ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (৬)

আগের পর্ব


বাংলা চলচ্ছবির সঙ্গে আমার চলন এমন একটা সময়, যখন তার কারিগরী পরিবর্তন বড় দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন কর্ম পদ্ধতি, নতুন নতুন কারিগরী বিদ্যা এসে পড়ছে এই চলচ্ছবি নির্মাণের আঙিনায়।

গতবার ছবি সম্পাদনার কথা বলেছিলাম। ছবিকে তার গল্প অনুযায়ী পর পর সাজিয়ে ফেলা হল। ছবির রীল তো রইলই এবং তার পাশে পাশে ছায়ার মতো আরও একটি রীল, যার পোষাকি নাম ডায়ালগ ট্র্যাক, সেটাও রইল। এ দুটোকে পাশাপাশি চালালে, তবেই ছবির চরিত্রদের মুখে কথা ফুটত। তার মানে দশ রীলের ছবি হলে, তখন তার আয়তন কুড়ি রীলের। যেখানেই যাও, এই কুড়ি রীল বয়ে বেড়াতে হত। পাঠক মনে রাখবেন এটা কেবল পোস্ট প্রোডাকশনের এই পর্যায়ের জন্যেই। বর্তমান পদ্ধতিতে এসব কিছুই প্রয়োজন হয় না। ছবি ধরা থাকে হার্ড ডিস্কে।

এই যে কথার রীল বা ডায়ালগ ট্র্যাক, এগুলি তৈরীরও একটি আলাদা পদ্ধতি ছিল। প্রথমতঃ শুটিং চলাকালীন শব্দ গ্রহণ করা হত, স্পুল টেপ রেকর্ডারে। সে আবার যে সে টেপ রেকর্ডার নয়, চলচ্ছবির ভাষায় যাকে ‘নাগরা’ বলে উল্লেখ করা হয়। ঐ নামে উল্লেখ করার কারণ ওটি ঐ কোম্পানির তৈরী ছিল। সরু ম্যাগ্নেটিক টেপ-এ শব্দ গ্রহণ করার পর, এই শব্দ ফিল্মের মত চওড়া ম্যাগ্নেটিক টেপ-এ গ্রহণ করা হত। এই স্থানান্তরের সময়, চলচ্ছবির পরিভাষায় যাকে বলা হয় সাউন্ড ট্রান্সফার, খেয়াল রাখা হয় শট এর শুরুটি ও শেষটি।

এখন এই শুরু ও শেষ ছবি না দেখে বুঝব কী করে? এ ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করে বলি। ধরা যাক, কোনও একটি শট আমরা কেবল ছবিটুকুই দেখছি। তাহলে দেখব, ফ্রেমের মধ্যে একজন সহকারী পরিচালক, ক্ল্যাপস্টিক হাতে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ক্ল্যাপস্টিক-এর প্রতিটি লেখা ক্যামেরা পড়তে পারছে।

পরিচালক স্টার্ট সাউন্ড, ক্যামেরা ইত্যাদি আদেশ করলেন আর সহকারীটি ক্ল্যাপস্টিক-এর ওপর লেখা দৃশ্যের নম্বর, শট’এর নম্বর এবং কোন টেক, প্রথম, দ্বিতীয় না আরো বেশী, সেইগুলি দ্রুত উল্লেখ করল এবং দ্রুত ফ্রেমের বাইরে কোথাও হারিয়ে গেল।

সহকারী সরে যেতেই আমরা দেখতে পেলাম, দৃশ্যের আসল অভিনেতাদের। পরিচালক এবার ঘোষণা করলেন, “এ্যাকশন।” সঙ্গে সঙ্গে অভিনেতাদের কাজকর্ম, কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল। ঠিক যেখানে শটটির শেষ চান পরিচালক, উনি সেখানে ঘোষণা করলেন, “কাট।” সব কার্যকলাপ থামল এবং থামল ক্যামেরা।

এবার আমার পাঠক বন্ধুরা খেয়াল করুন আমি শুরুতেই বলেছিলাম, এই শটটি আমরা দেখছি শব্দহীন। এই যে শব্দরা, পরিচালকের আদেশ, সহ পরিচালকের ঘোষণা, অভিনেতাদের কথা, সব ধরে রেখেছে ওই নাগরা। এই নাগরা মেশিনের অনেক বৈশিষ্ঠের মধ্যে অন্যতম হল, এটির চলন আর ক্যামেরার চলনের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আছে। যাকে চলচ্ছবির পরিভাষায় বলে, সিঙ্ক। ছবি আর শব্দ একই গতিতে চলে বলে, পরবর্তী সময়, এ দুটিকে পাশাপাশি চালালে, তারা মিলে মিশে যায়।

ছবিটিতে শব্দ না থাকলেও বুঝে নিতে পারছি, কোথায় শুরু, কোথায় শেষ। কিন্তু ছবিহীন শব্দ শুনলে, কী করে বুঝব কোথায় শুরু, কোথায় শেষ? প্রধাণতঃ এ কারণেই ক্ল্যাপস্টিক ব্যবহার করা হয়। সহকারী পরিচালক দৃশ্যের, শটের নম্বর ইত্যাদি ঘোষণা হয়ে গেলে, ক্ল্যাপস্টিক-এর ওপরে কব্জা লাগানো ডান্ডাটি তুলে ঠকাস করে ক্ল্যাপস্টিক-এর গায়ে আঘাত করে, দৃশ্য থেকে প্রস্থান করে। এর ফলে ‘ঠকাস’ শব্দটি আমরা শুনতে পাই। এই শব্দ, ছবিতে দেখতে পাওয়া ক্ল্যাপস্টিক-এর শরীরে ওপরের ডান্ডা এসে মিশে যাওয়া বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া হয়, এবার দুটিকে পাশাপাশি চালালে, শব্দ, ছবি একই ছন্দে চলতে থাকে।

শব্দ স্থানান্তরের সময়, পরিচালকের আদেশ থেকে রাখা হয় এবং পরিচালকের ‘কাট’ ঘোষনায় শেষ করা হয়। এই যে ‘ঠকাস’ শব্দ দিয়ে ছবির সঙ্গে শব্দকে এক ছন্দে জুড়ে দেবার কাজ, এটি খুব ধৈর্যের সঙ্গে সহকারী সম্পাদকেরা করে থাকেন, ঘন্টার পর ঘন্টার পরিশ্রমে।

কিন্তু এই যে শব্দ বা সাউন্ড ট্র্যাক, এ দিয়ে তো মূল চলচ্ছবির কাজ চলবে না। এখানে যে শুটিং চলাকালীন নানান উটকো শব্দেরা হাজির। রাস্তার গাড়ির শব্দ, চলতি মানুষের গুঞ্জন বা কোলাহল, অকারণ পশু পাখীর ডাক, এ সবই তো এখানে আছে।

অতএব পুনরায় সে সব ডায়ালগ অভিনেতাদের আবার বলতে হয়, স্টুডিওর ঘেরাটোপের মধ্যে। এবং সেটা করা হয় স্ক্রিনে ছবি চালিয়ে। এই পদ্ধতির নামই ডাবিং।

আমি লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, আমি যে সময় বাংলা চলচ্ছবি জগতে অতিবাহিত করেছি, সেখানে কারিগরী আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমার চোখের সামনে। এই ডাবিং-এর ক্ষেত্রে বলতে পারি, আমি যখন ডাবিং ব্যাপারটার মধ্যে ঢুকি, তখন যে পদ্ধতিতে কাজ হওয়া শুরু হয়েছে, তার নাম রক-অ্যান্ড-রোল। এই পদ্ধতিতে, রিওয়াইন্ড, ফাস্ট ফরোয়ার্ড, প্লে, পজ সব অডিও বা ভিডিও টেপ প্লেয়ারের মত। ইচ্ছে মতো জায়গায় ফিল্মটিকে নিয়ে আসা যায়, থমকে দেওয়া যায়, আবার ইচ্ছে মতো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে, পুনরায় সে অংশটি চালানো যায়। অতএব, স্ক্রিনে দেখে দেখে, অভিনেতা ডাব করেন। যদি না পারেন বা মনে হয় আর একটু ভালো করা যায়, তখন পুনরায় সেটি গ্রহনের ব্যবস্থা করা যায়।

এই সুবিধে তার কিছুদিন আগেও ছিল না। তখন ফিল্মের একটা অংশের ল্যাজা মাথা জুড়ে একটা লুপ তৈরী করা হত। সেই অংশটি প্রোজেক্টরে ঘুরে ঘুরে চলতেই থাকত আর অভিনেতা পর পর চেষ্টা করে যেতেন ঠোঁট মেলাবার। যেহেতু শটটি লুপে চালানো হত তাই এ পদ্ধতির নাম ছিল, লুপ ডাবিং।

একই সঙ্গে অনেক সময় একাধিক অভিনেতাও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ডাবিং করতেন এই পদ্ধতিতে। আমি যখন কাজ শুরু করেছি, তখন এই লুপ ডাবিং এর অবসান হয়েছে, তবে কিছু কিছু কাজ তখনও হচ্ছে। আমি পুরোনো দিনের হিরো অভিনেতা বিশ্বজিৎ বাবু কে একদিন এই এই লুপ ডাবিং করতে দেখেছিলাম।

এই ডাবিং নিয়ে আরো কিছু কথা বাকি রইল, পরের বার বলব। এবার শেষ করলাম আমার একটা ছবি দিয়ে। যে ছবিতে আমায় ক্ল্যাপ দিতে দেখা যাচ্ছে।

ছবি সৌজন্যেঃ লেখক
ছবি সৌজন্যেঃ লেখক

3 Replies to “ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (৬)”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *