বুজগুড়ি – ১ [স্বপ্ন]

একটা পাহাড়ি উপত্যকা অনেক অনেক দূরে, বাহারি সবুজ মাদুর পেতে বসে আছে কাঁচা-মিঠে রোদ মেখে। সেই উপত্যকাকে হাত ধরাধরি করে ঘিরে আছে মেঘ-জামা পরা উঁচু-নিচু পাহাড়েরা। ওই পাহাড়দের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা আর সবচেয়ে বুড়ো পাহাড়ের ঠিক চুড়ো থেকে উপত্যকার মধ্যিখান দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে একটা চিকচিকে নদী, কাঁচের মত টলটল করছে জল। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে বেশ খানিক নিচে চেরা-চোখের বোঁচা-নাকের হাসি-মুখের একদল মানুষের ছোট্টো একটা গ্রাম। বুড়ো পাহাড়ের ঠিক উল্টোদিকে উপত্যকার কানাচ ধরে উবু হয়ে আছে একটা আদ্যিকালের বৌধ্যগুম্ফা, পাহাড়িরা বলে, “লামাদের বাড়ি”।

একদিন আমি ঘুরতে ঘুরতে ভুল পথে ঘুরপাক খেতে খেতে কোনফাঁকে হটাৎ সেই উপত্যকায় পৌঁছেছিলাম। খানিক সেই সবজে গালচেতে নিজেকে বিছিয়ে নিয়ে জিরেন নিলাম। তাপ্পর ঢিমে পায়ে হেঁটে গেলাম নদীর পাড়ে। হাঁটু জলে ডুব দিয়ে বসে রইলাম কতক্ষণ খেয়াল নেই। ঘুম-মাখা আরাম-হাওয়া উড়ছিল আমার চুলের ফাঁকে ফাঁকে। ততক্ষণে অবিশ্যি নদীর লাল-নীল মাছেরা পায়ের আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে লুকোচুরি খেলে নিলে বেশ। আলগোছে ফিনফিনে সাদা সাদা মেঘেরা ঘিরেছিলো পাহাড়ের চুড়ো, অনেক দূরে পাহাড়ের কোলঘেঁষে একদল সাদা তুলোতুলো ভেড়ার পাল ঠেলাঠেলি করে এ ওকে জাগিয়ে রাখছিল।

বেশ একটা ফুরফুরে ভাব। ওমা! কোত্থেকে একদল দস্যি মেঘ এসে ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি মাখিয়ে জুবজুবে করে একসা করে দিলে সব কিছু। চেরা-চোখোদের উঠোনে শুকোতে দেওয়া আমসত্ত্ব, পেয়ারার জেলি, নকশি কাঁথা, রোঁয়া-ওঠা কম্বল সব ভিজে ঝুপ্পুস। তুলতুলে ভেড়ারা সব ভিজে চুবড়ি। দস্যি মেঘের কান্ড দেখেতো সব থ। কি করব কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছিনা। এমনি সময় লামাদের বাড়ি থেকে গমগমে গলায় বিশাল বড় আদ্যিকালের ঘন্টা বাজল “ঢং ঢং ঢং”, লামাদের ঘন্টার বকা খেয়ে দস্যি মেঘেরা দিলো ছুট ছুট ছুট।

আর আমার ঘুম ভাঙল একটা একবগগা ঘরে আধটেরে বিছানার কোলঘেঁষে। যেইনা ঘুম ভাঙা অমনি পড়ি কি মরি করে আজে বাজে ফালতু কাজের দল পঙ্গপালের মত দল কে দল ঝাঁপ মারলে আমার মগজ লক্ষ করে। আমি আর কি করি??

আমি তখন অনেক ভেবে, ভেড়ার দলকে পাহাড়ের গুহায় ঘাস-জল দিয়ে লুকিয়ে, নদীকে বুড়ো পাহাড়ের কোলে ঘুম পাড়িয়ে, চেরা চোখোদের উপত্যকার কার্ণিশে বসিয়ে, উপত্যকাকে লামাদের বাড়ির ঘন্টার ফাঁকে গুঁজে দিয়ে, লামাদের বাড়িকে মেঘেদের হাতে জমা করে, মেঘেদেরকে মনের ফাঁক তালে চিপে দিয়ে, মনকে স্বপ্নের কোটরে হাপিশ করে ফেলে বুজগুড়ি কাটতে কাটতে তুল্লাম এক খান ইয়াব্বড় হাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *