নীলকন্ঠ

Nilkantho

নামটা শুনেছেন নিশ্চয়ই। এই পাখিটিকে বলা হয়। ইংরিজিতে Indian roller.
কিছুদিন আগেও ইংরিজিতে আর একটা নাম ছিল, ‘Blue jay’. কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, ও নামটা ভুল। ‘ব্লু জে’ আসলে অন্য পাখি। এবার আমি যদি বলি, ‘নীলকন্ঠ’ নামটাও ভুল, নীলকন্ঠ আসলে অন্য পাখি? সবাই রে রে করে তেড়ে আসবেন না? চিরকাল জেনে এলাম এই পাখিটা নীলকন্ঠ, আর উনি এলেন কোন বিশারদ নাম নিয়ে গোলমাল পাকাতে?

আচ্ছা, বলুন তো, চিতাবাঘ দেখেছেন, ওই ইংরিজিতে যাকে বলে leopard ? সেটাও ভুল নাম জানেন কি? কী করে জানবেন বলুন, বলতে বলতে সেটাই এখন গেড়ে বসেছে। এমন কি চিড়িয়াখানার লেপার্ড এনক্লোজারের বাইরেও বাংলায় লেখা ‘চিতাবাঘ’।, ছোট বেলাত অ-য়ে অজগর আসছে তেড়ে তো আমরা সবাই পড়েছি। মনে আছে, ‘ঙ’ নৌকো,মাঝি ব্যাঙ, চিতাবাঘের সরু ঠ্যাং’? আজ্ঞে হ্যাঁ, সরু ঠ্যাং ওয়ালা ‘Cheetah’-ই বাংলায় ‘চিতাবাঘ’।, যা ভারতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অফিশিয়ালি ১৯৪৮ সালে। তারপরেও দুটো বাচ্চা কীকরে যেন বেঁচে গেছিল। মহারাজা কারনি সিং ( সেই অলিম্পিক শুটার) বীরদর্পে অসহায় বাচ্চাদুটোকে গুলি করে মারেন ১৯৫২ সালে।

তারপর যেহেতু গোল ছোপওয়ালা জন্তু বাঙালি আর দেখেনি(চিড়িয়াখানায়, বাইরে দেখার স্কোপ নেই, বাংলায় ছিলনা), তারা তখন অন্য গোল ছোপওয়ালা জন্তুটাকে চিতাবাঘ বলতে লাগল। কিন্তু আমাদের চেয়ে যাঁরা বয়সে বড়, তাঁদের মুখে ঠিক নামটাই শুনতাম –‘গুলবাঘ’।, ধীরে ধীরে গুলবাঘ নামটা হারিয়ে গেল। লেপার্ড এখন চিতাবাঘ। বাঙালি ছোট লরিকে ‘ম্যাটাডর’ বলে, কোলকাতার সামনের সারির বাংলা, ইংরিজি দুটো কাগজেই তাই লেখা হয়, চিতাবাঘ তো শিশু।

নীলকন্ঠ – আচ্ছা কেউ ভেবে দেখেছেন, কন্ঠটাই তো নীল নয়। বাকি শরীরের অনেকটাই তো নীল। তবে ব্যাটাচ্ছেলের নাম নীলকন্ঠ কেন? কোন যুক্তিতে? শুনুন তবে লেপার্ড যেমন চিতাবাঘ নয়, এটাও নীলকন্ঠ নয়।

আশির দশকের মাঝামাঝি, আনন্দবাজারের ক্রোড়পত্রে বিরাট হেডলাইন ও দারুন আকর্ষক রঙিন ছবি সহযোগে শ্রী দেবদূত ঘোষঠাকুরের এক বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হ’ল, ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’।, সেটি যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের নামানুসারে, তা নিশ্চয় বলে দিতে হবেনা। সেখানে নীলকন্ঠ পাখি নিয়ে অনেক কথা বলা ছিল। শোভাবাজারের রাজবাড়ির যে বিজয়ার দিনে নীলকন্ঠ উড়িয়ে দেওয়ার প্রথা, তার বিরুদ্ধে। পড়ে অবশ্য হাসব না কাঁদব ঠিক করতে পারিনি। নীলকন্ঠ (মানে, এই পাখিটা) নাকি ‘পুরুলিয়া’-র পাখি। কোলকাতায় তাকে ছাড়লে নাকি কাকে মেরে দেবে, ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে বলি,এটি পুরুলিয়া-চুরুলিয়ার নয়, সারা বাংলার যত্র তত্র দেখা যায়। কোলকাতায় কাকে মারবে? গল্ফ গ্রীনে বা টলি ক্লাবে কটা দেখতে চান? কিন্তু গোড়ায় গলদ মহাশয়, এটি নীলকন্ঠ পাখিই নয়।

নীলকন্ঠ পাখি আসলে এরই জাতভাই, নাম ‘কাশ্মির রোলার’ তার কন্ঠ, অর্থাৎ গলাটাই নীল। তাকে পাওয়া যায় লাদাখ অঞ্চলে, মানে যেখানে তার উড়ে যাবার কথা, সেই কৈলাশের খুব কাছে। এখন ভারতের মূল ভূখন্ডে পাওয়া যায়না, কারন, মাইগ্রেশনের রুটে ওদের মেরে মেরে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। তবে এককালে গুজারাট, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র, কেরল ও কর্ণাট অঞ্চলে শীতকালে চলে আসত। তাকে আর দেখা যাচ্ছেনা বলেই এ বেচারার নাম হয়েছে নীলকন্ঠ।

আরও একটা বিষ্ফোরক তথ্য দিচ্ছি। একটা লিঙ্কও দিচ্ছি, সেটা একটা বহু প্রাচীন বইয়ের। বিজয়া দশমী আসলে হয় দসেরার দিনে। মনে রাখতে হবে এই দুর্গাপূজো কিন্তু আসল দুর্গাপূজো নয়। রাজা কংসনারায়ণ চালু করার আগে দুর্গাপূজো হত বসন্তকালে। নীলকন্ঠ ওড়াবার রীতি আসলে দসেরায়। কেন? দসেরার সঙ্গে নীলকন্ঠ বা শিবের কী সম্পর্ক? সম্পর্ক নেই তো। ওই বইটায় বলছে, নীলকন্ঠ আসলে বিষ্ণুর প্রতীক। আপনারা বলবেন, ধূর মশায়, বিষ্ণু আবার নীলকন্ঠ হলেন কবে? আরে বাপু হননি তো। তিনি তো ‘নীলকান্ত’।, বইটায় লেখা আছে, এটি মহারাষ্ট্রের প্রথা। তাদের সঙ্গে দক্ষিণীদের খুব যোগাযোগ ছিল এককালে। দক্ষিনীরা তো ‘ত’ লেখেন টি+এইচ দিয়ে। জয়ললিতা বানান Jaylalitha। তো নীলকান্ত তো Neelkantha – এভাবেই লেখার কথা। তাই নয় কী? লিঙ্ক দিলাম এখানে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *