মেসি

ছোটবেলায় আলিফ লায়লা বলে একটা সিরিয়াল হত ডি ডি তে, বেসিক্যালি আরব্য রজনী। একটা এপিসোড আজও মনে আছে। সিন্দবাদ একটা চোরাবালির মত কিছু তে কোমর অবধি তলিয়ে আছে, আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে আরও। হাতে একটা ধনুক, আর একটাই তীর। সামনে একটা পাখি জাতীয় কিছু ঘুরছে, সেটার চোখে মারতে পারলে বেঁচে যাবে, আর ফসকালেই শেষ। সোজা তলিয়ে যাবে। আগের 2 টো তীর ফসকে গেছে, এটাই শেষ সুযোগ। সিন্দবাদের কপালে ঘামের ফোঁটা। নিজের নার্ভকে আয়ত্তে এনে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হবে। একটাই সুযোগ।

কাল রাত্রে সাড়ে এগারোটা নাগাদ টিভির সামনে বসে যখন মেসিকে দেখলাম, আমার এই গল্পটাই মনে পড়ে গেল। একটা গোটা দেশের 32 বছরের ট্রফি খরা কাটানোর দায় কাঁধে নিয়ে খাদের কিনারায় নেমেছে ওয়ারিওর প্রিন্স। আগের 2 টো ম্যাচে চেনা ছন্দে খুঁজে পাওয়া যায়নি একেবারেই, তার ওপর পেনাল্টি মিস। দলের অবস্থান টেবিলের তলার দিকে, পরের রাউন্ডে যেতে হলে আজকের ম্যাচ টা জিততেই হবে। একটাই সুযোগ্য, জিতলে কিছুদিন স্বস্তি, হারলে সোজা খাদের অতল।

ফুটবল খেলাটা বড় নিষ্ঠুর। এক মুহূর্তেই রাজাকে ফকির আর ফকির কে রাজা বানিয়ে দেয়। একটা খারাপ দিন…একটা মিস পাস…একটা ভুল ফিস্ট, আর সব শেষ। হিরো তখন সোজা ভিলেন। 94 এর ফাইনালে বাজ্জিওর সেই পেনাল্টি কিক টা ভাবুন, একটা গোটা দেশের 4 বছরের অপেক্ষা ওই একটা কিকেই শেষ …ব্যর্থতার সব দায় তখন নায়কের ঘাড়ে। “ও তো আসলে বার্সেলোনার প্লেয়ার… গা বাঁচিয়ে খেলে, দেশের প্রতি কোন কমিটমেন্ট ই নেই….ইনিয়েস্তা ছাড়া তো অচল….সি আর সেভেন এর মত স্পিড নেই …মারাদোনার ধারেকাছে না ….” ইত্যাদি ইত্যাদি।

মধ্যবিত্ত বাঙালির একটা সমস্যা হল, সব ব্যাপারেই সবজান্তা হাবভাব। প্যান্টে কাদা লেগে বাড়িতে বকুনি খাওয়ার ভয়ে কাদামাঠ এড়িয়ে যাওয়া পাশের বাড়ির বাবান থেকে শুরু করে উদয়ন সংঘের রিজার্ভ বেঞ্চ গরম করা পাশের পাড়ার সাধন জেঠু, ফুটবল জ্ঞানে মোটামুটি সবাই মোরিনহকে বলে বলে 10 গোল দিতে পারে। অথচ একটা খুব সাধারণ ব্যাপার কেউ বুঝতে চান না, 1986 আর 2018 এর মধ্যে অনেকটা সময়ের ফারাক আছে। খেলাটা এর মধ্যে অনেকটা পাল্টে গেছে, একক দক্ষতায় ম্যাচ জেতানোর দিন শেষ। সম্ভবত জিদানই এই ঘরানার শেষ ফুটবলার।

আর্জেন্টিনার প্রথম একাদশে তারকা প্লেয়ারের অভাব নেই। ম্যান সিটি, জুভেন্টাস, পি এস জি র প্রথম একাদশে নিয়মিত খেলা ফুটবলারের ছড়াছড়ি। তাও 15 বছর ইন্টারন্যাশনাল ট্রফির খরা কাটানোর সব দায় ওই একটা লোকের উপরেই কেন বর্তায় আমার জানা নেই। তাহলে বাকি 10 জনের কি ভূমিকা মাঠে?

এই সমস্ত সাত পাঁচ ভাবছিলাম, হঠাৎ ই মাঝমাঠ থেকে বানেগার একটা ঠিকানা লেখা পাস উড়ে গেল নাইজেরিয়া বক্স এর দিকে। নীল সাদা জার্সি পড়া একটা বেঁটে লোক, ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে একটা ডিফেন্ডার। বাম উরু দিয়ে রিসিভ করে বাঁ পায়ের আলতো টাচ এ বল টা নামিয়ে আনা, তারপর ডান পায়ের একটা অনবদ্য ফিনিশ …..

বিশ্বকাপ তোমার হাতে আসবে কিনা জানি না সূতপুত্রের যন্ত্রণা নিয়ে তোমাকে খেলা ছাড়তে হবে কিনা জানি না, রোনাল্ডো তোমার চেয়ে বেশি ব্যালন ডি ওর নিয়ে রিটায়ার করবে কিনা জানি না। একজন ফুটবল রোমান্টিক হিসেবে এই টুকু জানি, তুমি অনবদ্য। ফিনিক্স পাখির মত ছাই এর স্তূপ থেকে ফিরে আসতে জানো তুমি।

লাল পাহাড়ির দেশে

“একটা গন্ধ পাচ্ছিস ? সোঁদা গন্ধ? ” – হাঁটা থামিয়ে, প্রাণায়ামের ভঙ্গিতে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে প্রশ্নটা ছুড়েদেয় সুমন। মুখেচোখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তির ভাব, ঠিক যেন মোক্ষলাভের আগের স্টেজ এ পৌঁছে গেছে। “জঙ্গলেরগন্ধ। এ জিনিস কিন্তু তোর ক্যামেরার লেন্সে ধরা যাবে না।”

কোলকাতার বাইরে বেরোলেই সুমনের মধ্যে রোমান্স জেগে ওঠে। কালকূট, নীললোহিত সবাই একসঙ্গে ভর করে ওকে। শেষের কথাটা যার উদ্দেশ্যে বলা, সে খানিকটা এগিয়ে গেছে ।

– “বকবক না করে পা চালা। ফেরার সময় প্রাণ ভরে শুঁকিস।” – গাইড সুলভ ভঙ্গিতে জবাব দেয় তীর্থ।

– “তাড়া কিসের? সবে তো সোয়া চারটে।”- আমি ঘড়ি দেখে বললাম। “এমন সুন্দর রাস্তায় তাড়াহুড়ো করে হাঁটার কোন মানে হয় না।”

– “কারণ আমি আর ওয়েট করতে পারছি না ভাই। তোদের এই নেচারোলজির ক্লাস করার জন্য তো আরও দুদিন আছে।” একটা ফিচেল হাসি হেসে তীর্থ হাঁটার গতি বাড়াল। অগত্যা আমরাও।

রাস্তাটা সত্যিই সুন্দর। এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে। জন মানুষ নেই, গাড়ি – ঘোড়া ট্রাফিক জ্যাম নেই, বিষাক্ত বাতাস নেই, আর অসহ্যকর হর্নের আওয়াজ ও নেই। দুপাশে জঙ্গল, খানিকটা দূরে দূরে পুরুলিয়ার ট্রেডমার্ক টিলা পাহাড় চোখে পরছে। আজ সকালেই আমরা এসে পৌঁছেছি বরন্তী – তে। পুরুলিয়া জেলার এই গ্রাম,কলকাতাবাসীদের উইক-এন্ড গন্তব্য হিসেবে চমৎকার। বিশাল বড় একটা লেক, জঙ্গল, ছোট ছোট টিলা পাহাড় আর সর্বোপরি অপার শান্তি।

– “অরণ্যের দিনরাত্রি-র সিনটা মনে পড়ছে ?”

সুমনের প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললাম। সত্যি মনে পড়ারই কথা। কারণ আমাদের এই বৈকালিক অভিযান এর গন্তব্য হল বরন্তী থেকে সামান্য দূরে রামজীবনপুর গ্রাম, উদ্দেশ্য – মহুয়ার সন্ধান করা। আর তীর্থর লিডার-সুলভ ভাবভঙ্গিও অনেকটা অসীমের মতই। পুরুলিয়ায় এসে মহুয়া না খাওয়া আর কাশী গিয়ে মাথায় গঙ্গাজল না ছোঁয়ানো অনেকটা সমার্থক, দুটোই ঘোর পাপ। হোটেল ম্যানেজারের বাতলে দেওয়া পথে আমরা এখন হেঁটে চলেছি রামজীবনপুরের দিকে।

প্রায় মিনিট কুড়ি হেঁটে, দূরে একটা গ্রামের চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে জঙ্গল পাতলা হয়ে এসেছে।সম্ভবত ওটাই রামজীবনপুর। আমরা প্রবল উৎসাহে এগিয়ে চললাম।

রামজীবনপুর একেবারে নিপাট গ্রাম, মাটির দেওয়াল আর খড় বা টালির চালের অধিকাংশ বাড়ি। একেবারে শরৎবাবুর লেখা থেকে উঠে আসা। একমাত্র স্কুল বিল্ডিংটাই যা চোখে পড়ল বাঁধানো। ইলেকট্রিক এর পোস্ট আরে এক আধটা ডিশ টিভি ছাড়া, আধুনিক সভ্যতার চিহ্ন প্রায় নেই। লোকজন বিশেষ চোখে পড়ল না, সম্ভবত কাজ থেকে ফেরেনি।

তীর্থ অনেকটা এগিয়ে গেছিল। গ্রামে ঢোকার মুখেই একটা ছোট্ট ঝুপড়ি মত চালাঘর, দেখলাম সেটা থেকেই এক বৃদ্ধের সাথে তীর্থ বেরিয়ে আসছে। বৃদ্ধের খালি গা, শীর্ণ চেহারা। তীর্থ ‘কাকা’ পাতিয়ে নিয়েছে তাঁর সাথে।আমাদের চালাঘরে বসতে বলে কাকা হাঁটা দিলেন তাঁর বাড়ির দিকে। তীর্থর মুখে এভারেস্ট জয়ের হাসি – “ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এক বোতল পঞ্চাশ টাকা।”

– “এদিকে আয় অভি, একটা এক্সপিরিয়েন্স করে যা ।” – দেখি সুমন ততক্ষণে চালাঘরে ঢুকে পড়েছে। উঁকি মেরে দেখি সেটা আসলে চায়ের দোকান, তখনো উনুন জ্বলেনি যদিও। একপাশে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো মাচা ধরণের বসার জায়গা। বুঝলাম সন্ধেবেলা এখানে আড্ডা টাড্ডা বসে।

– “ভেবে দেখ, এদের কিন্তু সিসিডি নেই। আড্ডা মারার জন্যে এদের এসি বা চিকেন স্যান্ডুইচ ও নেই। চা আর মুড়ি তেলেভাজাই যথেষ্ট…

-“ চলে আয়।” বাইরে থেকে হাঁক পাড়ল তীর্থ। সুমনের মুড়ি তেলেভাজার রোমান্সের সবটুকু আর শোনা হল না।বেরিয়ে দেখি কাকা হাতে একটা কাঁচের বোতল আর কয়েকটা প্লাস্টিকের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে। বোতলের ভেতরে একটা স্বচ্ছ তরল। এই সেই মহুয়ার মদ ? যার এত গুণগান শুনে এসেছি ? বোতলটা মাঝারি মাপের, বড়জোর হাফলিটার হবে। দেখে বিশেষ ভক্তি এলো না। চোলাই টোলাই না তো ?

তীর্থ ইতিমধ্যে বোতলটা খুলে ফেলেছে, আমার দিকে এগিয়ে বলল – “শুঁকে দেখ।” একটা ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ পেলাম। খানিকটা মধুর মতো, কিন্তু বেশ তীব্র। নাহ, এটা চোলাই হতে পারে না।

কাকা আমাদের নিয়ে চলল তাঁর বাড়ির উঠোনে। একরাশ খড় ডাই করা ছিল একপাশে, তারই থেকে কিছু পেতে দিল আমাদের বসার জন্য। সব ব্যবস্থা দেখে বেশ খুশি হলাম। মহুয়া খেতে হলে এমনভাবেই খাওয়া উচিৎ। এ জিনিস ড্রয়িংরুমে কাঁচের গ্লাসে মানাবে না। মাটিতে বাবু হয়ে বসে, তীর্থর বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। বেশ কড়া। সত্যি বলতে, স্বাদ আহামরি কিছু লাগল না। কিন্তু ঐ পরিবেশটা, মাথার ওপর খোলা আকাশ, মাটির বাড়ির উঠোন, খড়ের আসন – এই সব কিছু মিলেমিশে কেমন একটা ঘোর মত লেগে গেল।

কাকা আমাদের পাশেই বসে ছিল, দেখলাম একটু আড়ষ্ট আড়ষ্ট ভাব। তীর্থর বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসটা প্রত্যাখ্যান করলেন, ওনার দোকান খোলার সময় হয়ে এসেছে বলে। আমি নাম জিজ্ঞেস করলাম ।

-“বাবুরাম কিস্কু।” বুঝলাম স্বল্পভাষী মানুষ। আমরা এটা সেটা প্রশ্ন করতে লাগলাম, কাকাও আস্তে আস্তে সহজ হলেন। বললেন এই পানীয়টি তাঁর স্বহস্তেই বানানো। ওনাদের গ্রামের সান্ধ্য আড্ডায় আলুর চপ সহযোগে এটি পান করেন ওনারা। সরকারি ভাবে মহুয়া বিক্রি করা নিষিদ্ধ, তাই গ্রামের বাইরে নিয়ে যায় না।

ছোট বোতল, তিন জনের শেষ করতে বেশী সময় লাগল না। এবার ফিরতে হবে। একটু পড়েই অন্ধকার পড়বে, সঙ্গে টর্চ ও নেই। গা ঝারা দিয়ে সবাই উঠলাম। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে কাকাও আমাদের সঙ্গে ওর দোকান অবধি এলেন হাঁটতে হাঁটতে। এবার সি-অফ করার পালা। বললাম – “ আসি কাকা। তোমাদের গ্রাম খুব সুন্দর, আবার আসব।”

কাকার মুখের আলতো হাসির রেখা দেখা দিল, গত এক ঘণ্টায় এই প্রথম –“শীতকালে আসলে খেজুরতাড়ি খাওয়াবো।”

ডুয়ার্সের ডায়েরী

পিচে মোড়া রাস্তাটা সোজা উঠে গেছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে – একপাশে খাদ, অন্যপাশে জঙ্গল। অক্টোবরের মাঝামাঝি এই চমৎকার সকালের রোদ গায়ে মেখে আমরা চার বন্ধু যখন হাঁটা শুরু করি তখন ঘড়ি বলছে সাড়ে আট্টা, সঙ্গী ব্যাগে চকোলেট, কেক, জলের বোতল ও পায়ে রাশভারী ট্রেকিং জুতো। গন্তব্য বাক্সা ফোর্ট হয়ে পাহাড়চূড়ায় লেপচাখা। যাওয়া আসা মিলিয়ে প্রায় তের কিলোমিটার।

পরশু রাত্রে আমরা চার বন্ধু এসে পৌঁছেছি আলিপুরদুয়ার জেলার বাক্সা টাইগার রিজার্ভের অন্তর্গত জয়ন্তীতে। উদ্দেশ্য পুজোর কোলকাতার যাবতীয় ক্যাকোফোনি থেকে দূরে শান্তিতে কয়েকটা দিন কাটানো। প্রথম দিনটা কেটেছে জঙ্গল সাফারিতে (সে গল্প আরেকদিন হবে)। আজ দ্বিতীয় দিন, আমাদের বহু প্রতীক্ষিত ট্রেক। জয়ন্তী থেকে সান্তালবাড়ি গাড়িতে আসা, এখান থেকেই ট্রেকিং রুটের শুরু। গাইডের হিসেব মত পৌছতে বারটা বেজে যাবে, পরের দিকে রাস্তাও বেশ খাড়াই। অতঃপর “অলস দেহ, ক্লিষ্ট গতি” নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।

OnTheWay

যাত্রাপথে

এই ট্রেকিং রুটের বৈশিষ্ট্য হল, অসাধারণ সব দৃশ্যপট। যারা ছবি তুলতে ভালবাসেন, তাদের ক্যামেরার লেন্সের জন্য দারুণ সব সম্ভার নিয়ে প্রকৃতি যেন বসে আছে। শুরুর দিকে রাস্তাটিও বেশ ভাল। বেশ খানিকটা অব্ধি গাড়িও যেতে পারে, তবে এত সুন্দর রাস্তায় হাঁটার মজাই আলাদা। মাঝে মধ্যে দুপাশে জঙ্গল। কান পাতলেই শুনতে পাবেন একটানা ঘণ্টা বাজার মত একটা শব্দ – ওটা আসলে ঝিঁঝিঁ পোকার ডানা ঝাপটানোর শব্দ, কাল জঙ্গলেও শুনেছি।
রাস্তা ক্রমশ দুর্গম হতে আরম্ভ করল। গাড়ির শেষ গন্তব্য পেরিয়ে আমরা তখন পাথুরে রাস্তায়। মাঝেমধ্যেই ভাঙ্গাচোরা পাথুরে সিঁড়ি, সাবধানে দেখে শুনে পা ফেলতে হচ্ছে। আলগা পাথরে পা পরলেই বিপদ। তবে সুবিধা এই যে একটানা খাড়াই রাস্তা নয়, মাঝে মধ্যেই সমতল আছে। এমনকি মাঝে মধ্যেই জিরিয়ে নেবার জন্য চমৎকার বাধানো জায়গাও আছে।রাস্তায় আমাদের স্বাগত জানাল ছোট্ট এক ঝর্ণা, ও কয়েকটি পাহাড়ি গ্রাম। পৃথিবীর এই দুর্গম কোণেও যে মানুষ থাকতে পারে, ভাবলে বেশ অবাক লাগে। প্রায় দেড় ঘণ্টা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য, বাক্সা ফোর্ট এ।

BuxaFort

বাক্সা ফোর্ট

বাক্সা ফোর্ট এর ভগ্নপ্রায় দশা দেখে খানিকটা হতাশই হতে হয়। ইতিহাস বলছে ভুটান রাজারা একসময় এই কেল্লাটি ব্যবহার করতেন তাঁদের সিল্ক রুট রক্ষা করার কাজে(সূত্র উইকিপিডিয়া)। ব্রিটিশ রাজত্বে এটি পরিণত হয় কারাগারে। আন্দামানের সেলুলার জেলের পরে বাক্সা ফোর্টই ছিল ব্রিটিশ আমলের সবচেয়ে দুর্গম জেলখানা, যেখানে সাংঘাতিক সব রাজদ্রোহীদের(পড়ুন স্বাধীনতা সংগ্রামী) বন্দী করে রাখা হত। শোনা যায় নেতাজীও কিছুদিন এখানে বন্দী ছিলেন। কেল্লার বাইরে বাধানো ফলকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা চোখে পড়বে।কেল্লার ভেতরে দর্শনীয় বিশেষ কিছু নেই, শুধু বন্দীদের গারদখানা ছাড়া। ভেতরে ঢুকলে বেশ একটা গা ছমছমে ভাব টের পাওয়া যায়(যদিও গরাদ-বিহীন)। কেল্লার পেছন দিকে ঘন জঙ্গল। সামনে খোলা মাঠ, তার পরেই সদরবাজার নামের একটা ছোট্ট গ্রাম। একটু দূরে পাহাড়ের ওপরে লেপচাখা গ্রামটাও(আমাদের পরবর্তী গন্তব্য) দেখতে পাওয়া যায়। কেল্লায় কিছুটা সময় কাটিয়ে, চকোলেট ও কেক এর সদ্ব্যবহার করে আমরা রওনা হলাম, লেপচাখার উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে সাড়ে চার কিলোমিটার হেঁটে, প্রচুর ঘাম ঝড়িয়ে আমরা বেশ খানিকটা ক্লান্ত। গাইডের চোখে সন্দেহ, আমরা আদৌ পারব কিনা। কিন্তু এত দূর এসে লেপচাখা না দেখে ফিরে যাবার কোন মানেই হয় না।

এই শেষ দেড় কিলোমিটার রাস্তা কিছুটা বেশী দুর্গম। রাস্তায় মাঝেমধ্যেই আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে স্থানীয় গ্রামবাসীরা। অনেকেরই পীঠে কাঠের বোঝা। খালি পায়ে, বা সামান্য চটি পড়ে এদের পাহাড় ডিঙ্গানো বেশ অবাক করে।

লেপচাখা পৌছতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় একটা ছোট্ট গ্রাম, অধিকাংশ বাড়িই কাঠের মাচার ওপর তৈরি। গ্রামে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে একটা সাদা প্যাগোডার চুড়ো। গাইড আমাদের নিয়ে এল গ্রামের শেষ প্রান্তে ভিউ পয়েন্টে। ভিউ পয়েন্টের ‘ভিউ’ এক কথায় অপূর্ব। একটা মাঝারি মাপের খোলা মাঠ, যার একপাশে খাদ। খাদের প্রান্তে এসে দাঁড়ালে, প্রায় গোটা বাক্সা জঙ্গলটাই দেখতে পাওয়া যায়। যার মধ্যে বালা, জয়ন্তী সমেত আরও কয়েকটি নদী ও চোখে পড়ে। উল্টো দিকে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ পাঁচটি পাহাড়ের চুড়ো – যার মধ্যে মহাকাল আর চুনাভাটি আমাদের চিনিয়ে দিল আমাদের গাইড।

Lepchakha1

লেপচাখা

জুতো টুতো খুলে আমরা ততক্ষণে ঘাসের ওপর বসে পড়েছি। পায়ের তলা রীতিমত লাল, গায়ের জামা ঘামে ভিজে একসা, পেটে রাক্ষুসে খিদে। শরীরময় ক্লান্তি। কিন্তু লেপচাখা এতটাই সুন্দর যে সব পরিশ্রম সার্থক মনে হল। একটা হালকা শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে, বেশ খানিকটা আরাম লাগল। চারিদিকে অদ্ভুত শান্তি। জায়গাটা দুর্গম বলেই বোধহয় ভিড়-ভাট্টা নেই। চোখে পড়ল পাহাড়ের চুড়ো ঘেঁষে এক খন্ড মেঘ ভেসে আসছে। ‘সাব্লাইম’ – লালমোহন বাবু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে মন্তব্য করেছিলেন, হঠ্ করে মনে পড়ে গেল।

Lepchakha2

লেপচাখা

কাঠের মাচার ওপর বাড়িগুলোর কয়েকটা আবার হোটেল(হোম স্টে)। গাইড এসে ঘুরে টুরে এসে খবর দিল, এক জায়গায় নুডলস পাওয়া যেতে পারে, প্রস্তাব সানন্দে গৃহীত হল। দূরে সান্তালবাড়ি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যেখান থেকে হাঁটা শুরু হয়েছিল। এতটা রাস্তা আমরা হেঁটে মেরে দিলাম!ভাবতে বেশ অবাক লাগছে।
গাইড এসে তাড়া লাগাল, খাবার তৈরি। এমন সুন্দর একটা জায়গা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু পেটের দায়। তাছাড়া নামাটাও বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অতঃপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠতেই হল। জুতো মোজা পড়তে পড়তে নিচের দিকে চোখ চলে গেল। জয়ন্তী নদীর ‘রিভার বেড’টা অসাধারণ দেখাচ্ছে। ফিরেই একবার জলে নেমে পড়তে হবে।