বাদশাহী সার্কাস

যখন দেখতে শুরু করেছিলাম তখনই বুকের কাছে হাত জড়ো করে চোখ বুজে প্রার্থনা করছিলাম, হে ভগবান, ৩১শে ডিসেম্বরের রাতটাকে তুমি নষ্ট হতে দিও না, প্লিজ প্লিজ প্লিজ ! কিন্তু ঐ সেকেন্ড প্লিজটা বলার সময় কানের সামনে একটা পোঁ পোঁ করে আওয়াজ শুনে বাঁ চোখটা ঐ যে আধা মিলিমিটার ফাঁক করেছিলাম, ব্যাস ! ওইটুকুর জন্য ভগবান আমার আপীল রিজেক্ট করে দিল ! নিষ্ঠুর হে ! এই করনি ভাল !

সেই বাজিগরের বাবুলালকে মনে আছে? সে একটা সিনেমা বানিয়েছে তো ! তোমরা কেউ দ্যাখোনি? ভালই করেছ ! আমিই ভুল করে দেখে মরলাম ! সিনেমা তো না, পুরো বাবুলাল ! আসল গল্পে ছিল ধীরুকাকার শেভ্রোলে গাড়ি, তাই বাবুলাল কি যোগাড় করেছে? শেভ্রোলে ট্যাভেরা !! তাতে ধীরুকাকা ফেলুদা, তোপসে, আর ওর বাবাকে নিয়ে ঘুরলেন । দেখে হাসি থামছিল না আমার !! একে বলে ডিটেলের দিকে নজর, আমার না, বাবুলালের। কাকা তো না, পুরো গাইড ! গাড়িতে চড়া থেকে ন্যাকা ন্যাকা করে লখনৌয়ের বিবরণ শুরু। যা আছে গল্পে একেবারে ডিটো ডায়লগে লাগিয়ে দিয়েছে। ও-বাবা বড়া ইমামবাড়ার নাম শুনিসনি? ভুলভুলাইয়ার নাম শুনিসনি? কিচ্ছাগোল ! যা যা লাফিয়ে পড় জানলা দিয়ে ! দেখিস লোক দেখে লাফাস, তুই মরলে দোষ নেই, কিন্তু লখনৌয়ের লোক মরলে হেবি ক্ষতি। দেখে না মনে হতে পারে, কিন্তু আদতে এরা প্রত্যেকে নবাব ! না এগুলো বলেনি, তবে এরকমই ভাব করছিল। ওদিকে ফেলুদাও কম যায় না, গল্পে যে জায়গাগুলো টাঙ্গাওয়ালা চিনিয়েছিল, সেগুলো সিনেমায় ফেলুদা চেনালো। কাকাও গাইড, ভাইপোও গাইড, দুয়ে মিলে সায়ানাইড ! খেয়ে দর্শক ফ্ল্যাট।

Badshahi-Angti-2014

আর ফেলুদাকে স্মার্ট প্রমাণ করার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা ! গল্পে ছিল না ধীরুকাকার চটিতে গোলাপ পাতা আর আঙ্গুলে টিংচার আয়োডিন দেখে ফেলুদা ফিসফিস করে বাগানের কথা জিজ্ঞাসা করল? সেটাকে সিনেমায় স্ট্রেট শার্লকীয় ডিডাকশনে নামিয়ে দিয়েছে। বলে কি, এই তো আপনার চটিতে গোলাপপাতা লেগে আছে, আর আপনার তর্জনীতে কাটা দাগ, ওটা গোলাপ কাঁটা লেগে হয়েছে, অতএব আপনি বাগান করেন। সত্যজিত রায় যে টিংচার আয়োডিনের দাগ বলতে কাটা দাগের বদলে আয়োডিনের গাঢ় বাদামী রঙের দাগের কথা বলেছেন তা মনে হয় বাবুলাল ধরতে পারেনি। যাকগে গোয়েন্দা আর গোলাপ একটা মারাত্মক রোমান্টিক কম্বিনেশন। তাই আবীর মিষ্টি হেসে কালো চশমাটা পরে নিল। এত মিষ্টি হাসি যে আমার “কালি পলক তেরি গোরি, খুলনে লাগি হ্যায় চোরি চোরি” গাইতে ইচ্ছে করছিল ! দিল বাগ বাগ কাইজারবাগ হো গিয়া !

না আবীর পুরোটাই খারাপ না, বরং চেহারার দিক দিয়ে বেশ খাপ খেয়েছে। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে যে ফেলুদার চিন্তাশীল ক্ষুরধার ব্যক্তিত্বের দিকটা ফুটে ওঠেনি। অভিনয়ের গণ্ডগোলে না বাবুলালের বুদ্ধিতে তা জানিনা ! চেষ্টা করলে হয়ত আবীরই ভাল করতে পারত। কিন্তু বাবুলালের ডিরেকশনে সম্ভব না। কি বুদ্ধি বাপরে ! ধীরুকাকার অতবড় দুই না তিনতলা বাড়ি, কিন্তু চাকর মাত্র একটা ! ওদিকে বাড়ির উপর থেকে নীচ অব্দি কি পরিচ্ছন্ন ! আমি ভাবছি, চাকরটা কি অসম্ভব খাটে ! ভোর চারটেয় কোমরে দড়ি বেঁধে ছাতের আলসে থেকে ঝুলে ঝুলে বাইরের দেওয়াল মোছে, পাঁচটায় ৪বিঘা জমির পাতা ঝাঁট দেয়, ৬টায় উঠোন নিকোনো সেরে বাগানে ০.৯% কেরোসিন স্প্রে করে উঠে কপালের ঘাম মুছে বলে, ওহ্‌ হো সাড়ে সাতটা বাজে ! এবার বাবুর বেড টি বসাতে হবে ! তারপর কাচতে হবে ধীরেন উদ(…)দৌল্লার আন্ডারওয়ার। গতকাল বেশী নীল দিয়ে ফেলেছিলাম বলে বাবু আবার গুসসা করেছে ! বলেছে, অন্ধকূপে বন্দী করে রাখব, হতভাগা খানাবাদোশ খানসামা !

পরাণ ব্যানার্জী কেন যে বনবেড়াল, ইয়ে মানে বনবিহারী সাজতে গেলেন কে জানে, অমন একটা থুত্থুড়ে বুড়োর সাথে ব্ল্যাক উইডো, হায়েনা, র‍্যাটল স্নেক পোষা কোন ভিলেনকে একেবারেই মেলানো যাচ্ছিল না। বাবুলাল আবার একটা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি লাগিয়ে দিয়েছিল দাদুকে, তাতে লাভ কিছুই হয়নি, উলটে শ্রীলঙ্কান জেলে মনে হচ্ছিল। আর ডঃ শ্রীবাস্তব হয়েছে যে তাকে আমি মাঝে মাঝে সন্ধেবেলায় দেখি। “রাজযোটক” নামক একটি ঝাঁট-জ্বলানো সিরিয়ালে বাবা সাজে ! যাই হোক, এখানে খারাপ লাগছিল না।

তোপসে তো ছেলে না মাছ, কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না ! কোত্থেকে যোগাড় করেছে ভগবান জানে ! সমস্ত কথা বলছে বিশ্ব-নেকী মেয়েদের মত ঢং করে ! ফেলুদা না এই পারে, ফেলুদা না ঐ পারে ! একটা ফ্রক আর পরচুল পরিয়ে দিলে একদম ঝিলিকের মতন লাগত ! আর ঠিক ঝিলিকের মতই অসহ্য ! মাঝে মাঝে চালাক চালাক ভাব করছিল, ক্লাসের লাস্ট বয় একবারে অ্যাপল বানান ঠিক বলতে পারলে যেমন চোখমুখ করে অমন করে। আবার মাঝে মাঝে বোকা সাজছিল, এমনিতেই বোকা, তার উপরে ওরকম করলে লাগছিল ঠিক ক্যাপসিকামের মত।

গল্পে আছে, বনবিহারী চোর আসার কথা শুনে অবাক হয়ে বলবে ওর বাড়ির ২০০ গজের মধ্য দিয়ে চোর গেল, অথচ ওর পোষা হাউন্ড কিছু বুঝল না, তা কি করে হয়। এবার সিনেমায় তো হাউন্ড রাখেনি, কিন্তু পরাণ ব্যানার্জী ঠিক বলল “২০০ গজের মধ্য দিয়ে গেল চোর? স্ট্রেঞ্জ !” আরে কিসের স্ট্রেঞ্জ?! ২০০ গজের মধ্য দিয়ে চোর গেছে তো কি? কি হবেটা কি? র‍্যাটল স্নেক “ওগো আমার সর্বস্ব লুটে নিলো গো” বলে ডুকরে কেঁদে উঠবে? ব্ল্যাক উইডো মাকড়সাটা ওপ্পান গ্যাংনাম স্টাইল বলে নেচে উঠবে?

ডিটেলের দিকে এত্ত কড়া নজর না কি বলব ! শ্রদ্ধায় মাথা ঝুঁকে আসছিল ! আমি তো ঢুলছিলাম ! বেলা দশটা এগারোটায় ট্রেন থেকে নেমে ফেলুদাদের গায়ে জ্যাকেট, ওদিকে রাতে শোয়ার সময় হালকা চাদর। মাঝে ছিলিমে টানটা কখন মারল কে জানে ! ওদিকে বনবেড়ালবাবু সিনেমার শেষে তো কাঠের ঘরে র‍্যাটল স্নেকের সাথে আবীর আর ফুলকপিটাকে ফেলে দরজা আটকে দিয়েছে। এদিকে সিঁড়ির ঠিক উপরেই একটা পাল্লা-বিহীন জানলা, তা দিয়ে শুধু পালানোই সম্ভব না, খুব সহজেই পরাণের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়াও সম্ভব ! কিন্তু বাবুলাল নিজের হাইট দিয়ে বিচার করেছিল সম্ভবত, তাই ব্যাপারটা অসম্ভব ঠেকেছে।

একেবারেই কিস্যু নেই সিনেমাটায় ! এক তো গল্প সবাই জানে, তার উপরে অ্যাকশনের যা নমুনা ! আবীর একবার একজনকে তাড়া করল, এত আস্তে দৌড়চ্ছিল যে DDLJ-র কাজলকে মনে পড়ছিল আমার। ঠিক এই জন্যই বনবিড়ালে যখন, “যব ছোড় চলে লখনো নগরী” গেয়ে উঠল, তখন মনে হচ্ছিল, একদম মানাচ্ছে না এই গান, এর জায়গায় “মেনকা মাথায় দিল ঘোমটা” চালালে অনেক মানাত ! তা সত্ত্বেও এই সিনেমটায় অপকর্ষ কোন নতুন ডাইমেনশন পেয়েছে বলতে পারব না। কারণ, এর আগের ফেলুদার সিনেমাগুলোও একই রকম খারাপ ছিল। বরং বলা ভাল, বাবুলাল স্ট্যান্ডার্ড মেন্টেন করেছে। সত্যজিৎ রায় বেঁচে থাকলে বাবুলালকে নাক খত দিইয়ে নাকের আঁচিলটা ক্ষইয়ে দিতেন !

পুনশ্চ ১- মৃত্যুর ৫০ বছর পরে কপিরাইট উঠে যায় না? আমি নিশ্চিত, সত্যজিৎবাবু কাতরভাবে এই পঞ্চাশ বছর কেটে যাবার অপেক্ষা করছেন, শেষ হলে ঐ DDLJ-র স্টাইলেই বলে উঠবেন, “যা ফেলু যা, জি লে আপনি জিন্দেগী…… ইস বাবুলাল সে জাদা ড্যামেজ তুঝে আউর কোই নেহী কর সক্‌তা”।

পুনশ্চ ২- আমি কেন দেখলাম ??? ভ্যাঁ-অ্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যা !!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *