স্মৃতি সুধা

আকাশটা যেন আরও কাছে চলে এসেছে।সামনের সবুজ ফাঁকা জায়গাটার বেশীরভাগটাই আজ কংক্রিটের দখলে।আজকাল সবকিছুই যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে শীতটাও কেমন যান তাড়াতাড়ি চলে গেল। বসন্ত এসে গেছে। এক অদ্ভুত গুমোট ভাব। গতকাল এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, আজকে তার সামান্য রেশ মাত্র নেই। একটা হাল্কা হাওয়া তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে।

অনেকক্ষণ ছাদের ধারে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কমলেশ্বর বাবু। কমলেশ্বর সেন। আজকাল মানুষ ভীষণ যান্ত্রিক। কমলেশ্বর হতে পারেন নি। মোবাইলটা আজও চার্জের অভাবে। নিস্তেজ হয়ে পকেটে ঘুমিয়ে আছে। বাবলু ছাদের লাইটটা জ্বালাতে এসে জিজ্ঞাসা করলো-“ কি জেঠু, এখন এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, নিচে যাবেন না?” তন্দ্রাটা হঠাৎ করে ভেঙে গেল। এই সব কিছু তার কত আপন, এই ছাদ, এই হাওয়া, এই আকাশ, সামনের জঙ্গল সব। ছাদের এই জায়গাটা থেকে মনে হয় আকাশের ভীষণ কাছে চলে এসেছে, ইন্দিরাও দেখতে পাচ্ছে। আজ তিনবছর হল ইন্দিরা চলে গেছে, আজ একবছর উনি ফ্ল্যাটে।

প্রথম যখন ইন্দিরাকে এই জায়গাটা দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন, বাড়ী গিয়ে ইন্দিরা তিনদিন কেঁদেছিল।প্রায় এক সপ্তাহ কথা বলেনি। শহর থেকে অনেক দূরে এই জমিটা কেনার আগে কমলেশ্বর কোনও আলোচনাই করেনি ইন্দিরার সাথে। এছাড়া কোনও উপায় ও ছিল না।

দেশভাগের সময় নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে এসে সারাটা জীবন বাবা একটা নিজের বাড়ী খুঁজেছিলেন, পাননি। কমলেশ্বরের মধ্যে সেই অন্বেষণের বীজ বপন করে ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। তার কিছুদিন পর মাও চলে গেলেন। নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা শেষ করে একটি আধা সরকারী অফিসে চাকরী যোগাড় করেন। তারপর ইন্দিরাকে বিয়ে করে সংসার পাতেন হাতিবাগানের একটি ছোট্ট দুই কামরার বাড়ীতে। তারপর সরকারী ব্যবস্থাপনায় শহর থেকে বেশ দূরে এই জমিটি কেনেন বেশ সস্তায় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।

বাড়ি তৈরি করে দেন আস্তে আস্তে। প্রথমে ইন্দিরা কোন উৎসাহই দেখাতো না। কমলেশ্বর প্রায় রোজ বাড়ি ফিরে এসে নতুন বাড়ীর খুঁটিনাটি ইন্দিরাকে শোনাত কতদূর এগোল, কোথা থেকে ইট আনছেন, মার্বেল দিচ্ছেন কোনখানে, মোজাইক করবেন না লাল মেঝে, বারান্দাটাতে গ্রিল কি দেওয়া হচ্ছে। আসলে বাড়ীটার সাথে ইন্দিরাকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করতেন। “কি গো একদিন যাবে নাকি তোমার নতুন বাড়ী দেখতে” কমলেশ্বর জিঞ্জাসাও করেছিলেন। খুব শান্ত ভাবে ইন্দিরা উত্তর দিয়েছিল, “ আমার নয়, বাড়ীটা তোমার। যেদিন বলবে সেইদিনই যাব।” তারপর থেকে ইন্দিরাকে বাড়ীর ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতেন না কমলেশ্বর।

মানুষ যখন নিষ্ঠা নিয়ে কোন কাজ করে, এবং প্রতিদিন সেটাকে পুরো করার অঙ্গিকার নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন সময়ের নিয়মে সেটা শেষও হয়। সেই একই নিয়মে বাড়ী তৈরিটাও শেষ হয়।

একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ী, নিচের তলায় তিনটে ঘর, একটি বারান্দা, সামনে একটি বসার যায়গা, বাড়ীর সামনে একটু যায়গায় ছোট্ট একটা ফুলের বাগান, ইন্দিরা ফুল ভালবাসে। বাড়ীর নাম “ইন্দিরা ভবন”।

এখন কোলকাতা থেকে সরাসরি কোনও বাস এখানে এসে পৌঁছায় না। যায়গাটা থেকে বেশ দূরে নেমে হেঁটে বা রিক্সাতে এখানে আসতে হবে। রিক্সাও সবসময় পাওয়া যায় বললে ভুল হয়। বাজারটাও বসে বেশ একটু দূরে।

সব না পাওয়াকে সাথে নিয়েই সংসারটাও জমে উঠলো কমলেশ্বর ও ইন্দিরার। ইন্দিরাও আস্তে আস্তে যায়গাটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে একটার পর একটা বাড়ী তৈরি হতে আরম্ভ হল। নতুন প্রতিবেশীরাও বেশ ভাল। সবাই মিলে সুখ-দুঃখে একটি পরিবারের মতো বসবাস শুরু করলো শহরের উপকণ্ঠে। কমলেশ্বর আর অন্যদের তত্ত্বাবধানে যায়গাটা আরও সুন্দর হতে আরম্ভ করল। পাকা পিচ এর রাস্তা, আলো, একটা বাজার, সবকিছুই তৈরি হল কমলেশ্বরের চোখের সামনে।

আসলে প্রথম দিন থেকেই জায়গাটা কমলেশ্বরের পছন্দ হয়েছিল, যখনই দেখতেন কোন নতুন বাড়ীর ভিত পোঁতা হচ্ছে, তখনই তখনই বাড়ীর মালিকের সাথে ভাব জমিয়ে নিজেদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে আসতেন। এইভাবে সবার খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন কমলেশ্বর।

ততদিনে কমলেশ্বর আর ইন্দিরার জীবনে এসে গেছে এক নতুন মানুষ, ওদের সন্তান ইন্দ্র। দিনগুলো খারাপ কাটছিল না। ইন্দ্র বড় হয়ে উঠছিল। সাথে সাথে এই নির্জন জায়গাটাও বেড়ে উঠছিল কালের নিয়মে। বসবাসকারী প্রত্যেকের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিবিড়তাও পেয়ে যাচ্ছিল কালক্রমে। শহর থেকে দূরে বলে এখন শহুরে দামালপনা জায়গাটাকে গ্রাস করেনি। প্রথম বছরের সার্বজনীন দুর্গোৎসবের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন কমলেশ্বর। নিজেদের বসা, আড্ডা মারার জন্য একটা ছোট্ট ক্লাবঘরও করা হয়েছে। উফঃ কই সুন্দর দিন ছিল তখন।

যায়গাটার সেই বৈচিত্র্য আর অবশিষ্ট নেই। শহর বৃদ্ধি পেয়েছে দৈর্ঘ্যে আর প্রস্থে। এই কয় বছরে প্রচুর নতুন মানুষ এইখানে এসে নিজেদের বসতি করেছে। যেই যায়গাতে আসার কথা শুনে ইন্দিরা প্রায় সাতদিন কথা বলেনি, সেই যায়গায় প্রচুর নতুন মানুষ প্রায় প্রতিদিন চলে আসছে। কমলেশ্বর শুনেছেন অনেকেই নাকি তার পৈত্রিক বাড়ী বিক্রি করে এইখানে চলে আসছে। মানুষের সংসার সাথে মাটির পরিমাণের সামঞ্জস্য দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে। তাই সবাই এখন অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে একটা ফ্ল্যাটে থাকে। সমগ্র বিশাল একটা আকাশচুম্বী বাড়ীর খুপরি খুপরি যায়গা। নিজেদের মাটিও না, আকাশও না। সবাই মাঝখানে ঝুলছে। কেউ কাউকে চেনে না। নিজেদের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগ নেই। মানুষ একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

এইসব ভাবলেই কমলেশ্বরের আজকাল ভীষণ কষ্ট হয়। কমলেশ্বরের জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। ইন্দ্রর পড়াশোনা শেষ করে একটা ভাল চাকরি পেয়েছে। বছর দুয়েক হল ইন্দ্রর বিয়ে হয়েছে, আর তাদের একটি খুব সুন্দর সন্তান এসেছে। কমলেশ্বরের আদরের নাতনী রিনি। একবছর হয়ে গেছে ইন্দিরা ইহলোক ত্যাগ করেছে। কমলেশ্বরও চাকরী থেকে অবসর পেয়ে গেছেন। এখন প্রায় সারাদিন রিনির সাথে সময় কাটান। ভালই আছেন।

 

“আমাদের কোনও কথাই কি তুমি শুনবে না বাবা ?” – বেশ চেঁচিয়েই বলেছিল ইন্দ্র। বেশ অবাক হয়েছিলেন কমলেশ্বর। ইন্দ্র এইভাবে কোনোদিন তাঁর সাথে কথা বলেনি। “কি অসুবিধা হচ্ছে আমি তো বুঝতেই পারছি না। তোমরা ওপরে থাক, আমি নিচে থাকি। এই বাড়ী আমি কাউকে দেব না”- দৃঢ় উত্তর দিয়েছিলেন কমলেশ্বর।

কয়েকদিন ধরেই এই ঝামেলাটা আরম্ভ হয়েছে। ইন্দ্র চায় বাড়ী ভেঙে একটা অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে। এখন ফ্ল্যাটে থাকাই ভাল। নিজেদের মত সাজানো যায়। এই কয়েকদিনে ফ্ল্যাটের প্রচুর উপকারিতা তালিকা জানিয়েছে কমলেশ্বরকে। ইন্দ্রর এক প্রোমোটার বন্ধু প্রায়ই বাড়ীতে যাতায়াত করছে।কমলেশ্বর এই ব্যাপারে ভীষণ জেদি, কিছুতেই বাড়ী উনি দেবেন না। বিভিন্ন দিক থেকে চাপ দেওয়ার পর ইন্দ্র সবথেকে বড় খেলাটা খেলল। রিনিকে তাঁর দাদুর কাছে আসা বন্ধ করে দিল। আসলের থেকে সুদের প্রতি মানুষের লোভ চিরকালই বেশী থাকে। কমলেশ্বর সেন এইবার ভেঙে গেলেন। বাড়ীর জন্য সংসারটাই যদি না থাকে তাহলে কি লাভ। ইন্দিরা চলে যাওয়ার সময়ও এত দুঃখ পাননি। নিজের জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি, সবথেকে বড় কৃতিত্ব চলে গেল, প্রোমোটারের হাতে।

আজ সাতদিন হয়েছে কমলেশ্বর ফ্ল্যাটে চলে এসেছেন। তিনতলায় সামনে পেছনে মিলিয়ে বেশ বড় একটা ফ্ল্যাট। প্রথম কদিন কমলেশ্বর শুধু তাঁর পুরনো বাড়ীর সাথে এই নতুন অবস্থানের তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। ভীষণ গুমোট মনে হয়েছে। ওনার একতলাটা হয়তো এর থেকে ছোট ছিল, কিন্তু কত নিজের ছিল। ইন্দ্রর সাথে আর স্বাভাবিক হতে পারেন না। নিজের ছেলেকে ভীষণ বড় খুনি মনে হয়। অনার আপন সন্তানের খুনের একমাত্র চক্রান্তকারী। আজ জীবনে যদি কোন টান থাকে তা হল রিনি। ওর মধ্যে কমলেশ্বর ইন্দিরার ছবি দেখতে পান।

লিফটের সাথে এখনও খুব একটা অভ্যস্ত হননি কমলেশ্বর। তাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা ব্যহত হচ্ছে। ফ্ল্যাটের বাকি বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করারও কোন সুযোগ নেই। এই অ্যাপার্টমেন্টের সবথেকে ভাল লেগেছে এইখানকার ছাদটা। বিশাল। আকাশের কাছাকাছি। এই ছাদ থেকে সামনের অনেকটা দেখা যায়, ভাল লাগে। আশেপাশের বাড়ীগুলোও আস্তে আস্তে অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে যাচ্ছে। এইসব মানুষগুলো কষ্টকরে নিজেদের মত করে এই যায়গাটা সাজিয়েছিলেন। বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব করেন আজকাল।

সবাই ছাদ থেকে ধরাধরি করে কমলেশ্বরের নিথর দেহটা নামাল তখন রাত এগারটা। ইন্দ্র অফিস থেকে এসে বিশ্রাম নিয়ে রাতে খাবার খাওয়ার অনেকক্ষণ পর, বাবার ঘরে আলো নেভানো দেখে একটু অবাক হয়েছিল। সৌমীকে জিজ্ঞাসা করে জানল যে ও কিছু জানেনা। সৌমী সিরিয়াল দেখছিল। “ বাবার আসাটা আমি লক্ষ্য করিনি”-সৌমী বলেছিল। বাবলু বলল সে জেঠুকে শেষবার ছাদে দেখেছিল।

শহরের গুমোট ভাবটা এখনও কাটেনি। আকাশটাও ঘোলাটে হয়ে আছে। বৃষ্টি পড়বে মনে হয় কংক্রিটের জঙ্গলে। জীবন এগিয়ে যাবে জীবনের মতো।

রাজযোটক

“সেই দশটা বেজে গেলো, যতই তাড়াতাড়ি করি কিছু না কিছু করে দেরি হয়েই যাবে” – গজগজ করতে করতে শোভনা এপার্টমেন্টের তিনতলার ফ্ল্যাটে ঢুকল সরিৎ| রবিবার একলা মানুষের বাজার করতে বেশী সময় লাগে না -তবে পাঁচটা লোকের সাথে দু-পাঁচ মিনিটের কথায় ঘড়ির কাঁটা ধোঁকা দিয়ে যায়|সরিৎ ঘরে ঢুকে পরের কয়েক মিনিটে বাজারটা তুলে ফেলে আর আধ বোতল জল গলায় ঢেলে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়ল |

গল্পটা হল সরিৎ সোমের – নামের মতন মানুষটা সাদামাটা কিন্তু তার মধ্যেও তার জীবনটা বেশ আলাদা | বছর খানেক হল স্ত্রী-পুত্রকে এক পথ দুর্ঘটনায় হারিয়ে এখন সরিৎ একা – বাবা মা আগেই গত হয়েছিলেন, তারপর গত বছরের দুর্ঘটনার পর সে একেবারে স্বজনহারা | যদিও একেবারে স্বজনহারা বলা যায় না – তার তুতো পরিচয় কয়েক ভাইবোন ও তাদের পরিবার আছে, কিছু কাছের বন্ধু আছে এবং সর্বোপরি তার শ্বশুরকুলও আছে|তবে সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চললেও তার ধরন বেশ ঠান্ডা |ব্যাপারটা সাপ্তাহিক দু একটা ফোনের ওপর আর কোনো নিমন্ত্রণ পেলে লৌকিকতার দ্বারা সে চালিয়ে গেছে|কিন্তু পঁয়ত্রিশ পার করা সরিৎ গত এক বছরে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছে | তার প্রাইভেট ফার্মের চাকরি – বাড়ির টুকরো টাকরা দৈনন্দিন কাজ – কোনো ভালো ছবি এলে দেখতে যাওয়া – গল্পের বই পড়া যদি হয়ে তার জীবনজাপনের কিছু আবশ্যক কাজ তবে তাকে টিকিয়ে রেখেছে তার নিজের মাথা থেকে বের হওয়া এক অদ্ভুত নেশা |

সপ্তাহের বাকি ছদিন অফিস প্রভৃতি কাজে কালক্ষেপ হলেও রবিবারগুলো যেন তাকে কাটতে আসত | রুবি আর পাপাই যেদিন চলে গেলো তারপর থেকে সে চেষ্টা করেছে একা না থাকতে – একা থাকলেই শেষ দশ বছরের সুখ স্মৃতি তাকে খেতে আসত | কিন্তু রবিবার গুলো সে কি করবে – আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে তো আর বলা যায় না – “আমার এক ভালো লাগেনা – একটু সঙ্গ দেবে”! এই করতে করতেই মাস দশেক আগের সেই রবিবার আসে – যেদিন সরিৎ তার জীবনের সবচেয়ে ইনোভেটিভ আইডিয়ার জন্ম দেয়|

সে যা হোক এখন বর্তমান কথায় ফিরে আসি| সরিৎ খবরের কাগজটা খুলে বসল – সাথে ল্যাপটপ| খুব সংক্ষেপে কাগজের খবরের পাতাগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে চলে গেলো সাপ্তাহিক পাত্র পাত্রী কলামে | পাকা চোখে সে পর্যায়ক্রমে দুটি পাতার সব বিজ্ঞাপন পড়ল – কুলীন কায়স্থ থেকে সম্ভ্রান্ত মাহিষ্য , কনভেন্ট এডুকেটেড থেকে ঘরকন্না কাজে নিপুণা , স্বর্ণবর্ণ থেকে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, পশ্চিমবঙ্গীয় থেকে পূর্ববঙ্গীয় সবরকম পাত্রীর সাথে পরিচয় হয়ে গেলে সে এক এক করে সেই সব ঠিকানা , ফোন বা মোবাইল নম্বর এবং আর কিছু দরকারী খবর নোট করে নিল তার ল্যাপটপে | ব্যাপারটা শুনতে সোজা হলেও এতটা সোজা নয় – পঁয়ত্রিশ বছরের বিপত্নীক প্রাইভেট ফার্মের মধ্যপর্যায়ের অফিসারকে হালে পানি দিতে পারে এইরকম অন্তত দশটা ক্যান্ডিডেট পেতে গেলে অনেক বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে | তাছাড়া একটা সম-মানসিকতার প্রয়োজনও তো আছে |

তাই ঘণ্টা দেড়েক পর সরিৎ উঠে যখন চাল মেপে ভাত বসাতে গেল, তখন তার মেজাজ বেশ ফুরফুরে | গোটা চোদ্দ পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে – এর মধ্যে একজন নিশ্চয়ই তার দাম দেবে | একদিকে ভাত আরেকদিকে ডাল বসিয়ে সরিৎ ফিরে এলো তার বসার ঘরে |

এরপরের কাজটাই সব থেকে শক্ত – নিজের ঘটকালিটা নিজে করা একটু কঠিন বৈকি – বিশেষ করে সরিৎ এর মতন এক মুখচোরা মানুষের| কিন্তু একাকিত্ব তাকে এখন অনেকটাই বলিয়ে কইয়ে করে তুলেছে, অন্তত এই ব্যাপারে | না হলে সপ্তা তিনেক আগে রাখহরি মুখার্জী যখন সরিৎকে বলে – “তোমার কি ইয়ে যে আমি তোমাকে মেয়ে দেব !”, তখন সরিৎ ফোনের ওপর টানা পাঁচ মিনিটে নিজের সম্মন্ধে যা যা ভালো কথা বলেছিল, সেগুলো ডাহা মিথ্যে নয় কিন্তু ষোলো আনা সত্যিও তো নয় | কিন্তু বলার সময় সরিৎ এর গলা তো একফোঁটাও কাঁপেনি | হ্যাঁ তার মানে এই নয় যে সব সময় সফল হয়ে – তবে কাজ তো হচ্ছে, সেটা বড় কথা |

সরিৎ আজকের লিস্টটা দেখল ল্যাপটপে – ৭ জন পাত্রী চাকুরিরত , ১০জন তিরিশোর্ধ, ৫ জন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, ২জন ডিভোর্সই এবং একজন সন্তানহীন বিধবা |প্রথমে সে বাছল – “ পূ:ব: সুন্দরী কায়স্থ , সরকারি ব্যাংকে চাকুরিরতা, প্রা:স: কর্মীর একমাত্র কন্যা, ৩৪/৫”৩’ , বাম হস্তে সাদা দাগ | যোগ্য পাত্র কাম্য | মোবাইল – *********** |” ফোন নম্বর টিপে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে সরিৎ |

অপরপক্ষ – “হ্যালো, কাকে চান? ” বেশ ভারী কিন্তু মার্জিত কণ্ঠস্বর – হাজারহোক ৩৪ বছরের অবিবাহিত মেয়ের বাবা কিনা!সরিৎ ভাবনা গুছিয়ে বলে – “নমস্কার, আমার নাম সরিৎ সোম | হর্ষবাজার পত্রিকার পাত্র – পাত্রী কলামের বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করছি | “

অপরপক্ষ – “হ্যাঁ বলুন, পাত্রের সম্মন্ধে যা বলার বলুন |”

সরিৎ – “আজ্ঞে, আমি নিজে পাত্র | আমি একজন ——- ” সরিৎ তার নিজের তৈরি করা সংক্ষিপ্ত একটা পরিচয়ে দিল | এই পরিচয় অনেক সময় খরচ করে বানানো – এর মধ্যে কোনো এমন মিথ্যে নেই যা খোঁজ করলে ধরা যাবে | তার চাকরি, তার স্ত্রী-পুত্র বিয়োগ ইত্যাদি কোনো কথা গোপন না করে সরিৎ নিজের পরিচয় জ্ঞাপন করল|

অপরপক্ষ – “আমার নাম কুশল বসু | আপনার কথা শুনলাম, আপনার নম্বরটা সেভ করে নিচ্ছি – একটু বাড়িতে কথা বলি| কথা এগোনোর হলে আপনাকে ফোন করবো |”
সরিৎ এবার খুব উদার গলায় ঠিক আছে বলে ফোনটা নামিয়ে রাখল | সরিৎ যে খুব একটা চিন্তিত তা নয় – সে জানে এরকম বেশ কিছু “না”, “পরে জানাবো”, “ভেবে দেখবো” পার করে তার “হ্যাঁ” টা আসবে|

আধ ঘন্টা পরে যখন সরিৎ ভাত আর ডালের ব্যবস্থা করতে গেলো ততক্ষণে সে ৩ জায়গায় শুরুতে না, ২ জায়গায় পরে ভেবে জানাবো এবং ১টা শেষ পর্যায় না শুনে ফেলেছে | এই শেষ পর্যায় না টা একটু বোঝাতে হবে | যেখানে একটু কথাবার্তা আগে যায় সেখানে সরিৎ বলে – “আমি আপনাদের মেয়ের সাথে কোনো সম্মত জায়গায় আগে একটু কথা বলে নিতে চাই, পারস্পরিক চিন্তাভাবনা কিছুটা না মিললে তো বেশী কথা এগিয়ে লাভ নেই|” তো আজ একটা ফোনালাপই অতটা এগুলো – কিন্তু তাতে পাত্রীপক্ষ রাজি হয়েনি |

ভাত – ডাল এর ব্যবস্থা হয়ে যাওয়াতে , সরিৎ বাকি রান্না ফ্রীজ থেকে বার করে রেখে আবার কাজে লেগে পড়ল| চান যাওয়ার আগে বাকি আটটার চারটে সেরে ফেলতে হবে | লিস্টটাতে চোখ বুলিয়ে এবার বাছল – “Alliance invited for pretty widow 32/5”4’ MCom without issues, works at private bank,  seeks established professional from Kolkata”.

অপরপক্ষ – “হ্যালো”|

সরিৎ নিজের পরিচয় এবং ফোনের হেতু জানাল |

অপরপক্ষ – “আমি মিত্রার দাদা, প্রশান্ত মিত্র | মানে আমার বোনের ক্লাসিফাইড এডভার্টাইসমেন্ট আপনি দেখেছেন – বলুন|”

সরিৎ নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জ্ঞাপন করে পাত্রী সম্মন্ধে জানতে চাইল |

প্রশান্ত – “মিত্রা চাকরি করছে – সে আমাদের সাথে আমাদের পৈতৃক বাড়িতেই থাকে – আমাদের বাবা মা গত হয়েছেন – মিত্রার  এক্স-হাসব্যান্ড বছর দুই হল স্ট্রোক হয়ে মারা যায় – মিত্রা প্রথম দেড় বছর বিয়েতে কিছুতেই রাজি হয়নি – শেষমেশ আমাদের কথায় সে রাজি হয়ে – কিন্তু কথা এগোনোর আগে সে চায় পাত্রের সাথে আলাদা করে কথা বলে নিতে “|

সরিৎ শুনে ভাবল – যাক এবার আর আমাকে দেখা করার কথা বলতে হল না| সে বলল – “আমার আপনার বোনের সম্মন্ধে শুনে, তার লসের কথা শুনে খুব খারাপ লাগল | আপনারা সম্মত হলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে প্রস্তুত|”

প্রশান্ত – “আমি তাহলে আপনার নম্বর ওকে দিয়ে দেব, আপনারা কথা বলে নেবেন |”

সরিৎ – “আমার পরের শনিবার এর আগে দেখা করা হবে না, রোজ অফিস থেকে বেরুতে ৭টা হয়ে |”

প্রশান্ত – “কোনো অসুবিধে নেই – আমি মিত্রা কে জানিয়ে দেব |”

ফোনটা ছেড়ে সরিৎ হাঁপ ছাড়ল – আজকের সকালের কাজ মিটল | এদিকে ঘড়িতে প্রায় একটা বাজতে চলল দেখে সে দৌড় মারল বাথরুমের দিকে | রেডি হতে হবে যে – গত সপ্তাহের পাত্র চাই কলমের খোঁজ সুমিতা সরকার অপেক্ষা করবে যে লেকটাউন সিসিডি তে|

 

বিকেল চারটে – ভি.এই.পির থেকে অটোতে বসে সুমিতা সরকারের প্রোফাইলটা ভেবে নিল | ৩২ বছর বয়সী সরকারি স্কুল শিক্ষিকা, কালিন্দী দমদমে বাড়ি, বাবা-মার একমাত্র মেয়ে | গত রবিবার আজকে দেখা করার এপয়েন্টমেন্ট হওয়ার পর কাল রাত নটায় সুমিতা ফের একবার ফোন করে – নিজের সম্মন্ধে কিছু কথা বলতে|সরিৎকে সে ধন্যবাদ জানায় শুরুতে আলাদা দেখা করতে চাওয়ার জন্যে |সিসিডির সামনে নেবে অটোভাড়া মিটিয়ে সরিৎ পা বাড়াল |

ভেতরে ঢুকে চোখ বুলিয়ে দেখলো ৩টে টেবিলে লোকজন বসে – তারমধ্যে একটা টেবিল একলা এক মহিলা | সামান্য পৃথুলা, মাঝারি ফর্সা, গোল মুখ, কমলা আর সবুজের কম্বিনেশনে সালোয়ার কামিজ পরনে | সরিৎ এগিয়ে গেলো – “আপনি কি সুমিতা ?”

ফর্সা, গোল মুখ উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলো | “বসুন |”

সরিৎই কথা শুরু করল – “বেশিক্ষন অপেক্ষা করেন নিত?”

সুমিতা – “না, মিনিট পাঁচেক হল|”

সরিৎ মোটামোটি  সহজ গলায় বললো – “কি খাবেন বলুন, একটু গলাটা ভিজিয়ে নিলে মন্দ হত না |”

সুমিতা একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে – “আমি একটা আইস টি নেবো |”

সরিৎ কাউন্টারে গিয়ে নিজের আর সুমিতার অর্ডারটা দিয়ে এসে বলল – “কফিটা আমার ঠিক ভালো লাগে না |” এইগুলো সেরকম অসত্য যা কোনো ক্ষতি করে না , আর ধরা পরার ব্যাপারটা থাকে না |

সরিৎ এরপর নিজের জীবনের শেষের কয়েক বছরের কথা বলল – সুখের সংসার থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পরার কথা | এগুলো সরিৎ এর খুব যে বলতে ভালো লাগে তা না – কিন্তু নতুন মানুষের সাথে আলাপ পরবর্তী প্রশ্নের মধ্যে এটা বেশ কমন |

সুমিতা – “বাবা কিছুটা বলেছিলেন আপনার কথা, সত্যিই দুঃখের | থাক আর পুরানো কথায় গিয়ে কাজ নেই |”

সরিৎ একটা কাষ্ঠহাঁসির সাথে জবাব দিলো – “হ্যাঁ সামনে তাকানোই ভালো | আপনার স্কুলের কথা বলুন |”

এইভাবে সুমিতার স্কুল থেকে সরিতের ফার্ম – সুমিতার বাবা মা এবং এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি থেকে সরিতের আত্মীয়পরিজন – দুজনের পছন্দের হবি আর অপছন্দের মানুষ – দুজনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা – এইভাবে এক থেকে অন্য বিষয়ে জল গড়াতে থাকল পরের ঘন্টা দুই | এরইমধ্যে আইস টির পর চিলি চিজি টোস্ট ,দার্জিলিং টি টেবিল ঘুরে গেছে |

সরিৎ চায়ের কাপ শেষ চুমুকটা দিয়ে সামনে তাকাতেই সুমিতা জিগ্যেস করলো – “একটা কথা জানতে চাইলেন না তো ? ৩২ বছর বয়েসে এখনও অবিবাহিত কেন আমি ?”

সরিৎ মুখের একটা পেশীতেও কোনোরকম অস্বাভাবিকতা না রেখে বলল – “সেই কথার তো কোনো প্রয়োজন নেই এইখানে, যেই কারণেই হোক আপনি এখনো অবিবাহিত আর আমি বিপত্নীক | আর সেই কারণে আমাদের কথা এগোতে পারে আর তাই আমাদের আজ কথা বলতে আসা |”

তারপর হালকা মুখ টিপে এসে সরিৎ বলল – “তাছাড়া শুরুতে তো আপনি বলেই দিলেন পুরোনো কথায় কাজ নেই |”

দুজনে এবার কাফের ভদ্রতার পরিধি না ভেঙে যতটা প্রাণখোলা হাঁসি হাসা যায়, ততটা হাসল |

এরপর আরো ঘন্টাখানেক চললো আলাপচারিতা – আর সুমিতা অনেকটা বেশি খুলে বেড়ালো – শেষের দিকে তার যে সরিৎকে ভালো লেগেছে সেটা তার চোখে মুখে বেশ বোঝা গেলো |

ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়ে কিছুদূর যেতে সরিৎই ওঠার কথা বলে | বিল মিটিয়ে ওরা বাইরে আসলো যখন তখন ঠিক সাড়ে সাতটা | সরিৎ জিজ্ঞেস করল কি ভাবে যাবে সুমিতা?

সুমিতা – “এই যশোর রোডের থেকে তো রিকশা পেয়ে যাবো |” কথাটা বলে সরিৎ এর  দিকে তাকাতে সরিৎ ইঙ্গিতটা বুঝে বললো – “ঠিক আছে তাহলে যশোর রোড অব্দি হেঁটে যাওয়া যাক |”

বিশেষ হেতুতে তুমি এড়ানোর জন্যে ভাববাচ্যের প্রয়োগ শ্রেয় মনে করল সরিৎ |

একথা, ওকথার মধ্যে দিয়ে ওরা যশোর রোডে এসে পড়ল – সরিৎ সুমিতাকে একটা রিকশা ধরে দিল | সুমিতা হেসে বললো – “আশা করি আবার দেখা হবে |”

সুমিতার রিকশা ভিড়ে হারিয়ে যেতেই সরিৎ একটা ট্যাক্সি ধরল – আর এখন অটো ঠেঙিয়ে যেতে ইচ্ছে করল না | রবিবাসরীয় আড্ডা বা আলাপচারিতার পর সে একটু যেন ক্লান্ত হয়ে পরে |

ট্যাক্সি চলতে চলতে সরিৎ হিসাব করে দেখলো যে সুমিতা হলো ৩৭ নম্বর পাত্রী যার সাথে সে দেখা করলো | মোটামোটি একটা ছকে পরে গেছে – রবিবার সকালে পাত্রী শর্টলিস্ট করে ফোন করে ঠিক জনকে বাছা – পরের শনি / রবি বিকেলে তাদের সাথে সময় কাটানো – আবার রবিবার সকালে পরের সপ্তাহান্তের সঙ্গী বাছা |

ভাবনাতে ছেদ পড়ল জোড়া মন্দিরের কাছে ট্যাক্সিটা বাঁক নিতেই | মোবাইলে একটা মেসেজ ঢোকার ইঙ্গিত – চেক করে দেখে সুমিতা | “সময়টা ভালো কাটল – থ্যাংক ইউ – আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি |”

সরিৎ যেন আরো কিছুটা গুটিয়ে গেল, ভাবলো – “নাহ রাতেই ফোনটা করতে হবে |” আর ট্যাক্সিটা তখনি শোভনা এপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল |

 

রাত পৌনে দশটায় নিচের থেকে রুটিটা নিয়ে এসে ফোনটা করল সরিৎ | নিজের চেনা ঢঙে গলায় একটা মার্জিত ভাব এনে সুখেন সরকার কে সে বললো – “সুখেনবাবু আমার সুমিতার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে – ও খুব ভালো মেয়ে | তবে আমার মনে হলো যে আমাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কটা না হওয়া ভালো | মানে আর কিছু না , আমাদের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে এটা বুঝেছি যে এই সম্পর্ক আর না এগোলেই ভালো |”

পারস্পরিক ভাবে কতগুলো বিরোধী কথা বলে সরিৎ এবার সুখেনবাবুকে বলার সুযোগ দিল |

সুখেন – “সুমিতারও তোমার সাথে কথা বলে ভালোই লেগেছিলো | কিন্তু তুমি যখন চাইছ না – তখন এই ব্যাপারটা আর আগে না যাওয়াই ভালো | ধন্যবাদ |”

ফোনটা কেটে একটা দীর্ঘনিঃস্বাশ ছেড়ে সরিৎ সোফায় বসল – আরেকটা রবিবারের ইতি |

এতক্ষনে সরিৎ সোমের রবিবাসরীয় দিনলিপি থেকে আপনারা নিশ্চই বুঝেছেন ওর সেই মারাত্মক আইডিয়াটা কি | স্বজনহারা হয়ে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি ফার্মের কাজে আর দিনগুজরানে চলে গেলেও শনিবারের বিকেল থেকে তার মনে হত কখন আবার সোমবার আসবে | কিছুদিন কাজিন,বন্ধুদের বাড়ি গেছে সপ্তাহান্তে – কিন্তু তার কোথাও ভালো লাগত না | বন্ধুদের সবার একটা ফ্যামিলি লাইফ আছে – তাই কেউ না বললে বা সত্যি না ভাবলেও সরিৎ অস্বস্তিতে ভুগত |

তখনি একদিন রবিবারের পাত্র পাত্রী কলামে চোখ পড়তে তার মাথায় এই বুদ্ধিটা আসে | তার বন্ধু – আত্মীয় – শ্বশুরকুল সবাই তাকে আরেকবার বিয়ে করে জীবনে এগোতে বলেছে অনেকবার | কিন্তু তার সেই ইচ্ছে হয়নি , কিন্তু যখন ভাবল এই পাত্র চাই থেকে ঠিকঠাক পাত্রী খুঁজে তাদের সাথে একদিন করে যদি দেখা করা যায় – কথা বলা যায়, তাহলে?

সরিৎ নিজের কাছে পরিষ্কার, সে সম্পর্কে জড়াতে চায়ে না | তার কোনো ইচ্ছে নেই | আর সে এইভাবে কারুর ক্ষতি না করে , কোনো দুরভিসন্ধি না রেখে নিজের মতন করে একটু সময়কাটানোর উপায় পেয়েছে | সে জানে সবাই বুঝবে না – তাই সে কারোকে বলেনি | একাকিত্বের মধ্যেই সে এক আশ্চর্য্য উপায় বের করেছে একাকিত্ব থেকে কিছুক্ষনের মুক্তির |

 

সপ্তাহের শেষ দুটি দিন বাদ দিলে সোম থেকে শুক্র সরিৎ এর জন্যে থোড় বড়ি খাড়া – খাড়া বড়ি থোড় | সকালে রান্নার লোক রান্না করে দিলে, তৈরি  হয়ে অফিসের জন্যে বেরিয়ে পরা, তারপর সারাদিন ফার্মের কাজ করে যাওয়া | অফিসে এখন আর সরিৎ এতটা হুল্লোড়বাজ নয়, হ্যাঁ এমন নয় যে কারোর সাথে কোনো কথা বলেনা কিন্তু আগের সেই এনাৰ্জি যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না | কাজের শেষে বাড়ি ফিরতে রাত আটটা কি নটা, তারপর একটু গল্পের বই, একটু টিভি আর খাওয়াদাওয়া সহকারে দিনের শেষ | সুমিতার সাথে কাটানো রবিবারের পর পাঁচটা দিন এইভাবেই টুক টুক করে কেটে গেলো |

পরের শনিবার সকালে অফিস ঢোকার সময় মেসেজটা এলো |”সরিৎবাবু আমার দাদার সাথে আপনার কথা হয়েছিল | আমি আজ সন্ধ্যেবেলা দেখা করতে পারি | আমি উত্তর কলকাতার মেয়ে, তাই এইদিকে কোথাও দেখা করা গেলে ভালো হত | — মিত্রা”

মিত্রার নম্বরটা তার মোবাইলে ছিল না, তাই শেষে মিত্রার পরিচয়ে দেওয়া না থাকলে অসুবিধে হত বুঝতে| সরিৎ একটু ভেবে রিপ্লাই বাটন টিপল – “সন্ধ্যে ৭টায় গিরিশ পার্ক মেট্রোর সামনে – অসুবিধা হবে না তো |” মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অস্তর্থক জবাব এলো | সরিৎ দিনের দ্বিতীয় ভাগের প্লানটা ঠিক করে ফেলল |

ঠিক ৭টা বাজতে দশে সরিৎ যখন বেরোচ্ছে মেট্রো থেকে তখন সে চনমনে – শনিবার সন্ধ্যেটা বাড়িতে বসে ডালমুট চিবোতে হবে না এটা সত্যি বড় ব্যাপার | কিছুক্ষন দাঁড়ানোর পর সে দেখল দীর্ঘাঙ্গী, মাজা রঙের এক মহিলা পরনে মেরুন কাজ করা অফ হোয়াইট শাড়ি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে | সরিৎ অপেক্ষা না করে এগিয়ে বলল – “আপনি কি মিত্রা ?”

মিত্রা যেন একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল , ভুল লোকের দিকে তাকায়নি ভেবে আস্বস্ত |

সরিৎ – “চলুন, রাস্তা পার করে বিবেকানন্দ রোডের ওপর একটা রেস্টুরেন্ট আছে | ওখানে বসতে আপত্তি নেই তো |”

মিত্রা – “না, ঠিক আছে – চলুন |”

মিনিট খানেকের হাঁটা পথ মোটামোটি বাক্যহীন কাটল | বিবেকানন্দ রোড আর বিধান সরণি ক্রসিংয়ে এম্বেসী রেস্তোরাঁতে ওরা ঢুকে বসল যখন, তখন ঘড়িতে সোয়া সাতটা | বেয়ারা এসে জল দিয়ে , মেনু কার্ড ধরিয়ে অর্ডার নেওয়ার আগেই সরিৎ কিছু দরকারি খবর নিয়ে নিয়েছে – মিত্রার বাড়ি পাইকপাড়া ২নং বাসস্ট্যান্ডের কাছে, তার একটু রাত করে বাড়ি ফেরাতে সেরকম অসুবিধে নেই, সরিৎ তাকে ফেরার পথে ড্রপ করলে কোনো অসুবিধে নেই আবার না করলেও চিন্তার কিছু নেই, এখন থেকে ডাইরেক্ট বাস সে পেয়ে যাবে |

রেস্তোরাঁর আলোতে সরিৎ মিত্রার মুখশ্রীটা দেখেছে এরমধ্যে – অনাড়ম্বর সাজে লম্বাটে সুশ্রী মুখ | একটা হালকা আঁধার থাকলেও চোখদুটি বেশ ঝকঝকে |দুজনে ওয়ান বাই টু চিকেন হট এন্ড সওয়ার সূপ অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করলো|

মিত্রা – “আপনার স্ত্রী- সন্তানের আকসিডেন্টটা খুবই মর্মান্তিক | কত বয়স হয়েছিল ছেলের ?”

সরিৎ – “ছয়ে – ক্লাস ওয়ান|”

মিত্রা – “লাইফ ব্যাপারটা এতটাই আনসার্টেন যে কি বলবো – আমার সবকিছু শুধু একটা রাতে চেঞ্জ হয়ে গেল |”

দুজনের জীবনটা অনেকটা এক গতে বয়ে যাওয়াতে দুজনে দুজনের লসটা ভালো বুঝতে পারল | আস্তে আস্তে ওদের পুরানো জীবন ছেড়ে সামনের কথা হতে লাগলো | সরিৎ এর কাছে এই বিভিন্ন অলি গলি দিয়ে বয়ে চলা কথোপকথন চেনা অথচ অচেনা | চেনা কারণ গড়পড়তা বাঙালি বছর ত্রিশের মহিলার গল্প একটা ধাঁচে পরে যায় – কিন্তু সবার গল্পই একভাবে আলাদা আলাদা | মিত্রার সাথে কথা বলে একটা জিনিস সরিৎ এর ভালো লাগলো ওর স্পন্টেনিটিটা , মেয়েটার আড়ষ্ঠতা নেই বিশেষ |

ঘন্টা তিনেক বাদে কথা আর খাবার শেষ করে বেড়ানোর সময় আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতা হলো সরিৎ এর – মিত্রা কিছুতেই রাজি নয় যে সরিৎ বিল মেটাবে | হয়ে সে পুরোটা দেবে নয়তো অর্ধেক – অর্ধেক | শেষ পর্যন্ত সরিৎ রাজি হলো মিত্রাকে বিল মেটাতে দিতে কারণ অর্ধেক অর্ধেক ব্যাপারটা দৃশ্যকটু – কিন্তু তার সাথে সরিৎ এই প্রস্তাবে মিত্রাকে রাজি করল যে আগামীকাল লেকটাউন এর সিলভার চিমনিতে ডিনার খাওয়াবে সরিৎ |

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশের দিকে এগোচ্ছে দেখে সরিৎ একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিল | মিত্রাকে নামিয়ে সে চলে যাবে তার ঠিকানায় | মিত্রার বাড়ির সামনে ট্যাক্সি তা দাঁড়ালে, মিত্রা নেবে বলল – “কাল দেখা হচ্ছে তাহলে”| মিষ্টি হেসে ঘুড়ে চলে যেতে সরিৎ এর কেন জানি না মনে হলো মেয়েটা আলাদা | কিন্তু পর মুহূর্তে ভেবে নিল , কাল এই সময়ের মধ্যে তো সেই ফোনটা সে করেই দিয়েছে, “না” হয়েও গেছে – তাহলে আর ভেবে কি লাভ | সরিৎকে নিয়ে ট্যাক্সিটা রওনা দিল বাগুইআটির উদ্দেশে |

 

কথায় বলে মানুষের জীবনে সবই প্রথম একবার ঘটে – আর সেইটা যদি ভাবনার উল্টোদিকে হয়ে তাহলে ঘটনাটা অনেকটা সপাটে চড় খাওয়ার মতন হয়ে | পরের দিন রবিবার রাত দশটা দশে ঠিক সেরকম একটা চড় খেল সরিৎ|

তার আগে অব্দি তার রবিবার ছিল একদম ছকে ছক মেলানো | সকালে বাজার – খবরের কাগজের পাত্র/পাত্রী কলাম – কিছু ফোনের মাধ্যমে পরের সপ্তাহের সঙ্গী বাছা – সন্ধ্যে ছটা থেকে সাড়ে আটটা অব্দি মিত্রার সাথে আড্ডা | মিত্রাকে ওর বাকিদের থেকে ভালো লাগা একটা ব্যাপার ছিল কিন্তু তবুও শেষমেশ ফোনে না বলবে ভেবে বাড়ি ফিরল সরিৎ|

ঠিক দশটা দশে প্রশান্ত মিত্রর – মিত্রার দাদা – ফোন | একটু অবাক হয়েই ফোনটা ধরল | সৌজন্য বিনিময়ে করার পর প্রশান্ত বলল – “সরিৎবাবু মিত্রা তো আপনার সাথে দুদিন দেখা করল – শুনলাম আপনাদের কথাবার্তাও ভালোই হয়েছে – কিন্তু মিত্রা ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোতে চেয়ে না |”

ধাক্কা খেয়ে সরিৎ বলে উঠল – “না-এর কোনো কারণ বলেছেন কি মিত্রা ?” – বলে নিজেই অবাক হয়ে গেলো এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে |

প্রশান্ত সাবধানী গলায় বললো – “মিত্রা একটু চাপা ধরণের মেয়ে, বিশেষ খুলে কিছু বলল না – খালি বলল ওর মনে হয়েছে না এগোনোই ভালো |”

এবার নিজেকে সামলে নিল সরিৎ | হালকা গলায় বললো – “ঠিক আছে | ভালো থাকবেন ” – ফোনটা কেটে দিল |

একদিক দিয়ে দেখলে এতে সরিৎ এর অসুবিধের কিছুই নেই | সে “না” বলত, তার বদলে “না”টা বলেছে মিত্রা | কিন্তু সেই পুরুষ অহম সরিৎ কে ব্যাপারটা মানতে দিল না – তার সাথে ওর মনে একটা খটকা দেখা দিল ব্যাপারটা কি সত্যি যেরকম সে দেখল , কোনো কারণ নেই কিন্তু ষষ্ঠইন্দ্রিও যেন তার মনে একটা খুঁতখুঁতানি ঢুকিয়ে দিল |

সেইদিন রাতে কোনোরকমে ঘটনা পরম্পরা মন থেকে সরালেও, পরের দিন সকালটা সরিৎ শুরু করল সেই একটা অসোয়াস্তি দিয়ে | ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে, সরিৎ প্রায় বছরখানেক বাদে ছুটি নিলো | সে ফার্মে ফোন করে বিশেষ হেতুতে ছুটি নিল – আপাতত দিন দুয়েক, তারপর জানাবে | ফার্মের মুখার্জী সাহেব একটু অবাক হলেন সরিৎ এর ছুটি নেওয়াতে , কিন্তু যে মানুষটি শেষ এক বছর একটাও ছুটি নেয়নি তাকে তো কিছু বলার থাকে না |

ছুটি নিয়ে কি করবে সরিৎ ছকে ফেলল – মিত্রার একটু খোঁজ নিতে হবে | দুদিনে কথায় কথায় সে জানতে পেরেছে মিত্রা এক্সিস ব্যাংকে কাজ করে – পার্ক স্ট্রিটের থেকে মেট্রো ধরে শনিবার গিরিশ পার্ক আসে | সরিৎ এর ফার্মের সুমনের বৌ কাজ করে এক্সিস ব্যাংকে – পার্ক স্ট্রিট ব্রাঞ্চে | সরিৎ সুমনকে ফোনে ধরে ওর বৌ মৌমিতাকে বলল একটু জানতে ওদের ব্রাঞ্চে কেউ মিত্রা নামের আছে কিনা – এও বলল ওদের ব্রাঞ্চে না হলেও অন্য কোনো ব্রাঞ্চে কেউ আছে কিনা সেই খোঁজ নিতে|

তারপর সে ঠিক করল পাইকপাড়া যাওয়া যাক – তার এক দূরসম্পর্কের পিসি আগে থাকতো যদুবাবুর বাজারের দিকে| একবার ওই পাড়ায় কোনো পুরানো চেনা লোক থাকলে একটু দেখা যেতে পারে|

শুরুতে ব্যাপারটাতে একটা হেরে গিয়ে হার না মানা রকম থাকলেও যখন সরিৎ বাড়ির থেকে বের হল তখন অনেকটা কৌতূহল এবং রোমাঞ্চ দানা বেঁধেছে তার মনে |

 

পাইকপাড়া পৌঁছে সরিৎ তার পদ্মপিসির বাড়িতেই গেল আগে | কেউ থাকে না পিসি চলে যাওয়ার পর | তবে একতলায় এক ভাড়াটে থাকে যার সাথে সরিৎ এর আলাপ আছে | সাত-পাঁচ ভেবে তার কাছেই গেলো | ভদ্রলোক স্কুলে পড়ান – বেলা এগারোটার আগে বেড়োন না, তাই দেখা হয়ে গেলো | তো যতীন বাবুকে সরিৎ বলল – “ফার্মের একটা ছেলের বাড়ি থেকে এক পাইকপাড়ার বাসিন্দার খোঁজ নিতে বলেছে, মনে হয়ে বিয়েথার ব্যাপার |”

যতীনবাবু – “দেখো যদি আমাদের পাড়ার হতো হয়তো বলতে পারতাম, কিন্তু দু নম্বর বাসস্ট্যান্ড, মানে রানী রোডের দিকে ঠিক বলতে পারব না | এক কাজ করতে পারো আমার এক পুরানো ছাত্র আছে – আজকাল কেবল টিভির কাজ করে, ওর সাথে কথা বলতে পারো|”

এরপর যতীনবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে সরিৎ গেল কেবল টিভি অফিসে হোৎকার খোঁজে – ভাগ্য ভালো বেরোবার মুখে  হোৎকাকে পেয়ে গেল সরিৎ | এমনিতে পাত্তা দিত না, কিন্তু মাস্টারমশায় পাঠিয়েছে শুনে  হোৎকা একপায়ে রাজি সাহায্য করতে |

মিত্রার বাড়ির ঠিকানা জানা ছিল না – কিন্তু প্রশান্ত মিত্র আর মোটামোটি জায়গার আন্দাজ দিতে  হোৎকা ঝাঁপি খুললো – “স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে কাজ করে প্রশান্তদা – বোনের বিয়ে হয়েছিল – দু বছর হলো বিধবা – প্রশান্তদা সোর্স খাটিয়ে ঢুকিয়ে দিলো ব্যাংকে – বাড়িতে মা আছেন – আর প্রশান্তদার বৌ , মেয়ে – প্রশান্তদা ভালো লোক , সময় টাকা দিয়ে দেয় – মিত্রা চুপচাপ মেয়ে – ওর সম্মন্ধে বিশেষ জানা নেই – তবে কোনো লাফড়ার কথা শুনিনি স্যার |” – নামতা  শেষে  হোৎকা একটা বড় শ্বাস নিলো |

হোৎকাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ঘুড়তে যাবে – হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল সরিৎ এর | জিজ্ঞেস করল  হোৎকাকে – “ভাই প্রশান্ত বাবুর নম্বর আছে তোমার কাছে |”

হোৎকা হলুদ – খয়েরি দাঁত বের করে জানায় অবশ্যই আছে – বলে নম্বর মোবাইল দেখে জানিয়ে দেয় |

কেবল টিভি অফিস থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা নিশানা পেয়ে সরিৎএর মুখে প্রশস্তির হাঁসি | প্রথম দিন প্রশান্ত বলেছিল – বাবা মা গত হয়েছেন, কিন্তু হোঁৎকার খবর অনুযায়ী মা আছেন প্রশান্ত আর মিত্রার | এইটুকু থেকেই সরিৎ এর খটকা আর খটকা থাকে না – সত্যির মধ্যে হালকা মিথ্যে যা বলাতে ক্ষতি নেই, তার চেনা ছক | তাই সে নম্বরটা চাইল – সেখানেও গরমিল| এই নম্বর আর তার কাছে আসা প্রশান্তর ফোন নম্বর এক নয় | হতেই পারে দুটো নম্বর, কিন্তু সেটা বাজিয়ে দেখতে হবে |

হোঁৎকার থেকে পাওয়া নম্বরে ফোন করল সরিৎ | একটা অচেনা গলা – “হ্যালো |”

সরিৎ – “নমস্কার, আমি সরিৎ কথা বলছিলাম|”

প্রশান্ত মিত্র – “হ্যাঁ বলুন | কি ব্যাপারে, কোথা থেকে বলছেন?” – শুনে মনে হল না নামটা এর আগে শুনেছেন বা গলাটা আগে কানে এসেছে |

সরিৎ তৈরী জবাব দিলো – “স্যার, আমাদের ব্যাঙ্কের তরফ থেকে ….. |” প্রশান্ত মিত্র অভ্যেস মতন  দু একটা শব্দ ব্যবহার করে ফোনটা কেটে দিল |

সরিৎ এর নিস্তরঙ্গ জীবনে এ এক তাজা হাওয়া | এক মহিলার সাথে ম্যাচ-মেকিং হেতু দেখা, দুদিনের বেশ মসৃন আলাপচারিতার পর মহিলা তাকে না বলে, তারপর দেখা যায় মহিলার দাদা পরিচয়ে যে ফোন করে সে তার দাদা নয় এবং মহিলার দেওয়া তথ্য কিচ্ছু কিছু অসত্য |

বি.টি. রোডের ওপর একটা চায়ের দোকানে বসে একটা চা নিয়ে সরিৎ চুম্বকে পুরোটা ভেবে নিল| ভাবছিল পরের পদক্ষেপ কি হতে পারে | ঘড়িতে ১১.৩০. আর তখনি মোবাইল বেজে উঠল – সুমন এর স্ত্রী মৌমিতা | ফোনটা ধরতেই, মৌমিতা বলে উঠল – “সরিৎদা, তোমার মিত্রাকে পাওয়া গেছে | আমাদের ব্রাঞ্চে নয়, রবীন্দ্রসদনে একজন আছে | বছর দেড়েক হল ঢুকেছে – উইডো – লোন ডিপার্টমেন্টে কাজ করে | ফোন নম্বরটা পেয়েছি, আমি মেসেজ করে দিচ্ছি |”

সরিৎ থাঙ্কস বলে ফোনটা কেটে দিল | চা শেষ হবার আগেই মেসেজ চলে এল – এবার নম্বর মিলেছে মানে যেই মিত্রার সাথে তার কথা – দেখা – পরিচয় সেই মহিলা এক্সিস ব্যাঙ্ক রবীন্দ্রসদন ব্রাঞ্চে কাজ করে |

সরিৎ এর পরের পদক্ষেপ মাথায় এলো লাঞ্চ করতে করতে | কি করি, কি করি করতে করতে সিটি সেন্টারে চলে এসেছিলো – প্রায় এক বছর বাদে কোনো কারণ ছাড়া সে একটা ভালো রেস্তোঁরাতে একা একা খেতে ঢুকেছে | তবে সেটা আজ কাজে লেগে গেল – লাঞ্চের সময় এক পঁচিশ ছাব্বিশের ছেলে মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে ট্রু কলার অ্যাপ-এর কথা তুলতেই সরিৎ নড়েচড়ে বসল | এই অ্যাপ-এর কথা সে শুনেছে, যদিও ব্যবহার করেনি |

সঙ্গে সঙ্গে তার মোবাইল খুলে অ্যাপটা ডাউনলোড করে ফেলল – এবার যেই নম্বরটা পাত্র পাত্রী বিজ্ঞাপনে দিয়েছিল প্রশান্ত মিত্রর নামে সেটা দিয়ে খুঁজলো ট্রু কলারে | জয়দীপ ব্যাঙ্ক – লেখাটা পরেই সে লাফিয়ে উঠলো | খাওয়ার কথা ভুলে আবার ফোন করলো মৌমিতাকে |

মৌমিতা – “হ্যাঁ সরিৎদা  |”

সরিৎ – “মৌমিতা, সরি আবার জ্বালাচ্ছি |”

মৌমিতা – “আরে বলো না, কোনো চাপ নেই |”

সরিৎ – “জয়দীপ বলে কেউ আছে কিনা ওই রবীন্দ্রাসদন ব্রাঞ্চ বা অন্য কোনো ব্রাঞ্চে |”

মৌমিতা – “ঠিক আছে, দেখে বলছি | কিন্তু পরের দিন বাড়িতে এসে পুরো গল্পটা বলতে হবে কিন্তু, হি হি|”

সরিৎ আচ্ছা বলে ফোনটা ছাড়ল | বাকি খাবার শেষ করতে করতে হিসাবটা কষে নিল – যদি মৌমিতার দিক দিয়ে খবর আসে তো ভালো – নাহলে কালই মিত্রার মুখোমুখি হবে |

বিল মিটিয়ে আর মৌরি মুখে দিয়ে বেড়িয়ে এল সরিৎ |

 

মৌমিতার ফোনটা এল পরের দিন বেলা এগারোটার সময় | প্রথমেই সরি বলল দেরির জন্যে, তারপর বললো – “জয়দীপ নামের কাউকে পেলাম না সরিৎদা, না ওই ব্রাঞ্চে না অন্য কোনো এক্সিস ব্যাঙ্ক ব্রাঞ্চ |”

সরিৎ হালকা নিভে যাওয়া গলাতে বললো – “ঠিক আছে |” কাল রাতে একা ব্যালকনিতে বসে সরিৎ অনেক ভেবেছে | সে এইভাবে মিত্রাকে ধাওয়া করছে কেন – এটা কি শুধুই সত্যিটা জানার ইচ্ছে ? নাকি আরো কিছু আছে | পুরো ব্যাপারটার শেষ না দেখা অব্দি সরিৎ সেই শান্তিটা পাচ্ছে না যে, ঠান্ডা মাথায় ভাববে |

ফোনটা কেটে একটু ভাবল | রেডি হয়ে সরিৎ বেড়িয়ে পড়ল | নিজের ফার্মের নিচে পৌঁছাতে লাগল ঘন্টাখানেক | ফার্মে না ঢুকে সরিৎ ফোন করল সুমনকে – “ফোনটা নিয়ে একটু নিচে নামো তো |”

সুমনের ফোনটা নিয়ে সরিৎ জয়দীপকে ফোনটা করল | গলাটা একটু পাল্টে বলল – “জয়দীপবাবু ?”

জয়দীপ – “হ্যাঁ বলছি |”

সরিৎ নিজের প্ল্যান অনুযায়ী বলল – “আপনি আমাকে মাস চারেক আগে একবার ফোন করেছিলেন, ব্যাঙ্কের একটা অফার নিয়ে| “

জয়দীপ – “হতে পারে, কিন্তু আপনার নম্বর আমার কাছে নেই | বলুন কি ব্যাপারে কথা হয়েছিলো, এখন কি করতে পারি |”

সরিৎ – “পার্সোনাল লোন নিয়ে |”

জয়দীপ – “তাহলে স্যার আপনার কিছু ভুল হচ্ছে আমি ব্যাংকে আছি কিন্তু লোন ডিপার্টমেন্টে না |”

সরিৎ দেখল আর কিছু বলে লাভ নেই তাই আচ্ছা সরি বলে ফোনটা ছেড়ে দিল | সুমনকে আর কিছু না বলে ফোনটা ফেরত দিয়ে সরিৎ এগিয়ে গেল | আর কোনো রাস্তা নেই ভেবে সে রবীন্দ্রসদনে দিকে রওনা দিল |

সন্ধ্যে তখন ছটা, ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেছে এলগিন রোডে এক্সিস ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে | তখনই মিত্রাকে দেখতে পেল সরিৎ | আজ একটা সাদা – সবুজ শাড়ি , একই রকম প্রসাধন – আড়ম্বরহীন সাজ | মিত্রা একা মেট্রোর রাস্তা ধরতে সরিৎ ওর পাশে চলে আসে | বলে – “আধ ঘন্টা সময় হবে?”

মিত্রা একটু চমকে ওঠে, তাকিয়ে চিনতে পেরে সামলে নেয়| বলে – “ও আপনি |” সাথে সেই চেনা মিষ্টি হাঁসি |

সরিৎ – “আধ ঘন্টা সময় হলে একটু বসা যায়? দুটো কথা বলার ছিল| কথা দিচ্ছি আর বিরক্ত করব না|”

মিত্রা – “এমা, বিরক্ত কেন করবেন | চলুন, কোথায় বসবেন |”

সরিৎ – “২৪ চৌরাঙ্ঘি রোড বসা যাক|”

দুজনে পা চালিয়ে পৌঁছে গেলো কিছুক্ষনে| দুটো মোমো অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করলো সরিৎ| কোনো ভনিতা না করে বলল – “জয়দীপের নম্বরে এডভার্টাইসমেন্ট দেওয়ার কারণ কি ?”

মিত্রা সেই মিষ্টি হেঁসে – “ও তাহলে জয় আমাকে ঠিকই বলেছে – আপনিই ওকে ফোন করেছিলেন !”

সরিৎ মরিয়া ব্যাপারটা জানতে – “হ্যাঁ আমিই |”

মিত্রা – “দেখুন আমি বুঝতে পারছি আপনি খুব ডিস্টার্বড হয়ে আছেন | আমি পুরোটা বলছি – কিন্তু আগে বোলেনি আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, না কোনোরকম ঠকবাজি করেছি |”

মিত্রা – “অমিতাভ চলে যাওয়ার পর দাদা, মা, বৌদি সবার সঙ্গে থাকলেও খুব একা লাগত |মনে হতো কিভাবে কাজের বাইরের সময়টা কাটবে| বন্ধু স্বজন কারুর সাথেই ভালো লাগত না | তখনই পাত্র পাত্রী কলাম থেকে আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে | ভাবি কিছু সম্ভাব্য পাত্রের সাথে সময় কাটালে কেমন হয়ে – খারাপ কিছু না, শুধু বসে গল্প করা – কিছু মানুষকে চেনা – কিছু অভিজ্ঞতা – কিছুটা সময় কেটে যাওয়া | এই ভাবেই শুরু | প্রথমে নিজে ফোন করতাম – কিন্তু দেখলাম পাত্রী নিজে ফোন করছে এইটা লোকের ভালো লাগছে না | তাই তখন আমার খুব ভালো বন্ধু – স্কুলের বন্ধু – জয়ের হেল্প নিলাম | ও আমার দাদা সেজে ফোন করত | দেখা সাক্ষাতের পরে ওই ফোন করে না বলে দিত| কিছুদিন আগে জয়ের বুধ্ধিতেই ভাবলাম আমি একটা অ্যাড দিয়ে দেখি|”

মিত্রা পুরোটা বলে দম নিল, দিয়ে একটু জল গলায় দিয়ে সরিৎ এর দিকে তাকালো ধরা পড়া যাওয়া দৃষ্টিতে – “আপনিও সেইভাবেই আমাদের নাম্বার পান আর তারপর যা হয়েছে তো বুঝতেই পারছেন |”

সরিৎএর সামলাতে একটু সময় লাগলো | ও শুনেছিলো দুটো মানুষ একই রকম ধারায় চিন্তা করেছে পৃথিবীর দুই প্রান্তে – এরকম অনেকবার ঘটেছে | সেই দিক দিয়ে ভাবলে এখানে বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই | কিন্তু তবু নিজের জীবনের লুকিয়ে রাখা , অত্যন্ত সযত্নে লালিত এক চিন্তাধারা যা সরিৎ ভেবে এসেছে একান্ত তার, আজ যখন অন্য একজনের কাছ থেকে সেই উপলব্ধি শোনে তখন একটা ধাক্কা তো লাগবেই |

তারপর যে সিক্রেট এতদিন তার একার ছিল সে এবার মিত্রার কাছে মেলে ধরল |

দুজনে দুজনেরটা শোনার পর কিছুক্ষন চুপ করে রইল | মিত্রাই আগে হেঁসে উঠলো, আর তারপরে সরিৎ ও | আজ আর ওদের আশপাশের কারুর কথা মনে হল না | কিছুক্ষন পরে দুজনেই যখন অনেক হালকা হল তখন আবার সেই কথোপকথন শুরু হল যা কাল রাতের ফোনে কেটে গেছিল | কখন রাত দশটা হয়ে গেছে কেউ বুঝল না |

বাইরে এসে সরিৎ বলল – “তাহলে এবার থেকে মাঝে মাঝে দেখা হতেই পারে – আর তো কারুর কিছু লোকানোর রইল না |”

মিত্রা সেই মিষ্টি হাঁসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো |

সরিৎ একটা ট্যাক্সি ডেকে বললো – “চলো তোমায় নামিয়ে দিয়ে যাবো |” আজ আর ভাববাচ্যের সাহায্য লাগলো না | এক নৌকায় বসা দুজনের অনুরণন আজ একদম পারফেক্ট – তাই অস্পষ্টতা, অস্বচ্ছতা, দ্বিধা পেরিয়ে আজ যেন এক নতুন আলাপ |

 

পুনশ্চ

মাসছয়েক পরের কথা | ৪ নম্বর রানী রোডের সামনে ট্যাক্সিটা থামলে, সরিৎ তার থেকে নামল | মিত্রাকে প্রথমবার ট্যাক্সি করে নামানোর ঠিক ৬মাস ৭দিনের পর আজ সরিৎ এসেছে প্রথমবার প্রশান্ত মিত্র আর তাদের মা এর সাথে দেখা করতে | একটা চাপা টেনশন ছিল আর ঠিক তখনই গেট বন্ধ করে হোঁৎকার আবির্ভাব | এক মুহূর্ত লাগলো সরিৎকে চিনতে – “হে হে স্যার আপনি নিজেই | হে হে , ভালো ভালো |” – সেই হলুদ – খয়েরি ছোপ দাঁত দেখিয়ে হোঁৎকা বিদায় নিল |

তবে তার কথাটা ঠিক — ভালো, সবটাই আজ ভালো |

বিরূপাক্ষ কথা (প্রথম পর্ব)

বিরূপাক্ষ কথা  #১

দু বছর ধরে বন্ধ থাকার পর আজ সকালে যখন বিরূপাক্ষ বাবুর নাকটা ফট করে খুলে গেল, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে দেশের হাওয়ার গন্ধ পাল্টে গেছে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #২

কিছুতেই সেই ছবিটাতে নিজেকে ফিট করতে পারছিলেন না বিরূপাক্ষ বাবু। একটা পারফেক্ট ফ্যামিলি ফটো, যেখানে তিনি অত্যন্ত বেমানান। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে উঠলেন…”না রে, এবারও পারলাম না”। শেষ ট্রেন আর এক ঘন্টা পরে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৩

যেদিন বিরূপাক্ষ বাবুর বাবার সাধের কালো ফিয়াট গাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়, তখন ওনার বয়েস ১৪ কি ১৫ হবে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর গ্যারাজে গিয়ে গাড়িটার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে কেঁদেছিলেন। আরেকবার কেঁদেছিলেন, ছাদে, যেদিন বড়পিসির লাগানো আমগাছ গুলো কেটে ফেলার কথা হয়েছিল। ভরা দুপুরে ছাদে দাঁড়িয়ে আমগাছগুলোর ডালে, পাতায়, হাত বুলিয়েছিলেন। বিরূপাক্ষ বাবুর আর কান্না পায়না। আয়নাতে নিজেকে দেখে, একটা সিগারেট ধরিয়ে হেঁসে বলে ওঠেন, “It goes on”.

 

বিরূপাক্ষ কথা #৪

রোজকার মতো অফিসে বেরিয়েও, হঠাৎ কি মনে হওয়াতে উল্টো পথে হাওড়া স্টেশন গিয়ে বেনারসের ট্রেনে চেপে বসলেন বিরূপাক্ষ বাবু।উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ সাহেবের বাড়ির সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। ছোটবেলা মামাবাবুর সাথে এসে সানাই শুনেছিলেন ওনার বসার ঘরের ফরাসে বসে। এখানে আর কেউ সানাই বাজায় না। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন মনিকর্ণিকা ঘাট। কান্নার শব্দ এখানে সানাইয়ের সুরে বাজে। পকেট হাতড়ে একটা সিগারেট পেলেন। ধরিয়ে, একটা লম্বা টান দিয়ে নিজের মনেই বলে উঠলেন “মন ভালো নেই”।

 

বিরূপাক্ষ কথা  #৫

একদিন সময় মত ভালোবাসার কথা বলে উঠতে না পারার আফশোস ওনার আজও যায়নি। সেদিন পিস হ্যাভেন এর সামনে কাঁচের গাড়িতে খুব চেনা মুখটা দেখে বুকের ভেতর একটা ব্যাথা অনুভব করলেন বিরূপাক্ষ বাবু। বাড়ি ফিরে বইয়ের তাক থেকে গালিবনামাটা নামিয়ে, প্রথম পাতায় মুক্তোর মতো হাতের লেখাতে নিজের নামটার ওপর আলতো আঙুল ছোঁয়ালেন। পাতা উল্টে প্রিয় নজমটি পড়লেন আরো একবার। “হাজারো খোয়াইশে এইসি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে”।

 

(চলবে)

বোধন

Bodhan

বড় মাঠের মাঝে প্যান্ডেল করে পুজো। সারা গ্রামের এই একটাই দুর্গাপুজো। ঈশ্বরের কৃপায় চাষবাস ভালোই হয় এই গ্রামে। পরিকাঠামোগত কিছু সমস্যা ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা বা দারিদ্রের প্রকোপ নেই চণ্ডীপুরে। অতএব বেশ জাঁকজমক করেই পুজোটা হয়। বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুঁড়ি ওড়ানোর হৈ চৈ এর পর গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা মেতে ওঠে দুর্গাপুজো নিয়ে। এই সময়টা খেলাধুলোও প্রায় বন্ধ। স্কুল থেকে ফিরেই সব গিয়ে জড় হয় পুজোর মাঠে। হ্যাঁ, এই মাঠেই সব পুজো হয় বলে মাঠটার নামই হয়ে গেছে পুজোর মাঠ। প্রতিমা শহর থেকে আনানো হয়না। মাঠেরই একধারে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে ছোট প্যান্ডেল করে সেখানেই ঠাকুর গড়েন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা।

আর এইখানেই কচি কাচাদের যত আকর্ষণ। অবাক বিস্ময়ে ওরা দেখে কাকু, জেঠুরা বাঁশের কাঠামোয় খড় বেঁধে তাতে মাটির প্রলেপ লাগিয়ে কিভাবে তিলতিল করে প্রতিমা গড়ে তুলছে। দেখতে দেখতে খুব লোভ হয় কাজে হাত লাগানোর। চেয়ে চিনতে অনেক বায়না করে কখনো বা একটু সুযোগ মেলে গণেশের ভুঁড়িতে গোলাপি রঙের কয়েক টান মারার অথবা কার্তিকের ময়ূরের গলায় নীল বা সিংহের গায়ে হলুদ রঙের ছোঁয়া দেওয়ার। তবে সবচেয়ে বেশি মজা শেষের দিকে, প্রতিমা গড়ার কাজ শেষ করে তখন সাজসজ্জার পালা। শোলা, জড়ি, চুমকি এসবে ছোটদের লোভ তো চিরন্তন। আর ভাগ্যক্রমে যদি একটু জড়ি বা চুমকি মাটি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া যায় তাহলে তো আর কথাই নেই।

গ্রামের বাকি ছেলেমেয়েদের মত অপু-দুর্গা ও স্কুলের পরে সটান হাজির হয় মাঠে। নাম আর দুই ভাই বোনের সম্পর্ক ছাড়া আর বিশেষ কিছু মিল নেই ওদের পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার সাথে। অভাব অনটনের জ্বালা নেই ওদের। অবশ্য বিভূতিভূষণের সেই গ্রাম ও নেই আর। ওদের বাবা কেন্দ্র সরকারের বেতনভোগী, মা গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের দিদিমণি। হ্যাঁ, পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার সঙ্গে মিল আছে বটে আরেকটা জায়গায়। হরিহরের মত ওদের বাবাও ওদের সঙ্গে থাকতে পারে না। ওদের বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করে। সুতরাং সারাবছরে কেবল একটি মাস ই বাড়িতে থাকতে পারে। বাকি সারাবছরই জলে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, পর্বতে পড়ে থাকতে হয়।

বাবাকে নিয়ে খুব গর্ব দুর্গার। ওর বাবার মত কিছু মানুষ নিজেদের সুখ, স্বাচ্ছন্দ, পরিবার সব ত্যাগ করে দেশের সেবা করে বলেই তো বাকি দেশশুদ্ধু লোক নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। যুদ্ধই হোক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে অন্যের প্রাণ বাঁচানোর মত কলজের জোর কজনের থাকে? শুধু দুর্গা নয়, ওর বাবাকে নিয়ে গ্রামের সকলের গর্ব। এই গ্রাম থেকে প্রথম কেউ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। চিরকালই খুব ডাকাবুকো অথচ সহজ, সরল, পরোপকারী ছেলে। কারগিলের যুদ্ধে বীরত্বের জন্য মেডেল পাওয়ার পর যখন ছুটিতে বাড়ি এসেছিল, ট্রেন থেকে নেমে আর কেউ হাঁটতে দেয় নি ওকে। বাড়ি অবধি কাঁধে করে নিয়ে গেছিল।

সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও উত্তেজনার ঠেলায় কদিন ধরে ইন্দ্রজিতের ঘুম আসছে না। কতবছর পর পুজোয় বাড়ি যাবে। শেষ কবে পুজোয় বাড়ি গেছে মনেও পড়ে না। বাড়িতে বলে রেখেছে একদিন সকলে মিলে কলকাতায় গিয়ে পুজোর কেনাকাটা করবে। দুর্গা বলেছে ওর ‘আনারকলি সালওয়ার’ চাই। ইন্দ্রজিৎ অতশত বোঝে না। জিজ্ঞেস করেছিল “সেটা আবার কি রে?” মেয়ে বলেছিল ” তোমায় অত বুঝতে হবে না বাবা, ও আমি ঠিক দেখে কিনে নেব।” মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে ঠোঁটের কোনায় হাঁসি খেলে গেল। সত্যি মেয়েটা কত বড় হয়ে গেল, এই সেদিন জন্মাল। অপুর জামা কাপড়ে কোনো লোভ নেই। শুধু বলেছে “বাবা আমি মেট্রো চড়ব আর বিরিয়ানি খাব।” পরমার তো নিজস্ব কোনো চাহিদাই নেই। যা কিনে দেবে তাতেই খুশি। পরমার কাছে ইন্দ্রজিৎ ঋণী। বছরের পর বছর একা হাতে সবকিছু সামলে যাচ্ছে পরমা। হাঁসিমুখে।

রাতের নিস্তব্ধতা চিড়ে গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠল পাহাড়ি উপত্যকা। রিফ্লেক্সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ইন্দ্রজিৎ। সতীর্থরাও সবাই। এ তো সীমান্তের লড়াই নয়, আওয়াজ তাঁবুর ঠিক বাইরে থেকেই আসছে। ছুটে বাইরে বেরোতে যাবে এমন সময় কান ফাটানো শব্দে ধেয়ে এল এক বিশালাকার আগুনের গোলা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন্ত জ্বলে গেল আঠারোটা তাজা প্রাণ। শেষমুহূর্তের আর্ত চিৎকার, করুণ প্রার্থনা সব চাপা পড়ে গেল গোলাগুলির পৈশাচিক শব্দে। ভোরের আলো যতক্ষণে ফুটল, ততক্ষণে সব শেষ। সেনা ছাউনিতে তখন শুধু মৃত্যুর হাহাকার। বারুদের কালো ধোঁয়া, পোড়া মাংসের গন্ধ আর বিকৃত শরীরের স্তুপ। অকালে চলে গেল কতগুলো জীবন, চুরমার হয়ে গেল কত স্বপ্ন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কতগুলো পরিবার। সন্ত্রাসের কারবারিরা সফল। এই তো চেয়েছিল তারা।

আজ ষষ্ঠী, দেবীর বোধন। সকাল থেকেই ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে আশে পাশের গ্রামে। হৈ চৈ, উত্তেজনা। চণ্ডীপুরে তখন শ্মশানের স্তব্ধতা। বেলা গড়াতে চলল, এখনো সঙ্কল্পও হয়নি। পরিত্যক্ত প্যান্ডেলে স্বপরিবারে দাঁড়িয়ে আছেন মা দুর্গা। এবছর আর পুজো হবে না। সকলের ক্ষোভ আর অভিমান আছড়ে পড়েছে মা দুর্গার ওপর। মা, তুমি এমনটা করতে পারলে? এত নিষ্ঠুর তুমি? আজ বাড়ি ফেরার কথা ছিল ইন্দ্রজিতের। ফিরেছে। কফিনে বন্দী হয়ে, জাতীয় পতাকায় মুড়ে। খবরটা এসেছিল দুদিন আগেই।

স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল পরমা। অপু দুর্গা ইতিমধ্যেই চলে গেছে। মোবাইলটা বাজছিল। কপালে সিঁদুরের টিপ টা পড়তে পড়তে ব্যস্ত হাতে ফোনটা ধরল পরমা। সরাসরি ইস্টার্ন কমান্ড থেকে ফোন। কাশ্মীরে জঙ্গি হামলায় শহিদ হয়েছেন ওর স্বামী। সিঁথিতে আর দেওয়া হল না সিঁদুর। শহীদের বাড়ির লোকেদের কাঁদতে নেই, তাতে শহিদের অসম্মান। শান্ত গলাতেই একে একে সকলকে জানালো দুঃসংবাদটা। বুকে জড়িয়ে ধরল বৃদ্ধা শাশুড়িকে। ওর তো কাঁদলে চলবে না। এই পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্ব এখন থেকে ওর একার।

‘গার্ড অফ অনার’ সহ পূর্ন সামরিক মর্যাদায় ইন্দ্রজিতের শেষকৃত্য সম্পন্ন হল ওদেরই  গ্রামের শ্মশানে। মৃত স্বামীর বিকৃত শরীরটাকে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারেনি পরমা। ছেলে মেয়েদের দেখতে দেয়নি। গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা জড় হয়েছেন শ্মশানঘাটে। পরমার বুকফাটা কান্নায় সকলের চোখের জল বাঁধ ভেঙেছে। ছোট ভাইয়ের হাত ধরে দুর্গা এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মাঝে মাঝেই ডুকরে কেঁদে উঠছে অপু। চিতার আগুন তখন প্রায় নিভে এসেছে। দুর্গা এসে দাঁড়াল গ্রামের বৃদ্ধ পুরোহিতের সামনে “দাদু, তুমি পুজোর আয়োজন করো। আজ তো মায়ের বোধন। অশুভ শক্তির কাছে কি মা কখনো হেরে যেতে পারে? ওরা আমাদের একজনকে মারলে আমরা পাল্টে আরো দশজন গিয়ে সামনে দাঁড়াব। কতজনকে মারবে ওরা? আমিও বড় হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেব। আর আমার ভাই ও।” রামদাস পুরোহিত মুখ তুলে এক অন্য দুর্গাকে দেখলেন। এ কোনো ক্লাস নাইনে পড়া মেয়ে নয়, সাক্ষাৎ দানবদলনী মা দুর্গা। ধুতির খুঁটে চোখ মুছে উঠে পড়লেন বৃদ্ধ “যাই পুজোর আয়োজন করি, আজ দেবীর বোধনই বটে”…

 

বীরভোগ্যা বসুন্ধরা

মহারাজ বীরভদ্র নির্ধারিত দিনে শিকারের জন্য যাত্রা করলেন। অনবদ্য শিকারি হিসাবে তিনি সর্বজন বিদিত। কিছুকাল আগেও তিনি শিকারে গিয়েছিলেন। তা ছিল নেহাতই নিজের দক্ষতাকে শাণিত করার প্রয়োজনে। কিন্তু এবারে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আর প্রজাদের মঙ্গলসাধনের সৎ ইচ্ছায় তিনি তার রাজধানী ‘বসুন্ধরা’ পুরনগরীকে যথাসম্ভব আধুনিক করে তুলেছেন। তার মানসনগরী বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি যেমন তার প্রজাদের কাছ থেকে সম্ভ্রম ও আনুগত্য আদায় করেছেন, তেমনই ভিনদেশী রাজন্যবর্গের ঈর্ষাও তাকে আমোদিত করেছে। রাজধানী ব্যতীত রাজ্যব্যাপী তার নগরায়নের পরিকল্পনাও কারও অজানা নয়। এ হেন রাজ্যে খোদ রাজধানীতে অযাচিত এক উপদ্রবের সূত্রপাত হয়েছে, যাতে মহারাজ বীরভদ্রের গর্ব আহত।

বসুন্ধরা নগরীর একধারে রয়েছে রাজ্যেরই অন্তর্গত এক নিবিড় অরণ্য। যে অরণ্যকে আংশিক ভাবে বাসভূমিতে পরিবর্তন করেছিলেন মহারাজ বীরভদ্রের পূর্বপুরুষগণ। বংশানুক্রমিক ভাবে সেই বাসভূমিই বিবর্তিত আর পরিবর্ধিত হয়েই আজকের মহারাজ বীরভদ্রের রাজ্য এবং তার অন্তর্গত বসুন্ধরা নগরী। এই সেই অরণ্য, কৈশোরে যেখানে তিনি হরিণ, খরগোশ ইত্যাদি শিকার করা শিখেছেন। যৌবনকালে যেখানে তিনি বহু সংখ্যক বন্য-মহিষ এবং কিছু সংখ্যক বাঘ সংহার করেছেন। শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্য আজ মহারাজের উদ্যোগে আপাতভাবে নিরাপদ। এই অরণ্য তার রাজ্যকে জন্ম দিয়েছে। অরণ্যের অশির্বাদধন্য রাজধানী বসুন্ধরা পেয়েছে তার বাসভূমি, ভবন নির্মাণের ও ব্যবহারের প্রয়োজনীয় কাঠ আর খাদ্য। রাজা বীরভদ্র পেয়েছেন তার বীরত্বের গর্ব আর শ্রেষ্ঠ রাজার সম্মান।

কিছুদিন যাবত মহারাজ তার প্রজাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাচ্ছেন যে অরণ্য নিকটবর্তী অঞ্চলে গৃহপালিত পশুদের রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হচ্ছে। মৃত প্রাণীদের দেহাবশেষ এবং অন্যান্য উপস্থিত চিহ্ন দেখে প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিক্ষেত্রেই হত্যা করার পর মৃতদেহটিকে অরণ্যের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হত্যাকার্য দেখে অনুমান, এর মূলে কোনও শ্বাপদের ভূমিকা রয়েছে। মহারাজ এই সংবাদে যারপরনাই বিচলিত হয়েছেন। প্রজাদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা তার রাজধর্ম। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রজা শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও তাদের সম্পত্তি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে তারাও যে এই হিংস্র জানোয়ারের শিকার হবেনা তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। কোনও কারণে মহারাজ বীরভদ্র মনে মনে ধারণা পোষণ করছেন যে এই ঘটনা তার বীরত্বকে উপহাস করছে। তিনি খুশী হয়েই এই গুরুদায়িত্ব নিজের হাতে নিলেন।

যথেষ্ট লোক-লস্কর সহ গজাসনে উপবিষ্ট হয়ে তিনি অরণ্যের নিবিড় অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে লাগলেন। সেই পথেই অগ্রসর হলেন যেই পথে সেই হিংস্র শ্বাপদটি তার উপস্থিতির চিহ্ন রেখে গিয়েছিল। এই অরণ্যের সাথে তিনি দীর্ঘদিন পরিচিত। এখন তার সজল-শ্যামল রূপটি যেন আর খুঁজে পান না। মনে হয় যেন এক জনবসতিহীন নগর। দীর্ঘ যে বনস্পতিদের দিকে তিনি একসময় মাথা উঁচু করে বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেন, তারা আজ অনুপস্থিত। তিনি জানেন তারা আজ তার নগরে ভিন্নরূপে বিদ্যমান। দিবসব্যাপী অনুসন্ধান শেষে দুই-একটি হরিণ ও কিছু খরগোশ ভিন্ন তেমন কোনও প্রাণী তাদের নজরে এলনা। একটু বিচলিত হলেন তিনি। পরক্ষণেই তার অধরে এক স্মিত গর্বিত হাসির রেখা দেখা দিল। অধিকাংশ পশুদের মৃতদেহ আজ রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন মহলের শোভাবর্ধন করছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে আজ রাত্রে তিনি ফাঁদ পেতে ওই শ্বাপদকে ধরবেন।

গভীর রাত। বৃক্ষরাজির পত্র-গুচ্ছের আড়াল থেকে চাঁদের আলো এসে অরণ্যের অভ্যন্তরে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একটি ছাগশিশু একটি গাছের সাথে বাঁধা। গাছটি সেই শ্বাপদের ব্যবহৃত পথের ধারেই। মহারাজ তার লোক-লস্কর নিয়ে প্রস্তুত। প্রহর ধীর গতিতে অতিক্রান্ত হচ্ছে। বেশকিছু সময় পরে ছাগশিশুটির প্রাণান্তকর চিৎকার শুনে তিনি সতর্ক হলেন। ক্রমশ উপলব্ধি করলেন এক আগন্তুকের আবির্ভাব। ছাগশিশুটির চিৎকার তখন চরমে। অভিজ্ঞ শিকারি বীরভদ্র বুঝলেন আর মাত্র কয়েক মূহুর্তের অপেক্ষা। কিন্তু মূহুর্ত তখন প্রলম্বিত, অপেক্ষার শেষ নেই। হঠাৎই মূহুর্তের জন্য লক্ষ্য করলেন ছাগশিশুটি অন্ধকারের আড়ালে, আর আড়াল সরে গেলে শুধু বাঁধনের ছিন্ন অংশটুকু গাছের সঙ্গে আটকানো। তারপর শুধু এক বিলীয়মান মর্মান্তিক আর্তনাদ। এক মূহুর্ত বিলম্ব না করে তিনি সেই শব্দের দিকে ধাবিত হলেন। বেশকিছুদূর অতিক্রান্ত হলে খুব সতর্কভাবে অনুসন্ধান করতে অবশেষে তার নজরে এলো দুটি অগ্নিগোলক অন্ধকারে থমকে আছে। মহারাজের অনুসারীরা তৎক্ষণাৎ এসে পড়ায় তাদের মশালের আলোয় তিনি দেখতে পেলেন, একটি চিতাবাঘ হিংস্র দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর পাশেই বাঘটির শাবকেরা ছাগশিশুটির দেহটি ভক্ষণ করছে। ক্ষণিকের জন্য মহারাজ ভাবলেন, তবে কি খাদ্যাভাবের কারণেই বাঘটির জনবসতিতে আগমন? বাঘটি আক্রমণোদ্যত। আর কাল বিলম্ব করার অবকাশ নেই। মহাশিকারি মহারাজ বীরভদ্রর হাতের বর্শা অভ্রান্ত নিশানায় চিতাবাঘটির হৃদয় বিদীর্ণ করে দিল। মুক্তি মিলল এক পাশবিকতার কবল থেকে, এক হিংস্রতার কবল থেকে। সকলের উল্লাস ধ্বনিতে জেগে উঠল রাতের অরণ্য। ঊষাকাল আগতপ্রায়। মহারাজের মুকুটে শোভিত হল আরও একটি উজ্জ্বল পালক। মহারাজ বাঘের শাবকগুলিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে চাইলেন। এতদিন তার রাজপ্রাসাদে শুধু মৃত বাঘেরাই শোভা বর্ধন করত। এবার জীবন্ত বাঘ তিনি পালন করবেন। তার গর্ব আর সন্তুষ্টি আরও এক নতুন মাত্রা স্পর্শ করল।

পরদিন রাজদরবারে মহারাজ বীরভদ্র প্রজাদের কাছথেকে ভূয়সী প্রশংসা গ্রহণ করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, যে অরণ্যের আর মানুষকে কিছু দেওয়ার নেই, তাকে সংরক্ষণ করার অর্থ মানুষের সুরক্ষাকে অনিশ্চিত করা আর প্রজাদের বিপদকে সংরক্ষণ করা। তাছাড়া অব্যবহৃত মানে অপচয়ও বটে। তাই তিনি ওই অবশিষ্ট অরণ্যকে নগরে পরিবর্তিত করতে চান। প্রজাগণ এই ঘোষণায় উৎফুল্ল হয়ে মহারাজের জয়গান করতে করতে ফিরে গেল।

পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত। একদল ঘোড়সওয়ার যাযাবর ব্যবসায়ী এক দেশ থেকে আরেক দেশের উদ্দেশ্যে চলেছে। সঙ্গে তাদের পণ্যসামগ্রী। এখন যে পথ দিয়ে তারা চলছে সেই পথ খুব রুক্ষ। জলের আভাষটুকুও নেই। পথে তাদের নজরে এলো এক মৃত নগরের ভগ্ন তোরণদ্বার। তার ফলকে উৎকীর্ণ ‘বসুন্ধরা’।

বেহায়া

দিলীপবাবু বিড়ির জ্বলন্ত পেছনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মুখ কুঁচকে বলে উঠলেন, ‘বেহায়া মেয়েছেলে একটা! সব ব্যাপারে এঁড়েপাকামি… ’
‘আরে দাদা কি বলছেন কি? আস্তে বলেন…। দেখলেন না আজ, পাড়ার মেয়েরা কেমন একসুরে কথা বলছিল? সাবধানে কথা বলেন, নাহলে ইলেকশনের বাজারে… ’ হাতে খইনি ডলতে ডলতে ফিচেল হাসি ছড়িয়ে ভজুয়া বলে উঠল। ওই হাতটা ধুয়েই একটু পরে ও কচুরি ভাজবে।
‘সাহা-সুইটস’ এর কচুরির কদরই আলাদা এ এলাকায়। দিলীপ সাহার ঠাকুদ্দার আমলের দোকান। তিন প্রজন্মের দোকান, এলাকায় নাম আছে। আরও একটা কারণ হল সাহা-বাড়ির ছোটকালীর থান। দিলীপ সাহার ঠাকুদ্দা নাকি স্বপ্নে পেয়েছিলেন এই কালীমূর্তিকে। কুচকুচে কালো। গা ভরা গয়না। লোকে মানত করে সোনা দানা কিংবা রূপো দিয়ে। খুব নাকি জাগ্রত কালী। সাহা-সুইটস্‌ এর মাখা সন্দেশ পুজোর প্রসাদ হয়ে সাহাবাড়ির কালীর থানেই জমা পড়ে। এ হেন সাহাবাড়ির বড়কত্তা দিলীপবাবু যে এলাকায় একটা গমগমে দাপট নিয়ে থাকবেন এ তো বলাই বাহুল্য। বাড়ির দাপট, বংশের দাপট, মন্দিরের দাপট, দোকানের দাপট এমনকি দিলীপ সাহার অহংকারী ব্যক্তিত্বের দাপট।
‘আপনি কিছু বললন না কেন দাদা? মেয়েটা প্যাঁটর প্যাঁটর করে কি কথাই না শোনালো সক্কলের সামনে’ মুখ নড়িয়ে ভজু যখন কথাগুলো বলছিল, তখন ও হাত দুটো বেলনা দিয়ে ফটাফট বেলে চলেছে কচুরি।
‘আমি ভাবতেই পারিনি যাদববাড়ির মেয়ের এত বড় সাহস হবে! পাড়ায় এতদিন ধরে তো আছি কেউ বলতে পারবে কাউকে দু কথা শুনিয়েছি, কারো কোন ক্ষতি করেছি? ওই তো, গেল ছটপূজোয়, যাদববাড়িতে দশটা ক্লাবের ছেলে আমার হুকুমে খাটেনি? যাদবদের বুড়ো বাপটাকে শ্মশানে নিয়ে আমার ছেলেরাই তো গেছিল। যায়নি? বর্ধনবাড়ির বড়মেয়েটা যে বিয়ের আগে ফালতু ছেলেটার সাথে ট্রেনে ভেগেছিল, আমরা তার বিহিত করিনি? কি হত বলত ওই বেকার ছেলেটাকে বিয়ে করলে? একটা প্রাইভেট টিউটরের বউ হয়ে সারা জীবন কাটাত সেটা ভালো হত? এখন বর্ধনবাড়ি যে বড়জামাইয়ের পয়সায় গাড়ি কিনেছে, হিল্লী দিল্লী করে বেড়াচ্ছে, জামাইয়ের প্রোমোটারি পয়সা ছাড়া এসব হত? তাহলে? এরা কেউ দাম দিতে চায় না, বুঝলি ভজু। সব হারামির জাত… নিমকহারাম’
‘সেই তো দাদা। সেই বাড়ির মেয়ে আপনাকে এমন কথা বলতে পারল?’ ভজু গরম তেলে কচুরিগুলো ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠল, আর দিলীপবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল ওনার মন মেজাজ আজ আর ভালো হবার কোন চান্সই নেই। তাও দিলীপদাকে তাতিয়ে দিলে পরিবেশটা যে গমগমে থাকবে বিলক্ষণ জানে ভজু। কাজে মন বসবে, কচুরি খাস্তা হবে! লোকের ভিড় হবে। দোকানের সামনে খানিক গপ্প-সপ্প হবে এই ভর-বিকেলে।
দিলীপবাবু দুহাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে খামচিয়ে ওপরের পাটি দাঁত দিয়ে নীচের পাটি দাঁতকে চেপে ধরল। মাথার দুপাশের রগদুটো দপদপ করছে। ভাবছিলেন, কি কুক্ষণেই না হরিমন্দিরের মিটিং এ হাজির হয়েছিল আজ দুপুরে। একটা তুচ্ছ কথাকে নিয়ে কি নাটকই না করল মেয়েটা! বর্ধনবাড়িতে যে আত্মীয়াটি গৌহাটি থেকে বেড়াতে এসেছে দিনকয়েক, সে কপালে সিঁদুর চওড়া করে পরলে কি হবে, ব্রা দেখানো পাতলা ব্লাউজ কিংবা বুক পেট আঁটা টাইট জামাকাপড় পরেই হরবখত আসা যাওয়া করছে রাস্তায়। ওইসব পড়ে কোন বাড়ির বউ হাঁটাচলা করে এই গলিতে? কস্মিনকালেও কেউ করেছে? সাধে ক্লাবের কালু-বিলু রবিবারের দুপুরে গাঁজা ভাঙের নেশায় কি বলতে কি বলে ফেলেছে? আর তার জন্যে নাটক করে পাড়ায় মিটিং ডাকতে হবে?
দিলীপবাবু মনে মনে গর্জাচ্ছিল, যাদববাড়ির টুকটুকি যদি মিটিং মিটিং জেদ না ধরত এসব কিছুই হত না। ওই মেয়েটা যত বড় হচ্ছে তত পুলক জাগছে যেন। ওই তো চেহারা, কালো, ছোট ছোট চুল। কিসের এত গুমর রে তোর? কে বিয়ে করবে এই ছেমড়িটাকে? তাছাড়া মেয়েটার স্বভাব চরিত্রও নাকি ভালো না, ক্লাবের ছেলেগুলো বলছিল ওনাকে। ছেলেদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। কে নাকি সিগারেট খেতেও দেখেছে। ক্লাবের ছেলেরা দিলীপবাবুকে অনেকদিন আগেই সাবধান করেছে টুকটুকিকে নিয়ে। ওর হাবভাব দেখে নাকি পাড়ার অন্যান্য মেয়েদের বাড় বাড়ছে। কড়কে রাখা দরকার ওটাকে। কিন্তু দিলীপবাবুকে আজকাল অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। পার্টি থেকে ফোনটা আসার পরেই দিলীপবাবু অনেক কিছু হিসেব কষতে শুরু করে দিয়েছেন। মাকালীর কৃপা হলে বিধায়কের টিকিটটা এবারই নাচছে মনে হচ্ছে। অতয়েব পাড়ায় একটা মাখো মাখো ভাবমূর্তি দরকার। যা করার ভেবেচিন্তে করতে হবে। কিন্তু তাই বলে, বাপের বয়েসী মানুষটা যেই নরম হল ওমনি মাথায় লাথি কষাল ওই টুকু মেয়ে! দুপুরের দৃশ্যগুলো সিনেমার রিলের মত পাক খাচ্ছিল দিলীপবাবুর ঘিলু বরাবর।
‘এ পাড়ার একটা সম্মান আছে। মেয়ে বউরা চিরদিন ভদ্রসভ্য পোশাক আশাকেই হাঁটাচলা করেছে। হঠাৎ ভরদুপুরে এমন অভদ্র পোশাকে … ছি ছি ছি’ নাক খুঁটতে খুঁটতে বলে উঠেছিল দিলীপবাবু। ক্লাবঘরে তখন জনা কুড়ি লোকজন।
‘কিন্তু কাকু তার জন্য কি ক্লাবের ছেলেরা ঠেকা নিয়ে রেখেছে কুরুচিকর কমেন্ট করার? আর অভদ্রের কি আছে? অমন ড্রেস আজকাল সবাই পড়ে। তাহলে তো বলতে হয়, আপনিই বা বিকেলের পরে খালি গায়ে লুঙ্গি পড়ে পাড়ার মোড়ে কেন বসেন? ওটাও তো অসভ্য পোশাক কাকু!’
‘কি বললি? কি বললি তুই?’ রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন দিলীপ সাহা। ওদিকে যাদববাড়ির রমেশ যাদব নিজের মেয়ের হাত চেপে ধরে বলছেন, ‘কাকে কি বলছিস কি তুই টুকটুকি?’
‘থামো বাবা। একটাও ভুল কথা বলছি? রোববারে ক্লাবের পাশ দিয়ে গেলে কান গরম হয়ে যায় আমাদের। মদ গাঁজার গন্ধে ম ম করে জায়গাটা। ওই বিলু-কালুদের আজে বাজে কথা হজম করেও পাড়ার মেয়েরা কিছু বলে না। কই দিলীপ কাকু তো সেসব দেখেও দেখেন না!’
রীতিমত ধুন্ধুমার বেঁধে গেছিল। ক্লাবের ছেলেগুলোও চ্যাঁচামেচি শুরু করে দিল আর কিছু না পেরে। দিলীপবাবু মিটিং ছেড়ে উঠে চলে এলেন। যাদববাড়ির মেয়ের এত বড় কথা! বেহায়া মেয়ে!
রাতে তেমন করে খাওয়া দাওয়াও করতে পারলেন না দিলীপবাবু। এ অপমান হজম করা অসম্ভব। নেহাত বয়েস হয়ে গেছে নাহলে…। তারওপর ভোটের বাজার। মনের কথা বেফাঁস বেরিয়ে গেলেই খান খান হয়ে যাবে এলাকার বিধায়ক হবার স্বপ্ন। শোয়ার আগে ছোটকালীর থানে প্রণাম সেরে নেওয়া বহুদিনের অভ্যাস। অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন কালীমূর্তির দিকে। চেয়েই রইলেন।
ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দুপুরের কথাগুলোর জাবর কাটতে কাটতে কখন যে চোখ লেগে এসেছে টেরই পাননি দিলীপবাবু। হঠাৎ দেখলেন সারা ঘরে লাল আলো জ্বলছে। টকটকে লাল। খাটের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে যাদববাড়ির মেয়েটা। একেবারে উলঙ্গ। কুচকুচে কালো শরীরে টকটকে লাল ঠোঁট জেগে আছে। ডাগর ডাগর চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে যেন। তাকিয়ে তাকিয়ে যেন গিলছে দিলীপবাবুকে। মেয়েটা এগিয়ে এসে খাটের ওপরে উঠল। শুয়ে থাকা দিলীপবাবুর শরীরটাকে তাচ্ছিল্য করে উন্মুক্ত করতে করতে হাড় হিম করা হাসি ছড়িয়ে দিল ঘরে। দিলীপবাবু যেন অবশ হয়ে যাচ্ছেন। ভয় পাচ্ছেন মেয়েটাকে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়েছে দিলীপবাবুর ওপরে। চারপাশে কারা যেন কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে সন্ধ্যারতির মত। দিলীপবাবু কি যেন বলতে চাইলেন। দেখতে পেলেন মেয়েটি আধহাত জিভ বের করে ভেঙাচ্ছে দিলীপবাবুকে। টকটকে লাল জিভ।
ধড়মড় করে তন্দ্রা ভেঙে গেল দিলীপ সাহার। সারা গায়ে দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে। ‘কি হল?’ স্ত্রীর উদ্বিগ্ন প্রশ্ন। দিলীপবাবু কোন কথা বলতে পারলেন না…। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল ছোট কালীর থান। দিলীপবাবু তাকালেন সেদিকে।
…নিশুতি রাতে, লাল আলোয় একা দাঁড়িয়ে থাকা কালো মূর্তিটি দেখে দিলীপবাবু যেন চমকে উঠলেন!

সমুদ্র গুপ্তের অটো-যাত্রা

সমুদ্র গুপ্ত অটোতে উঠলেন। জায়গাটা খানিক অন্ধকার বলেই আগে বোঝেননি অটোটার পেছনে দুদিক খোলা। অর্থাৎ ওদিকদিয়ে উঠতেই পারতেন। কিন্তু খামোকা বাঁইই করে অর্ধবৃত্তের মত পাক খেয়ে অটোর বাঁ দরজা দিয়ে পেছনের সিটে উঠেই দেখলেন হুড়মুড় করে কি একটা ডান দরজা দিয়ে ঊঠে পড়ল। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই নাকে এল পারফিউম আর ঘামে মাখামাখি এক বিতকুটে গন্ধ। স্পর্শে এল বড় সড় মেদবহুল এক মেয়েলী উপস্থিতি। আর ঘাড়ে সুড়সুড়ি দেওয়া একগাছি লম্বা চুল।
‘হ্যাঁ, কোথায় তুই?’ দেখা গেল মহিলা ফোন বের করে গলা পাকিয়েছেন। চওড়া স্মার্টফোনের পর্দাটা অটোর অন্ধকারে একবাক্স হীরক-খন্ডের মত জ্বলে উঠল। ততক্ষনে সমুদ্র গুপ্তকে স্যান্ডুইচ বানিয়ে পেছনের বাম দরজাও রাজারহাটের এক তথ্যপ্রযুক্তি সুলভ ছুঁচলো দাড়ি আর বিদগ্ধ চশমা ফ্রেম দখলে নিয়েছে। আর ছেলেটির হাতের বস্তাসদৃশ দুটো ল্যাপটপ ব্যাগে সে দরজা দিয়ে বাইরের আলো ঢোকার ফুটীফাটাও বন্ধ! এদিকে, ড্রাইভার ধর্মতলার ফুটপাথিয়া হকারের মত , ‘দুটো খালি… তাড়াতাড়ি… দুটো খালি’ বলে খদ্দের ডাকছে।
‘ও তুই বেরিয়ে গেছিস? এত তাড়াতাড়ি?’ মহিলা কথা বলে চলেছেন। সমুদ্র দেখছিল, ডানপাশের ওই বাহুবলী মহিলার স্মার্ট-ফোন কানে ধরা থলথলে হাত, ওনার মেদবহুল বুক-পেট ধরে টানা দেহরেখার সাথে পঁয়তাল্লিশডিগ্রীতে কাৎ করে বগল এলাকায় এক প্রশস্ত ফাঁকের জন্ম দিয়েছে। সে ফাঁক শুধু পারফিউম আর ঘেমো গন্ধের জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত নয়, বরং দেখে মনে হচ্ছে এক বিশাল পাইথনের হাঁ-মুখ। কিংবা সারসের ফাঁক করা লম্বা ঠোঁট। সেই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ফাঁক দিয়ে আবছায়া আলো এসে সমুদ্রকে বলে দিচ্ছিল এই মহিলা মোটেই তেমন বয়স্কা কেউ নয়। কানে বড় বড় দুল। ঠোঁট বেশ গাঢ় রঙে ছোপানো। গায়ের রঙ কালোই বলা যায়। চুলগুলো খানিক কোঁকড়ানো। আর বগলের ওই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ফাঁকা কৌনিক-জাঙ্গাটাই সমুদ্রের চোখজোড়াকে নিয়ে গিয়ে ফেলছিল ঠিক সামনেই একটি টেলরের দোকানে, যেখানে এক মহিলা বসেছিল আটপৌরে শাড়িতে। মাথার খানিক ওপরে দড়িতে টাঙানো জামাপ্যান্টগুলো নড়ছিল। আর সামনে দোকানের কাউন্টারে শুয়ে থাকা একটা শিশু হাতপা ছুঁড়ছিল আনন্দে। ওপরে কালো একটা ফ্যান ঘুরছিল বন বন করে। এভাবেই, ফ্যানের হাওয়ায় এই গরমে তুমুল ফুর্তির একটুকরো ছবি দেখছিল সমুদ্র গুপ্ত । আর আবছায়া এই ভ্যাপসানো ঘুপচিতে বসে ভাবছিল, অটো চললে কি খানিক মুক্তি পাবে ?
‘আমি তো প্রেসিতে আছি। প্রেসিডেন্সীর গেটে দাঁড়িয়ে আছি। ওকে বলেছি গাড়িটা আনতে। ফোন করেছিল। কাছাকাছি আছে। এই গরমে আর পারছিনা। ও এলে গাড়িতে অনুপম চালিয়ে এসির হাওয়া খেতে খেতে উত্তরপাড়া যাব। না দমদম পার্কে কাল যাব। তুই কাল কি করছিস?’ মহিলার ঠোঁটদুটো বিরাম নিচ্ছিল না যদিও এই গরমে।
সমুদ্র গুপ্ত কল্পনায় একটা এসি গাড়ি অনুভব করতে গিয়ে দেখল অনুপম রায় মাথায় সাদা টুপি পরে ড্রাইভারের আসনে বসে। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ভেবে আবার মেয়েটির বাহু ঘেঁষা ওই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রীর খোপ দিয়ে তাকিয়ে দেখল একটা কুকুর এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তায়। নিরীহ নেড়ি কুকুর।
‘ও তুই কাল চলে যাবি? এ বাবা। দেখা হল না। কাল থাকলে তুই আমাদের বাড়িতে থেকে খেয়ে যেতে পারতিস’ গলায় শান্তিপুরী ভদ্রতা এ মেয়ের এখন। সমুদ্রের রাগ হচ্ছিল। দমদম পার্কের অটোতে চড়ে প্রেসীডেন্সীর এসি ট্যাক্সি! পাঁয়তারা হচ্ছে!
চাকরি পাওয়ার আগে কোলকাতায় যখন ইন্টারভিউ-এর গোঁত্তা খেতে আসত জলপাইগুড়ি থেকে, এমন উত্তর হামেশাই পেত এখানকার আত্মীয় বন্ধুদের কাছে। ইন্টারভিউ দিয়ে অনেক সময়েই শিয়ালদার সস্তা হোটেলে থাকতে হত। অথচ সেই সব আত্মীয় বন্ধুরাই দার্জিলিং কিংবা ডুয়ার্সে এলে হেঁ হেঁ করে ফোন করত সমুদ্রকে। বিনি পয়সার হোটেল থেকে ফ্রি সার্ভিস গাইড। বেকার ছেলের এর চেয়ে বেশি কি আর যোগ্যতা হতে পারে?
খুব রাগ হচ্ছিল সমুদ্রের। বাঁ পাশের আইটির ছেলেটা চিৎকার করে উঠে বলল, ‘এই যে দাদা, এবারে অটোটা ছাড়ুন তো। যদি সারারাত কেউ না আসে আপনি এরকম চিল্লিয়ে যাবেন? আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো! এই গরমে এরকম করে পারা যায়?’
ওই মহিলা নাটুকে সংলাপে খানিক গলার জোর বাড়িয়ে বলল, ‘এই শোন, সাবধানে যাস। আর কাকু কাকিমাকে আমার প্রনাম জানাস। ও হ্যাঁ আমি না আগামী মাসে বোলপুর যাব। আমার জন্য একটা ব্যবস্থা করে রাখিস ভাইটি। জানিসই তো, ওখানে খুব কড়াকড়ি হচ্ছে আজকাল। তোর তো চেনাশোনা হোটেল আছে। ওর খুব ভরসা তোর ওপরে… ঠিক আছে?’ ।
সমুদ্র চিড়বিড়িয়ে উঠল। মনে হল ধাক্কেই ফেলে দেয় ওই ব্যাপারটিকে। কিন্তু সেসব হওয়ার আগেই দেখল কুকুরটি চিৎকার শুরু করেছে। ঘেউ ঘেউ ঘেউ ঘেউ। কি কর্কশ তিতকুটে আওয়াজ। যেন কারো ওপরে তীব্র আক্রোশ। নিজের অজান্তেই একটি শব্দযুগল বেরিয়ে এল সমুদ্রের মুখ দিয়ে,
‘শালা কুত্তা’!
ফোন থামিয়ে ঝড়ের বেগে মেয়েটি বাঁদিকে ঘুরে বলল, ‘কিছু বললেন?’

উন্নত শির

“ কিরে ? একটু গতর নাড়িয়ে জলটা তুলে দে না !! ” মায়ের ডাকে রাহুল বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুল । ওদিকে মায়ের কথা কিন্তু থামছে না । বাবার শরীর খারাপ, রিটায়ার্ড, দামড়া ছেলে ছুটির দিন কাজ না করে কিকরে যে মোবাইল-এ টুক টুক করে কেউ বোঝে না। এসব শুনে বিরক্ত রাহুল যখন শেষমেশ উঠল, ততক্ষণে মা চেঁচিয়ে ক্লান্ত হয়ে কাজগুলো করে নিয়েছে। যাক, এই সুযোগে, টুক টুক করে “মা ডাকছে, আসছি” মেসেজ করে দিয়ে কিছুটা সময় পাওয়া গেছে।

রাহুল টিভি চালাল। কোথাও একটা আগুন লেগেছে বলে খবর দিচ্ছে, ব্রেকিং নিউজ-এ।উদাসীন চোখ দুটো , একটা “ধাত্তেরি” নজর দিয়ে চ্যানেল ঘোরাতে বলল অন্যদিকে। মাথা সেটা শুনল, চালু হল একটা আইটেম গান, অন্য একটা চ্যানেল-এ। ‘বেটার’ বলল চোখ। বেশ খানিক সময় পেরিয়ে গেছে, ফোনের দিকে আবার নজর, টকাটক রেপ্লাই , টকাটক কথা। মুখে অনেক কিছুই বলা যায়ে না, মনে আসে না সেগুলো বলার কথা, তবে লেখায়ে সে বাধা নেই।

যা খুশি লেখ, ভাল না লাগলে তো একটা ‘সরি’ আছেই।

“এই, আজ বেরবি? চল কফি খাই, সি সি ডি ?”

“উম্, আচ্ছা চল।“

“হাউ আন রোমান্টিক !! বিরক্তিকর!!”

“খাব বলছি তো!!”

দুপুরে ভাত ডাল পোস্ত ছিল। রাহুল মুখ বেকিয়ে বলল, “ধুর এ আবার মানুষে খায়ে?”

“আজ তো নিরামিষ।” রান্নাঘর আওয়াজ দিল।

“বুদ্ধ পূর্ণিমা বলে নিরামিষ? কি ব্যাক ডেটেড থট মা!”

যাক, কোন ভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
New Doc 15_1

রনিতা অপেক্ষারত, সেও টকটকদুরস্ত। রাহুল আসতেই মুখ বেকিয়ে বলল, “আসছি বেবি? এই তোর আসছি বেবি? ৩০ মিনিট লেট!!”

“আরে বাসটা লেট করলে কি করব? জ্যাম ছিল।“

চলল দুজনের একসাথে বসে বিভিন্ন আলাপ, আলোচনা, সিনেমা, অর্ডার দেওয়া, কফি খাওয়া, আরও অনেক কিছু। শুধু মাঝে মাঝে চলল, চোখ তুলে একবার একে অপর কে দেখা, আর চোখ নামিয়ে টক টক করা।

ফোন যে কখনো হাল ছেড়ে দেবে এটা ভাবা যায় না বোধয়। অন্তত রাহুল কখনই সেটা ভাবে নি।

তাও রাস্তার মাঝখানে। তবে ভাগ্যিস হাল ছেড়েছিল। মুখটা তুলেই রাহুল বুঝেছিল যে আরেকটু হলেই ও চলন্ত বাসের তলায় চাপা পড়তো। টকটকানিতে মশগুল হয়ে রাস্তা পেরনোর সময় সিগন্যাল-এর চকচকানি চোখে পড়েনি।

হাত ফসকে ফোন রাস্তায়ে, আর বাসের চাকা ফোনের ওপরে। অজস্র লোকের ‘কি হোল কি হোল’ রব , আর ‘খুব বেঁচে গেছো ভায়া’ শোনার মাঝে রাহুল বুঝল, আজ অনেক দিন পর, ও ফোনের দিকে মাথা না ঝুকিয়ে হাঁটছে।

নতুন রাস্তাটা পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে। কয়েকটা নতুন বাড়ি বানানো হচ্ছে , আর তাদের ফাঁকে পূর্ণিমার চাঁদটা উঁকি মারছে। নাহ, রনিতাকে আজ একটা কল করতে হবে, খুব চেঁচাবে, তাও, ওর গলাটা শুনতে চায় রাহুল।

মাথা গুঁজলে তো শুধু ফোনে টকটকানি, আর বাস ট্যাক্সি চাপা পড়া, আর লুকিয়ে থাকা।

সবসময় নাহক, কিছুটা সময় তো মুখ মাথা তুলে জগতটা দেখা যেতেই পারে। তার সৌন্দর্য একদম অকৃত্রিম।

সামনেই বোধয় নজরুল জয়ন্তী, গলিতে ঢুকবার সময় কোন এক বাড়িতে কেউ আবৃতি করছে “বল বীর, বল উন্নত মম শির”

এবার রাহুলের বকা খাবার পালা শুরু, “কিরে, ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?”।

রাহুলের কপালে আজ খুব দুঃখ আছে।

পরিচয়

২৭শে অগাস্ট, বৃহস্পতিবার

যতদিন না রিপোর্টটা পাওয়া যাচ্ছে, চলো দুজনে কাছেপিঠে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। নিজেদের একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন আমাদের। যাবে?

ভাবতে একটু সময় নিয়েছিলো মৌলি। পরেরদিন শুক্রবার। সকালে উঠে বিজিতের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে বলেছিলো, “যাবো , কিন্তু দুজন না, তিনজনে। বিতানও যাবে।”
বিজিত একটু হকচকিয়ে গেলেও বুঝতে দেয়নি। শুধু বলেছিলো,”তোমার ছেলে, তুমি যা ভালো বুঝবে করবে। আমার কিছু বলার নেই। যদিও আমার মনে হয়েছিলো ও না থাকলে আমরা অনেক খোলা মনে আলোচনাগুলো সারতে পারব। ওতো এমনিতেও মার কাছে ভালই থাকে। তিনদিনে অসুবিধা হওয়ার কথা না।”
“হ্যাঁ, ছেলে আমার, সেই জন্যেই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই। ওরও এই পরিবেশ থেকে কদিনের জন্যে একটু দুরে যাওয়াটা কাজে দেবে। ও যাবে আমাদের সঙ্গে।”
“বেশ, তাই চলুক। কিন্তু মনে রেখো, সোমবারে রিপোর্ট আসবে। ফল যদি যা সন্দেহ করছি তা হয়, তাহলে ওকে জলপাইগুড়ি রেখে আসা হবে আশ্রমে।”
“ঠিক আছে বলে দিয়েছি তো একবার”।
দালানের দিকে পা বাড়ায় মৌলি।
“এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছ আবার?”
কেন বাথরুমে যাওয়াও বারণ নাকি আমার?”।
সতেরোপল্লির বটতলা থেকে ডানদিকে ঘুরে তিনটে বাড়ি পরেই ওদের বাড়ি। তিনতলা, মোটামুটি বড় ছড়ানো বাড়ি। বিজিত ও তার বাবার মিলিত পুঁজির লগ্নী। পারিবারিক ব্যবসায় যায়নি বিজিত। বাবার কঠিন অমত অগ্রাহ্য করে শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বহুজাগতিক প্রতিষ্ঠানে সু-উপায়ী এখন। চারবার বিদেশ ঘোরা হয়ে গেছে তার। মৌলি নিজেও বিতান হবার আগে একটা সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত ছিল।
পুরনো ধাঁচে তৈরী বাড়ির দোতলার বারান্দার শেষ প্রান্তে বাথরুম। ঢুকে জোরে কল খুলে দেয়।

porichoy_v1
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

বিয়ের আগে মা বলে দিয়েছিলো,”মৌলি, সংসারে নিজের একান্ত জায়গা বলতে কিছু থাকেনা। সবটুকুতেই অনেকের ভাগের অধিকার। নিজের চোখের জল কাউকে দেখাতে নেই রে। যখন খুব কান্না পাবে, বাথরুমে ঢুকে দরজা দিবি। ঐটুকুই তোর নিজস্ব আড়াল, মনে রাখিস।” গত কয়েক সপ্তাহের সমস্ত উদ্বেগ, উত্তেজনা গলে বেরিয়ে যেতে থাকে মৌলির লাল টকটকে দুই চোখের ভেতর থেকে, গরম-নোনতা ধারায়। আর, বড় লাল প্লাস্টিকের বালতি উপচে জল ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সাদা ঠান্ডা মেঝের ওপরের পরে থাকা ঝরা চুল, একটা লাল টিপ ও বিতানের খেলনা হাঁস।
ঘুম আসছে না কিছুতেই। বিতান মাকে জড়িয়ে তার গায়ে একটা পা তুলে দিয়েছে। ফুলো-ফুলো গালে তখনও একটু লাল দাগ। তুচ্ছ কারণে মেজাজ হারিয়ে বিজিত ঐটুকু ছেলেকে চড় মেরে বসেছে খাবার টেবিলে। অপরাধবোধে তলিয়ে যেতে থাকে মৌলি। নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে দুচোখের পাতা কখন লেগে এসেছে বুঝতে পারেনি।

ফ্ল্যাশব্যাক –
চোখ বুজতেই সেই দৃশ্য। আবার ফিরে আসে, বারবার। এর থেকে মুক্তি নেই মৌলির।
উত্তরাখন্ডের ভয়ংকর বন্যা কভার করতে গেছে মৌলি। সঙ্গে বহুদিনের সহকর্মী ও একদা সহপাঠি ক্যামেরাম্যান রাতুল। ফেরার সব রাস্তা বন্ধ। রুকস্যাক বেঁধে রাত জেগে টেমির আলোয় বসে আছে মৌলি আর রাতুল। রুদ্রপ্রয়াগের এক অখ্যাত হোটেলের চারতলায়। যেকোনো মুহুর্তে ঘরছাড়া হতে হবে। রাস্তা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই নীচে। সব ভাসিয়ে দুর্দম বেগে বয়ে যাচ্ছে মন্দাকিনী। ফোন নেই, নেট নেই। মুষলধারায় বৃষ্টি ধুয়ে দিছে চরাচর। সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপে আটকা পড়েছে ওরা। অসহ্য উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় কথা বন্ধ হয়ে গেছে বহুক্ষণ। শক্ত করে রাতুলের হাত ধরে বসেছিলো মৌলি। ঐভাবে প্রায় সারারাত বসে থাকার পর ভোরের দিকে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়েছিলো সে রাতুলের গা ঘেঁষে। কে, কোন মুহুর্তে প্রথম পদক্ষেপটা নিয়েছিলো এখন গুলিয়ে যায় ওর। কিন্তু খানিক পরে ভোরের আলো যখন ফুটে উঠছে, দুজনেরই উদ্বেগ ও উত্তেজনা খানিক হলেও চাপা পড়ে গেছে অন্য একটা হঠাৎ ঘুর্নিঝড়ের প্রলয় নাচনের তালে।। অনেকটা বেশি চিনে ফেলেছে দুজনে একে অন্যকে সেই মৃত্যু-গন্ধ মাখা পরিবেশে। ভয়টাও একটু কম করছে কি? নাকি একটু বেশি? যদি কিছু হয়ে যায়, কিভাবে সামাল দেবে সদ্যবিবাহিতা মৌলি? বিজিত যে কাজের সুত্রে গত মাস থেকে আমেরিকাতে।
এর দুদিন পর হোটেলের ছাদ থেকে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারে চেপে ওরা পৌঁছয় দেহরাদূন এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে কলকাতা। ক্লান্ত, বিপর্যস্ত মৌলিকে আরো বিহ্বল করে রাতুল বলে,”রাতটা ভুলে যাস মৌ। সেটা তোর পক্ষেও ভালো হবে, আর আমার পক্ষেও।”
কলকাতার বাড়ীতে ফিরে তিন দিন তিন রাত মৌলি শুধু ঘুমিয়েছিল স্নায়ু-প্রশমনকারী অসুধ খেয়ে। পারিবারিক ডাক্তার গুহ বলে দিয়েছিলেন, যা মানসিক আঘাত গেছে, তাতে কদিন ওর সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। খবর পেয়ে চারদিনের দিন ফিরে এসেছিল বিজিত। আমেরিকার কাজ অসম্পূর্ণ ফেলে রেখে। তদ্দিনে মৌলি একটু থিতু।
বাড়িতে তখনও শুভাকাঙ্খী আত্মীয়স্বজনের ভীড়। সব ফাঁকা হতে হতে রাত এগারোটা। নিজেদের শোবার ঘরের চারদেওয়ালের আড়াল হতেই তাকে অভ্যস্ত নিপুণতায় কাছে টেনেছিলো বিজিত। শেষে পরিতৃপ্ত ঘুমে তলিয়ে গেছিল সে একাই। লক্ষ্যই করতে পারেনি যে মৌলি পাঁচ ডানার সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে ঠায় জাগা। চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে মুক্তোদানা। ভিজে উঠছে বিয়েতে উপহার পাওয়া ঘিয়ের ওপর কমলা ভেলভেটের ফুলতোলা বালিশের ঢাকা। আরেকটা না-ফুরোনো রাতের সঙ্গী হয়ে জাগছিলো মৌলি।
পরদিন রাতুলের বিয়ের কার্ড পৌঁছে গেছিলো অফিসের সকলের ডেস্কে। ডিসেম্বরে বিয়ে।
এর পরের মাসেই অন্ত:সত্তা হবার কারণে চাকরি ছেড়ে দিল মৌলি। জার্নালিসমের মতন ধকলের চাকরি ওই অবস্থায় করতে দিতে চাননি শশুরবাড়ির কেউ। রোজ রাতুলের মুখোমুখি আর হতে হবে না ভেবে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল মৌলি।
বিতান হলো পরের বছর জুন মাসে। সাড়ে আট মাসের খুব কষ্টের গর্ভকালের পর। গলায় নাড়ি জড়িয়ে গেছিল বিতানের। তড়িঘড়ি সার্জারি করে বার না করলে বাঁচানো যেতো না।
মৌলি এখন মাঝে মাঝে ভাবে, সেই হয়ত ভালো হতো। এত ভোগান্তি লেখা থাকত না তাহলে ওদের দুজনের কপালে।

২৮শে অগাস্ট, শুক্রবার
আজ বিকেলেই রওনা হবে ওরা। মন্দারমণি। সমুদ্র সৈকতের একদম কাছেই একটা নতুন হওয়া তিনতারা রিসর্টে ঘর বুক করা হয়েছে। বিজিতের বন্ধুর রিসর্ট তাই এত কম সময়ের মধ্যেও জায়গা পেতে অসুবিধা হয়নি বিশেষ।
বিতান স্নান করবে বলে ঘুরঘুর করছে। গত কয়েক বছর ওকে ওর ঠাকুমা স্নান করিয়ে খাইয়ে দিতেন। কিছুদিন হলো বন্ধ করেছেন। সেই যেদিন দুপুরবেলায় হঠাৎ রাতুল এসে হাজির ! তাকে দরজা খুলে দিয়েছিলেন শাশুড়িমা নিজেই।
“বৌমার সহকর্মী? কিন্তু ও তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছে অনেক বছর হলো।” রাতুলের আদ্যপান্ত জরিপ করতে করতে কাবেরী বলেছিলেন,”কই তোমাকে আগে তো দেখিনি এ বাড়িতে”
দোতলায় নিজেদের ঘরে পুরনো রিডার্স ডাইজেস্ট পড়ছিলো মৌলি। পাশে বিতান দিবানিদ্রায় কাদা। নিচের তলার কথাবার্তা কানে যেতে উঠে দালানে বেরিয়ে উঁকি দিয়েই স্থানু হয়ে গেল। রাতুল !! এতদিন বাদে। সেইরকমই আছে। উস্কো-খুস্কো চুল, খোঁচা দাড়ি, রংচটা নীল রীবকের টিশার্ট আর বাদামী জিন্স। সেই ধুসর অ্যাঙ্কল বুট, বাইরে রিপোর্টিঙে গেলে যেটা পরে যেত। দোতলার ঘরের পর্দার নীচে লাগানো ঝুমঝুমির আওয়াজে কাবেরী উপরে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে রাতুলও। চোখাচোখি হতেই স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে ডান গালে টোল ফেলে রাতুল বললো,”কেমন আছিস? এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোর সাথে দেখা করে যাই”। যেন রোজই আসে এবাড়ীতে। কতকালের আনাগোনা।
কাবেরীকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে মৌলি তাড়াতাড়ি নীচে নেমে আসে,”তুই !! এতদিন কোথায় ছিলি? আমার অবশ্য কারুর সাথেই তেমন যোগাযোগ নেই। বাড়িতে খুব ব্যস্ত থাকি।”
কাবেরীর দিকে চেয়ে রাতুল বলে,”মাসীমা, আমি একটু জল খাবো। অনেকক্ষণ বেরিয়েছি”
“হ্যাঁ, বোসো তুমি, বন্ধুর সাথে গল্প-টল্প করো। অনেকক্ষণ বেরিয়েছো, খিদেও পেয়েছে নিশ্চই। আমি আসছি।”
নীচেরতলার রান্নাঘরটা একটু দুরে, দালান পেরিয়ে।
কাবেরী চোখের আড়াল হতেই বিরক্তিতে ফেটে পড়ল মৌলি,”এতদিন বাদে কেন এলি এখানে তুই? কি দরকার তোর?”
“মৌ, তোর কোনো অসুবিধা করব না আমি, কথা দিচ্ছি। আমি সত্যিই এখানে আর থাকিনা। রাজস্থানে ছিলাম এতদিন। ওখানে থেকে তোর-তোদের সব খবরই পেয়েছি। ছেলে হয়েছে তোর। গাড়ি কিনেছিস আরেকটা। হয়তো আমেরিকা যাবি, সব।”
এবার মৌলি ধৈর্য হারায়,”কি চাস তুই খুলে বলতো।”
“মৌলি, তোর ছেলে, কি নাম রেখেছিস? জুন মাসে হয়েছে তাই না? তার মানে তো….হয়তো। হয়তো কেন, নিশ্চই তাই, বিজিত তো তখন আমেরিকাতে। আমি নিজেকে কিছুতেই আটকাতে পারলাম না রে। ওকে একবার দেখতে দিবি?”
“না আ আ” টা একটু জোরেই বলে ফেলেছিল মৌলি। ঠিক তখনই কাবেরী ঢুকছিলেন জলখাবারের ট্রে হাতে নিয়ে।
কতটা কি শুনেছেন বোঝা গেল না। কিন্তু এরপর খুব গম্ভীর হয়ে থাকলেন, রাতুলের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বললেন না। রাতুল চলে যাবার পর মৌলির সাথেও না। এদিকে রাতুল আবার যাওয়ার সময়ে জোর করে একটা দামী ক্যামেরা মৌলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। “ছেলের জন্যে এনেছি। বড় হলে দিস। আমার কথা বলিস।”
রাতে বিজিত ফেরার পর কাবেরী তার সাথে আলাদা ঘরে অনেকক্ষণ কথা বললেন।
মৌলি রাতে বিতানকে খাইয়ে নিজে উপোশ করে ঘরে বসে রইলো সারা সন্ধে। কেউ সাধলোও না। বিজিত ঘরে ঢুকেই প্রথমে বললো,”রাতুলের কথা আগে শুনিনি কেন। আমি তো জানতাম তুমি একাই গেছ উত্তরাখন্ড। কাজের অজুহাতে এসব চলছে টের পেতে দাওনি তো। ভালো।”
“তুমি যা ভাবছো তা নয়।” মৌলি একটু ক্ষীণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলো।
“চুপ করো। আমি কি ভাবব সেটা আমাকেই ভাবতে দাও। সান্যাল বাড়ীতে আজ পর্যন্ত কোনো অনাচারের ফসল জল-হওয়া পায়নি। এও পাবে ভেব না। আমি ওই ছেলের ডি এন এ টেস্ট করাবো। তারপর ঠিক হবে ও এবাড়ীতে মানুষ হবে না আস্তাকুঁড়ে। কোনও অনাথাশ্রমে দিয়ে আসবে ওকে।”
বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মৌলি। প্রতিবাদ করার জন্যে যেটুকু আত্মপ্রত্যয় দরকার হয় সেটা যেন কোথায় উবে গেছে মনে হলো তার। যদি সত্যিই তাই হয়। তবে?

বিজিত বেমালুম ভুলে গেল যে পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে তারা নিজেরাও দিনরাত বিতানের চেহারা নিয়ে আদিখ্যেতা করে থাকে দুবেলা।
“ছেলের নাকটা আমার মতন”
“নাতি একদম ছোটবেলার বিজিতের মতন দেখতে হয়েছে”
“গালে টোলটা পেয়েছে মনে হয় মামাবাড়ির থেকে”
সব ভুলে গেলো।
দ্রুত হাতে সুটকেসে জামা কাপড় ভরে নিতে থাকে মৌলি। রিপোর্টের রিসিপ্টটা হাত ব্যাগে রাখে। বিজিত আর বিতানের হাতের বুড়ো আঙ্গুলে ছুঁচ ফুটিয়ে রক্তর নমুনা নিয়ে গেছে পরীক্ষাগার থেকে। তিনদিন লাগবে। সোমবার জানা যাবে বিজিতের রক্তের কৌলিক নিয়ম নির্ধারক কণাসমূহের মানচিত্র বিতানের সঙ্গে মেলে কিনা।
বিতানকে স্নান করিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়ালো এরপর। ঘুমন্ত বিতানের নরম কপালের ওপর থেকে রেশম-রেশম একটু তামাটে চুল সরিয়ে দিচ্ছিলো সে। “এলি যদি, আমার কোলে এলি কেন তুই। আমি যে তোর উপযুক্ত নই।”

২৯শে অগাস্ট, শনিবার
মন্দারমণি এসে গেছে ওরা। এখানেও আবহাওয়া ভালো নেই। প্রায়ই বৃষ্টি হচ্ছে।
মৌলির সাথে একটু-আধটু কথা হয়েছে বিজিতের। কিন্তু বিতান যেন অন্য কেউ। তার সাথে নিজের থেকে একবারও কথা বলেনি বিজিত। বিতান খুব বায়না করলে হুঁ, হ্যাঁ দিয়ে কাজ সেরেছে। বরফ গলেনি। মৌলি শুধু তাকিয়ে দেখেছে আর অপরাধের বিরাট বোঝাটা আরো আঁট হয়ে চেপে বসেছে তার বুকের মাঝে।

৩০শে অগাস্ট রবিবার
কাল সকালে ফিরে যাবার কথা ওদের।
যাবার আগে একবার অন্তত সমুদ্রে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালো মৌলি। বিতান তো লাফাচ্ছে। বিজিত কিছুতেই যেতে রাজি হলো না।
ছেলেকে নিয়ে একাই রওনা হলো মৌলি। বিকেল হয়ে আসছে। বালিতে নেমেই হুটোপাটি করতে শুরু করেছে বিতান। লাফাচ্ছে, মুঠো করে বালি তুলে ছুঁড়ছে, মাকে ডাকছে, হাসছে, নাচছে। ঈশান কোনে একটু মেঘ ছিলো। কখন যেন আকাশটা ঢেকে ফেলেছে। অস্ত যাবার আগেই অন্ধকার করে এলো। বৃষ্টি নামলো ঝুপঝুপ করে।
বিতান মজা পেয়ে খিলখিল করে হাসছে। ভিজছে পাখির ছানার মতন। মৌলি পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়, হাত ধরে ফেলে ওর।
“চল জল খেলবি সোনা?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ মামনি, চলো চলো”
ছোট্ট রবারের মতন তুলতুলে হাতের মুঠিটা নিজের হাতে নেয় মৌলি। এগোতে থাকে জলের দিকে। ঢেউ বাড়ছে খুব। বৃষ্টিও জোরদার হচ্ছে প্রতি মুহুর্তে। পায়ের পাতা ডোবা জলে যেতেই বিতান আনন্দে দিশেহারা। ঢেউগুলো লকলকিয়ে একের পর এক এসে ছোবল মারতে থাকে ওদের পায়ে। হাতছানি দেয়, আরো আরো।
আরো খানিকটা এগোয় মৌলি, বিতানের মুঠি দৃঢ় মুষ্টিতে ধরা।
হাঁটুজলে যেতেই জল পৌঁছে যায় বিতানের বুক অব্দি। এবার একটু ভয় পায় সে। মুখ তুলে তাকায় মায়ের দিকে। কই, মা তো ভয় পায়নি একটুও। আদিগন্ত বিস্তৃত জলের দিকে তাকায় বিতান। এবার ও বুঝতে পারে মায়ের মুঠিটা আলগা হচ্ছে। “মামনি” বলতে গিয়ে মুখে অনেক খানি জল ঢুকে যায় ওর। মৌলি আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। ফুঁসতে থাকা বঙ্গোপসাগর মুহুর্তে টেনে নেই ছোট্ট বিতানকে। কালো হাতির পালের মতন মেঘের তলা দিয়ে ততক্ষণে উঁকি দেয় সূর্য। মাত্র কয়েক মুহূর্ত, তারপরেই ডুবে যায়। বৃষ্টির জল ধুয়ে দিতে থাকে মৌলির গালের অঝোর নোনা জলকে।
“ভালো থাকিস সোনা। আমাকে ক্ষমা করিস”
ফিরে রওনা দেয় সে হোটেলে।

৩১শে অগাস্ট, সোমবার
গতরাতে মৌলি-বিজিত কেউ ঘুমোতে পারেনি। সারা রাত সার্চ পার্টি খুঁজেছে বিতানকে। কিছু পাওয়া যায়নি। ঝড়-বৃষ্টি থেমে যাবার পরও না।
হা-ক্লান্ত দুজনে হোটেলের বিলাসবহুল কামরায় বসে তাকিয়ে শুন্যের দিকে।
হঠাৎ ভীষণ চমকে দিয়ে বেজে উঠলো বিজিতের সেল ফোন।
“হ্যালো বিজিত, আমি মা বলছি রে। রিপোর্ট এসে গেছে। ভগবানের অশেষ দয়া, তিনি মুখ রেখেছেন। বিতান আমাদেরই রক্ত রে। তোর ই ছেলে। টেস্টে কনফার্ম করেছে। তোরা আজকেই ফিরবি তো? কখন রওনা হচ্ছিস? হ্যালো, হ্যালো….”
ফোনটা বিজিতের অবশ হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে তিন টুকরো হয়ে যায়।
মৌলির লাল হয়ে ফুলে যাওয়া চোখ আবার ঝরাতে থাকে নোনা জলের বৃষ্টিধারা।

ধরণী দ্বিধা হতে পারেন না এযুগে, তাই বৃদ্ধ আকাশ তার বারি সঞ্চয় নিয়ে ঘরে-ঘরে সীতাদের আগলে নিতে আবারও নামে।

পৌরুষ

কুড়ি মিনিটের মধ্যে এই নিয়ে চার বার ঘড়ি দেখল বর্ষা । রাণাকে দুবার ফোনও করেছে –

সুইচড অফ। প্রতাপাদিত্য রোডে রাজীবদের এই বাড়িটার দোতলার বারান্দা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এখন। মেঘ করেছে বেশ – গুমোট হয়ে আসছে, গত দুদিন বৃষ্টি হয়নি এই মাঝ আষাঢ়েও । আজ ভাসাবে । তাহলে কি আসবে না ? মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল তার । কথাটা যে আজই বলতে হবে রাণাকে।

বেডরুমে গিয়ে এ.সি টা চালিয়ে দিল বর্ষা, গুলজারের কালেকশন থেকে একটা সিডি বেছে নিয়ে চালাল লো ভলিউমে।

pourush
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

তার বিয়ের আগে থেকেই রাণা অ্যাসিস্ট করে রাজীবকে – আলাপ ছিলই । ভালো করে চিনল ডুয়ার্সের আউটডোরে। মাস তিনেক আগে। রাজীবই নিয়ে গেছিল জোর করে। টানা সাত দিনের শুটিং জয়ন্তিতে – বিকেল বিকেল প্যাক আপ হয়ে যেত। আলিপুরদুয়ারের সার্কিট হাউসে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সেবার। পুরো ইউনিটকে মাতিয়ে রাখত রাণা। গিটার নিয়ে একের পর এক পিট সিগার – জন লেনন – আর.ডি – সলিল চৌধুরী গেয়ে শোনাত সার্কিট হাউসে ফেরার পর। মিষ্টি গলা । সারাদিন এর ওর পেছনে লাগছে, মজা করছে । আবার কাজের সময় সংলাপ পড়াচ্ছে – কণ্টিনিউইটির দিকে কড়া নজর রাখছে, ক্যামেরার অ্যাঙ্গল নিয়ে তদারকি করছে। ছিপছিপে – শ্যামলা – অসম্ভব ছটফটে আর বুদ্ধিদীপ্ত। ভালো না লেগে উপায় ছিল না ছেলেটাকে। একদিন রাজীব তাকে রানার সাথে ইউনিটের গাড়ি দিয়ে কোচবিহার ঘুরে আসতে পাঠাল। হাসিতে – কথায় কেটে গেল দিনটা । বর্ষার ভালো লাগছিল, স্বাবাবিকভাবে কথা বলছিল সে, হাসছিল আবার। একটু একটু করে ফিরে পাচ্ছিল নিজেকে।

রাজীবের সাথে আলাপ হয় যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির চাকরিটার দৌলতে, সেটা সে ছেড়ে দিয়েছিল বিয়ের পরে। কিছুদিনের কোর্টশিপের পর তাদের বিয়েটা ততদিনে প্রায় দেড় বছরের পুরনো। মাস খানেক আগেই ডক্টর মিত্র জানিয়ে দিয়েছেন সমস্যাটা তার নয়, রাজীবের। তার পক্ষে বাবা হওয়া সম্ভব নয়।

বিষণ্ণতায় ডুবে গেছিল বর্ষা – একটা শূন্যতাবোধ গ্রাস করে নিচ্ছিল তাকে ধীরে ধীরে । রাজীব মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথা বলেছিল। বলেছিল, “আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারো, আটকাব না। টাকার জন্য ভেবো না। নিজের মত করে বেঁচো। শুধু কারণটা বোলো না কাউকে। অনেক কষ্টে নিজের জায়গা তৈরি করেছি।  আমার পৌরুষ প্রশ্ন উঠবে, গসিপ হবে, মিডিয়া কভার স্টোরি করবে, আমার কেরিয়ারের – নামের খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আমার জীবনটা তো জানো বর্ষা…”

জানে, বর্ষা জানে, রাজীবের বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায় তার চোদ্দ বছর বয়সে । রাজীবের কাস্টডি পায় তার বাবা । মা যার প্রেমে পড়েছিল – তাকে বিয়ে করে চলে যায় ক্যালিফর্নিয়া – কোনো যোগাযোগ রাখেনি। তাদের বিয়ের বছর দুয়েক আগে রাজীবের বাবাও মারা যায়। ততদিনে অবশ্য রাজীবের চারটে ছবিই দেশে বিদেশে পুরস্কার পুরস্কার পেয়েছে – ভালো ব্যবসাও করেছে। তার জীবনের সেই অপ্রিয় ঘটনাটাই রাজীবের প্রতিভায় একটা অস্থিরতা – একটা পাগলামো যোগ করে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে, সেটাও বোঝে বর্ষা।

কোনও উত্তর দেয়নি সেদিন,  কিন্তু রাজীবকে ছেড়ে যাওয়াও হয়নি বর্ষার । কোথায় যেত – কাকেই বা বলত ! এসব কথা কাউকে বলা যায় না। দমদম পার্কের বাপের বাড়িতে দাদা বৌদি আর মার সংসার। বৌদির সাথে বনাবনি নেই তেমন। ভেবেছিল মাকে বলবে একবার। তাও বলেনি, মায়ের শরীরটা ভালো নেই। প্রেশারটা বেশি, যদি চিন্তায় চিন্তায় কিছু হয়ে যায় ! রাজীব ছাড়া তেমন করে তো জীবনে কেউ আসেওনি তার।

কিছুটা অপরাধবোধ হয়ত,ঠিক জানে না বর্ষা, কোলকাতায় ফেরার পরে রাজীবও চুপচাপ হয়ে গেল অনেক। টুকটাক সাংসারিক কথাবার্তা হয় তাদের । আপাতভাবে সবই স্বাভাবিক কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও দূরত্ব বাড়ছিল, একটু সরে থাকছিল রাজীব। আর কোলকাতায় ফেরার পর থেকেই রাণার যাতায়াত বেড়ে গেল তাদের বাড়িতে। কখনো রাজীবের ফেলে যাওয়া স্ক্রিপ্টের খাতা – কখনো কোনও প্রপ নিতে আসত। চা খেয়ে, গল্প করে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে যেত। কোনও একটা রসায়ন কাজ করছিল, কিছু হরমোন ক্ষরিত হচ্ছিল যা আগে কখনো হয়নি বর্ষার,   সেই দেখা হওয়ার সময়টা বাড়ছিল। শেষ তিন মাসে বৌদি থেকে বর্ষাদি থেকে বর্ষায় সহজাত ক্ষিপ্ততায় পৌঁছেছে রাণা তার সব অবরোধ ভেঙে। তারপর প্রথম স্পর্শ, প্রথম চুমু, প্রথম আদর – রাণাকে বাধা দিতে পারেনি বর্ষা । রাণাকে সে সব বলেছে। একটা পাপবোধ কাজ করত তার –  রাণা বলেছে এতে কোনও অন্যায় নেই …

বন্ধ ঘরে বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে, বাড়ছে কি? ‘ইস মোড় সে যাতে হ্যায়’ গানটার মাঝখানে কলিং বেলের শব্দ হঠাৎ , রাণা এসেছে ।

(২)

রাণার ঠোঁট তার সারাটা শরীর আবার নতুন করে আবিষ্কারের খেলায় মেতেছে। এক অদম্য অভিযাত্রীর মত নতুন ভূখণ্ড আবিস্কারের নেশায় সে পেরিয়ে যাচ্ছে পর্বত – অববাহিকা – উপত্যকা – বনানী – অতলান্ত খাদ । রাণার সবটুকু আদর শুষে নিচ্ছে বর্ষা তার অন্তর দিয়ে। এভাবেও ভালোবাসা যায় ! কথাটা শুনে রাণা এত খুশি হবে ভাবেনি সে। এ মাসে তার নিয়মিত রক্তক্ষরণের সময় পেরিয়ে গেছিল প্রায় সপ্তাহ খানেক। আজ সকালেই ঘরোয়া পরীক্ষায় জানতে পেরেছে, সে সন্তানসম্ভবা। খবরটা শুনেই তাকে জড়িয়ে ধরেছিল রাণা । একটা অদ্ভুত আলো খেলা করছিল তার চোখে। এভাবে রাণাকে খুশিতে ভেসে যেতে দেখেনি বর্ষা আগে কখনো।

রাণা বলেছে, “আজ আমি পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষ বর্ষা। আমাদের সন্তানকে নিয়ে আমরা দুজন একটা নতুন পৃথিবী তৈরি করব, তুমি বেরিয়ে এসো এই বাঁধন থেকে …”

হোক না রাণা তার চেয়ে প্রায় তিন বছরের ছোট, হোক না অভিধানগতভাবে তাদের ভালোবাসা অবৈধ – কী যায় আসে । আজই বলবে সব রাজীবকে । বলবে সে মুক্তি চায় । না, নিছকই একটা শারীরিক ত্রুটির জন্য মানুষটাকে ছেড়ে যাচ্ছে না সে। তার তো কোনও অভাব রাখেনি রাজীব। ইচ্ছাকৃত ভাবে বঞ্চনাও করেনি । কিন্তু সে যে ভালোবেসে ফেলেছে আর কাউকে – তার এটুকু অসহায়তা নিশ্চয়ই বুঝবে রাজীব। সেই তো বলেছিল নতুন করে জীবন শুরু করতে …

বাইরের মত বর্ষারও শরীরে, মনে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে  – কানায় কানায় ভরে উঠছে সে।

(৩)

রাজীব বাড়ি ফিরে সাধারণত ড্রয়িংরুমে হুইস্কি খেতে খেতে কোনও দেশি বা বিদেশি ছবি দেখে, ফিল্ম সংক্রান্ত জার্নাল –   ম্যাগাজিন পড়ে, বা পরের দিন শুটিং থাকলে ঘন ঘন ফোনে কথা বলতে থাকে । আজ সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরেই বর্ষার গালে একটা চুমু খেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। মিউজিক সিস্টেমে কিশোর কুমারের অ্যালবাম শুনছিল বর্ষা ,“কোই হামদম না রাহা… ” , এটা আশা করেনি বর্ষা, একটু চমকাল । যাক গে, ভালো খবর আছে হয়ত – কোনও পুরস্কার বা বিশেষ কিছু সম্মান । এগিয়ে যাক মানুষটা। উন্নতি হোক আরও। তার থাকা বা না থাকায় কীই বা ক্ষতি হবে এমন।

আজ রাজীব নিজেই এল বেডরুমে সময়ের আগে, হুইস্কির গ্লাস হাতে। আয়েস করে একটা চুমুক  দিয়ে বেড সাইড টেবিলে গ্লাসটা রেখে, বেশ কিছুদিন পর এই প্রথম বর্ষার চোখে চোখ রেখে বলল, “ এবার খুশি তো ?”

একটু থমকে গেল বর্ষা, “মানে ?”

– “আমাদের সন্তান আসছে যে -”

বর্ষার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল, “কী বলছ তুমি ?”

বাইরের মেঘ ডাকার শব্দ ছাপিয়ে গেল রাজীবের হাসির আওয়াজ, “ আরে এত ভয় পাওয়ার কী আছে, এটা তো আমারই স্ক্রিপ্ট । রাণাকে আমিই প্ল্যান্ট করেছিলাম। ডিল ছিল তোমাকে প্রেগন্যান্ট করতে পারলে সুরানাদের পরের ছবিটায় ওকে রেকমেণ্ড করে দেব ডিরেক্টর হিসেবে – ছেলেটার মধ্যে স্পিরিট আছে জানো – অনেকদুর যাবে …”

গলা শুকিয়ে আসছে বর্ষার, মাথা কাজ করছে না – হাতের কাছেই মোবাইলটা ছিল – ডায়াল করল রিফ্লেক্স অ্যাকশনে রাণার নাম্বারটা – সুইচড অফ।

“ওকে ফোন করো না – পাবে না, অন্য নাম্বার নিয়েছে। সুরানাদের সাথে কথা বলে ওদের পরের বিগ বাজেট ছবিটা – যেটার জন্য ওরা আমাকে চাইছিল, সেটা রাণা ডিরেক্ট করবে । ওকে নিয়ে সব ফাইনাল করে এলাম – এটাই ডিল ছিল, এরপর আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না আমাদের সাথে… ” হুইস্কির গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিল রাজীব ।

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না বর্ষা, অসাড় হয়ে আসছে তার সারাটা শরীর, শুধু বলতে পারল, “ এ কী করলে তুমি !”

-“কেন, এটাই তো ভালো হল। সবাই জানবে যে আসছে সে আমাদেরই সন্তান। আমার দিকে আঙুল তুলতে পারবে না কেউ কোনোদিন । তোমাকে বলিনি আগে, জানি রাজি হতে না – রানাকেও তো বলেছ, তুমি পাপ করছ – এত পাপ পুণ্য বোধ তোমার – কি করে আগে বলতাম বল তো ? কিন্তু সত্যি বলছি, আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ … ” হেসে উঠল রাজীব, “হা হা হা হা …”

বড্ড অচেনা লাগছে ওকে বর্ষার। পর্দার ফাঁক দিয়ে জানলার কাঁচ দিয়ে আসা চমকানো বিদ্যুতের নীল আলো রাজীবের মুখে । রাণার কণ্ঠস্বর রাজীবের প্রতিটা কথায় শুনতে পাচ্ছিল বর্ষা।  নগ্ন সে রাজীব – রাণা দুজনের কাছেই হয়েছে – কিন্তু এভাবে নগ্ন সে হয়নি কখনো আগে ।  তারপর, তার প্রচণ্ড কান্নার শব্দ রাজীবের হাসির শব্দকে ছাপিয়ে যেতে পারল না… সারাটা শহর তখন বর্ষায় স্নান করছে ।