অমল মহিমা লয়ে তুমি এলে- ২

ঠাকুর দেখা মানে তো শুধু ঠাকুরের কাছে যাওয়াই নয় - কে কিরকম সেজেগুজে বেরিয়েছে, পরিচিত-স্বল্পপরিচিত সমবয়সী সুন্দরী মেয়েদের দিকে ইতিউতি তাকানো, একটু হাসি, একটু ইশারা, একটু মান-অভিমান, একটু আশা-দু:সাহস - মানে চটপট প্রেমিক-প্রেমিকা বেছে নেবার মতো এরকম সুলভ সুযোগ বছরে আর দুটো আসতো না। রঙিন ফ্রক আর শাড়ির দল, সামান্য স্নো-পাউডারের প্রসাধনীতে হঠাৎ করেই প্রজাপতির মতো সুন্দরী হয়ে ওঠা মেয়েরা চোখে যেন সম্মোহনের মায়াজাল বুনে দিয়ে যেতো।

অমল মহিমা লয়ে তুমি এলে- ১

ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাওয়াটাই এ জগতের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু সেই সময়ে আমরা বড্ড বেশি করে চাইতাম 'চট' করে বড়ো হয়ে যেতে। তা'হলে দাদার মতো একলা একলা সাইকেল চেপে যেখানে খুশি যেতে পারবো, বা কাউকে না-বলেই ট্রেনে চেপে কলকাতা ঘুরে আসতে পারবো, এ'সবই আর কি ! কিন্তু আজ পিছু ফিরে বুঝতে পারি যে কি সাংঘাতিক ভুল চাওয়াই না সেদিন চেয়েছিলাম। বড় হওয়া আর মেকি হওয়ার মধ্যে আদপেই যে কোনো পার্থক্য নেই, তা বোঝার ক্ষমতা সেদিনের 'সেই আমি'-র ছিলো না।

মার্জার কাব্য – ৩

image002

(প্রথম ভাগ) (দ্বিতীয় ভাগ)

বিড়াল কাহিনী – ৩

আমাদের বাগানটা ছিলো বেশ বড় – আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, কুল, নারকেল, সুপারি, লিচু, জামরুল, কলা, চালতা, ফলসা, সবেদা, বাতাবি লেবু আরো হরেকরকম ফলের গাছে ভরা ছিল জায়গাটা। ফুলের গাছও  ছিলো অনেক রকমের – হাস্নুহানা, কদম, গোলাপ, দোপাটি, কাঞ্চন, অপরাজিতা, মাধবীলতা, বোগেনভলিয়া, জবা, রঙ্গন, গন্ধরাজ……  এ ছাড়া ইউটিলিটি সব্জি, যেমন লাউ-কুমড়ো, লঙ্কা, পেঁপে, ডুমুর, পালং/পূঁই/কলমী, ওল-কচু, বেগুন, থানকুনি, ইত্যাদি তো ছিলই। এতো বড়ো বাগান ওই অঞ্চলে আর কোথাও ছিলনা। সে’জন্যে অনেক সময় সাপ-খোপ, পেঁচা, বাদুড়েরও উপদ্রব হতো। মাঝে মাঝে ‘শোড়েল’ বলে শিয়ালের মতো এক জন্তু রাতের বেলা এসে হানা দিতো। তার গায়ে থাকতো এক বিশ্রী রকমের গন্ধ, যা বহুদূর থেকে নাকে আসতো। আর তা থেকেই বুঝতে পারতাম যে বাগানে শোড়েল ঢুকেছে! তখন টর্চ, লাঠি-সোঠা নিয়ে বাগানে গিয়ে তাড়া করা হতো। বাদুড়রা অন্য কোথাও থেকে ‘বাক্স বাদাম’ নিয়ে এসে রাতের বেলা গাছের ডালে ঝুলে ঝুলে খেতো। কিন্তু বাক্স বাদামের খোলা খুলে খাওয়া সহজ কথা নয় – তাই বেশিরভাগ সময় ওরা কিছুটা চিবিয়ে বাদামটা ফেলে চলে যেতো। পরের দিন সকালে গিয়ে আমরা সেই সব বাদাম খুঁজে খুঁজে বাড়িতে নিয়ে এসে ভালো করে ধুয়ে, হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে খেতাম। খেতে আহামরি হয়তো তেমন ছিলো না, কিন্তু সেই বয়সে এই ভাবে বাদাম খোঁজার মধ্যে বেশ একটা রোমাঞ্চ লুকিয়ে থাকতো। যাই হোক সেই বাগানে মাঝেমাঝেই বাইরে থেকে একটা কুকুর এসে তার প্রাত্যহিক কৃতকর্ম করে যেতো। বাগানের চারদিকে পাঁচিল থাকলেও, ঢোকার মুখের যে গ্রীলের গেট-টা ছিলো, সেটার মধ্যে দিয়ে কুকুর অনায়াসেই গলে যেতো পারতো। ঢিল ছুঁড়ে, বা তাড়া করেও সেই কুকুরকে ভয় দেখানো যায় নি। তাছাড়া কুকুরটা ছিলো অত্যাধিক চালাক। সে যেন আগে থেকেই  জানতো যে কোথায়, কখন, বা কে তাকে লক্ষ্য করছে। read more

মার্জার কাব্য – ২

image002

(প্রথম ভাগ)

বিড়াল কাহিনী –

ছোটবেলার জীবনে অভাব-কষ্ট ছিলো, কিন্তু আনন্দের অভাব কখনোই অনুভব করিনি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক সময়েই আমাদের বাড়িতে খাবারের মেনুতে লাগাতার নিরামিষ পদ রান্না হতো। মাঝে মাঝে আমরা ছিপ দিয়ে পুকুর থেকে মাছ ধরার চেষ্টা করতাম। বেশিরভাগ সময়ে ছিপে ‘কই’, কি ছোটো ‘রুই’ মাছ ধরা পড়তো। পুকুরের সিঁড়ির ধারে একটা জবা গাছ বেড়ে উঠেছিলো, যার ডালপালা বেশ অনেকটাই বড় হয়ে ছাতার কাজ করতো। একদিন আমি এই জবা গাছের নিচে ছিপ ফেলে বসে আছি। আমার কাছাকাছি আমাদের সাদা বিড়ালটাও চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ দেখি ছিপের ফাতনাটা ডুবে ডুবে যাচ্ছে। বুঝলাম যে মাছ এসে টোপ গিলেছে। উত্তেজনার বসে ছিপ ধরে মারলাম খুব জোরে এক টান। এতো জোরে টান মেরেছি যে মাছ সমেত ছিপের দড়ি প্রায় ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে গিয়ে জড়িয়ে গেলো মাথার উপরে থাকা জবা গাছের ডালপালায়। আমার সাথে সাথে আমার পাশে বসা বিড়ালটাও মাছের এই শুন্যপথে উড়ান লক্ষ্য করেছিলো। আমরা দুজনেই তাড়াতাড়ি গাছের দিকে এগিয়ে গেলাম। মাছটা খুব একটা ছোটো ছিলো না। ডালে ঝোলা মাছের ঝটপটানি দেখে বিড়ালটা লোভে অস্থির হয়ে উঠলো। আমি তাড়াতাড়ি করে জবাগাছের ডাল থেকে মাছ আর ছিপের দড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে বাড়িতে চলে এলাম মা’কে দেখাতে যে এই মাছটাকে ছেড়ে দেবো কি না। বঁড়শীর বাঁকানো মুখ থেকে মাছের ঠোঁট ছাড়াতে বেশ বেগ পেতে হলো – কারণ মাছটা টোপটা বেশ ভালো করেই গিলেছিলো। মা বললো যে আর মাছ ধরতে হবে না, ওটাতেই সে-রাতের রান্না হয়ে যাবে। সুতরাং আমি ছিপ গুছিয়ে রেখে দিলাম। এর বেশ কিছু পরে কি একটা কাজে আমি আবার পুকুরের দিকে গেলাম। অবাক হয়ে দেখলাম আমাদের বিড়ালটা তখনও সেই একই ভাবে জবা গাছের ডালের দিকে ঘাড় উঁচু করে, এক দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে!! আমি যে অনেক আগেই মাছটাকে নিয়ে চলে গেছি সেটা সে বুঝতেও পারেনি, বা বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। সে তখনও ভেবে চলেছে যে মাছটা জবা গাছের কোনো ডালপাতার আড়ালে লুকিয়ে ঝুলছে, আর কোনো এক সময়ে ঝুপ করে নিচে পড়ে যাবে! তখন তিনি সেটাকে ধরে খাবেন !! read more

মার্জার কাব্য

ছেলেবেলার দিনগুলো একটু নয়, এখনকার থেকে বেশ অনেকটাই অন্যরকমের ছিলো। সে সময় না ছিলো কোনো আই-ফোন/আই-প্যাড, না ছিলো কোনো ভিডিও গেমস বা স্যাটেলাইট চ্যানেলের-র দৌরাত্ম্য। কিন্তু তাতে মনে হয় না যে কোনো কিছু মিস্ করেছি। আমাদেরকে ঘিরে থাকতো একরাশ নি:স্বার্থপর মানুষের দল – যাঁরা কোনো কিছুর প্রত্যাশা না করেই আমাদের ছেলেবেলার প্রতিটি দিনকে ভরিয়ে তুলতেন হাসি-ঠাট্টা-খেলা-গল্প-গান-আনন্দ দিয়ে। আর ছিলো অসাধারন সুন্দর রাশি রাশি গল্পের বই – রূপকথা, পক্ষীরাজ, ভুত-প্রেত, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, ঠাকুরমার ঝুলি, চাঁদমামা, সন্দেশ, আনন্দমেলা, শুকতারা, আরব্য রজনী. . . . দিগন্ত জোড়া মাঠ-গাছ-পালা, চোখ জুড়ানো শীতের নীলকাশ, শরতের আকাশে মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা, কাশফুলের ভারে পথ হারিয়ে যাওয়া, কার্তিক মাসের হিমেল হাওয়ায় চাদর গায়ে বসে আচার খেতে খেতে গল্পের বই পড়া, হেমন্তের বিকেলে সূর্য্যের ঝুপ্ করে হঠাৎ ডুবে যাওয়া, বসন্ত-বিকেলের ঝিরঝিরে বাতাসে মন হারিয়ে যাওয়া, বর্ষার ঘনঘটায় আকাশ কালো করে বৃষ্টির উদ্দাম নাচন, কালবৈশাখীর দাপট উপেক্ষা করে কাঁচা আম কুড়ানো, ভরা-বর্ষায় কলাগাছের বানানো ভেলায় চড়ে পুকুরে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো, সুপারি গাছের শুকনো খোলা-কে ‘Go-Cart’ বানিয়ে খেলা, চেনা রাস্তা ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে সম্পূর্ণ অচেনা অঞ্চলে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যাওয়া – আরও কত্তো কি! read more

জীবনের প্রথম প্যারাবোলা

কিছুদিন আগে এক টিম লাঞ্চে কথা হচ্ছিলো কার কী ফেভারিট জিওমেট্রিক শেপ তাই নিয়ে। ফেভারিট শেপ দিয়ে নাকি মানুষের পার্সোনালিটি গেস করা যায়। বেশিরভাগই বলছিলো ‘স্কোয়ার’, ‘সার্কেল’, ‘রেক্টাঙ্গল’ বা ‘ট্রায়াঙ্গল’, কে একজন বললো ‘স্কুইগেল’। আমাকে জিজ্ঞাসা করতেই আমি ইনস্ট্যান্টলি জবাব দিলাম ‘প্যারাবোলা’ – সবাই কিছুটা হকচকিয়ে গেলো। কারণটা কী জানতে চাইলে যুতসই কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না। বেসিক্যালি আমার অবচেতন মনই এই উত্তরটা সাজেস্ট করেছে। কিন্তু সেটাকে সাপোর্ট করার মতো সাফিসিয়েন্ট যুক্তি তার কাছে সঙ্গে সঙ্গে আশা করা যায় না। তাই কায়দা করে বললাম নেক্সট কোনো একদিন কারণটা বলবো। সবাই ভাবলো না-জানি কী গূঢ় কারণ সেটা! সারাটা দিন নানান ব্যস্ততায় কেটে গেলো – মিটিংয়ের পর মিটিং। কিন্তু মাথার ভিতর ঘুণপোকার ঘ্যানঘ্যানানির মতো রয়েই গেল প্রশ্নটা। সত্যি তো, এতো কিছু শেপ থাকতে হঠাৎ ‘প্যারাবোলা’ বলতে গেলাম কেন? রাতে ঘুম আসতে ইদানিং আমার এমনিই সময় বেশি লাগে, সেই রাতে ঘুম এলো অনেক পরে। ভোরের দিকে ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নের একগাদা অসংলগ্ন, খন্ড খন্ড ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে বোধহয় জানতে পারলাম সেই আসল কারণটা ছিলো কী। read more