মেলার দিনগুলো

বাবা মার হাত ধরে যেমন প্রথম আমার মেলায় যাওয়া,তেমনি আমার ঠাকুরদার কাঁধে চেপে । ভীষণ রকম মনে পড়ে এখন – সে সব কথা । এখন আমার হাত,আমার কাঁধ ওনাদের খোঁজে। তখন একটা টমটম গাড়ি না কিনতে পারলে মেলায় যাওয়া বৃথা ছিল। বাবার থেকে দাদুর কাছে বায়না করতাম বেশি। বাবা চোখ রাঙালেও দাদু কিন্তু সেটা করতেন না। পয়সা সেই বাবারই যেতো কিন্তু বাহবা পেতেন দাদু। এখন বুঝি পয়সা আনা কতটা শক্ত কাজ।

বাবা জিলিপি খেতে খুব ভালোবাসতেন। বাড়ির কাছে মেলা যতদিন চলতো, দু’বেলাই জিলিপি চাই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বেড়িয়ে পড়তেন, আবার স্কুল থেকে ফেরার পথে সাইকেলের চাকাটা এসে থামত সেই জিলিপির দোকানেই। দোকানদারও এমন খদ্দের পেয়ে যে খুশি হতেন সেটা বোঝাই যেত – জোর করে আমার হাতে একটা গজা গুঁজে দিতেন, যখন বাবার সাথে থাকতাম।

DSC_0516a

একটু বড় হয়ে মেলায় যাওয়া টা আবার অন্য রকম। তখন যেতে শুরু করেছি বন্ধুদের সাথে। স্কুলে পড়ি – এইট কি নাইনে। সিনেমা দেখে তত দিনে বুঝে গেছি ছেলে মেয়ের ফারাকটা। তবে মেয়েদের প্রতি আমার অত ইয়ে-টিয়ে ছিল না। তবু বন্ধুদের সাথে থাকতে গেলে মেলার এ গলি, সে গলি অযথাই ঘুরতে হত কলুর বলদের মতো! বাড়ি ফিরতাম এক রাশ ধুলো বালি মেখে। ভিড়টা হতো বেশি নাগরদোলার কাছে, যা এখনও হয়। মেয়েদের নাগর দোলার প্রতি টান দেখে আমার হিংসে হত – আমি না উঠতে পারার দুখে। কেন জানি না, আমি আবার এই নাগরদোলায় একেবারেই উঠতে পারতাম না। সেই জন্যেই কি মেলায় গিয়ে কোন মেয়ে আমার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না?

একবার তো সেই বন্ধুরা চ্যাংদোলা করে হেইও হেইও করতে করতে জোর করে আমাকে টেনে তুলল। তবে এক পাক দিতেই নাগরদোলা থেমে গেল আমি না আবার লাফিয় পড়ি এই ভেবে। এর পরে না কোনও মেয়ে না তাকায় আমার দিকে, না আমি। এখন সব পালটে গেছে। বড় হয়ে গেছি আমি, অনেক বড়। এখন মেলায় আমি বায়না মেটাই। তবে মেলাটা তেমন পালটায়নি খুব একটা – শুধু মানুষগুলো পালটে গেছে। চেনা বন্ধু গুলো, চেনা বন্ধু মেয়েরা সব হারিয়ে গেছে কোথায়। দেখা হলে এখন আর চিনতেও পারব না। তবু এখনও চোখদুটো ওদের খুঁজবেই মেলাতলার ভিড়ে।

আমাদের সেই মেলা আজও আছে, থাকবেও। আমি আর আমরা সব হারিয়ে যাবো একদিন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *