সিনেমার কুইজ – ৪

প্রথম দুই সপ্তাহ হিন্দি সিনেমার প্রশ্নের পর গত সপ্তাহের বাংলা ধাঁধা আশা করি ভালো লেগেছে , এবার উত্তর এর পালা ।

এর সমাধান এর শুরু হতে পারে দুই ভাবে – ক এর নাম গ নামক সাহিত্যিক এর সাথে এক এবং খ এর প্রথম রঙিন ছবি বাঙালি সাহিত্যিক , সমস্ত নাম ভাবলে একমাত্র মিল পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার এর।

এবার প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার কে ?যারা জানেন না তাদের বলি এ হল বিখ্যাত অভিনেতা রবি ঘোষ এর আসল নাম।
এই সূত্রে এগোলে আমরা পাই ,ক : রবি ঘোষ এবং গ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।

এবার প্রথম রঙিন ছবি, যদি আমরা ধরি খ হলেন সত্যজিৎ রায় , তবে তার প্রথম কালার/রঙিন ছবি হল  কাঞ্চনজঙ্ঘা ।যদি মিলিয়ে দেখি রবি ঘোষের স্ত্রী সেই ছবিতে ছিলেন কিনা, তাহলে আমরা পাই হ্যাঁ ,তার স্ত্রী অনুভা গুপ্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিতে কাজ অভিনয় করেন।
এর ফলে আমরা বলতে পারি  খ : সত্যজিৎ রায় , ঘ : অনুভা গুপ্ত এবং চ : কাঞ্চনজঙ্ঘা।

এরপর সেই ছবি যা ২০১১ সালে রিমেক করা হয়, যা কিনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা। সেই সূত্রে একটি ছবির নামই আসে যা হল নৌকাডুবি ,যা কিনা ঋতুপর্ণ ঘোষএর পরিচালনায় তৈরি।যদি এবার মিলিয়ে দেখি ১৯৭৯ সালে অজয় করের পরিচালনায় নৌকাডুবি সিনেমা রূপ পায় যাতে অক্ষয়-বাবু র চরিত্রে রবি ঘোষ অভিনয় করেন ।
তাই এর থেকে বলা যায়ে – ছ : নৌকাডুবি এবং জ : ঋতুপর্ণ ঘোষ ।

এবার পুরোটা একবার দেখে নেওয়া যাক ঃ
ক – রবি ঘোষ
খ – সত্যজিৎ রায়
গ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ – অনুভা গুপ্ত
চ – কাঞ্চনজঙ্ঘা
ছ – নৌকাডুবি
জ – ঋতুপর্ণ ঘোষ

এবার এই সপ্তাহের প্রশ্ন ঃ
ক – অভিনেতা হিসাবেই তিনি মূলত পরিচিত , তিনি বেশ কিছু ছবি পরিচালনাও করেছেন । তার মধ্যে দুটি হিন্দি ছবি হল : খ (যাতে গ অভিনয় করেন) এবং ঘ (যাতে চ অভিনয় করেন)।
গ এবং চ আবার একসাথে ছ নামক ছবিতে কাজ করেন ।ছ এর পরিচালক হল জ ।
জ-এর ভাই ঝ আরেকজন পরিচালক ,যিনি ট নামক পরিচালকের সহায়তা করেন ঠ নামক ছবি তে। ঠ কে হিন্দি ছবির জগতে সেরা whodunit কাজের অন্যতম বলা হয়ে থাকে।
ক সেই ঠ ছবিতে এক প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ।
ঠ ছবিটা ফ্লপ করার পর ট আরেকটি ছবি দ করেন (পরিচালক এবং নির্মাতা) যাতে গ অভিনয় করেন এবং ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পান ।

এবার বলতে হবে – ক, খ, গ, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ এবং দ-এর পরিচয় ।

উত্তর আগামী সংখ্যায় ।

পড়তে থাকুন ও কলকাতা

প্রাক্তন- The Former

হঠাৎ দেখা
রেলগাড়ীর কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন..। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যদি ‘হঠাৎ দেখা’ হয়ে যায় প্রাক্তনের সাথে? কি বলব আমি..কি শুধাবে সে..বলবে কি সে “আমাদের যা গেছে একেবারেই কি গেছে?কিছুই কি নেই বাকি..?উত্তরে কি বলতে পারব “রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে..”
এরকমই এক গল্পের সামনে দাঁড় করায় প্রাক্তন ।
রবিঠাকুরের এই কবিতা,‘হঠাৎ দেখা’ পর্দা জুড়ে যত্ন করে এঁকেছেন পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সিনেমাপ্রেমী মানুষদের কাছে এই পরিচালকের জুটি যে কতটা পছন্দের তার রেশ পাওয়া যায় প্রতিবার ওনাদের ছবি মুক্তির সময়।একেবারে নতুন কনসেপ্ট এ তৈরী এই গল্প বলিয়েদের ছবি প্রথম থেকেই বাংলা ছবির বাজারে হিট।
ইচ্ছে, মুক্তধারা, রামধনু, অলিক সুখ- তাঁদের প্রতিটি ছবির বিষয় সবসময় নতুনের আনন্দ দিয়েছে। খুব সাধারণ গল্প এই পরিচালকদ্বয়ের ক্যানভাসে নতুনভাবে ছবি হয়ে ওঠে।
আর বেলাশেষে শুধু রেকর্ডই ভাঙেনি আমাদের নিয়ে গেছে সেই পুরনো দিনের ভালোবাসার গল্পে- যে গল্প আমরা নতুন প্রজন্মরা খুব কমই দেখার সুযোগ পেয়েছি।তাই বেলাশেষের পর প্রাক্তন এর অপেক্ষায় ছিল ছবিপ্রেমী বাঙালিরা।
ছবি শুরু হয় মুম্বাই এর ট্রেন যাত্রা দিয়ে আর এগিয়ে চলে নিজের গতিতে।সেই মুম্বাইয়ের ট্রেনে ছায়া ফেলে ছেড়ে আসা প্রেম, পুরনো অভ্যাস, হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তরা আর শুরু হয় প্রাক্তনের যাত্রা।ছবি এগিয়ে চলে..পুরনো প্রেম আনাগোনা করে..হারানো ভালোবাসা, চেনা অভ্যাস, হারিয়ে যাওয়া কথারা ফিরে আসে প্রাক্তনের হাত ধরে।সামনে এসে সে বলে “সময় কোথা সময় নষ্ট করবার”..জীবনের নিয়মে এগিয়ে চলাই নিয়ম- তবু থমকে দাঁড়াতে মন চায়..একবার ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে পিছুটানের দিকে।

ছবির গল্প বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ এতদিনে অনেকেই এটি দেখে ফেলেছেন আর যাদের দেখা হয়নি তারা যাওয়ার প্ল্যানও সেরে ফেলেছেন। ছবির নাম যখন ‘প্রাক্তন’ তখন তার গল্পও যে প্রাক্তনের হবে এ আর নতুন কি কথা? কিন্ত এখানেও আছে একটা নতুনত্ব- মূল গল্পের মধ্যে আছে অনেকগুলো সাব-প্লট আর সেই চরিত্রগুলো সকলেই অতীতের গল্পে আটকে থাকা।যেখানে এক গানওয়ালা একরাশ অভিমান নিয়ে ছেড়ে এসেছে তার জোড়িদার আরেক গানওয়ালা বন্ধুকে- এক নবদম্পতি তাদের প্রাক্তনদের ছেড়ে এসে পথচলা শুরু করেছে একসাথে- ছেড়ে যাওয়ার গল্পে আছে এক ছেলে যে তার মা-বাবাকে ছাড়তেও পিছপা হয়নি। এইভাবেই প্রাক্তন আর বর্তমান মিলেমিশে এগিয়ে চলে।
আর এই সবের মাঝখানে এগিয়ে চলে উজান (প্রসেনজিত) আর সুদীপার (ঋতুপর্ণা)হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প। গল্প বলার ধরন বেশ সুন্দর- কখনো ফ্ল্যাশব্যাকে প্রেমের শহর কলকাতা আবার কখনো স্মৃতিভারাক্রান্ত মুম্বাই এর ট্রেন। ফিরে ফিরে আসে পুরনো ছবি, ভালবাসার মুহূর্ত, অভিমানের প্রহর। চেনা টুকরো টুকরো ঘটনা বার বার বলতে চায় শুধু ভালোবাসা নয় সম্পর্ক টিকে থাকে বোঝাপড়ায়- ভালোবাসার মানুষের সবটুকু আপন করে নিয়ে খুব যত্ন করে না রাখলে সম্পর্ক থাকেনা- ভালবাসা হারিয়ে যায়। এইভাবেই মুম্বাইগামী ট্রেন কলকাতায় ফেরে এক প্রেমের গল্প, বন্ধুত্বের গল্পের সাক্ষী হয়ে।
এবার আসা যাক অভিনয়ের প্রসঙ্গে। বাংলা সিনেমার সবথেকে জনপ্রিয় জুটি প্রসেনজিত আর ঋতুপর্ণা অভিনয়ের গুণে সম্পর্কের দোলাচল খুব সুন্দর ভাবে পর্দায় এনেছেন-তাঁদের ভালোবাসা-অভিমান-ঝগড়া, উজান-সুদীপার সম্পর্ককে জীবন্ত করে তুলেছে। এছাড়াও গল্পের একাধিক সাবপ্লটের বিভিন্ন চরিত্রে সকলেই নিজের নিজের মত করে সুন্দর। কিন্তু অপরাজিতা আঢ্য ছাপিয়ে গেছেন সকলকে। মন খোলা হাসি নিয়ে ওরকম প্রাণবন্ত অভিনয় এই ছবির অনেক বড় পাওনা।
শহর কলকাতা এই ছবিতে প্রেমের অনুঘটক। প্রিন্সেপ ঘাটের নৌকায় দেখা সূর্যাস্ত, ট্রামে টানা গাড়ির হাত ধরে এই শহরে প্রেম আসে- আর সেই প্রেম আরও গভীর হয় ময়দানের আড্ডায় আর চার্চের নিস্তব্ধতায়। কলকাতাকে যারা ভালোবাসেন তারা আরও একবার প্রেমে পড়বেন এই শহরের।
অনুপম রায়ের গান নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই- শহুরে, প্রাণবন্ত সবটাই যেমন প্রতিবার হয়। কিন্তু “অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর” গানটির প্রতিটি শব্দ অদ্ভুত রকমের সুন্দর- অনেকখানি মন কেমন করা ফাঁকা একটা অনুভূতি তৈরি করে। ইমন চক্রবর্তী এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা মিশিয়ে খুব যত্ন নিয়ে এই গানটি গেয়েছেন।
সবশেষে বলতেই হয় প্রাক্তন কোনও ব্যতিক্রমী ছবি নয়, এমনও নয় যে এই ছবিতে প্রচুর তত্ত্বকথা আছে, আবার এও নয় যে এই ছবি খুব ভাবায়। কিন্তু প্রাক্তন যেটা রেখে যায় তা হল মন কেমন করা একটা রেশ। ভালোলাগার রেশ, এগিয়ে যাওয়ার রেশ রেখে প্রাক্তন শেষ হয়। ছবিটি কারো কারো একটু বড় মনে হতে পারে, একটু টানাও মনে হতে পারে… কিন্ত আমি বলবো প্রাক্তনের সাথে দেখা যখন হল সময় তো থমকে দাঁড়াবেই, ফেলে আসা জীবনের পিছুটান একটু বড় তো হবেই!

সিনেমার কুইজ – ৩

গত সপ্তাহের সিনে-ধাঁধা আশা করি সকলের ভালো লেগেছে। প্রথম সপ্তাহের তুলনায় সহজ ছিল না !!! তাহলে এবার উত্তর এর পালা  ।

একই ছবিতে (যা কিনা ৫০ এর দশক এর একটি কালজয়ী ছবি )৩ অভিনেতা ,তাদের মধ্যে দুজনের পরবর্তীকালে বিবাহ এবং তাদের পুত্রও পরে অভিনেতা হয়, এই সব সুত্র এক করলে যাদের কথা মনে হয় ,তারা হলেন নার্গিস – সুনীল দত্ত।
তাহলে ক – নার্গিস আর খ – সুনীল দত্ত ধরে এগোলে কি দাঁড়ায়ে দেখা যাক ,
নার্গিস – সুনীল এর সম্পর্কের সূত্রপাত মাদার ইন্ডিয়া ছবি তে ,তাই ঘ হলো মাদার ইন্ডিয়া।
মাদার ইন্ডিয়া ছবির আরেক অভিনেতা – রাজেন্দ্র কুমার, তার ছেলে কুমার গৌরভ বিয়ে করেন নম্রতা দত্ত কে যে নার্গিস – সুনীল মেয়ে ।
তাই – গ – রাজেন্দ্র কুমার, ছ – কুমার গৌরভ, চ – নম্রতা দত্ত।
নার্গিস – সুনীল এর ছেলে সঞ্জয় দত্ত ,তাই জ – সঞ্জয় দত্ত।
ঝ – সেই ছবি যাতে সঞ্জয় দত্ত আর কুমার গৌরভ একসাথে অভিনয় করে এবং ছবি টা সুপার হিট হয় ,১৯৮৬ সালের ছবি টার নাম – “নাম” ।

এবার পুরোটা একবার দেখে  নেওয়া যাক –
ক – নার্গিস
খ – সুনীল দত্ত
গ – রাজেন্দ্র কুমার
ঘ – মাদার ইন্ডিয়া
চ – নম্রতা দত্ত
ছ – কুমার গৌরভ
জ – সঞ্জয় দত্ত

এই সপ্তাহের প্রশ্নঃ
ক একজন বিখ্যাত চরিত্রাভিনেতা যাকে অনেকবার বিখ্যাত পরিচালক খ এর ছবি তে দেখা যেত।ক এর নাম এক বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক গ এর সাথে এক ছিল ।
পরিচালক খ সাহিত্যিক গ এর একাধিক সাহিত্য থেকে ছবি বানিয়েছেন ।
ক এর প্রথম স্ত্রী ঘ, চ নামক ছবি তে কাজ করেন , চ হলো পরিচালক খ এর প্রথম কালার ছবি ।
ক একটি ছবি করেন ছ , যা কিনা গ এর এক সাহিত্যকীর্তির ওপর বানানো. ২০১১ সালে ছ ছবিটা আবার পরিচালনা করেন পরিচালক জ এবং ছবির নাম একই থাকে।

বলতে হবে ক, খ, গ, ঘ, চ, ছ, জ কারা ।

উত্তর আগামী সংখ্যায় ।

পড়তে থাকুন ও কলকাতা

আমিও কাপ্তান

কতটা সেকেলে হয়ে গেছি তা একটা প্রমাণ পেলুম আজকে। সিনেমা দেখতে গেছি – ভালো কথা। চলতে চলতে একটা সময় সে সিনেমা শেষও হয়ে গেছে, মানে ঐ নাম দেখাতে শুরু করেছে আর কি – হাফ লোক উঠে হাঁটা লাগিয়েছে -ভিড় – ঠেলাঠেলি – দেখি কিছু পাবলিক তখনও চোখে চশমা সেঁটে বসে আছে। মনে মনে ভাবলাম একি কেস? কিন্তু তাতেও তারা ওঠেনা দেখে মনে হল এত পয়সা দিয়ে টিকিট কেটেছে, বোধহয় শেষ অবধি নাম দেখানটুকু দেখবে। এমনি করতে করতে প্রায় বেরিয়ে এসেচি – তখন দেখি স্ক্রিনে নামের বদলে আরেকটু কি সব দেখাচ্ছে। ভাবলাম এ কি রে বাবা – আবার প্রথম থেকে রিলটা ঘুরতে শুরু করল নাকি? পরে বুঝলুম না তা নয় – আরেকটু গপ্প দেখান হচ্ছে। সেই কমিকের শেষ পাতায় যেমন ক্লিফ হ্যাঙ্গার করা হত এক কালে – সেইরকম। মানে দর্শককে আরও একটু তাতিয়ে দেওয়া – বেরিয়ে আসার পর শুনলাম এরকম নাকি মার্ভেল সব সিনেমায় করে থাকে – আর নিজেকে বললাম – শালা, বেকুবিরও একটা সীমা থাকে – এদ্দিন ধরে সিনেমার পর্দায় ঢিসুম ঢাসুম গিলছি – আর এইটাও জানতাম না? বোঝ কাণ্ড। যাক গে – সে বেকুবির কথা এখন থাক। সিনেমার কথায় আসি।

আমিও কাপ্তান

হ্যাঁ, নতুন অ্যাভেঞ্জার সিনেমার কথাই বলছি। ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা – সিভিল ওয়ার। তা সিভিল ওয়ার বলতে যা বোঝায় সেই গৃহযুদ্ধ কাপ্তান করেছেন ভালোই মানতে হবে – সেই ধোঁয়া, আগুন, গোলা বারুদ, বন্দুক,পিস্তল, ঢাল তরোয়াল, স্পাইডারম্যান – সবে মিলে এক্কেবারে জমজমাট ব্যাপার। তবে কিনা হ্যাঁ – কেউ যদি এই সিরিজের আগের কোন সিনেমা নাই দেখে থাকেন, তাহলে বুঝতে একটু অসুবিধে হতে পারে। যেমন আমার পাশের সিটের কয়েকজন দম্পতির হচ্ছিল। বার বার উঠে পপকর্ন খাব, আলুভাজা খাব, মোমো খাব। অনেকটা যেন আলিবাবার গল্পে বন্ধ দরজার সামনে কাশিমের ‘চিচিং ফাঁক’ ভুলে গিয়ে খেতে না পেলে মানুষ কি করে – ‘খাই খাই ফাঁক’ আওড়ান টাইপের ব্যাপার – যা পাব তাই ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে যেব নইলে বার করে দেব – সেরকম ধান্দা থাকলে আপনার কাছে ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকাও যা, পাগলুও তাই। সিরিয়াসলি হোয়াট দা ফাঁক।

সে যাই হোক। সিনেমায় আসি। এবারের সারপ্রাইজ প্যাকেজ নিঃসন্দেহে স্পাইডার-ম্যান। একদিকে তার চোখে সুপারহিরোদের প্রতি শ্রদ্ধার অন্ত নেই আবার তাদের সাথে লড়তেও হচ্ছে। এই দলে সে সবচেয়ে ছোট – কিন্তু সমান-তালে পাল্লা দিয়ে চলেছে বড়দের সাথে। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও অ্যান্ট ম্যানের ছুঁড়ে দেওয়া সংলাপও খুবই উপভোগ্য। আসলে দুই দলের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময়ে এই ছোটখাটো কনট্রাস্টই কিন্তু দৃশ্যটাকে বাঁচিয়ে রাখে – কখনও নির্মল হিউমার বা কখনও নির্মম স্যাটায়ার। গল্প বলে দিলে মজাটা হালকা হয়ে যাবে – আর তাছাড়া এরকম স্পেশাল এফেক্ট ছেড়ে আমার রিভিউ পড়বেন – সে দুধের স্বাদ অম্বলে মেটানোর মত অবস্থা হবে। হ্যাঁ, যেটুকু না বললেই নয়, তা হল আলট্রনের সাথে লড়াইয়ের সময় সোকোভিয়ায় নিজের পরিবারকে হারিয়ে এক সৈনিকের ষড়যন্ত্র ফাটল ধরাতে শুরু করে অ্যাভেঞ্জারদের অটুট দুর্গে – যেখানে ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা আর আয়রন ম্যানের দলবল। বাদবাকিটা – শক্তিপদ চট্টোপাধ্যায় যেমন পাণ্ডব গোয়েন্দায় লিখতেন না – ‘ডিস্যুম’ – ঠিক তাই।

আমি বরাবর মার্ভেল ফ্র্যাঞ্চাইজির বেকুব ফ্যান (যে শেষ দৃশ্যের পরের দৃশ্য ব্যাপারটা এদ্দিন জানতো না) – কিন্তু লক্ষ্য করেছি যে অন্যান্য সুপারহিরো চরিত্রদের সিনেমাগুলোর তুলনায় ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকার গল্পের ঠাসবুনট একটু বেশি। সে প্রথম দিন থেকেই। সেই প্রথম সিনেমায় – ক্যাপ্টেনকে সিরাম দেওয়ার আগে একটা ফলস গ্রেনেড ছুঁড়ে পরীক্ষা করা হয় আর ক্যাপ্টেন সেটাকে দুরে সরিয়ে দেওয়ার বদলে গ্রেনেডটাকে মুড়ে শুয়ে পড়ে – আমার কাছে থেকে ক্রিস ইভান্স হিরো সেই দিন থেকেই – ঢাল তরোয়াল আর ফর্সা ভীমের মত বগলে ফোঁড়া নিয়ে হাঁটার স্টাইল তো পরের ঘটনা। সেই ফুটফুটে পেগি কার্টারের সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাক-ড্রপে হালকা প্রেম, পুরনো বন্ধুর জন্য জান কবুল করে দেওয়া অথবা কোনও নিয়ম শুনতে না চাওয়া – সবে মিলে কোথাও যেন ক্যাপ্টেন স্টিভ রজার্স যেন ক্যাপ্টেন আম্যেরিকার লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজটাকে ছুঁড়ে ফেলে ভিড়ের মধ্যে মিশে যান। সুপারহিরো সিনেমার হিসেবে এই সাফল্যটা অসাধারন।

ঐ যে অ্যাভেঞ্জারের প্রথম সিনেমায় ক্যাপ্টেনের এক পিস ডায়লগ ছিল না – “সুপারহিরোর স্যুটটা খুলে রাখলে তুমি কে?” যদিও ডায়লগটা অনেক বেশি বিখ্যাত আয়রন ম্যানের ‘জিনিয়াস-প্লেবয়-মিলিওনিয়ার-ফিল্যান্থ্রপিস্ট’ মার্কা ডাকাবুকো প্রত্যুত্তরের জন্য, কিন্তু আসল সত্যি তো এটাই যে সুপারহিরো সিনেমা আমাদের কাছে এক রোম্যান্টিক ইলিউশন ছাড়া আর কিছুই নয়। হলিউডে গল্প লেখা হয় না, তৈরি হয়। তবুও গল্পের লেখকদের তারিফ করতেই হচ্ছে কারন বন্দুক পিস্তলের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ চিঠিতে ক্যাপ্টেনের বন্ধুত্বের হাতছানি – এখনও এক মুহূর্তে আমাকে কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। থ্যাঙ্ক ইউ ক্যাপ্টেন।

আশ্চর্য প্রেমিক

Hasikhushi Snape
প্রোফেসর সেভেরাস স্নেইপ

একটা লোক বেঁচে থাকতে সব্বার স্বার্থেই স্বেচ্ছায় সব্বার সামনে নিজেকে ঘেন্নার চোখে দেখতে অভস্ত্য করে তুলেছিলো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক সব্বার স্বার্থে যেচে মুখ বুজে তার জীবনের সবথেকে দামী জিনিসটাকে যে কেড়ে নিয়েছে তারই খিদমতগার হয়ে থাকতো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যাকে কোনোদিন কেউ ভালোবাসার চোখে দেখেনি কিন্তু সে তাদের হয়েই লড়তে গিয়ে মর্মান্তিক ভাবে মরলো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যে বাধ্য হলো নিজের সবচাইতে প্রিয় মানুষটাকে নিজের হাতে মেরে ফেলতে। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যে নিজেকে যেচে সব্বার কাছে সন্দেহের পাত্র করে রেখেছিলো। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যে বিশ্বাস করতে ও করাতে চাইতো সে পাথর। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

একটা লোক যার মত সাহসী সেই দুনিয়ায় আর হাতে গুনে দুটো ছিলো, সেই লোকটাই কখনও বলতেই পারলোনা ভালোবাসি। কারন লোকটা ভালোবাসতো।

শুধু একজোড়া চোখের ওপর ভরসা করে, শুধু কৈশরের কয়েকটা মুহুর্ত সম্বল করে, শুধু একটা আশায়, একটা বিশ্বাসে, একটা ভালোলাগায়…লোকটা ভালোবাসতো।

আশা করা যাচ্ছে আজ জেমন্স পটার বেরসিকের মত ব্যাবহার করবেন না….

প্রোফেসর সেভেরাস স্নেইপ, এক আশ্চর্য প্রেমিকের গল্প


বৃটিশ কিংবদন্তী অ্যালান রিকম্যান চলে গেলেন ৬৯ বছর বয়সে – ক্যান্সারের সঙ্গে লড়তে না পেরে। আমি লন্ডনে থিয়েটার দেখিনি – দেখেছি শুধু প্রোফেসর স্নেইপ কে। সেই মানুষটাকে নিয়ে কিছু কথা যে না বললেই নয়।


বাজিরাও মাস্তানি

প্রথমেই বলে রাখি পেশোয়া প্রথম বাজিরাও এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মাস্তানির গল্প নিয়ে বলিউডে সিনেমা এটাই প্রথম নয়, ১৯৫৫ সালে প্রথম – ধীরুভাই দেশাই পরিচালিত ‘মাস্তানি’ নামক একটা বিস্মৃতপ্রায় সিনেমা, তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি তখন। এবারেও তেমন সাড়া ফেলতে পারত কিনা সন্দেহ আছে কারণ তদানীন্তন মারাঠা অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত ইতিহাস নিয়ে আজকের বেশিরভাগ ভারতবাসীই উদাসীন, মাধ্যমিক স্তরের ইতিহাস পাঠ্যক্রম শেষ হওয়ার সাথে সাথে যার প্রয়োজন ফুরোয় কিন্তু ধন্যবাদ সঞ্জয় লীলা বনশালীকে, অল্পশ্রুত কাহিনীকে বিরল দৃশ্যরূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জটা সুন্দর করে পরিবেশন করার জন্যে। ইতিহাস নিয়ে আমার বরাবরই আগ্রহ, কোথাও ঘুরতে গেলে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমার প্রথম পছন্দ। তাই সিনেমার অপ্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য নিয়ে অনেক ফিল্ম সমালোচনায় পড়লেও আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছিল ‘ইস্, আরেকটু সময় চললে পারত।’

bajirao

পক্ষপাত দোষে দুষ্ট তাই আমার ফিল্ম সমালোচনাও, সেটা গোড়াতেই বলে রাখা ভালো। যেমন সিনেমার শুরুতে বনশালীর ঘোষণা – cinematic effect বা appeal আনার জন্য কিছু কিছু ঘটনা পরিবর্তিত করা হয়েছে। ভালো কথা, একটু আধটু বিকৃতি  মানাই যায় কিন্তু ঘটনা বা স্থান কাল পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিলে কাঁহাতক্ সহ্য করা যায় ? বেশ কিছু ঐতিহাসিক অসঙ্গতি চোখে পড়ল। যেমন,

১) প্রথম বাজিরাওয়ের প্রথমা স্ত্রী কাশিবাঈ। কাশিবাঈ জন্ম থেকেই বাতের সমগোত্রীয় একটা জটিল অসুখে আক্রান্ত হন, যেজন্য আজীবন প্রায় শয্যাসীন অবস্থায় কাটাতে হয় তাঁকে। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল কাশিবাঈয়ের বিয়েটাও নিছক রাজনৈতিক অভিসন্ধিপ্রসূ্‌ যেটা তখনকার সময় খুব সাধারণ ঘটনা (বালিকা অবস্থাতেই তাঁর বিয়ে হয় বালক বাজিরাওয়ের সাথে)। কাজেই এহেন শয্যাসীন রুগ্ন মহিলার পক্ষে ধেই ধেই করে ‘পিঙ্গা’ নৃত্য/ জোরে হাঁটা অসম্ভব।

২) মাস্তানি (যিনি বাজিরাওয়ের থেকে বয়সে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন) বাজিরাওয়ের অন্তিমকালে তাঁর সাথে দেখা করতে খারগঁ গেছিলেন। এটা সত্যি যে বাজিরাওয়ের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁকে বন্দী করেছিলেন নানাসাহেব কিন্তু দূতমারফৎ বাজিরাওয়ের জটিল অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে রাধাবাঈ, কাশিবাঈয়ের পর নানাসাহেব, মাস্তানিও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন। সিনেমাতে দেখানো হয়েছে উল্টো। এখানেই শেষ না। অত্যন্ত হাস্যকর লাগল যেভাবে ক্লাইম্যাক্স দেখানো হল। টেনে টেনে একটা দৃশ্যকে কতটা লম্বা করা যায় তার সার্থক নমুনা। কোথায় শেষ দৃশ্যে চোখে জল আসবে, না – সে বালাই নেই। আমার পাশে বসা মেয়েটি ততক্ষণে WhatsApp চেক করতে শুরু করে দিয়েছে দেখলাম। প্রসঙ্গত জানাই, মাস্তানি বাজিরাওয়ের মৃত্যুর পর কিছুুদিন বেঁচে ছিলেন, এমন না যে সাথেসাথেই মরেছেন। তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা মত আছে। সর্বাধিক প্রচলিত মতে, তাঁকে হত্যা করা হয়। যেটা সবচেয়ে কম শোনা যায় কিন্তু গবেষণালব্ধ মত – নানাসাহেব (যিনি পরবর্তীকালে বালাজী বাজিরাও নামে সমধিক প্রসিদ্ধ) তাঁকে যৌন হেনস্থা করেন বাজিরাওয়ের মৃত্যুর পর, পরিণামে স্বামীর মৃত্যুজনিত দুঃখ আর অপমানের যুগপৎ কারণে মাস্তানির নিজের আংটিতে লুকিয়ে রাখা বিষপান করে আত্মহত্যা।

উপরোক্ত অসঙ্গতিগুলো অগ্রাহ্য করলে বাজিরাও মাস্তানি নিঃসন্দেহে দারুণ আকর্ষণীয় সিনেমা। দুর্ধর্ষ সেট (শুনেছি সবমিলিয়ে ২১টা সেট বানানো হয়েছিল), ঝলমলে পোশাক আশাক, দৃষ্টিনন্দন পেশোয়া নৃত্যশৈলী, পন্ডিত বিরজু মহারাজ নির্দেশিত একটি দুর্দান্ত কত্থক নৃত্য, কিছু শ্রুতিমধুর গান, রণবীর-প্রিয়াঙ্কা-তনভি আজমির নিঁখুত অভিনয় (তনভি প্রকৃত অর্থেই মাথা ন্যাড়া করেছিলেন রোলটার জন্য) এবং ভারতীয় যুদ্ধবিদ্যার অভিনব কলারিপয়াট্টু রণকৌশল এই ছবির অনন্য সম্পদ। দীপিকাকে সামান্য নিষ্প্রভ লাগল তবে সেটা চিত্রনাট্যগত ত্রুটি। যাবতীয় নজর বা ভাবাবেগ শুধু কাশিবাঈ চরিত্রটির দিকেই ধাবিত হচ্ছিল, প্রিয়াঙ্কাকে সেজন্য সাধুবাদ দেওয়া প্রয়োজন। অনন্য শিল্পগুণ সমৃদ্ধ এই সিনেমা যেন কোন রূপকথা বা চিত্রকরের তুলিতে আঁকা এক মায়াবী কল্পনা যা একবার কেন, আমার মনে হয় দুবার দেখার মতো  তবে অবশ্যই বড় পর্দায়। নতুবা visual effect তেমন ধরা পড়বেনা। তবে হৃদয়স্পর্শী লাগল না সবমিলিয়ে, বেশী ঝাঁ চকচকে হলে যা হারিয়ে যায়। প্রায় পনেরো বছর ধরে একটু একটু করে তৈরী হওয়া এই সৃষ্টি হয়তো তেমন সুন্দর লাগত না যদি সলমন খান মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতেন, শোনা যায় বনশালী বার দুয়েক সলমনকে মনোনীত করেছিলেন বাজিরাও চরিত্রের জন্য। রণবীর সিং যেরকম একাত্ম হয়ে মিশে গেছিলেন বাজিরাওয়ের  চরিত্রের সাথে সলমন তা পারতেন কিনা সন্দেহ আছে।

পুনশ্চ: আমাদের বাংলার মাটিতেও রোমান্টিসিজম বা বীরগাথা কম নেই কিন্তু। ভালো লাগে যখন যোধা আকবর, তাজমহল(২০০৫), মুঘল-ই-আজম্, বাজিরাও মাস্তানি প্রভৃতি সিনেমা দেখি। আরও ভালো লাগবে যদি কোনদিন এরকম বড় স্কেলে সিরাজ-উদ্-দৌল্লা + লুৎফন্নিসা কাহিনীও দেখতে পাই (ছোট স্কেলে বহুদিন আগে একবার হয়েছে – বিশ্বজিৎ, সন্ধ্যা রায় অভিনীত ‘আমি সিরাজের বেগম’)।

আমার রেটিং: ৪/৫

অন্য অহল্যা

[spp title=”অন্য অহল্যা- ১”]

অভিধানে অহল্যা শব্দটির অর্থ হল: লাঙল চালনার অযোগ্য এমন ভূমি আর সংস্কৃতে ন-হলা বা যা হল-কর্ষণযোগ্য নয়। এই অহল্যা নাম্নী নারীটি অযোনিসম্ভবা অর্থাৎ কোনও নারীর থেকে তার সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নিজ হাতে গড়া অমন তিলোত্তমা অন্য কোনও পুরুষের হয়ে উঠুক সেটিও বোধ হয় ব্রহ্মা মনেপ্রাণে মানতে পারেননি তাই বুঝি অহল্যা ছিলেন চিরকুমারী এবং সেখানেই তার নামটি সার্থক। আবার অভিশপ্ত পাথরে রূপান্তরিত অহল্যা সত্য সত্য‌ই হল-কর্ষণযোগ্য নয় এবং নিষ্ফলা । সেদিক থেকেও নামের আক্ষরিক অর্থটির সাথে সাযুজ্য রয়েছে।

 সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সৃষ্ট অহল্যা নামে নারী চরিত্রটি পৌরাণিক উপাখ্যানে স্বনামধন্য হয়ে আছে অনেকগুলি কারণে।
১) তাঁর রূপ (সৃষ্টিকর্তার খেয়াল )
২) বুদ্ধি (বৃদ্ধ-স্বামীকে মানিয়ে নেওয়া ও একইসাথে দেবরাজ ইন্দ্রকেও খুশি করা)
৩) বৃদ্ধ স্বামীকে মেনে নেওয়া (পিতা ব্রহ্মার কথা লক্ষ্মী মেয়ের মত মেনে নেওয়া )
৪) অসাধারণ সিডিউসিং পাওয়ার (বৃদ্ধ,যুবক সকলকেই পটিয়ে ফেলা )
৪) ইন্দ্রের সাথে পরকীয়ার কারণে অভিশপ্ত পাথরে রূপান্তরিত হয়ে প্রকৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থেকে যাওয়া (চিরন্তন ভারতীয় নারীর ত্যাগ )
৫) রামায়ণের রামকে অতিথি সৎকারে অভিভূত করে অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া (কঠোর তপস্যার জন্য আর কিছুটা গৌতমমুনির ক্ষমতা প্রদর্শন)
এবং এইসবগুলি কারণে পঞ্চকন্যার আখ্যা পাওয়া। “অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তদা, পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহা পাতক নাশনম্‌।” এবার দেখি মূল অহল্যা-গৌতম-ইন্দ্র উপাখ্যান কি বলে?

ব্রহ্মা যতগুলি মানসকন্যা সৃষ্টি করেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্কৃষ্টা এবং তিলোত্তমা ছিলেন এই অহল্যা।    সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নাকি স্বর্গের নর্তকী উর্বশীর রূপের দেমাক খর্ব করার জন্যই এই অবর্ণনীয় সুন্দরী অহল্যাকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। ব্রহ্মার কাছ থেকেই অহল্যা পেলেন চির-যৌবনবতী থাকার আশীর্বাদ। গৌতমমুনির কামনার স্বীকার হলেন যৌবনবতী অহল্যা। ধ্যানের বলে ব্রহ্মা জানতে পারলেন সে কথা, কিন্তু ব্রহ্মা ঘোষণা করলেন যে সারা পৃথিবী পরিক্রমা করে সর্বাগ্রে তাঁর সামনে আসবে তার সাথেই তিনি অহল্যার বিবাহ দেবেন। সেই কথা শুনে সমগ্র দেবকুল এবং মুনিঋষিরা সকলেই যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রা-শেষে আশ্রমে ফেরার মুখে মহর্ষি গৌতম একটি গোরুর বাছুর জন্ম নেওয়া লক্ষ্য করলেন। সেটি ছিল কামধেনু বা দৈব গোরু। সৃষ্টির এরূপ প্রকাশ লক্ষ্য করে গৌতম সেই গোবৎসের চারিপাশে প্রদক্ষিণ করে সেই পরিধির মধ্যিখানে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করলেন।

ব্রহ্মা দৈববলে সে কথা জানতে পেরে গৌতমমুনিকে বললেন যে একটি গাভীর সন্তানের জন্ম দেওয়া হল পৃথিবী সহ সপ্তদ্বীপের উৎপত্তির সমতুল্য। এবং সেই গোবৎসটি প্রদক্ষিণ করে তার মধ্যে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হল সারা পৃথিবী ভ্রমণের সমান। গৌতমের এরূপ কঠোর ধৈর্য দেখে ব্রহ্মার মন ভিজল। তিনি গৌতমমুনির সাথে অহল্যার বিবাহে সায় দিলেন। অসামান্য সুন্দরী অহল্যা হলেন বৃদ্ধ গৌতম মুনির যুবতী ভার্যা। ব্রহ্মা নবদম্পতিকে উপহারস্বরূপ ‘ব্রহ্মগিরি’ দান করলেন। ব্রহ্মগিরি হল নবদম্পতির আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের সর্বোচ্চ স্থান।

বাকরহিত

বাংলা ছবি বানানো খুব সহজ কাজ। এমনকি পৃথিবীর সহজতম কাজ বললেও ভুল হবে না।কেন? ধরুন আপনি একজন পরিচালক। উঁহু…ভুল বললাম।একজন বাংলা ছবির পরিচালক।এখন ধরে নিন আপনার হাতে প্রযোজকের মানিব্যাগ আছে।এন্তার চিট ফান্ড বা লেকমলজাত টাকা। আপনি কি করবেন?
১। প্রথমেই একজন বলিউড ফেরত নায়িকার ফাঁকা ডেট গুলো বুক করে নিন।
২। তারপর একজন ভালো ডি ও পি -র সাথে কথা বলে নিন।(সৌমিক হালদার হলে বেটার)।
৩। তারপর টি ভি চ্যানেলে একটা স্লট বুক করে নিন। ভালো ভালো কিছু টার্ম মুখস্থ করে যাবেন। (সংজ্ঞা -ও পড়বেন, কারন কিছু কিছু সাংবাদিক ঠ্যাঁটা হয়।খালি কোশ্চেন করে) যেমন সুররিয়ালিজম, দাদাইজম, কিউবিজম, নিও নোয়ার, স্লো সিনেমা, পোয়েটিক্স, হাংরিয়ালিস্ট আন্দোলন, হ্যানেকে,বার্গম্যান,ইরানিয়ান ডায়াস্পোরা ইত্যাদি। ইন্টার্ভিউ তে গিয়ে বলুন- আপনি এবার একটু “অন্যরকম” কাজ করতে ছান।এই “অন্যরকম” শব্দ টা আবার অনেক কিছু বোঝায়।মল্লিকা শেরওয়াৎ -ও অন্যরকম।আবার স্বদেশ সেনের কবিতা-ও অন্যরকম।
৪।যাকগে, এবার আপনি ছবিটা বানানো শুরু করে দেবেন। বলিউড ফেরতা নায়িকা কে নিয়ে বেশ কয়েকটা “অন্যরকম” শট নিন।মানে আপনি এতদিন টরেন্ট আর উইকিপিডিয়া ঘেঁটে যা যা শিখেছেন সেগুল কয়েকটা পারমুটেশন কম্বিনেশন করে দিন। বেলা টারের তুরিন হর্সের সাথে মাইকেল মানের চোখা সংলাপ—মেলাবেন আপনি মেলাবেন।
** ঋত্বিক বা শাশ্বত–এদের যেকোনো একজন কে নেবেন।এদের এখন পাবলিক খাচ্ছে ভালো।
৫।কিছু বোকা বোকা রমকম থেকে বামনদেব চক্রবর্তী মার্কা বাংলা অনুবাদ করা সংলাপ দেবেন। প্রেম যে আসলে দুনিয়ার সব সেরা ব্যাপার, অনেকটা পবিত্র, সাদা ভ্যানিলা আইসক্রিম বা ময়দানের বুড়ির চুলের মতো; আর রাজনীতি যে অতি বস্তাপচা, নোংরা খ্যাংরাঝাঁটা মার্কা জিনিস—এটা ভালো করে বোঝাবেন।তাহলে আনন্দবাজার ভালো নম্বর দেবে।
৬। আবার টিভি চ্যানেল।এবারে বলে আসবেন, এই ছবি টা করতে গিয়ে মানুষ হিসেবে আপনি এতোটাই পরিবর্তিত হয়েছেন, যে আর কোনোদিন আপনার আগের ছবি গুলোর মতো পাপিষ্ঠ ছবি বানাবেন না।তাই শুটিং শেষ করেই আপনি সিসিলি তে একটা ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন।
৭। ছবির শেষ টুকু ভাবাই আসল। বেশি চাপ নেবেন না। নেট ঘেঁটে কিছু না কিছু একটা পেয়ে যাবেন। আই এম ডি বি আছে না?আর মাথা খাটাতে চাইলে ৩ এর পয়েন্ট টা আবার একটু ঝালিয়ে নেবেন।
৮। মার্কেটিং, মশাই মার্কেটিং। ওটাই আসল। রেডিও, নিউজ চ্যানেল, রেস্টুরেন্ট, রকেট বড়ি,শপিং মল, আই পি এল–সবার সাথে কোলাবরেশন করে ফেলুন। বাকিটা ফ্যাল কড়ি, মাখ তেল।


ET00029563

ও হ্যাঁ, নির্বাক দেখলাম। সৃজিত মুখার্জির সব সিনেমাই প্রথম দিনে দেখে এসেছি এজাবত।পরিচালক হিসেবে সৃজিত ব্যাক্তিগত ভাবে আমার তেমন পছন্দ নন, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির ধারক বাহক পত্রিকাটির সৌজন্যে তাঁর প্রতিটি ছবিই সমালোচকের হাত খোলা নম্বর পেয়ে পাশ করে, তাই ভালো বাংলা ছবির কাঙ্গাল হিসেবে দেখতে যাই। অটোগ্রাফ আর জাতিস্মর বেশ ভালই লেগেছিল।কিন্তু নির্বাকে এসে ভদ্রলোক হতাশ করলেন।ছবির শুরুতে সালভাদর দালির নাম দেখে প্রত্যাশা বাড়তে বাধ্য।দালি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুনুয়েলের সাথে “আন সিয়েন আন্দালু” বা আন্দালুসিয়ান ডগ নামে একটি শর্টফিল্ম ও বানিয়েছিলেন।পিকাসো ও সহকর্মীরা ফিল্ম টির সমালোচনা করলে ক্রুদ্ধ দালি পকেটে ধিল নিয়ে থিয়েটারে যান জবাব দেওয়ার জন্য। আজও ছবি টি এই ২০১৫এর দর্শক কেও চমকে দেয়, ভাবায়।কিন্তু বঙ্গবাসী পরিচালকের থেকে সেই স্পর্ধা প্রত্যাশা করা টা বোধ হয় বারাবারি।যাই হোক, ছবিটি পাঠকরা এখন অনেকেই দেখেননি, তাই সংক্ষেপে স্পয়েলার ছাড়া নির্যাস টুকু বলি।ছবিটি চারটি গল্প নিয়ে তৈরী। আ ম্যান। আ ট্রি। আ বিচ। আ কর্পস্‌।প্রতিটি গল্পেরই থিম প্রেম, নীরবতা এবং মৃত্যু।প্রথম গল্পে অঞ্জন দত্ত একজন নার্সিসিস্ট মানুষ।যিনি নিজের প্রেমে মগ্ন।উডি আলেনের “সুইট অ্যান্ড লোডাউন” ছবির শন পেনের মতো সেলফ অবসেসড অঞ্জন অবশ্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।কিন্তু পরিচালক বোধয় ভুলে গেছিলেন যে সাদা অন্তর্বাস পরিয়ে চরিত্রকে চাড্ডি ইংরেজি বলালেই আন্তর্জাতিক মান ছোঁওয়া যায় না।দ্বিতীয় গল্প একটি প্রেমিক গাছকে নিয়ে।যে সুস্মিতা সেনের প্রেমে পড়ে সুস্মিতার বয়ফ্রেন্ড যীশুকে নাকাল করার চেষ্টা করে।তৃতীয় গল্প যীশুর কুকুর বিঙ্গিকে নিয়ে। সে যীশুর প্রেমিকা সুস্মিতা সেনকে মোটেই সহ্য করতে পারে না। এই গল্পের পরিনতি হয় একটি মৃত্যু তে। শেষ গল্পে মর্গের কেয়ারটেকার ঋত্বিক একটি মৃতদেহের প্রেমে পড়ে।কম্পাস দিয়ে আঁকা বৃত্তের মতই খুব প্রেডিকটেবল ভাবে এই গল্প টি শেষ হয়।তুলনামুলক ভাবে শেষ গল্পটি টেলএন্ডার ব্যাটসম্যানের মতো মান বাঁচানোর চেষ্টা করেছে ঋত্বিকের অসাধারণ অভিনয়ের গুনে।কিন্তু কয়েকটি বাজারচলতি চটুল হিন্দি গান অনাবশ্যক ভাবে ব্যবহৃত হয়ে ঋত্বিককে বেমালুম রানআউট করে দিয়েছে।সুস্মিতা সেনের রোলটি করার জন্য মুম্বাই থেকে নায়িকা আনার কি দরকার ছিল কে জানে? টালিগঞ্জে নায়িকা কম পড়িয়াছে বোধ হয়।মোটমাট ছবিটি একটি কারনেই দেখতে পারেন,সৌমিক হালদারের সিনেমাটোগ্রাফি।বাংলা সিনেমাটোগ্রাফি-র হল অফ ফেমের দিকে আরেক ধাপ এগোলেন হালদার মশাই।


শেষপাতে বলে রাখি ছবিটি নিয়ে ফেসবুক/টুইটারে পরিচালক-প্রযোজকের বন্ধুবর্গের লাগামছাড়া প্রশংসা মনে করিয়ে দিল চলচ্চিত্রের বিগ থ্রি ফেস্টিভ্যালের অন্যতম ভেনিসে এই বছর সেরা নবীন পরিচালকের সম্মান পাওয়া ছবি “আসা যাওয়ার মাঝে”(লেবার অফ লাভ) এখনো ফান্ডের অভাবে কলকাতায় মুক্তি পায়নি।সবার তো ভেঙ্কটেশ থাকে না রে,তোপসে।


ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ

ব্যোমকেশ দেখলাম – নতুন ব্যোমকেশ। শুধু বয়সেই নতুন যে তা নয়, অভিজ্ঞতায়, চলনে বলনে বাঙালির কাছে এ এক নতুন ব্যোমকেশই বটে। হ্যাঁ, দিবাকর ব্যানার্জীর নতুন সিনেমার কথাই বলছি। যশ রাজের ব্যানারে এই নতুন সিনেমা – শুধু সিনেমাই, পাঠক হিসেবে তাকে শরদিন্দুর সাথে গুলিয়ে ফেললে একেবারেই চলবে না কিন্তু। সাহিত্য-ধর্মী কাহিনী থেকে সিনেমার পর্দায় উত্তরণের কিছু পদক্ষেপ আছে, দর্শক হিসবে পরিচালকের সেই স্বাধীনতাটুকু মন থেকে মেনে নিতে পারলে আজকের ব্যোমকেশ বেশ ঝকঝকে সিনেমাই বলতে হবে। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ সত্যান্বেষী – আর দিবাকরের ব্যোমকেশ ডিটেকটিভ। পরিচালক কিন্তু প্রত্যাশা পূরনের রাস্তায় হাঁটেননি একেবারে গোড়া থেকেই।

আজকের ব্যোমকেশ বললাম বটে – কিন্তু আদপে ১৯৪২ এর ঘটনা। প্রথমেই বলতে হবে, পুরনো কলকাতা তৈরি করতে বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক ও সেট ডিজাইনাররা। খুঁটিনাটির জোরে সময়টাকে মেনে নিতে অন্তত: অসুবিধে হয় না। কাহিনীকার দিবাকর ব্যানার্জী নিজেই। উনি কয়েকটি নাম ও চরিত্রই শুধু ধার করেছেন শরদিন্দুর কাছ থেকে। বাকীটুকু কল্পনা। সেই কল্পনার ব্যোমকেশ কলেজ পাশ করেছে, চাকরির চেষ্টায় আছে – প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে তার কষ্ট হয়। তারপর সেই কলেজেরই ছাত্র অজিতের বাবা ভুবন-বাবু নিখোঁজ হয়ে গেলে সে তদন্তে নেমে পড়ে – আর তারপর গোটা সিনেমা জুড়ে একের পর এক রহস্যের উন্মোচন।

বাসু চ্যাটার্জির ব্যোমকেশ দেখলে যেমন মনে হয় একেবারেই বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছেন রজিত কাপুর, সেখানে সুশান্তকে মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধে হয় বৈকি। বিশেষ করে সে যখন বুদ্ধির খেলায় মাঝে মাঝে হেরে যায়। কিন্তু এখানে এই পার্থক্যটা মেনে নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। ব্যোমকেশ আর পাঁচজনের মত একজন কলেজের ছাত্র। তার সায়েন্স অফ ডিডাকশন যে প্রচণ্ড জোরালো তা নয় – বরং তার অস্ত্র হচ্ছে উপস্থিত বুদ্ধি এবং অনমনীয় জেদ। আজকাল ডিটেকটিভ বা থ্রিলারের নামে যেমন অনেকটা শ্যালকের (বেনেডিক্ট) কপি করতে নেমেছেন অনেক পরিচালক, সেখানে আমি বলব এই ব্যোমকেশের স্ক্রিন প্রেজেন্স বেশ ভালো।

বইতে পড়া দুটি গল্পের আদল এসেছে গল্পের কাহিনীতে আর সেই সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আন্তর্জাতিক টালমাটাল পরিস্থিতি। জড়িয়ে আছে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ব্রিটিশ সরকারের সাথে জাপানের দোলাচল – চীনে মাফিয়া। সব মিলিয়ে বর্ণাঢ্য পরিবেশ। এর মধ্যে কুহকিনী অঙ্গুরি-দেবীর চরিত্রে নেমে স্বস্তিকা দর্শককে একটু অন্যদিকে টানতে চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি এরকম ঠাসবুনোন রহস্যের বাজারে স্বস্তিকায় মায়াবী অবতার কিন্তু এক রকম দর্শককে বিভ্রান্তই করে, বিশেষ করে সিনেমার শেষে যখন চরিত্রটি গল্পের একেবারেই অন্যরকম হয়ে পড়ে। যাক সে কথা।

আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার বেশ চমকপ্রদ – বিশেষ করে এক এক সময়ে তা বেশ উত্তেজিতও করে তোলে দর্শককে। যখন মনে হচ্ছে গল্প কোনদিকে যাচ্ছে, তখন এই আবহ সঙ্গীতই কিন্তু মোড় ঘুরিয়েছে গল্পের। তবে হ্যাঁ, গল্পের খাতিরে এতটা জটিলতা সৃষ্টি করতে গিয়ে কোথাও যেন একটু ঢিলে হয়ে গেছে কাহিনীর আবেদন – কারন এটা আগেও দেখেছি, খুব জটিলতা অনেকটা অসম্ভবের পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়; অর্থাৎ স্মাগলিং, মাফিয়া, খুন যখম অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক আবহটা না থাকলেই বোধহয় ভালো ছিল। তবে অন্যান্য গুনের জন্য বোধহয় এইটুকু ত্রুটি মাফ করে দেওয়াই যায়।

ব্যোমকেশের কথা তো বললামই। অজিত সে তুলনায় অনেক কাছাকাছি, তবে সে মাঝে মাঝেই উত্তেজিত হয়ে কেন মারামারি করে বসে, সেটা ঠিক বুঝলাম না। অনুকূলের চরিত্রে নীরাজ বেশ নজর কেড়েছেন। ব্যোমকেশ দেখতে চাইলে অবশ্যই দেখুন, তবে সিনেমা সিনেমাই – আর গল্প গল্প। ফেলুদার বা কাকাবাবুর নামে যেরকম হাস্যকর বাংলা সিনেমা দেখে আমরা বারবার বিরক্ত হয়েছি, সেখানে আমার তো মনে হয় পিরিয়ড ফিল্মের নামে ক্লাসিককে কাটাছেঁড়া না করে দিবাকর একটা ভালো সিনেমাই করেছেন। এখন দেখুন আপনাদের কি মনে হয়।

নস্ট্যালজিক ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’

‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ আমি দেখতে গিয়েছিলাম দুটো কারণে – এক, এটা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সিনেমা (লোকটাকে আমার হেব্বি লাগে), আর দুই, সিনেমার ট্রেলারটা বেশ মনে ধরেছিল। তাছাড়া ‘মিরাক্কেল’ আর ‘দাদাগিরি’তে এই ফিল্ম ইউনিটের অভিনেতারা এসে সিনেমাটা সম্পর্কে অনেক ভাল ভাল কথাও বলেছিল। তবে সেগুলোকে অবশ্য পাত্তা দিইনি, নিজমুখে নিজের সিনেমার নিন্দে কেউ করে, তাও আবার রিয়েলিটি শোতে এসে? যাই হোক, রবিবারের এক সন্ধ্যায় সিনেমাটা দেখার জন্য আন্ধেরী ওয়েস্টের ‘ইনফিনিটি মল’-এ পৌঁছে গেলাম। বেশ ছিমছাম জায়গাটা, ওই যাকে বলে ছোট্টর ওপর গুছিয়ে। একটু এদিকসেদিক করে, ‘কাপে কফি দে’-তে কফি আর সামোসা খেয়ে, মুম্বইয়ের বং ব্রিগেডের কলকাকলী শুনতে শুনতে ঢুকে পড়লাম প্রেক্ষাগৃহে।

কিছু কিছু সিনেমা থাকে, যেগুলো দেখতে বসলেই সিনেমার চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেকে, এবং নিজের পরিচিত মানুষজনকে একাত্ম করা যায়, যার ফলে মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে ওঠে। ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ ঠিক সেরকম একটা সিনেমা। সেই উত্তর কলকাতার গলিঘুঁজি, গায়ে-গায়ে পুরনো আমলের সব বাড়িঘর, একটা বাড়ির ছাদ থেকে অন্য বাড়ির ছাদে যেখানে লাফ মেরে চলে যাওয়া যায়,  প্রতিবেশীদের মধ্যে একটা টক-ঝাল-মিষ্টিমধুর সম্পর্ক থাকে। চরিত্রগুলো দেখতে দেখতে মাঝে মাঝেই মনে হবে, “আরে, এ তো আমাদের পাড়ার অমুকবাবু কিংবা অমুকদা অথবা তমুকবৌদির মতন!” ঘটনাগুলোও বেশ নিজেদের জীবনের সঙ্গে মেলানো যাবে।

OTB

কিন্তু ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এর মূল আকর্ষণ অন্য জায়গায়।  আমরা, যারা নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছি, তারা এই ছবির পরতে পরতে নস্ট্যালজিয়া খুঁজে পাবে। অনেক পুরনো, মনের এককোণে দায়সারাভাবে পড়ে থাকা ঘটনা তাজা হয়ে যাবে সিনেমাটা দেখতে দেখতে। লাফিং ক্লাব, একমাসব্যাপী সাইকেল চালানো, মিলে সুর মেরা তুমহারা, কুছ খাস হ্যায় জিন্দেগী মে, সন্ধে সাতটার বাংলা খবর, কলকাতা ‘ক’, গণেশের দুধ খাওয়া, সূর্যগ্রহণের সেই বিখ্যাত ডায়মন্ড রিং – আরো অনেক ভুলে যাওয়া ঘটনা ছবির মতন চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ছবিটা দেখতে দেখতে মনে মনে বলে উঠেছিলাম, “কোথায় ছিলে ওস্তাদ, এতদিন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলে?”

সিনেমার গল্পটা এতদিনে সবার জানা হয়ে গিয়েছে, তাই নতুন করে আর বলছি না। তবে ফোয়ারা আর ওর বন্ধুরা আমাকে দুটো ঘন্টার জন্য ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আমার ফেলে-আসা কৈশোরবেলায়। বন্ধুদের সঙ্গে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া, মেয়েদের ঝাড়ি মারা, বন্ধুর প্রেমিকা দেখে ঈর্ষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলা, জানালার ফাঁক দিয়ে পাশের বাড়ির দাদা-বৌদির অ্যাডাল্ট শো, আরো নানারকম ‘নিষিদ্ধ’ অ্যাডভেঞ্চার দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আহা রে, আবার যদি সেইসব দিনগুলো ফিরে পাওয়া যেত! ফোয়ারা আর তিতিরের দৃশ্যগুলো খুব মিষ্টি। বিশেষ করে প্রথম সিনটা, যেখানে ফোয়ারা ওর নাম বলার পরে তিতির খিলখিল করে হেসে বলে ওঠে, “তোমার নাম ফোয়ারা? জল পড়ে?”

বন্ধুত্ব আর কৈশোরের প্রেম ছাড়াও এই ছবিতে মা-ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে, জীবনযুদ্ধে হেরে-যাওয়া একজন ফুটবল কোচের মরণপণ লড়াই আছে, কপালে চন্দনের ফোঁটা নিয়ে ট্রটস্কি আওড়ানো কমিউনিষ্ট নেতা আছে, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’ বুলি কপচানো পাড়ার মাস্তান আছে, আলাভোলা যুবকের চৌকস মেয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়া আছে, বন্ধুবিচ্ছেদ আছে, সুখ-দুঃখ আছে, মাপা হাসি এবং চাপা কান্নাও আছে। অনিন্দ্য এই পুরো ব্যাপারটা খুব নিপুণভাবে বেঁধেছেন। ছবির সংলাপ বেশ বুদ্ধিদীপ্ত এবং ঝরঝরে।

দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকটা প্রেডিক্টেবল, খানিকটা মেলোড্রামাটিকও বটে। ‘অবিবাহিত মায়ের’ কনসেপ্টটাও না আনলে চলতো। তবে এইসব ছোটোখাটো খামতি ছাড়া প্রথম ছবি হিসেবে অনিন্দ্য ভালভাবেই উৎরেছেন। “পাগলা খাবি কি”, “ওপেন টি বায়োস্কোপ” এবং অনুপমের “বন্ধু চল” গানগুলো খুবই শ্রুতিমধুর।

সবশেষে আসি অভিনয়ে। চার বন্ধু ফাটিয়ে অভিনয় করেছে। ঋদ্ধি সেন, ধী মজুমদার, ঋতব্রত মুখার্জী আর রাজর্ষি নাগ, চারজনেই অনবদ্য। সুরঙ্গমা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ মিষ্টি। ফোয়ারার মায়ের ভূমিকায় সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং ফুটবল কোচের ভূমিকায় রজতাভ দুর্দান্ত। এছাড়া ছোটছোট রোলে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অম্বরীশ মুখার্জী, সোহিনী সরকার, অপরাজিতা আঢ্য, কৌশিক সেন, বিশ্বনাথ বসু – সকলেই চমৎকার। ন্যাচারাল এবং সাবলীল অভিনয়ে সবাই মাতিয়ে দিয়েছেন।

সিনেমার এন্ড ক্রেডিটে ফের “বন্ধু চল” গানটা বাজছিল। সুখ এবং দুঃখ মেশানো একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল গানটা শুনে।

মনে হল নিজের একটুকরো কৈশোরকে যেন খানিকক্ষণের জন্য কেউ ফিরিয়ে দিয়েছিল, আবার নিয়ে নিয়েছে।