দুর্গাপূজা, প্রেম ও এক অধুরী কাহানী

পুজো আসছে, আর বাকি ১৩ দিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই এই ধরনের পোস্ট চোখে পড়ছে। আমরা যারা বাইরে থাকি, তাদের কাছে পুজো মানে কিন্তু বাড়ি ফেরার আনন্দ। আলোয় মোড়া আমার খুব চেনা এই শহর, চেনা-অচেনা সব মানুষ, ভিড়, একরাশ হাসিমুখ, প্যান্ডেলের বাইরে লম্বা লাইন, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ…সব মিলে মিশে একটা অন্যরকমের ভালোলাগা। তাই আমার বন্ধু যখন আমাকে এই লেখাটা লিখতে বলল, সঙ্গে জুড়ে দিলো যে একটু নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই কিন্তু, আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে জুলফিতে আর দাড়িতে রূপোলী ছোঁয়া দেখে চমকে উঠে, বাড়তে থাকা পেটের ওপর হালকা করে হাত বুলিয়ে নিজের মনেই গেয়ে উঠলাম “আমার যে দিন ভেসে গেছে…”।

“নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই” কথাটা কানে বাজতেই মনে হল, সত্যিই তো বয়েস বেড়ে চলেছে। অন্যের বউ, নিজের প্রেমিকা যখন বয়েস নিয়ে খোঁটা দিয়েছে, বিশ্বাস করুন একটুও গায়ে মাখিনি সেই সব কথা। কিন্তু লিখতে বসে যখন পুরনো কথাগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি, বেশ বুঝতে পারছি যে যেই ঘটনাগুলো “এই তো সেদিন” বলে সামলে রেখেছিলাম, পায় পায় ১৫ বছর হেঁটে পার হয়ে গেছে।

নস্টালজিয়ার কথা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়, কিন্তু আমার এতো নস্টালজিয়া নেই কারণ সময়ের সাথে সবকিছু পাল্টায় স্বাভাবিক রীতিতে, এবং সেটা মেনে নিতে হয়। যেটা পাল্টায় না সেটা হল এমন কিছু গল্প যা মনের ভিতর বাঁধা পড়ে আছে… পুজো আসতেই আগল খুলে ছড়িয়ে পড়বে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

“আমায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবি?” আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল এরকমই একটা ফোন কল দিয়ে। সে বছর পুজোর অষ্টমীর দিনটা বড্ড ভালো কেটেছিল। লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা, ফুচকা খাওয়া, প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝখানেও একে অপরের আঙ্গুল খুঁজে নেওয়া, প্রথম হাত ধরা, আর সব শেষে পাড়ার প্যান্ডেলের পিছনের অন্ধকারে আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা। সব মনে আছে স্পষ্ট করে, যেন কালকেই ঘটেছে সবকিছু। এখনো পুজোর ঢাক বাজলে চোখের সামনে সিনেমার রিলের মত চলতে থাকে সবকিছু। দশমীর দিন ওর হঠাৎ বাড়ি চলে আসা, মায়ের কাছে আবদার করা “তোমার সাথে বরণ করতে যাবো”, তারপর দুগালে সিঁদুর মেখে আমার ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠা “দেখ আমাকে কিরকম নতুন বউয়ের মত লাগছে।” কই, আমি তো কিছুই ভুলিনি?

আমার গল্পে বেকারত্বের জ্বালা ছিলনা, পকেটে একশ টাকা নিয়ে ঝাঁ চকচকে শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অসহায়তা ছিলনা, তোকে হারানোর ভয়ও ছিলনা…তবু কেন ভুল হল ঠিক সময়ে ভালোবাসার কথা বলতে না পারায়? আজ আমাদের মধ্যে দুটো মহাদেশের শূন্যতা। এই পুজোতে তুই শিকাগোর বঙ্গ সম্মেলনে তোর প্রিয় কবিতা পড়বি, আর আমি লন্ডনের শীতে ওভারকোট গায়ে চেপে ধরে হেঁটে যাবো কোনও পুরনো রাস্তা ধরে। তবুও আমার পুরো পুজো জুড়ে শুধু তোর কথাই মনে পড়বে। আমি জানি, কোথাও না কোথাও গিয়ে তোরও আমার কথা একটু হলেও মনে পড়বে। এই মনখারাপের মধ্যে দিয়েই কোথাও না কোথাও আমার আঙ্গুল ছুঁয়ে ফেলবে তোর হাত। ভালো থাকিস, মন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *