পয়লা আষাঢ়

ডায়রির কাছে মিথ্যে কথা বলতে নেই। আজ হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি না নামলে, ডায়রিটা এতদিন পর আলমারির তাক থেকে নেমে আসত কিনা জানিনা। অনেকদিন সে দরজা বন্ধই ছিল, আজ বৃষ্টি না হলে কি হত বলতে পারব না, কিন্তু বৃষ্টির সাথে সব অভিমানের মত সেসব কোথায় ধুয়ে মুছে গেল। যা গরম গেল কলকাতায় তার সঙ্গে কেবল চৌত্রিশ বছর মার্কা উপমাই চলে একমাত্র, কিছু লেখার সাধ আহ্লাদ তো থাকে না। আবার দু-ফোঁটা পড়লেই গাছপালার মত মনমেজাজও চনমনিয়ে ওঠে। এদিক ওদিক একটু বেপরোয়া হতে ইচ্ছে করে। বাঙালির রোমান্টিকতায় বৃষ্টি আর বিকেল – দুটোই কোনোদিন ফুরবে বলে তো মনে হয় না।
বৃষ্টি শেষ হলেই বর্ষা শেষ হয়ে যায় না – এই ধারনা আমার অনে-এ-এ-কদিনের। হাতে ছাতা না থাকলে অপ্রস্তুত হয়ে ভিজে যাওয়ার স্মৃতিটুকু যেমন বেঁচে থাকে অনেকদিন, তেমনি। রেনিডে হয়ে শেষ কবে বাড়ি ফিরেছি, মিনে নেই – তাও এখনও তো ইচ্ছে করে সকালবেলা উঠে দেখব ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, ট্রাম বাস নেই। বস্-কে ফোন করলে তিনিই আগ বাড়িয়ে বলবেন, “না না, আজকে আর অফিসে আসার চেষ্টা কর না – দিনটা বাড়িতেই থাক”, কিন্তু সে কপাল কি আমার আছে, যে ঘুম থেকে উঠেই খিচুড়ির খোঁজ করব?

IMG-20160622-WA0006এই তো সেদিনকার কথা। সাউথের লাইনে ট্রেন বন্ধ। ঝুপ্পুস জলে ভিজে, গড়িয়া থেকে গোটা কয়েক বাস বদলে, সারা শহরের জল ঠেলে শিয়ালদা পৌঁছলাম। কোনও রকমে ট্রেনে উঠেছি – অথচ মনে হচ্ছে আরেকটু আকাশটাকে মুছে যেতে দেখি, যেন সে এক দুর্দান্ত ল্যান্ডস্কেপ, কোনও এক অসামান্য শিল্পীর ব্রাশস্ট্রোকে ভ্যান গফের মত মুনশিয়ানায় মুছে যাচ্ছে দিগন্তের ঠিকানা। চলন্ত ট্রেনের পাশে নারকেল গাছের পাতাও এক শেড বেশি সবুজ লাগছিল। এখন মনে হচ্ছে এই তো সেই সেদিনকার ঘটনা – যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব; অথচ মাঝখানে কেটে গেছে ষোল’টা বছর।
বৃষ্টি আমার কৈশোর, কিন্তু বর্ষা আমার প্রেম। তাই বলে কৈশোরসুলভ অপাপবিদ্ধ প্রেম নয়; রীতিমত নিষিদ্ধ এবং দু:সাহসী। প্রথম যৌবনে কারও কোমরে হাত দেওয়ার মত, তাও আবার দক্ষিণ ভারতে, শিরুভানি জলপ্রপাতের সামনে। পিছল পাথরের উপর দাঁড়িয়ে মৃদু বৃষ্টির আঘাতে সে পিছলে পড়ে যাচ্ছিল। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বৃষ্টির মত। আমি তার হাতটাই ধরে পারতাম, কিন্তু মনে হল ও যদি পিছল পাথরের খাদ বেয়ে পড়ে যায়? এত কাছ থেকে ওকে কি চলে যেতে দিতে পারি? কোদাইকানাল আমার কাছে বর্ষার আরেক নাম। সেদিন পাহাড়ি ঝর্নার কাছে রেখে এসেছিলাম আমার প্রথম স্পর্শবিদ্যুত, আজকে সেই উচ্ছল যুবতীর নামটা না হয় গোপনই থাক। সে একবার আমার বাহুবন্ধনে ধরা দিয়েছিল এটাই কি সব নয়? শ্রীদেবী বলিউডের রক্তে মিশিয়ে দিয়েছিলেন বর্ষার অমোঘ আকর্ষণ, পিছনে ফিরে তাকালে ঐ দিনটা আমিও মিস্টার ইন্ডিয়া হয়ে উঠেছিলাম।
আমার কাছে বর্ষা যেমন শুধু বৃষ্টি নয় আবার বৃষ্টিও শুধু বর্ষা নয়। সে যেমন বাঁধনহারা মুক্তির নি:শ্বাস, সে যেমন দুর্নিবার প্রেমের অনুভূতি, তেমনি এক মুহূর্তের বুকের ওম। ইংল্যান্ডের ঘটনা, যেখানে বারোমাস বৃষ্টি। ঐ বছর ইংল্যান্ডের কিছু জায়গা জলে ডুবেও গেছিল শুনেছি। যাইহোক – আমার সামনে প্যারামবুলেটরে রুপু – আমার দেড় বছরের কন্যা। বাইরে প্রবল বৃষ্টি ও জমাট সন্ধ্যে। হঠাৎ রুপু কাঁদতে শুরু করল। কাছেপিঠে একটাও ট্যাক্সি নেই। রুপুকে তুলে নিলাম কোলে, এঁটে নিলাম জ্যাকেট – ছোট্ট রুপু ব্যালেন্স হয়ে গেল ভুঁড়ি ও জ্যাকেটের অন্তর্বর্তী মহাকাশে। তোমায় আমি পরোয়া করি না বলে নেমে পড়লাম। বাইরে কুঁকড়ে আসছি ঠাণ্ডায়, আর বুকের ওমে সপ্রতিভ হয়ে উঠছে রুপু, একটু একটু করে।
পয়লা আষাঢ় – স্মৃতিগুলো এলোমেলো। স্থান কাল পাত্র পাত্রী বদলে গেছে। তবু সেই দু:সাহসিকতা মাঝে মাঝে নিজেকে জানান দেয়। প্রবল বৃষ্টিতে রেলিং ধরে জানলার সামনে দাঁড়াতে সাহস দেয় – তখন আর মাথার ওপর ছাত থাকে না, বৃষ্টি, হাঁটুজল ভেঙে কাকে যেন হাঁটতে দেখা যায়। কত লড়াই এই বর্ষাই শিখিয়েছে।

One Reply to “পয়লা আষাঢ়”

  1. khub sundar lekha hoyeche,tomar lekhar haat ager cheye aro bhalo hoyeche,rupu ke bhalobasa janio.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *