গর্ব্‌ সে বোলো হম ‘হিন্দু’ হ্যাঁয় (২য় পর্ব)

(পূর্ব প্রকাশিত অংশটি পড়ুন এখানে)

যাক এই ধানাই পানাই বকার একটা উদ্দেশ্য আছে। উদ্দেশ্য বিনা কার্য হয়না। কিছুদিন আগে থেকে কলকাতাবাসীরা কেউ খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা, দেয়ার ইজ আ নিউ গড অন দা হরাইজন। তার নাম –‘ শ্যামবাবা’। শুনলে সাধারণ ‘হিন্দু’ রা অবাক হবেন, বাবা বলতে পেটমোটা কিংবা অতিকায় ফ্যালিক সিম্বল, পুরুষতন্ত্রের প্রতীক শিবঠাকুর। শ্যাম তো চিরকেলে প্রেমিক, সে আবার ‘বাবা’ হল কবে? যদিও পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে কেষ্টবাবুর ছেলেপুলে হয়েছিল, কিন্তু মন্দিরে পূজো পায় বালক গোপাল কিংবা তিনব্যাঁকা (ত্রিভঙ্গ মুরারী) প্রেমিক শ্যাম । তাহলে ‘বাবা’ এল কোত্থেকে?

তাহলে বলি শুনুন, এ শ্যাম সে শ্যাম নন। মন্দিরে ঢুকলেই বুঝবেন। ইনি শুধু একটি কাটা মুন্ডু। আরও গুলিয়ে যাচ্ছে? গোলাবেই। তাই তো এতবড় স্টেটাস। তবে শুনুন, মহাভারতের কাহিনী অনুসারে এঁর নাম বর্বরিক অথবা শর্টে, বব্রিক। ইনি ভীমের, মতান্তরে ঘটোৎকচের পুত্র। ইনি এতবড় বীর ছিলেন, যে এঁকে হারানো কারো সাধ্য নয়, একথা সবাই জানত। মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হতে কিছুদিন ইনি চুপচাপ দেখছিলেন, তারপর আর থাকতে না পেরে অস্তর শস্তর নিয়ে ইনি রওনা দিলেন করুক্ষেত্রের দিকে। ত্রাহি ত্রাহি রব, কেননা জানা গেল ইনি যুদ্ধে পার্টিসিপেট করবেন, তবে এঁর মতি হল, যে হারছে, আমি তার হয়ে খেলব। এবার হারছে তো কৌরবরা। তাহলে পান্ডবের ব্যাটা কৌরবের হয়ে খেলবে? আর খেললে পরে তো দশ গোল দেবে। মুশকিল আসান কেষ্টদা। ভিখারি ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে সামনে হাজির। (এইজন্যই ওঁরা ব্রাহ্মণদের ভিখারি বা ভিখমাঙ্গা বলেন কিনা জানা নেই)।

কেষ্টদা বললেন, ভিক্ষাং দেহী। ক্ষত্রিয় বীর, তার কাছে কেউ কিছু চেয়ে ফেরত যায় না। বর্বরিক ( খেয়াল করবেন, ইংরিজিতে লিখলে – Barbarik ) বললেন, কী চান দ্বিজবর? বামুন ব্যাটা বলল, তোর মুন্ডু চাই। ব্যস, উনি বুঝে গেলেন এই বামনাটা আসলে কে? Barbarik বললেন, ও কে, আই উইল গিভ ইয়া মা’ হেড। আই নো হু ইউ আর। কিন্তু প্রভূ এক শর্তে। আমার কাটা মুন্ডুটা নিয়ে গিয়ে ওই পাহাড়ের মাথায় এমন করে বসিয়ে দিন, যাতে আমি পুরো যুদ্ধটা দেখতে পাই। কিরিষ্টো বললেন, তথাস্তু। তা ছাড়া তোমার এই স্যাকরিফাইস লোকে ইয়াদ করবে আজীবন। কলিযুগে তুমি ভগবান হিসেবে পূজো পাবে। আর আমার নামে তোমার নাম হবে – ‘শ্যামবাবা’।

রাজস্থানের খাটুতে এই বব্রিকের একটা বহু প্রাচীন মন্দির ছিল। কালের প্রভাবে তার ভাঙাচোরা অবস্থা। এই সব মিথিকাল হিরো/হিরোইনদের আঞ্চলিক পূজো আচ্চা হয়, যেটার সার্বিকভাবে কোনও ইম্প্যাক্ট নেই। হিমাচলে দুর্যোধনের মন্দির আছে, হিড়িম্বার মন্দির আছে। আমাদের খোদ বাংলায় হুগলি এবং বর্ধমানের অনেক জায়গায় ভীমপূজো হয়। অতিকায় মাসকুলার ভীম গদাহস্তে  দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তায় ধারে অথবা মাঠের মাঝখানে। হ্যাঁ এখানে আবার নিয়ম আছে, প্যান্ডাল করা চলবেনা। মাথার ওপর আচ্ছাদন থাকবেনা (কেন কে জানে)। পূজো হয়ে গেলে রোদে জলে পড়ে থাকবে মূর্তি। আমরা বাঙালি তো, উত্তর ভারতীয়রা যেমন ‘জয় শ্রীরাম’ বলে বাংলায় ঢুকে পড়ল, আমরা কিন্তু ‘জয় শ্রীভীম’ বলে উত্তর বা দক্ষিণ ভারতে থানা গাড়তে পারলুম না। – ছ্যাঃ ছ্যাঃ।

তা রামায়ণ থেকে মাত্র দুচারটে ক্যারাকটারই ‘ভগবান’ স্টেটাস পেয়েছে। আমাদের লক্ষণ ভাইও শুধুই সাইডকিক, নিজে দেবতা নয়। কিন্তু মহাভারত অনেক পরের কাব্য হলেও বিভিন্ন রিজিয়নে বিভিন্ন দেবতা গেড়ে বসেছেন এই মহাকাব্যের দৌলতে, কে কে কোথায় কোথায় বসে পড়েছেন, তা আগেই বলেছি। এবার এই বর্বরিক রাজস্থানের ‘খাটু’ নামক জায়গায় একটা ভাঙাচোরা মন্দিরে বসেছিলেন কাটামুন্ডু নিয়ে। ওই মন্দিরে ক্ষত্রিয়রা পূজো দিত, তাও আবার বছরে একদিন কী একটা উপলক্ষে ( অত ডিটেল কব্জা করতে পারিনি এখনও)। মন্দিরটাও অনাদরে অবহেলায় প্রায় ভগ্ন দশায় পড়ে ছিল। হঠাৎ কোত্থেকে সেই অগ্রহরি সমাজের কোনও এক মোড়লের মাথায় কিছু একটা খেলল। একটা অলৌকিক গল্প পয়দা হয়ে গেল রাতারাতি। খাটু মন্দিরের জয়জয়কার বিশ্ব(?) (সেটাই নাকি ক্লেম) জুড়ে শুরু হয়ে গেল। এখন সেই ‘শ্যামবাবা’ আগরওয়ালদের দেবতা। খাটুতে সেই বিশেষ দিনে কত লক্ষ মানুষের সমাগম হয়, তা শুনলে কুম্ভমেলাও লজ্জা পাবে। খাস কলকাতাতে অন্তত তিন জায়গায় শ্যামবাবার মন্দির হয়ে গেছে। কমলা ও গোলাপি ফ্ল্যাগ নিয়ে রাস্তা আটকে প্রোসেশন হয় প্রত্যেক মাসে। বছরে তিনদিন ‘জাগরণ’, মানে, ওই বরাহনন্দনগুলো জাগবে সারা রাত, আর ডেসিবেল যে উচ্চতায় পৌঁছবে বিশাল বিশাল সাউন্ড বক্স থেকে, তাতে সারা পাড়াও জাগতে বাধ্য হবে। বাগুইআটির দিকে কেউ থাকলে ভাল বলতে পারবেন। যে দেবতার অস্তিত্বের কথা পাশের গাঁয়ের লোক জানতনা বছর দশ বারো আগেও, সে ভারতজুড়ে দখলিসত্ব কায়েম করছে রাতারাতি, প্রত্যকে জায়গায় একটা অলৌকিক গল্প রটিয়ে।

এই শ্যামবাবা কাদের দেবতা? হিন্দুদের?

যে তারা মায়ের মন্দিরে গিয়ে সুভাষ চক্কোত্তিকে শিপিয়েম প্রায় বের করেই দিয়েছিল, সেই ‘তারা’-ও কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম থেকে হাইজ্যাকড। তবে এখানেও কমিউনিজমের ডাব্‌ল স্ট্যান্ডার্ড – সেই গলায় গামছা মন্ত্রী (এখন অন্য কারণে পার্টির বাইরে) হজ করতে গেলে আলিমুদ্দিন চুপ। কিন্তু সুভাষ চক্কোত্তি তারাপীঠে গেলেই মহাভারত ডিসিক্রেটেড, ভাই পারিস বটে।

চুপি চুপি বলি, খুব তাড়া করবে লোকে, তিরুপতি মন্দিরের লর্ড ভেঙ্কটেশ্বোয়ারা-ও কিন্তু হাইজ্যাকড। আসল মূর্তিটা অন্য কোনও দেবতার ছিল। কেউ বলে শিবের, আবার কেউ বলে এটা অজ্জিনালি মেয়েছেলের মূর্তি ছিল, কালীর।

যাকগে সে সব কথা, এবার চলুন সাউথে। সোয়ামী (স্বামী) আয়াপ্পন – সাংঘাতিক দাপুটে এবং ‘জাগ্রত’ দেবতা। তিনি লোকটি(?) কে? না শিবের ঔরসে, মোহিনীরূপী বিষ্ণুর গর্ভে জাত সন্তান। হুঁ হুঁ বাওয়া, বাঘের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ান ( অনেকটা আমাদের দক্ষিণ রায়)। তা বিষ্ণু তো অসুরদের কাছ থেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অমৃত উদ্ধারের সময়ে টেম্পোরারিলি মোহিনী মূর্তি ধরেছেন, আসলে তো ব্যাটাছেলে। তেনার আবার গভভো হয় কেমনে। ও হ্যাঁ, ভষ্মাসুরের নিজের মাথায় হাত দিয়ে মরার সময়েও মোহিনীর সিডিউসিং অ্যাক্টো ছেল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, – পিকচার আভি ভী বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত – বিষ্ণু কোথায় কোথায় এবং কখন কখন মোহিনী মূর্তি ধরেছেন, তার ইতিবৃত্ত যদি পুরান টুরান ঘেঁটে (অন্যথায় ইন্টারনেটে গুগ্‌লকাকু) বের করে পড়ে উঠতে পারেন, দেখবেন তার পর নিজের নাম আর মনে পড়ছেনা।

কেরালায় ম্যাটানচেরি প্যালেস বলে একটা রাজপ্রাসাদ আছে। গেলে মনে দুঃখ পাবেন, কেননা যদি আপনার ফ্ল্যাট না থেকে একটা বড়সড় দোতলা বাড়ি থেকে থাকে, সেটা ওই ‘প্যালেস’ এর চেয়েও বড়, এটা নিশ্চিত। তবে কেন যাবেন সেই মহার্ঘ্য ‘রাজপ্রাসাদ দেখতে? তার কারণ তার অনেকগুলি ঘরের দেয়ালে আছে অসাধারণ চিত্রকলা, সবই ন্যাচরাল ভেজিটেব্‌ল ডাই দিয়ে আঁকা। কিছু ঘরে তা সম্পূর্ণ, কোথাও অসম্পূর্ণ, একটা ঘরে তো শুধু খয়েরি রঙ দিয়ে আউটলাইন করা হয়েছিল, তাতে রঙচঙ পড়েনি। এই ‘রাজপ্রাসাদের’ রাজার বেডচেম্বার, মানে শোয়ার ঘরে যদি ঢোকেন, দেখবেন দুই দেব দেবীর ‘লীলে’ করার ছবি চার দেয়াল জুড়ে। সেই ছবিরা কোনারক বা খাজুরাহকেও লজ্জা দেবে, এতই এক্সপ্লিসিট, যদিও শিল্পের দিক থেকে অসাধারণ। কারা সেই দেব-দেবী? না শিব আর মোহিনী, যে নাকি অজ্জিনালি ব্যাটাছেলে, মানে বিষ্টু।

আমরা বাঙলায় বসে ‘মোহিনী’ বলতে তো শুধু মোহিনী কাপড়ের মিলের নাম জানতাম, তা সেও অনেক দিন আগেই উঠে গেছে। আপদ গেছে।

এনারা, মানে এই ‘বর্বরিক’, আয়াপ্পন, কাদের দেবতা? হিন্দুদের? মানে, আমি যদি গর্ব করে বলি আমি হিন্দু, তবে আমায় কি ‘শ্যামবাবা’র জাগরণে বসতে হবে সারা রাত, পরের দিন অফিস থাকলেও?

আমি যেখানে থাকি, সেই অঞ্চলে গত তিরিশ বছরে গেরস্ত বাঙালির সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে। একতলা দোতলা বাসগৃহ ভেঙে যে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরী হয়েছে, সেগুলোতে বাঙালি ১০%। বাকি সব ভাষাভাষি যাও বা আছে, ৭০% বাসিন্দাই বিহার ও ইউপির লোক। এদের এই বাজারেও জন্ম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনও হেলদোল নেই, আমার বাড়ির উল্টোদিকেই একজনের ৯টি সন্তান। সে আদ্দিকালের লোক নয়, আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট। যাক সে কথা, এদেরই একজন একদিন একটা ছোট গাছের চারা হাতে করে আমার বাড়িতে এসে বলল, আমার বাড়িতে তো জায়গা নেই, যদি আপনার সামনের ওই কোনাটায় একটু পুঁতে দেন। আমি বললাম, কী গাছ এটা? সে বলল, আমলকি। আমলকি গাছ শহরে চট করে দেখা যায়না, আমি তো গাছটা পুঁতেই দিলাম। লোকটা বলল, আপনার কাছে দিলে যত্নে থাকবে, আমার তো দরকার বছরে মাত্র একদিন। আমি কিছুই বুঝিনি সেকথার মানে। দরকার, কীসের দরকার? যাক, কিছুদিনের মধ্যেই সে গাছ বিশাল হয়ে গেছে। আজ থেকে দিন তিন চার আগে, হঠাৎ দেখি গাছের তলায় ঝাটপাট দিয়ে (আমি আবার বিহারিদের পাড়ায় থাকতে থাকতে, ‘ঝাট’ –এ কিছুতেই চন্দ্রবিন্দু লাগাতে পারিনা) পরিষ্কার করে, ধুপ ধুনো ফুনো জ্বালিয়ে একসা। আমি বললাম, কী ব্যাপার, কিছু পূজো ফুজো নাকি? সে একগাল হেসে বলল, হ্যাঁ ওই জগদ্ধাত্রী পূজোর নবমীর দিনে একটু –ইয়ে – আমি বললাম, জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে আমলকির কোনও কানেকশন আছে বলে তো বাপের জম্মে শুনিনি ? সে বলল, না না জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে নেই, এটা আসলে নারায়ণ। ঐ নবমীর দিনে করা হয় বলে জগদ্ধাত্রীর নাম নিলাম। – বোঝো কান্ড। সে আরও বলল, গ্রামের দিকে খুব ধূমধাম হয়, আসলে এই গাছের তলায় বসে রান্না বান্না করে খেতে হয়। এখানে আর অত কিছু করা যাবে? তাই ধূপ ধূনো দিলাম, একটু বিস্কুট নিয়ে এসে খাচ্ছি, নিন আপনিও একটা বিস্কুট খান।

আমার প্রশ্ন, এটা কি ‘হিন্দু’ দের পূজো?

সেই প্রদেশের লোকদের ছট পূজো নিয়ে তো এখন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছেন। কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরটাকে তেনারা এক রাত্তিরে তছনছ করে দিয়ে চলে যান। বুদ্ধবাবু একবার আটকাবার চেষ্টা করেছিলেন, এখন তো মমতাদেবী আরও তোল্লাই দিচ্ছেন, দেবেনই। ভোট ব্যাঙ্ক বলে কথা। গ্রামে না হলেও শহরে এখন পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাঙালির চেয়ে বিহারি বেশি। পটকার আওয়াজে সারা রাত্তির জাগতে হবে চাকুরিজীবিদেরও। ডেসিবেল কালীপূজোয় মাপা হলেও এইদিনে ছাড়। ছেলেবেলায় শুনতাম ‘ছটপরব’। সেটা বদলে ‘ছটপূজো’ হয়ে গেছে।

কাদের পূজো এটা? হিন্দুদের?

কিছু ‘পোগোতিশীল’ মানুষ আছেন, যাঁরা এসব পড়ে বলেন,  ‘উত্তর ভারতীয়’ আবার কী? ফেস্টিভাল ইজ ফেস্টিভাল, যত্তো সব ‘sick mind’.

এবার সেই মানুষরা  কি বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণের পরে, ধনতেরাস, ছটপূজো, আমলকি পূজো, শ্যামবাবার মাসিক পূজো, জ্জে মাতাদি-র পূজো, গণেশ পূজো, সোয়ামি আয়াপ্পনের পূজো, রাস, পোঙ্গল, বিহু, সব পালন করবেন? আমি তো কেবল ‘হিন্দু’দের গুলো বললাম, দুখানা ঈদ, সবেবরাত, মুহরর্‌ম, ক্রিসমাস, ঈস্টার, হ্যালুইন, বুদ্ধ জয়ন্তী, গুরু রবিদাস উৎসব, শিখদের বৈশাখী, সাঁওতালদের হুল, আরও যা যা আমি নিজেই জানিনা, সব করার পর তিনি অফিস বা আদালত বা নিজের কাজের জায়গায় যাবেন বছরে ক’দিন?

কয়েক বছর আগে সমরেশ মজুমদার একটি বাংলা সাময়িকপত্রের পূজো সঙ্খ্যায় লিখলেন, ‘পূজো (দুগ্‌গোপূজো) হচ্ছে বাঙালির বাৎসরিক পুতুলখেলা’। তিনি ঠিকও বলেছেন(যদিও সারকাসটিকালি), ভুলও বলেছেন। ভুল এই কারণে, যে ‘বাঙালি’র একটা বড় অংশের সঙ্গে পূজোর কোনও সম্পর্ক নেই। এটা আর ভেঙে নিশ্চয়ই বলতে হবেনা কেন।  আর ঠিক বলেছেন এই কারণে, যে দূর্গা, কালী, এঁরা হচ্ছেন বাঙালির নিজস্ব ম্যাসকট। ওই যে বললাম, কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা পলা, মুখে পান মিষ্টি, এঁরা ‘হিন্দু’ দেবতা নন, এঁরা পুতুলই। একজনকে কৃত্তিবাস অন্যজনকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ‘সৃষ্টি’ করেছেন। দুজনের উল্লেখই শাস্তরে আছে, কিন্তু এভাবে নয়।  ( তাছাড়া সরস্বতী লক্ষ্মী, কেতো, গনশা পাশে জুটে গেছে, এরা কেউ দুগ্‌গার ছেলেপুলে নয়। মাথার ওপর ‘বর’ শিবের ছবি লাগানো থাকে, দুগ্‌গার বিয়ে হলো কবে? উমা আর পার্বতী যদি দুর্গার নাম হয়, তবে আমার নাম রবার্ট ভদ্র) বাঙাল পুরুত যখন অশুদ্ধ ‘উরুশ্চারণে’ – সর্বমঙ্গইল্য মঙ্গোইল্ল্যে, শিব্যা, সর্বাইর্থ সাধিক্যা, শরৈণ্যে ত্রম্বকে গৌরীঈঈঈ – বলে ‘ওঞ্জুলি’ দেওয়ান, অনেক হার্ড কোর নাস্তিককে দেখেছি ভিড়ে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে যেতে। নতুন তাঁতের শাড়ির গন্ধ, ভিজে চুলের ঝাপটা, একটু পূজো পূজো গন্ধ, ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি মাখানো একটা উৎসব –  এ আমাদের পুতুল খেলাই। পুতুল খেলতে তো মার্ক্স থেকে মারকোজ, কেউ বারন করেন নি।

কোনও হিন্দু ফিন্দু বুঝিনা ভাই – গর্বসে বোলো হম বংগালি হ্যাঁয়।

পোড়া পেট

অবিভক্ত ভারতের সাহিত্য যদি ঠিক ঠাক বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করবো । অন্যান্য প্রদেশের তুলনায়, বাংলায় খাওয়ার রকম ও ধরণ বৈচিত্র্যে ভরা ।

বাংলা সাহিত্যের গোড়া থেকেই ( মূলত পদ্য) আমরা বিচিত্র সব খাদ্যবস্তুর উল্লেখ পাই ।এগুলো কিন্তু, অন্য কোনো অঞ্চলের সাহিত্যে পাওয়া যায় না । এই নানা রকম বৈচিত্র্য সব চেয়ে বেশী পাই – মিষ্টান্নে । বাংলায় মিষ্টান্ন মানে – যে সব খাবারের মূল উপাদান গুড় এবং চিনি । এই চিনি কিন্তু আমাদের পরিচিত সাদা চিনি নয় । এটা একটু লালচে, আর একে কাশীর চিনি বলা হয় ।পুরীতে সাদা চিনির মিষ্টান্ন, ভোগে দেওয়া হয় না, এটা আগেই বলেছি । সংস্কৃত ভাষায়, মিষ্ট বলতে মধুরও বোঝায় এবং সাথে আমিষ দ্রব্যও বোঝায় । যে সব খাদ্য বস্তু খেতে মধুর, সেগুলোও কিন্তু মধুর তাই মিষ্ট । মিষ্ট বলতে আবার সিক্ত বা ভেজা বোঝায় । তাই প্রিয় মাছের ঝোল বা মাংসকেও মিষ্ট বলা যায় ।

বৈদিক যুগ থেকেই দুধ এবং তার থেকে তৈরী ক্ষীর, দই, ঘি, মাখন সর্বশ্রেষ্ঠ খাবার ছিল । তাই এগুলোকে পবিত্র মনে করে দেবতাদেরও নিবেদন করা হতো। এই দুধের ব্যবহারে বাংলার মানুষ কিন্তু সবাইকে পেছনে ফেলে, রেসের ঘোড়ার মত ডার্বি জিতে নিয়েছে । ছানা আবিস্কার জন্য বাঙালি এই কৃতিত্বের দাবীদার ।ক্ষীর, দই, ঘি, মাখন কিন্তু কাঁচা দুধের স্বাভাবিক পরিণাম,  কৃত্রিম অথবা স্বাভাবিক – কিন্তু কোনো ভাবেই দুধের বিকৃতি নয় ।ছানা – ফোটানো দুধের কৃত্রিম বিকৃতি । বাঙালি যত্ন নিয়ে অন্য জিনিস দিয়ে দুধকে ছিন্ন – ভিন্ন করে দিয়ে জলীয় বস্তু আর সারবস্তু আলাদা করেছে। এই ভাবে ছিন্ন ভিন্ন করার জন্য নাম হয়েছিল – ছেনা, এখন ছানা নামে পরিচিত ।

সংস্কৃত ভাষায় ছানার কোনো উল্লেখ নেই , অন্য ভাষাতেও ছিল না । তাই অজ্ঞাত বলে পূজায় একে নিবেদন করার বিধান নেই । বুঝুন ব্যাপার !! জানি না বলে, খেতে পারবো না । ওনাদের অজ্ঞতা আমাদের মাথা ব্যাথার কারণ । তাই বলে, তো বাঙালি থেমে থাকবে না ।

দুটো শ্রেণী তৈরী হলো :-

প্রথম শ্রেণীতে পড়ল :-একটা মাত্র উপাদানের মিষ্টান্ন । গুড় বা চিনির নাড়ু আর চাকতি । গুড়ের চাকতি হলো :- নবাৎ পাটালি আর ফেনী বাতাসা । চিনির চাকতি হলো :- বীরখণ্ডি। চিনির নাড়ু – ওলা (ওলের মত দেখতে বলে)

দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে :-দুটো উপাদানে তৈরী মিষ্টান্ন । যেমন, গুড় আর নারকোল কোরা মিশিয়ে – নারকোল নাড়ু । চিনি আর নারকোল মিলিয়ে :-নারকোল পুলি আর নারকেল ছাপা ( নকশা করা বলে, এই নাম ) ক্ষীর আর চিনি মিশিয়ে তৈরী হল – ক্ষীরের নাড়ু । ছানা, চিনি মিলিয়ে হলো – মণ্ডা বা সন্দেশ এবং অবশ্যই রসগোল্লা ।

শহর কোলকাতা এবং ঢাকার ময়রাদের হাতেই মণ্ডা‍র অনেক রকমফের তৈরী হয়েছে । এসব রকমফের হয়, পাকের তারতম্য অনুযায়ী । কড়াপাক, নরমপাক,কাঁচাগোল্লা,জলভরা, রাতাবী ( অর্থ :- সাধারণ )- এই সব বিভিন্ন কেতা কানুন । সবচেয়ে বড় আবিস্কার অবশ্য – রসগোল্লা ।

এখানে এসে একটু ধাক্কা খেতে হয় । ওডিশার নামকরা ইতিহাস বিদ – জে পাঢ়ী তাঁর পুরোষত্তমতত্ব ও নব কলেবর ( ১৯৯৬ ) বইতে বলছেন :- ওডিশার পুরীতে এই রসগোল্লা , আদিতে ক্ষীর মোহন নাম নিয়ে জগন্নাথ দেবকে রথ যাত্রায় শীতল ভোগ দেওয়া হতো । পরে, কটক জেলার শালেপুরের বিকলানন্দ কর, এই মিষ্টির নাম দেন- রসগুল্লা । রসগুল্লা মানে হলো রসের গোলা । মূলত লক্ষ্মী দেবীকে এই মিষ্টি শীতল ভোগ দেওয়া হতো । “The rasgulla is more than 600 years old. It is as old as the RathYatra in Puri”.  পাঢ়ী তাঁর বইতে এই কথাই লিখেছেন ।

আরও একজন ইতিহাস বিদ এস সি মহাপাত্র বলছেন :-This practice of offering rasgullas to Lakshmi dates back at least 300 years. “The RathYatra, which started more than six centuries ago, has not changed with times. And until today, rasgulla is the only sweet offered to Mahalaxmi, Jagannath’s consort, to appease her when the deities return home,”

তা হলে, এই রসগোল্লা বাংলায় এলো কি করে ?

বলা হয় , নদে জেলার নবদ্বীপের চৈতন্য দেব পুরীতে এই রসগুল্লা খেয়ে মোহিত হয়ে গেছিলেন। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল মহাপ্রভুর এই মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথা । শান্তিপুর ফুলিয়ার হারাধন ময়রা চলে গেলেন পুরীতে । মোটা মুটি, সেটা ১৮৬৪ সাল । বাংলার নব জাগরণের ( রেনেসাঁ) সময় । মূলত রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭৫-১৮৩৩) সময় এই নবজাগরণের শুরু এবং এর শেষ ধরা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সময়ে, যদিও এর পরেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ এই সৃজনশীলতা ও শিক্ষাদীক্ষার জোয়ারের বিভিন্ন ধারার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন।

হারাধন ময়রার রথ দেখা আর কলা বেচা এক সঙ্গে শুরু হলো । সেখানে শিখে এলেন  রসগুল্লা বানানোর প্রণালী। কিন্তু, সেই পুরীর ক্ষীর মোহনের স্বাদ নাকি এলো না । নবীন চন্দ্র দাস,  বাগবাজারে দোকান খোলেন ১৮৬৬ সালে ।  তিনি জেনেছিলেন হারাধন ময়রার এই চেষ্টার কথা । লেগে গেলেন তাঁর মত তৈরি করতে । কলম্বাস হয়ে গেলেন নবীন ময়রা । আমাদের কাছে এলো স্পঞ্জ রসগোল্লা ।

ভগবান চন্দ্র বাগলা নামে এক কাঠের ব্যবসায়ী সপরিবারে, একদিন যাচ্ছিলেন নবীন ময়রার দোকানের পাশ দিয়ে । ছোট ছেলের জল তেষ্টা পেলে তিনি দাঁড়ালেন দোকানের সামনে জল নিতে । নবীন ময়রা একটা স্পঞ্জ রসগোল্লা দিলেন ছেলেটির হাতে । দিল তরর হয়ে গেল ছেলের । বাবাকে বলতে তিনিও খেলেন । শুরু হলো নবীন ময়রার জয়যাত্রা ।

রসগোল্লায় বিশুদ্ধ ছানা গাঢ় রসে সেদ্ধ করা হয় আর রসে ডুবিয়ে রাখা থাকে ।ছানার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে রসগোল্লার মত পাক করে যদি শুকনো অবস্থায় অল্প চিনি মিশিয়ে রাখা হয়, তবে তাকে বলে :- দানাদার । ছোট সাইজের দানাদারকে বলা হয় :-রসমণ্ডি । সাইজটা যদি চ্যাপ্টা আর কিছুটা রস থাকে তবে বলা হয় ক্ষীরমোহন ।রসগোল্লাকে ঘন দুধের মধ্যে রাখলে বলা হয় – রসমালাই ।

আরও একটা মিষ্টান্ন আছে- দরবেশ । এটার মূল হলো – মোতিচুর । মোতিচুর কিন্তু সাদাটে এবং শক্ত  মণ্ডা । দরবেশ হলো নরম আর এর দানা হরেক রঙের ।ফকির দরবেশদের আলখাল্লা নানা রঙের কাপড় দিয়ে তৈরী হয় বলে এই দরবেশ নাম হল ।

এবারে আসি বোঁদে বা বুঁদিয়াতে । সংস্কৃত বিন্দু থেকে এই নামটা এসেছে । ঘৃতপক্ক কলাইডালের গুঁড়ো দিয়ে সাধারণত তৈরী এই বোঁদে । বোঁদেকেই চিনি দিয়ে শক্তপাকে বানালে হয় মতিচুর । মতি  মানে মুক্তো আর চুর মানে চূর্ণ । তাই সংস্কৃত নাম :- মৌক্তিক । এককালে এটার নাম ছিল – মেঠাই আর অখণ্ড ভারতের সবচেয়ে পুরোনো মিষ্টান্ন ।

ল্যাংচা হলো ক্ষীর আর ছানার তৈরী শিবলিঙ্গের আকারে তৈরী চিনির রসসিক্ত মিষ্টান্ন। হয়তো কোনো খোঁড়া ময়রা তৈরী করেছিল বলে এর নাম ল্যাংচা । এরই গেঁড়ে সংস্করণ :- পানতুয়া  । পাতলা রসে ডোবানো থাকে বলে এর নাম পানতুয়া ( পানিতাওয়া) । লেডিকেনী হলো পানতুয়ার রাজসংস্করণ । লেডি ক্যানিংয়ের নামে এটা তৈরী করা হয়েছিল ।

তার পর আছে – চমচম, রসকদম্ব । সবই ক্ষীর, ছানা আর চিনির তৈরী । বোঁদে মতিচুরের পর উল্লেখযোগ্য হলো জিলিপি । এটা কিন্তু বাদশাহী খাবার । নামটার প্রথম অংশ আরবী । জিল্লা মানে জেল্লা বা উজ্জ্বল । তারপর ঢুকেছে সংস্কৃত খাদিক মানে চমৎকার খাদ্যবস্তু । জিলিপির উপাদান কিন্তু বোঁদের মত । তবে, ভাজার পরে রসে ফেলা হয় ।  খেতে শক্ত, বোঁদের মত নরম নয় । জিলিপির রাজসংস্করণ হলো অমৃতি । নামটাও সংস্কৃত থেকে এসেছে । অমৃত >অমৃতি । তবে, অনেকেই বলেন :-অমৃতি — এই মিষ্টিকে উত্তর ভারতে বলা হয় ‘ইমারতি’। ইমারত অর্থাৎ উঁচু বাড়ি যেমন থাকে থাকে তৈরি হয়, এও সেভাবে হয় বলে এই নাম। অরিজিন সম্ভবতঃ আরবি বা ফারসি। জিলিপির আরও একটা রকমফের আছে । মোটা আকারের এই জিলিপি দই মিশিয়ে রাখা হয়/ হত । এর নাম দই জিলিপি । শোনা যায়, এই দই জিলিপি খেতে এতই ভালো যে এক ডাক্তার গদ্যকার ইনসুলিন ইনজেকশান নিতে নিতে জিলিপি রসিয়ে খেতেন ।

বাংলায় গম অজানা ছিল না , তবে ব্যবহার অল্পই ছিল । যবের ব্যবহার ছিল বেশী । যবের ছাতু এখনও বেশ জনপ্রিয় । বাদশাহী আমলে গম ভাঙিয়ে হত আটা । এই সময় থেকেই বাংলায় আটার ব্যবহার চালু হয় । এখানে আটা আর ময়দার ভেতর পার্থক্য বলে রাখি । খোসাশুদ্ধ গম ভাঙালে- সেটা আটা আর খোসা ছাড়ানো গম ভাঙালে হয় ময়দা । ময়দার ব্যবহার শুরু হয়- পোর্তুগীজ আমলে , কারণ এরাই পাঁউরুটির প্রচলন করে এদেশে ।

প্রথম প্রথম বাঙালিরা ময়দা ব্যবহার করতো- সেমুই পায়েসে । তারপর রুটি লুচিতে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় । আবার শুরু হলো বাউনদের ফ্যকড়া । যবনদের দেওয়া আটা ময়দা চলবে না । সমাধান অবশ্য করলেন বাউনরা নিজেই । গব্য ঘৃততে উত্তমরূপে ভর্জিত হইলে  গোধূম ( গম) চূর্ণ দেবতাদের নিবেদন করিয়া ভক্ষণ করা যাইবে, কারণ গব্যঘৃত শুদ্ধ । আসলে ঘটনাটা হলো, খাওয়ার ইচ্ছে খুব- ওদিকে জনসমক্ষে কিছু বলতে হবে তো !! বিধানগুলো এই ভাবেই এসেছে । ধরুন- কোনো নামকরা বিধানদারের কোনো নির্দ্দিষ্ট খাবার খেতে ভালো লাগে না । বিধান চলে এলো- ওই খাবার শাস্ত্রসম্মত নয় । কে আর দেখছে কোন শাস্ত্রে কি লেখা আছে ? কেউ হয়তো মিনমিন করে বলল – কোন শাস্ত্র ঠাকুর মশাই ? অমনি উত্তর আসবে :- বেদ । এই বেদ এমন জটিল ব্যাপার , গ্রামের লোক আর ট্যাঁ ফুঁ করবে না । এবারে সেই একই খাবার অন্য গ্রামের  এক ঠাকুরমশাইয়ের  খেতে ভাল লাগে, উনি আবার উল্টো বিধান দিলেন । লোকমুখে শুনে সেই অন্য ঠাকুরমশাই এলেন এনার কাছে । তখন সমাধান হতো গব্যঘৃত , গব্যদুগ্ধ, গব্যদধির ফরমান দিয়ে ।

বড়লোকেরাও এই সব সমাজপতিদের হাতে রাখতেন । চালু কথায় এটা ছিল সমাজ ।এই কোলকাতার এক বড়লোক ছিলেন:- রামদুলাল  সরকার ( ১৭৫২-১৮২৫ ) । ইনি সৎ ছিলেন । সামান্য চাকরী করতেন দশটাকা মাইনের । এক ডোবা জাহাজ কিনেছিলেন, মনিবের পয়সায় । তাতে যে মুনাফা করেন, সেই পুরো মুনাফাটাই তুলে দেন মনিবের হাতে ( প্রায় এক লক্ষ টাকা) । মনিব সেই টাকা ফিরিয়ে দিতেই তিনি বড়লোক হয়ে যান । তাঁরই এক বন্ধু কালীপ্রসাদ তখন বড় হাঙ্গামা করছিলেন ,নিষিদ্ধ মাংস আর মদ্যপান করে । জাতি চ্যুত হওয়ার পর রামদুলাল বাবু তাকে আবার জাতে ফিরিয়ে আনেন । অন্যরা যখন সমাজের কথা তোলেন, তখন তিনি বলেছিলেন :- সমাজ আমার সিন্দুকে।

তাই আমার বক্তব্য- খাওয়ার বিচার করবেন না । সবই ওই সিন্দুকের খেলা ।

**********

তথ্যঋণ :-

সুকুমার সেন :-কলিকাতার কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স

সুবীর রায়চৌধুরী :- সেযুগের কেচ্ছা, একালের ইতিহাস ।

গর্ব্‌ সে বোলো হম ‘হিন্দু’ হ্যাঁয়

সেটা ১৯৮৬ সাল। আমাদের চাকরিতে প্রায়ই বদলির সংস্থান থাকে, বদলি হতেই হয়। আমার বদলি হল বর্ধমানে। অল্প কয়েকদিন পরেই আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল, হুগলি জেলার এক প্রান্তিক এলাকায়। জায়গাটা ব্যবসা বানিজ্যের জন্য সুবিধেজনক হলেও সে সময়ে জনসংখ্যা খুব একটা বেশি ছিলনা। একটু রাতের দিকে স্টেশনে গেলে মনে হত, এক্ষুণি এখানে ভূতের কাহিনী নিয়ে কোনও সিনেমার শূটিং হবে। স্টেশনের প্রায়ান্ধকার ঘরগুলোর পেছন থেকে মনু মুখার্জী একটা আলোয়ান গায়ে দিয়ে লন্ঠন উঁচু করে ধরে বেরোলেন বলে। আর অন্ধকারে অশ্বত্থ গাছের ডাল থেকে একটা পেঁচা ডেকে উঠবে তৎক্ষণাৎ।

সেই প্রায় জনমানব শূণ্য স্টেশন, যেখানে বিশেষ কয়েকটি ট্রেনের সময় ছাড়া মানুষ কেন কুকুরও দেখা যায়না, সেই স্টেশনের টিকেট কাউন্টারের পাশে একদিন দেখি, ‘ঋতুবন্ধ’, ‘ম্যাড্রাসি ডাক্তার’, ‘গোপনে মদ ছাড়ান’  এই সব বিজ্ঞাপনের পাশে হলদে কাগজের ওপর লাল দিয়ে দেবনাগরী অক্ষরে ছাপা, ‘গর্ব্‌ সে বোলো হম হিন্দু হ্যাঁয়’। ওপরে একটা ওঙ্কার চিহ্ন।

বেশ ঘাবড়েই গেলাম। ঘাবড়ানোর কয়েকটা কারণও ছিল, যেমন বাংলার মফঃস্বল অঞ্চলে টিভি প্রতিটি ঘরে ঢুকে পড়ার আগে পর্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষ হিন্দি বলতে পারতনা, অন্য কেউ বললে যতদূর বাংলার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়, ততদূর বুঝত। হিন্দী লেখার পাঠোদ্ধার তো দূর অস্ত। সে সময়ে সব না হলেও কিছু বাড়িতে টেলিভিশন ঢুকতে শুরু করেছে, তবে কেব্‌ল চালু হয়নি, তাই শুধু দূরদর্শনের বাংলা অনুষ্ঠানই দেখে তখন লোকজন। এই পান্ডব-কৌরব উভয়পক্ষ বর্জিত জায়গায় হিন্দী পোস্টার? কে পড়বে এগুলো ? শুধু তাই নয়, আমার মাথায় ঢুকলনা, আমি যে হিন্দু, সেটা গর্ব করে বলার কী আছে। যেমন আমার পদবী সরকার, এটা নিয়ে কি কোনও গর্বের জায়গা আছে? নেই। তেমনি আমার বাবা হিন্দু বলেই তো ইস্কুলে রিলিজিয়নে হিন্দু লিখতে হয়েছে, বাবা ক্রিশ্চান হলে আমিও তাই হতাম। তো গর্বটা কিসের?

ওখানে একলাই থাকতাম আর এক জনের সঙ্গে শেয়ার করে। সে আবার প্রায়ই কলকাতা চলে আসত, তাই আমি পুরোপুরি একা। বাড়ি গিয়ে খুব চিন্তায় পড়লাম এই পোস্টার নিয়ে। ভেবে দেখলাম ‘হিন্দু’ ব্যাপারটা খুব একটা খারাপ লাগেনা আমার। দুগ্‌গোপূজো, ধুনুচি নাচ, খিচুড়ি, কোলাকুলি, কালীপূজোয় তুবড়ি কম্পিটিশন, তাপ্পর ভাইফোঁটা, ইস্কুলে পড়া বয়সে সরস্বতী পূজোয় মেয়েদের ইস্কুলে ভোগ খেতে গিয়ে একটু ইয়ে, তাপ্পর দোল – এইরকম অনেকগুলো ব্যাপার বোধহয় যারা হিন্দু নয়, তাদের নেই। না থাকলেও আমাদের মেহবুব, আমাদের ফ্রান্সিস, এরা তো দিব্যি এইসব অনুষ্ঠানে চুটিয়ে আমোদ করে। তা করুক গে, কিন্তু প্রশ্ন হল এই নিয়ে গর্ব করব কেন? আসলে আমি অনেক বড় বয়স পর্যন্ত রাজনীতিমূর্খ ছিলাম। কাগজের প্রথম পাতা পড়তাম না, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম জানতাম না, বিজেপি বলে যে একটা পার্টি তৈরী হয়েছে, সে খবরই রাখতাম না, ভোটের সময়ে গিয়ে ব্যালট পেপারে প্র্যায়ই নানা রকম দুষ্কর্ম করে আসতাম।  এই কারণেই এমন অদ্ভুত হিন্দী পোস্টার দেখে বেজায় ঘাবড়ে গেলাম। আরও ঘাবড়ে গেলাম এই কারণে, যে আমার মত কিছু বহিরাগত ছাড়া ওখানে এটি কেউ পড়তেই পারবেনা। তবে কে সাঁটল এই পোস্টার এবং কেন?

ওখানে আমার ঘরে একটা কাঠের তক্তপোষ ছিল। বাড়ি থেকে একটা খেশ আর একটা ফোলানো বালিশ নিয়ে গেছিলাম। শীতকালে একটা শাল গায়ে দিয়ে ঘুমোতাম। সেই তক্তপোষে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে লাগলাম, হিন্দু ব্যাপারটা কী আসলে। বিভিন্ন ইতিহাসের বই পড়ে আমার যা ধারণা জন্মেছিল, তা হল ‘হিন্দু’ কোনও ধর্মের নাম নয়। যাঁরা বলেন পারসিকরা ‘স’ উচ্চারণ করতে পারতনা বলে সিন্ধু নদীর অববাহিকায় থাকা মানুষদের ‘হিন্দু’ বলতে শুরু করেছিল, তাঁরাও ১০০% ঠিক নন সম্ভবতঃ।  তবে ইতিহাস ঘেঁটে এটুকু পাচ্ছি, সেকালে মুসলমানরাও ‘হিন্দু’ হত। বিখ্যাত ইসলামিক হিস্টোরিয়ান ফরিস্তা-র পুরো নাম ছিল, মুহাম্মদ হিন্দু শাহ ফরিস্তা। যেমন, কামাল জালালাবাদি, যেমন সুর্মা ভোপালী, ঠিক তেমনি হিন্দু ফরিস্তা অর্থাৎ এই লোক ‘হিন্দ-ই-স্তান’ (‘হিন্দুস্থান’ নয়) এর বাসিন্দা।

সে যাই হোক। আন্ডার পপুলার পারসেপশন, আজকাল হিন্দু হচ্ছে একটা ধর্মের নাম। আগেকার ব্রাহ্মরা ‘হিঁদুয়ানী’ বলে বেজায় উন্নাসিক মতামত রাখতেন এ আমি পুস্তক আর সিনেমার দৌলতে জেনেছি। তা হিন্দু ধর্মটি কেমন? আমি কিন্তু এখন থেকে যা বলব, তা আমার নিজের চোখে, আমাদের সময়ে দেখা ঘটনা বা উপলব্ধির কথা। আমাদের ছেলেবেলায়, একবার  জীবনে প্রথম রামমন্দির দেখে এক বন্ধুকে বলেছিলাম, এ কীরে, রামের আবার মন্দির কেন রে, লোকে তো ভুতে ধরলে ‘রাম রাম’ করে। বিহারিদের হনুমান পূজো নিয়ে তো আমরা সেরদরে পেছনে লাগতাম। তারা ধুতিতে মালকোঁচা মেরে তাড়া করত, আমরা পালাতাম। আমাদের দূর্গাপূজোর মত ( যেটা সম্ভবতঃ ১৫৩৮ সালে পৃথিবীতে প্রথম চালু হয়) লার্জ স্কেল বারোয়ারী উৎসব ভূ ভারতে ছিলনা, টিলক মশাই নাকি ‘জাতীয় সংহতি’ রক্ষা করার জন্য ‘বোম্বে’ তে প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে গাবদা গাবদা গনেশ বানিয়ে বারোয়ারী শুরু করান। তাতে জাতীয় সংহতি কীভাবে রক্ষা হচ্ছিল, নেহাত বুদ্ধি কম বলে বুঝতে পারিনি। তবে সেটাও আমাদের থেকে টুকে।

 আমাদের হিন্দুপনা দুগ্‌গা ঠাকুরকে নিয়ে, যে একাধারে আমাদের মা আর মেয়ে। তার হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর, যাবার সময়ে মুখে পান মিষ্টি। আমাদের হিন্দুপনা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের ‘শ্যামা কালী’কে নিয়ে, একেবারেই বাঙালি কালী, পুরাণ বর্নিত, করালদ্রংষ্ট্রা, লোলজিহ্বা কালী না। পাশাপাশি রাসমণির ভবতারিনী তো আছেনই। আমাদের কেষ্ট হামাগুড়ি দেয়া গোপাল, বা নবদ্বীপের শ্যামরাই। আমরা জোয়ানমদ্দ নীল রঙের শঙ্খচক্রগদাপদ্ম ধারী পালোয়ান কেষ্টকে চিনিনা। আমরা বাঙালি। আমাদের লোকাল কিছু ঠাকুর ছিল, এক ছিল পঞ্চানন ঠাকুর, কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের আনাচে কানাচে গন্ডায় গন্ডায় পঞ্চাননতলা। সে ঠাকুরের গায়ের রঙ টকটকে লাল, তার ভাঁটার মত চোখ, তার ইয়াব্বড় পালোয়ানি গোঁফ, তার পঞ্চানন নাম হলেও সে কোনও দিন শিব না। ইদানীং ধীরে ধীরে সেই ঠাকুর হাইজ্যাক হয়ে শিব বনে যাচ্ছে বেমালুম। আমাদের ধম্মোঠাকুর কষ্মিনকালে ধর্মরাজ ‘যম’ না। সেও হাইজ্যাক হচ্ছে। উত্তর ভারতীয়দের পাড়ায় আমাদের বাঙালি সিংহবাহিনী কে সরিয়ে শেরাওয়ালী জয় মাতাদি গেড়ে বসছে। আমরা ভাই হিন্দু না, আমরা বাঙালি।

মরেও যে মরেনা, সেই বালকের দলের লোকেরা মাঝে মাঝে দেয়ালে কালো কালিতে লিখত, ‘বাঙালি গর্জে ওঠো’। তার তলায় অন্যদের লেখা কাঁচা ঘুম সম্পর্কিত মন্তব্য এখন ক্লিশে। বাঙালি ‘হিন্দু’ তার নিজস্ব কালচার নিয়ে দিব্যি ছিল। যদি গর্বিত হয়ে হয়, আমি তাতেই গর্বিত। বাঙালির হিন্দুয়ানি একটা কালচার, যারা দুগ্‌গোপুজো করে, তাদের ক’জন ধর্ম-উৎসব হিসেবে সেটা করে? মুশকিল হচ্ছে, কিছু তীব্র আঁতেল নিজের নাস্তিক বলেন, তাঁরা পূজো ফুজো মানেন না। আমাদের কমিউনিস্টরা ‘দ্বিতীয়া তিথি’তে ভাইফোঁটা নেন, কিন্তু পূজোকে বলেন শারদোৎসব। আর কিছু পদলেহি বাঙালি, উত্তর ভারতীয় আগ্রাসনকে আসন পেতে আমন্ত্রণ জানায়, ঘরের উমা কে ছেড়ে ‘জ্জে মাতাদি’ বলে হুঙ্কার ছাড়ে।

গর্ব করে বল, আমি বাঙালি।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। আমরা প্রায়ই শুনি, ‘কমিউনাল রায়ট’। বাংলা কাগজগুলো লেখে ‘জাতিদাঙ্গা’। কথাটার মানে কী? চট্‌ করে কমিউনাল রায়ট কথাটা শুনলে, অ্যাট দা ব্যাক অফ ইয়র মাইন্ড হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা মনে হবে নিশ্চয়ই। অনেকে চুরাশি সালের হাজারে হাজারে শিখ নিধনকে ‘দাঙ্গা’ বলে চালিয়েছে। ওটা দাঙ্গা ছিলনা। দাঙ্গা মানে দুপক্ষ দুপক্ষকেই মেরেছে। এমনকি গোধরার মাচ পাবলিসাইজড দাঙ্গাতেও শ’আড়াই হিন্দু মরেছে। শিখ জেনোসাইডে একজন শিখ একটা হিন্দুরও একগাছা চুল ছেঁড়েনি। আসলে ওটা জাতিদাঙ্গা ছিলনা, কংগ্রেস পার্টি হাজার হাজার শিখকে মেরে ফেলেছে।  বোম্বেতে কিছু টেরই পাওয়া যায়নি, কলকাতায় কংগ্রেসের লোকেরা নিজেদের এলাকায় ক’টা দোকান পুড়িয়েছে মাত্র, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও তেমন কিছু খুন খারাপি হয়নি। শুধু দিল্লী হরিয়ানা ও কুমায়ুন অঞ্চলে ব্যাপক হারে শিখ নিধন হয়েছে। তার কারণ অন্য সব দাঙ্গার মতই বেসিকালি ইকনমিক। তবে দাঙ্গা মানে কি শুধুই হিন্দু-মুসলিম মারামারি ?

এখানে একটা কথা বলব, প্রথমেই বলে রাখি,  এটা উইকি-বিদ্যে নয়। এবার তাহলে বইয়ের রেফারেন্স দেয়া প্রয়োজন। তাও সম্ভব নয়, কারণ আমার নিজের সংগ্রহেই কয়েক শো(হাজারও হতে পারে) বইয়ের কোনই সংরক্ষণ নেই। মাঝে মাঝে ধূলো ঝেড়ে কোনও একটা বের করে দেখা যায়, বইপোকারা একটা অক্ষরও গোটা রাখেনি। কাজে কাজেই রেফারেন্স ছাড়াই বলি, ভারতের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দাঙ্গা হয়েছিল শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে। বহু মানুষ মারা গেছিল, সংখ্যাটা ভয়াবহ। ইস্যু ছিল উত্তর ভারতে একটা জায়গার নাম ‘হরিদ্বার’ হবে, না ‘হরদ্বার’। এখন অবশ্য ওই দু-রকম নামই চালু আছে। সেটা হয়েছিল, কারণ তখন কেউ নিজেদের ‘হিন্দু’ ভাবতনা। আমি শৈব, ও বৈষ্ণব, সে গাণপত্য, অমুক লিঙ্গায়েত, এমনি। পরে আবার এর মধ্যে ‘শাক্ত’ এসে জুটল বৌদ্ধ ধর্মের বাইপ্রডাক্ট হিসেবে, সে অন্য কথা। কোনও তেমন টেনশন না থাকলেও একটা লক্ষ্যণীয় তফাত দেখা যায় দক্ষিণে গেলেই। আইয়ার আর আয়েঙ্গারদের কপালের আলাদা তিলক দেখেই।

তাহলে গর্ব্‌ সে বোলো হম হিন্দু হ্যায় মানে? হম আইয়ার হ্যাঁয় না আয়েঙ্গার হ্যাঁয়? আসলে এখনকার ‘হিন্দু’ হচ্ছে নন-মুসলিম, নন ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ড নন বুদ্ধিস্ট পপুলেস অফ ইন্ডিয়া।

এখনকার কলকাতাবাসী বা সে হিসেবে বাঙালিরা বুঝবেন না, আমাদের বয়সকালে হনুমান পূজো টুজো কেমন উপহাসের বস্তু ছিল। রামও ছিল স্পাইডারম্যান বা সুপারম্যানের মত কেবল একজন কমিক বুক হিরো। তাকে পূজো করতে হবে তা আমরা জানতাম না। ধীরে ধীরে তারা জায়গা করে নিল বাংলায়। শুধু কি তারা?  এর পরে আসছি আরও বিশদে।

পাবলিকে শুনলে বলবে, ধুর মশাই অত হীনমন্যতায় ভোগেন কেন? ভাগাভাগি কার নেই? মুসলমানদের শিয়া-সুন্নি নেই? ক্রিশ্চানদের ইউনিটারিয়ান-ট্রিনিটারিয়ান কিংবা ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট? বৌদ্ধদের মহাযান-হীনযান নেই কি? এছাড়া এই সব ধর্মের অফশূট হিসেবে, আহ্‌মেদিয়া, সুফি, বাহাই ফেথ, ব্রাহ্মধর্ম – ও রকম সব ছোট ছোট গ্রুপ ধর্মপালদের হাত ধরে নিয়ত আসছে। জৈন, শিখ, এসব তো আছেই। তাতে হয়েছেটা কী? গর্ব্‌ সে বোলো হম হিন্দু হ্যাঁয়।

কিন্তু নাঃ সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আমরা বোধহয় সকলেই শুনেছি আগরওয়ালদের নাম। আমাদের সম্ভবতঃ ধারণা ছিল, এরা মাড়োয়ারি (মাড়ওয়ারি)। মাড়ওয়ারি কারা? রাজস্থানে আরাবল্লি পর্বতমালা মেঘ আটকে দেয়ার একটা দেওয়াল ছিল কিছুদিন আগে পর্যন্ত। এখন আর নেই। আরাবল্লি রেঞ্জটাই কিছুদিনের মধ্যে কেটে সমতল বানিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং হবে। তবে এটা আবার অন্য গল্প, এখানে নয়। সেই আরাবল্লির আগে পর্যন্ত মেঘ থাকত, বৃষ্টি হত। আরাবল্লির ওপাশে মেঘ সচরাচর যেতনা, বৃষ্টি কবে হবে তা নিয়ে ঈশ্বরেরও সন্দেহ থেকে যেত এককালে ( এখন নয়)। যেদিকে বৃষ্টি হত, সেটা মেবার (‘মেবার পতন’ মনে আছে তো?) আর যেদিকে হতনা, সেটা মাড়ওয়ার।

বৃষ্টি যেবার হতনা, স্বভাবতই তখন খরা। তখন চাষ হবেনা কিন্তু পেট তো চালাতে হবে। তাই কৃষক ও অন্যান্য শ্রমজীবি সম্প্রদায় ঋণ নিত। এমনিতে কে ঋণ দেবে,তাই জমি বন্ধক। তার পরের বছরও যদি মেঘ দেওয়াল টপকাতে না পারে? তখন ‘বাবু কহিলেন বুঝেছ উপেন’। কিন্তু না, বাবু তো তাও ‘কিনেছিলেন’। মাড়ওয়ার নন্দনরা তো এমনিতেই পেয়ে যেত, বন্ধক আছে যে। তা ছাড়া দলিলে কী লেখা হয়েছে, কত দশমিক সুদ, তা কি টিপসই চাষি পড়তে পেরেছে? কারা এই মাড়োয়ারি ? সবাই নয়। যারা ঋণ নিত, তারাও তো সেই অর্থে মাড়ওয়ারি, কেননা ‘মাড়ওয়ার’ প্রদেশের বাসিন্দা তারাও। কিন্তু তাদের কি আমরা মাড়ওয়ারি বলি? – না।

একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে বক্তব্য। যাঁদের ধৈর্য থাকবে, দয়া করে তাঁরাই পড়বেন, অন্যদের বিরক্তি উৎপন্ন হলে বেশিদূর যাবার প্রয়োজন নেই । আমরা যাদের, মানে আগরওয়ালদের মাড়ওয়ারি বলে জানি, তারা কিন্তু অতীতে হরিয়ানা থেকে মাইগ্রেট করে এসেছিল। তাই এখনও বেশ কিছু আগরওয়ালের চেহারায় হরিয়ানভি জেনেটিক সিগনেচার দেখা যায়। আরও একটা মজার কথা বলি, আগরওয়াল কিন্তু শুধু রাজস্থানে নেই, বিহার ইউপিতেও বেশ কিছু আগরওয়াল আছে। ঠিক যেমন বিহারি ‘শিখ’ হয়, রাজস্থানী শিখ হয়,(জানতেননা?) তেমনি। এগুলো অবশ্য ব্যাপক ঘোরাফেরা না করলে জানা যাবেনা। আসলে রাজা অগ্রসেন এর সাড়ে সতের জন পুত্রের বংশধররাই আগরওয়াল। এবং তাদের সাড়ে সতেরটি গোত্র। পুত্র এবং গোত্র ‘সাড়ে’ কী করে হয়, জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না।

এঁরা আবার সবাই ‘আগরওয়াল’ পদবিধারী নন, সুরেকা, মিত্তল, কুচ্চল, এইসব পদবিধারীরাও আদপে আগরওয়াল। আসলে এখানে একটা ভাঁওতা আছে, এইসব সাড়ে সতেরটি গোত্র ভুঁই ফুঁড়ে ওঠেনি, মিত্তল আসলে ‘মৈত্রেয়’ গোত্র। কুচ্চল আসলে ‘কাশ্যপ’ গোত্র। ম্যাংগো পাবলিককে বোকা বানাতেই এই ‘পরিবর্তন’। এঁদের ধারণা এঁরা জাত পাতে শ্রেষ্ঠ ভারতবাসী। আমি অন্ততঃ জনা দুই আগরওয়ালকে, ‘ব্রাহ্মণ’ জাতিকে ‘নিচু জাত, ভিখমাঙ্গা’ বলে উল্লেখ করতে শুনেছি।


(পরের পর্ব পড়ুন এখানে)

অতঃপর বাংলাদেশ

কাদের মোল্লা বা কসাই কাদেরের ফাঁসির আগে বেশ কিছু নাটক হয়ে গেল বাংলাদেশে। সাম্প্রদায়িক শক্তি বিশেষ করে জামাত ই ইসলামির বাড়বাড়ন্তই এর কারণ। ইতিহাস বা এই সময়ে বিভিন্ন ইসলামি দেশ গুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে ধর্ম এখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বেশ ভালরকম হস্তক্ষেপ করতে উদ্যত। বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন এই ধর্মের আফিমের বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠেছিল তা এক ইসলামিক রাষ্ট্রের মানসিকতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছে। তারপরে বেড়েছে জামাতের অসভ্যতা।

কিন্তু এত কিছু করেও কসাই কাদেরের ফাঁসি আটকানো যায় নি। যদিও একটা মহল থেকে সুকৌশলে প্রচার হয়ে চলেছিল এই কাদেরই সেই কসাই কাদের নয়। একাত্তরের সেই দুর্বিষহ সময়ে ধর্ষণে নেতৃত্বদানকারী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী, হাজার হাজার বাঙালিকে খুন করা পাকিস্তানের সমর্থক কসাই কাদের আদতে নাকি জামাত ইসলামির নেতা নন। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসির পর পাকিস্তান পার্লামেন্টে শোকপ্রস্তাব এবং বিভিন্ন পাক নেতার শোক দেখে এটা বোঝাই গেছে “মরিয়াই তিনি প্রমাণ করিলেন তিনিই সেই কাদের মোল্লা”।

এই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা বাঙালি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের সমর্থনের নামে যারা বাঙালির বিরোধিতা করেছিল, তাদের দমনের নামে ধর্ষণ খুন নির্বিচারে করেছিল, তাদের প্রতি বিরোধী দলের এই সহানুভূতি কেন? আদতে উপমহাদেশে রাজনৈতিক দলগুলির যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতায় যাওয়াটা একটা গভীর ব্যধি। যার জন্য এরা নীতি নৈতিকতার ধার ধারেনা।

ওপর ওপর দিয়ে যে প্রচারটা চলে সেটা হল জামাতি ইসলামি “নরম পন্থী” একটা সাম্প্রদায়িক দল। আসলে সেটা কাজ করে তৃণমূল স্তরে। একেবারে ছোটবেলা থেকে গ্রামে মফস্বলে শুরু হয় ধর্ম শিক্ষার নামে ব্রেইন ওয়াশ। সুকৌশলে সেখানে চলে ঈশ্বরের নামে দেশ চালানোর শিক্ষা। বিজ্ঞান যেখানে প্রবেশ করতে পারে না কোনভাবেই। এই ধর্মের ব্যবসা হল এখন সব থেকে লাভ জনক ব্যবসা। এর কোন “রিসেশন” হয় না। বরং রিসেশনের সময়েই এর বাড়াবাড়ি সব থেকে বেশি পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। যে জায়গাগুলিতে এখনো রাস্তা হয় নি, শিক্ষার আলো সঠিকভাবে পৌঁছায়নি সেই কোণগুলিতে এই শক্তিগুলি খুব সহজে অপারেট করে। যার ফলে স্পর্শকাতর জায়গাগুলিতে এরা খুব সহজে পৌঁছে যেতে পারে। এদের অপারেশন বলতে ছুতো নাতা পেলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘর জ্বালিয়ে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করা।

রাস্তা কেটে রাখা, বাস জ্বালিয়ে দেওয়া, দিনের পর দিন মূল সড়ক অবরোধ করে রাখা, নিত্ত নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে। এর ফলে স্বাভাবিক জনজীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শুরু হয়ে গেছে এক বিচিত্র মাৎস্যন্যায়। কালোবাজারি বৃদ্ধি পাচ্ছে, জিনিসের দাম হয়ে উঠছে আকাশছোঁয়া, রাস্তা ঘাটে বেরোলে সাধারন মানুষ নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না যে তারা ঘরে ফিরবেনই- সব মিলিয়ে রাষ্ট্র বিরোধী বিপ্লবের নামে জামাতবাহিনী যে কাজটা শুরু করেছে সেটা আসলে এই নরম পন্থার নামে সাম্প্রদায়িক শক্তির তুমুল শক্তিপ্রদর্শন। এবং এই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠে যায়, সাম্প্রদায়িক শক্তির আবার “নরমগরম” হয় নাকি?

এবার আসা যাক সরকারি দল বা শাসক দলের ভূমিকায়। তারা কি রাজধর্ম পালন করছে? কঠিন হাতে দমন করতে পেরেছে এইসব অসভ্যতা? তাদের কাজ কঠিন থেকে কঠিন তর হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। তাদের বিরুদ্ধেও উঠতে শুরু করেছে “যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা”র অভিযোগ। সুতরাং সাধারন জনগণ পড়েছেন মহা আতান্তরে।

এবার প্রশ্ন হল বাংলাদেশ আসলে কি সত্যিই ধর্মের কারাগার থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? এখনো তবে অধিকাংশ মানুষ কেন কাদের মোল্লার সমর্থনে মিছিল করছেন? আদতে কি তারা সত্যিই চান পাকিস্তানের ছত্রছায়াতেই থাকতে? “বাংলাস্তান”ই কি তাহলে ভবিষ্যৎ? নাকি শিক্ষা ও উন্নয়নের আলোয় আলোকিত শাহবাগ আন্দোলন এক নতুন অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলার পথ দেখাবে?

এই উত্তরগুলির দিকেই আপাতত তাকিয়ে আছে বহির্বিশ্ব।


কেন শাহবাগ, গোড়ার কথা

লাইন দিয়ে সার সার উদ্বাস্তু যখন পশ্চিমবঙ্গ নামক এক হেঁয়ালিতে প্রবেশ করছেন ঠিক তখনই নিঃশব্দে ভাগ হয়ে গেল বাঙালি। বাঙালি মুসলমানরা তখন বাঙালি রইলেন না, হয়ে গেলেন পাকিস্তানি। ধর্মের নামে এক অভূতপূর্ব দেশভাগ করে ইংরেজরা যখন বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে চলে গেল তখন কিছুই করার ছিল না কারও। একদিকে ভারতবর্ষে বাঙালিরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন ঘর, উঠতে বসতে অপর বাঙালীদের থেকে দিন রাত লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনে এদেশে থাকা, কোথায় জায়গা দখল করে কোথাও উদ্বাস্তু কলোনি করে থাকা, ঠিক সেই সময়, পূর্ব পাকিস্তানে নতুন দেশের নামে শুরু হল এক অদ্ভুত ভাঁওতাবাজি। ভাষাগত দিক দিয়ে বাংলা ভাষার না ছিল কোন সম্মান, না ছিল কোন মর্যাদা। অন্যদিকে জাতিগত দিক দিয়ে বাঙালিদের ক্রীতদাস ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানিরা আর কিছু ভাবতে পারতেন না। স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝে গেল, নামেই ইসলামের নামে দেশ ভাগ হয়েছে, আদতে মুখে উর্দু বলিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান আসলে ইংরেজদের মতোই আরও একটা উপনিবেশ গড়ে তুলতে চায়। ছাইচাপা আগুন ছিলোই, সেটাই একসময় দাবানলে পরিণত হল। শুরু হল এক নতুন স্বাধীনতার লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের লড়াই।

কিন্তু লড়াই হয়ে দাঁড়াল অসম লড়াই। এক সংগঠিত রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রহীন, শক্তিহীন এক জাতির লড়াই। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে পড়ল একের পর এক সেনাবাহিনী,হানা দিল গ্রামে গ্রামে, আর ঠিক এই সময়েই, এক সুবিধাবাদী শ্রেণির উত্থান হল। এরা উর্দুভাষী পাকিস্তানি নয়, বাংলাভাষী বাঙালি। এরা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে পাকিস্তানিদের কাছে নিজের আত্মমর্যাদা বিক্রি করে যতরকম ভাবে সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা শুরু করলেন। যত রকম নোংরা জঘন্য কাজ করা সম্ভব, তার কোনটাই এরা বাদ দিলেন না। হিন্দুদের ধর্ষণ, নির্বিচার হত্যা… অবশ্য হিন্দু শব্দটাই বা বলব কেন, এরা এদের নষ্ট কাজের জন্য হিন্দু মুসলিম কোনটাই দেখল না, এক জাতিকে দমনের উদ্দেশ্যে ঘর ঘর থেকে যুবতী মেয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া, ধর্ষণ করা, খুনের পরে দেহের বিভিন্ন অংশ খুবলে খুবলে নিয়ে নিজেদের বিকৃত কাম চরিতার্থ এরা- এই সমস্ত কাজ করে যেত পাকিস্তানের বাহিনী এবং এই সকল কাজে পাকিস্তানিদের যারা সহায়তা করেছে তারাই রাজাকার। একসময় শুরু হল বুদ্ধিজীবী হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জল নক্ষত্রদের ঘর থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, একসময় পদ্মার জলে কতশত যে প্রতিভার লাশ ভেসে গেছে এই সকল পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের “সৌজন্যে” তার হিসেব নেই। বলা যেতে পারে, একটা জাতির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়ে যাবার সবরকম চেষ্টা করেছিল এই সকল সাম্প্রদায়িক এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। একসময় স্বাধীনতা এল, তার বিস্তারিত ইতিহাস বর্ণনায় এই আলোচনা ভারাক্রান্ত করব না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বেসর্বা। কিন্তু সমস্যা কি মিটল? না।

কারণ এই সকল রাজাকারেরা কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানে বা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পালালেও মূল সমস্যা মানে পাকিস্তান পন্থী মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশে কিন্তু টিকেই থাকল যারা মনে প্রাণে পাকিস্তানী কিন্তু উপায়ন্তর না দেখে এই দেশেই থাকতে হল।

চেষ্টা কিন্তু চলতেই থাকল দেশের স্থিতাবস্থা নষ্ট করে দেবার। এবং আরও বড় একটা সমস্যা তৈরি হল যখন মুজিবর রহমান দায়িত্বে এলেন। দেশের আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত বহু অস্ত্র সাধারন জনগণের কাছে থেকে গিয়েছিল যার ফলে সমস্যার পর সমস্যা তৈরি হল এবং মুজিবর রহমানও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারল না।

সাধারণত মুসলিম দেশগুলিতে উদাহরণ স্বরূপ পাকিস্তান ইত্যাদির কথা বলা যেতেই পারে, সেনা অভ্যুত্থান এক অতি সাধারন ঘটনা। এই এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যেই অকস্মাৎ এক বিকেলে ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনী মুজিব ও তার পরিবারের সকলকে হত্যার মাধ্যমে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা করল বাংলাদেশে। এরপর থেকে যেটা দেখা গেল কখনো সেনা, কখনো মুজিব কন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামি লীগ, কখনো জিয়াউর রহমান পত্নী খালেদা জিয়ার বি এন পি, কখনো আরেক মিলিটারি স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতায় এসেছেন।  সেই রাজাকারদের কিন্তু কেউ টিকিটি ছুতে পারেনি, উলটে জিয়াউর রহমান যিনি একসময় সেনা প্রধান ছিলেন এবং মাত্র ৪৩ বছর বয়সে রাষ্ট্রের হর্তা কর্তা হন, তিনি নিজের উদ্যোগে এক কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আজমকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে পুনরায় প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেন। আদতে জিয়াউর রহমান সেই সেনার প্রতিনিধি করেছিলেন যারা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের হয়ে লড়া সত্ত্বেও দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে হেয় করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি উল্টে রাজাকার গোষ্ঠী এবং মুসলিম মৌলবাদী সংগঠন জামাতকে পরোক্ষে দেশে পাখনা মেলার সুযোগ করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর উপমহাদেশের রাজনীতির নিয়মেই তার পত্নী খালেদা জিয়া (বিবাহপূর্ব নাম খালেদা মজুমদার) বি এন পির সর্বোচ্চ পদে আসীন হন।

ইতিহাসের নিরপেক্ষ দৃষ্টি বলে মুজিব কিংবা জিয়াউর রহমান এঁরা কেউই ক্ষমতায় আসার পর অকস্মাৎ ক্ষমতা পেয়ে দেশের ভাল করার পরিবর্তে বিভিন্ন রকম সমস্যা দিয়ে, বাংলাদেশের বাঙালিদের আরও হতাশায় নিমজ্জিত হন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বলে, খালেদা জিয়া পদে থাকাকালীন জামাত তথা মৌলবাদীদের এমন প্রশ্রয় দেন, এবং বাংলাদেশের মাটিকে ভারতবিরোধী সমস্ত কাজের আখড়ায় পরিণত করেন। আদতে ভারতবর্ষ যে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছিল দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেই ইতিহাস এই দলটি যথাসাধ্য মোছার চেষ্টা করেছে। ভারতের কাছে বি এন পি ক্ষমতায় থাকা চিরকালই এক বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে এসেছে। অন্যদিকে আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশীদের কাছে বিরাট কোন লাভ না হলেও অন্তত কিছুটা হলেও নিরাপত্তাগত দিক থেকে ভারত একটু ভাল জায়গায় যেতে পারে।

আসলে মৌলবাদী আখড়া সব জায়গায় সব দেশেই সমান, আর এস এস যেমন ভারতবর্ষে দেশ জাতি গঠনের নামে পিটি ইত্যাদি করে আসলে হিন্দু মৌলবাদী ও মগজধোলাইয়ের কেন্দ্র গড়ে তুলছে একই ভাবে এই জামাত ই ইসলামি কিংবা লস্কর ই তইবা, কিংবা তালিবান কিংবা আল কায়দা এরা ইসলামের জিগির তুলে আদতে তাদের সংকীর্ণ স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায়।

সাম্প্রতিক কালে আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এল এবং বিপুল ভোটে জিতে। ভোটের সময় তাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি ছিল রাজাকারদের শাস্তি দেওয়া। আদতে খুঁজে পেতে দেখলে দেখা যাবে, গোটা দেশে ৫ থেকে ৭ শতাংশ এই সব মুসলিম মৌলবাদের কবলে পড়ে আছে, কিন্তু সমস্যা হল উপমহাদেশ। যে উপমহাদেশে চিরকাল ধর্মই শেষ কথা বলে, শিক্ষার থেকে ধর্মই চালিকাশক্তি হয় দেশের, এবং মূল সমস্যা অশিক্ষা সেখান থেকে ভাল কিছু আশা করা সম্ভব নয়।

ঠিক এই সময়েই রাজাকারদের বিচার শুরু হল বাংলাদেশে এবং যখনই এক রাজাকারের বিচারে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন ঘোষণা হল ঠিক তখনই গর্জে উঠল মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো, ধর্মীয়  কুসংস্কারের  বন্ধন থেকে মুক্ত বাঙালি সমাজ। শাহবাগে শুরু হল এক জাতীয়তাবাদী অরাজনৈতিক বিক্ষোভ যার মূল দাবীই হয়ে উঠল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশবাসীর বিপক্ষে গিয়ে দেশের চরম ক্ষতিসাধন করেছিলেন তাদের ফাঁসি। একসময় দাবী উঠল জামাত নিষিদ্ধ করার। এবং সাম্প্রতিক কালের সমস্ত রকম বিক্ষোভ ছাপিয়ে প্রতিবাদের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল শাহবাগ।

এবং ঠিক এইসময়েই তাদের রঙ চিনিয়ে দিল বি এন পি, দেশের এই জন জাগরণের সময়ে জামাতের হাত ধরে। বুদ্ধিজীবী ধর্মনিরপেক্ষ জাগ্রত জনতাকে “নাস্তিক” আখ্যা দিয়ে ইসলাম ও নাস্তিকের যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে এই আন্দোলনের নামে নানারকম কুৎসা ছড়ানো শুরু করল জামাত তথা বি এন পি। এক রাজাকার সাঈদির ফাঁসির রায়ে এই মৌলবাদীরা হয়ে উঠল অতিরিক্ত সক্রিয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে যতভাবে সম্ভব ঝামেলা পাকানো শুরু করে দিল।

বাংলাদেশের লড়াই তাই এখন মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, যে লড়াই লড়তে ভারতবর্ষ এখনও পিছিয়ে রয়েছে কয়েক লক্ষ যোজন, যে ভারতবর্ষে এখনও জাত পাতের নামে, মতুয়ার নামে, ইসলামের নামে নির্লজ্জ সংখ্যালঘু তোষণ হয়। তাই বাঙালিরা এখানেও ভারতবর্ষকে হারিয়ে দিল, এবং মনে করিয়ে দিয়ে গেল গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই অমোঘ বাণী “what Bengal thinks today, India thinks tomorrow”.

লড়াই চলুক, বলাই বাহুল্য আমার রায় কোন দিকে…