পয়লা বৈশাখ

কথায় বলে অন্ধের কি বা দিন, কি বা রাত। আমরা যারা লক্ষীসাধনায় মগ্ন হয়ে হত্যে দিয়ে বাইরে পরে আছি, আমাদের একই অবস্থা প্রায়। কবে পয়লা বোশেখ, কবে পঁচিশে, এক্সেল শীট, প্রজেক্ট ডেডলাইন আর কেপিআইয়ের চক্করে সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যায়। একটা নিয়মে নিজেকে বাঁধতে বাঁধতে কবে যে নিয়ম-দাস হয়ে গেছি, টের ও পাইনি। মাস পয়লার মোটা মাইনে আর দিনান্তে স্কচের অমোঘ টানে নিজেকে কবেই যেন আস্তে আস্তে হারাতে শুরু করেছিলাম। আমার মধ্যের আমিটা সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বারবার পালাতে চেয়েছে, আর তাকে আটকে রেখেছে বাইরের আমি। তাই পয়লা বৈশাখের নতুন জামা, আর পঁচিশের দিন শেষের কবিতা হাতে নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়ার বিলাসিতা চিন্তার বাইরে আর বেরোতে পারেনি।

কাল রাতেও অফিস থেকে ফিরেছি এগারোটার পর। কোনোরকমে কিছু একটা রেঁধে খেয়ে আবার ল্যাপটপ নিয়ে দাসত্বের রোজনামচা লিখতে বসেছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেও জানিনা। ঘুম ভাঙল যখন একফালি নরম রোদ জানলা বেয়ে মুখ ছুঁয়ে গেলো। অভ্যেস মতোই হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। দেখলাম হোয়াটস্যাপে বাবার একটা মেসেজ। “শুভ নববর্ষ।” ভদ্রলোকের এই ব্যাপারে কোন ভুল হয়না। প্রতি বছর প্রথম মেসেজটা বাবাই পাঠায়। অন্যান্য বছর আমি রিপ্লাই করে ছেড়ে দি, কিন্তু এ বছর মেসেজটা পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। রিপ্লাই করে সিগারেটটা শেষ করে বিছানা ছেড়ে নামলাম, কিন্তু অন্যদিনের মতো বাথরুমের দিকে না গিয়ে বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা অন করলাম। কোন প্রাইভেট চ্যানেল না, সোজা ডিডি বাংলা। দেখলাম প্রভাতী অনুষ্ঠান তখনো চলছে। কফি বানিয়ে সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিলাম। কতক্ষণ অনুষ্ঠান দেখেছি, মনে নেই। হুঁশ ফিরল ফোনের আওয়াজে। যা ভেবেছিলাম তাই; অফিসের ফোন। রিংটোনটা অফ করে দিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে দিলাম পাশের চেয়ারে। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজেকে একবার দেখলাম। তিন মাসের না কামানো দাড়িটা একটু বেশি পাকা লাগছে। চোখের নিচে হাল্কা কালিও যেন পড়েছে মনে হচ্ছে। না:, এভাবে নিজেকে দেখে মোটেও ভালো লাগলো না। কেবিনেট খুলে রেজারটা বার করে দাড়িটা কামিয়েই ফেললাম।

স্নান করে বেরিয়ে আলমারি খুলে নতুন একটা পাঞ্জাবি বার করলাম। গত পুজোয় কিনেছিলাম, পরে ওঠা হয়নি। সবই নিউটনের থার্ড ল আর কি! আজকের জন্যেই হয়তো তোলা ছিল। বসার ঘরে এসে ফোনটা দেখলাম। সাতাশটা কল, সবই অফিসের। জুনিয়র একটি ছেলেকে মেসেজ করে বলে দিলাম আজ এসব না। বলে ফোনটা বন্ধ করে অন্য নাম্বারটা চালু করলাম। এবার বাজার যাবো, খাসির মাংস কিনতে। দুপুরে জমিয়ে রান্না, তারপর একটা ভালো সিনেমা দেখে লম্বা একটা ঘুম দেব। আজ পয়লা বৈশাখ, আজ আমি সব নিয়ম ভেঙে নিজের মতো করে থাকবো। কি বললেন, অফিস? না, আমাকে ছাড়া একদিন ওরা ঠিক থাকতে পারবে। প্রথম আলোর চরণধ্বনি একটু অন্যভাবেই না হয় আজ বাজলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *