পয়লা বৈশাখ

কথায় বলে অন্ধের কি বা দিন, কি বা রাত। আমরা যারা লক্ষীসাধনায় মগ্ন হয়ে হত্যে দিয়ে বাইরে পরে আছি, আমাদের একই অবস্থা প্রায়। কবে পয়লা বোশেখ, কবে পঁচিশে, এক্সেল শীট, প্রজেক্ট ডেডলাইন আর কেপিআইয়ের চক্করে সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যায়। একটা নিয়মে নিজেকে বাঁধতে বাঁধতে কবে যে নিয়ম-দাস হয়ে গেছি, টের ও পাইনি। মাস পয়লার মোটা মাইনে আর দিনান্তে স্কচের অমোঘ টানে নিজেকে কবেই যেন আস্তে আস্তে হারাতে শুরু করেছিলাম। আমার মধ্যের আমিটা সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বারবার পালাতে চেয়েছে, আর তাকে আটকে রেখেছে বাইরের আমি। তাই পয়লা বৈশাখের নতুন জামা, আর পঁচিশের দিন শেষের কবিতা হাতে নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়ার বিলাসিতা চিন্তার বাইরে আর বেরোতে পারেনি।

কাল রাতেও অফিস থেকে ফিরেছি এগারোটার পর। কোনোরকমে কিছু একটা রেঁধে খেয়ে আবার ল্যাপটপ নিয়ে দাসত্বের রোজনামচা লিখতে বসেছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেও জানিনা। ঘুম ভাঙল যখন একফালি নরম রোদ জানলা বেয়ে মুখ ছুঁয়ে গেলো। অভ্যেস মতোই হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। দেখলাম হোয়াটস্যাপে বাবার একটা মেসেজ। “শুভ নববর্ষ।” ভদ্রলোকের এই ব্যাপারে কোন ভুল হয়না। প্রতি বছর প্রথম মেসেজটা বাবাই পাঠায়। অন্যান্য বছর আমি রিপ্লাই করে ছেড়ে দি, কিন্তু এ বছর মেসেজটা পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। রিপ্লাই করে সিগারেটটা শেষ করে বিছানা ছেড়ে নামলাম, কিন্তু অন্যদিনের মতো বাথরুমের দিকে না গিয়ে বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা অন করলাম। কোন প্রাইভেট চ্যানেল না, সোজা ডিডি বাংলা। দেখলাম প্রভাতী অনুষ্ঠান তখনো চলছে। কফি বানিয়ে সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিলাম। কতক্ষণ অনুষ্ঠান দেখেছি, মনে নেই। হুঁশ ফিরল ফোনের আওয়াজে। যা ভেবেছিলাম তাই; অফিসের ফোন। রিংটোনটা অফ করে দিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে দিলাম পাশের চেয়ারে। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজেকে একবার দেখলাম। তিন মাসের না কামানো দাড়িটা একটু বেশি পাকা লাগছে। চোখের নিচে হাল্কা কালিও যেন পড়েছে মনে হচ্ছে। না:, এভাবে নিজেকে দেখে মোটেও ভালো লাগলো না। কেবিনেট খুলে রেজারটা বার করে দাড়িটা কামিয়েই ফেললাম।

স্নান করে বেরিয়ে আলমারি খুলে নতুন একটা পাঞ্জাবি বার করলাম। গত পুজোয় কিনেছিলাম, পরে ওঠা হয়নি। সবই নিউটনের থার্ড ল আর কি! আজকের জন্যেই হয়তো তোলা ছিল। বসার ঘরে এসে ফোনটা দেখলাম। সাতাশটা কল, সবই অফিসের। জুনিয়র একটি ছেলেকে মেসেজ করে বলে দিলাম আজ এসব না। বলে ফোনটা বন্ধ করে অন্য নাম্বারটা চালু করলাম। এবার বাজার যাবো, খাসির মাংস কিনতে। দুপুরে জমিয়ে রান্না, তারপর একটা ভালো সিনেমা দেখে লম্বা একটা ঘুম দেব। আজ পয়লা বৈশাখ, আজ আমি সব নিয়ম ভেঙে নিজের মতো করে থাকবো। কি বললেন, অফিস? না, আমাকে ছাড়া একদিন ওরা ঠিক থাকতে পারবে। প্রথম আলোর চরণধ্বনি একটু অন্যভাবেই না হয় আজ বাজলো।

সিনেমার কুইজ – ৫

আমরা আবার চলে এসেছি সিনেমার কুইজ নিয়ে।

প্রথমে উত্তরের পালা।

চতুর্থ সপ্তাহের ধাঁধার সূত্র লুকিয়ে আছে একটা সূক্ষ্ম অংশে ।

হিন্দি ছবি যাকে অন্যতম সেরা whodunit বলা হয়ে থাকে , আবার সেই ছবি ফ্লপ করলে পরে পরিচালকের পরবর্তী প্রচেষ্টা হিট এবং তার জন্যে এক অভিনেতার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড  – এই মর্মে পরিচালকের নাম বেড়িয়ে আসে বিধু বিনোদ চোপড়া । তার প্রথম ছবি যেটা ফ্লপ করে : খামোশ ,তার পরের ছবি : পারিন্দা যার জন্যে ন্যাশনাল  অ্যাওয়ার্ড পান নানা পাটেকার।

এর থেকে বেরিয়ে আসে –

ঠ – খামোশ

ট – বিধু বিনোদ চোপড়া

গ – নানা পাটেকার

দ – পারিন্দা

খামোশ ছবিটিতে প্রধান অভিনেতাদের মধ্যে পরিচালনা করেছে অমল পালেকার এবং তার যেই ছবিতে নানা পাটেকার কাজ করেন তা হল – থোরাসি রুমানি হো যায়।

সেই ভাবে আমরা পাই –

ক – অমল পালেকার

খ – থোরাসি রুমানি হো যায়

এবার বাকি অংশে আসি – ঘ হল অমল পালেকারের আরেকটা ছবি যাতে চ প্রধান অভিনেতা  যিনি নানা পাটেকারের সাথে ছবি করেছেন।এই কম্বিনেশনে আমরা যদি চ কে ধরি শাহরুখ খান তাহলে ছ: রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান যাতে নানা পাটেকার অভিনয়ে করেছেন এবং ঘ : পহেলি । জ হল  রাজু বন গয়া জেন্টলম্যানের পরিচালক আজিজ মির্জা এবং ঝ : সাইদ মির্জা , যিনি বিধু বিনোদ কে খামোশ ছবিতে সহায়তা করেন।

এইভাবে আমরা বাকি অংশ থেকে পাই ঃ

চ – শাহরুখ খান

ছ – রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান

ঘ – পহেলি

জ – আজিজ মির্জা

ঝ – সাইদ মির্জা 

এবার চলে আসি এই সপ্তাহে।

একটু পুরনো দিনের কথায় আসি।

আজ যে সিনেমাটি নিয়ে আমাদের প্রশ্ন,তার পরিচালক ছিলেন আর্কেওলজিকাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার কর্মচারী।
একদিনে দুবার একটি ফ্রেঞ্চ সিনেমা দেখে ওনার সিনেমা জগতে প্রবেশ এবং এই সিনেমাটি করার ইচ্ছা।
সিনেমাটি প্রদর্শন করার আগে ছিল এক বিশাল নভেলটি প্রোগ্রাম যেখানে প্রদর্শন হয়েছিল ‘টিপ টপ’ কমিকসের কিছু শট ।

বলুন ত আমরা কোন সিনেমা নিয়ে কথা বলছি?

 

উত্তর আগামী সংখ্যায় ।

পড়তে থাকুন ও কলকাতা

বদলা নয়, বদল চাই

poribesh diboshসারাদিন অফিস ঠেলে বাড়ি ফিরছি। সায়েন্স সিটির সামনে বিস্তর জ্যাম। বাতাসে একরাশ ধুলো, মাথার ওপর ফ্লাইওভার – বিরক্তি এড়াতে এফ এম। অবশ্য আজকাল রেডিও বিরক্তি কমায় না বাড়ায় সেটা ঠিক বোঝা যায় না – তাও জ্যাম, ঘাম আর সারাদিনের ক্লেদ ভুলতে চারানার গান আর বারো-আনার এডভার্টাইজমেন্ট নিয়ে ঐ এক এফএমই সম্বল। এমন সময় এই রেডিওই মিনে করাল জুন পাঁচ তারিখ বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

পরিবেশ দিবসে আমার কিচ্ছু করার নেই। কারণ বছরে একদিন গাছ লাগিয়ে আর বাকি ৩৬৪ দিন গাছ শুকিয়ে পরিবেশের সেবা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যা বারোটা বাজার তা বেজে গেছে। এই পরিবেশ দিবস পালন করে কিছু শুধরোবে সে আশা যে নিতান্তই গুড়ে বালি। এসব আর দশটা লোকের মত আমারও মজ্জায় গেঁথে গেছে। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল – বাধ সাদল একটা ভিডিও।

হ্যাঁ – একটা ভিডিওই। কোনও এক বন্ধু শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। নিউজিল্যান্ডের ডেয়ারি ফার্মের ঘটনা। কিভাবে দুধের প্রোডাকশন বাড়ানর জন্য বাছুর হওয়ামাত্র তাদের আলাদা করে দেওয়া হয় – আর শুধু তাই নয় সেই বাচ্ছাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কসাইখানায়। খুব ধাক্কা খেলাম একটা। পড়তে শুরু করলাম কিছু হেলথ রিপোর্ট। যে সব তথ্য উঠে এল তা মর্মান্তিক বললে কম বলা হয়।

এক এক করে দেখে নেওয়া যাক অবস্থাটা কতটা খারাপ। গরুর সাথে মানুষের সবচেয়ে বড় মিল এই যে একটি বাছুরও তার মায়ের গর্ভে প্রায় ন’মাস সময় কাটায়। এখন দুধের প্রয়োজনে গাইগুলিকে বছরে একবার করে বাধ্যতামূলক ফোর্সড প্রেগন্যান্সি করান হয় এবং হরমোন ট্রিটমেন্ট করে মাতৃত্ব যে পরিমাণ দুধ উৎপন্ন করতে পারে তার প্রায় দশ-বারো গুন দুধ তৈরী করান হয়। এই অবস্থায় চার-পাঁচ বছরের বেশী দুধ দেওয়ার ক্ষমতা গাইদের থাকে না। তখন তাদের ঠাঁই হয় কষাইখানায়। এবারে আসি তাদের সন্তানের কথায়। পুরুষ হলে তাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জন্মের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই – নিলামের জন্য। কয়েক মাসে মধ্যে তাদের গন্তব্যও হয় কষাইখানায়। স্ত্রী হলেও তাদের সরিয়ে নেওয়া হয় আর অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্য ভালোদের মধ্যে কয়েকজনকে দুধের জন্য রেখে বাকীদের ও বিক্রিই করে দেওয়া হয়। যারা জন্মের পর ঠিক করে উঠে দাঁড়াতে পারে না, তাদের বলা হয় ‘ট্র‍্যাশ’।

স্ট্যাটিস্টিকস বলছে বছরে এরকম একুশ কোটি বাছুর মেরে ফেলা হয়। প্রায় ৯৭% বাছুরই জন্মের কয়েক ঘন্টার মধ্যে হারায় তাদের মাকে। নিউজিল্যান্ড হোক বা আমেরিকা ছবিটা একই রকমের। পরিবেশ দিবস শুনে অন্য কিছু ভাবতে পারলাম না। এমনিওটিক ফ্লুইডের আস্তরণ কাটিয়ে না উঠতে পারা একটি বাছুর তার মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আর আমরা নৃশংসভাবে তাকে তাড়িয়ে তুলছি ভ্যানে। কখনও তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলছি। শুধু রক্তে ভাসাচ্ছি না, পরিবেশের নিয়ম, মাতৃত্বের নিয়ম ভাঙছি শুধু লোভে। আশার কথা এটাই যে অনেক শহরে আস্তে আস্তে বাছুরের মাংস ব্যান করা হচ্ছে। সরকারি নিয়মে এই বাছুরদের চালান করার ক্রেট বে-আইনি করা হয়েছে। পরিবর্তন হবেই কিনা বলা যাচ্ছে না – তবু প্রথম ধাপ তো বটেই।

পরিবেশ দিবসে আমাদের পাঠকদের অনুরোধ করব ব্র‍্যান্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে, যা ইউরোপ আমেরিকায় শুরু হয়েছে এইসব ডেয়ারি ফার্মের বিরুদ্ধে – ছোট হলেও এই চূড়ান্ত অমানবিকতাকে চ্যালেঞ্জ করছেন কনসিউমাররা, যেটা খুব জরুরী ছিল। বেঁচে থাকার অধিকার কারও কম নয়। তাই বছরে একটা দিন নয়, পরিবেশকে বাঁচানর দায়িত্ব হোক চিরন্তন। ভালো থাকুন সব্বাই।

পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশ – একটি বিপদ সংকেত

টিয়ার নগর জীবনআজ ৫ই জুন – বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মহা সমারোহে। প্রথম যখন এই তারিখটার সাথে পরিচয় ঘটে তখন জোর কদমে পরীক্ষা প্রস্তুতি।তাই দিনটির গভিরতা না মেপেই মুখস্ত করেছি। পরে যত দিন পার হয়েছে বুঝেছি ৫ই জুন শুধু মাত্র একটি দিন নয় এটি একটি ভাবনা, প্রয়াস আগামী প্রজন্মকে এক বাসযোগ্য ভূমি দিয়ে যাবার। লড়াই নিজেকে বাঁচানোর। লড়াই প্রকৃতিকে প্রাত্যহিক ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করার। আসলে লড়াইটা আমাদের নিজের সাথে নিজেদেরই। বিলাস বহুল জীবন আর স্বচ্ছন্দের বস্তুটি কাছে পেতে মরিয়া আমরা। সেই লোভী মনটাকে সংযত করতে ঠিক যেমন স্বাধীনতার চেতনাকে জাগাতে হয়েছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা। ঠিক তেমনি আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে পরিবেশ দূষণের প্রভাবে কলুষিত পৃথিবীকে বাঁচাতে এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের প্রয়োজনীয়তা। রাষ্ট্রপুঞ্জ, ১৯৭২ সাল থেকে মানব পরিবেশ সম্পর্কিত সন্মেলনের মাধ্যমে শুরু করে এই লড়াই। যাতে বর্ণ, ধর্ম, জাত পাত ভুলে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসে বিশ্বের মানুষ। ১৯৭৪ সালের ৫ই জুন থেকে প্রতিটি দেশের একটি শহর আয়োজকের ভূমিকায় একটি নির্দিষ্ট থিমের উপর ভিত্তি করে পালন করে আসছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। উদ্দেশ্য মানুষকে একত্রিত করে পরিবেশ ভাবনা ও সচেতনতাকে জাগিয়ে তোলা। পরিবেশ পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাওয়া পরিবেশের সমস্যাগুলির সমাধান বের করা। ১৯৭৪ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্পোকেনে ‘একই পৃথিবী’ থিমের ওপর প্রথম এই দিনটি পালিত হওয়া শুরু হয়। ২০১১ সালে ভারতের রাজধানী শহর নয়াদিল্লীতে আয়োজিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস, থিম – ‘বন ও বন সম্পদের সংরক্ষণ’। এ বছর (২০১৬) দক্ষিন আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলা শহরে ‘বন্যপ্রাণী নিয়ে চলা বিশ্বব্যাপী অবৈধ ব্যাবসা অবিলম্বে বন্ধ করা’ থিমের ওপর এই দিনটির পালন হচ্ছে। পাশাপাশি সারা বিশ্বের মানুষ এই আন্তর্জাতিক দিবসটি পালন করতে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু শুধু একদিন এই দিন পালন করলে হবেনা সারা বছর ধরে চালিয়ে যেতে হবে এই প্রচার, স্কুল কলেজ থেকে অফিস বা পাড়ার ঠেক সর্বত্র। পরিবেশ দূষণের প্রভাবে বদলে যাওয়া পরিবেশ ও সেই পরিবেশে নিজেদের স্বভাবের পরিবর্তনে বাধ্য হওয়া জীবগুলি সম্পর্কে প্রয়োজন গভীর গবেষণার। ব্যাক্তিগত ভাবে পরিবেশ পরিবর্তনের কিছু টুকরো তথ্য পরিবেষণের চেষ্টা করলাম। আসুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে সার্থক করে তুলি এই সব জীবদের রক্ষার মধ্যে দিয়ে।

বাসা তৈরির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে পায়রা নিজের বাসায়সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘বাংলাদেশ’ কবিতার গ্রাম বাংলার সাথে আজকের বাংলার বিস্তর ফারাক। কথাগুলো আজ বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। গ্রাম বাংলায় আজ সচরাচর চাতকের দেখা মেলে না, বাবুইও যেন ভুলে গেছে বাসা বাঁধতে। ছোটো বড় পুকুর গুলো ভরাট হয়ে সেখানে গজিয়ে উঠছে বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ী, সুউচ্চ ইমারত কিংবা শপিংমল, তাইতো পাড়ার ছেলেরা আর ‘জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটেনা’। আজ আর কোন ‘গফুর’ই তার প্রিয় ‘মহেশের’ মৃত্যুতে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করেনা। আমাদের মধ্যে থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে আবেগ, আর আমরা প্রত্যেকেই পরিনত হচ্ছি এক একটি যন্ত্রমানবে। যন্ত্রের প্রতি আমাদের এই ভালবাসা আমাদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে দূরে, যন্ত্রদানবদের সাম্রাজ্যে। যেখানে ‘হীরক রাজার’ মতো কোন দুষ্টু রাজার পোষা বিজ্ঞানী তার ‘মগজ ধোলাইয়ের’ যন্ত্রে আমাদের মস্তিস্ক থেকে মুছে ফেলছে প্রেম, প্রীতি আর ভালবাসার আবেগকে। প্রকৃতিকে আমরা মা বলে সম্বোধিত করি আর তাই মায়ের কাছ থেকে চেয়েনি যখন যা প্রয়োজন। সে চাওয়ার অন্ত নেই, আর সেও হাসি মুখে সব আবদার মেনে উজাড় করে দেয় নিজের সবটুকু। এই পাওয়ার নেশায় আমরা চাই আরও বেশী বেশী, যা লোভেরই নামান্তর। মানুষের চাহিদা পূরণের সামর্থ্য প্রকৃতির থাকলেও, কারো লোভ মেটানোর ক্ষমতা বোধকরি স্বয়ং বিধাতা পুরুষেরও নেই। তাই ধরিত্রী আজ নিঃস্ব। সব শেষ হয়ে আসার আগে আমরা চাইছি অন্য কোথাও অন্য কোনো গ্রহে পালিয়ে যেতে স্বার্থপরের মতো। তাইতো গ্রাম বাংলার রাঙামাটিতে হাঁটার বদলে মঙ্গলের লালমাটিতে পা ফেলার স্বপ্ন দেখছি জেগে-ঘুমিয়ে। কিন্তু সেখানে কি বাবুই বাসা বোনে, না মধ্য রাত্রিতে ভোর হল ভেবে বাড়ীর পাশের কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে থাকা কোকিলটা উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে ? হয়তো এদের কোন বিকল্প জীব আছে আমাদের অভ্যর্থনা করতে! পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন জীবজন্তুর মধ্যে বেশ কিছু স্বভাবগত ও আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর যারা এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না তারা হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ থেকে। উদ্ভিদ থেকে প্রাণী সবাই সমান ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই ধ্বংসাত্মক পরিবেশ পরিবর্তনের প্রভাবে। অন্যান্য জীবদের থেকে পাখি আমাদের অত্যন্ত কাছের। অনেক চেনা অচেনা পাখি আমাদের নিত্য সঙ্গী। ভোর বেলা মুরগীর ঘুম ভাঙ্গানো ডাক থেকে শুরু করে গভীর রাতের অন্ধকারকে চিরে ফেলা কোন নিশাচর পাখির অ্যার্লাম কল আমাদের নিশি-দিন যাপনের সাথী। তাই পাখি নিয়ে আলোচিত হল এখানে। যদিও পরিবেশের অন্যান্য জীবগুলিও সমান ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন বিভিন্ন গবেষণায় ধরা পড়েছে।

পায়রার সাময়িক বাসস্থান জীবন চলমান তাই সে জানেনা থেমে থাকার মানে, সাথে সাথে পরিবর্তনশীলও বটে। তাইতো এদের অনেকেই নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে শহুরে জীবনের সাথে কনক্রিটের ঘরে সংসার পেতে। ছোটো ছোটো গ্রাম গুলি আজ দ্রুত রুপান্তরিত হচ্ছে আধুনিক সুবিধা যুক্ত মাল্টিসিটিতে যেন রুপকথার সেই ‘রুপান্তরম রস’ এর প্রভাবে। তাই আজ গ্রামের পুকুরের ধারে তাল-খেজুরের সারি দেখা যায়না, দেখা যায়না শীতের প্রাক্কালে নতুন গুড়ের জন্য নতুন হাঁড়ি লাগানো সারবদ্ধ খেজুর গাছের দলকেও। এই আদিম সংস্কৃতি আজ ঢাকা পরে গেছে আধুনিক মেশিনের ভারে। আধুনিক যন্ত্র সম্বলিত বিশাল বিশাল কারখানায় প্রস্তুত হচ্ছে মৌচাক থেকে ভাঙা খাটি মধুর বিকল্প। রেশম কীট চাষের স্থান আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আধুনিক পলি-ইস্টার বা সুইস্- কটনের রমরমা বাজার। আজ থেকে প্রায় বেশ কিছু বছর আগের কথা, স্কুল থেকে ফিরে জানলার রডটায় হাত রেখে দাঁড়াতেই দেখা মিলত একদল শুকুনের পরিবারের। বাড়ীর উল্টোদিকে পাঁচ-ছটা তাল গাছে বাস ছিল ওদের। সারা দেশ থেকে এক যোগে সব শুকুন উধাও হয়ে গেলো নিমিষের মধ্যে, আমাদের চাহিদা পূরণের তাগিদে। আমার বাড়ীতেও ছোটো থেকে দেখে এসেছি প্রায় ৫০-৬০ টি পায়রার দলকে বাস করতে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারাও যেন পরিবর্তন করে নিচ্ছে নিজেদের বাসস্থান আমাদের পরিবর্তনের সাথে সাথে। এখনো তাদের দেখা মেলে তবে আবাসিক হিসাবে নয় বরং অথিতি আবাসিক হিসাবে মাঝে মধ্যে। একসময় আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যাওয়া চড়ুই পাখি আবার ফিরে এসেছে আগের ছন্দে বিভিন্ন ধরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গুলির সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তবে এরাও বাসস্থানের অভ্যাস বদলেছে, আগে মাটির ঘরের খড়ের চালে বা মাটির ‘কোঠা’ বাড়ীর টিনের চালার ফাঁকে এরা বাসা করে থাকতো। কিন্তু এখন সেসব জায়গায় পরিবর্তে এদের পুরনো পাইপের ফাঁকে, পাকা বাড়ীর ঘুলগুলিতে, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে, মিটার বক্সে অথবা টিউব লাইট বা হোল্ডারের গায়ে বাসা করে থাকতে হয়। সেখানেও অবশ্য এদের বাসস্থানের জন্য পাল্লা দিয়ে সংঘর্ষ করতে হয় পায়রার, ঘুঘু এবং শালিকের মতো পাখিদের সাথে। বাবুই পাখির সৌন্দর্য তার আকর্ষণের মূল কারণ নয় তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ তার বাসার জন্য। বর্ষার সময় সময় প্রায় দিন ছাদ থেকে দেখতাম বাবুই পাখির দুটি বা তিনটি দল খেজুর গাছের পাতা থেকে সুন্দর ভাবে সরু সুতোর মতো পাতা কেটে উড়ে যাচ্ছে আর সামনের তাল গাছের ডাল গুলোতে বাসা বুনছে। কী সুন্দর তাদের বাসার গঠন কী সুন্দর আর সাবলীল তাদের কারীগরি, যেন এদের কাছে হার মানে যেকোনো কোট-টাই পরা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের দলও। কিন্তু তাদের বাসা এখন খালি, এরাও যেন পালিয়েছে কোথাও। বুলবুলি আর ধান খায়না, সেও অভ্যস্ত হয়েছে বাঁশপাতির মতো পতঙ্গ ধরে খেতে। আকাশের উড়ন্ত কালো চিলের দল আজ নিজেদের মাছ ধরতে পটু করে তুলেছে, খাবারের অসুবিধা কে মেটাতে। মাংসের দোকানে কাছা কাছি তাই আজকাল এদের বেশ ভালো সংখ্যায় দেখা যায়। শহরাঞ্চলে এদের সংখ্যা এখন অন্যান্য পাখিদের থেকে বেশী।

মৌটুসি পাখির গাছের বদলে ঘরের গ্রিলে বাসাবিভিন্ন স্থানে নগরায়ন ও রাস্তা সম্প্রসারণের মতো বড় বড় প্রকল্প গুলি বাস্তবায়িত করার জন্য কেটে ফেলতে হচ্ছে রাস্তার ধারের অগণিত প্রাচীন মহীরুহদের অথবা ভরাট করা হচ্ছে পুরনো জলাশয় এবং পুকুর গুলিকে। একমাত্র সরকারী তকমা প্রাপ্ত রামসার সাইট বা ইম্পরট্যান্ট বার্ডিং জোন গুলি ছাড়া প্রায় সব জলাশয় ভরাট হয়ে তার জায়গায় দ্রুত গজিয়ে উঠছে বড় বড় মাল্টিপ্লেক্স। দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো শক্ত করতে শিল্পানয়নের জোয়ার। যা বর্তমান পরিস্থিতি সাপেক্ষে আবশ্যিক ভাবে প্রয়োজন কিন্তু এখানে দরকার পদ্ধতিগত সংশোধনের। বন্ধ হওয়া কারখানা না খুলে তার পাশে গড়ে উঠছে নতুন সব কারখানা (উদাহরণ হিসাবে বলা যায় দুর্গাপুর শহরের প্রান্তে এবং অন্ডাল ও রানীগঞ্জের মাঝে NH-2 এর ওপর রাস্তার ধারে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা স্পঞ্জ আয়রনের কারখানাগুলি, যার অধিকাংশ আজ বন্ধ)। একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ব কোলকাতার জলাভূমি ভরাটের জন্য প্রায় ১০৯ টি প্রজাতির পাখির দেখা মিলছেনা ঐ সব অঞ্চলে, পরিযায়ী পাখিরাও ঐ সব অঞ্চলে আর সময় মত আসছেনা, আসলেও তাদের সংখ্যা আশানুরূপ নয়। এছাড়াও বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত জোকা, রাজারহাট জলাভূমির মতো গুরুত্ব পূর্ণ বার্ডিং সাইট। দুর্গাপুর ব্যারেজ, চিত্তরঞ্জনের কার্নেল সিং পার্ক, ডানকুনি ওয়েটল্যান্ড, সাঁতরাগাছি ঝিল, লালবাঁধ, সাহেববাঁধ, নয়াবাঁধ ও বৈদ্যবাটি ক্যানালের মতো পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা গুলি আজ নিরাপদ নয়। সেখানও ভয় রয়েছে নগরায়নের প্রভাবের পাশাপাশি গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো ‘পচার’ বা চোরা শিকারির।

চড়ুইয়ের বাসা রক্ষাপূর্ব কোলকাতার মতো একইরকম ঘটনার সাক্ষী দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অম্বুজা জলাভূমিতে, সেখানেও পাখির সংখ্যা কমছে দিন দিন। সাম্প্রতিক ১৮ই মে চালু হওয়া অন্ডালের কাজী নজরুল ইসলাম বিমান বন্দর ও বিমান নগরীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আগে ১১০ টির বেশি প্রজাতির পাখির দেখা মিলত বছরের বিভিন্ন সময়ে কিন্তু সেখান থেকেও পাখির সংখ্যা কমছে। সাথে সাথে এইসব অঞ্চলে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন ও খাদ্যের অভাবের জন্য এখান থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন গাছ গুলি কেটে ফেলার জন্য অনেক পাখি তাদের প্রাকৃতিক আবাস হারাচ্ছে। এখন আর আগের মতো সন্ধ্যে হলে প্যাঁচার ডাক শোনা যায়না। যদিও খুব প্রত্যন্ত গ্রাম গুলিতে এদের মাঝে মাঝে দেখা যায় তবে সে সব গ্রামও দ্রুত পা বাড়াচ্ছে নগরান্নয়নের পথে। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে আমরা সবাই হাঁটছি। উদ্ভিদ কূল থেকে প্রাণী কূল সকলের অস্তিত্ব আজ বিপন্নতার দোর গোড়ায়, বাদ নেই মানুষও। উন্নয়ন সবার কাম্য, কিন্তু সে তার সাথে সাথে মাথায় রাখতে হবে পরিবেশ সচেতনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও। বর্তমানে প্রত্যেক প্রকল্প (সরকারি বা বেসরকারি) অনুমোদনের প্রথমেই পরিবেশবিদদের পরামর্শ প্রয়োজন। সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে নেওয়া সে অঞ্চলের পরিবেশের তথ্য। একমাত্র সচেতন নাগরিকের সঠিক সিদ্ধান্তই রক্ষা করতে পারে আমাদের অস্তিত্বকে।

 

রডোডেনড্রন – তোমায় দিলাম আজ

মার্চ ২০১৪, শহর কলকাতায় তখন ‘বসন্ত এসে গেছে’ (যেটুকু টের পাওয়া যায় আর কী)! ঠিক করলাম পাহাড়ে খুঁজতে যাব বসন্তকে..দেখব কেমন হয় তার রূপ-রং।

অতএব ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়া বসন্তের খোঁজে। গন্তব্য হিলি-ভার্সে-ওখেরে..সিকিমের পশ্চিম ঢালে সাজানো ছোটো ছোটো গ্রাম।

দার্জিলিং মেল ধরে এন. জি. পি স্টেশনে নামতেই মন ভালো করে দিল একরাশ ঝলমলে রোদ্দুর। জীপে চেপে রওনা দিলাম সিকিমের দিকে। একদিকে হিমালয়া তরাই, অন্য দিকে তিস্তা – আমাদের সঙ্গী রইল সর্বক্ষণ।

IMG_0463

সিকিমে গাড়ি ঢুকতেই পাহাড়ের রূপ বদল..কোথাও সে সবুজে মোড়া-আবার কোথাও সে রূক্ষ–ধূসর। ঢালে ঢালে সাজানো ছবির মতো সুন্দর গ্রাম!

IMG_0511

বেশ কিছু পথ চলার পর গাড়ী থামালো আমাদের নেপালী চালক..জানালা দিয়ে হাত দেখালো বাইরে – আর সেই প্রথম দেখতে পেলাম তাকে। একরাশ গাম্ভীর্য আর অনেকখানি দর্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের রানী ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। প্রথম দেখাতেই বাকরূদ্ধ হলাম। বরফে মোড়া এই শৃঙ্গের সৌন্দর্য বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। প্রকৃতি এত সুন্দরও হয়?

IMG_0510

মুগ্ধতা কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম। সাত ঘন্টা্র যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল ওখেরে পৌছে আমাদের গেস্টহাউসের লেপচা মালিকের আতিথেয়তায়। পূর্ণিমার রাতে কনকনে ঠান্ডায় ওই মালিকের বসার ঘরে আগুন পোহাতে পোহাতে চলল গল্পকথা।

IMG_0512

পরের দিন নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু হল ভার্সে ভ্যালির দিকে। ভার্সের আরেক নাম ‘Valley of Rhododendron’। বসন্তের রঙিন দিনে এই ভ্যালিতে রঙের রায়ট লাগে। রডোডেনড্রনে ভরে ওঠে ভার্সে।

DSCN0308

ওখেরে থেকে ভার্সে যাওয়ার পথ ট্রেক করে যেতে হয় ভার্সে রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারির মধ্যে দিয়ে। সদলবলে শুরু হল আমাদের ট্রেকিং। জঙ্গলের ভিতর পায়ে পায়ে তৈরী পথ আর অন্যদিকে গভীর খাদ – সেই পথ কোনোদিন ভোলার নয়। চারপাশে এত নিস্তব্ধতা যে খসে পড়া পাতার শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। সেই নিশ্চুপ পথে হাঁটতে হাঁটতে ৪কিমি পথ কিভাবে যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেও পারলাম না। সেই প্রথম ট্রেক – ক্লান্তি তো ছিলই – কিন্তু তার সাথে ছিল একগুচ্ছ আ্নন্দ। প্রকৃতিকে বন্ধু করে ভার্সেতে পৌছানোর আ্নন্দ।

DSCN0332

রডোডেনড্রন তখনো সব ফোটেনি – ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এদিক ওদিক। আমাদের কটেজের পিছনেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকায় তার দেখা মিললোনা।

DSCN0339

সারাদিন আড্ডা হইচই করে কেটে গেল।বিকেলে আকাশ কালো করে নেমে এল বৃষ্টি – পাহড়িয়া বৃষ্টি। পাহাড়ের এই প্রান্তে কারেন্ট এখনো আসেনি। তাই মোমের আলোই ভরসা। জমে যাওয়া ঠান্ডা আর মোমবাতি রাত – মনে থেকে যাবে আজীবন।

IMG_0522

রাত যত বাড়তে থাকল নিস্তব্ধতা তত গাঢ় হলো। নিঝুম জঙ্গল, ঝুপঝুপ বৃষ্টি আর হিম হাওয়া সঙ্গ দিল সারারাত।

IMG_0516

পরদিন ঘুম ভাঙতেই দেখলাম মেঘ উধাও। ফুরফুরে রোদের জন্মদিন। ছুট্টে বাইরে গেলাম – যদি একঝলক দেখা যায় কাঞ্চনকন্যাকে সেই আশায়। এবার সে আশা ভাঙতে দিলোনা।

DSCN0240

দেখলাম রোদের মুকুট মাথায় আর বরফের গয়নায় সেজে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের রানী। আরো একবার কথা হারালাম, আরো একবার প্রেমে পড়লাম পাহাড়ের।

DSCN0231

ধীরে ধীরে মেঘ এসে ঢেকে দিল সেই সুন্দরী রানীকে।এদিকে ততক্ষণে আমাদেরও ফিরে আসার সময় হয়ে এল।

DSCN0001

গুটিগুটি পায়ে আবার রওনা হলাম ওখেরের দিকে। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ফিরে যাওয়া। শুনতে পেলাম মেঘের আড়াল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন বলছে- “আবার আসিস – থাকব তোদের অপেক্ষায়”।

উত্তর সিকিম ভ্রমণ

অফিসের ব্যস্ত শিডিউল থেকে সময় ম্যানেজ করে বেরোলাম আমরা চার জনে একটু নর্থ সিকিম ঘুরতে। আমাদের বেস পয়েন্ট ছিল গ্যাংটক। সেখান থেকে প্রথমে গেলাম লাচেন হয়ে গুরুডোংমার লেক। যাওয়ার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। শেষের কয়েক কিলোমিটার পাকা রাস্তা, তার আগে শুধুই পাথর, রাস্তা বলে কিছু নেই। শেষ কিছুটা রাস্তা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তবে ওখানে পৌঁছে আসল জিনিসটা দেখা গেল। গুরুডোংমার লেকের সৌন্দর্য্য দেখে অনেকেরই প্রায় ভির্মি খাওয়ার জোগাড়। যদিও সেটা বোধহয় ওই উচ্চতায় (১৭৮০০ ফিট) অক্সিজেন আর হাওয়ার প্রেশার কম থাকায় হয়েছে।

জোকস অ্যাপার্ট, সত্যিই অসাধারণ সুন্দর এই লেকটি। এছাড়া শুনলাম এটা খুবই পবিত্র স্থান বৌদ্ধ এবং শিখদের কাছে। যাইহোক, গুরুডোংমার লেকের সৌন্দর্য্য নিয়ে লিখতে বসলে পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে। আমরা ওখানে মাত্র আধ ঘন্টা ছিলাম। সেখান থেকে পরের দিন গেলাম লাচুং, তারপর আমাদের গন্তব্য ছিল ইয়ুমথাং উপত্যকা এবং উষ্ণ প্রসবণ। ইয়ুমথাং উপত্যকা আসলে ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ নামে পরিচিত। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষে গিয়ে সেরকম কিছুই দেখতে পেলাম না। খুবই ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে শুধু তিস্তার একটা শাখার সৌন্দর্য্য দেখলাম। সেখান থেকে একটু নেমে, উষ্ণ প্রসবণের জলে হাত গরম করে সত্যিই খুব আরাম পেলাম। কথিত আছে, ওই হলে স্নান করলে নাকি গায়ের ব্যাথা আর বাত সেরে যায়। সেই আশায় ওখানে অনেকেই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটা চৌবাচ্চায় বসে থাকে।

এরপর আমাদের ট্যুর শেষ করে আবার গ্যাংটকে ফিরে আসা, ম্যালে একটু সময় কাটানো, সেখান থেকে নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে বাড়ি ফিরে আসাটা আর বলতে ভাল লাগছে না। এত তাড়াতাড়ি ট্যুর শেষ করতে মন একেবারেই চাইছিল না। তবে আরেকবার যাওয়ার ইচ্ছে নিয়েই ফিরে এলাম কলকাতার বুকে। এখনো মাঝে মাঝে এই ভ্রমণের কথা আর গুরুডোংমার লেকের সৌন্দর্য্য মনে মনে হাতছানি দেয়।

উত্তর সিকিম  থেকে কয়েকটা ছবি রইল। কেমন লাগল সবাই জানাবেন।

WayToGurudongmar1
গুরুডোংমার লেকের পথে

 

WayToGurudongmar2
গুরুডোংমার লেকের কাছে

 

Gurudongmar
গুরুডোংমার লেক

 

Gurudongmar2
গুরুডোংমার লেক

 

Yumthang
ইয়ুমথাং উপত্যকা

 

yumthang1
ইয়ুমথাং উপত্যকা

 

Yumthang2
ইয়ুমথাং উপত্যকা

 

tessta
তিস্তার একটি শাখা

 

way to hotspring
উষ্ণ প্রসবণের পথে

 

GangtokMall
গ্যাংটক ম্যাল

উপন্যাস আলোচনা: ‘কলাবতী কথা’

প্রতি বছর পুজো আমাদের কাছে একগুচ্ছ সাহিত্য নিয়ে হাজির হয় শারদীয়া পত্রিকা গুলোতে। আমাদের মত সাহিত্য পিপাসুরা অধীর আগ্রহে তাই অপেক্ষা করে থাকে পুজোর আগমনের। কিছু লেখা নিজ গুণে মনে থেকে যায়, আর কিছু লেখা বিস্মৃত হয় গুণহীনতায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত, বেশ কিছু গল্প উপন্যাস পড়লাম। তার মধ্যে শারদীয়া সানন্দাতে প্রকাশিত ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কলাবতী কথা’ র মধ্যে ভিন্নধর্মী এক লেখার আস্বাদ পেলাম।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে সাঁওতাল কন্যা কলাবতী। অদৃষ্টের পরিহাসে মাধ্যমিকেই পড়াশোনার ইতি, সে তার গ্রামের সাঁওতালি মাদল দলের এক নাচিয়ে, কুরুম্ভেরার মেলায় লাঞ্ছিত , পায়নি নিজের দলের কারুর সহানুভূতি বা সাহায্য। মেলার ওই ঘটনায় সে বাঁধা পড়ে কনকের সাথে এবং কালক্রমে কনকের সংসারে।

কনকের জীবনে সুখের থেকে দুঃখ টাই বেশি। পায়নি স্বামীর ভালবাসাটুকুও। তবুও নিজের সংসারের অস্বচ্ছলতাকে অতিক্রম করে এক আধুনিক রমণীর মোড়কে তাকে আমরা দেখতে পাই যার কাছে অপরিচিত কোন মেয়ের সম্ভ্রম অনেক বড় হয় নিজের অর্থোপার্জন থেকে। তাইতো কলাবতী যখন কুরুম্ভেরা মেলায় লাঞ্ছিত হয়েছে তখন একা সে পাশে দাঁড়িয়েছে, এগিয়ে গেছে প্রতিবাদ করতে বিপদ আছে জেনেও এবং সবশেষে জাতিভেদ দূরে রেখে সাঁওতাল মেয়ে কলাবতীকে নিজের পুত্রবধূর সম্মান দিয়েছে। এখানেই মহৎ হয়ে উঠেছে চরিত্রটি। আধুনিক চিন্তাভাবনার যে প্রতিফলন দেখি আমরা কনকের চরিত্র তা আধুনিক অগ্রসর সমাজেও বিরল।

রামু, কলাবতীর স্বামী, কনকের পুত্র। কলাবতীর প্রতি ভালবাসার অন্ত নেই। কনক, কলাবতীর ‘পইঠার পট-চিত্র’ গড়ে ওঠা ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য রামুর প্রতিদান অনেকটাই। কিন্তু রামুর সহজ সরল মন কলাবতীর মনের গভীরে পৌঁছতে পারে না। পারে না একজন নারীর গভীরতম ইচ্ছা অনিচ্ছার নাগাল পেতে, তাই তাকে হারাতে হয় কলাবতীকে। শুধু সাংসারিক দায়িত্ব ছাড়াও যে একজন নারী তার মনের পুরুষের কাছে আরও কিছু প্রত্যাশা করে নীরবে, তা বোঝার সাধ্য বোধহয় সহজ সরল গ্রাম্য রামুর ছিল না।

এছাড়া আমরা দেখি আকিও ও মিকি চরিত্র, জাপানী ছেলে মেয়ে। মিকির সাথে কলাবতীর পরিচয় হয় মেলায়। এবং তার হাত ধরেই কলাবতীর পটশিল্প পৌঁছে যায় সুদূর জাপানে। এবং উপন্যাস শেষে আকিওর হাত ধরে কলাবতীর নতুন সংসার শুরু হয় জাপানে।

কিন্তু যে জিনিসটা এই লেখাটাকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে তা হল এর বিষয়বস্তু। গ্রাম বাংলার পটশিল্প, পটশিল্পীদের জীবন, কথকতার কাহিনী যেগুলো বাংলার নিজস্ব, যার মধ্যে কোন কৃত্রিমতা নেই। লেখককে সেই কারণে ধন্যবাদ। বাংলার হাট, মিলন মেলার মেলা ইত্যাদি জায়গায় এই পটশিল্পের কিছু নমুনা আমরা মাঝে মাঝে কলকাতায় বসে দেখার সুযোগ পাই। কিন্তু লেখিকার লেখনীর জোড়ে আমরা ঘুরে আসি এই সব পটশিল্পীদের জীবনে, তাদের সংঘর্ষময় জীবনযাত্রার মধ্যে। দেখতে পাই কিভাবে এই পটশিল্পীরা পটের শিল্পের মধ্যে পুরাণের কাহিনী ফুটিয়ে তোলে, তার উপযুক্ত গান রচনা করে মেলায় মেলায় পসার সাজিয়ে বসে, কিভাবে দিনের পর দিন নিজেদের দারিদ্র অতিক্রম করেও বাংলার এই ঐতিহ্য কে নিজেদের কাঁধে বয়ে নিয়ে চলে। সঙ্গে রয়েছে কথকতার কাহিনী। উপন্যাসে বেশ কিছু ব্রতকথার উল্লেখ রয়েছে – ভৈমি একাদশী ব্রত, গোটা ষষ্ঠী, নিত-সিঁদুর ব্রত, অশোকষষ্ঠীর ব্রত, নীলষষ্ঠী ব্রত, অক্ষয় তৃতীয়া, বিপত্তারিণীর ব্রত, চাপড়া-ষষ্ঠী। এই সব ব্রতের পৌরাণিক কাহিনী কখনো কথকঠাকুরের মুখে, কখনো কনকের মুখে, কখনো কলাবতীর মুখে অনবদ্য ভঙ্গিতে লেখিকা ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখিকার পুরাণ বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা প্রশংসার উল্লেখ রাখে। উপন্যাস শেষে বিশেষ নোটের উল্লেখ থেকে জানতে পারি লেখিকা দীর্ঘদিন মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ছিলেন এবং সেই সূত্রে এই পটশিল্পীদের সংসর্গে এসেছিলেন। লেখিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই পটশিল্পীদের জীবনকে তাঁর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময়ের ফসল ‘কলাবতী কথা’, এটা যে কোন ‘Puja Assignment’ না তা পড়লেই বোঝা যায়। লেখিকা হৃদয় দিয়ে লিখেছেন। তাই লেখাটা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

তবে উপন্যাস পড়া শেষে কিছু প্রশ্ন মনে আসে।

এক জায়গায় আমরা দেখি আকিও জাপানী ভাষা ছাড়া জানে না। অথচ সেই রাতেই সে পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। এই কথোকপথন টা না থাকলেই বোধহয় ভাল হত। আমরা তো অনেক সময়েই নীরবে অনেক কথা বলে দিই। দুজন ভিন্নভাষী মানুষকে একে অপরের কাছে আনতে নাই বা আমরা মুখের ভাষা ব্যবহার করলাম, মনের ভাষাটা কি যথার্থ হত না?

উপন্যাসের শেষে যখন কলাবতী আকিওর সাথে জাপানে তার নতুন সংসার শুরু করে সেই সময় তার শাশুড়ি কনক বা তার স্বামী রামুর মনে কি হল তা জানা গেল না। কনক বা রামু ব্যাপারটা এত সহজে মেনে নেওয়াটাকেও ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। কলাবতীর মধ্যে আধুনিক মনস্কতার পরিচয় থাকলেও তা যেন কোথাও একটা সীমা লঙ্ঘন করে। তার দেশের সীমা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার থেকেও বড় হয়ে দেখা দেয় নারীত্বের পূর্ণ স্বাদ পাওয়ার নিদারুণ চাহিদা থেকে নারীমর্যাদার সীমানা পেড়িয়ে যাওয়া। তাই কলাবতী এই উপন্যাসের নায়িকা হয়েও কিছুটা যেন খলনায়িকা হয়ে যায় গল্প শেষে।

সব শেষে আবারও ধন্যবাদ লেখিকাকে এরকম একটা উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য। আশা করি লেখিকা পাঠকদের জন্য এরকম আরও কিছু উপন্যাসের ডালি নিয়ে হাজির হবেন অদূর ভবিষ্যতে।

রঙ-বেরঙের পাখি (২)

রং-বেরঙের পাখি মানেই ছোটবেলা, শীতকাল, চিড়িয়াখানা, কমলালেবু, আর ক্রিসমাসের ছুটি। কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়া আমাদের ছোটবেলায় ছিল না, এখন হয়েছে। আমরা পাখি দেখতাম গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে, বাড়ির চালে, কারণ তারা তখনো সংখ্যায় অনেক ছিল। এখনকার মত ক্যামেরার লেন্সে তাদের খুঁজতে বেরোতে হত না। শীতকাল মানেই পরিযায়ী পাখি আসবে, শুধু চিড়িয়াখানাতে নয়, মাঝে মাঝে আমাদের মফস্বলের খালবিলেও। এখন তারা হয়ত অভিমান করে আর আসে না, তবু আমরা তাদের খুঁজতে বেরোই। সেরকমই কিছু পাখির ছবি উপহার দিয়েছেন কৌশিক সেন

russet sparrow
রাসেট স্প্যারো

 

verditer flycatcher
ভারডিটার ফ্লাইক্যাচার

 

shikra
শিকরা

 

grey headed canary flycatcher
গ্রে-হেডেড ক্যানারি ফ্লাইক্যাচার

 

asian barred owlet
এশিয়ান বারড আউলেট

রঙ-বেরঙের পাখি (১)

মনে আছে, ছোটবেলায় কে যেন আমাকে সালিম আলি’র একটি সচিত্র পাখির বইয়ের বাংলা অনুবাদ উপহার দিয়েছিল। বাচ্চারা যেমন ছবির বই পেলে খুশি হয়, আমিও মাঝে মাঝেই ওটা উল্টেপাল্টে পাখির ছবি দেখতাম। ল্যাজের ডগা লালে রাঙানো শাহ বুলবুলি নিজেদের বাগানে দেখতে পেয়ে মনে মনে সালিম আলিকে ধন্যবাদও দিয়েছিলাম। আজও বাগানে, বারান্দায়, রাস্তায়, ঘরের পাশে ইলেকট্রিকের তারে, যে কোনোখানে পাখি দেখতে পেলে মন ভাল হয়ে যায়। এই কয়েকটি রঙ বেরঙের পাখির ছবি তাই আপনাদের জন্য খুঁজে এনেছেন নবনীতা সেন

lesser flameback woodpecker
লেসার ফ্লেমব্যাক উডপেকার

 

greater flameback woodpecker
গ্রেটার ফ্লেমব্যাক উডপেকার

 

lesser yello-naped woodpecker
লেসার ইয়েলো-নেপড উডপেকার

 

crested kingfisher
ক্রেস্টেড কিংফিশার

 

rufus georgetted flycatcher
রুফাস জর্জেটেড ফ্লাইক্যাচার

গর্ব্‌ সে বোলো হম ‘হিন্দু’ হ্যাঁয় (২য় পর্ব)

(পূর্ব প্রকাশিত অংশটি পড়ুন এখানে)

যাক এই ধানাই পানাই বকার একটা উদ্দেশ্য আছে। উদ্দেশ্য বিনা কার্য হয়না। কিছুদিন আগে থেকে কলকাতাবাসীরা কেউ খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা, দেয়ার ইজ আ নিউ গড অন দা হরাইজন। তার নাম –‘ শ্যামবাবা’। শুনলে সাধারণ ‘হিন্দু’ রা অবাক হবেন, বাবা বলতে পেটমোটা কিংবা অতিকায় ফ্যালিক সিম্বল, পুরুষতন্ত্রের প্রতীক শিবঠাকুর। শ্যাম তো চিরকেলে প্রেমিক, সে আবার ‘বাবা’ হল কবে? যদিও পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে কেষ্টবাবুর ছেলেপুলে হয়েছিল, কিন্তু মন্দিরে পূজো পায় বালক গোপাল কিংবা তিনব্যাঁকা (ত্রিভঙ্গ মুরারী) প্রেমিক শ্যাম । তাহলে ‘বাবা’ এল কোত্থেকে?

তাহলে বলি শুনুন, এ শ্যাম সে শ্যাম নন। মন্দিরে ঢুকলেই বুঝবেন। ইনি শুধু একটি কাটা মুন্ডু। আরও গুলিয়ে যাচ্ছে? গোলাবেই। তাই তো এতবড় স্টেটাস। তবে শুনুন, মহাভারতের কাহিনী অনুসারে এঁর নাম বর্বরিক অথবা শর্টে, বব্রিক। ইনি ভীমের, মতান্তরে ঘটোৎকচের পুত্র। ইনি এতবড় বীর ছিলেন, যে এঁকে হারানো কারো সাধ্য নয়, একথা সবাই জানত। মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হতে কিছুদিন ইনি চুপচাপ দেখছিলেন, তারপর আর থাকতে না পেরে অস্তর শস্তর নিয়ে ইনি রওনা দিলেন করুক্ষেত্রের দিকে। ত্রাহি ত্রাহি রব, কেননা জানা গেল ইনি যুদ্ধে পার্টিসিপেট করবেন, তবে এঁর মতি হল, যে হারছে, আমি তার হয়ে খেলব। এবার হারছে তো কৌরবরা। তাহলে পান্ডবের ব্যাটা কৌরবের হয়ে খেলবে? আর খেললে পরে তো দশ গোল দেবে। মুশকিল আসান কেষ্টদা। ভিখারি ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে সামনে হাজির। (এইজন্যই ওঁরা ব্রাহ্মণদের ভিখারি বা ভিখমাঙ্গা বলেন কিনা জানা নেই)।

কেষ্টদা বললেন, ভিক্ষাং দেহী। ক্ষত্রিয় বীর, তার কাছে কেউ কিছু চেয়ে ফেরত যায় না। বর্বরিক ( খেয়াল করবেন, ইংরিজিতে লিখলে – Barbarik ) বললেন, কী চান দ্বিজবর? বামুন ব্যাটা বলল, তোর মুন্ডু চাই। ব্যস, উনি বুঝে গেলেন এই বামনাটা আসলে কে? Barbarik বললেন, ও কে, আই উইল গিভ ইয়া মা’ হেড। আই নো হু ইউ আর। কিন্তু প্রভূ এক শর্তে। আমার কাটা মুন্ডুটা নিয়ে গিয়ে ওই পাহাড়ের মাথায় এমন করে বসিয়ে দিন, যাতে আমি পুরো যুদ্ধটা দেখতে পাই। কিরিষ্টো বললেন, তথাস্তু। তা ছাড়া তোমার এই স্যাকরিফাইস লোকে ইয়াদ করবে আজীবন। কলিযুগে তুমি ভগবান হিসেবে পূজো পাবে। আর আমার নামে তোমার নাম হবে – ‘শ্যামবাবা’।

রাজস্থানের খাটুতে এই বব্রিকের একটা বহু প্রাচীন মন্দির ছিল। কালের প্রভাবে তার ভাঙাচোরা অবস্থা। এই সব মিথিকাল হিরো/হিরোইনদের আঞ্চলিক পূজো আচ্চা হয়, যেটার সার্বিকভাবে কোনও ইম্প্যাক্ট নেই। হিমাচলে দুর্যোধনের মন্দির আছে, হিড়িম্বার মন্দির আছে। আমাদের খোদ বাংলায় হুগলি এবং বর্ধমানের অনেক জায়গায় ভীমপূজো হয়। অতিকায় মাসকুলার ভীম গদাহস্তে  দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তায় ধারে অথবা মাঠের মাঝখানে। হ্যাঁ এখানে আবার নিয়ম আছে, প্যান্ডাল করা চলবেনা। মাথার ওপর আচ্ছাদন থাকবেনা (কেন কে জানে)। পূজো হয়ে গেলে রোদে জলে পড়ে থাকবে মূর্তি। আমরা বাঙালি তো, উত্তর ভারতীয়রা যেমন ‘জয় শ্রীরাম’ বলে বাংলায় ঢুকে পড়ল, আমরা কিন্তু ‘জয় শ্রীভীম’ বলে উত্তর বা দক্ষিণ ভারতে থানা গাড়তে পারলুম না। – ছ্যাঃ ছ্যাঃ।

তা রামায়ণ থেকে মাত্র দুচারটে ক্যারাকটারই ‘ভগবান’ স্টেটাস পেয়েছে। আমাদের লক্ষণ ভাইও শুধুই সাইডকিক, নিজে দেবতা নয়। কিন্তু মহাভারত অনেক পরের কাব্য হলেও বিভিন্ন রিজিয়নে বিভিন্ন দেবতা গেড়ে বসেছেন এই মহাকাব্যের দৌলতে, কে কে কোথায় কোথায় বসে পড়েছেন, তা আগেই বলেছি। এবার এই বর্বরিক রাজস্থানের ‘খাটু’ নামক জায়গায় একটা ভাঙাচোরা মন্দিরে বসেছিলেন কাটামুন্ডু নিয়ে। ওই মন্দিরে ক্ষত্রিয়রা পূজো দিত, তাও আবার বছরে একদিন কী একটা উপলক্ষে ( অত ডিটেল কব্জা করতে পারিনি এখনও)। মন্দিরটাও অনাদরে অবহেলায় প্রায় ভগ্ন দশায় পড়ে ছিল। হঠাৎ কোত্থেকে সেই অগ্রহরি সমাজের কোনও এক মোড়লের মাথায় কিছু একটা খেলল। একটা অলৌকিক গল্প পয়দা হয়ে গেল রাতারাতি। খাটু মন্দিরের জয়জয়কার বিশ্ব(?) (সেটাই নাকি ক্লেম) জুড়ে শুরু হয়ে গেল। এখন সেই ‘শ্যামবাবা’ আগরওয়ালদের দেবতা। খাটুতে সেই বিশেষ দিনে কত লক্ষ মানুষের সমাগম হয়, তা শুনলে কুম্ভমেলাও লজ্জা পাবে। খাস কলকাতাতে অন্তত তিন জায়গায় শ্যামবাবার মন্দির হয়ে গেছে। কমলা ও গোলাপি ফ্ল্যাগ নিয়ে রাস্তা আটকে প্রোসেশন হয় প্রত্যেক মাসে। বছরে তিনদিন ‘জাগরণ’, মানে, ওই বরাহনন্দনগুলো জাগবে সারা রাত, আর ডেসিবেল যে উচ্চতায় পৌঁছবে বিশাল বিশাল সাউন্ড বক্স থেকে, তাতে সারা পাড়াও জাগতে বাধ্য হবে। বাগুইআটির দিকে কেউ থাকলে ভাল বলতে পারবেন। যে দেবতার অস্তিত্বের কথা পাশের গাঁয়ের লোক জানতনা বছর দশ বারো আগেও, সে ভারতজুড়ে দখলিসত্ব কায়েম করছে রাতারাতি, প্রত্যকে জায়গায় একটা অলৌকিক গল্প রটিয়ে।

এই শ্যামবাবা কাদের দেবতা? হিন্দুদের?

যে তারা মায়ের মন্দিরে গিয়ে সুভাষ চক্কোত্তিকে শিপিয়েম প্রায় বের করেই দিয়েছিল, সেই ‘তারা’-ও কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম থেকে হাইজ্যাকড। তবে এখানেও কমিউনিজমের ডাব্‌ল স্ট্যান্ডার্ড – সেই গলায় গামছা মন্ত্রী (এখন অন্য কারণে পার্টির বাইরে) হজ করতে গেলে আলিমুদ্দিন চুপ। কিন্তু সুভাষ চক্কোত্তি তারাপীঠে গেলেই মহাভারত ডিসিক্রেটেড, ভাই পারিস বটে।

চুপি চুপি বলি, খুব তাড়া করবে লোকে, তিরুপতি মন্দিরের লর্ড ভেঙ্কটেশ্বোয়ারা-ও কিন্তু হাইজ্যাকড। আসল মূর্তিটা অন্য কোনও দেবতার ছিল। কেউ বলে শিবের, আবার কেউ বলে এটা অজ্জিনালি মেয়েছেলের মূর্তি ছিল, কালীর।

যাকগে সে সব কথা, এবার চলুন সাউথে। সোয়ামী (স্বামী) আয়াপ্পন – সাংঘাতিক দাপুটে এবং ‘জাগ্রত’ দেবতা। তিনি লোকটি(?) কে? না শিবের ঔরসে, মোহিনীরূপী বিষ্ণুর গর্ভে জাত সন্তান। হুঁ হুঁ বাওয়া, বাঘের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ান ( অনেকটা আমাদের দক্ষিণ রায়)। তা বিষ্ণু তো অসুরদের কাছ থেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অমৃত উদ্ধারের সময়ে টেম্পোরারিলি মোহিনী মূর্তি ধরেছেন, আসলে তো ব্যাটাছেলে। তেনার আবার গভভো হয় কেমনে। ও হ্যাঁ, ভষ্মাসুরের নিজের মাথায় হাত দিয়ে মরার সময়েও মোহিনীর সিডিউসিং অ্যাক্টো ছেল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, – পিকচার আভি ভী বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত – বিষ্ণু কোথায় কোথায় এবং কখন কখন মোহিনী মূর্তি ধরেছেন, তার ইতিবৃত্ত যদি পুরান টুরান ঘেঁটে (অন্যথায় ইন্টারনেটে গুগ্‌লকাকু) বের করে পড়ে উঠতে পারেন, দেখবেন তার পর নিজের নাম আর মনে পড়ছেনা।

কেরালায় ম্যাটানচেরি প্যালেস বলে একটা রাজপ্রাসাদ আছে। গেলে মনে দুঃখ পাবেন, কেননা যদি আপনার ফ্ল্যাট না থেকে একটা বড়সড় দোতলা বাড়ি থেকে থাকে, সেটা ওই ‘প্যালেস’ এর চেয়েও বড়, এটা নিশ্চিত। তবে কেন যাবেন সেই মহার্ঘ্য ‘রাজপ্রাসাদ দেখতে? তার কারণ তার অনেকগুলি ঘরের দেয়ালে আছে অসাধারণ চিত্রকলা, সবই ন্যাচরাল ভেজিটেব্‌ল ডাই দিয়ে আঁকা। কিছু ঘরে তা সম্পূর্ণ, কোথাও অসম্পূর্ণ, একটা ঘরে তো শুধু খয়েরি রঙ দিয়ে আউটলাইন করা হয়েছিল, তাতে রঙচঙ পড়েনি। এই ‘রাজপ্রাসাদের’ রাজার বেডচেম্বার, মানে শোয়ার ঘরে যদি ঢোকেন, দেখবেন দুই দেব দেবীর ‘লীলে’ করার ছবি চার দেয়াল জুড়ে। সেই ছবিরা কোনারক বা খাজুরাহকেও লজ্জা দেবে, এতই এক্সপ্লিসিট, যদিও শিল্পের দিক থেকে অসাধারণ। কারা সেই দেব-দেবী? না শিব আর মোহিনী, যে নাকি অজ্জিনালি ব্যাটাছেলে, মানে বিষ্টু।

আমরা বাঙলায় বসে ‘মোহিনী’ বলতে তো শুধু মোহিনী কাপড়ের মিলের নাম জানতাম, তা সেও অনেক দিন আগেই উঠে গেছে। আপদ গেছে।

এনারা, মানে এই ‘বর্বরিক’, আয়াপ্পন, কাদের দেবতা? হিন্দুদের? মানে, আমি যদি গর্ব করে বলি আমি হিন্দু, তবে আমায় কি ‘শ্যামবাবা’র জাগরণে বসতে হবে সারা রাত, পরের দিন অফিস থাকলেও?

আমি যেখানে থাকি, সেই অঞ্চলে গত তিরিশ বছরে গেরস্ত বাঙালির সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে। একতলা দোতলা বাসগৃহ ভেঙে যে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরী হয়েছে, সেগুলোতে বাঙালি ১০%। বাকি সব ভাষাভাষি যাও বা আছে, ৭০% বাসিন্দাই বিহার ও ইউপির লোক। এদের এই বাজারেও জন্ম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনও হেলদোল নেই, আমার বাড়ির উল্টোদিকেই একজনের ৯টি সন্তান। সে আদ্দিকালের লোক নয়, আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট। যাক সে কথা, এদেরই একজন একদিন একটা ছোট গাছের চারা হাতে করে আমার বাড়িতে এসে বলল, আমার বাড়িতে তো জায়গা নেই, যদি আপনার সামনের ওই কোনাটায় একটু পুঁতে দেন। আমি বললাম, কী গাছ এটা? সে বলল, আমলকি। আমলকি গাছ শহরে চট করে দেখা যায়না, আমি তো গাছটা পুঁতেই দিলাম। লোকটা বলল, আপনার কাছে দিলে যত্নে থাকবে, আমার তো দরকার বছরে মাত্র একদিন। আমি কিছুই বুঝিনি সেকথার মানে। দরকার, কীসের দরকার? যাক, কিছুদিনের মধ্যেই সে গাছ বিশাল হয়ে গেছে। আজ থেকে দিন তিন চার আগে, হঠাৎ দেখি গাছের তলায় ঝাটপাট দিয়ে (আমি আবার বিহারিদের পাড়ায় থাকতে থাকতে, ‘ঝাট’ –এ কিছুতেই চন্দ্রবিন্দু লাগাতে পারিনা) পরিষ্কার করে, ধুপ ধুনো ফুনো জ্বালিয়ে একসা। আমি বললাম, কী ব্যাপার, কিছু পূজো ফুজো নাকি? সে একগাল হেসে বলল, হ্যাঁ ওই জগদ্ধাত্রী পূজোর নবমীর দিনে একটু –ইয়ে – আমি বললাম, জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে আমলকির কোনও কানেকশন আছে বলে তো বাপের জম্মে শুনিনি ? সে বলল, না না জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে নেই, এটা আসলে নারায়ণ। ঐ নবমীর দিনে করা হয় বলে জগদ্ধাত্রীর নাম নিলাম। – বোঝো কান্ড। সে আরও বলল, গ্রামের দিকে খুব ধূমধাম হয়, আসলে এই গাছের তলায় বসে রান্না বান্না করে খেতে হয়। এখানে আর অত কিছু করা যাবে? তাই ধূপ ধূনো দিলাম, একটু বিস্কুট নিয়ে এসে খাচ্ছি, নিন আপনিও একটা বিস্কুট খান।

আমার প্রশ্ন, এটা কি ‘হিন্দু’ দের পূজো?

সেই প্রদেশের লোকদের ছট পূজো নিয়ে তো এখন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছেন। কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরটাকে তেনারা এক রাত্তিরে তছনছ করে দিয়ে চলে যান। বুদ্ধবাবু একবার আটকাবার চেষ্টা করেছিলেন, এখন তো মমতাদেবী আরও তোল্লাই দিচ্ছেন, দেবেনই। ভোট ব্যাঙ্ক বলে কথা। গ্রামে না হলেও শহরে এখন পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাঙালির চেয়ে বিহারি বেশি। পটকার আওয়াজে সারা রাত্তির জাগতে হবে চাকুরিজীবিদেরও। ডেসিবেল কালীপূজোয় মাপা হলেও এইদিনে ছাড়। ছেলেবেলায় শুনতাম ‘ছটপরব’। সেটা বদলে ‘ছটপূজো’ হয়ে গেছে।

কাদের পূজো এটা? হিন্দুদের?

কিছু ‘পোগোতিশীল’ মানুষ আছেন, যাঁরা এসব পড়ে বলেন,  ‘উত্তর ভারতীয়’ আবার কী? ফেস্টিভাল ইজ ফেস্টিভাল, যত্তো সব ‘sick mind’.

এবার সেই মানুষরা  কি বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণের পরে, ধনতেরাস, ছটপূজো, আমলকি পূজো, শ্যামবাবার মাসিক পূজো, জ্জে মাতাদি-র পূজো, গণেশ পূজো, সোয়ামি আয়াপ্পনের পূজো, রাস, পোঙ্গল, বিহু, সব পালন করবেন? আমি তো কেবল ‘হিন্দু’দের গুলো বললাম, দুখানা ঈদ, সবেবরাত, মুহরর্‌ম, ক্রিসমাস, ঈস্টার, হ্যালুইন, বুদ্ধ জয়ন্তী, গুরু রবিদাস উৎসব, শিখদের বৈশাখী, সাঁওতালদের হুল, আরও যা যা আমি নিজেই জানিনা, সব করার পর তিনি অফিস বা আদালত বা নিজের কাজের জায়গায় যাবেন বছরে ক’দিন?

কয়েক বছর আগে সমরেশ মজুমদার একটি বাংলা সাময়িকপত্রের পূজো সঙ্খ্যায় লিখলেন, ‘পূজো (দুগ্‌গোপূজো) হচ্ছে বাঙালির বাৎসরিক পুতুলখেলা’। তিনি ঠিকও বলেছেন(যদিও সারকাসটিকালি), ভুলও বলেছেন। ভুল এই কারণে, যে ‘বাঙালি’র একটা বড় অংশের সঙ্গে পূজোর কোনও সম্পর্ক নেই। এটা আর ভেঙে নিশ্চয়ই বলতে হবেনা কেন।  আর ঠিক বলেছেন এই কারণে, যে দূর্গা, কালী, এঁরা হচ্ছেন বাঙালির নিজস্ব ম্যাসকট। ওই যে বললাম, কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা পলা, মুখে পান মিষ্টি, এঁরা ‘হিন্দু’ দেবতা নন, এঁরা পুতুলই। একজনকে কৃত্তিবাস অন্যজনকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ‘সৃষ্টি’ করেছেন। দুজনের উল্লেখই শাস্তরে আছে, কিন্তু এভাবে নয়।  ( তাছাড়া সরস্বতী লক্ষ্মী, কেতো, গনশা পাশে জুটে গেছে, এরা কেউ দুগ্‌গার ছেলেপুলে নয়। মাথার ওপর ‘বর’ শিবের ছবি লাগানো থাকে, দুগ্‌গার বিয়ে হলো কবে? উমা আর পার্বতী যদি দুর্গার নাম হয়, তবে আমার নাম রবার্ট ভদ্র) বাঙাল পুরুত যখন অশুদ্ধ ‘উরুশ্চারণে’ – সর্বমঙ্গইল্য মঙ্গোইল্ল্যে, শিব্যা, সর্বাইর্থ সাধিক্যা, শরৈণ্যে ত্রম্বকে গৌরীঈঈঈ – বলে ‘ওঞ্জুলি’ দেওয়ান, অনেক হার্ড কোর নাস্তিককে দেখেছি ভিড়ে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে যেতে। নতুন তাঁতের শাড়ির গন্ধ, ভিজে চুলের ঝাপটা, একটু পূজো পূজো গন্ধ, ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি মাখানো একটা উৎসব –  এ আমাদের পুতুল খেলাই। পুতুল খেলতে তো মার্ক্স থেকে মারকোজ, কেউ বারন করেন নি।

কোনও হিন্দু ফিন্দু বুঝিনা ভাই – গর্বসে বোলো হম বংগালি হ্যাঁয়।