বদলা নয়, বদল চাই

poribesh diboshসারাদিন অফিস ঠেলে বাড়ি ফিরছি। সায়েন্স সিটির সামনে বিস্তর জ্যাম। বাতাসে একরাশ ধুলো, মাথার ওপর ফ্লাইওভার – বিরক্তি এড়াতে এফ এম। অবশ্য আজকাল রেডিও বিরক্তি কমায় না বাড়ায় সেটা ঠিক বোঝা যায় না – তাও জ্যাম, ঘাম আর সারাদিনের ক্লেদ ভুলতে চারানার গান আর বারো-আনার এডভার্টাইজমেন্ট নিয়ে ঐ এক এফএমই সম্বল। এমন সময় এই রেডিওই মিনে করাল জুন পাঁচ তারিখ বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

পরিবেশ দিবসে আমার কিচ্ছু করার নেই। কারণ বছরে একদিন গাছ লাগিয়ে আর বাকি ৩৬৪ দিন গাছ শুকিয়ে পরিবেশের সেবা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যা বারোটা বাজার তা বেজে গেছে। এই পরিবেশ দিবস পালন করে কিছু শুধরোবে সে আশা যে নিতান্তই গুড়ে বালি। এসব আর দশটা লোকের মত আমারও মজ্জায় গেঁথে গেছে। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল – বাধ সাদল একটা ভিডিও।

হ্যাঁ – একটা ভিডিওই। কোনও এক বন্ধু শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। নিউজিল্যান্ডের ডেয়ারি ফার্মের ঘটনা। কিভাবে দুধের প্রোডাকশন বাড়ানর জন্য বাছুর হওয়ামাত্র তাদের আলাদা করে দেওয়া হয় – আর শুধু তাই নয় সেই বাচ্ছাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কসাইখানায়। খুব ধাক্কা খেলাম একটা। পড়তে শুরু করলাম কিছু হেলথ রিপোর্ট। যে সব তথ্য উঠে এল তা মর্মান্তিক বললে কম বলা হয়।

এক এক করে দেখে নেওয়া যাক অবস্থাটা কতটা খারাপ। গরুর সাথে মানুষের সবচেয়ে বড় মিল এই যে একটি বাছুরও তার মায়ের গর্ভে প্রায় ন’মাস সময় কাটায়। এখন দুধের প্রয়োজনে গাইগুলিকে বছরে একবার করে বাধ্যতামূলক ফোর্সড প্রেগন্যান্সি করান হয় এবং হরমোন ট্রিটমেন্ট করে মাতৃত্ব যে পরিমাণ দুধ উৎপন্ন করতে পারে তার প্রায় দশ-বারো গুন দুধ তৈরী করান হয়। এই অবস্থায় চার-পাঁচ বছরের বেশী দুধ দেওয়ার ক্ষমতা গাইদের থাকে না। তখন তাদের ঠাঁই হয় কষাইখানায়। এবারে আসি তাদের সন্তানের কথায়। পুরুষ হলে তাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জন্মের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই – নিলামের জন্য। কয়েক মাসে মধ্যে তাদের গন্তব্যও হয় কষাইখানায়। স্ত্রী হলেও তাদের সরিয়ে নেওয়া হয় আর অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্য ভালোদের মধ্যে কয়েকজনকে দুধের জন্য রেখে বাকীদের ও বিক্রিই করে দেওয়া হয়। যারা জন্মের পর ঠিক করে উঠে দাঁড়াতে পারে না, তাদের বলা হয় ‘ট্র‍্যাশ’।

স্ট্যাটিস্টিকস বলছে বছরে এরকম একুশ কোটি বাছুর মেরে ফেলা হয়। প্রায় ৯৭% বাছুরই জন্মের কয়েক ঘন্টার মধ্যে হারায় তাদের মাকে। নিউজিল্যান্ড হোক বা আমেরিকা ছবিটা একই রকমের। পরিবেশ দিবস শুনে অন্য কিছু ভাবতে পারলাম না। এমনিওটিক ফ্লুইডের আস্তরণ কাটিয়ে না উঠতে পারা একটি বাছুর তার মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আর আমরা নৃশংসভাবে তাকে তাড়িয়ে তুলছি ভ্যানে। কখনও তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলছি। শুধু রক্তে ভাসাচ্ছি না, পরিবেশের নিয়ম, মাতৃত্বের নিয়ম ভাঙছি শুধু লোভে। আশার কথা এটাই যে অনেক শহরে আস্তে আস্তে বাছুরের মাংস ব্যান করা হচ্ছে। সরকারি নিয়মে এই বাছুরদের চালান করার ক্রেট বে-আইনি করা হয়েছে। পরিবর্তন হবেই কিনা বলা যাচ্ছে না – তবু প্রথম ধাপ তো বটেই।

পরিবেশ দিবসে আমাদের পাঠকদের অনুরোধ করব ব্র‍্যান্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে, যা ইউরোপ আমেরিকায় শুরু হয়েছে এইসব ডেয়ারি ফার্মের বিরুদ্ধে – ছোট হলেও এই চূড়ান্ত অমানবিকতাকে চ্যালেঞ্জ করছেন কনসিউমাররা, যেটা খুব জরুরী ছিল। বেঁচে থাকার অধিকার কারও কম নয়। তাই বছরে একটা দিন নয়, পরিবেশকে বাঁচানর দায়িত্ব হোক চিরন্তন। ভালো থাকুন সব্বাই।

পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশ – একটি বিপদ সংকেত

টিয়ার নগর জীবনআজ ৫ই জুন – বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মহা সমারোহে। প্রথম যখন এই তারিখটার সাথে পরিচয় ঘটে তখন জোর কদমে পরীক্ষা প্রস্তুতি।তাই দিনটির গভিরতা না মেপেই মুখস্ত করেছি। পরে যত দিন পার হয়েছে বুঝেছি ৫ই জুন শুধু মাত্র একটি দিন নয় এটি একটি ভাবনা, প্রয়াস আগামী প্রজন্মকে এক বাসযোগ্য ভূমি দিয়ে যাবার। লড়াই নিজেকে বাঁচানোর। লড়াই প্রকৃতিকে প্রাত্যহিক ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করার। আসলে লড়াইটা আমাদের নিজের সাথে নিজেদেরই। বিলাস বহুল জীবন আর স্বচ্ছন্দের বস্তুটি কাছে পেতে মরিয়া আমরা। সেই লোভী মনটাকে সংযত করতে ঠিক যেমন স্বাধীনতার চেতনাকে জাগাতে হয়েছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা। ঠিক তেমনি আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে পরিবেশ দূষণের প্রভাবে কলুষিত পৃথিবীকে বাঁচাতে এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের প্রয়োজনীয়তা। রাষ্ট্রপুঞ্জ, ১৯৭২ সাল থেকে মানব পরিবেশ সম্পর্কিত সন্মেলনের মাধ্যমে শুরু করে এই লড়াই। যাতে বর্ণ, ধর্ম, জাত পাত ভুলে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসে বিশ্বের মানুষ। ১৯৭৪ সালের ৫ই জুন থেকে প্রতিটি দেশের একটি শহর আয়োজকের ভূমিকায় একটি নির্দিষ্ট থিমের উপর ভিত্তি করে পালন করে আসছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। উদ্দেশ্য মানুষকে একত্রিত করে পরিবেশ ভাবনা ও সচেতনতাকে জাগিয়ে তোলা। পরিবেশ পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাওয়া পরিবেশের সমস্যাগুলির সমাধান বের করা। ১৯৭৪ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্পোকেনে ‘একই পৃথিবী’ থিমের ওপর প্রথম এই দিনটি পালিত হওয়া শুরু হয়। ২০১১ সালে ভারতের রাজধানী শহর নয়াদিল্লীতে আয়োজিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস, থিম – ‘বন ও বন সম্পদের সংরক্ষণ’। এ বছর (২০১৬) দক্ষিন আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলা শহরে ‘বন্যপ্রাণী নিয়ে চলা বিশ্বব্যাপী অবৈধ ব্যাবসা অবিলম্বে বন্ধ করা’ থিমের ওপর এই দিনটির পালন হচ্ছে। পাশাপাশি সারা বিশ্বের মানুষ এই আন্তর্জাতিক দিবসটি পালন করতে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু শুধু একদিন এই দিন পালন করলে হবেনা সারা বছর ধরে চালিয়ে যেতে হবে এই প্রচার, স্কুল কলেজ থেকে অফিস বা পাড়ার ঠেক সর্বত্র। পরিবেশ দূষণের প্রভাবে বদলে যাওয়া পরিবেশ ও সেই পরিবেশে নিজেদের স্বভাবের পরিবর্তনে বাধ্য হওয়া জীবগুলি সম্পর্কে প্রয়োজন গভীর গবেষণার। ব্যাক্তিগত ভাবে পরিবেশ পরিবর্তনের কিছু টুকরো তথ্য পরিবেষণের চেষ্টা করলাম। আসুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে সার্থক করে তুলি এই সব জীবদের রক্ষার মধ্যে দিয়ে।

বাসা তৈরির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে পায়রা নিজের বাসায়সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘বাংলাদেশ’ কবিতার গ্রাম বাংলার সাথে আজকের বাংলার বিস্তর ফারাক। কথাগুলো আজ বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। গ্রাম বাংলায় আজ সচরাচর চাতকের দেখা মেলে না, বাবুইও যেন ভুলে গেছে বাসা বাঁধতে। ছোটো বড় পুকুর গুলো ভরাট হয়ে সেখানে গজিয়ে উঠছে বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ী, সুউচ্চ ইমারত কিংবা শপিংমল, তাইতো পাড়ার ছেলেরা আর ‘জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটেনা’। আজ আর কোন ‘গফুর’ই তার প্রিয় ‘মহেশের’ মৃত্যুতে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করেনা। আমাদের মধ্যে থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে আবেগ, আর আমরা প্রত্যেকেই পরিনত হচ্ছি এক একটি যন্ত্রমানবে। যন্ত্রের প্রতি আমাদের এই ভালবাসা আমাদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে দূরে, যন্ত্রদানবদের সাম্রাজ্যে। যেখানে ‘হীরক রাজার’ মতো কোন দুষ্টু রাজার পোষা বিজ্ঞানী তার ‘মগজ ধোলাইয়ের’ যন্ত্রে আমাদের মস্তিস্ক থেকে মুছে ফেলছে প্রেম, প্রীতি আর ভালবাসার আবেগকে। প্রকৃতিকে আমরা মা বলে সম্বোধিত করি আর তাই মায়ের কাছ থেকে চেয়েনি যখন যা প্রয়োজন। সে চাওয়ার অন্ত নেই, আর সেও হাসি মুখে সব আবদার মেনে উজাড় করে দেয় নিজের সবটুকু। এই পাওয়ার নেশায় আমরা চাই আরও বেশী বেশী, যা লোভেরই নামান্তর। মানুষের চাহিদা পূরণের সামর্থ্য প্রকৃতির থাকলেও, কারো লোভ মেটানোর ক্ষমতা বোধকরি স্বয়ং বিধাতা পুরুষেরও নেই। তাই ধরিত্রী আজ নিঃস্ব। সব শেষ হয়ে আসার আগে আমরা চাইছি অন্য কোথাও অন্য কোনো গ্রহে পালিয়ে যেতে স্বার্থপরের মতো। তাইতো গ্রাম বাংলার রাঙামাটিতে হাঁটার বদলে মঙ্গলের লালমাটিতে পা ফেলার স্বপ্ন দেখছি জেগে-ঘুমিয়ে। কিন্তু সেখানে কি বাবুই বাসা বোনে, না মধ্য রাত্রিতে ভোর হল ভেবে বাড়ীর পাশের কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে থাকা কোকিলটা উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে ? হয়তো এদের কোন বিকল্প জীব আছে আমাদের অভ্যর্থনা করতে! পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন জীবজন্তুর মধ্যে বেশ কিছু স্বভাবগত ও আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর যারা এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না তারা হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ থেকে। উদ্ভিদ থেকে প্রাণী সবাই সমান ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই ধ্বংসাত্মক পরিবেশ পরিবর্তনের প্রভাবে। অন্যান্য জীবদের থেকে পাখি আমাদের অত্যন্ত কাছের। অনেক চেনা অচেনা পাখি আমাদের নিত্য সঙ্গী। ভোর বেলা মুরগীর ঘুম ভাঙ্গানো ডাক থেকে শুরু করে গভীর রাতের অন্ধকারকে চিরে ফেলা কোন নিশাচর পাখির অ্যার্লাম কল আমাদের নিশি-দিন যাপনের সাথী। তাই পাখি নিয়ে আলোচিত হল এখানে। যদিও পরিবেশের অন্যান্য জীবগুলিও সমান ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন বিভিন্ন গবেষণায় ধরা পড়েছে।

পায়রার সাময়িক বাসস্থান জীবন চলমান তাই সে জানেনা থেমে থাকার মানে, সাথে সাথে পরিবর্তনশীলও বটে। তাইতো এদের অনেকেই নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে শহুরে জীবনের সাথে কনক্রিটের ঘরে সংসার পেতে। ছোটো ছোটো গ্রাম গুলি আজ দ্রুত রুপান্তরিত হচ্ছে আধুনিক সুবিধা যুক্ত মাল্টিসিটিতে যেন রুপকথার সেই ‘রুপান্তরম রস’ এর প্রভাবে। তাই আজ গ্রামের পুকুরের ধারে তাল-খেজুরের সারি দেখা যায়না, দেখা যায়না শীতের প্রাক্কালে নতুন গুড়ের জন্য নতুন হাঁড়ি লাগানো সারবদ্ধ খেজুর গাছের দলকেও। এই আদিম সংস্কৃতি আজ ঢাকা পরে গেছে আধুনিক মেশিনের ভারে। আধুনিক যন্ত্র সম্বলিত বিশাল বিশাল কারখানায় প্রস্তুত হচ্ছে মৌচাক থেকে ভাঙা খাটি মধুর বিকল্প। রেশম কীট চাষের স্থান আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আধুনিক পলি-ইস্টার বা সুইস্- কটনের রমরমা বাজার। আজ থেকে প্রায় বেশ কিছু বছর আগের কথা, স্কুল থেকে ফিরে জানলার রডটায় হাত রেখে দাঁড়াতেই দেখা মিলত একদল শুকুনের পরিবারের। বাড়ীর উল্টোদিকে পাঁচ-ছটা তাল গাছে বাস ছিল ওদের। সারা দেশ থেকে এক যোগে সব শুকুন উধাও হয়ে গেলো নিমিষের মধ্যে, আমাদের চাহিদা পূরণের তাগিদে। আমার বাড়ীতেও ছোটো থেকে দেখে এসেছি প্রায় ৫০-৬০ টি পায়রার দলকে বাস করতে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারাও যেন পরিবর্তন করে নিচ্ছে নিজেদের বাসস্থান আমাদের পরিবর্তনের সাথে সাথে। এখনো তাদের দেখা মেলে তবে আবাসিক হিসাবে নয় বরং অথিতি আবাসিক হিসাবে মাঝে মধ্যে। একসময় আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যাওয়া চড়ুই পাখি আবার ফিরে এসেছে আগের ছন্দে বিভিন্ন ধরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গুলির সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তবে এরাও বাসস্থানের অভ্যাস বদলেছে, আগে মাটির ঘরের খড়ের চালে বা মাটির ‘কোঠা’ বাড়ীর টিনের চালার ফাঁকে এরা বাসা করে থাকতো। কিন্তু এখন সেসব জায়গায় পরিবর্তে এদের পুরনো পাইপের ফাঁকে, পাকা বাড়ীর ঘুলগুলিতে, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে, মিটার বক্সে অথবা টিউব লাইট বা হোল্ডারের গায়ে বাসা করে থাকতে হয়। সেখানেও অবশ্য এদের বাসস্থানের জন্য পাল্লা দিয়ে সংঘর্ষ করতে হয় পায়রার, ঘুঘু এবং শালিকের মতো পাখিদের সাথে। বাবুই পাখির সৌন্দর্য তার আকর্ষণের মূল কারণ নয় তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ তার বাসার জন্য। বর্ষার সময় সময় প্রায় দিন ছাদ থেকে দেখতাম বাবুই পাখির দুটি বা তিনটি দল খেজুর গাছের পাতা থেকে সুন্দর ভাবে সরু সুতোর মতো পাতা কেটে উড়ে যাচ্ছে আর সামনের তাল গাছের ডাল গুলোতে বাসা বুনছে। কী সুন্দর তাদের বাসার গঠন কী সুন্দর আর সাবলীল তাদের কারীগরি, যেন এদের কাছে হার মানে যেকোনো কোট-টাই পরা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের দলও। কিন্তু তাদের বাসা এখন খালি, এরাও যেন পালিয়েছে কোথাও। বুলবুলি আর ধান খায়না, সেও অভ্যস্ত হয়েছে বাঁশপাতির মতো পতঙ্গ ধরে খেতে। আকাশের উড়ন্ত কালো চিলের দল আজ নিজেদের মাছ ধরতে পটু করে তুলেছে, খাবারের অসুবিধা কে মেটাতে। মাংসের দোকানে কাছা কাছি তাই আজকাল এদের বেশ ভালো সংখ্যায় দেখা যায়। শহরাঞ্চলে এদের সংখ্যা এখন অন্যান্য পাখিদের থেকে বেশী।

মৌটুসি পাখির গাছের বদলে ঘরের গ্রিলে বাসাবিভিন্ন স্থানে নগরায়ন ও রাস্তা সম্প্রসারণের মতো বড় বড় প্রকল্প গুলি বাস্তবায়িত করার জন্য কেটে ফেলতে হচ্ছে রাস্তার ধারের অগণিত প্রাচীন মহীরুহদের অথবা ভরাট করা হচ্ছে পুরনো জলাশয় এবং পুকুর গুলিকে। একমাত্র সরকারী তকমা প্রাপ্ত রামসার সাইট বা ইম্পরট্যান্ট বার্ডিং জোন গুলি ছাড়া প্রায় সব জলাশয় ভরাট হয়ে তার জায়গায় দ্রুত গজিয়ে উঠছে বড় বড় মাল্টিপ্লেক্স। দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো শক্ত করতে শিল্পানয়নের জোয়ার। যা বর্তমান পরিস্থিতি সাপেক্ষে আবশ্যিক ভাবে প্রয়োজন কিন্তু এখানে দরকার পদ্ধতিগত সংশোধনের। বন্ধ হওয়া কারখানা না খুলে তার পাশে গড়ে উঠছে নতুন সব কারখানা (উদাহরণ হিসাবে বলা যায় দুর্গাপুর শহরের প্রান্তে এবং অন্ডাল ও রানীগঞ্জের মাঝে NH-2 এর ওপর রাস্তার ধারে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা স্পঞ্জ আয়রনের কারখানাগুলি, যার অধিকাংশ আজ বন্ধ)। একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ব কোলকাতার জলাভূমি ভরাটের জন্য প্রায় ১০৯ টি প্রজাতির পাখির দেখা মিলছেনা ঐ সব অঞ্চলে, পরিযায়ী পাখিরাও ঐ সব অঞ্চলে আর সময় মত আসছেনা, আসলেও তাদের সংখ্যা আশানুরূপ নয়। এছাড়াও বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত জোকা, রাজারহাট জলাভূমির মতো গুরুত্ব পূর্ণ বার্ডিং সাইট। দুর্গাপুর ব্যারেজ, চিত্তরঞ্জনের কার্নেল সিং পার্ক, ডানকুনি ওয়েটল্যান্ড, সাঁতরাগাছি ঝিল, লালবাঁধ, সাহেববাঁধ, নয়াবাঁধ ও বৈদ্যবাটি ক্যানালের মতো পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা গুলি আজ নিরাপদ নয়। সেখানও ভয় রয়েছে নগরায়নের প্রভাবের পাশাপাশি গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো ‘পচার’ বা চোরা শিকারির।

চড়ুইয়ের বাসা রক্ষাপূর্ব কোলকাতার মতো একইরকম ঘটনার সাক্ষী দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অম্বুজা জলাভূমিতে, সেখানেও পাখির সংখ্যা কমছে দিন দিন। সাম্প্রতিক ১৮ই মে চালু হওয়া অন্ডালের কাজী নজরুল ইসলাম বিমান বন্দর ও বিমান নগরীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আগে ১১০ টির বেশি প্রজাতির পাখির দেখা মিলত বছরের বিভিন্ন সময়ে কিন্তু সেখান থেকেও পাখির সংখ্যা কমছে। সাথে সাথে এইসব অঞ্চলে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন ও খাদ্যের অভাবের জন্য এখান থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন গাছ গুলি কেটে ফেলার জন্য অনেক পাখি তাদের প্রাকৃতিক আবাস হারাচ্ছে। এখন আর আগের মতো সন্ধ্যে হলে প্যাঁচার ডাক শোনা যায়না। যদিও খুব প্রত্যন্ত গ্রাম গুলিতে এদের মাঝে মাঝে দেখা যায় তবে সে সব গ্রামও দ্রুত পা বাড়াচ্ছে নগরান্নয়নের পথে। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে আমরা সবাই হাঁটছি। উদ্ভিদ কূল থেকে প্রাণী কূল সকলের অস্তিত্ব আজ বিপন্নতার দোর গোড়ায়, বাদ নেই মানুষও। উন্নয়ন সবার কাম্য, কিন্তু সে তার সাথে সাথে মাথায় রাখতে হবে পরিবেশ সচেতনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও। বর্তমানে প্রত্যেক প্রকল্প (সরকারি বা বেসরকারি) অনুমোদনের প্রথমেই পরিবেশবিদদের পরামর্শ প্রয়োজন। সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে নেওয়া সে অঞ্চলের পরিবেশের তথ্য। একমাত্র সচেতন নাগরিকের সঠিক সিদ্ধান্তই রক্ষা করতে পারে আমাদের অস্তিত্বকে।

 

রডোডেনড্রন – তোমায় দিলাম আজ

মার্চ ২০১৪, শহর কলকাতায় তখন ‘বসন্ত এসে গেছে’ (যেটুকু টের পাওয়া যায় আর কী)! ঠিক করলাম পাহাড়ে খুঁজতে যাব বসন্তকে..দেখব কেমন হয় তার রূপ-রং।

অতএব ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়া বসন্তের খোঁজে। গন্তব্য হিলি-ভার্সে-ওখেরে..সিকিমের পশ্চিম ঢালে সাজানো ছোটো ছোটো গ্রাম।

দার্জিলিং মেল ধরে এন. জি. পি স্টেশনে নামতেই মন ভালো করে দিল একরাশ ঝলমলে রোদ্দুর। জীপে চেপে রওনা দিলাম সিকিমের দিকে। একদিকে হিমালয়া তরাই, অন্য দিকে তিস্তা – আমাদের সঙ্গী রইল সর্বক্ষণ।

IMG_0463

সিকিমে গাড়ি ঢুকতেই পাহাড়ের রূপ বদল..কোথাও সে সবুজে মোড়া-আবার কোথাও সে রূক্ষ–ধূসর। ঢালে ঢালে সাজানো ছবির মতো সুন্দর গ্রাম!

IMG_0511

বেশ কিছু পথ চলার পর গাড়ী থামালো আমাদের নেপালী চালক..জানালা দিয়ে হাত দেখালো বাইরে – আর সেই প্রথম দেখতে পেলাম তাকে। একরাশ গাম্ভীর্য আর অনেকখানি দর্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের রানী ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। প্রথম দেখাতেই বাকরূদ্ধ হলাম। বরফে মোড়া এই শৃঙ্গের সৌন্দর্য বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। প্রকৃতি এত সুন্দরও হয়?

IMG_0510

মুগ্ধতা কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম। সাত ঘন্টা্র যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল ওখেরে পৌছে আমাদের গেস্টহাউসের লেপচা মালিকের আতিথেয়তায়। পূর্ণিমার রাতে কনকনে ঠান্ডায় ওই মালিকের বসার ঘরে আগুন পোহাতে পোহাতে চলল গল্পকথা।

IMG_0512

পরের দিন নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু হল ভার্সে ভ্যালির দিকে। ভার্সের আরেক নাম ‘Valley of Rhododendron’। বসন্তের রঙিন দিনে এই ভ্যালিতে রঙের রায়ট লাগে। রডোডেনড্রনে ভরে ওঠে ভার্সে।

DSCN0308

ওখেরে থেকে ভার্সে যাওয়ার পথ ট্রেক করে যেতে হয় ভার্সে রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারির মধ্যে দিয়ে। সদলবলে শুরু হল আমাদের ট্রেকিং। জঙ্গলের ভিতর পায়ে পায়ে তৈরী পথ আর অন্যদিকে গভীর খাদ – সেই পথ কোনোদিন ভোলার নয়। চারপাশে এত নিস্তব্ধতা যে খসে পড়া পাতার শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। সেই নিশ্চুপ পথে হাঁটতে হাঁটতে ৪কিমি পথ কিভাবে যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেও পারলাম না। সেই প্রথম ট্রেক – ক্লান্তি তো ছিলই – কিন্তু তার সাথে ছিল একগুচ্ছ আ্নন্দ। প্রকৃতিকে বন্ধু করে ভার্সেতে পৌছানোর আ্নন্দ।

DSCN0332

রডোডেনড্রন তখনো সব ফোটেনি – ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এদিক ওদিক। আমাদের কটেজের পিছনেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকায় তার দেখা মিললোনা।

DSCN0339

সারাদিন আড্ডা হইচই করে কেটে গেল।বিকেলে আকাশ কালো করে নেমে এল বৃষ্টি – পাহড়িয়া বৃষ্টি। পাহাড়ের এই প্রান্তে কারেন্ট এখনো আসেনি। তাই মোমের আলোই ভরসা। জমে যাওয়া ঠান্ডা আর মোমবাতি রাত – মনে থেকে যাবে আজীবন।

IMG_0522

রাত যত বাড়তে থাকল নিস্তব্ধতা তত গাঢ় হলো। নিঝুম জঙ্গল, ঝুপঝুপ বৃষ্টি আর হিম হাওয়া সঙ্গ দিল সারারাত।

IMG_0516

পরদিন ঘুম ভাঙতেই দেখলাম মেঘ উধাও। ফুরফুরে রোদের জন্মদিন। ছুট্টে বাইরে গেলাম – যদি একঝলক দেখা যায় কাঞ্চনকন্যাকে সেই আশায়। এবার সে আশা ভাঙতে দিলোনা।

DSCN0240

দেখলাম রোদের মুকুট মাথায় আর বরফের গয়নায় সেজে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের রানী। আরো একবার কথা হারালাম, আরো একবার প্রেমে পড়লাম পাহাড়ের।

DSCN0231

ধীরে ধীরে মেঘ এসে ঢেকে দিল সেই সুন্দরী রানীকে।এদিকে ততক্ষণে আমাদেরও ফিরে আসার সময় হয়ে এল।

DSCN0001

গুটিগুটি পায়ে আবার রওনা হলাম ওখেরের দিকে। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ফিরে যাওয়া। শুনতে পেলাম মেঘের আড়াল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন বলছে- “আবার আসিস – থাকব তোদের অপেক্ষায়”।

উত্তর সিকিম ভ্রমণ

অফিসের ব্যস্ত শিডিউল থেকে সময় ম্যানেজ করে বেরোলাম আমরা চার জনে একটু নর্থ সিকিম ঘুরতে। আমাদের বেস পয়েন্ট ছিল গ্যাংটক। সেখান থেকে প্রথমে গেলাম লাচেন হয়ে গুরুডোংমার লেক। যাওয়ার রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। শেষের কয়েক কিলোমিটার পাকা রাস্তা, তার আগে শুধুই পাথর, রাস্তা বলে কিছু নেই। শেষ কিছুটা রাস্তা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তবে ওখানে পৌঁছে আসল জিনিসটা দেখা গেল। গুরুডোংমার লেকের সৌন্দর্য্য দেখে অনেকেরই প্রায় ভির্মি খাওয়ার জোগাড়। যদিও সেটা বোধহয় ওই উচ্চতায় (১৭৮০০ ফিট) অক্সিজেন আর হাওয়ার প্রেশার কম থাকায় হয়েছে।

জোকস অ্যাপার্ট, সত্যিই অসাধারণ সুন্দর এই লেকটি। এছাড়া শুনলাম এটা খুবই পবিত্র স্থান বৌদ্ধ এবং শিখদের কাছে। যাইহোক, গুরুডোংমার লেকের সৌন্দর্য্য নিয়ে লিখতে বসলে পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে। আমরা ওখানে মাত্র আধ ঘন্টা ছিলাম। সেখান থেকে পরের দিন গেলাম লাচুং, তারপর আমাদের গন্তব্য ছিল ইয়ুমথাং উপত্যকা এবং উষ্ণ প্রসবণ। ইয়ুমথাং উপত্যকা আসলে ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ নামে পরিচিত। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষে গিয়ে সেরকম কিছুই দেখতে পেলাম না। খুবই ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে শুধু তিস্তার একটা শাখার সৌন্দর্য্য দেখলাম। সেখান থেকে একটু নেমে, উষ্ণ প্রসবণের জলে হাত গরম করে সত্যিই খুব আরাম পেলাম। কথিত আছে, ওই হলে স্নান করলে নাকি গায়ের ব্যাথা আর বাত সেরে যায়। সেই আশায় ওখানে অনেকেই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটা চৌবাচ্চায় বসে থাকে।

এরপর আমাদের ট্যুর শেষ করে আবার গ্যাংটকে ফিরে আসা, ম্যালে একটু সময় কাটানো, সেখান থেকে নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে বাড়ি ফিরে আসাটা আর বলতে ভাল লাগছে না। এত তাড়াতাড়ি ট্যুর শেষ করতে মন একেবারেই চাইছিল না। তবে আরেকবার যাওয়ার ইচ্ছে নিয়েই ফিরে এলাম কলকাতার বুকে। এখনো মাঝে মাঝে এই ভ্রমণের কথা আর গুরুডোংমার লেকের সৌন্দর্য্য মনে মনে হাতছানি দেয়।

উত্তর সিকিম  থেকে কয়েকটা ছবি রইল। কেমন লাগল সবাই জানাবেন।

WayToGurudongmar1
গুরুডোংমার লেকের পথে

 

WayToGurudongmar2
গুরুডোংমার লেকের কাছে

 

Gurudongmar
গুরুডোংমার লেক

 

Gurudongmar2
গুরুডোংমার লেক

 

Yumthang
ইয়ুমথাং উপত্যকা

 

yumthang1
ইয়ুমথাং উপত্যকা

 

Yumthang2
ইয়ুমথাং উপত্যকা

 

tessta
তিস্তার একটি শাখা

 

way to hotspring
উষ্ণ প্রসবণের পথে

 

GangtokMall
গ্যাংটক ম্যাল

রঙ-বেরঙের পাখি (২)

রং-বেরঙের পাখি মানেই ছোটবেলা, শীতকাল, চিড়িয়াখানা, কমলালেবু, আর ক্রিসমাসের ছুটি। কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়া আমাদের ছোটবেলায় ছিল না, এখন হয়েছে। আমরা পাখি দেখতাম গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে, বাড়ির চালে, কারণ তারা তখনো সংখ্যায় অনেক ছিল। এখনকার মত ক্যামেরার লেন্সে তাদের খুঁজতে বেরোতে হত না। শীতকাল মানেই পরিযায়ী পাখি আসবে, শুধু চিড়িয়াখানাতে নয়, মাঝে মাঝে আমাদের মফস্বলের খালবিলেও। এখন তারা হয়ত অভিমান করে আর আসে না, তবু আমরা তাদের খুঁজতে বেরোই। সেরকমই কিছু পাখির ছবি উপহার দিয়েছেন কৌশিক সেন

russet sparrow
রাসেট স্প্যারো

 

verditer flycatcher
ভারডিটার ফ্লাইক্যাচার

 

shikra
শিকরা

 

grey headed canary flycatcher
গ্রে-হেডেড ক্যানারি ফ্লাইক্যাচার

 

asian barred owlet
এশিয়ান বারড আউলেট

রঙ-বেরঙের পাখি (১)

মনে আছে, ছোটবেলায় কে যেন আমাকে সালিম আলি’র একটি সচিত্র পাখির বইয়ের বাংলা অনুবাদ উপহার দিয়েছিল। বাচ্চারা যেমন ছবির বই পেলে খুশি হয়, আমিও মাঝে মাঝেই ওটা উল্টেপাল্টে পাখির ছবি দেখতাম। ল্যাজের ডগা লালে রাঙানো শাহ বুলবুলি নিজেদের বাগানে দেখতে পেয়ে মনে মনে সালিম আলিকে ধন্যবাদও দিয়েছিলাম। আজও বাগানে, বারান্দায়, রাস্তায়, ঘরের পাশে ইলেকট্রিকের তারে, যে কোনোখানে পাখি দেখতে পেলে মন ভাল হয়ে যায়। এই কয়েকটি রঙ বেরঙের পাখির ছবি তাই আপনাদের জন্য খুঁজে এনেছেন নবনীতা সেন

lesser flameback woodpecker
লেসার ফ্লেমব্যাক উডপেকার

 

greater flameback woodpecker
গ্রেটার ফ্লেমব্যাক উডপেকার

 

lesser yello-naped woodpecker
লেসার ইয়েলো-নেপড উডপেকার

 

crested kingfisher
ক্রেস্টেড কিংফিশার

 

rufus georgetted flycatcher
রুফাস জর্জেটেড ফ্লাইক্যাচার

সাদা-কালো Ibis

এই পৃথিবীতে অগুনতি প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। তাদের কারোর বর্ণের সম্ভার চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো, কারো কণ্ঠের গান মন মাতিয়ে দেয়। কিন্তু আজ যে দুটি পাখির সম্পর্কে এখানে জানব তারা রঙের দিক থেকে নেহাতই সাদামাটা। কিন্তু এদেরও কিছু বিশেষত্ব আছে। আসলে এই পৃথিবীর প্রত্যেকটি জীবেরই কিছু নিজস্ব গুণ আছে। তারা কেউ বা অতি ছোটো আবার কেউ পরিচিত সুবিশাল আকৃতির জন্য। আইবিস (Ibis) পেলিক্যানিফর্মিস (Pelecaniformes) বর্গের অন্তর্ভুক্ত থ্রেসকিওর্নিথিডি (Threskiornithidae) গোষ্ঠীর পাখি। এদের চেনার সব থেকে ভালো উপায় হল এদের চঞ্চু, ঠিক যেন কাস্তের মতো বাঁকানো আর পা গুলোও বেশ বড় বড় শামুক-খোলদের মতো। ভারতে তিন ধরণের আইবিস যথা Oriental White Ibis (Threskiornis melanocephalus), Black Ibis (Pseudibis papillosa) এবং Glossy Ibis (Plegadis falcinellus) দেখতে পাওয়া যায়। তবে আজকের আলোচনা থাকছে White Ibis এবং Black Ibis প্রসঙ্গে, যাদেরকে পশ্চিমবঙ্গের মাঠ ঘাটে এবং খোলা ধানক্ষেত গুলিতে সহজে দেখা যায়।

White Ibis (Sada Kastecera)

প্রথমেই আসব সাদা আইবিস বা কাস্তেচেরা বা সাদা দোচরা প্রসঙ্গে। Oriental White Ibis কে Black-headed Ibis ও বলা হয়ে থাকে, এদের বিজ্ঞান সন্মত নাম Threskiornis melanocephalus আর বাংলা নাম কাস্তেচেরা বা সাদা দোচরা। এদের খোলা মাঠে একসাথে জোট বেঁধে খাবারের খোজ করতে দেখা যায় শামুক-খোল বা Asian Openbill-Stork দের সাথে। আমি বর্ধমান যাওয়ার পথে বা বর্ধমান থেকে কালনা বা কাটোয়া যাওয়ার মূল রাস্তার পাশে এদের জোট বেঁধে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি বেশ কয়েকবার। এদের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা যদিও ন্যাড়া মাথা, গলা ও পায়ের রঙ কালো। আকারে মোটামুটি ৭৫ সে.মি. মতো হয় এবং পা গুলি যথেষ্ট লম্বা ও শক্তপোক্ত হয়। এদের ঠোঁট শক্ত কালো এবং কাস্তের মতো সামনের দিকে বাঁকানো। এরা খুব দ্রুত এবং সোজা ভাবে উড়তে পারে। গলায় স্বর উৎপাদনকারী পেশীর অভাব থাকায় বেশী জোরে ডাকতে পারেনা, কেবল মাত্র প্রজনন কালে এবং সীমা নির্ধারণের জন্য মৃদু শব্দ বের করে। প্রজনন কালে ঘাড়ে ও ডানার কাছে ধূসর রঙের আভা দেখা যায় এবং গলার নিচের অংশে বাহারি পালক গজায়। এরা জল জমা ধান মাঠের মধ্যে থেকে শামুক, ছোটো মাছ, ব্যাঙ এবং ছোটো বড় পোকামাকড় ধরে সংগ্রহ করে। এরা বেশ সামাজিক পাখি, শামুক-খোলদের মতো কলোনি তৈরি করে গাছের ওপরে বাসা করে এবং প্রজনন ঋতুতে ২-৪টি ডিম পাড়ে।

Black Ibis (Kalo Kastecera)

সাদা আইবিসের মতোই কালো আইবিসেরও অনেক নাম। Indian Black Ibis বা শুধু Black Ibis ছাড়াও আরেকটি নাম হল Red-napped Ibis, এদের বিজ্ঞান সন্মত নাম Pseudibis papillosa আর বাংলা নাম কালো কাস্তেচেরা বা কালো দোচরা। বর্ধমান জেলার অন্ডালের ফাঁকা মাঠ থেকে ১০ই আগস্ট ২০১৩ তারিখে প্রথম এই পাখিটির সন্ধান পাই এবং ছবি তুলতে সক্ষম হই। আকারে ও দৈহিক গঠন সাদা আইবিসের মতোই হয় তবে দেহের রঙের পার্থক্য লক্ষণীয়, যা থেকে খুব সহজে পার্থক্য করা যায়। এদের গায়ের রঙ ঘন কালো তবে কাঁধের কাছে সাদা রঙের বড় ছোপ দেখা যায়। কালো রঙের ন্যাড়া মাথার ঠিক ওপরে লাল রঙের ত্রিকোণাকার ছোপটি দেখে দূর থেকে এদের চেনা যায়। বাঁকানো চঞ্চুটির রঙ হলদেটে ধরণের হয় আর পায়ের রঙ পোড়া ইঁটের মতো। ধান জমির পাশের খোলা শুষ্ক জমিতে এদের একসাথে দল বেঁধে বা একা একা থাকতে দেখা যায়। অন্যান্য আইবিসদের বিপরীতে এরা জলা জায়গার পরিবর্তে শুকনো খোলা মাঠে থাকতে বেশী পছন্দ করে। এছাড়াও এরা সাদা আইবিসদের মতো অন্য জাতের পাখিদের সাথে বাসা বাঁধে না, বরং নিজেদের দু-তিনটি দল বাসা বেঁধে থাকে। গাছের ওপর বড় বাটির মতো আকারের বাসা বানায় তবে শকুন বা ঈগলের পরিত্যক্ত বাসাতেও থাকতে দেখা যায়। প্রজনন কালে ২-৮টি ডিম পাড়ে। এরাও সচরাচর উঁচু স্বরে ডাকেনা তবে কখনো কখনো ওড়ার সময় নাকিস্বরে চিৎকার করে। সাদা আইবিসদের মতো এরাও দ্রুত এবং অনেক উঁচুতে উড়তে পারে। এদের খাদ্যাভাসে আছে শস্যদানা, ছোটো পোকা, ছোটো সাপ, গিরগিটি ধরণের জীব। যদিও এরা পশ্চিমবঙ্গে বেশ ভালো সংখ্যায় আছে তবু দিন দিন চাষের জমি ও খোলা জমির পরিমাণ কমে আসার জন্য চিন্তার কারণ দাঁড়িয়েছে। আশাকরি এদের আমরা শকুনের মতো হারিয়ে ফেলব না!

নীলকন্ঠ

Nilkantho

নামটা শুনেছেন নিশ্চয়ই। এই পাখিটিকে বলা হয়। ইংরিজিতে Indian roller.
কিছুদিন আগেও ইংরিজিতে আর একটা নাম ছিল, ‘Blue jay’. কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, ও নামটা ভুল। ‘ব্লু জে’ আসলে অন্য পাখি। এবার আমি যদি বলি, ‘নীলকন্ঠ’ নামটাও ভুল, নীলকন্ঠ আসলে অন্য পাখি? সবাই রে রে করে তেড়ে আসবেন না? চিরকাল জেনে এলাম এই পাখিটা নীলকন্ঠ, আর উনি এলেন কোন বিশারদ নাম নিয়ে গোলমাল পাকাতে?

আচ্ছা, বলুন তো, চিতাবাঘ দেখেছেন, ওই ইংরিজিতে যাকে বলে leopard ? সেটাও ভুল নাম জানেন কি? কী করে জানবেন বলুন, বলতে বলতে সেটাই এখন গেড়ে বসেছে। এমন কি চিড়িয়াখানার লেপার্ড এনক্লোজারের বাইরেও বাংলায় লেখা ‘চিতাবাঘ’।, ছোট বেলাত অ-য়ে অজগর আসছে তেড়ে তো আমরা সবাই পড়েছি। মনে আছে, ‘ঙ’ নৌকো,মাঝি ব্যাঙ, চিতাবাঘের সরু ঠ্যাং’? আজ্ঞে হ্যাঁ, সরু ঠ্যাং ওয়ালা ‘Cheetah’-ই বাংলায় ‘চিতাবাঘ’।, যা ভারতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অফিশিয়ালি ১৯৪৮ সালে। তারপরেও দুটো বাচ্চা কীকরে যেন বেঁচে গেছিল। মহারাজা কারনি সিং ( সেই অলিম্পিক শুটার) বীরদর্পে অসহায় বাচ্চাদুটোকে গুলি করে মারেন ১৯৫২ সালে।

তারপর যেহেতু গোল ছোপওয়ালা জন্তু বাঙালি আর দেখেনি(চিড়িয়াখানায়, বাইরে দেখার স্কোপ নেই, বাংলায় ছিলনা), তারা তখন অন্য গোল ছোপওয়ালা জন্তুটাকে চিতাবাঘ বলতে লাগল। কিন্তু আমাদের চেয়ে যাঁরা বয়সে বড়, তাঁদের মুখে ঠিক নামটাই শুনতাম –‘গুলবাঘ’।, ধীরে ধীরে গুলবাঘ নামটা হারিয়ে গেল। লেপার্ড এখন চিতাবাঘ। বাঙালি ছোট লরিকে ‘ম্যাটাডর’ বলে, কোলকাতার সামনের সারির বাংলা, ইংরিজি দুটো কাগজেই তাই লেখা হয়, চিতাবাঘ তো শিশু।

নীলকন্ঠ – আচ্ছা কেউ ভেবে দেখেছেন, কন্ঠটাই তো নীল নয়। বাকি শরীরের অনেকটাই তো নীল। তবে ব্যাটাচ্ছেলের নাম নীলকন্ঠ কেন? কোন যুক্তিতে? শুনুন তবে লেপার্ড যেমন চিতাবাঘ নয়, এটাও নীলকন্ঠ নয়।

আশির দশকের মাঝামাঝি, আনন্দবাজারের ক্রোড়পত্রে বিরাট হেডলাইন ও দারুন আকর্ষক রঙিন ছবি সহযোগে শ্রী দেবদূত ঘোষঠাকুরের এক বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হ’ল, ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’।, সেটি যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের নামানুসারে, তা নিশ্চয় বলে দিতে হবেনা। সেখানে নীলকন্ঠ পাখি নিয়ে অনেক কথা বলা ছিল। শোভাবাজারের রাজবাড়ির যে বিজয়ার দিনে নীলকন্ঠ উড়িয়ে দেওয়ার প্রথা, তার বিরুদ্ধে। পড়ে অবশ্য হাসব না কাঁদব ঠিক করতে পারিনি। নীলকন্ঠ (মানে, এই পাখিটা) নাকি ‘পুরুলিয়া’-র পাখি। কোলকাতায় তাকে ছাড়লে নাকি কাকে মেরে দেবে, ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে বলি,এটি পুরুলিয়া-চুরুলিয়ার নয়, সারা বাংলার যত্র তত্র দেখা যায়। কোলকাতায় কাকে মারবে? গল্ফ গ্রীনে বা টলি ক্লাবে কটা দেখতে চান? কিন্তু গোড়ায় গলদ মহাশয়, এটি নীলকন্ঠ পাখিই নয়।

নীলকন্ঠ পাখি আসলে এরই জাতভাই, নাম ‘কাশ্মির রোলার’ তার কন্ঠ, অর্থাৎ গলাটাই নীল। তাকে পাওয়া যায় লাদাখ অঞ্চলে, মানে যেখানে তার উড়ে যাবার কথা, সেই কৈলাশের খুব কাছে। এখন ভারতের মূল ভূখন্ডে পাওয়া যায়না, কারন, মাইগ্রেশনের রুটে ওদের মেরে মেরে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। তবে এককালে গুজারাট, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র, কেরল ও কর্ণাট অঞ্চলে শীতকালে চলে আসত। তাকে আর দেখা যাচ্ছেনা বলেই এ বেচারার নাম হয়েছে নীলকন্ঠ।

আরও একটা বিষ্ফোরক তথ্য দিচ্ছি। একটা লিঙ্কও দিচ্ছি, সেটা একটা বহু প্রাচীন বইয়ের। বিজয়া দশমী আসলে হয় দসেরার দিনে। মনে রাখতে হবে এই দুর্গাপূজো কিন্তু আসল দুর্গাপূজো নয়। রাজা কংসনারায়ণ চালু করার আগে দুর্গাপূজো হত বসন্তকালে। নীলকন্ঠ ওড়াবার রীতি আসলে দসেরায়। কেন? দসেরার সঙ্গে নীলকন্ঠ বা শিবের কী সম্পর্ক? সম্পর্ক নেই তো। ওই বইটায় বলছে, নীলকন্ঠ আসলে বিষ্ণুর প্রতীক। আপনারা বলবেন, ধূর মশায়, বিষ্ণু আবার নীলকন্ঠ হলেন কবে? আরে বাপু হননি তো। তিনি তো ‘নীলকান্ত’।, বইটায় লেখা আছে, এটি মহারাষ্ট্রের প্রথা। তাদের সঙ্গে দক্ষিণীদের খুব যোগাযোগ ছিল এককালে। দক্ষিনীরা তো ‘ত’ লেখেন টি+এইচ দিয়ে। জয়ললিতা বানান Jaylalitha। তো নীলকান্ত তো Neelkantha – এভাবেই লেখার কথা। তাই নয় কী? লিঙ্ক দিলাম এখানে

তুতুর সাপ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে

Common Sand Boa

পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া যায় এমন সব সাপই যে বিষাক্ত তা কিন্তু নয়, কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষধর সাপ ছাড়া প্রায় সব কটি নির্বিষ। কিন্তু নির্বিষ ও স্বভাবে লাজুক হওয়া সত্ত্বেও কেন তুতুর বা COMMON SAND BOA (Gongylophis conicus)  সাপটির সংখ্যা কমে আসছে সেটাই চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত সাপ সম্পর্কে আমাদের ভয় আমাদের পরিবার থেকেই প্রথমে পেয়ে থাকি। আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা সব সাপই বিষাক্ত এবং মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। তাই এদের সম্পর্কে খানিকটা জেনে নেওয়া প্রয়োজন উভয়েরই নিরাপদে জীবনধারণের স্বার্থে। বর্ধমান জেলার শিল্প ও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চল হল রানীগঞ্জ, এখান থেকেই গত ৭ই জুলাই ২০১৩ তারিখে আমি এই সাপটি প্রথম খুঁজে পাই। এদের সাথে চন্দ্রবোড়া (RUSSLLE’S VIPER ) ও অজগরের (INDIAN ROCK PYTHON) বাচ্চার অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। এই দুটি কারণই এদের ক্ষতির মূল কারণ হিসাবে দাড়ায়। প্রথমত চন্দ্রবোড়ার মারাত্মক বিষের কথা অনেকেরই জানা তাই এদের দৈহিক গঠনের সাথে চন্দ্রবোড়ার মিল থাকায় প্রায় ভুল বশত এদের মেরে ফেলা হয়। দ্বিতীয়ত সাপুড়েরা আমাদের বোকা বানানোর জন্য প্রায় সময় এদের অজগরের বাচ্চা হিসাবে খেলা দেখাতে ব্যাবহার করে তাই এদের খুঁজে পেলেই সাপুড়েদের হাতে ধরা পড়তে হয় এদের।

আকারে বেশ মোটাসোটা ও শান্ত ধরনের সাপ এই তুতুর। এরা দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা এবং স্বভাবে নিশাচর প্রকৃতির হয়। এদের মাথা শরীরের থেকে ছোটো এবং লেজটা ভোঁতা। পিঠ খসখসে আঁশে ঢাকা এবং দেহের আকারের তুলনায় চোখ দুটো খুব ছোটো। হলদেটে সাদা পিঠের ওপর বাদামী রঙের অসমান ছোপ থাকে যার জন্য এদের অনেক সময় চন্দ্রবোড়া মনে হয়। তবে চন্দ্রবোড়ার মাথা আকারে অনেক বড় এবং তেকোনা প্রকৃতির। তুতুরের পেটের অংশ হালকা ঘিয়ে রঙের হয়। স্ত্রী সাপটি পুরুষের তুলনায় লম্বা হয়। এরা সাধারণত রুক্ষ পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। লোকালয় থেকে দূরে ঘাসবন, পাথরের খাঁজ বা পুরনো ইঁদুরের গর্তে থাকতে ভালবাসে। বালি মাটিতে মিশে থাকার মতো দৈহিক গঠনের জন্য এদের উপস্থিতি প্রায় বোঝাই যায় না। এরা ইঁদুর, কাঠবেড়ালি খেতে পছন্দ করে। তবে সুযোগ পেলে ছোটো পাখি, গিরগিটিও ছাড়েনা। এরা এমনিতে খুব শান্ত স্বভাবের হলেও বিরক্ত হলে ছোটো ছোটো লাফ দিয়ে সরে যায় বা কামড়াতে আসে। এরা ডিম পাড়ে না, স্ত্রী তুতুর সাপটি মে-জুলাই মাসে ৬-৮ টি বাচ্চার জন্ম দেয়। সুতরাং এই সাপটি অযথায় মারা পড়ে বা ধরা পড়ে, তাই এদের সম্পর্কে জেনে নিয়ে এদের রক্ষায় দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। তবেই আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে এদেরই সাথে।

 

ঝলমলে পাখি পার্পল সানবার্ড

IMG_4630

IMG_2931একটা ছোট্ট ঝকমকে পাখি সারাদিন আমার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর একটানা জোরালো চুউইট্ চুউইট্ শব্দে মাতিয়ে দিচ্ছে আমার সারা সকাল দুপুর ! তখনও জানতাম না কি চাইছে পাখিটা, হটাৎ একদিন বুঝলাম এটা ওদের প্রজনন ঋতু আর তাই দরকার একটা বাসার, তাইতো ওরা বাসা বেঁধেছে আমার বাড়ির কাঞ্চন ফুলের গাছে।

পার্পল সানবার্ড বা দুর্গাটুনটুনি পাখির নাম কেনো এমন হল তা জানতে হলে পাখিটা দেখতে হবে ঝলমলে রৌদ্রজ্জল দিনে কেননা তখনই ঘন ধাতব বেগুনি রঙের ফাকে ঘন নীল ও সবুজ রঙের আভা ফুটে উঠবে, আর বাচ্চাদের বুকের রঙ যখন উজ্জ্বল হলুদ থাকে তখনতো যেকোনো বিউটি কম্পিটিশন জেতা ওর পক্ষে সম্ভব। স্থান বিশেষে পার্পল সানবার্ডকে মৌটুসি নামেও ডাকা হয়।

পুরুষ পাখিটির থেকে সৌন্দর্যে স্ত্রী পাখিটি কোনো অংশে কম যায়না, স্ত্রী পাখিটির পিঠের রঙ জলপাই বাদামী এবং পেট ও বুকের কাছটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের হয়। সানবার্ডের ঠোঁট এদের অনন্য করে তোলে অন্যান্য পাখিদের থেকে, এদের লম্বা সরু চঞ্ছুটি যেন মধু সংগ্রহের জন্যই তৈরি। উত্তর আমেরিকার হামিং বার্ডের মতো এরাও উড়ন্ত অবস্থায় ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। পার্পল সানবার্ড পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়। এরা আকারে চড়াইয়ের থেকে ছোট হয় এবং এদের বিজ্ঞান সন্মত নাম Cinnyris asiaticus।

পার্পল সানবার্ডের পুরো জীবনটাই বর্ণময় এরা যখন জন্মায় তখন দেখতে প্রায় মায়ের মতো হয়, সারা গায়ে উজ্জ্বল হলুদ রঙ থাকে ধীরে ধীরে যখন বড় হতে থাকে তত তাদের হলদে রঙের জায়গা হারিয়ে রঙ নেয় ঘন নীলচে বাদামী রঙ তবে মাঝে মাঝে বিশেষ করে প্রজনন কালে আবার গলা ও বুকের কাছে হলুদ রং ফুটে ওঠে। প্রজনন পর্বে পুরুষ পাখিটি স্ত্রী পাখিটির সামনে ডানা ছড়িয়ে সৌন্দর্য প্রদর্শন করে এবং গান গায়। এরপর স্ত্রী পার্পল সানবার্ড বসন্তের শেষে বাসা করে গাছের ডালে, আর পুরুষ পাখিটি পাশে থেকে দেখাশোনা করে ও বাসার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। বাসাটা দেখতে খানিকটা ঝুলন্ত থলির মতো হয় এবং ঘাস, নোংরা আবর্জনা ও গাছের পাতলা ছাল দিয়ে এরা বাসা বানায়। বাসাতে দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে এবং স্ত্রী সানবার্ড বাচ্চাদের দেখাশোনা করে যদিও এই সময় পুরুষ পাখিটি খাবারের জোগান দেয়।

এদের ছটফটে স্বভাব ও পুরুষ-স্ত্রী পাখির নিরন্তর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এদের বাচ্চারা শিকারি পাখিদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকে, তবে এদের প্রধান শত্রু শিকরা। পার্পল সানবার্ডের সাথে অন্যান্য সানবার্ডের পার্থক্য শুধুমাত্র এদের রঙের বাহার দেখেই করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে পার্পল সানবার্ড প্রায় ২০-২২ বছর অবধি বেঁচে থাকে। তবে আমরা ইচ্ছে করলেই বাঁচিয়ে রাখতে পারি এদের, দিনের পর দিন গাছপালা কেটে বানানো হচ্ছে বড়বড় ঘরবাড়ি যা কেড়ে নিচ্ছে এই সব সুন্দর সুন্দর নিরীহ পাখিদের বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক আস্তানা। হয়ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এদের দেখতে জেতে হবে কোন মিউজিয়ামে বা সার্চ করতে হবে গুগুল জাতিও কোন সার্চ-ইঞ্জিনে! তাই এখনো সময় আছে ভুল শুধরে নেওয়ার। আমাদের চারপাশের সুন্দর পরিবেশ কে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের মনের মলিনতাকে মুছে ফেলতে হবে, নিজেদের স্বার্থপর মনটাকে বোঝাতে হবে অনেক হয়েছে … আর না।