পয়লা বৈশাখ

কথায় বলে অন্ধের কি বা দিন, কি বা রাত। আমরা যারা লক্ষীসাধনায় মগ্ন হয়ে হত্যে দিয়ে বাইরে পরে আছি, আমাদের একই অবস্থা প্রায়। কবে পয়লা বোশেখ, কবে পঁচিশে, এক্সেল শীট, প্রজেক্ট ডেডলাইন আর কেপিআইয়ের চক্করে সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যায়। একটা নিয়মে নিজেকে বাঁধতে বাঁধতে কবে যে নিয়ম-দাস হয়ে গেছি, টের ও পাইনি। মাস পয়লার মোটা মাইনে আর দিনান্তে স্কচের অমোঘ টানে নিজেকে কবেই যেন আস্তে আস্তে হারাতে শুরু করেছিলাম। আমার মধ্যের আমিটা সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বারবার পালাতে চেয়েছে, আর তাকে আটকে রেখেছে বাইরের আমি। তাই পয়লা বৈশাখের নতুন জামা, আর পঁচিশের দিন শেষের কবিতা হাতে নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়ার বিলাসিতা চিন্তার বাইরে আর বেরোতে পারেনি।

কাল রাতেও অফিস থেকে ফিরেছি এগারোটার পর। কোনোরকমে কিছু একটা রেঁধে খেয়ে আবার ল্যাপটপ নিয়ে দাসত্বের রোজনামচা লিখতে বসেছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেও জানিনা। ঘুম ভাঙল যখন একফালি নরম রোদ জানলা বেয়ে মুখ ছুঁয়ে গেলো। অভ্যেস মতোই হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। দেখলাম হোয়াটস্যাপে বাবার একটা মেসেজ। “শুভ নববর্ষ।” ভদ্রলোকের এই ব্যাপারে কোন ভুল হয়না। প্রতি বছর প্রথম মেসেজটা বাবাই পাঠায়। অন্যান্য বছর আমি রিপ্লাই করে ছেড়ে দি, কিন্তু এ বছর মেসেজটা পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। রিপ্লাই করে সিগারেটটা শেষ করে বিছানা ছেড়ে নামলাম, কিন্তু অন্যদিনের মতো বাথরুমের দিকে না গিয়ে বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা অন করলাম। কোন প্রাইভেট চ্যানেল না, সোজা ডিডি বাংলা। দেখলাম প্রভাতী অনুষ্ঠান তখনো চলছে। কফি বানিয়ে সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিলাম। কতক্ষণ অনুষ্ঠান দেখেছি, মনে নেই। হুঁশ ফিরল ফোনের আওয়াজে। যা ভেবেছিলাম তাই; অফিসের ফোন। রিংটোনটা অফ করে দিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে দিলাম পাশের চেয়ারে। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজেকে একবার দেখলাম। তিন মাসের না কামানো দাড়িটা একটু বেশি পাকা লাগছে। চোখের নিচে হাল্কা কালিও যেন পড়েছে মনে হচ্ছে। না:, এভাবে নিজেকে দেখে মোটেও ভালো লাগলো না। কেবিনেট খুলে রেজারটা বার করে দাড়িটা কামিয়েই ফেললাম।

স্নান করে বেরিয়ে আলমারি খুলে নতুন একটা পাঞ্জাবি বার করলাম। গত পুজোয় কিনেছিলাম, পরে ওঠা হয়নি। সবই নিউটনের থার্ড ল আর কি! আজকের জন্যেই হয়তো তোলা ছিল। বসার ঘরে এসে ফোনটা দেখলাম। সাতাশটা কল, সবই অফিসের। জুনিয়র একটি ছেলেকে মেসেজ করে বলে দিলাম আজ এসব না। বলে ফোনটা বন্ধ করে অন্য নাম্বারটা চালু করলাম। এবার বাজার যাবো, খাসির মাংস কিনতে। দুপুরে জমিয়ে রান্না, তারপর একটা ভালো সিনেমা দেখে লম্বা একটা ঘুম দেব। আজ পয়লা বৈশাখ, আজ আমি সব নিয়ম ভেঙে নিজের মতো করে থাকবো। কি বললেন, অফিস? না, আমাকে ছাড়া একদিন ওরা ঠিক থাকতে পারবে। প্রথম আলোর চরণধ্বনি একটু অন্যভাবেই না হয় আজ বাজলো।

আশ্বিনের শারদ প্রাতে

আমি বাংলা ভাষাও ছাড়িনি, বাঙালিয়ানা ও ছাড়িনি, ছেড়েছি শুধু শহরটা। তবে ওটাও নেহাত দায় না পড়লে ছাড়তাম না।

শহর থেকে দূরে থাকার একটা খারাপ দিক হলও এখানে উৎসবের আমেজ ঠিক বোধ করা যায়না। উৎসব বলতে এখন অবশ্যই দুর্গাপূজার কথা বলছি। আজ দশ বছরের বেশি হয়ে গেল বাইরে। দিল্লী, লখনৌ, মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, লন্ডন… এখানে কোথাও কাশফুল ফোটেনা। কোথাও মহালয়ার দিন ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের আওয়াজ রেডিও থেকে ভেসে আসেনা। এখন অবশ্য সব টিভি চ্যানেলে একটা না একটা মহিষাসুর-মর্দিনী অভিনীত হয়, কিন্তু কোনও কিছুই যেন সেই রেডিওতে মহালয়া শোনার অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে পারেনা।

ছোটবেলার স্মৃতির কাঁটা এখনো আটকে আছে বাবার সেই murphy রেডিওতে। মহালয়া মানে এখনো আমার কাছে সেই পুরনো রেডিও, বীরেন বাবুর গলা, আর তারপর বাবা, জেঠু, কাকার তৈরি হয়ে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ করতে যাওয়া। মহালয়া মানে এখনো কাশফুল।

এখানে আমাকে কেউ ভোরবেলা ডেকে দেয়না। আগের দিন রাত জেগে প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করা ক্লান্ত চোখ মিছেই গোসা করে এলার্ম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। কফি মেকারের শব্দ, টোস্টারের থেকে বেরিয়ে আসা দুটো মুচমুচে টোস্ট, বাইরে হাল্কা মেঘলা আকাশ, আর অদূরের ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ, সব মনে করিয়ে দেয় আমার নাগরিক ব্যস্ততাকে। অফিস যেতে হবে।

রিপোর্টে শেষ মুহূর্তের ঝালাই দেওয়ার জন্যে ল্যাপটপ খুলতেই চোখ পরে গেল ক্যালেন্ডারে। আজ মহালয়া না? নিজের অজান্তেই রিপোর্টটা বন্ধ করে ইউটিউব খুলে টাইপ করি “মহালয়া বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র”। প্লেলিস্টের প্রথম ভিডিওতে ক্লিক করে, কফির কাপটা নিয়ে দাঁড়াই আমার বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর সামনে। ঘর জুড়ে তখন গমগম করে ওঠে বীরেন বাবুর কণ্ঠ…”আশ্বিনের শারদ প্রাতে…” এই বছরও বাড়ি ফেরা হলোনা।

দুর্গাপূজা, প্রেম ও এক অধুরী কাহানী

পুজো আসছে, আর বাকি ১৩ দিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই এই ধরনের পোস্ট চোখে পড়ছে। আমরা যারা বাইরে থাকি, তাদের কাছে পুজো মানে কিন্তু বাড়ি ফেরার আনন্দ। আলোয় মোড়া আমার খুব চেনা এই শহর, চেনা-অচেনা সব মানুষ, ভিড়, একরাশ হাসিমুখ, প্যান্ডেলের বাইরে লম্বা লাইন, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ…সব মিলে মিশে একটা অন্যরকমের ভালোলাগা। তাই আমার বন্ধু যখন আমাকে এই লেখাটা লিখতে বলল, সঙ্গে জুড়ে দিলো যে একটু নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই কিন্তু, আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে জুলফিতে আর দাড়িতে রূপোলী ছোঁয়া দেখে চমকে উঠে, বাড়তে থাকা পেটের ওপর হালকা করে হাত বুলিয়ে নিজের মনেই গেয়ে উঠলাম “আমার যে দিন ভেসে গেছে…”।

“নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই” কথাটা কানে বাজতেই মনে হল, সত্যিই তো বয়েস বেড়ে চলেছে। অন্যের বউ, নিজের প্রেমিকা যখন বয়েস নিয়ে খোঁটা দিয়েছে, বিশ্বাস করুন একটুও গায়ে মাখিনি সেই সব কথা। কিন্তু লিখতে বসে যখন পুরনো কথাগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি, বেশ বুঝতে পারছি যে যেই ঘটনাগুলো “এই তো সেদিন” বলে সামলে রেখেছিলাম, পায় পায় ১৫ বছর হেঁটে পার হয়ে গেছে।

নস্টালজিয়ার কথা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়, কিন্তু আমার এতো নস্টালজিয়া নেই কারণ সময়ের সাথে সবকিছু পাল্টায় স্বাভাবিক রীতিতে, এবং সেটা মেনে নিতে হয়। যেটা পাল্টায় না সেটা হল এমন কিছু গল্প যা মনের ভিতর বাঁধা পড়ে আছে… পুজো আসতেই আগল খুলে ছড়িয়ে পড়বে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

“আমায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবি?” আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল এরকমই একটা ফোন কল দিয়ে। সে বছর পুজোর অষ্টমীর দিনটা বড্ড ভালো কেটেছিল। লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা, ফুচকা খাওয়া, প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝখানেও একে অপরের আঙ্গুল খুঁজে নেওয়া, প্রথম হাত ধরা, আর সব শেষে পাড়ার প্যান্ডেলের পিছনের অন্ধকারে আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা। সব মনে আছে স্পষ্ট করে, যেন কালকেই ঘটেছে সবকিছু। এখনো পুজোর ঢাক বাজলে চোখের সামনে সিনেমার রিলের মত চলতে থাকে সবকিছু। দশমীর দিন ওর হঠাৎ বাড়ি চলে আসা, মায়ের কাছে আবদার করা “তোমার সাথে বরণ করতে যাবো”, তারপর দুগালে সিঁদুর মেখে আমার ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠা “দেখ আমাকে কিরকম নতুন বউয়ের মত লাগছে।” কই, আমি তো কিছুই ভুলিনি?

আমার গল্পে বেকারত্বের জ্বালা ছিলনা, পকেটে একশ টাকা নিয়ে ঝাঁ চকচকে শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অসহায়তা ছিলনা, তোকে হারানোর ভয়ও ছিলনা…তবু কেন ভুল হল ঠিক সময়ে ভালোবাসার কথা বলতে না পারায়? আজ আমাদের মধ্যে দুটো মহাদেশের শূন্যতা। এই পুজোতে তুই শিকাগোর বঙ্গ সম্মেলনে তোর প্রিয় কবিতা পড়বি, আর আমি লন্ডনের শীতে ওভারকোট গায়ে চেপে ধরে হেঁটে যাবো কোনও পুরনো রাস্তা ধরে। তবুও আমার পুরো পুজো জুড়ে শুধু তোর কথাই মনে পড়বে। আমি জানি, কোথাও না কোথাও গিয়ে তোরও আমার কথা একটু হলেও মনে পড়বে। এই মনখারাপের মধ্যে দিয়েই কোথাও না কোথাও আমার আঙ্গুল ছুঁয়ে ফেলবে তোর হাত। ভালো থাকিস, মন।

বিরূপাক্ষ কথা (তৃতীয় পর্ব)

আগের পর্ব

বিরূপাক্ষ কথা #১১

কফির কাপটা সশব্দে টেবিলে রেখে চলে যাওয়ার সময় বউ বলে উঠলো, “কাল থেকে নিজের কফি নিজেই বানিয়ে নিও। আমার হাতের কফি তো তোমার মুখে রোচেনা।” কফি বানাত বটে বিরূপাক্ষ বাবুর মা। সারা বাড়ি ম ম করতো কফির খোশবু তে। কফি আসতো বাবার পছন্দের এক দোকান থেকে। সময় পাল্টাতে কফির স্বাদ ও পাল্টে গেল। বাবা কফি খাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলেন। কাপে চুমুক দিয়ে, বিস্বাদে, মুখ বিকৃত করে বিরূপাক্ষ আপনমনে বলে উঠলেন, “আজ অফিস ফেরতা বাবার পছন্দের সেই কফির দোকানটা হয়ে ফিরব।” বসার ঘরের ফটো ফ্রেম থেকে বিরূপাক্ষ বাবুর বাবা খুক করে হেসে উঠলেন।
বিরূপাক্ষ কথা #১২

বৃষ্টি নামলেই বিরূপাক্ষ বাবুর মন খারাপ করে। ভেজা মাটির গন্ধে, তাতে মিশে থাকা কোনও অজানা ফুলের মিষ্টি গন্ধে, মন কেমন করা অনুভূতিরা দানা বাঁধে চোখের কোনে। মনে পড়ে তাদের পুরনো বাড়িটার কথা, ছাদের ঘর, দালান কোঠা… রাঙাদাদুর ঘরের ফিলিপ্স রেকর্ড প্লেয়ার থেকে ভেসে আসা মেহেদি হাসানের কণ্ঠ “মহব্বত করনেওয়ালে কম না হোঙ্গে, তেরি মেহফিল মেঁ লেকিন হম না হোঙ্গে।” রাঙাদাদু বিয়ে করেননি। শোনা যায় বিদেশে থাকাকালীন একজন কে ভালবেসেছিলেন। রাঙাদাদুর বাবা রাজি হননি। ছেলেও জিদ্দি বাপের মতন। বেঁকে বসলেন বিয়ে করবেননা বলে। ছেলের জেদের কাছে বাপ হার মেনেছিল। রাঙাদাদু যেদিন মারা যান, আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিল। উঠোনে শোয়ানো দেহটার ওপর বিরূপাক্ষ বাবুর বাবা একটা ছবি রেখে দিয়েছিলেন। তাতে এক জার্মান মহিলা, সম্ভবত সেই জন যাকে রাঙাদাদু ভালোবাসতেন। শ্মশানে দাদুর সাথে ছবিটাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাইরে তাকিয়ে বিরূপাক্ষ বাবু গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন “অগর তু ইত্তিফকন মিল ভি যায়ে, তেরি ফুরকত কে সদমে কম না হোঙ্গে মহব্বত করনেওয়ালে কম না হোঙ্গে।
বিরূপাক্ষ কথা #১৩

মন্দিরের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কপালে হাত ঠেকাতেই পাশের সিটে বসা বৌদি খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আবার ভগবানে ভক্তি হল কবে থেকে?” বিরূপাক্ষ মুচকি হেসে বললেন, “রক্তমাংসের মানুষরা দু বেলা বিশ্বাস ভাঙ্গছে। চেনা সব লোক। এও না হয় ভাঙ্গবে। একে চোখেও দেখিনি, চিনিওনা। তাই ড্যামেজ কম, রিস্ক ও”। বউ মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো, “একটা উন্মাদ লোককে বিয়ে করে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল।” বিরূপাক্ষ বাবু শুনেও শুনলেন না। আজ মাসের পয়লা, বুয়াকাকার বাড়ি যাওয়া আছে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #১৪

হাসপাতালে এক বন্ধুর মাকে দেখে বেরোনোর সময় চোখ পরে গেল স্ট্রেচারে শোয়ানো একটা দেহের দিকে। বছর চব্বিশ বয়েস, মাথার পেছন দিয়ে রক্ত বেরিয়ে সাদা চাদর ভিজিয়ে দিয়েছে। পাশে দাঁড়ানো ওয়ার্ড বয় বলে উঠলো বেওয়ারিশ লাশ,মর্গে পাঠানো হবে। নিজের গায়ের থেকে চাদরটা খুলে দেহটা ঢেকে দিলেন বিরূপাক্ষ। অবাক চোখে ওয়ার্ড বয় জিজ্ঞেস করলো, “চেনেন নাকি?” “জানিনা” বলে বেড়িয়ে এলেন বিরূপাক্ষ বাবু। “পাগল, না কি?” কানে এলো ওয়ার্ড বয়ের গলা।

 

বিরূপাক্ষ কথা #১৫

হাতঘড়িটা আজ আবার বন্ধ হয়ে গেল। অফিস ফেরতা নিয়ে গেলেন লালবাজারে করিমের দোকানে। পুরনো খদ্দের, তাই করিম নিজেই ঘড়িটা নিয়ে বসে গেল ঠিক করতে। “এবার এটা পাল্টে নিন স্যার। এত পুরনো ঘড়ি, কদিন বাদে আর সারাই করাও যাবেনা। বেচলে বলুন, মোটামুটি ভালো দাম দেব।” “এই ঘড়ি দাদু এনেছিলেন লন্ডন থেকে। ওনার পরে বাবা পড়তেন, এখন আমি পড়ি। বোসেদের তিনপুরুষের দিনবদল দেখেছে এই ঘড়ি। তার কত দাম ধরবে করিম মিয়াঁ?” করিম এই সব বোঝেনা। ঘড়ির মেশিনে ফোঁটা ফোঁটা তেল ঢালতে ঢালতে আড় চোখে দেখে এই অদ্ভুত মানুষটাকে, যে মায়ার চোখে তাকিয়ে আছে ১০০ বছরের পুরনো ঘড়িটার দিকে।

 

(চলবে)

বিরূপাক্ষ কথা (দ্বিতীয় পর্ব)

আগের পর্ব

বিরূপাক্ষ কথা #৬

ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে একটা ভালো চাকরি পেয়েছিলেন বিরূপাক্ষ বাবু। শত হোক, শিবপুর কলেজের সেরা ছাত্রদের মধ্যে একজন। যাওয়ার সব ঠিক, হঠাৎ বেঁকে বসলেন বিরূপাক্ষ। যে শহরের অলি গলি ওনার নিজের, যে শহরের প্রত্যেকটা মানুষ কোথাও না কোথাও গিয়ে তার নিজের লোক, সেই শহর ছেড়ে যাওয়া যায় নাকি?

বছর পনেরো পরে, বিদেশে সেটল করা বন্ধুদের সাথে স্কচ খেতে খেতে বিরূপাক্ষ বাবু বলে ওঠেন,

“এই শহরটার বড় মায়া গো। যেতে চাই, কিন্তু যেতে দেয়না। আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে রেখেছে মায়ের আঁচলের মতো।”

 

বিরূপাক্ষ কথা  #৭

পেল্লাই পরিবারটা ছোট হতে হতে যখন দুটো ৩ কামরার ফ্ল্যাটে এসে ঠেকলো, বিরূপাক্ষ বাবুর মন খারাপ বেড়ে চললো। কতগুলো মানুষ ফটো ফ্রেমে আটকা পড়ে গেল, শুকনো মালা ঝুলে রইলো জং ধরা পেরেকে। মাঝে মাঝেই পুরোনো কলকাতায় নিজেদের পুরোনো বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন উনি। এখানেই তো কত হাসি শোনা যেত একসময়। এখন পায়রার গুমরানো শোনা যায় কান পাতলে। শ্যাওলা ধরা ফলকে নামটা আর পড়া যায়না। মুচকি হেঁসে ফিরে আসেন বিরূপাক্ষ বাবু। অস্ফুটে বলে ওঠেন “ভালো থেকো”।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৮

বাপের চাপে বিয়ে করেছিলেন ঠিকই, এক ছেলের বাপ ও হয়েছিলেন, কিন্তু মনের মিল হয়নি বিরূপাক্ষ বাবুর। বউ কবিতা পড়েনা, গানেও বিশেষ রুচি নেই। সন্ধ্যে হতেই টিভি চ্যানেলে গুচ্ছের বাজে সিরিয়াল দেখে। ঘর আলাদা অনেকদিন ধরেই, কাছেও বিশেষ আসা হয়না। অফিস থেকে ফিরে আলমারি খুলে একটা পুরোনো হয়ে যাওয়া রুমাল বার করে প্রানভরে ঘ্রাণ নেন বিরূপাক্ষ বাবু। খোঁজেন সেই অতিপরিচিত ল্য অরিগান পারফিউমের গন্ধ। প্লাইউড আর ন্যাপথলিনের গন্ধ ওনার মন আরো খারাপ করে দেয়। বসার ঘর থেকে ভেসে আসে টিভির শব্দ। উঠে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। রুমালটা ঠিক জায়গাতে রেখে জানলা খুলে বাইরে তাকান।
“তোমার পারফিউমের গন্ধে আমার মন খারাপ কেটে যায়।”
এক বৃষ্টির দুপুরে বলা কয়েকটা কথা মনে পড়ে যায়।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৯

প্রথমে রাঙাদাদুর ল্যান্ডমাস্টার, পরে বাবার কালো ফিয়াট চালাতো বুয়া কাকা। মোটা গোঁফ, আর বিশাল একটা ভুঁড়ি, বুয়া কাকাকে দেখেই ভয় লাগতো ছোট বিরূপাক্ষর। সেই বুয়া কাকার কাছে গাড়ি চালানোর হাতেখড়ি। বিরাট ভুঁড়ির ওপর বসে, স্টিয়ারিং ধরে নিজেকে বড় ভাবতে ভাবতেই একদিন সব পাল্টে গেল। একে একে বিক্রি হয়ে গেলো ল্যান্ডমাস্টার, কালো ফিয়াট। এর সাথে কোথাও একটা চলে গেল বুয়া কাকা।
সেই বুয়া কাকা কে বাসস্ট্যান্ডে ভিক্ষে করতে দেখে এগিয়ে গেলেন বিরূপাক্ষ বাবু। সময় বড্ড নিষ্ঠুর। গিয়ে পা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “চিনতে পারলে বুয়া কাকা? আমি বিরু, বোস বাড়ির বিরু”।
চোখ বেয়ে নেমে আসা জল বলে দিলো বুয়াকাকা কিছুই ভোলেননি। কাকার হাত ধরে রাস্তা পার করে নিয়ে এলেন অন্যদিকে। একজন কে দেবেন বলে হাজার দশেক টাকা তুলেছিলেন, সেটা পকেটেই ছিল। খামটা বার করে বুয়া কাকার হাতে তুলে দিলেন।
“প্রতি মাসে তোমাকে আমি টাকা দিয়ে যাবো। তুমি আর কারোর কাছে হাত পাতবেনা। না বোলোনা, আমি শুনবনা।”
ভেজা চোখে বুয়া কাকা তাকিয়ে রইলেন সেই ছোট্ট বিরুর দিকে, হাত দিয়ে চেপে ধরলেন ওর হাত, যে ভাবে একদিন স্টিয়ারিং ধরতে শিখিয়েছিলেন।
“বড় হয়ে গেলি বিরু।”
“তুমি বুড়ো হয়ে গেলে কাকা।”
যে গাড়ি সোজা রাখতে শিখিয়েছিল, তার হাত ধরে আজ বাড়ি পৌঁছে দিতে দিতে বিরূপাক্ষ বাবু মনে মনে ছেলেবেলাতে ঘুরে এলেন।

 

বিরূপাক্ষ কথা  #১০

এক অলস বিকেলে কলেজ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরোনো বইয়ের দোকান খুঁজছিলেন বিরূপাক্ষ বাবু। রহমতের ওই দোকান থেকে একসময় অনেক দুষ্প্রাপ্য বই কিনেছেন তিনি। সময়ের অভাবে অনেকদিন আসা হয়নি। ঘন্টাখানেক খুঁজেও সেই দোকানটা দেখতে পেলেন না। একজন কে জিজ্ঞেস করতে সে অবাক মুখে বললো ওখানে কোনোদিনও ওরকম কোনো দোকান ছিলনা। রেগে বিরূপাক্ষ বলে উঠলেন, ধুর মশাই, বছর কয়েক আগেও আমি ওই দোকান থেকে বই কিনেছি, ছিলনা বললেই হবে? সেই লোকটি বলে উঠলো, ৫০ বছর এই তল্লাটে ব্যবসা করছি, ওরকম কোনো দোকান কস্মিনকালেও দেখিনি… রহমত বলে কোনো দোকানি এখানে নেই। আরো দু একজন ওর কথায় সায় দিলো। একটু অবাক হয়ে বাড়ি ফিরে, বইয়ের তাকে খুঁজলেন সেই সব বই যা তিনি রহমতের দোকান থেকে কিনেছিলেন। কোথাও কিছু নেই। শুধু একটা তাকে উইয়ে খাওয়া কিছু পাতা পড়ে আছে। হলদে হয়ে যাওয়া কিছু পাতা। হাতে ধরতেই গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

 

(চলবে)

বিরূপাক্ষ কথা (প্রথম পর্ব)

বিরূপাক্ষ কথা  #১

দু বছর ধরে বন্ধ থাকার পর আজ সকালে যখন বিরূপাক্ষ বাবুর নাকটা ফট করে খুলে গেল, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে দেশের হাওয়ার গন্ধ পাল্টে গেছে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #২

কিছুতেই সেই ছবিটাতে নিজেকে ফিট করতে পারছিলেন না বিরূপাক্ষ বাবু। একটা পারফেক্ট ফ্যামিলি ফটো, যেখানে তিনি অত্যন্ত বেমানান। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে উঠলেন…”না রে, এবারও পারলাম না”। শেষ ট্রেন আর এক ঘন্টা পরে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৩

যেদিন বিরূপাক্ষ বাবুর বাবার সাধের কালো ফিয়াট গাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়, তখন ওনার বয়েস ১৪ কি ১৫ হবে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর গ্যারাজে গিয়ে গাড়িটার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে কেঁদেছিলেন। আরেকবার কেঁদেছিলেন, ছাদে, যেদিন বড়পিসির লাগানো আমগাছ গুলো কেটে ফেলার কথা হয়েছিল। ভরা দুপুরে ছাদে দাঁড়িয়ে আমগাছগুলোর ডালে, পাতায়, হাত বুলিয়েছিলেন। বিরূপাক্ষ বাবুর আর কান্না পায়না। আয়নাতে নিজেকে দেখে, একটা সিগারেট ধরিয়ে হেঁসে বলে ওঠেন, “It goes on”.

 

বিরূপাক্ষ কথা #৪

রোজকার মতো অফিসে বেরিয়েও, হঠাৎ কি মনে হওয়াতে উল্টো পথে হাওড়া স্টেশন গিয়ে বেনারসের ট্রেনে চেপে বসলেন বিরূপাক্ষ বাবু।উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ সাহেবের বাড়ির সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। ছোটবেলা মামাবাবুর সাথে এসে সানাই শুনেছিলেন ওনার বসার ঘরের ফরাসে বসে। এখানে আর কেউ সানাই বাজায় না। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন মনিকর্ণিকা ঘাট। কান্নার শব্দ এখানে সানাইয়ের সুরে বাজে। পকেট হাতড়ে একটা সিগারেট পেলেন। ধরিয়ে, একটা লম্বা টান দিয়ে নিজের মনেই বলে উঠলেন “মন ভালো নেই”।

 

বিরূপাক্ষ কথা  #৫

একদিন সময় মত ভালোবাসার কথা বলে উঠতে না পারার আফশোস ওনার আজও যায়নি। সেদিন পিস হ্যাভেন এর সামনে কাঁচের গাড়িতে খুব চেনা মুখটা দেখে বুকের ভেতর একটা ব্যাথা অনুভব করলেন বিরূপাক্ষ বাবু। বাড়ি ফিরে বইয়ের তাক থেকে গালিবনামাটা নামিয়ে, প্রথম পাতায় মুক্তোর মতো হাতের লেখাতে নিজের নামটার ওপর আলতো আঙুল ছোঁয়ালেন। পাতা উল্টে প্রিয় নজমটি পড়লেন আরো একবার। “হাজারো খোয়াইশে এইসি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে”।

 

(চলবে)