বেহায়া

দিলীপবাবু বিড়ির জ্বলন্ত পেছনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মুখ কুঁচকে বলে উঠলেন, ‘বেহায়া মেয়েছেলে একটা! সব ব্যাপারে এঁড়েপাকামি… ’
‘আরে দাদা কি বলছেন কি? আস্তে বলেন…। দেখলেন না আজ, পাড়ার মেয়েরা কেমন একসুরে কথা বলছিল? সাবধানে কথা বলেন, নাহলে ইলেকশনের বাজারে… ’ হাতে খইনি ডলতে ডলতে ফিচেল হাসি ছড়িয়ে ভজুয়া বলে উঠল। ওই হাতটা ধুয়েই একটু পরে ও কচুরি ভাজবে।
‘সাহা-সুইটস’ এর কচুরির কদরই আলাদা এ এলাকায়। দিলীপ সাহার ঠাকুদ্দার আমলের দোকান। তিন প্রজন্মের দোকান, এলাকায় নাম আছে। আরও একটা কারণ হল সাহা-বাড়ির ছোটকালীর থান। দিলীপ সাহার ঠাকুদ্দা নাকি স্বপ্নে পেয়েছিলেন এই কালীমূর্তিকে। কুচকুচে কালো। গা ভরা গয়না। লোকে মানত করে সোনা দানা কিংবা রূপো দিয়ে। খুব নাকি জাগ্রত কালী। সাহা-সুইটস্‌ এর মাখা সন্দেশ পুজোর প্রসাদ হয়ে সাহাবাড়ির কালীর থানেই জমা পড়ে। এ হেন সাহাবাড়ির বড়কত্তা দিলীপবাবু যে এলাকায় একটা গমগমে দাপট নিয়ে থাকবেন এ তো বলাই বাহুল্য। বাড়ির দাপট, বংশের দাপট, মন্দিরের দাপট, দোকানের দাপট এমনকি দিলীপ সাহার অহংকারী ব্যক্তিত্বের দাপট।
‘আপনি কিছু বললন না কেন দাদা? মেয়েটা প্যাঁটর প্যাঁটর করে কি কথাই না শোনালো সক্কলের সামনে’ মুখ নড়িয়ে ভজু যখন কথাগুলো বলছিল, তখন ও হাত দুটো বেলনা দিয়ে ফটাফট বেলে চলেছে কচুরি।
‘আমি ভাবতেই পারিনি যাদববাড়ির মেয়ের এত বড় সাহস হবে! পাড়ায় এতদিন ধরে তো আছি কেউ বলতে পারবে কাউকে দু কথা শুনিয়েছি, কারো কোন ক্ষতি করেছি? ওই তো, গেল ছটপূজোয়, যাদববাড়িতে দশটা ক্লাবের ছেলে আমার হুকুমে খাটেনি? যাদবদের বুড়ো বাপটাকে শ্মশানে নিয়ে আমার ছেলেরাই তো গেছিল। যায়নি? বর্ধনবাড়ির বড়মেয়েটা যে বিয়ের আগে ফালতু ছেলেটার সাথে ট্রেনে ভেগেছিল, আমরা তার বিহিত করিনি? কি হত বলত ওই বেকার ছেলেটাকে বিয়ে করলে? একটা প্রাইভেট টিউটরের বউ হয়ে সারা জীবন কাটাত সেটা ভালো হত? এখন বর্ধনবাড়ি যে বড়জামাইয়ের পয়সায় গাড়ি কিনেছে, হিল্লী দিল্লী করে বেড়াচ্ছে, জামাইয়ের প্রোমোটারি পয়সা ছাড়া এসব হত? তাহলে? এরা কেউ দাম দিতে চায় না, বুঝলি ভজু। সব হারামির জাত… নিমকহারাম’
‘সেই তো দাদা। সেই বাড়ির মেয়ে আপনাকে এমন কথা বলতে পারল?’ ভজু গরম তেলে কচুরিগুলো ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠল, আর দিলীপবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল ওনার মন মেজাজ আজ আর ভালো হবার কোন চান্সই নেই। তাও দিলীপদাকে তাতিয়ে দিলে পরিবেশটা যে গমগমে থাকবে বিলক্ষণ জানে ভজু। কাজে মন বসবে, কচুরি খাস্তা হবে! লোকের ভিড় হবে। দোকানের সামনে খানিক গপ্প-সপ্প হবে এই ভর-বিকেলে।
দিলীপবাবু দুহাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে খামচিয়ে ওপরের পাটি দাঁত দিয়ে নীচের পাটি দাঁতকে চেপে ধরল। মাথার দুপাশের রগদুটো দপদপ করছে। ভাবছিলেন, কি কুক্ষণেই না হরিমন্দিরের মিটিং এ হাজির হয়েছিল আজ দুপুরে। একটা তুচ্ছ কথাকে নিয়ে কি নাটকই না করল মেয়েটা! বর্ধনবাড়িতে যে আত্মীয়াটি গৌহাটি থেকে বেড়াতে এসেছে দিনকয়েক, সে কপালে সিঁদুর চওড়া করে পরলে কি হবে, ব্রা দেখানো পাতলা ব্লাউজ কিংবা বুক পেট আঁটা টাইট জামাকাপড় পরেই হরবখত আসা যাওয়া করছে রাস্তায়। ওইসব পড়ে কোন বাড়ির বউ হাঁটাচলা করে এই গলিতে? কস্মিনকালেও কেউ করেছে? সাধে ক্লাবের কালু-বিলু রবিবারের দুপুরে গাঁজা ভাঙের নেশায় কি বলতে কি বলে ফেলেছে? আর তার জন্যে নাটক করে পাড়ায় মিটিং ডাকতে হবে?
দিলীপবাবু মনে মনে গর্জাচ্ছিল, যাদববাড়ির টুকটুকি যদি মিটিং মিটিং জেদ না ধরত এসব কিছুই হত না। ওই মেয়েটা যত বড় হচ্ছে তত পুলক জাগছে যেন। ওই তো চেহারা, কালো, ছোট ছোট চুল। কিসের এত গুমর রে তোর? কে বিয়ে করবে এই ছেমড়িটাকে? তাছাড়া মেয়েটার স্বভাব চরিত্রও নাকি ভালো না, ক্লাবের ছেলেগুলো বলছিল ওনাকে। ছেলেদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। কে নাকি সিগারেট খেতেও দেখেছে। ক্লাবের ছেলেরা দিলীপবাবুকে অনেকদিন আগেই সাবধান করেছে টুকটুকিকে নিয়ে। ওর হাবভাব দেখে নাকি পাড়ার অন্যান্য মেয়েদের বাড় বাড়ছে। কড়কে রাখা দরকার ওটাকে। কিন্তু দিলীপবাবুকে আজকাল অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। পার্টি থেকে ফোনটা আসার পরেই দিলীপবাবু অনেক কিছু হিসেব কষতে শুরু করে দিয়েছেন। মাকালীর কৃপা হলে বিধায়কের টিকিটটা এবারই নাচছে মনে হচ্ছে। অতয়েব পাড়ায় একটা মাখো মাখো ভাবমূর্তি দরকার। যা করার ভেবেচিন্তে করতে হবে। কিন্তু তাই বলে, বাপের বয়েসী মানুষটা যেই নরম হল ওমনি মাথায় লাথি কষাল ওই টুকু মেয়ে! দুপুরের দৃশ্যগুলো সিনেমার রিলের মত পাক খাচ্ছিল দিলীপবাবুর ঘিলু বরাবর।
‘এ পাড়ার একটা সম্মান আছে। মেয়ে বউরা চিরদিন ভদ্রসভ্য পোশাক আশাকেই হাঁটাচলা করেছে। হঠাৎ ভরদুপুরে এমন অভদ্র পোশাকে … ছি ছি ছি’ নাক খুঁটতে খুঁটতে বলে উঠেছিল দিলীপবাবু। ক্লাবঘরে তখন জনা কুড়ি লোকজন।
‘কিন্তু কাকু তার জন্য কি ক্লাবের ছেলেরা ঠেকা নিয়ে রেখেছে কুরুচিকর কমেন্ট করার? আর অভদ্রের কি আছে? অমন ড্রেস আজকাল সবাই পড়ে। তাহলে তো বলতে হয়, আপনিই বা বিকেলের পরে খালি গায়ে লুঙ্গি পড়ে পাড়ার মোড়ে কেন বসেন? ওটাও তো অসভ্য পোশাক কাকু!’
‘কি বললি? কি বললি তুই?’ রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন দিলীপ সাহা। ওদিকে যাদববাড়ির রমেশ যাদব নিজের মেয়ের হাত চেপে ধরে বলছেন, ‘কাকে কি বলছিস কি তুই টুকটুকি?’
‘থামো বাবা। একটাও ভুল কথা বলছি? রোববারে ক্লাবের পাশ দিয়ে গেলে কান গরম হয়ে যায় আমাদের। মদ গাঁজার গন্ধে ম ম করে জায়গাটা। ওই বিলু-কালুদের আজে বাজে কথা হজম করেও পাড়ার মেয়েরা কিছু বলে না। কই দিলীপ কাকু তো সেসব দেখেও দেখেন না!’
রীতিমত ধুন্ধুমার বেঁধে গেছিল। ক্লাবের ছেলেগুলোও চ্যাঁচামেচি শুরু করে দিল আর কিছু না পেরে। দিলীপবাবু মিটিং ছেড়ে উঠে চলে এলেন। যাদববাড়ির মেয়ের এত বড় কথা! বেহায়া মেয়ে!
রাতে তেমন করে খাওয়া দাওয়াও করতে পারলেন না দিলীপবাবু। এ অপমান হজম করা অসম্ভব। নেহাত বয়েস হয়ে গেছে নাহলে…। তারওপর ভোটের বাজার। মনের কথা বেফাঁস বেরিয়ে গেলেই খান খান হয়ে যাবে এলাকার বিধায়ক হবার স্বপ্ন। শোয়ার আগে ছোটকালীর থানে প্রণাম সেরে নেওয়া বহুদিনের অভ্যাস। অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন কালীমূর্তির দিকে। চেয়েই রইলেন।
ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দুপুরের কথাগুলোর জাবর কাটতে কাটতে কখন যে চোখ লেগে এসেছে টেরই পাননি দিলীপবাবু। হঠাৎ দেখলেন সারা ঘরে লাল আলো জ্বলছে। টকটকে লাল। খাটের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে যাদববাড়ির মেয়েটা। একেবারে উলঙ্গ। কুচকুচে কালো শরীরে টকটকে লাল ঠোঁট জেগে আছে। ডাগর ডাগর চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে যেন। তাকিয়ে তাকিয়ে যেন গিলছে দিলীপবাবুকে। মেয়েটা এগিয়ে এসে খাটের ওপরে উঠল। শুয়ে থাকা দিলীপবাবুর শরীরটাকে তাচ্ছিল্য করে উন্মুক্ত করতে করতে হাড় হিম করা হাসি ছড়িয়ে দিল ঘরে। দিলীপবাবু যেন অবশ হয়ে যাচ্ছেন। ভয় পাচ্ছেন মেয়েটাকে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়েছে দিলীপবাবুর ওপরে। চারপাশে কারা যেন কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে সন্ধ্যারতির মত। দিলীপবাবু কি যেন বলতে চাইলেন। দেখতে পেলেন মেয়েটি আধহাত জিভ বের করে ভেঙাচ্ছে দিলীপবাবুকে। টকটকে লাল জিভ।
ধড়মড় করে তন্দ্রা ভেঙে গেল দিলীপ সাহার। সারা গায়ে দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে। ‘কি হল?’ স্ত্রীর উদ্বিগ্ন প্রশ্ন। দিলীপবাবু কোন কথা বলতে পারলেন না…। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল ছোট কালীর থান। দিলীপবাবু তাকালেন সেদিকে।
…নিশুতি রাতে, লাল আলোয় একা দাঁড়িয়ে থাকা কালো মূর্তিটি দেখে দিলীপবাবু যেন চমকে উঠলেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *