শীতবদল

‘সব ঋতুর সেরা বাঙালির তুমি শীতকাল’ – মান্না দে এমন একখানি গান বাঁধলে ফুটবলের মতই সেটি সমান আদর পেত।

আরামপ্রিয় বাঙালির কাছে শীতকাল হল শেষ পাতের মিষ্টি দইয়ের মতো . . নিজের মিষ্টতা আর ঠান্ডা দিয়ে যে ধীরে ধীরে সব বাঙালি মনকেই আচ্ছন্ন করে বছর শেষে।

আর গড়পড়তা বাঙালির মতই আমারও বছরের মধ্যে সবথেকে প্রিয় সময় শীতকাল (অবশ্যই দুর্গাপূজার সময় ছাড়া – বছরের ওই সেরা সময়ের সাথে তুলনা করা বারণ।)

sheetbodol
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

নতুন আলুর গায়ে লেগে থাকা মাটি আর নলেন গুড়ের গন্ধে মেখে থাকা শীতকাল আমার ভীষণ পছন্দের – সেই ছোটবেলা থেকেই।

জন্মসূত্রে আমি নব্বই দশকের শেষের দিকের -‘The nineties kids’ – বলতে যা বোঝায় এক্কেবারে তাই। মানে সেই চিত্রহার – চন্দ্রকান্তা, গণেশের দুধ খাওয়া – সূর্যগ্রহণে ডায়মন্ড রিং দেখার সময়ের।

তো সেই নব্বই পেরিয়ে এই বিংশ কালের স্টেশনে পৌছোতে গিয়ে অনেক নতুন বদল চোখে পড়েছে – প্রতিনিয়তই পড়ছে। অবশ্য এটা মনে হতেই পারে বদলে যাওয়াই বেঁচে থাকা – হক কথা। বদল না হলে পরিবর্তন হবে কী করে?তাই তো কোডাক ক্যামেরা চলে গিয়ে সেলফি ক্যামেরা এসেছে, চিঠি লেখা চলে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ এসেছে। আর এই বদলের হাওয়ায় আমার সাধের শীতের উত্তুরে হাওয়াও তার পথ বদলে ফেলেছে। কেমন সেই হাওয়াবদল? একবার পিছিয়ে যাওয়া যাক ছোটবেলার সেই ফেলে আসা শীতকালে।স্কুলে পড়ার সেই শীতের দিনগুলো শুরু হত একরাশ মিষ্টি রোদের আদর মেখে। কুয়াশার চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভাঙা সেই দিনের নিজের একটা ম্যাজিক ছিল। এখনও তো দিন শুরু হয় – কিন্তু সেই ম্যাজিক কোথায়? নিত্যদিনের কাজ মিটিয়ে আমরা যখন ঘুমাতে যাই রাত গড়িয়ে তখন মাঝ রাত। অতএব সকালের সূর্য দেখার সৌভাগ্য আমাদের নেই। এত আরাম করে বসে চায়ের আদর নিলে জীবনে অনেকখানি পিছিয়ে যেতে হবে যে – সামনের দিকে তো খালি এগিয়ে যাওয়া – থামতে মোদের মানা। তাই হারিয়ে যাচ্ছে আমেজের চায়ের কাপ। এই শীত দিন শুধুই ইন্সট্যান্ট কফি আর সবুজ চায়ের দিন।চায়ের মতই হারিয়ে যাচ্ছে কড়াইশুঁটির কচুরি-নতুন আলুর দমের সাথে জিভে জল আনা জলখাবার। স্বাস্থ্য সচেতনী বাঙালীর প্লেটে এখন সার্ভ হয় কর্ণফ্লেক্স, ব্রাউন ব্রেড, ফ্ল্যাক্সসিড। শরীর ভালো রাখতে গিয়ে মনকে খারাপ করে ফেলছি না তো?   হারিয়ে গেছে দুপুরের রোদ পোহানো আর শীতের ছুটির পাড়া ক্রিকেট। মনে পড়ে রোদ ঘেরা বারান্দায় বসে দাদু সারা দেশের খবর নিত – না না ফোনে নয় – খবর দিত দৈনিক সংবাদপত্র। আর দুপুরের রোদের আঁচে ছাদে বসে দিদা আসনে তুলত নিত্যনতুন ছবি। চোখে আরাম দেওয়া এই খুব প্রিয় ছবিটা এখন আর চোখেই পড়ে না – আমার তো নাই, আর আমার বিশ্বাস খুব কম বাঙালীর চোখেই এখন এমন ছবি ধরা পড়ে। আর শীতের ছুটিতে দুপুরের রোদে ক্রিকেট – সেও বেহদিশের পথে। মোবাইল আর প্লেস্টেশনের দৌলতে ব্যাটবল এখন ঘরবন্দী। হারিয়ে যাওয়ার এই লিস্টে ধীরে ধীরে যোগ হচ্ছে আর একটি নাম – পিকনিক! মনে পড়ে ছোটবেলা শীতকাল মানেই ছিল পিকনিক কাল। একটা অন্তত পিকনিকে যেতেই হবে – এটাই ছিল না বলা, না লেখা নিয়ম! ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ২৬শে জানুয়ারি – এই ছিল পিকনিক ক্যালেন্ডার। সেখানে হইচই করে রান্নাবান্না, রোদে বসে লুচি-আলুরদম আর মাংস-ভাত সহযোগে সেই চড়ুইভাতির সেই আনন্দ ছিল বছরের সেরা পাওনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই নিয়মও এখন অনেকটাই ফিকে। পিকনিকের সেই মুখভরা হাসি, পিকনিকের সেই প্রেম, পিকনিকের সেই পেটপুরে খাওয়া – সব নিরুদ্দেশের পথে। এখন আর এত সময় কোথায় যে সারাদিন আড্ডা দিয়ে, ব্যাডমিন্টন খেলে, রোদ পোহাতে পোহাতে একটা গোটা দিন নষ্ট করব? তাই পিকনিকের জায়গা দখল করেছে রেস্তোরার কিছু নতুন নামে মোড়া ডিশ আর মেপে আড্ডা। এই পরিমিত ভোজনের পোশাকী নাম – ব্রাঞ্চ! শীত মানেই তো বড়দিন আর বড়দিন মানেই কেকের দিন। মা-কাকীমারা প্রেশার কুকার বা পুরোন দিনের কেক তৈরির মেশিনে অনেক বাদাম দিয়ে বানাতো বড়দিনের কেক। সেই কেক বড়দিনের খুশীকে আরও বড় করে দিত। এখন শীত পড়তেই কিছু কেক রেস্তোঁরা বা বড় বড় হোটেলে ‘কেক মিক্সিং’ নামে একটি উৎসবের চল হয়েছে। এই ‘কেক মিক্সিং’ ব্যাপারটি আসলে হলো কেকের প্রস্তুতি পর্ব। সবাই একসাথে মিলে কেকের বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে বড়দিনের মাসকে স্বাগত জানায়। এই পর্বটি বেশ মজাদার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই পোশাকী পাবনের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপার্বণের। খুব প্রিয় একটা ছবি এখনো মনের ফ্রেমবন্দি। ছোটবেলার পৌষের একটা হিম সন্ধ্যেবেলায় ঠাম্মা-দিদা, মা-কাকীমাদের একসাথে বসে পিঠেপুলি বানানোর ছবি। সেখানেও ছিল সবার হাতের ভালোবাসার ছোঁয়া। ‘কেক মিক্সিং’এর মত সেই পিঠেপুলির উৎসবের ছিল নিজস্ব মিষ্টতা – অনেকখানি ভালোবাসা আর নতুন গুড়ের মিষ্টতা। শীত বদলের আগে মানে সেই নব্বই দশকের ঠান্ডাকালে আরেকটা মন ভালো করা চল ছিল। পাড়ায় পাড়ায় গানের জলসার চল। পাড়ার দাদা, পাশের পাড়ার কাকীমা, তার পাশের পাড়ার পিসিমা – সবাইকে একজায়গায় আনতে এই গানের উৎসবের জুড়ি মেলা ভার ছিল। শীতের হিম সন্ধ্যায় শালের গরমে বসে সেই গান শোনার স্মৃতিরা এখনও আসা যাওয়া করে। পাড়াতুতো সঙ্গীতানুষ্ঠানের চল এখন প্রায় উঠেই গেছে। ‘সফিস্টিকেশনের’ পাল্লায় পড়ে এই গান পার্বণেও এখন বেশ ভাঁটা পড়েছে। মফঃস্বলের কিছু পাড়ায় এখনো অবশ্য বসে গানের জলসাঘর। এইভাবেই নিরুদ্দেশের এই লিস্টে রয়েছে হাজারো একটা হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস। নারকেল তেলের জমে যাওয়া শালিমারের টিনের কৌটো হারিয়ে গেছে ‘ননস্টিক হেয়ার অয়েলের’ ভীড়ে, জয়নগরের মোয়ার বাক্স হারিয়ে যাচ্ছে ‘সুগার ফ্রি’ মিষ্টির মাঝে, শীতের রোদের চিড়িয়াখানার পিকনিক হারিয়ে যাচ্ছে শপিং মলের ‘ফুড কোর্টের’ খাবারের আড়ালে। আর আমার কলকাতা একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে এই শীতবদলের মরসুমে।

হারিয়ে যেতে যেতে যেটুকু পড়ে আছে তাই নিয়েই এখন আমাদের শীতদিন কাটে। দিদার হাতে তৈরী পুরোনো রেজাইয়ের গরম, পৌষ পার্বণের দিন না হলেও শীতের মধ্যেই কোনো একদিন মায়ের হাতের তৈরী নতুন গুড়ের পায়েস আর হঠাৎ করে ফিরে পাওয়া অলস শীতের দুপুরের ভাতঘুম – অনেক হারিয়ে যাওয়ার মাঝেও এরা ফিরে আসে পুরোনো অভ্যাসে আর শীত ছড়িয়ে পড়ে কমলালেবুর খোসার মত চারপাশে।

One Reply to “শীতবদল”

  1. Apnader sohure der etai mushkil. Urban life er muro tukuo khaben abar purono somoyer lyaja niye chokher jol muchhben. Bissyaon joto hobe toto poshchimi desher byapar syapar edike dhukbe. Mofossowl ar gramer dike er chhnoach kom. Eto dukkho hole sedik panei giye thakun.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *