কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না

প্রথম পর্ব – বন্ড’চরিত্র

প্রায় প্রতিদিনই দুনিয়ার লোকের ইমেল পড়তে হয়, তাতে হাজার ফ্যাঁকড়া, দু’শ সমস্যা; কিন্তু এসবের ফাঁকেও এক এক জায়গায় চোখ আটকে যায় – তা হল সিগনেচার, অর্থাৎ ইমেল লেখা শেষ হলে যেখানে প্রাপক সচরাচর নিজের সম্পর্কে কিছু লিখে থাকেন। আবার অনেকেই কোন না কোন লেখেন – যেমন আমার এক বস লিখতেন ওয়াল্ট ডিজনির ডায়লগ – তুমি যদি স্বপ্ন দেখতে পার, তাহলে তুমি সেই স্বপ্নকে বাস্তবের রূপও দিতে পার। কদিন আগে অফিসে এরকমই আরেকটা ইমেলে চোখ আটকে গেল –সেখানে নাম লিখতে গিয়ে একজন লিখেছেন – রিগার্ডস, শীল, বলবন্ত শীল। প্রথম ও শেষবার সেইরকম শুনেছিলাম ড্যানিয়েল ক্রেগের মুখে, “মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড”। তাই খুব অবাক হয়েই বলবন্তের সাথে ভালো করে আলাপ করতে বসলাম।

Illustration - part 1

বলবন্তের চেহারা যেমন লম্বা সেরকমই চওড়া। তার খোরাকি দিনে প্রায় গোটা দশেক এগ হোয়াইট (বাকি কুসুমটুকু খায় পাড়ার নেড়িকুত্তারা), গোটা তিরিশেক রুটি (সকাল বিকেল মিলে), পনের লিটার জল, মাংস খেলে দেড় কিলোর মত। বাড়িতে আশি জিবির সুপার-ফাস্ট ব্রডব্যান্ড কানেকশন, কলকাতার রাস্তায় তার বাইক চলে একশ থেকে দেড়শর স্পিডে। তার সাথে এক জিমে কসরত করতে আসে নুসরত জাহানের পর্যায়ের সুন্দরীরা। বাড়িতে বউ, ছেলে – অফিসে রিসেপশনিস্ট – এই নিয়ে তার দিন কাটে।

সব জানার পর একদিন বললাম, “এক সেই জেমস বন্ড বলেছিল, তারপর তোর ইমেলে দেখলাম – তোর মধ্যে কিন্তু এক্কেবারে হিরো হিরো ব্যাপার একটা আছে।”

বন্ড, থুড়ি শীল, এক গাল হেসে জবাব দিল, “একবার বিজন সেতুর ওপরে এক অটো-ওয়ালা কেলিয়ে এমন চলন্ত বাসে চড়ে পালিয়ে ছিলাম না – সে আর কি বলব, পরে গোটা একদিন গড়িয়া-হাট বন্ধ ছিল”

মুচকি হাসলাম কিন্তু বলতে গিয়েও বললাম না, “কলকাতায় যদি জেমস বন্ডের শুটিং হত, নিঃসন্দেহে তোর ডাক পড়ত।”

এহেন বন্ডের কাজে কর্মে কদিন মন নেই। একদিন পাকড়াও করে বললাম, “কি হয়েছে বন্ড?”

“আর বল কেন, এত কাজ চাপিয়ে দিচ্ছে-”

“কে কাজ চাপিয়ে দিচ্ছে?”

“কে আবার-(একজনের নাম নিল, এখানে অপ্রাসঙ্গিক)”

“এখন উপায়?”

“তুমি রিসেপশনিস্টকে এনে এখানে বসাও, দেখবে ডাবল স্পীডে কাজ হচ্ছে।”

এখন রিসেপশন থেকে তুলে এনে সুন্দরীকে চারতলায় প্রজেক্টের এক কোনে বসাব – এহেন ক্ষমতা আমারও নেই প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে, তাই মুচকি হেসে বললাম, “তার চেয়ে ভালো একটা সমাধান করা যেতে পারে!”

“কি কি, বল শুনি?”

“তুই ভিকি, ক্রিস্টিনা বার্সিলোনা দেখেছিস? না হলে চট করে দেখে নে একবার, তোর প্রোডাক্টিভিটি ডবল হয়ে যাবে”

যারা সিনেমাটি দেখেন নি তাদের অবগতির জন্য বলতে পারি এরকম রোম্যান্টিক সিনেমা আমি নিজে খুবই কম দেখেছি। ফিল্মের নায়ক এক বিতর্কিত চিত্রশিল্পী – হুয়ান অ্যান্তোনিও, যার সাথে আলাপ হয়ে স্পেন ঘুরতে আসা দুই বান্ধবী ভিকি ও ক্রিস্টিনার, আর ক্যানভাসে উপচে পড়া রঙের মত প্রাক্তন স্ত্রী এলিনা সকলে মিলে জড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতায়। হুয়ানের চরিত্রে জ্যাভিয়ের বার্ডেম, তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে পেনেলোপি ক্রুজ গোটা সিনেমায় নজর কেড়েছেন স্কার্লেট জোহানসনের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। সিনেমা দেখার পর স্প্যানিশ কান্ট্রিসাইড, স্থাপত্য, কবিতা, ফটোগ্রাফি, প্রেম – সব কেমন মিলে মিশে যায়।

শুক্রবার বন্ডকে বলেছি সিনেমার কথা। মনে হয়েছিল সে নিজে যেমন রঙিন মানুষ, তেমনি সিনেমা দেখে হয়তো অনুপ্রাণিত হয়ে কাজে খুব মন দেবে, রিসেপশনিস্টকে ঝাড়ি করতে হবে না – প্রজেক্টের সব কাজ হেলায় নামিয়ে ফেলবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। সোমবার বিকেলে যখন তার সাথে দেখা হল, সে মুখ গম্ভীর করে বললে, “এভাবে আমার সংসারে আগুন লাগাতে চাও তুমি?”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন?”

“ভাগ্যিস একা দেখেছি। আমার বউ এই সিনেমা দেখলে হবে পুরো উল্টোটা”

“মানে?”

“মানে টানে বেশি বোঝার দরকার নেই –যাই আগে দুটো ফুটলং খাই সাবওয়ে থেকে। তারপর জিমে যাই। ওখানে অনেক সুন্দরীরা আসে – মন ভালো করে আসি”

আমার কাছে ঠিক খোলসা হল না ব্যাপারটা।

অফিসে অন্যদের জিজ্ঞেস করে বুঝলাম – বলবন্ত যেমন বন্ড, তেমনি তার বউ এক্কেবারে লেডি বন্ড। বাইরে যাই করে থাকুক না কেন, বাড়িতে ফিরে অত বড় বন্ডও গ্রেহাউন্ড থেকে চিহুয়াহুয়া হয়ে যায়। নিজ গৃহিনীর সামনে সব্বাই গৃহপালিত স্বামী – তখন একডজন এগ হোয়াইটই হোক বা আড়াই কেজি চিকেনই হোক, কিছুই ধোপে টেকে না। নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। ম্যানেজমেন্টের প্রথম ধাপ ভুল থেকে শেখা। আর চটজলদি তো কোন সিদ্ধান্তই নেওয়া উচিত নয়। যাই হোক না কেন, প্রোডাক্টিভিটি রাতারাতি বাড়বে এমন গ্যারান্টি বোধহয় কোন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট টোটকাতেই নেই।

আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা যে খুব দীর্ঘায়ত এমন নয়, কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে বিভিন্ন শহর –সেও সংখ্যায় প্রায় দশ’টি –ঘুরে বলতে পারি, এমন গল্পের ঝুড়ি খুব সহজে শেষ হওয়ার নয়। সাধারণত এই ধরনের গল্প অফিস চৌহদ্দি, পার্টি-র রঙিন গ্লাস বা নিদেনপক্ষে চায়ের কাপে তেলেভাজার সাথেই ফুরিয়ে যায়। এসব লেখার কথা কেউ বড় একটা ভাবেন না। অন্তত: আমার বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের যতটুকু চিনি, তাদের কেউ এই গুরুদায়িত্ব নেবেন বলে মনে হয় না। তাই বলে গল্পগুলো ফুরিয়ে যাবে? নাম চরিত্র গোপন রেখে যতটা বলতে পারি সেই চেষ্টাই করছি।

কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না কিন্তু!!!

2 Replies to “কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না”

  1. গোলাপ ফুল চাই বলবন্তের ….. দুর থেকে দেখলে হবে না! শুকতেও হবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *