ঝলমলে পাখি পার্পল সানবার্ড

IMG_4630

IMG_2931একটা ছোট্ট ঝকমকে পাখি সারাদিন আমার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর একটানা জোরালো চুউইট্ চুউইট্ শব্দে মাতিয়ে দিচ্ছে আমার সারা সকাল দুপুর ! তখনও জানতাম না কি চাইছে পাখিটা, হটাৎ একদিন বুঝলাম এটা ওদের প্রজনন ঋতু আর তাই দরকার একটা বাসার, তাইতো ওরা বাসা বেঁধেছে আমার বাড়ির কাঞ্চন ফুলের গাছে।

পার্পল সানবার্ড বা দুর্গাটুনটুনি পাখির নাম কেনো এমন হল তা জানতে হলে পাখিটা দেখতে হবে ঝলমলে রৌদ্রজ্জল দিনে কেননা তখনই ঘন ধাতব বেগুনি রঙের ফাকে ঘন নীল ও সবুজ রঙের আভা ফুটে উঠবে, আর বাচ্চাদের বুকের রঙ যখন উজ্জ্বল হলুদ থাকে তখনতো যেকোনো বিউটি কম্পিটিশন জেতা ওর পক্ষে সম্ভব। স্থান বিশেষে পার্পল সানবার্ডকে মৌটুসি নামেও ডাকা হয়।

পুরুষ পাখিটির থেকে সৌন্দর্যে স্ত্রী পাখিটি কোনো অংশে কম যায়না, স্ত্রী পাখিটির পিঠের রঙ জলপাই বাদামী এবং পেট ও বুকের কাছটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের হয়। সানবার্ডের ঠোঁট এদের অনন্য করে তোলে অন্যান্য পাখিদের থেকে, এদের লম্বা সরু চঞ্ছুটি যেন মধু সংগ্রহের জন্যই তৈরি। উত্তর আমেরিকার হামিং বার্ডের মতো এরাও উড়ন্ত অবস্থায় ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। পার্পল সানবার্ড পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়। এরা আকারে চড়াইয়ের থেকে ছোট হয় এবং এদের বিজ্ঞান সন্মত নাম Cinnyris asiaticus।

পার্পল সানবার্ডের পুরো জীবনটাই বর্ণময় এরা যখন জন্মায় তখন দেখতে প্রায় মায়ের মতো হয়, সারা গায়ে উজ্জ্বল হলুদ রঙ থাকে ধীরে ধীরে যখন বড় হতে থাকে তত তাদের হলদে রঙের জায়গা হারিয়ে রঙ নেয় ঘন নীলচে বাদামী রঙ তবে মাঝে মাঝে বিশেষ করে প্রজনন কালে আবার গলা ও বুকের কাছে হলুদ রং ফুটে ওঠে। প্রজনন পর্বে পুরুষ পাখিটি স্ত্রী পাখিটির সামনে ডানা ছড়িয়ে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে এবং গান গায়। এরপর স্ত্রী পার্পল সানবার্ড বসন্তের শেষে বাসা করে গাছের ডালে, আর পুরুষ পাখিটি পাশে থেকে দেখাশোনা করে ও বাসার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। বাসাটা দেখতে খানিকটা ঝুলন্ত থলির মতো হয় এবং ঘাস, নোংরা আবর্জনা ও গাছের পাতলা ছাল দিয়ে এরা বাসা বানায়। বাসাতে দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে এবং স্ত্রী সানবার্ড বাচ্চাদের দেখাশোনা করে যদিও এই সময় পুরুষ পাখিটি খাবারের জোগান দেয়।

এদের ছটফটে স্বভাব ও পুরুষ-স্ত্রী পাখির নিরন্তর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এদের বাচ্চারা শিকারি পাখিদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে, তবে এদের প্রধান শত্রু শিকরা। পার্পল সানবার্ডের সাথে অন্যান্য সানবার্ডের পার্থক্য শুধুমাত্র এদের রঙের বাহার দেখেই করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে পার্পল সানবার্ড প্রায় ২০-২২ বছর অবধি বেঁচে থাকে। তবে আমরা ইচ্ছে করলেই বাঁচিয়ে রাখতে পারি এদের, দিনের পর দিন গাছপালা কেটে বানানো হচ্ছে বড়বড় ঘরবাড়ি যা কেড়ে নিচ্ছে এই সব সুন্দর সুন্দর নিরীহ পাখিদের বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক আস্তানা। হয়ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এদের দেখতে জেতে হবে কোন মিউজিয়ামে বা সার্চ করতে হবে গুগুল জাতিও কোন সার্চ-ইঞ্জিনে! তাই এখনো সময় আছে ভুল শুধরে নেওয়ার। আমাদের চারপাশের সুন্দর পরিবেশ কে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের মনের মলিনতাকে মুছে ফেলতে হবে, নিজেদের স্বার্থপর মনটাকে বোঝাতে হবে অনেক হয়েছে … আর না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *