ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ

ছোটবেলায়chhaya-chhobir-songi-logo আমরা একটা খেলা খেলতাম। হাতের দুটি আঙুলের আটটি কড়-এর মধ্যে একশো গুনতে হবে, কিন্তু কোনও কড়-এর পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। যে এর ভেতরের কায়দাটা জানেনা, তাকে বেশ মস্তানি দেখিয়ে বলা হত – “এই পারবি, পারবি”? তবে ব্যাপারটা জানা হয়ে গেলে দেখা যেত তেমন কিছু না। একটা লোক ঠকানো কায়দা মাত্র। আমরা আটটি কড়কে এই ভাবে ভাগ করতাম, “লাল-নীল-বাক-সো-এই-দেখো-এক-শো”। ব্যাস আট করে হয়ে গেলো একশ গোনা। তবে মোটেও এসব কায়দায় নয়, গুনে গুনে একশোটি বছর পার করে দিল ভারতীয় চলচ্চিত্র। তার বয়স এখন সত্যিই একশো। ১৯১৩ সালে দাদা সাহেব ফালকে পরিচালিত রাজা হরিশ্চন্দ্র চলচ্ছবি থেকে শুরু হয়েছিল সে যাত্রা। নানান ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে, চরাই উতরাই পেরিয়ে, পরীক্ষা নিরীক্ষা পেরিয়ে আজ ভারতীয় চলচ্চিত্র বিশ্ববন্দিতই শুধু নয়, সর্বজন গ্রাহ্য এবং সর্বত্র সম্মানিত।

এই বিশাল কর্মকাণ্ডের আমিও একজন ক্ষুদ্র কর্মী ভবতে আমার গর্ব হয়। আনন্দে বুক ভরে ওঠে। সারাজীবন আমি এই কাজটা প্রাণের আনন্দে করেছি। একটুও ক্লান্তি বা একঘেয়েমি আসেনি। এখনও কোনও নতুন চলচ্ছবির কাজে আমি সমান উৎসাহ পাই। তবে এ জগতে আমার প্রবেশ আকস্মিক। আমিও যে চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকব সারাজীবন একেবারেই ভাবিনি কোনোদিন। আমার মনে হয়, ছোটবেলায় এই রচনাটা আমাদের সকলকেই লিখতে হয়েছে, তুমি বড় হয়ে কি হবে? নানান জনে নানানটা লিখত, আমিও লিখেছি। পরবর্তী কালে আমার খুব জানার ইচ্ছে হত, সত্যি সত্যিই একশ ভাগ কারো ইচ্ছের সঙ্গে জীবনকে মিলিয়ে নিতে পেরেছে কি না।

আমাদের সময় ইনফরমেশন টেকনোলজি বলে কোনও শব্দই ছিল না। আর ছিল না এত রকমের পড়াশুনো করার বা নিজেকে মেলে ধরবার পথের দিশা। মূলত: সকলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত দুটো শাখায়। সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে। আমার বাবা মা-ও তার ব্যতিক্রম নন। তবে আমার মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী আমায় ডাক্তার বানানোরই চেষ্টা হয়েছিল। কারণ আমার দাদু, মায়ের বাবা, সফল ডাক্তার ছিলেন। মা’র পড়াশোনার তীব্র বাসনা ছিল। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিতে দিতেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। আর সেই বছরেই মাত্র সতেরো বছরের মা’র কোল জুড়ে আমি চলে আসি। ওই যে মা সংসারের গলি-ঘুঁজিতে ঢুকে পড়লেন, আর বেরোনো হল না তাঁর। কর্তব্যের পাহাড় সামলে পরে চেষ্টা করেছিলেন। এখন যেটা প্লাস টু, তখন বলা হত ইন্টারমিডিয়েট। আই এ, আই কম, আই এস সি এই রকম। পাসও করেছিলেন, মন মতো হয়নি। আর এগোনো হয়নি মা’র। মায়ের খুবই ইচ্ছে ছিল আমি দাদুর মত প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হই। আমি বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলাম তবে সেরাদের সারিতে আমায় গণ্য করা ভুল হবে। আমাদের সময় ছিল এগারো ক্লাসে হায়ার সেকেন্ডারি। প্রথম বিভাগেই পাশ করেছিলাম এবং প্রাপ্ত নম্বরে আমার মেডিকেল ভর্তি নিশ্চিত। কথায় বলে কপাল যায় সঙ্গে, সেবার থেকে হঠাৎ শুরু হল জয়েন্ট এন্ট্রান্স। বসলামও, হল না। হবার কথাও না, কারণ ওই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সঙ্গে একেবারেই পরিচয় ছিলনা তখন, প্রস্তুতিও উপযুক্ত ছিল না।

আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করি আমার ষোলো বছর তিন মাসে। তখনই আমার প্রায় একশ কবিতা লেখা হয়ে গেছে। সব গুলিই কবিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না জানি না, তবে লেখা হয়ে চলছে। অন্তঃস্রোতের অভাব নেই। অভাব নেই উন্মাদনারও। আমি যদি সত্যি কিছু হতে চেয়ে থাকি, আমি কবি হতেই চেয়েছিলাম। পরবর্তী সময় সেটা তেমনভাবে পালিত হয়নি। না আমার দিক থেকে, না আমার গুরুজনদের পরিচালনায়। ছেলে মানেই সাইন্স পড়তে হবে। কোথায় যে লেখা থাকে এই সব। আমি অনেকদিন কলেজে আমার ফিজিক্সের ক্লাস না করে বন্ধুর সাথে ওর বাংলা ক্লাস করেছি। মনে আছে জয়দেব বাবু বাংলা পড়াতেন। ধবধবে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরতেন আর খুব সুন্দর দেখতে ছিলেন। পড়াতেনও চমৎকার। মুগ্ধ হয়ে ওনার ক্লাসে বসে থাকতাম। আপাত দৃষ্টিতে আমার জীবন বাড়ির ভিতটা নড়বড়ে হয়ে রইল মনে হতে পারে কিন্তু এক আশ্চর্য জগতের দরজা আমার জন্য খোলা হয়ে গেছে তখন জানতে পারিনি।

 এর পর দ্রুত ফাস্ট ফরোয়ার্ড করলে, সাইন্স গ্র্যাজুয়েট হয়েছি, ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা পাশ করেছি, অল্প বিস্তর ফরাসী চর্চা করেছি, চাকরি করেছি, বিয়ে করেছি, ব্যবসা করেছি। সবটাই বাবার ছত্রছায়ায়। উনি আমায় তাঁর ভালোবাসা দিয়ে এতটাই আগলে রেখেছিলেন যে উনি চলে যাবার পর আমি অকূল পাথারে পড়েছিলাম। বাবা চলে যান দু হাজার সালে, তার থেকেও অনেকটা পিছিয়ে যাই। এই ধরুন ১৯৮৮-৮৯ হবে। পঁচাশিতে আমার বিয়ে হয়ে গেছে, অষ্টাশিতে আমার বড় মেয়ে আমাদের জীবনে এসে গেছে, এমন অবস্থায় গল্প শুরু।

আমার বড় ভগ্নীপতির খুড়তুতো ভাই, দীপন তপাদার, তখনই সে এক ছবির নায়ক, তার সাথে আলাপ হোল। কি কারণে যেন তারা বিয়ের সময় আসতে পারেননি। ঠিকানা ছিলনা, যোগাযোগ ছিলনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। তো সেই দীপন আমায় নিয়ে গেল দেবকুমার বসু’র কাছে। তখন তিনি সদ্য একটি মনিপুরী চলচ্ছবি করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। আসামেও কিছু কাজ করেছেন। তথ্য চিত্র করছেন বিভিন্ন। তখন তিনি দূরদর্শনের জন্য একটি সিরিয়াল শুরুর পরিকল্পনা করছেন। দেবকুমার দা’র আর একটি বিশাল পরিচয় আছে, তিনি স্বনামধন্য পরিচালক দেবকী বসু’র পুত্র। মেনকা সিনেমার পাশে দেবকী বাবুর সেই বিখ্যাত বিশাল বাড়িতে একদিন সকালে আমায় নিয়ে গেল দীপন। আগা গোড়া শ্বেত পাথরে মোড়া বাড়ি। অসাধারণ লেগেছিল সিঁড়িটা। চওড়ায় পাঁচ-ছ ফুট তো হবেই। দেবকুমার দা’র সাথে আলাপ হল। খুব অমায়িক, ভদ্র মানুষ। মুহূর্তের মধ্যেই আপন করে নিলেন। আমার যাওয়া আসা শুরু হল। প্রথম ক’দিন উনি আমায় বিভিন্ন স্ক্রিপ্ট পড়তে দিতেন। পড়া হয়ে গেলে আমার মতামত জিজ্ঞেস করতেন। আমার কথা, মাথা নাড়তে নাড়তে মন দিয়ে শুনতেন। কি কি যে বলতাম তখন আজ আর মনে নেই। তবে ওনার পছন্দ হত বুঝতে পারতাম। পরবর্তী সময় দেখেছি, উনি আমায় খুবই স্নেহ করতেন এবং আমার ওপর নির্ভর করতেন।

আমি তখন চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিকরি, নিয়ম কানুন, কিছুই জানিনা। রোজই আমার সামনে একটার পর একটা বিস্ময়ের জানালা খুলে যাচ্ছে। শুরু হল দূরদর্শনের জন্য ধারাবাহিক তৈরির কাজ। সেই ধারাবাহিকটি যা কি না সিরিয়ালের ইতিহাসে নানান কারণে মাইল স্টোন হয়ে আছে। সিরিয়ালের নাম ‘বিবাহ অভিযান’।


পরের পর্ব


One Reply to “ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *