মা আসছেন

প্রতিবারই ঝামেলা লাগে। এবছরও লাগলো। কি না, সরস্বতীর একপাটি স্টিলেটোজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা! যাবেই বা কি করে, মামার বাড়ী থেকে ফিরে এসে সব এক্কেরে হেদিয়ে পড়ে প্রতি বছর। কোথায় কি ছুঁড়ে ফেলে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেইকো। একে তো চার-চারটে দিন ধরে অখাদ্য-কুখাদ্য গিলে পেটের ভেতর কুরুক্ষেত্র, তার ওপর ভুলভাল মন্তর শুনে শুনে কানে খোল জমে হালত আরই খারাপ। পইপই করে দুগ্‌গা বলতে থাকেন যে ওরে ম্যাক ডি তে যাসনা, আর ওই ডালডা মারা বিরিয়ানি তো নৈব নৈব চ …তা সেকথা কেউ শুনলে তো। পেত্যেকবার ফিরে এসেই অশ্বিনীকুমারদের ডবল ফীজ দিয়ে বাড়ীতে ডাকতে হয়! আর মহাদেব এমনিতেই ন্যালাখ্যাপা গোছের, ছেলেমেয়েদের শরীর খারাপ দেখে একেবারে গুষ্টির তুষ্টি করতে থাকে বৌয়ের। আবব্বে, তোর ছেলেমেয়েগুলো একেকটা কি স্যাম্পেল সেটা আগে দ্যাখ।

এইবার যেমন যাওয়ার আগে থেকেই খ্যাচরম্যাচর শুরু হয়েছে। কোত্থেকে খবর পেয়েছে কে জানে, কলকাতায় নাকি মদ,গাঁজা খাওয়া নিয়ে ব্যাপক বাওয়াল হয়েছে । ব্যস্‌ ! আর যায় কোথায়, একেবারে রাগে নেত্য করতে লেগেছে মিন্‌সে! আবার কত কথা, ” ক্যানো শুনি ? নেশা করে কনস্ট্রাকটিভ কাজকম্মো করা যায়না ? আমি নাচ-গান করিনা? আমি ত্রিগুণাতীত নই? ” আ মোলো যা, কোথায় কী ছোট্ট ঘটনা হয়েছে সেই নিয়ে বেকার চিল্লামিল্লি। সরস্বতীও বাপের তালে তাল মিলিয়ে সাফাই গাইতে লেগেছিল ,”হ্যাঁ, আমি বলছি ওরা বেশ মন দিয়েই আমার উপাসনা করে…এসব একদম ঠিক হয়নি” …… বোঝো ! এরপর যা হয় আর কি ! স্বামী-স্ত্রী তে ধুন্ধুমার…বুড়ো ব্যাটা শেষে ঠিক মেনে নিলো কিন্তু মাঝখান থেকে হল কী সেদিন আর জয়া-বিজয়ার সঙ্গে স্পা তে যাওয়া হলনা। ডেট পাওয়া এমনিতেই টাফ্‌ এইসময় আর মিস্‌ হলে তো কথাই নেই! ডানদিকের তিনটে আর বাঁ দিকের দুটো হাতে ম্যানিকিওর ছাড়াই এখন রওনা হতে হচ্ছে। মাথা আবার চিড়বিড়িয়ে উঠলো দুগ্‌গার।

কেউ তো আর বুঝবেনা, কী মারাত্মক সব ঘ্যাম নিয়ে হিরোইনরা পুজো ‘উদ্বোধন’ করতে আসে, বোধন না হোক, উদ্বোধন মাস্ট । সেখানে একটু টিপ্‌টপ্‌ হয়ে যেতে হয় নইলে মান থাকেনা। মেয়েরা তো কবে থেকেই শুরু করে দ্যায় মাঞ্জা মারা, কেতো, গণ্‌শাও কিছু কম যায়না । কেতোর ত স্বভাব ভীষণ খারাপ হয়ে গ্যাছে , হাঁ করে তাকিয়ে থাকে প্যান্ডেলসুন্দরীদের দিকে! এমনকি অসুরটা পর্যন্ত নুন-জল না খেয়ে এইট প্যাক্‌স বানাতে শুরু করে তিনমাস আগে থেকে! ভাবা যায়! সে যাক্‌গে, কিন্তু সংসারের ঘানি টেনে টেনে শুধু তাঁরই আর রূপচর্চা করার সময় হয়না। দীর্ঘশ্বাস পড়ে একটা দুগ্‌গার। ঠিক এই সময়েই একগাল হেসে বেরিয়ে আসে সরস্বতী, পেছনে পেছনে হাঁসু, ঠোঁটে জুতো।

“একি, তোমরা এখনও দাঁড়িয়ে ? চল চল …” নৌকোর দিকে এগোতে থাকে সরস্বতী,” এই কেতো, সরে বোস দিকি, আমার সাদা জামদানী তে যেন আবার তোর ময়ূর কাদা মাখা পা না দিয়ে দ্যায়”। ময়ূরটা খুক্‌ করে একটু হেসে একেবারে সামনের দিকে কেটে পড়ে। লক্ষ্মী অনলাইনে ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট চেক করছিল, তাই-ই করতে থাকে মন দিয়ে। “এলুম গো” বলে দুগ্‌গা নৌকোয় উঠতেই দুলে ওঠে সেটা। আর গণ্‌শা গজগজিয়ে বলে ওঠে ” আর কদ্দিন এসব নৌকো-ফৌকো করে যেতে হবে! কী ব্যাকডেটেড মাইরি , বেকার ভ্যান্‌তাড়া…আমার কোন ভক্ত কে বললেই লেটেষ্ট মডেলের ইম্পোরটেড গাড়ী পাঠিয়ে দেবে!” বাকিরাও সরবে সায় দ্যায় এবং জানায় যে তাদেরও মালদার ভক্ত কিছু কম পড়ে নাই ।

মা দুগ্‌গা শুনেও না শোনার ভান করে জলের দিকে তাকিয়ে থাকেন । ওরা তো বুঝবেনা… তাঁর কাছে এই চারটে দিন মানে অনেক কিছু…সারা বছরের অনেক হিসেব মেলাতে হয় তাঁকে এইসময়। বাপের বাড়ী বলে কথা, সাবেকী ভাবেই বরাবর গ্যাছেন, যাবেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *