বিজ্ঞাপনীয়তা

আজকাল টেলিভিশনে বাংলা বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে মনে হয়, ‘এরা কারা?কোথা থেকে আসে?’ যে বিজ্ঞাপনগুলো হিন্দি বা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে ডাব করা, সেগুলোর ভাষা দেখে হাসব না কাঁদব সেটা ঠিক করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কদিন ধরেই কয়েকটা এরকম বিজ্ঞাপন দেখে খালি মনে হচ্ছে যে এই কপিগুলো কারা লেখে? আমি তাদের এই আরামের চাকরিটা চাই, যেখানে ভুলভাল কিছু বসিয়ে দিলেই দায় সারা হয়ে যায়। কাজ কম, খাটনি কম,অধ্যাবসায় আদৌ নেই, ভাষা এবং উচ্চারণের কোনো মাদার ফাদার নেই। বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো আঞ্চলিক ভাষায় বিজ্ঞাপনকে বোধহয় ততটা গুরুত্ব দেয় না। অথবা তাদের ধারণা ক্রেতারা সবাই বোধহয় হিন্দি বোঝে বা পড়তে পারে। কয়েকটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হবেঃ

হরলিক্স (বাংলা) এমন একটি ব্র্যান্ড যা লক্ষ লক্ষ লোক রোজ কেনেন/ব্যবহার করেন। হিন্দি বিজ্ঞাপনটি এঁরা খুব যত্ন নিয়ে করিয়েছেন, কিন্তু বাংলার বেলায় দুয়োরানী কেন?বাচ্চাদের জন্যে হরলিক্সের উপকারিতা, যেটা কিনা এই বিজ্ঞাপনের আসল USP, সেটা বোঝানোর সময়ই এঁরা ধেড়িয়েছেন।

এতে আছে আধ কাপ দুধ যতটা ক্যালশিয়াম আর একশো গ্রাম বাদাম যতটা আয়রন।

এই পুরো বাক্যটি হিন্দি থেকে সরাসরি অনুবাদ হওয়াতে খুবই অদ্ভুত শোনায়।

ইসমে হ্যায় আধা কাপ দুধ যিতনা ক্যালশিয়াম ঔর সৌ গ্রাম বাদাম যিতনা আয়রন।

এই ‘যিতনা‘ থেকে ‘যতটা‘ অনুবাদের কি কোনো দরকার ছিল? হিন্দিতে যা মানে দাঁড়ায়, বাংলায় তো আদৌ কোনো মানেই হয় না। হিন্দি-বাংলা অনুবাদ সঠিক করবেন এরকম কপিরাইটার মনে হয় পাওয়া যায় না, কে জানে!

ওয়াইল্ডস্টোন ডিও স্প্রে(বাংলা) এই বিজ্ঞাপনের জিঙ্গলটি হিন্দিতে এত সুন্দর যে শুনতে দারুণ লেগেছিল কয়েকদিন। তারপর যখন বাংলায় এল একই জিনিস,প্রথমবার শুনেই ভেবেছিলাম, ‘ভগবান, তুলে নাও! (আমাকে নয়, ওদের)’ …কী অত্যাচার রে ভাই!এরকম অনুবাদ আমি বাবার কেন ঠাকুর্দার জন্মেও শুনিনি। হিন্দি জিঙ্গলটি হলঃ

রংরেজা,… ইত্যাদি, প্রভৃতি (দূর মশাই, অত মন দিয়ে কে শোনে!)

আর এর বাংলা অনুবাদটি শুনবেন? প্লিজ শুনুন, আমি একাই কেন ভুগব।

রঙের রাজা,… ইত্যাদি, প্রভৃতি (এটাও পুরো শোনার প্রয়োজন বোধ করিনি)

উর্দুতে রংরেজা মানে যিনি কাপড় রঙে ছোপান, আর বাংলায় রঙের রাজা মানে…বোধহয় ভালো রঙের মিস্ত্রীকে বোঝায়। সেদিক দিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয় কপিরাইটার দারুণ সোশালিস্ট, সবরকম ক্লাসের ক্রেতাদের একই ডিও স্প্রে দিয়ে আয়ত্তে আনতে চেয়েছেন। তবে যারা শুধু দিয়া মির্জার লাল শাড়ি আর বিপজ্জনক ব্লাউজ দেখে এই ডিওটা কিনবেন/অলরেডি কিনে ফেলেছেন, তাদের এইসব দেখে-শুনে-পড়ে-ভেবে কোনো লাভ নেই, ‘জয় মা‘ বলে কিনে ফেলুন আর তারপর কী হল সেটা…থাক, আমাদের জানাবার দরকার নেই।

বেনাড্রিল (বাংলা) এটা নিয়ে আমার বিশেষ আপত্তি নেই, পুরো বিজ্ঞাপনটি আপনি মন দিয়ে শুনবেন,ভালই লাগবে। শুকনো কাশি আর কফওয়ালা কাশির আলাদা আলাদা ওষুধ হয় সে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবেন। আর সবশেষে গিয়ে এই ট্যাগলাইনটা দেখবেনঃ

কাশি আলাদা তো সমাধানও

এটা দু সেকেন্ডের জন্যে শুনে কানে লাগে না, কিন্তু লেখাটায় চট করে চোখ পড়লেই কীরকম যেন খট করে বাজে। হিন্দিতে ওরিজিনালি এই ট্যাগলাইনটা ছিলঃ

খাঁসি অলগ তো হল ভি

এ যেন মনে হয় কেউ গুগল ট্রান্সলেট খুলে শব্দ-টু-শব্দ বসিয়ে দিয়েছে। আর কে না জানে গুগল ট্রান্সলেট একটা অলপ্পেয়ে জিনিস, বাবা কে অবলীলায় মামা করে দিতে পারে। একটু কষ্ট করে সময় ব্যয় করে একটু সঠিক অনুবাদ কী একেবারে করা যায় না? মানছি অ্যাড এজেন্সিগুলি একসঙ্গে অনেকগুলো অ্যাকাউন্টের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু তা বলে এই?

সার্ভো (বাংলা)- বিজ্ঞাপনটি বেশ সুন্দরভাবে বানানো, অ্যানিমেশনও ভাল। ‘সার্ভো’র নাম লেখা একটা পেনসিল ঘুমন্ত বাচ্চার হাত থেকে পড়ে তার সব খেলনাগুলোকে জাগিয়ে তোলে। মিষ্টিমত বিজ্ঞাপন, আপনারও ভাল লাগবে, বাচ্চাদেরও। তবে একেবারে শেষে এসে ট্যাগলাইনে আপনি আটকে যাবেন।

সার্ভো ভর। প্রাণ ভর।

বাক্যবন্ধটি অবশ্য আপনার কানে এরকমভাবে আসবেঃ সার্ভো ভরো। প্রাণ ভরো।

আমার প্রথম আপত্তি বানান মুদ্রণে। ট্যাগলাইনের ক্ষেত্রে বানানটা বাকি বিজ্ঞাপনের থেকেও জরুরি কারণ ওটাই দর্শককে আকৃষ্ট করে। দ্বিতীয় আপত্তি অনুবাদে। মূল হিন্দী বিজ্ঞাপনে বাক্যবন্ধটি এরকম ছিলঃ

সার্ভো ডালো। জান ডালো।

হিন্দীতে ‘জান ডালা’র একটা ব্যপ্তি আছে। পুতুলের প্রাণ দেওয়া, বা কোনো মূর্তি এতটাই জীবন্ত দেখানো যেন কারিগর তাতে প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন, এগুলো হিন্দীতে বেশ প্রচলিত। কিন্তু বাংলায় এভাবে ‘প্রাণ ভরা’ ব্যবহার করা হয় বলে আমার জানা নেই। বড়জোর দেবীমূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, এছাড়া কোনো পুতুল/মূর্তিতে ‘প্রাণ ভরা’ হয় না বাংলায়। অন্তত আমার জানা নেই, আপনাদের জানা থাকলে আমায় নিশ্চয়ই জানাবেন।

ক্যাডবেরি চকলেয়ার্স (বাংলা)- বিশদে পরে গিয়ে প্রথমেই বিজ্ঞাপনটি ব্যক্ত করিঃ

ক্যাডবেরি একলেয়ার্স এখন ক্যাডবেরি চকলেয়ার্স। এটা এঁটে থাকে না।

কিছু বুঝলেন? আমি প্রথমবার দেখেশুনে কিস্যু বুঝিনি। ‘এঁটে থাকে না’ মানে কী? পুরো বিজ্ঞাপনটি শেষ অব্দি দেখতে হল ব্যাপারটা বোঝার জন্যে। তারপর এই যুগান্তকারী ট্যাগলাইনটি এলঃ

এটা মনে এঁটে থাকে, দাঁতে নয়।

সার কথা বুঝলাম যে ক্যাডবেরি একলেয়ার্স খেলে সেটা আগে দাঁতে আটকে যেত, এই নতুন চকলেয়ার্স একদম মুখে মিলিয়ে যাবে, দাঁতে আটকাবে না। আটকানো আর এঁটে থাকা হয়তো একই জিনিস, তবে তা বোধহয় দাঁতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ব্যাকরণে হয়ত ভুল নেই, কিন্তু শ্রুতিমধুরতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে। সেটা ভুলে গেলে কপিরাইটারদের চলবে কী করে?

পুনশ্চঃ আরেকটি অর্বাচীন বিজ্ঞাপন আছে বাংলায় যার শেষে ট্যাগলাইনটা হিন্দিতে লেখা থাকে, যেন সব বাঙালী দর্শক হিন্দি পড়তে পারেন! কীসের বিজ্ঞাপন এক্ষুণি মনে পড়ছে না, পরে মনে পড়লে জানিয়ে দেব আপনাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *