পানু ব্যান

খুব বড় একটা কন্ট্রোভার্সি বাজার গরম করেছে এখন। সেটা হচ্ছে ‘পানু ব্যান’। আমরা, যারা এদিক ওদিক লিখে বেড়াই, তাদের ওপর একটা অলিখিত দায়িত্ব বর্তায় যে কোনও চালু বিতর্ক নিয়ে কিছু বলার। অবশ্য আমরা সিলেক্টিভলি যে কিছু কিছু ব্যাপার এড়িয়ে যাইনা তা নয়। তবে বেশির ভাগ জায়গাতেই বক্তব্য রাখেন আমার গোত্রের বহু মানুষ। টেলিভিশনের স্ক্রিনে মিডিয়া কাউকে কাউকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের বক্তব্য সম্প্রসার করে ঠিকই। আমরা সেই উচ্চতায় উঠিনি তাও ঠিক। তবে যেহেতু বহু মানুষ আমাদের অনুসরণ করেন, তাই কিছু তো বলতে হয়ই।

এই প্রসঙ্গে, আমার বেশ হাসি পাচ্ছে একটা কথা ভেবে। আমাদের বয়সকালে পর্নোগ্রাফিকে আমরা একটা অন্য নামে উল্লেখ করতাম। এখনকার প্রচলিত ‘পানু’ নামটা চালু ছিলনা সে সময়ে। আমার একটা সামান্য খ্যাত নাটকের মুখ্য চরিত্রের নাম ছিল পানু। সে নাটকে অভিনয় করেছেন এবং সেটি দেখেছেন এমন মানুষ বেশ কজন আছেন আমার বন্ধু তালিকায়। আমি ভাবছি এখন নাটকটি লিখলে সেই চরিত্রের কি নাম দিতাম।

আমি পরিষ্কার বলি, যে আর্গুমেন্টটি এই মুহূর্তে বাজারে খুব সরব, আমার কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। আমি কিন্তু পানু-র বিরুদ্ধে একটি কথাও বলছিনা। এই যে বিভিন্ন ফোরামে বলা হচ্ছে – ‘আমি কি দেখব, তার ওপর সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারেনা। এর পরে তো সরকার আমার বেডরুমেও ঢুকে পড়বে।’ একটু ভাল ভাবে ভেবে দেখলে, এটা কি কোনও যুক্তি হল? আরে মশাই(বা মশাইনি) আপনি কি দেখবেন তার ওপর হস্তক্ষেপ কোথায় হল? যে দেখাচ্ছে তার ওপর হল তো। বাজারে সিডি পাওয়া যায়না? তাই কিনে এনে যত ইচ্ছে দেখুন না। কেউ বারণ করার সাহসই করবেনা।

আসল কথা আপনি প্রবঞ্চনা করছেন। আপনি সিডি বাড়িতে রাখলে অন্য কেউ সেটি দেখে ফেলতে পারেন। আপনি লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপনে কাজ সারতে চাইছেন ইন্টারনেটে। এখন যখন প্রকাশ্যে সমালোচনা করেই ফেললেন, তখন সিডি যুগে ফিরে যাননা কেন। পানু দেখা ভাল কি ভাল নয় সে ব্যাপারে আমার কোনও বক্তব্যই নেই। জীবনে পানু দেখেননি এমন মানুষ রামকৃষ্ণ মিশনেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

যদি ইন্টারনেটে পানু সম্প্রসার হয়, তাহলে কি হয়? কয়েকদিন আগে কাগজেই পড়ছিলাম এক সাংঘাতিক অসুখের কথা। দুটি বালক, তাদের একজনের বয়স চোদ্দ, আর একজনের মাত্র নয়। বেশ কিছুদিন যাবত তাদের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে তাদের মাতাপিতা তাদের আচরণের পেছনে ফেউ লাগলেন। দেখা গেল তারা পানু দেখছে দিবারাত্র। পড়াশোনা ডকে শুধু না। তাদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে, নানা মানসিক সমস্যাও হাজির হয়েছে। তখন তাদের ইন্টারনেট অ্যাকসেস বন্ধ করে দেয়া হল। দেখা গেল দুজনেই মারাত্মক উইথড্রয়াল এ ভুগছে। তারা দুজনেই এখন রিহ্যাব সেন্টারে। দুটি পরিবারই যাকে বলে শ্যাটার্ড।

অবশ্য ইন্টারনেট বন্ধ করে সঙ্ক্রামক ব্যাধি আটকানো যায়না। স্কুলে এঁচোড়ে পাকা সহপাঠী ব্যাগে লুকিয়ে প্রিন্টেড ম্যাটার নিয়ে আসতে পারে, ছবি দেখাতে পারে। ট্রু, একদম ঠিক। কিন্তু এক্সপোজার আটকানো না গেলেও তার অ্যাডিকটেড হবার সম্ভাবনা কম। অনেকে দেখলাম আর্গুমেন্ট রাখছেন, লোকে বলছে এর জন্য রেপ মলেস্টেশন বেড়ে যাচ্ছে। যখন ইন্টারনেট ছিলনা তখন রেপ হতনা?

এটা অনেকটা ছোট জামা পরা মেয়েদের আর্গুমেন্টের মতন। তাঁরা বলেন, বোরখা পরা মেয়েদের রেপ করা হয়না? তবে আর ছোট জামার দোষ কি? যার রেপ করবার, সে যে কোনও অজুহাতেই করবে। আমি একটা অন্য আর্গুমেন্ট দেব। একশ জনে পাঁচজন মানসিক ভাবে এতই বিকৃত, যে জামাকাপড় তার কাছে কোনও ইস্যুই না, সে বোরখা পরা মহিলার দিকেও হাত বাড়াবে। কিন্তু যারা বর্ডার-লাইন কেস ছিল, এমন আরও পনের-জন ছোট জামা দেখে চেগে যেতে পারে। এটা অস্বীকার করলে হিপোক্রিসি।

পানু দেখলে রেপ করা চেগে যায় কিনা, তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে। আমি সাল তারিখ মুখস্থ রাখিনি, আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে, একজন আমেরিকান নাগরিক মহিলা, যদিও তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয় (আগরওয়াল পদবী, মনে আছে),তৎকালীন বিহারের কোনও একটা জায়গায় সুবর্নরেখার তীরে বসে সূর্যাস্তের শোভা দেখছিলেন। এমন সময়ে কয়েকটি ছেলে এসে তাঁকে ধর্ষণ করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ষোল বছর বয়স সেটা পরে জানা যায়। এরা ধরা পড়লেও ভদ্রমহিলা এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, তিনি লিখেছিলেন, এ তো সামাজিক ব্যাধি, এদের কি দোষ। এরা এত নরম স্বভাবের, যে আমার সানগ্লাসটি ধস্তাধস্তিতে ছিটকে পড়েছিল, দৌড়ে পালিয়ে যেতে যেতে একটি ছেলে ফিরে এসে সেটি কুড়িয়ে এনে আমার হাতে তুলে দিয়ে যায়।

পানু ব্যান
পানু ব্যান

ছেলেগুলো জেলে সম্প্রদায়ের। তাদের জেরা করে জানা গেছিল, সে সময়ের খুব চালু(প্রশাসনের ঘুষ খেয়ে চোখ বন্ধ রাখার খাতিরে) তাঁবু খাটিয়ে ভিডিও দেখার ঠেকে তারা নীল ছবি দেখেছিল। আর তার প্রভাবেই তার এই কাজ করে, এটা তাদের স্বীকারোক্তি ছিল।  এই ঠেক গুলি আমাদের বাংলাতেও গ্রামাঞ্চলে রমরম করে ব্যবসা করত। ম্যাটিনি ও ইভনিং এ পপুলার হিন্দি ছবি, নাইট শোয়ে নীল। আর তাতে ভিড় জমাত গ্রামের অপ্রাপ্তবয়স্করাও।

পানু নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই। আমি আগেও বলেছি, পানু দেখেনি কোনোদিন এমন মানুষ নেই(বোধহয়)। তবে সেটা সম্প্রসার বোধহয় না করাই ভাল। বা সেটা আলাদা করে সাবস্ক্রাইব করতে হবে অন পেমেন্ট। যেটা নেট ব্যাঙ্কিং দিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের পক্ষে করা একটু মুশকিল। আর বয়স্করাও ‘ফিরিতে’ বিনোদন পাবেন কেন? রেস্ত খসান।

তবে আমার শেষ কথা, ভারত সরকারের প্রতি – পানু ব্যান করার আগে সিগারেট আর পান মসালা ব্যান করান। পানুতে মানুষ মরেনা, এতে মরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *