মেসি

ছোটবেলায় আলিফ লায়লা বলে একটা সিরিয়াল হত ডি ডি তে, বেসিক্যালি আরব্য রজনী। একটা এপিসোড আজও মনে আছে। সিন্দবাদ একটা চোরাবালির মত কিছু তে কোমর অবধি তলিয়ে আছে, আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে আরও। হাতে একটা ধনুক, আর একটাই তীর। সামনে একটা পাখি জাতীয় কিছু ঘুরছে, সেটার চোখে মারতে পারলে বেঁচে যাবে, আর ফসকালেই শেষ। সোজা তলিয়ে যাবে। আগের 2 টো তীর ফসকে গেছে, এটাই শেষ সুযোগ। সিন্দবাদের কপালে ঘামের ফোঁটা। নিজের নার্ভকে আয়ত্তে এনে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হবে। একটাই সুযোগ।

কাল রাত্রে সাড়ে এগারোটা নাগাদ টিভির সামনে বসে যখন মেসিকে দেখলাম, আমার এই গল্পটাই মনে পড়ে গেল। একটা গোটা দেশের 32 বছরের ট্রফি খরা কাটানোর দায় কাঁধে নিয়ে খাদের কিনারায় নেমেছে ওয়ারিওর প্রিন্স। আগের 2 টো ম্যাচে চেনা ছন্দে খুঁজে পাওয়া যায়নি একেবারেই, তার ওপর পেনাল্টি মিস। দলের অবস্থান টেবিলের তলার দিকে, পরের রাউন্ডে যেতে হলে আজকের ম্যাচ টা জিততেই হবে। একটাই সুযোগ্য, জিতলে কিছুদিন স্বস্তি, হারলে সোজা খাদের অতল।

ফুটবল খেলাটা বড় নিষ্ঠুর। এক মুহূর্তেই রাজাকে ফকির আর ফকির কে রাজা বানিয়ে দেয়। একটা খারাপ দিন…একটা মিস পাস…একটা ভুল ফিস্ট, আর সব শেষ। হিরো তখন সোজা ভিলেন। 94 এর ফাইনালে বাজ্জিওর সেই পেনাল্টি কিক টা ভাবুন, একটা গোটা দেশের 4 বছরের অপেক্ষা ওই একটা কিকেই শেষ …ব্যর্থতার সব দায় তখন নায়কের ঘাড়ে। “ও তো আসলে বার্সেলোনার প্লেয়ার… গা বাঁচিয়ে খেলে, দেশের প্রতি কোন কমিটমেন্ট ই নেই….ইনিয়েস্তা ছাড়া তো অচল….সি আর সেভেন এর মত স্পিড নেই …মারাদোনার ধারেকাছে না ….” ইত্যাদি ইত্যাদি।

মধ্যবিত্ত বাঙালির একটা সমস্যা হল, সব ব্যাপারেই সবজান্তা হাবভাব। প্যান্টে কাদা লেগে বাড়িতে বকুনি খাওয়ার ভয়ে কাদামাঠ এড়িয়ে যাওয়া পাশের বাড়ির বাবান থেকে শুরু করে উদয়ন সংঘের রিজার্ভ বেঞ্চ গরম করা পাশের পাড়ার সাধন জেঠু, ফুটবল জ্ঞানে মোটামুটি সবাই মোরিনহকে বলে বলে 10 গোল দিতে পারে। অথচ একটা খুব সাধারণ ব্যাপার কেউ বুঝতে চান না, 1986 আর 2018 এর মধ্যে অনেকটা সময়ের ফারাক আছে। খেলাটা এর মধ্যে অনেকটা পাল্টে গেছে, একক দক্ষতায় ম্যাচ জেতানোর দিন শেষ। সম্ভবত জিদানই এই ঘরানার শেষ ফুটবলার।

আর্জেন্টিনার প্রথম একাদশে তারকা প্লেয়ারের অভাব নেই। ম্যান সিটি, জুভেন্টাস, পি এস জি র প্রথম একাদশে নিয়মিত খেলা ফুটবলারের ছড়াছড়ি। তাও 15 বছর ইন্টারন্যাশনাল ট্রফির খরা কাটানোর সব দায় ওই একটা লোকের উপরেই কেন বর্তায় আমার জানা নেই। তাহলে বাকি 10 জনের কি ভূমিকা মাঠে?

এই সমস্ত সাত পাঁচ ভাবছিলাম, হঠাৎ ই মাঝমাঠ থেকে বানেগার একটা ঠিকানা লেখা পাস উড়ে গেল নাইজেরিয়া বক্স এর দিকে। নীল সাদা জার্সি পড়া একটা বেঁটে লোক, ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে একটা ডিফেন্ডার। বাম উরু দিয়ে রিসিভ করে বাঁ পায়ের আলতো টাচ এ বল টা নামিয়ে আনা, তারপর ডান পায়ের একটা অনবদ্য ফিনিশ …..

বিশ্বকাপ তোমার হাতে আসবে কিনা জানি না সূতপুত্রের যন্ত্রণা নিয়ে তোমাকে খেলা ছাড়তে হবে কিনা জানি না, রোনাল্ডো তোমার চেয়ে বেশি ব্যালন ডি ওর নিয়ে রিটায়ার করবে কিনা জানি না। একজন ফুটবল রোমান্টিক হিসেবে এই টুকু জানি, তুমি অনবদ্য। ফিনিক্স পাখির মত ছাই এর স্তূপ থেকে ফিরে আসতে জানো তুমি।