কোলাজ কোলকাতা (১)

অটো
বর্ননাঃ
তিনটে চাকা, হ্যান্ডেলে ঝোলানো খুচরোর ব্যাগ আর চাকরি না পাওয়া ছোট দেওরের মত বাই ডিফল্ট কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় আর একখানা লম্বা-পনা হ্যাণ্ডেল ছাড়া যে যানের আর সমস্ত কিছু অদ্ভুত রকমের অনিশ্চিত তাকে অটো বলে। কিন্তু সেই বেকার যুবকটিকে যেরকম বাড়ির বাইরের কেউ অপমান করলে বৌদি ভয়ংকর রকম চটে যান সেরকম ভাবেই এই হ্যান্ডলের ওপর পা রাখা যায়না। মানে দরকার পড়লে মালাইচাকিটা পাশের গাড়িকে দিয়ে দিতে পারেন কিন্তু ওটার ওপর একেবারেই নয়।
প্রত্যেক সাধারণ মানুষের জীবনেই এমন একটা চায়ের দোকান ছিল বা আছে যেখানকার চা-টা কিনে খেতে হয় শুধুমাত্র সেখানে আড্ডা মারতে দেয় বলে। অটোও হল সেইরকম। তাই, জ্বালা, যন্ত্রণা, ব্যথা, লাইন, ভয়, অপমান এই সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা অটো ভালোবাসি। একই জায়গায় যাওয়ার সময় বাস আর অটো দুটোর অপশন থাকলে আমরা অটোটাই বেছে নেই। অটো ছাড়া কলকাতা হল খোসা ছাড়া বাদামের মত।

স্ট্যান্ড আর রুট:
যে জিনিস দুটো সল্টলেকের অটোর থাকেনা তাদের স্ট্যান্ড আর রুট বলা হয়। এক স্ট্যান্ড থেকে আরেক স্ট্যান্ডের মধ্যবর্তী রাস্তা কে বলা হয় রুট। বেশির ভাগ স্ট্যান্ডের আশে পাশেই একটা বাজার বা স্টেশন থাকে। দেখবেন কলকাতা যখন খটখটে শুকনো, পিচ ফিচ ফেটে গেছে, মানুষ একটু আর্দ্রতার জন্য মায় মানত অবধি করে ফেলেছে, তখনও বাজার আর স্টেশন নিকটবর্তী এলাকায় কাদা থাকে। এই কাদা কেন এবং কিভাবে সেটা কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু থাকে, থাকবেই, তা লাইনেও এসে পড়ে।
এবার ধরুন আপনি আধঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর লাইনের একদম সামনে চলে এলেন। এবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে। দু-তিনটে অটো এসে ঠিক আপনার সামনে দাঁড়াবে। তারপর চালক ভাই তার থেকে নেমে খুচরোর ব্যাগটা সঙ্গে করে নিয়ে কোথাও একটা চলে যাবেন। কেন যাবেনা জিজ্ঞেস করার যে মানেই নেই সেটা এতদিনে সকলে বুঝে গেছেন।
আরেক রকম হয়। আর এটা ঠিক তখনই হবে যখন আপনার সবচাইতে বেশি তাড়া থাকবে। মানে ধরুন প্রেমিকা অপেক্ষা করছে, বা বোতল। আপনি স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখলেন লাইন নেই। অটোতে উঠে পড়লেন, আরও দুজন জুটে গেলো, অথচ অটো ছাড়ছেনা। কারণ আর একজন জুটছেনা। ওই একজন যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ শুধুই অপেক্ষা। আপনার, প্রেমিকার, গেলাসের।
সবচাইতে বেশি অগ্রাধিকার পান যারা ওই একা আছেন তারা। “একজন” ডাক শুনে তারা লাইনের একদম শেষ থেকে হাত তুলে লুফে নেন বাকিদের ঈর্ষা। সামনে বসে রাজার মত এগিয়ে যান নিজের গন্তব্যে।

চালক:
এই একজন হলেন অটোর দেশের বেতাজ বাদশা। এনার মুড ভালো থাকলে আপনাকে ১০০ টাকাও ভাঙ্গিয়ে দেবে আর খারাপ থাকলে ৮ টাকাও খুচরোতে চাইবে। অটোতে উঠেই নিজের ভাড়াটা খুচরোতে দিয়ে দিলে মনে হয় চালক ভাইয়ের থেকে আপন আর কেউ হয়না।
এনাদের ভেতরেও নানা রকম প্রভেদ আছে। যাদের বয়স অল্প, তারা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে অটোটাকে সাজিয়ে তোলেন। লাল নীল আলো আর অসম্ভব জোরে উব-উব-উব-উব বেসনাদে মাতিয়ে রাখেন। বাস, ট্রাম, লরি কিচ্ছুর তোয়াক্কা করেননা। যে করে হোক অলে গলে যাবে। আর স্পিড! কে বলবে অটো!
বাকিরা হলেন বর্ষীয়ান। এনারা “যাবেন?” জিজ্ঞেস করলে জাস্ট মাথা নেড়ে উত্তর দেন। রাস্তায় বেয়াড়া ট্যাক্সি, দাঁড়িয়ে থাকা বাইক, এখনও ঠিক করে বসতে না শেখা প্যাসেঞ্জার সব্বাইকে ট্রাফিক আইন আর সহবৎ শিখিয়ে দিতে পারেন সেরকম দরকার হলে। এনাদের পুরো ব্যাপারটাই অসাধারণ। ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তা, বর্তমান পলিটিক্স সেই সঙ্গে খেলা সমস্ত কিছু নিয়ে কথা বলতে পারেন মনের মত প্যাসেঞ্জার পেলে।

প্যাসেঞ্জার:
অটো হল পৃথিবীর একমাত্র যান যেখানে সামনে চারজন পেছনে তিনজন বসেন। প্যাসেঞ্জার মানে আমাদের একটা প্যাটার্ন আছে। কেউ কেউ “আমি সামনে নামব” বলে যেন তেন প্রকারেণ ধারের সিট দখল করি। আবার সেই আমরাই যে করে হোক বৃষ্টির সময় মাঝে বসি। কারণ ধারে বসলে যে ধারে বসব জামার সেই ধার চপচপে হবেই। কেউ আটকাতে পারবেনা। কেউ না। বৃষ্টি না থাকলে রডে জমে থাকা জল চুইয়ে চুইয়ে এসে নিঃশব্দে ভিজিয়ে দেবে। কেউ কেউ, এই প্রবণতা সাধান-রত বাড়ন্ত বাচ্চাদের দেখা যায়, তারা পেছন পুরো ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও সামনে গিয়ে বসে।
আবার আমদের অনেক সময় এই ভেবে বিরক্ত লাগে যে পাশের লোকটা কেন বুঝতে পারছেনা অটোটা আমার বাপের সম্পত্তি। আমি একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রিলাক্সিয়ে বসব তা না। সেই শালা সরুন সরুন। আর না সরলে থাই কনুই দিয়ে জায়গা করে নেবে। ইকিরে! সে নয় আমরা একই ভাড়া দেব, একই জায়গায় যাব। তাই বলে আমার অন্যে ও একটু কষ্ট করতে পারবেনা? আমি একটু খুশি হতে পারি তাহলে।

উপসংহার:
খুশি থেকে মনে পড়লো। জীবনে প্রথমবার প্রেম হাত ধরেছিল অটোতে ওঠবার সময়ই। নাহ, ভুল লিখিনি। ধরেছিলাম নয় ওটা ধরেছিলই হবে। নাহলে আমি যা ক্যাবলা হয়তো ওই অটোতে উঠতেই পারতাম না। আবার লাইনে দাঁড়াতে হতো আর দেখে নিতে হতো বুকপকেটে খুচরো পাথর আছে কি নেই। তারপর হাত তুলত হত, যখন শুনতে পেতাম “একজন” !!

প্লুটোর ইন্টারভিউ

রিপোর্টারঃ নিজেকে কি বলবেন?

প্লুটোঃ কি আবার বলব? আপনাদের সুপারিইগো সম্বলিত জীবন। পোচ্চুর ক্ষ্যামতা। গোটা মহাবিশ্বের তুলনায় .000000000000000000১ ভাগের কয়েক হাজার ভাগ সাইজ হও্য়া সত্ত্বের দারুন দারুন গ্ল্যামারাসলি ঠিক করে দিচ্ছেন কে গ্রহ আর কে খনা মা। আপনাদের আমি কি বলব, আপনারাই বলুন।

রিঃ আহা আপনি খামোকাই রাগ…

প্লুটোঃ খামোকা? ধরুন আপনাকে আজ বলা হলো তুই মানুষ তারপর বলা হলো না তুই প্ল্যাটিপাস তারপর আবার বলা হলো না অনেক ভেবে দেখলাম তুই মানুষ। যা ভজহরি মান্নায় খেয়ে আয়। আপনার কেমন লাগবে?

রিঃ না মানে দেখুন…

প্লূটোঃ দেখছি তো বহুদিন ধরেই বাবা। ছোট তকমা সেঁটে দিতে পারলে তোমরা আর কিচ্ছু চাওনা। পাঁঠা বলি দেখলে নার্ভ ফেল হয়ে যায় ইদিকে অকারনে পিঁপড়ে মারো। কেন? কারন সে ছোট। পাঁঠা ডাকে, সে ডাকেনা। তোমার কুকর্ম তোমার চোখের সামনে তুলে ধরবার ক্ষমতা কেউ তাকে দেয়নি।

রিঃ আপনি তো কিছু শুন…

প্লুটোঃ এতদিন শুনিয়েও শখ মেটেনি? শোনান শোনান

রিঃ ছোট বিষয়ে…
প্লুটোঃ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কারোর নিকৃষ্টতা বোঝানোর জন্যে আপনি কোনোদিন তাকে ছোটোলোক সম্বধন করেন নি? ছোটদের কতটা পাত্তা দেন আপনারা ছুনুমুনুগুলূপুচো করা ছাড়া? যা বাজে তাই ছোট, যা খারাপ তাই ছোট। আপনি যে আপনি হয়েই জন্মাবেন সেটা যখন ডিসাইড হলো তখন আপনার সাইজ কত ছিলো বলুন তো?

রিঃ আপনি তো লিটারেল মিনিং এ চলে যাচ্ছেন

প্লুটোঃ যাহ বাবা আপনারা করবেন আর আমি গেলেই দোষ? খারাপ বোঝাতে ছোট শব্দের ব্যাবহার কেন হবে? কেন? যা কিছু ভালো তাই কেন বড় দিয়ে ডিনোট করা হবে? আছে এর কোনো উত্ত্র আপনার কাছে?

রিঃ তাই হয়ে আসছে কিনা…

প্লুটোঃ সেতো এককালে ন-বছরের মেয়েরও বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত, সেটা হয়ে এলে ক্যামন লাগত? হয়ে আসা মানেই ভালো? চেঞ্জের দরকার নেই?

রিঃ নিশ্চয়ই আছে কিন্তু আপনি তো বিষয় থেকে সরে যাচ্ছেন।

প্লুটোঃ একটুও সরছিনা। আসলে আপনাদের বড় হওয়ার লোভ এতটাই বেশি যে ঠিক বেঠিকের জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ভাবেন যা বড় তাই ভালো। তার কথা শোনেন বেশি তার জন্যে ভাবেন বেশি। গোটা বছরের শুধুমাত্র ছোটদের জন্যে কটা সিনেমা তৈরী হয়? ইদিকে বলবেন আজকালকার বাচ্চা খুব পাকা। আরি ওদের চারপাশে তো সবসময় দেখচে সব্বাই বড় হতে চাইছে। আর ওরা চাইলেই দোষ।

রিঃ আপনি কি চান?

প্লুটোঃ আমার চাওয়া না চাওয়াতে কি এসে যায় ভাই? আমি তো ছোট। আমি সিনেমার কমিক রিলিফ, কলেজের বারোয়ারী মশকরা। আমি হাইহিলের পায়ে পড়ে মেট্রোর হাতল ধরবার চেষ্টা আর তাই দেখে নল্বা বড়সড় দের জুত করে হাতল বাগানোর উদ্দেশ্য। আমি কি বললাম তাতে আর।

রিঃ এইতো এবার তো সুযোগ পাচ্ছেন, এবার বলুন নিজের কথা?

প্লুটোঃ হ্যাঁ উদ্ধার করে দিচ্ছে একদম সুযোগ দিয়ে। আসলে আপনারা তাকাতে শিখেছেন অন্য ভাবে। আকাশ ধরতে গিয়ে বিকেলে তাতে রঙের খেলা আপনাদের কাছে মাঠে মারা যায়। বড় অবশ্যই ভালো তবে ছোট মানেই যে খারাপ না, অসহায় না এ আপনাদের ধারণার বাইরে। বড় কিছু দেখে আপনারা তার মত হয়ে গিয়ে দেখতেই পাননা কতগুলো ছোট আসলে বাঁধা আচে একসাথে।

রিঃ আপনার কথা মত তাহলে পিঁপড়ে মারা আর মানুষ মারা সেম ক্রাইম তাই তো?

প্লূটোঃ আলবাত তাই। অকারণে যে কোনো কিছুকেই হত্যা করা তা সে পিঁপড়ে হোক কি মানূষ।

রিঃ তার মানে কারণ থাকলে মারাই যায়?

প্লুটোঃ দেখেছেন, এই হলো আপনাদের সবচাইতে বড় শক্তি। যেটা বলা হলোনা সেটাকেই টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে যুক্তি খাড়া করবার অযৌক্তিক ইতরশ্রেষ্ঠ উপায়। না বেকার আপনার সময় নষ্ট করে লাভ নেই। হ্যাঁ পৃথিবীতে ছবি যাওয়ায় আমি ক্যাতাত্ত বোধ করছি। আশা রাখছি আগামী কয়েকশ বছরের মধ্যে আপনারা এটাকেও পিকনিক স্পট বানিয়ে ফেলবেন, অনেক শুভেচ্ছা, রসোগোল্লা খেতে খুউব ভালোবাসি, ইত্যাদি, প্রিতী ও শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন নমস্কার।

রিঃ এইভাবে এড়িয়ে গেলেন

প্লুটোঃ আমি যে ছোটলোক ভাই। আমার চারটে বেসিক নিড ফুলফিল হয়নি তার সুপারিগো সফিস্টিকেটেড নয়, আসি।

আমরা যারা বাইশের/তেইশের ওপারে আর উনত্রিশ/ত্রিশের এপারে

আমদের প্রজন্মটাকে সময় বস্তুটা চিরকালই হাঃ মুগ্ধ করে রেখেছে। একমাত্র ফুচকাওয়ালার হাত ধোওয়ার সাবান বাদ দিয়ে এমন কোনো জিনিস নেই যা আমরা দেখিনি (সোলজার কিন্তু হিট করেছিলো ফলে ওই প্রসঙ্গ আনা গেলোনা)। সেই জন্ম থেকে শুরু করে বর্তমানে পাড়ায় নির্ভয়ে সিগারেট খাওয়া/ মায়েরটা ছেড়ে নিজের জন্য শাড়ি কেনা অথবা দুটোই একসাথে অবধি। সারাটাক্ষন যেন এক অদৃশ্য হাত রোজনামচার চলতিতে ধরিয়ে দিচ্ছে অবাক হওয়ার ইস্তেহার। আর সে এমনই আদেখলা হওয়ার নিমন্ত্রন যাকে মুঁড়িয়ে ফেলে দেওয়ার যান্ত্রিকতা আমাদের ছিলনা, নেই, হবেও না।

আর হবেই বা কি করে। হরলিক্স তো এই হালে বলছে শিশুর আসলি মানসিক বিকাশ হয় ছানা-পোনা বেলায়। আর আমাদের কি শিখিয়েছে, এমনি এমনি খাও। আর গণ্ডগোলটা এখনেই। মুকেশ খান্না দেখিয়েছিলেন বীরদর্পে সত্যের পথে এগোনো মানেই চকমকে লাল, আঙ্গুল তুলে ফাকফাকফাকফাকফাক। চিন সরকার আর চ্যাপেল তো এই সেদিন বলল আসল মানেটা। জুরাসিক পার্কের ডাইনোর সাথে লড়ে গেছি প্রায় অনায়াসে তাই এখনও খুচরো না থাকলেও অটোতে ওঠার সাহস দেখাইনা। আমাদের ছুটি ছুটি তে লালকমল-নীলকমল আর ত্রিডিতে ডেথলী হ্যালোস, দুটোই “আরিব্বাসিয়”আমোদ দেয়।

সুযোগ পেয়েছি আলিশার গানে মিলিন্দ সুমান আর ঐশর্য রাই, দুজনকেই নাচতে দেখার। সাথে নেচেছে আসমুদ্র ডাল লেক যখন লাইভ পর্দায় শচীন দুশো করেছে আর দাদা জামা উড়িয়ে ঝামা ঘষে এসেছে উন্নাসিকতার মামাবাড়িতে। আমরা ভিসিআরে “বাজিগর” দেখেছি, “এই বেশ ভালো আছি” থেকে পেন্সিলের সাহায্যে টেপ-রের্কডারটাকে বারবার নীলাঞ্জনা মুখর করেছি, তিরিশ টাকায় দেড়শো গানের লক্ষ লক্ষ চাকতি জমিয়েছি, আর এখন, ক্লিকাই।

সাদা-কালো সুপারহিট মুকাবলার তালে তাল রেখে প্লাজমার অ্যান্ড্রয়েডিয় উত্থানে হবিট সুলভ প্রযুক্তির বির্বতন উইটনেস করাটা আমাদের হ্যাবিটে দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা কন্ট্রা হয়ে একপেশে দৌড়েছি এখন দৌড়ে দৌড়ে ভারচুয়াল কবাডি খেলি। আমরা চন্দ্রকান্তার জন্য রোববার সকাল নটায় উঠেছি আর এখন সেটার সিড পেলেই নামিয়ে ফেলার তালে আছি। আমরা আরেকটা রিভার্স এভিলিউশনেরও সাক্ষী। ফোন কে গাবদা থেকে ছোট্ট হয়ে আবার গাবদা হতে দেখছি। ওয়াকম্যান টা পকেটে ঢুকত না বলে বেল্টে ঢুকিয়েছি আর এখন হেডফোনটা ব্যাগে ঢোকেনা বলে গলায় ঝোলাই।

কিন্তু এখন প্রশ্ন আসতেই পারে যে এসব তো যারা উনত্রিশ/ত্রিশের ওপারে তারাও প্রত্যক্ষ করেছে। তবে আমরা আলাদা হলুম কই? অব্যশ্যই আলাদা! কারণ যে বয়সে যে বিষয়টা সবথেকে বেশী কৌতুহলাক্রান্ত করে আমরা ঠিক সেই বয়সে সেই বিষয় গুলোর একেবারে আনকোরা বিস্ফোরনের সামনে পড়ে গেসলাম। আঁচড়ের দাগগুলো তাই বড়ই আদরের। আমরা যখন সদ্য টিভি চালাতে পারি তখন সিন্দাবাদ তিমি আর তালিব মালিকা হামিরার সাথে সাথে লড়ছে। যখন বন্ধু ব্যাপারটা কলার তুলব তুলব করছে তখন ফারহান আখতার লঞ্ছ করলেন। গেঁড়েপাকা স্টেজ়টায়, বাড়ির লোক কেবল কাকুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফ্যাশন টিভি কেটে দিতে বলছে। যখন রিকশোতে বিনুনি দেখে রেসিং সাইকেলের স্পীড আপনা থেকে কমে যাচ্ছে ।অল্পবয়েশি স্যারের সামনে বিয়ে শুনে কান্না পাচ্ছে ঠিক তখনই শাহরুখ খান অমিতাভ বচ্চনের মুখের ওপর তেড়ে বেহালা বাজিয়ে দিলো।

যখন চে-গ্যেভারার টি-শার্ট খুঁজছি কমদামে তখন মোমবাতি মিছিল পেলো একের পর এক যতার্থতা। যখন যেটা তখন সেটার এরকম হাতে গরম একেবারে পাত পেড়ে খেয়েছি বলেই “ভালো তবে আমাদের সময় বেশী ভালোছিলো”-র ঢং থাকবেই। কিন্তু কয়েকটা জিনিসের ক্ষেত্রে সেটা সত্যিও! উদাহরন- কার্টুন নেটওয়ার্ক, ডব্লু ডব্লু এফ, জীবনমুখি, দেখ ভাই দেখের মত সিরিয়াল, শারদীয় আননন্দমেলা, দু-ছক্কা-পাঁচ, নিজস্ব ডাইরী আরও কত কি! পরিবর্তন ব্যাপারটে ধাতে সয়ে গেছে আমাদের। সে নন্দীগ্রামের মর্মান্তিক ঘটনাই হোক বা এস আর এফ টি আই তে দেবকর্ম প্রদর্শন।

আমদের কনফিউজড জেনারশন হিসেবে খ্যাতি আছে। দোষটা আমাদের না। আসলে আমাদের করন জোহর এই বলছে শিল্পী সে-ই যে বন্ধু, পরিবার, পড়শী, কলেজ প্রিন্সিপাল, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি সকলকে সম্মান করে ইদিকে নিজেই আবার খিস্তিটাকে নিয়ে যাচ্ছেন শিল্পের পর্যায়। বেলাকে এই অঞ্জন দও তো এই রক্তচোষার প্রেমে পড়তে দেখছি। জি কে বলছে ঠিক, সংসদ ও বলছে ঠিক আর দু-জনেরই আলাদা আলাদা প্রমান আছে। আমরা বাইককে বাইকারের তলায়, আর ক্যামেরাকে যার তার গলায় চলে যাওয়ার সব কটা স্টেজ একে একে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বাবা সাইগেলের গান দেখলে বকুনি খেতে হতো এখন ন্যাপি পরা আদোআদো “তাল বোতোল বোদকাহ” গেয়ে আদর খায়। ফলে কনফিউশনটাই স্বাভাবিক।

আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই মোদের তুলনা মোরাই। আমারা প্রেম কে ভাই আর সঞ্জয় দত্তকে মুন্নাভাই হতে দেখেছি। টি টোয়েন্টি, আইপিএল, অপমান করে স্মার্ট হওয়ার ক্ষমতা, এল ও এল, এ এস এ পি, টি কে সি আর, ইংরাজি শব্দের পাসে “ইয়ে” বসিয়ে সেটাকে ট্রান্সলেটিয়ে সময় বাঁচানো ইত্যাদির প্রভৃতির আবিষ্কারটা ঠিক যখন আমাদের সব থেকে দরকার ছিলো তখন-ই হয়েছে। আমরা কলকে মিল কল, এসএমএস কে হাইক, আর দরকার কে হোয়াটসআপ হতে দেখেছি।

আর তাই মোদের তুলনা মোরাই। আমরা আর যাই হইনা কেন বুড়ো-বুড়ি কোনোদিনও হবেনা। কারন বয়স কেবলমাত্র একটা নম্বর। আর এখন গ্রেডের যুগ। তাই বাকি আর সমস্ত কিছুর মতই সেটাও আমাদের বুকপকেটে জায়গা করে নেবে। আমরা বারবার ঠকতে পারি, তবে ঠকাবো না। কারন আমরা সাবানের বুদবুদ বানাতাম, কিনতাম না। নতুনত্বকে ওপেন চ্যালেঞ্জ। পারলে চমকে দেখা। উল্লাস।

ফ্যাশন টিভি

সে এক উত্তাল সময়। আবিষ্কারের সময়। কৈশর পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে যৌবনকে ধরবার, কিন্তু সে তখনও বিভিন্ন যোজনার মত যোজন বছর দূরে। সবাই নাকি দেখেছে, সবাই নাকি জানে “কি করে হয়”। আতিপাতি খোঁজ চলছে। ইলেভেনের দিদিদের কিছুতেই দিদি বলতে মন চাইছে না। নতুন ম্যাডাম ক্লাসে এলে বসন্ত বিলাপ। এরকম এক টালমাটাল মুহুর্তে দেবদূতের মত হাজির সে। বোতাম টিপলেই সমস্ত গোপন স্বপ্ন বিড়াল হাঁটছে তো হাঁটছেই। বাবা মায়েরা চাইল্ড লক করেও আটকাতে পারছেননা অজানা কে আবিষ্কার করবার অদম্য ইচ্ছে। হাতে রিমোট নিয়ে বাড়ির সব চাইতে রিমোট এরিয়াতে চলছে না দেখা পৃথিবী যাপন।

আমরা এক ম্যাড়ম্যাড়ে সময়ে জন্মেছি। বলবার মত কোন উত্তেজনাই পাইনি। না উডস্টক না নকশাল, কোন বই ব্যান করা নেই। তাই বড়দের ব্যাপারে কৌতুহল ছিলো অপরিসীম। কিন্তু যোগান বলতে সেই টাইটানিকের “ছবি আঁকার সিন টা”-ই ছিলো সম্বল। কিন্তু এ মাধ্যম হয়ে উঠলো একেবারে আপনার, নিজস্ব রাজধানী। যেখানে কিচ্ছু যাপসা নয়। একেবারে চকচকে ঝকঝকে। এই চ্যানেল আমাদের আর কিছু শেখাক না শেখাক একটা জিনিস শিখিয়েছে। উচ্চারন।

যেহেতু মিউট করে দেখতে হয় তাই আমারা জানতাম এর মালিকের নাম মাইকেল আদাম। ক্লাসের সব থেকে ইফরমেটিভ ছেলেটা খোঁজ আনলো “ও হলো মাইকের জ্যাকসনের ভাই”। আমরা কেউ আপত্তি করিনি। কারন এর আগে ও খবর এনেছিলো বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল আসলে একটা “হেব্বি বিসাল” জন্তুর নাম। ওর চামড়া দিয়ে “জারোয়ারা” এক ধরনের পোষাক বানায় যার নাম বারমুডা। সেখান থেকে আমাদের বারমুডার নাম এসেছে। তারপর ও আবার নাসায় ঘুরতে গেস্লো যেটা ক্লাসে সব্বাইকে বলেনি তাই ওর দেওয়া তথ্য অস্বিকার করবার হিম্মত আমাদের কারোর ছিলোনা।

ওই একদিন এসে বলল – গন্ধ পাচ্ছিস? বাবা কিনে দিয়েছে, “চ্যানেল”(Chanel) এর সেন্ট। তারপর সত্যি বলছি সারাদিন যেন একটা দারুন মিঠে গন্ধ পেলাম। ওর ইজ্জত আরও খানিকটা বেড়ে গেলো। সব্বার মনে একটাই প্রশ্ন “লিঙ্গারী”(Lingerie) টা ঠিক কখন কখন দেখায়? “হিউট কাউন্টার”(Haute Couture) দেখে আরেক বন্ধুর অমর উক্তি “হাইডি কুলুম (Heidi Klum) যেন কেন এসব করে?” এছাড়া “ডলিস আর গাবানা”(Dolce ans Gabbana) “জরেজিয়োহ আমানি”(Giorgio Armani)(কে একজন বলেছলো ওদের “আর” টা উচ্চারন করতে নেই) এসব তো আছেই।

চ্যানেলটা ফাস্ট বেঞ্চ লাস্ট বেঞ্চের ভেদাভেদটা মুছে দিয়েছিলো। যে ছেলেটা জীবনে কোনদিন ইংরিজীতে পাশ করতে পারেনি সেও জানতো “মিডনাইট হট” কখন হয়। তাকে একবার টিচার জিজ্ঞেস করলো – “বল শি ইজ ফলিং মানে কি?” সে বলল “মেয়েটা হলো হেমন্ত”। বেশীরভাগ দিনই কেউ ছলছল চোখে এসে জানান দিত বাবা ধরে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সব্বার একবাক্য প্রশ্ন- “কি চলছিলো?”। কেউ যদি উত্ত্র দিতো “ক্যালেন্ডার” তার দুঃখে আমরাই ধরে রাখতে পারতাম না চোখের জল।

ভুগোল স্যারের থেকেও ভালো পৃথিবী চিনিয়েছিলো এই চ্যানেল। মিলান, প্যারিস, মায়ামী হয়ে গেছিলো ঘরের উঠোন। “মডেলার”-রা (যারা মডেল হয় তারা মডেলার) যখন কেকের ওপর আগুন জ্বালিয়ে আমোদ করত আমারাও তখন তাদের খুশিতে পাগল হয়ে যেতাম। এক বন্ধু সেই দেখে কালী পূজোর দিন ফুলঝুরী জ্বালিয়ে জমাট বাঁধা খিঁচুড়ির ওপর লাগাতে গিয়ে বেকুব বনে গেলো। সেই ইনফরমেটিভ আবার বলল “ওগুলোর নাম ফুড ফায়ার। পুরোটা জ্বলে গেলে কাঠিটা চুষে চুষে খেতে হয়। ওর বিশাল দাম। পার্ক স্ট্রীটে পাওয়া যায়, আমি খেয়েছি”

দাম তো অবশ্যিই ছিলো। সেই অফুরান বোকামী গুলোর। বোকা বাক্সে আলাদীনের আশ্চর্য হীরেটা পেয়ে যাওয়ার দিন গুলোর। কেবলওয়ালাকে মারব বলে প্ল্যান করবার (চ্যানেলটা বন্ধ হয়ে গেলো বলে)। তারও দাম এখন অল্প, ফ্যাশন টিভিরও। চ্যানেলটাকে আর এখন কেউ পাত্তা দেয়না, চাইল্ড লক করেনা। দামী রেঁস্তোরা এখন সপরিবারে উপোভোগ করে ফ্যাব্রিকের কারুকাজ, মুখশ্রির উল্কি। আমরা যৌবন পেয়েছি আর চ্যানেলটা…নাহ তার যৌবন এখনও বেঁচে আছে, আমাদের কৈশরে, আমাদের বড় হওয়ার দিনগুলোতে, “লিঙ্গিরিতে”, “মৌলিন রুগের”(Moulin Rouge) নাচে। দাপটে বেঁচে আছে সে। থাকবেও। আমরন কাল, মিউট হয়ে রাতের অন্ধকারে।

আশ্চর্য প্রেমিক

Hasikhushi Snape
প্রোফেসর সেভেরাস স্নেইপ

একটা লোক বেঁচে থাকতে সব্বার স্বার্থেই স্বেচ্ছায় সব্বার সামনে নিজেকে ঘেন্নার চোখে দেখতে অভস্ত্য করে তুলেছিলো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক সব্বার স্বার্থে যেচে মুখ বুজে তার জীবনের সবথেকে দামী জিনিসটাকে যে কেড়ে নিয়েছে তারই খিদমতগার হয়ে থাকতো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যাকে কোনোদিন কেউ ভালোবাসার চোখে দেখেনি কিন্তু সে তাদের হয়েই লড়তে গিয়ে মর্মান্তিক ভাবে মরলো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যে বাধ্য হলো নিজের সবচাইতে প্রিয় মানুষটাকে নিজের হাতে মেরে ফেলতে। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যে নিজেকে যেচে সব্বার কাছে সন্দেহের পাত্র করে রেখেছিলো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যে বিশ্বাস করতে ও করাতে চাইতো সে পাথর। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যার মত সাহসী সেই দুনিয়ায় আর হাতে গুনে দুটো ছিলো, সেই লোকটাই কখনও বলতেই পারলোনা ভালোবাসি। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

শুধু একজোড়া চোখের ওপর ভরসা করে, শুধু কৈশরের কয়েকটা মুহুর্ত সম্বল করে, শুধু একটা আশায়, একটা বিশ্বাসে, একটা ভালোলাগায়…লোকটা ভালোবাসতো।

আশা করা যাচ্ছে আজ জেমন্স পটার বেরসিকের মত ব্যাবহার করবেন না….

প্রোফেসর সেভেরাস স্নেইপ, এক আশ্চর্য প্রেমিকের গল্প


বৃটিশ কিংবদন্তী অ্যালান রিকম্যান চলে গেলেন ৬৯ বছর বয়সে – ক্যান্সারের সঙ্গে লড়তে না পেরে। আমি লন্ডনে থিয়েটার দেখিনি – দেখেছি শুধু প্রোফেসর স্নেইপ কে। সেই মানুষটাকে নিয়ে কিছু কথা যে না বললেই নয়।


যার ঢিশুম করতে মুখোশ লাগেনি

12544216_1168034413224209_774650714_o

সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়তাম। মা আগের দিন একটা লাল গামছা কিনে এনেছিলো। গোড়া থেকেই তক্কে তক্কে ছিলাম। পরের দিন ইস্কুল কোনো কারনে ছুটি। বেশ জুত করে সেখানা কেটে কুটে পাগড়ি বানালাম একপিস। কাগজ কেটে গোঁফ। সারাদিন চাচা চৌধুরী হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। এমন আবেগে ভেসে গেলাম যে ভুলেই গেলাম মায়ের অফিস থেকে আসাবার সময় হয়ে গ্যাছে। মা, ফিরলো, দেখলো ছেলে সদ্য কেনা গামছা ফর্দাফাই করে, তারই লাল হাতকাটা কার্ডিগান খানা গায়ে জড়িয়ে কাল্পনিক রাকাকে কাল্পনিক সাবু দিয়ে পেটাচ্ছে। যে কটা কারনের জন্য আমার মা পৃথিবীর সবচাইতে মিষ্টি প্রানী তার একটা হলো মা সেইদিন শুধু হেসেছিলো। একফোঁটাও বকেনি মারেনি। কমিক্স নামের সেই আশ্চর্য ডানা জুড়ে স্পীচ বাবল আর থট বাবলে উড়ে বেড়াতে শেখাও মার হাত ধরেই। সেই টালমাটাল সময়েই এক জন্মদিনের দিন হাতে এলো একটা কমিক্সকা বাপ (তখন গ্রাফিক বলে কোনো শব্দ আছে কিনা তাই জানিনা, তায় আবার নভেল)। নর্থ শহরতলিতে বসেই মনে প্রাণে আন্তর্জাতিক হওয়ার হাস্যকর আপ্রান চেষ্টার ওই শুরু।
তখন ডায়ামন্ড কমিসকের দাম ছিলো দশটাকায় একটা, আর নণ্টে ফন্টে হাঁদা-ভোঁদাদের সাত টাকা। আরও একট ছিলো চার-টাকা দামের হাতের তালু সাইজের হি-ম্যান। সবচাইতে দামি ছিলো অরন্যদেব, পঁচিশ টাকা। এক একটা কমিক্স ছিলো কিডনিসম। সত্যি বলছি, এখন প্রাক্তন বিষয়টা নিয়ে যতটা সেনসিটিভ তখন কমিক্স নিয়ে তার চাইতেও বেশি ছিলাম। ফলে লোহিত সাগরের হাঙ্গর-এর পিছনে নব্বুই লেখা দেখে মনে ক্যামন একটা ভক্তিভাব চলে এসেছিলো আপনা থেকেই। তারপর কিনা আবার ওত্ত বড়! ওতোগুলো পাতা! একটাই গল্প! সব মিলিয়ে একটা আশ্চর্য ব্যাপার! চমকে এক্কাকার। গল্পটা পড়েছিলাম প্রায় একদমে। তারপর প্রায় বিলিয়ান টাইমস পড়েছি। একদমে। এর আগে চাচা চৌধুরী হরেদরে এগ্রহ সেগ্রহ করেছে, ফ্ল্যাশগর্ডন তো ছেড়েই দিলাম, তাছাড়া অরন্যদেব, হি-ম্যান সব্বাই হেলায় হারিয়েছে শত্রুদের। কিন্তু এই গল্পের হীরো দেখলাম ঘুঁষি খায়, মাথায় চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, পড়ে যায়, ফেঁসে যায়। কোনো স্পেশাল পাওয়ার নেই। অসম্বব বুদ্ধি আছে এমনটাও না। কেউ যে খুব বিশেষ পাত্তা দেয় তাও না। তার মধ্যে রোগা পাতলা চেহারা। কিন্তু শেষমেশ জিত তারই হয়। এই বিষয়গুলো একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেললো। আমায় ছোট থেকেই বাড়িতে শেখানো হয়েছে তুই কিন্তু ব্যাটা গরীব এবং ইন্টালিজেন্ট আর আমি তদ্দিনে বুঝে গেছি আমি বেশ সবার মত। ফলে টিনটিন হয়ে উঠলো আরাধ্য দেবতা। ছাপোষা ইন্টালিজেন্সির জয়। দরকার শুধু সাহস আর মনের জোর।

কারন ব্যাটা ঠিক সেই সেই কাজগুলোই করত যেগুলো কর সম্ভব। কঠিন কিন্তু সম্ভব। তিব্বত মোটেই ইটারনিয়া নয়, তা সত্যিই আছে, আর ইয়েতি তো আছেই। টিনটিন যেভাবে পৃথিবী চিনিয়েছে তার তুলনা কেবলমাত্র একজনই, নিউটন নামক বিড়ালের মালিক এক প্রোফেসর। টিনটিন সবচাইতে অবাক করেছিলো ওই কারনেই। টিনটিন অবাস্তব কাজ করেনা, কঠিন কাজ করে। আর গল্প? এ বলে আমায় পড় ও বলে আমায়। জীবনের মুল লক্ষ্যই হয়ে উঠলো পয়সা জমাও টিনটিন কেনো। যথারীতি ওত টাকা ওই সময়ে কোনোদিন জমেনি। ফলে চেয়েচিন্তে ধার করে পড়া ছাড়া উপায় রইলো না। বইগুলোর গুলোর ব্যাক কভারটায় লিস্টি করে দেওয়া থাকতো সবকটা বইয়েরর নাম। সেই দেখে দেখে মেলানো শুরু। কোনটা বাকি রয়ে গ্যালো। টিনটিন রিয়্যাল। সম্মানটা আশ্চর্য বাড়লো যখন বুঝতে পারলাম টিনটিন নীল আর্মস্ট্রং এর আগে চাঁদে গ্যাছে। উরেব্বাস!! ফ্রান্সিস বেকনের কল্পবিজ্ঞান থেকেই রয়্যাল সোসাইটি হয়েছে না? হার্জ গুপ্ত বিজ্ঞানী না হয়ে যায়না। এই নিয়ে ইস্কুলে তর্ক মারামারি ওবদি পৌঁছোলো। যথারীতি অসম্ভব মার খেলাম। প্রথমে বন্ধুর কাছে, তারপর আমি আর সেই বন্ধু টিচারের কাছে। কারন টিচার জিজ্ঞেস করেছিলো মারামারি করেছিস ক্যানো? আমি উত্তরে বলেছিলাম শুধু মারা হয়েছে মারিনি। কারন টিনটিনও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেয়। তারপরেও মারাই হলো।

কালের নিয়মে পেছনে কার্বাইড পড়লো। টিনটিনকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। বিপ্লবিদের দঙ্গলের ওই ছবি দুটো মনে আছে? সেই যে টিনটিনদের প্লেন যখন প্রথম বার নামছে তখনও না খেতে পাওয়াদের রাস্তার ধারের বসতির সামনে সেনা টহল দিচ্ছে আর যখন টিনটিন আর ক্যাপ্টেন তাদের বন্ধু আলকাজারকে প্রেসিডেন্ট করে ফিরে যাচ্ছে তখনও না খেতে পাওয়াদের রাস্তার ধারের বাড়ির সামনে সেনা টহল দিচ্ছে। তাছাড়া ওটোকারের রাজদন্ডের টুইস্ট, বা ফ্লাইট ৭১৪ এ সত্যি বলার ইঞ্জেকশনে ক্যারিদাস আর রাস্টাপপুলাসের কান্না? প্রতিবার, সে কাঁকড়া রহস্য হোক বা লাল বোম্বেটের জাহাজ বা চাঁদে টিনটিন, অত্যাধিক নেশার ফল যে কি হতে পারে সেটা অত মজারু ভাবে একবারে আর কেউ বোঝাতে পারেনি। এছাড়াও আরও কত কত কত। বিতর্কও যে হয়নি এমনটা নয়। বেশিরভাগ সময়ই এশিয়ানদের খল হাস্যকর চরিত্র করা হয়েছে বলে কথা উঠছে। প্রোফেসর ক্যালকুলাসের বধিরত্ব নিয়ে মজা করা হচ্ছে বলে কথা উঠেছে। এমনকি আমার সঙ্গে এক বন্ধুর এই মর্মে তর্ক হয় যে লোহিত সাগরের হাঙ্গর গল্পে আফ্রিকার গরীব মুসলমানদের এত অবোধ দ্যাখানো হলো ক্যানো? আমি যদিও ক্রীতদাস প্রথাকে অসম্ভব গালাগাল করে লড়ে গেছি। আর লড়ব না ক্যানো? টিনটিন তো অসম্ভব রকম বাঙ্গালী, তার চার পাশের সমস্ত মানুষগুলোই তাই। তার জন্যে অবশ্যই দায়ি আরেকজন মানুষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

একবার ইংরিজিতে পড়বার চেষ্টা করেছিলাম টিনটিন। অসহ্য লেগেছে। একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। কারন বাংলা এমন একটা ভাষা যেটা বলবার ধরন এমনকি পাড়া বিশেষেও বদলে যায়। এলাকার কথা তো ছেড়েই দিলাম। যেমন “দারুন ভালো” বিষয়টা গড়িয়ার দিকটায় “ফাটিয়ে”, লেকটাউনের দিকটায় “সেরা”, কফিহাউসের দিকে “লেভেল”, দমদমের দিকে “গোলা” ইত্যাদি। টিনটিনের বাংলাটাও একটা আলাদা ধরন। শব্দচয়ন একদম গোলা। একেবারে নিজস্ব। যেমন – “ক্ষির! নিশ্চয়ই ওপরে একটু চিনি ছড়িয়ে”, “ওটা খাসনা কুট্টুস, ওটা খেলে মানুষের মত নচ্ছ্বার হয়ে যাবি”, “বাহ, দিব্যি মানিয়েছে”, “চাঁদে যাচ্ছি বলেই কি হ্যা হ্যা করে হাসতে হবে নাকি?”, “এই তোমায় বেঁধে ফেললাম এবার একটা কুমির এসে তোমায় খেয়ে ফেলবে” ইত্যাদি। প্ল্যাটিপাস যে আসলে একটা প্রানীর নাম, এটা কোনো গালাগাল নয় সেতো জানলাম এই সেদিন। একটারও কোনো কম্পিটিটর পাওয়া যাবেনা। কেবল মিলানের কোকিলকন্ঠি বিয়াংকা কাস্তাফিওরের গানগুলোর যা লিরিক সেটারই একমাত্র কম্পিটিটর আছে। উনি যদি গান “আমি এক ছোট্ট মেয়ে, ভীষন ছোট্ট আমি/চোখের তারা নীলচে আমার চুলগুলো বাদামী” তবে তার উত্তর হলো “তুতু তু তুতু তারা/ খাবি খাতা দিল হামারা” গায়ক, কেল্টু দা।

টিনটিন চিনিয়েছে পৃথিবী। টিনটিন চিনিয়েছে যুদ্ধ। টিনটিন সেই কবে তেলের পাইপ উড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল ধান্দাবাজদের মুন্ডুপাত করে গ্যাছে। নেশার চোরা কারবারিদের ধরছে। আমেরিকান গ্যাংস্টারদের জেলে ঢুকিয়ে ন্যাসকার ভূমিকে শান্ত করে তবে ফিরেছে। শুধু একটা স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে নিজের বন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে গ্যাছে নিজের প্রানের মায়া না করে। চাঁদ আর সমুদ্রের তলদেশের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। একটা ছেঁড়া খবরের কাগজের ওপর ভরসা করে বাঁচিয়েছে নিজের আর নিজের বন্ধুদের প্রান কিন্তু এত কিছু শুধুমাত্র উনিশ বছরের ভেতরেই। বয়সা বাড়েনি। কারন টিনটিনের বয়স বাড়েনা। টিন্টিনিয়ানদেরও বয়স বাড়েনা। আজও একটা মলাটের ওপর চোখ পড়লেই চারপাশ হয়ে যায়….ঠিক যেমটা হতে চাই তেমন…সাহসী, বুদ্ধিমান, চিরতরুন, যে ভালোবাসতে জানে।

বুড়ো খোকার জন্মদিন সপ্তাহে অনেক শুভেচ্ছা..