ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (৩)

আগের পর্ব


 

3.1

শুরু হ’ল ‘অপূর্ণ’র শ্যুটিং। আমার কাছে তো সবই বিস্ময়, সবই নতুন। অজানাকে জানার এক তীব্র বাসনা। এই বাসনাটা ছিল বলেই হয়ত আমি একটা ছবিতেই যাবতীয় কারিগরি কাজগুলো সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হয়ে গিয়েছিলাম। সেজন্যে অবশ্যই দেব দত্তদা’র অবদান অনেক। উনি দিনের পর দিন আমায় প্রতিটি পদক্ষেপ অতি যত্নের সঙ্গে বুঝিয়ে দিতেন, শিখিয়ে দিতেন। আজ জানিনা, উনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না। যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন দেব দত্তদা। আমার প্রণাম নেবেন।

ট্রাইপড, ভিডিও ক্যামেরা আমারও একটা ছিল। ফিল্মিং ব্যাপারটা একেবারেই যে জানতাম না, তা নয়। ততদিনে উইংগার্ড থেকে ভিডিও ফিল্মের একটা কোর্সও করা হয়ে গেছে। তবে সেটা ছিল ভিডিও শিক্ষা। ঠিক ঠিক কি কি পদ্ধতিতে সেলুলয়েডের কাজ হয় জানা ছিল না।

আমি আমার ভিডিও ক্যামেরাটি কিনেছিলাম, মানে আমার বাবা কিনে দিয়েছিলেন অন্য কারণে। আমি এটিকে আমার রুজির জন্য ব্যবহার করতাম। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কার্যকলাপকে ক্যাসেট বন্দী করা ছিল আমার কাজ। হ্যাঁ তখন ক্যাসেট ব্যবহৃত হত। সেগুলিকে আবার সাজিয়ে গুছিয়ে, মানানসই সঙ্গীত যুক্ত করে, মনোগ্রাহী করে দিতে হত। এটাও তখন আমার একটা রোজগারের উপায় ছিল।

অপূর্ণ’র শ্যুটিং এ প্রথম দেখলাম ফিল্ম ক্যামেরা। প্রথম দেখলাম ব্যবহৃত আলো। প্রথম দেখলাম ট্রলি। প্রথম দেখলাম রিফ্লেক্টর। প্রথম দেখলাম স্ক্রিপ্ট। প্রথম দেখলাম মেক আপ। আরো অনেক কিছুই প্রথম অভিজ্ঞতা এনে দিল।

ফিল্ম ক্যামেরার মাথার ওপর আটকে দেওয়া হয়, ফিল্ম সহ বাক্সটিকে। যেটিকে বলা হয় ম্যাগাজিন। এই ম্যাগাজিনে ফিল্ম পোরা বা লোড করা একটি দক্ষতার কাজ। কিছু কিছু মানুষই এ ব্যাপারে দক্ষ, তারাই এ কাজটি করেন। সেই কাজটিও বেশ অদ্ভুত। বিশাল একটি কালো কাপড়ের ব্যাগ’এর এ মাথা থেকে ও মাথা থাকে চেন বন্দী। সেই চেন খুলে, ওই ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, ম্যাগাজিনটি এবং একটি সীল না খোলা ফিল্মের ক্যান। চেন বন্ধ হয়ে যায়। অন্য দিকে দু প্রান্তে দুটি জামার হাতার মত গর্ত থাকে। সেই গর্ত দুটি্র শেষে দুটি গ্লাভস লাগানো থাকে। কোনো মতেই বাইরের আলো সেখানে ঢুকতে পারে না। সেই জামার হাতার মত ফুটো দিয়ে এবার যিনি কাজটা করবেন তিনি তার দুটি হাত ঢুকিয়ে দেন। দুটো হাত গলিয়ে, গ্লাভস দুটি পরে নিয়ে ওই কালো ব্যাগের মধ্যে, স্রেফ আন্দাজে, ওই ক্যানের সীল খুলে, ফিল্ম বের করে, ম্যাগাজিনের মধ্যে সঠিকভাবে স্থাপন করতে হয় এবং আরো আছে। হাতের আন্দাজে, স্পকেট বা দাঁড়ায় ফিল্মের প্রান্তের ফুটো ফুটো ঘাট গুলি সঠিকভাবে আটকে দিতে হয়। পরে এই স্পকেটগুলিই ফিল্মটিকে মসৃনভাবে অগ্রসর হতে সাহায্য করে।

আগেই বলেছি, এটি খুবই দক্ষতার কাজ। এ কাজে ভুল হলে, অনেক অনেক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। কিছু কিছু সময় তা যে হয়না, তা নয়। স্পকেট ছিঁড়ে গিয়ে, ফিল্ম এগোলোই না। প্রথমে ধরতে পারা গেলনা। শ্যুটিং হয়েই চলল। অথচ ফিল্মে কিছুই ধরা থাকল না। সেক্ষেত্রে পুনরায় ঐ দৃশ্যগুলি আবার চলচ্চিত্রায়িত করতে হয়। তা বেশ কষ্টকর এবং ব্যায়সাধ্য। আমার কাজ করা একটি ছবিতে একবার এমন ঘটনা ঘটেছিল। সে গল্প, সেই ছবির কথা যখন বলব, তখন বলব।

আবার এই ফিল্ম ঠিক ঠিক স্থাপনা না করলে, কোনোও কারণে, কোনোও আঁচড়ের দাগ পড়লে, তোলা ছবিতেও সে দাগ এসে যাবে। তখন সে ছবিটি গ্রহনযোগ্যতা হারাবে। অতএব এই ফিল্ম লোডিং কাজটি খুবই সাবধানতার সাথে করতে হয়।

3.2

দীপঙ্কর দে কে তখন শুধু দাদা বলতাম। ভয় পেতাম। পরবর্তী সময় টিটো দা হয়ে গিয়েছিলেন এবং বন্ধুও। অনেক কাজ করেছি ওঁনার সঙ্গে। কিন্তু ‘অপূর্ণ’র সময় প্রথম বলে একটু দ্বিধা হ’ত কাছে যেতে। পাঠ পড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার। দরাজ গলায় আমায় ডাকতেন টিটো দা, ‘এসো রানা পড়া ধর’।

আমাকে ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন বলেই কি না জানিনা, আমাকে নিয়ে নানা মজাও করতেন। একদিন এই রকম পাঠ পড়ানোর সময়, উনি ডিভানের ওপর বসে ছিলেন, পায়ের নীচে চাপা ছিল ওঁনার স্ক্রিপ্টটা। আমায় বললেন, ‘রানা, এই দেখো পায়ের নীচে স্ক্রিপ্ট রেখেছি, কিছু হবে না তো’? বুঝলাম আমায় ক্ষ্যাপানোর জন্যই উনি ইচ্ছে করে, এটা করেছেন। এও বুঝলাম একটু আগেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে এক সহকর্মীকে জ্ঞান দিচ্ছিলাম, ওটা উনি শুনেছিলেন। তবু আমি নতুন তো, ভয়ে কিছু না বলে, মিটিমিটি হাসতে লাগলাম। তবে মনে মনে একটা অসন্তুষ্টিও ছিল।

স্ক্রিপ্টটাকে আমি চিরকালই মাথায় করে রেখেছি এবং ভগবান টগবান জানিনা, সমতুল্য সম্মান দিয়েছি। ওটাই আমাদের পেটের ভাত জানতাম। সুতরাং পেটের ভাতের জোগাড় যে করে তার সম্মান কতটা করা উচিত নিশ্চয়ই সবাই জানেন।

3.3

আর একটা মজার ঘটনা বলে এবারের লেখা শেষ করব। টিটো দা’র মত মম দি’ও আমায় খুব স্নেহ করতেন। পরবর্তি সময় আমার এই সহকারী জীবনে এঁদের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। মম দি তার নাচের স্কুল উদয়নের বিভিন্ন ডকুমেন্টেশনের কাজ দিয়েও আমায় সাহায্য করেছেন। এই ‘অপূর্ণ’ র শ্যুটিং চলাকালীন মম দি মনে মনে তাঁর ট্রুপের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধও করে ফেলেছিলেন। উনি জানতেন না আমি বিবাহিত। জেনে খুব হতাশ হয়েছিলেন।


পরের পর্ব


One Reply to “ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (৩)”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *