প্রবাসীর ডায়েরি ২

Okolkata_OK_-_Dharabahik

 “স্যার, পাবলিক আমায় নেবে তো?”

একটা হাল্কা উন্মাদনা বোধ করছি। আমার লেখা জনৈক ব্লগে ছাপানো হচ্ছে। একটু একটু করে পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে। সকাল বিকেল কড়া নজর রাখছি ফেসবুকে এবং ব্লগে কে লাইক করছে, কে কী কমেন্ট করছে তা জানার জন্য। মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছি। তাও, নিজেকে থামাতে পারছি কই?

বড় হওয়ার একটা খারাপ দিক হল, রোজের বাড়টুকু নিজেরই চোখ এড়িয়ে যায়। চারদিকের মানুষজনের চাহনি দেখে বুঝতে হয় যে আমি বাড়ছি। আমার লেখা বর্ণপরিচয়ের গন্ডি পেরিয়ে যুক্তাক্ষরের জগতে প্রবেশ করল। নিজের ভাল লাগার গন্ডি পেরিয়ে অপরের ভাল লাগার জগতে প্রবেশ করল। সেখানে অনেক জটিল রীতি-নীতি শেখার সুযোগ।

নতুন কিছু শেখার মধ্যে একদিকে আছে exploration এর আনন্দ। অন্যদিকে, scientific এবং Sophisticated দৃষ্টিভঙ্গি তৈরীর ফলে পুরোন মেঠো সহজ সরল দৃষ্টিভঙ্গির অভিমান করে মুখ ঘুরিয়ে থাকা। যেমন, আমার এই লেখার অভ্যেস। লিখে লিখে ভাবব বলেই লেখার সূচনা। অন্যকে পড়িয়ে মতের মিল-অমিল খোঁজার কোন ইচ্ছে ছিল না। ভাবনা চিন্তার ঠিক-ভুল যেন নিজেরই চোখে ধরা পরে, সকলের আড়ালে। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে, তা নিজের ঘেরাটোপ পেরিয়ে যখন আরো পাঁচ জনের মাঝে এসে হাজির হল, তখন পাঁচ জনের সাথে পছন্দ-অপছন্দের সম্পর্ক গড়ে উঠতে বাধ্য। ফলে, আগের মত ভালো লাগার সাথে যোগ দিল “কে কী বলবে” ফোবিয়া। কোন রকমে ধরে রেখেছি আমার পুরোনো “লিখে লিখে ভাববার অভ্যেস”কে। “ঠিক-ভুল, ভাল-মন্দ” বিচারের কড়া নজর লেগে একটু আড়ষ্ট বোধ করছে বটে। “শুকনো লঙ্কা” তে চিনু নন্দীর কথা মনে পড়ে গেল – “স্যার, পাবলিক আমায় নেবে তো?”

পাগল করে দেবে নিমর্লা। বালতি-ন্যাতাকে পাশে জিরোতে দিয়ে পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে এত বকবক করছে! ওর দিকে না তাকালেও ও আমার দিকে তাকিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। আর আমি তার মধ্যে লিখে যাচ্ছি। চুপও করতে বলতে পারছি না। ওর জীবনী আর সাথে সাথে আরো পাঁচ জনের জীবন বৃত্তান্ত বলে এত আরাম পাচ্ছে যে ওকে চুপ করতে বলে ওর ভাল লাগার গলা টিপতে মায়া হচ্ছে। কোন কোন দিন চুপচাপ নিজের মত কাজ করে চলে যায়। কিন্তু কোন কোন দিন ওর চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতে মন্দও লাগে না। আমার লেখালেখিতে ও একজন বিশিষ্ট চরিত্র।

ওর আজকের মূল বক্তব্য হল, ও খুব ভাল মত বুঝতে পারে কার “দিল” আছে, কার নেই। যে ওর ব্যাথায়ে সমব্যাথী তারই “দিল” আছে, বাকিদের নেই। একজন মালকিনের সদুপদেশ এবং সাহায্যের ফলেই আজ ওর তিনটে ছেলে স্কুল যাচ্ছে, বাকিদেরও পাঠানোর কথা ভাবছে। সেই মালকিন অনেক দিন হল এই হাউসিং সোসাইটি ছেড়ে চলে গেছেন। জীবনেও ও ওনার কথা ভুলতে পারবে না। ও মনে করে ওনার আশীর্বাদ সবসময় ওর বাচ্চাদের সাথে আছে। আর এক জন আছে, যে ওকে একটা খারাপ মিক্সি দেবে বলে নিজেই তা বাক্স বন্দী করে রেখে দিয়েছে। ওর বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি যে ওনার “দিল” নেই।

আর একটি ঘটনা জানাল যেটা বেশ মজার। ও নাকি নতুন কোন কাজের বাড়ীতে ঢুকে কিছুতেই বলে উঠতে পারত না যে ওর ছয়টা “বালক-বাচ্চে” আর তারা সবাই ছেলে। সবাই এত অবাক হয় যে ওর “সরম” লাগে। তাই ও দুটো দিয়ে শুরু করে। একবার একজন মালকিনের শ্বাশুড়ি পাশের বাড়ী থেকে জেনে যাওয়ায় ওর “সরম”এর মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যায়। সেই বয়স্ক মহিলা ওকে বুঝিয়েছিলেন, এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। অন্য কেউ থোড়াই ওর ছানাদের মানুষ করছে! ওই তো কষ্ট করে তাদের কোলেপিঠে করে বড় করছে। এতে লজ্জা কোথায়? আর তাছাড়া, বাচ্চা ঈশ্বরের আশীর্বাদ। ওদের ব্যাপারে এরকম “ঝুট” বললে উনি রেগে যেতে পারেন। তারপর থেকে সরমের মাথা খেয়ে প্রথমেই বলে দেয়। কিন্তু যদ্দুর মনে পড়ছে, ও আমাকে “ইতি গজ” স্টাইলে দুটি ছানার কথাই বলেছিল। আমি আর ওকে “সরম” দিইনি, জানিয়ে।

যেটা বুঝলাম, ওর এই অনগর্ল কথা বলা আমার লেখার মতই। বিরক্তি, অবাক করা ভাল লাগা, লজ্জা মেশানো ভুল শুধরে নেওয়ার এই কথার ফোয়ারার উচ্চতার তারতম্য থাকতে পারে কিন্ত শেষ আছে কি? ওর জীবন ধরে এত লোকের সাথে এত রকম অভিজ্ঞতা আর আমার লেখার নানান রকম মানুষের মন কম বেশী জয় করার মধ্যে কোথায় যেন একটা মিল আছে। তাই “পাবলিক” আমায় তাদের মত করে নেবে আমি নিশ্চিত।

~ ইতি, পূর্ণা

গ্রেটার নয়ডা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *