বিরূপাক্ষ কথা (তৃতীয় পর্ব)

আগের পর্ব

বিরূপাক্ষ কথা #১১

কফির কাপটা সশব্দে টেবিলে রেখে চলে যাওয়ার সময় বউ বলে উঠলো, “কাল থেকে নিজের কফি নিজেই বানিয়ে নিও। আমার হাতের কফি তো তোমার মুখে রোচেনা।” কফি বানাত বটে বিরূপাক্ষ বাবুর মা। সারা বাড়ি ম ম করতো কফির খোশবু তে। কফি আসতো বাবার পছন্দের এক দোকান থেকে। সময় পাল্টাতে কফির স্বাদ ও পাল্টে গেল। বাবা কফি খাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলেন। কাপে চুমুক দিয়ে, বিস্বাদে, মুখ বিকৃত করে বিরূপাক্ষ আপনমনে বলে উঠলেন, “আজ অফিস ফেরতা বাবার পছন্দের সেই কফির দোকানটা হয়ে ফিরব।” বসার ঘরের ফটো ফ্রেম থেকে বিরূপাক্ষ বাবুর বাবা খুক করে হেসে উঠলেন।
বিরূপাক্ষ কথা #১২

বৃষ্টি নামলেই বিরূপাক্ষ বাবুর মন খারাপ করে। ভেজা মাটির গন্ধে, তাতে মিশে থাকা কোনও অজানা ফুলের মিষ্টি গন্ধে, মন কেমন করা অনুভূতিরা দানা বাঁধে চোখের কোনে। মনে পড়ে তাদের পুরনো বাড়িটার কথা, ছাদের ঘর, দালান কোঠা… রাঙাদাদুর ঘরের ফিলিপ্স রেকর্ড প্লেয়ার থেকে ভেসে আসা মেহেদি হাসানের কণ্ঠ “মহব্বত করনেওয়ালে কম না হোঙ্গে, তেরি মেহফিল মেঁ লেকিন হম না হোঙ্গে।” রাঙাদাদু বিয়ে করেননি। শোনা যায় বিদেশে থাকাকালীন একজন কে ভালবেসেছিলেন। রাঙাদাদুর বাবা রাজি হননি। ছেলেও জিদ্দি বাপের মতন। বেঁকে বসলেন বিয়ে করবেননা বলে। ছেলের জেদের কাছে বাপ হার মেনেছিল। রাঙাদাদু যেদিন মারা যান, আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিল। উঠোনে শোয়ানো দেহটার ওপর বিরূপাক্ষ বাবুর বাবা একটা ছবি রেখে দিয়েছিলেন। তাতে এক জার্মান মহিলা, সম্ভবত সেই জন যাকে রাঙাদাদু ভালোবাসতেন। শ্মশানে দাদুর সাথে ছবিটাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাইরে তাকিয়ে বিরূপাক্ষ বাবু গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন “অগর তু ইত্তিফকন মিল ভি যায়ে, তেরি ফুরকত কে সদমে কম না হোঙ্গে মহব্বত করনেওয়ালে কম না হোঙ্গে।
বিরূপাক্ষ কথা #১৩

মন্দিরের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কপালে হাত ঠেকাতেই পাশের সিটে বসা বৌদি খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আবার ভগবানে ভক্তি হল কবে থেকে?” বিরূপাক্ষ মুচকি হেসে বললেন, “রক্তমাংসের মানুষরা দু বেলা বিশ্বাস ভাঙ্গছে। চেনা সব লোক। এও না হয় ভাঙ্গবে। একে চোখেও দেখিনি, চিনিওনা। তাই ড্যামেজ কম, রিস্ক ও”। বউ মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো, “একটা উন্মাদ লোককে বিয়ে করে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল।” বিরূপাক্ষ বাবু শুনেও শুনলেন না। আজ মাসের পয়লা, বুয়াকাকার বাড়ি যাওয়া আছে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #১৪

হাসপাতালে এক বন্ধুর মাকে দেখে বেরোনোর সময় চোখ পরে গেল স্ট্রেচারে শোয়ানো একটা দেহের দিকে। বছর চব্বিশ বয়েস, মাথার পেছন দিয়ে রক্ত বেরিয়ে সাদা চাদর ভিজিয়ে দিয়েছে। পাশে দাঁড়ানো ওয়ার্ড বয় বলে উঠলো বেওয়ারিশ লাশ,মর্গে পাঠানো হবে। নিজের গায়ের থেকে চাদরটা খুলে দেহটা ঢেকে দিলেন বিরূপাক্ষ। অবাক চোখে ওয়ার্ড বয় জিজ্ঞেস করলো, “চেনেন নাকি?” “জানিনা” বলে বেড়িয়ে এলেন বিরূপাক্ষ বাবু। “পাগল, না কি?” কানে এলো ওয়ার্ড বয়ের গলা।

 

বিরূপাক্ষ কথা #১৫

হাতঘড়িটা আজ আবার বন্ধ হয়ে গেল। অফিস ফেরতা নিয়ে গেলেন লালবাজারে করিমের দোকানে। পুরনো খদ্দের, তাই করিম নিজেই ঘড়িটা নিয়ে বসে গেল ঠিক করতে। “এবার এটা পাল্টে নিন স্যার। এত পুরনো ঘড়ি, কদিন বাদে আর সারাই করাও যাবেনা। বেচলে বলুন, মোটামুটি ভালো দাম দেব।” “এই ঘড়ি দাদু এনেছিলেন লন্ডন থেকে। ওনার পরে বাবা পড়তেন, এখন আমি পড়ি। বোসেদের তিনপুরুষের দিনবদল দেখেছে এই ঘড়ি। তার কত দাম ধরবে করিম মিয়াঁ?” করিম এই সব বোঝেনা। ঘড়ির মেশিনে ফোঁটা ফোঁটা তেল ঢালতে ঢালতে আড় চোখে দেখে এই অদ্ভুত মানুষটাকে, যে মায়ার চোখে তাকিয়ে আছে ১০০ বছরের পুরনো ঘড়িটার দিকে।

 

(চলবে)

বিরূপাক্ষ কথা (দ্বিতীয় পর্ব)

আগের পর্ব

বিরূপাক্ষ কথা #৬

ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে একটা ভালো চাকরি পেয়েছিলেন বিরূপাক্ষ বাবু। শত হোক, শিবপুর কলেজের সেরা ছাত্রদের মধ্যে একজন। যাওয়ার সব ঠিক, হঠাৎ বেঁকে বসলেন বিরূপাক্ষ। যে শহরের অলি গলি ওনার নিজের, যে শহরের প্রত্যেকটা মানুষ কোথাও না কোথাও গিয়ে তার নিজের লোক, সেই শহর ছেড়ে যাওয়া যায় নাকি?

বছর পনেরো পরে, বিদেশে সেটল করা বন্ধুদের সাথে স্কচ খেতে খেতে বিরূপাক্ষ বাবু বলে ওঠেন,

“এই শহরটার বড় মায়া গো। যেতে চাই, কিন্তু যেতে দেয়না। আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে রেখেছে মায়ের আঁচলের মতো।”

 

বিরূপাক্ষ কথা  #৭

পেল্লাই পরিবারটা ছোট হতে হতে যখন দুটো ৩ কামরার ফ্ল্যাটে এসে ঠেকলো, বিরূপাক্ষ বাবুর মন খারাপ বেড়ে চললো। কতগুলো মানুষ ফটো ফ্রেমে আটকা পড়ে গেল, শুকনো মালা ঝুলে রইলো জং ধরা পেরেকে। মাঝে মাঝেই পুরোনো কলকাতায় নিজেদের পুরোনো বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন উনি। এখানেই তো কত হাসি শোনা যেত একসময়। এখন পায়রার গুমরানো শোনা যায় কান পাতলে। শ্যাওলা ধরা ফলকে নামটা আর পড়া যায়না। মুচকি হেঁসে ফিরে আসেন বিরূপাক্ষ বাবু। অস্ফুটে বলে ওঠেন “ভালো থেকো”।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৮

বাপের চাপে বিয়ে করেছিলেন ঠিকই, এক ছেলের বাপ ও হয়েছিলেন, কিন্তু মনের মিল হয়নি বিরূপাক্ষ বাবুর। বউ কবিতা পড়েনা, গানেও বিশেষ রুচি নেই। সন্ধ্যে হতেই টিভি চ্যানেলে গুচ্ছের বাজে সিরিয়াল দেখে। ঘর আলাদা অনেকদিন ধরেই, কাছেও বিশেষ আসা হয়না। অফিস থেকে ফিরে আলমারি খুলে একটা পুরোনো হয়ে যাওয়া রুমাল বার করে প্রানভরে ঘ্রাণ নেন বিরূপাক্ষ বাবু। খোঁজেন সেই অতিপরিচিত ল্য অরিগান পারফিউমের গন্ধ। প্লাইউড আর ন্যাপথলিনের গন্ধ ওনার মন আরো খারাপ করে দেয়। বসার ঘর থেকে ভেসে আসে টিভির শব্দ। উঠে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। রুমালটা ঠিক জায়গাতে রেখে জানলা খুলে বাইরে তাকান।
“তোমার পারফিউমের গন্ধে আমার মন খারাপ কেটে যায়।”
এক বৃষ্টির দুপুরে বলা কয়েকটা কথা মনে পড়ে যায়।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৯

প্রথমে রাঙাদাদুর ল্যান্ডমাস্টার, পরে বাবার কালো ফিয়াট চালাতো বুয়া কাকা। মোটা গোঁফ, আর বিশাল একটা ভুঁড়ি, বুয়া কাকাকে দেখেই ভয় লাগতো ছোট বিরূপাক্ষর। সেই বুয়া কাকার কাছে গাড়ি চালানোর হাতেখড়ি। বিরাট ভুঁড়ির ওপর বসে, স্টিয়ারিং ধরে নিজেকে বড় ভাবতে ভাবতেই একদিন সব পাল্টে গেল। একে একে বিক্রি হয়ে গেলো ল্যান্ডমাস্টার, কালো ফিয়াট। এর সাথে কোথাও একটা চলে গেল বুয়া কাকা।
সেই বুয়া কাকা কে বাসস্ট্যান্ডে ভিক্ষে করতে দেখে এগিয়ে গেলেন বিরূপাক্ষ বাবু। সময় বড্ড নিষ্ঠুর। গিয়ে পা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “চিনতে পারলে বুয়া কাকা? আমি বিরু, বোস বাড়ির বিরু”।
চোখ বেয়ে নেমে আসা জল বলে দিলো বুয়াকাকা কিছুই ভোলেননি। কাকার হাত ধরে রাস্তা পার করে নিয়ে এলেন অন্যদিকে। একজন কে দেবেন বলে হাজার দশেক টাকা তুলেছিলেন, সেটা পকেটেই ছিল। খামটা বার করে বুয়া কাকার হাতে তুলে দিলেন।
“প্রতি মাসে তোমাকে আমি টাকা দিয়ে যাবো। তুমি আর কারোর কাছে হাত পাতবেনা। না বোলোনা, আমি শুনবনা।”
ভেজা চোখে বুয়া কাকা তাকিয়ে রইলেন সেই ছোট্ট বিরুর দিকে, হাত দিয়ে চেপে ধরলেন ওর হাত, যে ভাবে একদিন স্টিয়ারিং ধরতে শিখিয়েছিলেন।
“বড় হয়ে গেলি বিরু।”
“তুমি বুড়ো হয়ে গেলে কাকা।”
যে গাড়ি সোজা রাখতে শিখিয়েছিল, তার হাত ধরে আজ বাড়ি পৌঁছে দিতে দিতে বিরূপাক্ষ বাবু মনে মনে ছেলেবেলাতে ঘুরে এলেন।

 

বিরূপাক্ষ কথা  #১০

এক অলস বিকেলে কলেজ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরোনো বইয়ের দোকান খুঁজছিলেন বিরূপাক্ষ বাবু। রহমতের ওই দোকান থেকে একসময় অনেক দুষ্প্রাপ্য বই কিনেছেন তিনি। সময়ের অভাবে অনেকদিন আসা হয়নি। ঘন্টাখানেক খুঁজেও সেই দোকানটা দেখতে পেলেন না। একজন কে জিজ্ঞেস করতে সে অবাক মুখে বললো ওখানে কোনোদিনও ওরকম কোনো দোকান ছিলনা। রেগে বিরূপাক্ষ বলে উঠলেন, ধুর মশাই, বছর কয়েক আগেও আমি ওই দোকান থেকে বই কিনেছি, ছিলনা বললেই হবে? সেই লোকটি বলে উঠলো, ৫০ বছর এই তল্লাটে ব্যবসা করছি, ওরকম কোনো দোকান কস্মিনকালেও দেখিনি… রহমত বলে কোনো দোকানি এখানে নেই। আরো দু একজন ওর কথায় সায় দিলো। একটু অবাক হয়ে বাড়ি ফিরে, বইয়ের তাকে খুঁজলেন সেই সব বই যা তিনি রহমতের দোকান থেকে কিনেছিলেন। কোথাও কিছু নেই। শুধু একটা তাকে উইয়ে খাওয়া কিছু পাতা পড়ে আছে। হলদে হয়ে যাওয়া কিছু পাতা। হাতে ধরতেই গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

 

(চলবে)

ছায়া ছবির সঙ্গী (৯)

13046098_1239062649454718_938753217_n

বলেছিলাম কারিগরি কথা লিখব না। কিন্তু দেখলেন তো সেই কথাই এসে গেল। আসলে আমাদের কাজটা এতটাই কারিগরি নির্ভর যে একে বাদ দিয়ে, আমাদের আর অস্তিত্ব কোথায়?

১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালের কাজ শুরু হল। আমাদের কাজ শুরু মানে তো সলতে পাকানো থেকে। স্ক্রিপ্ট তৈরী করা। তার থেকে লোকেশন তালিকা, চরিত্র তালিকা তৈরী করা। চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা অভিনেত্রী বাছাই করা। ঘুরে ঘুরে কোথায় কোথায় শুটিং করা যেতে পারে বা আমাদের গল্প অনুযায়ী খাপ খাওয়ানো যেতে পারে, সেসব জায়গা নির্ধারণ করা। পোষাক পরিকল্পনা করা। আরো আরো কত কাজ।

এসব কাজে আনন্দ পেতাম। ভালোবেসে করতাম। কোনোদিন ক্লান্তি বোধ করিনি। নিজে নিজে অনেক উপায় উদ্ভাবন করতাম, কি করে কতটা সহজ করে করা যায় কাজটা। এমন একটা লিস্টি বানাতে হবে যেটা সব কলাকুশলীদের সামনে থাকবে এবং তারা এক চোখ বুলিয়েই সব কাজটা বুঝে নিতে পারবে। আমার সব সময় চেষ্টা থাকত এমন সব কিছু করার।

‘অপূর্ণ’ ছবির পোষাকের তালিকা তৈরী করেছিলাম, বিভিন্ন রঙের ব্যবহারে। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারত, কোন চরিত্র, কখন, কোন পোষাক পরবে এবং কোথায় তার পোষাক পরিবর্তীত হবে। দেবকুমার দা এবং দেব দত্ত দা দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন এবং আমাকে বাহবা দিয়েছিলেন। বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, ওঁনাদের উৎসাহ পেয়েছিলাম বলেই, আরও নতুন কিছু করার তাগিদ থাকত সব সময়।

এই রঙের কোড ব্যবহার এখন হয়ত নতুনত্ব কিছু নয়। কিন্তু ছাব্বিশ বছর আগে এইভাবে কেউ ভেবে দেখেনি বা করেনি। এমন অনেক তালিকাই তখন আমার উদ্ভাবনি চিন্তা দিয়ে তৈরী করেছিলাম, যা পরবর্তী কাজেও ব্যবহার করেছি। সেগুলির নমুনা দেখাতে পারলে বোঝানো সম্ভব হত। এখানে তার উপায় নেই।

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়’এর যে গল্প থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালটি তৈরী হয়, তার নাম ‘গনশার বিয়ে’। এই গল্প থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘বর যাত্রী’ হয়ে গেছে অনেকদিন। সেই চলচ্ছবি থেকেই উঠে এসেছিলেন পরবর্তী সময়ের নামী অভিনেতা কালী ব্যানার্জী। শোনা যায়, ওঁনার কথা আটকে যাওয়ার যে ঝোঁক, সেটা ওই গনশার চরিত্র করার সময় থেকেই তার সঙ্গে থেকে যায়। কারণ গনশা ছিল তোতলা।

আমাদের গনশা হল শঙ্কর চক্রবর্তী। অসাধারণ অভিনয় করে সবার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল সে। তার সঙ্গে এই জগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে বরাবরের মত, ঐ অভিনয় থেকেই। এই ধারাবাহিক এ শঙ্করের মত অনেকেই প্রথম অভিনয় করতে আসেন। পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অপরিহার্য হয়ে যান তাঁরা সকলেই। শুভাশিষ মুখার্জী, রাহুল বর্মন, জয় বাদলানী, দীপন তপাদার, রঞ্জন ব্যানার্জী। দীপন পরে দেবকুমার দা’র পরিচালনায় একটি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। কিন্তু সেই ছবিতে তার যে নায়িকা ছিল তাকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে, দুজনেই এ জগত থেকে সরে গেছে। আমার প্রথম কাজের সঙ্গে এঁদেরও যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বিবাহ অভিযান’ তাই এদের সাথে আত্মীক যোগাযোগটা আজও রয়ে গেছে।

প্রথম পর্বের শুটিং শুরু হল জয়নগর মজিলপুর এ। জায়গাটার নাম যে একসাথে জয়নগর মজিলপুর, ওখানে গিয়ে জানলাম। যেখানকার মোয়া সর্বজনবিদিত। এর পরের ক’দিন সকাল সন্ধ্যে প্রাতঃরাশ আর সন্ধ্যের জলখাবারে মোয়া খেতে খেতে অত্যিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম।

১৯৯০ এর ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা সদলবলে সেখানে গিয়ে তাঁবু গাড়লাম। তাঁবু গাড়াই প্রায়। এখন কেমন বলতে পারব না। তবে তখন ওখানে থাকার মত কোনো হোটেল ছিলনা। বিভিন্ন লোকের বাড়িতে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতাম। এক বাড়ির যে ঘরে দেবকুমার দা’র থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানেই আশ্রয় মিলেছিল আমার আর আমার এক সহকর্মীর।

তখন আবহাওয়ার এত অবনতি হয়নি। খুব ঠান্ডা পড়ত শহরে। আর জয়নগর তো শহর থেকে অনেক দূরে। বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। দেবকুমার দা শুতেন একটা তক্তাপোষে। আর আমরা দুজন শুতাম মাটিতে। মোটা করে খড় বিছিয়ে তার ওপর চাদর পেতে। ঘরে আলো নিভে যাবার পরেও আমাদের আলোচনা চলত। যেমন আজকের কাজে কি কি ভুল হল না হল না, কাল কি হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেটা আমার শিক্ষানবিশীর, মণি মুক্তো কুড়িয়ে নেবার সময়। সে সময়গুলো কোনোদিন ভোলা যাবে না। কথাবার্তা চলতে চলতেই কখন যে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসত, টের পেতাম না।

ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (৮)

আগের পর্ব


কারিগরি কচকচানি অনেক হ’ল। আর ওসব আলাদা করে লিখব না। যখন যেমনভাবে সামনে আসবে, আলোচনা করা যাবে তখন। বরং কাজের কথা বলতে বলতে কাজের বাইরের কথা কথা কিছু বলি। কাজের বাইরের বলে উল্লেখ করলাম বটে কিন্তু এই অকাজ-গুলো আমাদের কাজের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আলাদা করাই মুশকিল। সত্যি কথা বলতে, এসব মুহূর্তই আমাদের কষ্ট ভুলিয়ে আনন্দময় করে রেখেছে আমাদের কর্মজীবন এবং তা কোনো কোনো সময় যথেষ্ঠ রঙীন।

আগেই বলেছি ‘অপূর্ণ’ আমার কাজ করা প্রথম চলচ্ছবি। শুধু তাই নয়, আমার কাজ শেখার শুরুও তো সেখান থেকেই। অপূর্ণ’র ডাবিং এর সময়ের একটা মজার ঘটনা বলি। ছবিতে এমন অনেক ছোটখাট চরিত্র থাকে, যাদের উপস্থিতি অনেক থাকলেও, কথা বার্তা হয়ত বিশেষ নেই বা থাকলেও অনেক নয়। যেমন ধরা যাক, বাড়ির কাজের লোক এসে বলল, দিদি আপনাকে বড়মা ডাকছেন। বলেই সে চলে গেল। এখন এই কথাটুকু ডাব করতে হবে তো? অতএব সেই অভিনেতাকে এই টুকু বলাবার জন্য কষ্ট দিয়ে না ডেকে আমরাই কেউ বলে দিতাম।

সেলুলয়েড জমানায় আমার মনে হয় প্রায় সব সহকারীকেই কোনো না কোনো ছবিতে এমন ডাবিং করতে হয়েছে। তবে সমস্ত ছবি জুড়ে থাকা চরিত্রের মুখেও যে আমাদের কেউ কেউ কথা বসিয়েছে, এমন ঘটনাও অনেক আছে।

এই ডাবিং নিয়ে নানান লোকের নানান অভিমত। হলিউডে অনেকদিন আগেই হত, এখন আমাদের ছবিতেও হচ্ছে, সিঙ্ক সাউন্ড। অর্থাৎ শুটিং চলাকালীন শব্দটাই মূল ছবিতে থাকছে। হয়ত কিছু আধুনিক কারিগরী দিয়ে তাকে আরো সুন্দর করা, এই টুকুই। কোনো কোনো পরিচালক, অভিনেতা বিশ্বাস করেন, অভিনয়ের সময় বলাটাই ঠিক বলা হয় বা ঠিক বলতে পারা যায়। বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতে তা ভুল নয়। যদি কোনো দুই চরিত্র জগিং করতে করতে কথা বলছেন, কি দুজনের মধ্যে বচসা হচ্ছে, হাতাহাতি হচ্ছে এবং কথা বিনিময় চলছে, সেখানে এমন শব্দগ্রহন খুবই কার্যকরী। তবে ভালো অভিনেতারা এতটাই পটু যে তারা স্টুডিওতে বসে অভিনয়ের সময়ের ভাব রেখেই অভিনয় সহযোগে ডাবিং করতে পারেন।

আবার অন্য মতে , শুটিং এর সময় কোনো ত্রুটি থাকলে, তা শুধরে নেবার এক উৎকৃষ্ট পদ্ধতি এই ডাবিং। একটা বাক্যকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কতরকমভাবে বলা যায়। স্টুডিওয় বসে সেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকে। তবে এ কথাও ঠিক যে, যে শব্দ ঠোঁটে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো বলতেই হবে। পাঠক লক্ষ্য করুন আমি ‘দেখা যাচ্ছে’ কথাটা ব্যবহার করেছি। অর্থাৎ যেখানে চরিত্রের ঠোঁট দেখা যাচ্ছে না, সেখানে আমি অন্য কথাও বসাতে পারি। ঠোঁট দেখা যাচ্ছে এমন জায়গাতেও অন্য শব্দ বসানো যায়। যেমন ধরুন বলেছে, বাপ। আমি সেখানে বসাতে পারি, মাপ, খাপ, লাফ, টাফ এমন অজশ্র শব্দ, যা কিনা ওই ঠোঁট নাড়ার সঙ্গে মিলে যায়। তা অবশ্যই গল্প, চরিত্র, চিত্রনাট্যকে মাথায় রেখেই করতে হবে।

শুটিং এর পরে, সম্পাদনা করতে বসে যদি কোনো পরিচালকের মনে হয়, ইস্‌ এই চরিত্রের মুখে, এই দৃশ্যে ওই কথাটা যদি বলানো যেতো, ভালো হতো। ডাবিং এ সে সুযোগ আছে। তবে ওই যে বললাম, ঠোঁট না দেখিয়ে ব্যাপারটা করতে হবে এবং সেটার জন্যেও বেশ মুন্সিয়ানার প্রয়োজন। কথায় কথায় অন্য একটা কথা উঠে এলো, সেটা নিয়ে একটু বলি। এই যে সম্পাদনার সময় পরিচালকের মনে হল চরিত্রের মুখে অন্য কথা বসাবার কথা, এর পথ প্রদর্শক কিন্তু সম্পাদনা। সম্পাদনা অনেক নতুন পথের সন্ধান দেয়, অনেক নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটায়। এটা একটা অন্যতম কারণ, যে কারণে সম্পাদনাকে দ্বিতীয় পরিচালনা বলা হয়।

আমাদের সব কাজটাই আপাত দৃষ্টিতে খুব সহজ, সোজা মনে হয়। আসলে তা নয়। প্রত্যেকটি কাজের জন্যে বিভিন্ন রকমের কাজ জানা মানুষ এতে নিযুক্ত আছেন। তাদের কাজটা শিখে প্রস্তুত হতে হয়েছে। প্রথমে তিনটে ছবিতে আমাদের অবজার্ভার থাকতে হয়। এই সময় কাজের মধ্যে থেকে কাজটা বোঝা, শেখা। তারপর আমি কার্ড পাবার যোগ্য বলে গণ্য করা হয়। এরপরের ধাপ, পরীক্ষা, ইন্টারভিউ।

মজার কথা আমার প্রথম অবজার্ভার কার্ড পাই চিত্রগ্রাহক হিসেবে। সৌমেন্দু রায় এর হস্তাক্ষর সম্বলিত সেই কার্ড এখনও আমার কাছে আছে। টালিগঞ্জ চলচ্চিত্র জগতে আমার প্রথম পদার্পন হয়েছিল, ক্যামেরা ডিপার্টমেন্টেই, চিত্রগ্রাহক শঙ্কর ব্যানার্জীর হাত ধরে। শঙ্কর দা তখন অনেক কাজ করতেন। শঙ্কর দা আমাকে তাঁর নিজের ঝুলি থেকে অনেক বই দিয়েছিলেন পড়তে। সবগুলিই ক্যামেরা ও ফোটোগ্রাফি সংক্রান্ত। সেসব বই আমাকে অবশ্যই সমৃদ্ধ করেছে, কোনো সন্দেহ নেই। শঙ্কর দা’র স্নেহ ভুলব না।

আমাকেও লিখিত পরীক্ষা দিয়ে, ইন্টারভিউ এর সম্মুখীন হয়ে সে কার্ড অর্জন করতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমি পরিচালনা বিভাগে চলে আসি যেহেতু ছবি পরিচালনা আমায় বেশি টানত বলে। এখন খুব অনুশোচনা হয়, তখন যদি কেউ ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে বলত, চিত্রগ্রাহক হয়েও ছবি পরিচালনা করা যায়, তাহলে হয়ত আমি বিভাগ পরিবর্তন করতাম না। বর্তমানে গোবিন্দ নিহালিনী, সন্তোষ শিবন সহ আরো অনেক সফল চিত্রগ্রাহক-পরিচালক আছেন। আমাদের এখানেই দু’জন চিত্রগ্রাহকের নাম মনে পড়ছে, যাঁরা ছবি পরিচালনা করেছেন। এক, অভীক মুখোপাধ্যায়, দুই, সৌমিক হালদার। অভীক এর ছবি ‘একটি তারার খোঁজে’ তে আমার সহকারী হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।

কোন কথা বলতে গিয়ে কোন কথায় চলে গেলাম দেখুন। তো সেই অপূর্ণ’র ডাবিং এর সময়, দেবকুমার দা আমায় বললেন, রানা, তুমি ড্রাইভারের ভয়েসটা ডাব করে দাও। দৃশ্যটা ছিল সে এসে একটা প্যাকেট মত কিছু মনিবকে দিয়ে, একটা কথা বলে চলে যায়। প্রথমে ভয় পেলেও, আমার তো তখন চলচ্চিত্রের সব শেখার দারুন আগ্রহ। সব কিছু করার সুযোগ পেয়েছিলাম বলেও হয়তো সব কিছু শিখতে পেরেছি, এটাও সত্যি।

দাঁড়িয়ে পড়লাম মাইকের সামনে। কানে হেড ফোন, সামনে ঝুলে আছে মাইক। আধো আলো আধো অন্ধকার ঘর। ঘেরাটপের মধ্যে আমি। সামনে বড় স্ক্রিনে চলছে ছবি। প্রথম দু’তিন বার তো বোঝবার আগেই পেড়িয়ে গেল জায়গাটা। সেদিন টিটো দা মানে দীপঙ্কর দে উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তিনি কয়েকটা টিপস দিলেন, কিভাবে দৃশ্যের অন্য চরিত্রদের অঙ্গভঙ্গী খেয়াল করেও ঠিক জায়গাটার হদিস রাখা যায়, বলে দিলেন। অবশেষে আমার ডাবিং সম্পন্ন হল। আজকাল ডাবিং আরো সহজ হয়ে গেছে। যা বলা হয়েছে শুনে, আগে, পড়ে বলে দিলেই হল। শব্দগ্রাহক ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেবেন।

ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার পর, টিটো দা আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, কি, রানা, কোনটা সহজ মনে হচ্ছে, পরিচালনাটা না অভিনয়টা? উপস্থিত সকলেই হেসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আজ বুঝি উনি বলতে চেয়েছিলেন, কোনো কাজটাই সহজ নয়। যে কথাটা আমি একটু আগে উল্লেখ করেছি, কাজের মুন্সিয়ানা আনতে অধ্যাবসায়ের কোন বিকল্প নেই।

প্রবাসীর ডায়েরি ৪

                                                                     “ভিন্ডি” – “সায়েরি” – “জোড়ি”

আজ আমি অসম্ভব উত্তেজিত। এত এত কথা বলার আছে যে গুছিয়ে সাজিয়ে উঠতে পারছি না। কাকে আগে কাকে পরে রাখবো ভাবতে ভাবতে দিশেহারা অবস্থা।

আর বিলম্ব নয়। ‘জয় জয় নির্মলার জয়’ বলে শুরুই করে দি। নির্মলা আর আমার দুজনেরই অজান্তে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে নির্মলা-কাব্য। আমাকে যে ও খেরোর খাতা হিসেবে দেখে তাতে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু, ও এখনো পর্যন্ত জানে না, যে কেউ আড়ালে আড়ালে ওর দৈনিক সংবাদ লিপিবদ্ধ করার ভার নিয়েছে, বিনা পারিশ্রমিকে। নির্মলার রোজ কাজে আসায় আমি অভ্যস্ত। কিন্তু ও কোন দিন কী প্রসঙ্গে কথা বলবে বা আদৌ বলবে কি না তার বোতাম আমাদের দুজনের কারুর হাতেই নেই। কোন বড় মাপের যন্ত্রীর তত্ত্বাবধানেই এই খেলা সম্ভব। তাই অকারণ জোর খাটানোর প্রশ্নই ওঠে না।

প্রথম অধ্যায় : ভিন্ডি

আমার এক বন্ধুর বাড়িতে তিন চার দিন হল এক বেলার রান্নার কাজে লেগেছে। গত পরশু ভিন্ডির সব্জি বানিয়ে ওদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আমার বন্ধুটির নাকি ভিন্ডি রান্নার গন্ধেই খিদে পেয়ে যায়। বুঝলাম, ভালো রান্না করার প্রশংসা এত অল্প সময়ের মধ্যে হাসিল করায় ও বেশ খুশী। তাও আবার অন্য প্রদেশের লোকের মুখ থেকে। কথাটা গতকালও শুনেছিলাম। আজ আবার শুনে আমারও ‘ভুক্’ লেগে গেল। গতকাল খুব কষ্টে রেসিপি জানার লোভ সামলেছিলাম। হাজার হোক প্রফেশনাল সিক্রেসি থাকতেই পারে। আজ আর পারলাম না। জোয়ান আর পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে টমেটো আর ভিন্ডি বানিয়েছিল। কিন্তু আরো একটা কিছু দিয়েছিল যেটা ওর মনে পড়ছে না। আমি জোর করিনি। কিছুটা হলেও ওর সিক্রেসি ওর অজান্তে রাখতে পারায়, আমি আত্মগ্লানির হাত থেকে মুক্তি পেলাম। সাধে বলি, বোতামের অস্তিত্বের কথা।

দ্বিতীয় অধ্যায় : সায়েরি

ওর গল্প বলার একটা স্বচ্ছ স্নিগ্ধ ধরণ আছে। তারিফ করায় জানা গেল যে কারোর ‘নলেজে’ যদি কোন কিছু  বসে যায় তাহলে তা বলতে কোন অসুবিধে হয় না। কিন্তু, যদি তা না হয় তাহলে মানুষকে দৌড়দৌড়ি করতে নানান রকম খাপছাড়া ঘটনার মধ্যে। ফলে, ‘কিস্সা’ বলতে অসুবিধে হয়। যেন, নলেজ ওর চোখে বিশাল বড় মাপের বাগান বিশেষ। আর কথারা হল সেই বাগানে খেলতে আসা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। কোন বিশেষ কারণে তারা বাগানের এক জায়গায় জড়ো হলেই গল্প তৈরী হতে থাকে।

বললাম , “তোমার বাচ্চাদের গল্প শোনাও?” জানালো, ঘুমোতে যাওয়ার সময় কিস্সা শুনতে ছানারা বেশ ভালবাসে। “কী ধরনের কিস্সা শোনাও – রাজা রাণীর গল্প?” মূলতঃ, যা ওর বাবা- মা-চাচা-চাচী-দাদা-দাদীর কাছ থেকে শুনে এসেছে, তাই বলে থাকে। এছাড়া নাকি সায়েরিও বলে। বললাম, দু একটা শোনাও। দু একটা লাইনেই শেষ এমন সায়েরি শোনার পর বুঝলাম যে ও ধাঁধাঁর কথা বলছে। ঠিক করলাম লিখে নি বরং। লেখার কথা বলতেই সাথে সাথে ঘর মোছার ন্যাতাকে তাচ্ছিল্যের সাথে ফেলে দেয়। ৪ ফুট ৭ ইঞ্চির ৪০ কেজি ওজনের শরীরটা জানালার পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে নিজেকে  ধপ করে ছেড়ে দেয়। দুই হাতলে দুই হাত রেখে বললো, “ঠিক হ্যায়, তো ফির লিখো”।

বগায়ের চ-খাটকে দরওয়াজা বন্ধ্  রহতা হ্যায়। বোলো কেয়া হ্যায়? .. হোঁট্। কথা বলার সময়ই তো ঠোঁট খোলে। আর চৌকাঠেরও কোন বালাই নেই। মনে পরে গেল দেশের বাড়ি আর কালিঘাটের একান্নবর্তী পরিবারে কাটানো বাড়িগুলোর কথা। ফ্ল্যাট বাড়িতে চৌকাঠ কোথায়, সবই ফ্ল্যাট।

ইধার সে গেয়া, উধার সে আয়া। বোলো কেয়া হ্যায়? … নজর। ভাবলাম, অনেক কিছুই তো হতে পারে। আমি কোন তর্কাতর্কির মধ্যে যাইনি।

মুঠঠি মে আতা হ্যায়, পর কুঠিয়া মে নেহি আতা। বোলো কেয়া হ্যায়?  ভাবলাম, মুঠঠি সমেত তো আমি নিজেই কুঠিয়ায় ঢুকে যাবো। কী রে বাবা! … ছাতা। জানলাম, কুঠিয়া মানে আনাজপত্র রাখার জন্য পাতলা লাহার পাত দিয়ে তৈরি ছোট দরজা ওয়ালা ঘর। অনেকটা ধানের গোলার ধরনের।

সব লোক বাজার গ্যায়ে পর মটুয়া নেহি গেয়ে। বোলো কেয়া? মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই মটুয়া রোগা হওয়ার ধান্দায় ছিল। … কুঠিয়া। কুঠিয়া প্রচুর আনাজ খেয়ে এত মোটা হয়ে গেছে, যে বেচারার নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই।

আমারই ঘরে বসে আমাকে হারতে দেখে নির্মলার মনে হয় ভালো লাগছিল না। অকপটে স্বীকার করে নিল যে প্রশ্নগুলো আমার জন্য একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। “ঠিক হ্যায় দিদি থোড়া সিম্পল্ সা সওয়াল করতি হুঁ।”

১০০ বিঘা জমিন। উসকে উপর গাউঠা জায়সা কুছ হ্যায়। বোলো কেয়া? অনেক পরিশ্রমের পর জানা গেল গউঠা মানে ঘুঁটে। যথারীতি আকাশ কুসুম ভেবেও এই ‘সিম্পল্ সা’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। … সূর্য্য। কীরকম জিজ্ঞেস করায়, বললো একশো বিঘা জমি অনেক অনেক বড় হয়। তার মধ্যে সূর্য্যই তো দেখা যায়! বললাম, সূর্য্য তো আকাশে। ওর পাল্টা উত্তর, “কিন্তু আকাশে বললে তো সবাই একবারেই বুঝে যাবে।” একমাত্র  হযবরল শাস্ত্রেই এর ব্যাখ্যা মিলতে পারে।

পরে ভাবলাম, ঠিকই আছে। আকাশ কোথায় শুরু আর ‘জমিন’ কোথায় শেষ এর উত্তর তো কারুর কাছেই নেই। তাই, গোটাটাই একটা বড় ‘জমিন’ ধরে নিলেই সব সমস্যার সমাধান। কিছুটা সবুজ, কিছুটা নীল। কিছুটা নিচে কিছুটা ওপরে। হযবরল ভাবে আছে।

তৃতীয় অধ্যায় : জোড়ি

এবার তৃতীয় এবং শেষ অধ্যায়। … “ওয়ো পতা নেহি দিদি। মুঝে তো সিরফ্ ইয়ে মালুম হ্যায় কে হামারে ইধার যব্ দিন হো তা হ্যায়, আমরিকা ম্যায় তব রাত হোতি হ্যায়।” কী মনে হল ওকে বললাম নিজের চারদিকে ঘুরতে। আর আমি নিজের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে ওর চারদিকে ঘুরতে থাকলাম। ন্যাতা নির্বাক দর্শক। নির্মলা চোখ বড় বড় করে মুখ হাঁ করে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতেই ওকে ভাঙ্গাচোরা হিন্দিতে দিন রাতের ‘কিসসা’ শোনাই। চাঁদের চরিত্রে অবশ্য কাউকে পাওয়া যায়নি। ওর চোখ মুখে বিস্ময়ের শেষ নেই। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অবাক হয়ে বললো, এত সব কথা ওর জানাই ছিল না। ওর বাবা মাও ওকে জানায়নি। এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে ন্যাতাকে নিতে গিয়ে হঠাৎ করে বলে বসলো “উপরওয়ালা কা হিসাব্ সহি হ্যায়, দিদি।” জানতে চাইলাম কীরকম হিসেব?

যদি ‘হরওয়াক্ত’ দিনই থাকতো তাহলে ‘আদমি’ কাজ করতে করতে পাগল হয়ে যেত। পৃথিবীর অন্যদিকে, রাতের লোকেরা ঘুমোতে ঘুমোতে ‘ভুকে পেয়াসে’ই মরে যেত। তাই ওর মতে ভগবানের হিসেবে কোন গরমিল নেই। ভগবান তাই পিঁপড়ে থেকে শুরু করে সব কিছুরই ‘জোড়ি’ বানিয়েছে দিন রাতের মতো।

আমি বাকরূদ্ধ।

পূর্ণা
১৯/০৮/২০১৫
গ্রেটার নয়ডা।

অমল মহিমা লয়ে তুমি এলে- ২

স্কুলের ছুটি পড়ে যেতো মোটামুটি তৃতীয়া কি চতুর্থীর দিন থেকেই। একমাস ছুটির পরেই থাকতো অ্যানুয়াল পরীক্ষা, কিন্তু দুর্গাপুজো শেষ না-হওয়া পর্যন্ত ভুলেও আমরা পড়ার বইয়ের ধারেকাছে
ঘেঁষতাম না। পুজোর কেনাকাটা সারতে আমরা কলকাতার দিকে গেলেও ঠাকুর দেখার সময় কিন্তু নিজেদের এলাকাটা চষে বেড়াতেই পছন্দ করতাম। শহরতলীর মাইল দশেক জায়গা জুড়ে হয়ে থাকা ঠাকুরের সংখ্যা নেহাৎ কমকিছু  ছিলো না। বনেদী বাড়ির পুজো, প্যান্ডেলের পুজো মিলিয়ে গোটাদশেক দেবীপ্রতিমা দর্শন করতেই কেমন করে যেন সময় ফুরিয়ে যেতো। পুজোর নতুন জুতোর দেওয়া পুজোর ফোস্কা পায়ে নিয়ে সপ্তমী-অষ্টমী খুঁড়িয়ে, নবমী থেকে আবার পুরনো জুতো সম্বল করেই মাইলের পর মাইল হেঁটে ঠাকুর দেখা শেষ হয়েও যেন ঠিক শেষ হতোনা। সকাল হতে না-হতেই নাকেমুখে কিছু গুঁজে প্যান্ডেলে চলে যাওয়া, বাড়ি ফিরতে ফিরতে হয়ে যেতো প্রায় মাঝরাত।

Kunal 2

ঠাকুর দেখা মানে তো শুধু ঠাকুরের কাছে যাওয়াই নয় – কে কিরকম সেজেগুজে বেরিয়েছে, পরিচিত-স্বল্পপরিচিত সমবয়সী সুন্দরী মেয়েদের দিকে ইতিউতি তাকানো, একটু হাসি, একটু ইশারা, একটু মান-অভিমান, একটু আশা-দু:সাহস – মানে  চটপট প্রেমিক-প্রেমিকা বেছে নেবার মতো এরকম সুলভ সুযোগ বছরে আর দুটো আসতো না। রঙিন ফ্রক আর শাড়ির দল, সামান্য স্নো-পাউডারের প্রসাধনীতে হঠাৎ করেই প্রজাপতির মতো সুন্দরী হয়ে ওঠা মেয়েরা চোখে যেন সম্মোহনের মায়াজাল বুনে দিয়ে যেতো। মোটামুটি সপ্তমীর সকালের মধ্যেই আমাদের পছন্দের লিস্ট কমপ্লিট হয়ে যেতো – তারপরেই শুরু হয়ে যেতো পুজোর প্রেম। সেই প্রেম চলতো টানা কালীপুজো পর্যন্ত। অষ্টমীর অঞ্জলিতে প্যান্ডেলে হয়ে চলা আরতির সময় হাত জোড় হয়ে থাকতো দশভূজা দেবীর দিকে, কিন্তু মুন্ডু আপনা-আপনিই ঘুরে যেতো দ্বিভূজা চিন্ময়ীদের দিকে। কান্ড দেখে দেবী প্রতিমার মুখ হাসিতে ভরে উঠলেও কেন যে সেই মাটির প্রতিমা সজীব হয়ে সে’দিন দশহাতে আমার কানমূলে দিয়ে যাননি তা ভেবে আজ নিজের মনেই আক্ষেপ জাগে!!  রাতের প্রতিমা দর্শনের ফাঁকে ফাঁকে চলতো রাস্তার ধারে ভূঁইফোঁড়ের মত গজিয়ে ওঠা মেক-শিফ্ট স্টলগুলোতে অনবরত: খাওয়া-দাওয়ার পালা। ভীড়ের মধ্যে রীতিমত লড়াই করে ঘুগনি-ফুচকা-আলুকাবলি-এগরোল খতম করার পর থামস-আপের বোতলের শেষ বিন্দুটুকু পর্যন্ত গলায় ঢেলে ‘হেউ’ করে একটা বিকট শব্দে ঢেঁকুর তোলার মধ্যে কি যেন এক অনাস্বাদিত আনন্দ লুকিয়ে থাকতো, যার দেখা বছরের অন্য কোনো সময়ে মিলতো না।

দেখতে দেখতেই চলে আসতো দশমী – বিসর্জনের সময়, ঢাকের কাঠিতে বেজে উঠতো বিদায়ের বোল। বুকের ভিতর চলতো উথাল-পাতাল, আবেগের তোলপাড় – মা যে চলে যাচ্ছেন। চোখ ভেঙে নেমে আসতো জল, অভিমানও হতো খুব। তবুও বড়দের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মায়ের চলে যাওয়াকে কান্নাভেজা চোখে দেখতে হতো। ঝড়ের মতো হঠাৎ করেই যে পুজো এসেছিলো, তার চেয়েও দ্রুত বেগে চলে যেতো সে, যেমনটি চিরকালই আসে আর যায়। নবমী নিশি যেন বড়ো দ্রুত অতিক্রান্ত হযে যেতো। অনেকদিন আগে এক আধুনিক কবি লিখেছিলেন —

             বোধনের ঢুলি বাজাবেই শেষে

                            বিসর্জনের বাজনা,

                     থাক থাক সে তো আজ না

                                  সে তো আজ নয়, আজ না…

কিন্তু থাক থাক করে কিছুই কি ধরে রাখা যায়? কিছুই কি ধরে রাখা যাবে? অবশেষে ঢাকের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যায়। শুন্য মন্ডপে সঙ্গীহীন ক্ষীণ প্রদীপশিখা স্মরণ করিয়ে দেয় গতদিনের উৎসব রজনীর কথা। বাতাসে হিমেল ভাব আরেকটু বেড়ে যায়, শরতের শেষ শেফালী ঝরে পড়ে অনাদরে ধুলোভরা রাস্তায়। পুরানো গৃহস্থ বাড়ির ছাদের শিখরে মিটমিটিয়ে জ্বলে ওঠে কোন সনাতন পৃথিবীর অমল আকাশ প্রদীপ…

* * *     * * *     * * *

শরতের সোনা-ঝরা রোদ আর উপচে পড়া খুশি নিয়ে ভরে থাকা আমার ছোট্টবেলার শরৎ আজ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে চলে গেছে আমার প্রিয় মানুষরা, সঙ্গে নিয়ে শরতের সবকটা সোনা-রোদ মাখা ছবি! সেই শরৎকে আর কখনোই খুঁজে পাবোনা – যা কিছু নেই, তার টুকরো টুকরো ছবি জুড়ে একটা অসম্পূর্ণ কোলাজ তৈরির চেষ্টা করে চলি মনে মনে। যদিও জানি এই কোলাজটা আর সম্পূর্ণ হবেনা কখনোই। দূর্গাপুজো আজ বিশ্বজুড়ে – সচিনকত্তার গাওয়া টাকডুম টাকডুমের ভাঙা ঢোলটা কোথাও তবু যেন একটানা বেজেই চলেছে মনে হয়।

আজ দেশ ছেড়ে, সাত-সমুদ্র তেরো-নদী পার হয়ে এই বিদেশে-বিঁভুইয়ে এসে, এতোটা কাল কাটিয়েও অনুভব করছি ছেলেবেলার সেই সব সোনা-ঝরা দিনগুলোর স্মৃতি ভোলা সহজ কথা নয়। আজন্মের বাড়ি, যেখানে জীবনের প্রথম আনন্দ, প্রথম দুঃখ, প্রথম পাপ আর প্রথম পূণ্যের অনুভব। যেখানে বেড়ে ওঠা, কিশোর থেকে যুবক হওয়া – অথচ কি যেন রহস্যময়, কি যেন নতুন – শিরশিরে, ভয় মেশানো গভীর আনন্দ – সেই জায়গার আকর্ষণ কাটানো মোটেও সহজ কথা নয়। সোনালী ফসলে ভরে থাকা দেশের মাঠ, ভোরের দোয়েল পাখির মিঠে শিস, বাড়ীর পাশে হয়ে থাকা ছোট্ট ফুলের গাছ, শালুক-শাপলার পাতায় বসে থাকা কৃষ্ণকালো ভ্রমর, বৃষ্টিভেজা কদমের অদম্য সুগন্ধ, রুপোলী জরির ফিনফিনে জ্যোৎস্নাভরা রাত, আকাশ ঝমঝম করা তারাদের একদৃষ্টে চেয়ে থাকা, মাঠ শেষের দিগন্তরেখাকে আবীর রাঙা আভায় ভরিয়ে সূর্যের অস্ত যাওয়া, কমলালেবুর গন্ধ-ভরা শীতদুপুরের রোদে পা-মেলে বসে থাকা, নিঝুম আঁধারে ঝোপঝাড়ে বেজে চলা ঝিঁঝিঁদের সম্মিলিত অর্কেস্ট্রা,  এই সবই কি আমাদের জীবনের সব চাইতে বড় পাওয়া নয় ?

অমল মহিমা লয়ে তুমি এলে- ১

ছোটবেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে স্মৃতিটা মনে ভেসে আসে  সেটা হলো, মাদুরের উপরে বাবু হয়ে বসে দুলে দুলে রবিঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ থেকে পড়ে চলা সেই কবিতাটা: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে‘ – তবে বৈশাখ মাসের থেকে শরৎ আর শীতকালের জন্যেই আমরা সবাই মুখিয়ে থাকতাম। শীতকাল মানেই স্কুলের Annual পরীক্ষা, সেটা কোনোমতে শেষ করে দিতে পারলেই স্বর্গলাভ – যথেচ্ছ খেলা-ধুলা, ঘুড়ি ওড়ানো, গল্পের বই পড়া, মামার বাড়ি যাওয়া, পিকনিক, আরো কত্তো কী! অন্যদিকে শরৎকাল মানেই দুর্গাপুজো। তা, পুজো তো প্রায় এসেই গেলো – দেখতে দেখতে আবার ঠিক চলেও যাবে। যাওয়া-আসার এই দোলনায় চেপে আমার ছেলেবেলাকার পুজোর দিনগুলো থেকে একটু ঘুরে আসতে ভারি ইচ্ছা করছে।

Kunal 1

দুর্গাপুজোর সূত্রপাত হয়ে যেতো ‘রান্না পুজো’ থেকে। তবে ‘রান্না পুজো’র কথা শুনে অনেকে ভ্রু কোঁচকাতেই পারেন, কারণ ‘রান্না পুজো’ হলো পুরোপুরি এদেশীয় অর্থাৎ ‘ঘটি’দের বাপকেলে অনুষ্ঠান। রান্না পুজো মানে ‘রান্না’-র পুজো আবার সেই সঙ্গে ‘অরন্ধন’, অর্থাৎ না-রান্নাও বটে! ভাদ্র সংক্রান্তিতে, বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন পরিবারের যাবতীয় মেয়েরা, অর্থাৎ মা-মাসিপিসি, নিজের এবং জ্যাঠতুতো-মাসতুতো দিদি-বোনেরা, সবাই মিলে একজোট হয়ে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে সারারাত ধরে চালাত কুটনো-বাটনা আর রান্না – সে ছিলো এক অদ্ভুত আনন্দযজ্ঞ। ভাদ্রে রেঁধে আশ্বিনে খাওয়ার এই রীতির মূলে লুকিয়ে ছিলো এক চিরায়ত বিশ্বাস: ভাদ্রের জল হাঁড়িতে পড়লে তবেই নাকি আশ্বিনের ঢাকে বোল ফুটবে, আর ধানের ক্ষেত সব শস্যভারে ফুলেফেঁপে উঠবে। বাড়ির পুরুষদের কাজ ছিলো রান্নাঘরটাকে ঝাড়াই-পোঁছাই করে রাখা, ব্যাগ বোঝাই করে বাজার করে আনা, উনুনের জ্বালানির জোগাড় দেওয়া, টেম্পোরারী কানেকশন দিয়ে ইলেকট্রিক লাইট এবং হ্যাজাকের বন্দোবস্ত করা,  সেই সঙ্গে ক্যাসেট প্লেয়ারে ঝকমারি গানের ব্যবস্থা করা, ইত্যাদি, মানে যত্তোসব অকাজ আর কী! তো সেই রান্নার বিশাল পর্ব শেষ হতে হতে পরের দিন ভোর না-হলেও, রাত দুটো তো হয়েই যেতো! পরের সকালে সেই সব রান্নাবান্নার প্রত্যেকটি পদ থেকে একটু করে নিয়ে, শাঁপলাপাতায় সাজিয়ে ভক্তিভরে মা মনসাকে সর্বপ্রথমে নিবেদন করা হতো, তারপরে শুরু হয়ে যেতো আমাদের খাওয়া-দাওয়া। হাঁড়িভর্তি পান্তাভাতের সাথে গতরাতের রান্না করা পদগুলি খেতে যে কী অপূর্ব লাগতো, তা বলে বোঝানো যাবে না। এই রান্নাপূজা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন বাড়িতে বিভিন্ন রান্নার চল থাকলেও মোটামুটি সব বাড়িতেই ‘ডাল শুকনো’, ওল, কচুশাক, চিংড়ি-ইলিশ ভাজা, উচ্ছের একটা রান্না, আর গোলগোল করে কাটা মোটা আলুভাজা হতো। আমাদের বাড়ির স্পেশাল আইটেম ছিলো বাগানের নারকেল গাছের নারকেল দিয়ে বানানো পিসিমার নিজের হাতের করা নারকেল-ছাঁই আর নারকেল নাড়ু। গোটা পনেরো বড়ো বড়ো নারকোল ভেঙে কুরনি-বঁটি  দিয়ে কোরা হতো।  পিসিমা খুব মিহি করে নারকোল কোরাতে পারতেন। বেশ কঠিন ছিলো সে’কাজ – ক্রমাগত হাত ঘোরাতে ঘোরাতে একসময় হাতে  ব্যথা হয়ে যেতো – তাই অন্যরাও এসে পালা করে হাত লাগাতেন। সেই কোরা নারকেল কড়াইতে ফেলে ভেজে, তার মধ্যে নলেনগুড় ঢেলে, ময়ান করে বানানো হতো নারকেল নাড়ু – অসাধারণ ছিলো তার স্বাদ। গরম অবস্থাতেই নামিয়ে গোল্লা করে নাড়ু বানাতে হতো, কারণ ঠান্ডা হয়ে গেলে সেগুলো আর গোল করা যেতো না। মা-পিসিমা-দিদিদের সবারই হাত ওই তাপে লাল হয়ে যেতো, কিন্তু খেয়ে ‘দারুণ হয়েছে’ বললেই তাঁদের মুখে ফুটে উঠতো পরিতৃপ্তির অনাবিল হাসি। বাড়ির পুকুর থেকে তুলে আনা শাঁপলাডাঁটার ডাল আর আলপনা দিয়ে সাজানো রান্নাঘরের হাঁড়ি-কড়াইগুলিকে দেখে কেমন যেন গা-ছমছম করে উঠতো। একান্নবর্তী পরিবারের নানান আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে, দাদা-দিদিদের বন্ধু-বান্ধবী, পাড়ার নানান লোকেদের যাওয়া-আসায় আমাদের বাড়িটা সারাটা দিন ধরে গমগম করতো। ফলস্বরূপ রাতের বেলা খেতে বসে পান্তাভাতের সাথে ভালো কিছু আর জুটতো না, অন্তত: চিংড়ি বা ইলিশমাছ ভাজা তো নয়ই!

ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাওয়াটাই এ জগতের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু সেই সময়ে আমরা বড্ড বেশি করে চাইতাম ‘চট’ করে বড়ো হয়ে যেতে।  তা’হলে দাদার মতো একলা একলা সাইকেল চেপে যেখানে খুশি যেতে পারবো, বা কাউকে না-বলেই ট্রেনে চেপে কলকাতা ঘুরে আসতে পারবো, এ’সবই আর কি ! কিন্তু আজ পিছু ফিরে বুঝতে পারি যে কি সাংঘাতিক ভুল চাওয়াই না সেদিন চেয়েছিলাম। বড় হওয়া আর মেকি হওয়ার মধ্যে আদপেই যে কোনো পার্থক্য নেই, তা বোঝার ক্ষমতা সেদিনের ‘সেই আমি’-র ছিলো না।

পাড়ার মোড়ে যখন বিশ্বকর্মা পুজো হতো তখন থেকেই বুঝে যেতাম যে নতুন জামাকাপড়ের পাট ভাঙার সময় এখন না-এলেও, দুর্গাপুজো কিন্তু আর মাত্র কয়েক হাত দূরেই। পরিবেশে যেন একটা পুজো-পুজো গন্ধ সে দিন থেকেই পেতে শুরু করতাম। তার কিছুদিন পরেই হঠাৎ করেই এসে যেতো ‘মহালয়া’। ভোর সকালে আধো ঘুম আধো জাগরণে,  বীরেনবাবুর মন্দ্রমধুর কন্ঠে চন্ডীপাঠ:  ‘যা দেবী সর্বভূতেষু …’  শুনে চমকে উঠতাম – অকারণেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো – যাক, পুজো তাহলে সত্যি সত্যিই এসে গেছে!! চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসে খেয়াল করতাম কাছে-দূরের সবকটা বাড়ির রেডিও থেকেই মহালয়া শোনা যাচ্ছে। কাছের রেডিওটা যেন দূরের রেডিওটারই প্রতিধ্বনি – তারপর এক সময়ে সবকটা মিলেমিশে যেতো – দূরের বীরেন ভদ্র আর কাছের বীরেন ভদ্র মিলেমিশে এক হয়ে যেতেন। মনে পড়ে ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’ গানটা শুরু হবার সাথে সাথেই মা দরজা খুলে দাওয়ায় বেরিয়ে আসতেন, শিউলি-গন্ধ মাখা আবছা আলো আঁধারির সেই ভোরে। আকাশটা লাগতো কেমন অদ্ভুত রকমের শান্ত আর নীলাভ। অচেনা একটা শিরশিরে ভাবে ভরে থাকা, শারদীয়ার সুবাস মাখা সেই ভোরে পাখিদের ঘুম তখনও ভাঙতো না। আশ্বিনের শারদ প্রাতে জেগে উঠছে আলোর মঞ্জরী ’, কথাগুলো শুনলেই সারা শরীরে অদ্ভুত এক আবেগ উথলে উঠতো! সে আবেগের পুরোটাই ছিলো নির্ভেজাল আনন্দের। পুজো শুরু হওয়ার আনন্দের সঙ্গে যেমন মিশে থাকতো দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়ে নিয়ম ভাঙার আনন্দ, তেমনই থাকতো পড়াশোনা ভুলে আপন খুশিতে মেতে ওঠার আনন্দ। স্তোত্রে জেগে ওঠা ভোর কেমন করে যেন ‘আধুনিক’ হয়ে যেতো বেলা বাড়ার সাথে সাথেই। মহালয়ার গানের সঙ্গে মিশে যেতো লতা-সলিল-হেমন্ত কিশোর-আশার পুজোর গান। আকাশের ধূসর, গোমড়া মুখটা পাল্টে গিয়ে কী আশ্চর্য্য রকমের ঝকঝকে নীল হয়ে উঠত। সেই নীল-জুড়ে ভাগ বসাতে চলে আসতো পেঁজা তুলোর মতো সাদা-সাদা মেঘেদের দল। রোদ্দুরটাও হয়ে উঠতো মায়ামাখা, সোনা-রঙা। আর তারই মধ্যে এক সপ্তাহান্তে বাবা বলে উঠেতেন, ‘আজ পুরানো গল্পের বইগুলোকে সব রোদ্দুরে দিতে হবে’। ঘরের দেয়ালজোড়া আলমারিগুলোতে থাকা অগুন্তি বইগুলোকে একে একে নিয়ে আমি চলতাম তিনতলার ছাদে মাদুর বিছিয়ে রোদ খাওয়াতে। সবকটা রোদে দেওয়া হয়ে গেলে, বাবা আকাশের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে উঠতেন: মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি – নাহ্, আর বৃষ্টি হবে না – শরৎ এসে গেছে… – আর অমনিই সেইসব বইয়ের পাঁজা ছুঁয়ে ঝলমলে সোনা-রঙা রোদ আর একরাশ খুশি নিয়ে আমার মনেও হুটোপুটি করে এসে পড়তো শরৎ।

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না – ৫


আগের পর্ব


প-য়ের প্রকার


গম্ভীরভাবে বললাম, ‘পঞ্চ ম-কার কি জানিস?’

তর্ক মাথা চুলকে বললে, ‘কি একটা হয় শুনেছি – ঠিক ঠিক জানি না।’

‘বৈদিক মতে যেমন পঞ্চ-গব্য, তান্ত্রিক মতে তেমনি পঞ্চ ম-কার। ঠিক উল্টোটা। এদের মতে এইটা পবিত্র, তো ওদের মতে ঐটা। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। সবার সাধনার মার্গ আলাদা। বুঝলি কিছু?’

‘তুমি কি ফুল-টাইম প্রজেক্ট ম্যানেজার না পার্ট-টাইম তান্ত্রিক? কে জানে দেখা গেল হয়তো প্রজেক্ট নামান’র জন্য বাড়ি ফিরে নামাবলী পরে বসে থাক?’

‘ওরে গবেট-চন্দর – নামাবলীটা বৈষ্ণব আর পঞ্চ ম-কার তান্ত্রিক। দুটো ডোমেন পুরো আলাদা – একটা ডট নেট তো অন্যটা জাভা, একটা মেইনফ্রেম তো অন্যটা ইউনিক্স। যাই হোক, তান্ত্রিক টান্ত্রিক না তবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ঐ টাইপের একটা জিনিস আছে – তৃতীয় প-কার। এক্কেবারে নৈব নৈব চ। খুব সাবধানে এড়িয়ে চলা উচিত – যে কোন একটাই প্রজেক্টকে লাটে তোলার জন্য যথেষ্ট। মজার ব্যাপার হল এদের কোনওটাকেই লুকিয়ে রাখা সম্ভব না। যতই চেপে রাখার চেষ্টা কর – সে তার নিজমূর্তি ধারন করবেই। তাই ভাবছিলাম সেই ঘটনাটাই আজকে তোদের বলব। তোদেরও তো একদিন বড় হয়ে প্রজেক্ট চলাতে হবে – সব জেনে রাখা ভালো।’

KPMKN-5 illustration - small

কাজ ফেলে গল্প বলতে চাইলে যা হয় আর কি। ভিড় জমে গেল। সেই ঠেকে তর্ক, রুদ্ধ ছাড়াও পুতু, পার্থ (যে কিনা এখন ছবিগুলো আঁকছে) এরা সব্বাই আছে। ব্যস অমনি শুরু হয়ে গেল গল্প। অবশ্য গল্প ভাবলেই গল্প, খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন – হুবহু একই ঘটনা হয়তো আপনার অফিসেও হামেশাই ঘটে থাকে।

‘বেশ – প্রথমটা কি শুনি?’

‘কেন, প্রেম?’

‘যাহ – এটা তো কমন ছিল।’

‘ধুর ধুর – তোরা পয়েন্টটাই মিস করে গেলি। এ যে সে প্রেম নয়, এ হল অফিসের প্রেম। পাড়ার প্রেম বা ইশকুল কলেজের প্রেম নয় যে একটা চিঠি লিখলাম, দুটো বিরহের গান শুনলাম, তিনবার নীলাঞ্জনা গাইলাম বাথরুমে। অমনি হয়ে গেল – প্রাতঃকৃত্যের সাথে মাথা হালকা হয়ে গেল।’

‘তবে?’

‘আহা অফিসে কাউকে ভালো লেগে গেলে তাকে তো আট ঘণ্টা তাকে চোখের সামনে দেখতে হবে – তার সাজগোজ, কথাবার্তা, বন্ধু-বান্ধব, মোবাইল রিংটোন, সিক্রেট ট্যাটু – কত কি? এর মধ্যে লাঞ্চ আছে, টিফিন আছে, চা আছে। বিকেল বেলা ওয়াক করা আছে।’

তর্ক ফট করে বলে বসল, ‘আইসক্রিম আছে।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘মানে?’

‘না, মানে রুদ্ধ মাঝে মাঝে নীচে যায় গরমকালে – একটা মেয়েকে আইসক্রিম খেতে দেখতে যায়!’

রুদ্ধর দিকে তাকে ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘না না, ওটা অন্য ব্যাপার – তোরা বড্ড বাজে বকিস। যাই হোক, যা বলছিলাম। অফিসে কাউকে ভালো লাগলে সে আবেগটা বড্ড বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। স্বীকার করতে হয় না – চোখে মুখে ফুটে ওঠে। কাজে কর্মে পরিষ্কার বোঝা যায়। অনেককে দেখে তো আমার এরকমও মনে হয়েছে যে ওদের দুজনের জন্য দুটো কম্পিউটার বোধহয় লাগত না। ডেস্ক সেভ, ইলেক্ট্রিসিটি সেভ। কত প্রফিট।’

‘কেন? একবার ডেকে সোজাসাপ্টা বলে দিলেই হল বা ধরো চুপি চুপি ইমেল করলে?’

‘ওফ হাসালি, তোরা’

‘কেন? কেন?’

‘বাহ ইমেলে এরকম কু-প্রস্তাব দিলে, মানে চিঠিটা পড়ে যদি তাই মনে হয় আর কি, তাহলে এইচ-আর কেস হয়ে যাবে না? সেই ভয়টা তো সব সময় আছেই। তার ওপর যদি আবার রিজেকশন কেস হয়, তাহলে প্যাঁক, টিটকিরি তো আছেই, ওদিকে গোদের ওপর বিষফোড়া প্রজেক্টও অমনি রাতারাতি বদলে ফেলা যাবে না। ফলে সেই একই মেয়েকে আবার ন ঘণ্টা ধরে সহ্য কর আর যতদিন প্রজেক্টে আছো, ইশারায় বলে চল – একবার ডাকিলেই আসিব।’

‘আর যদি কেউ প্রোপোজ করার ম্যানেজারকে কপিতে রেখে দেয়? অন্তত এইচ আর কেসটা তো এড়াতে পারে?’

‘ওফ এরকম করেছিল বটে কৃষাণু। সেই ২০০৬ সালে। দিব্যি বন্ধুদের কথা শুনে বার খেয়ে, ডিকশনারি দেখে এক-পিস প্রেম পত্র সাজিয়েছিল কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেকে সেফ-সাইডে রাখার জন্য দুই ম্যানেজারকে কপিতে রেখে মেলটা করেছিল। ফলটা হল উলটো। লেঙ্গি তো খেলোই, তার ওপর জাঁদরেল প্রজেক্ট ম্যানেজারের দাবড়ানিতে টানা দু বছর ধরে সব প্রজেক্ট / নন-প্রজেক্ট পার্টিতে নীলাঞ্জনা গাওয়া করিয়েছিল। একটা সময় কৃষাণুর মনে হত ডেকে সবার সামনে বলদ বলে কান ধরে উঠবস করালেও বোধহয় এতটা দুঃখ হত না। প্লাস ঐ চিঠিটা পড়েনি এমন কেউ পাবলিক শুধু ঐ প্রজেক্ট কেন, গোটা অপিসেও ছিল না। তাই বলছি আর যাই করিস, ঐ ভুলটা কক্ষনও ভুলেও করিস না। ’

‘অনেকটা কার্তিক-দার মত কেস – পার্টিশন করতে চেয়েছিল, আর্কাইভাল হয়ে গেল?’

‘কার্তিক-দাটা আবার কে?’

‘ওহহো, তোমার সাথে এখনও তো পরিচয় হয় নি, তাই জানো না হয়তো। গোলাপি চশমা, সবুজ ট্রাউজার – কার্তিক-দা পুরো কেতার ছেলে ছিল। একবার একটা মেয়েকে তার ভালো লেগে যায়। তারপর তাকে পার্টিশন এক্সচেঞ্জ বোঝাতে কতবার কাচের ঘরে ডেকে নিয়ে যেত, শনিবারে আসতে বলত অফিস। শেষমেশ যখন কেটে গেল ঘুড়ি আমাদের এসে বলল, আর্কাইভাল হয়ে গেছে – ফাইল ক্লোসড।’

‘ওহহো’

‘কি হল আবার?’

‘একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল। সে আমার কাছে একটা ডিজাইন বার বার বোঝার চেষ্টা করতাম – কিন্তু আমি যতই যাই বলি, সে কিছুই বুঝতে পারত না। দু-একবার বাড়িও চলে এসেছিল। শেষে একদিন বাধ্য হয়ে বললাম – আর বোঝার দরকার নেই, ওতেই হবে। যেটুকু বুঝেছিস তাই দিয়েই চালিয়ে দে।’

‘হায় রে- এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করলে? মেয়েটা থোড়াই তোমার কাছে ডিজাইন বুঝতে চেয়েছিল। ছি ছি ছি – এইটুকু পারলে না? দেখতে কেমন ছিল?’

‘বেশ মিষ্টিই ছিল। কিন্তু তখনই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তো।’

‘সেইটাই তো সুযোগ ছিল – ধুর তুমিও যেমন’

‘আহ, কথায় কথায় তর্ক করিস না – যতক্ষণ অফিসে থাকবি, ঐসব ব্যাক পকেটে রাখবি। এই জন্যই বলছি, ওসব বাদ দে।’

‘তা তোমার প-কারে প্রেমের পর আর কি কি বাকী আছে শুনি?’

‘তার আগে আরও কয়েকটা ব্যাপার ছিল। প্রাক-বৈবাহিক তো বললাম, উত্তর-বৈবাহিক আর আন্তঃর্বৈবাহিক ব্যাপারও আছে’

‘গোদা বাংলায় বলবে?’

‘মানে প্রিম্যারিটাল, পোস্ট ম্যারিটাল – ইন্টার্ম্যারিটাল আর কি। ধরা যাক কেউ বিয়ের আগে পালাবে – সেও দেখেছি। কেউ বিয়ের পর অফিসে কি করে সেও দেখেছি। আবার অন্যের বউ -’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে তর্ক জিজ্ঞেস করলে, ‘পালাতে দেখেছ?’

‘তা আর দেখিনি? মেয়ের বাড়ি থেকে দুই জাম্বুবান মার্ক ভাই এসে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অফিসের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আর হুঙ্কার ছাড়ছে। আর ওদিকে প্রজেক্ট ম্যানেজার তাকে চেন্নাইতে পালানর সেফ প্যাসেজ দিচ্ছে। ছেলে তার হবু শালাদের এড়াতে বন্ধুর গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে অফিস থেকে বেরোচ্ছে – সব নিজের চোখে দেখা রে।’

‘তোমার প্রতিভা আছে বলতে হবে-’

‘আরে ঐটাই তো দ্বিতীয় প’

‘কিরকম শুনি?’

‘এই যেমন ধর আমাদের পুরনো প্রজেক্টে একজন সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিল। এমনিতে ছোটখাটো চেহারার লোকটিকে দেখলে সিকিউরিটি গার্ড বলে ভুল হতে পারে কারও। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রতিভা বোঝা যেত মুখ খুললে। একদিন তাকে একটা কলে ডাকা হয়েছিল – সে আই আই আই আই চারবার বলে কর্ণের রথের চাকার মত সেই যে আটকে গেল – আর কিছুতেই এগোয় না। তারপর থেকে আইয়াইয়াইয়াই টাই ওনার নাম হয়ে গিয়েছিল। এ শুধু অফিসে হলে ঠিক ছিল – একবার বিদেশে গিয়ে ব্যাঙ্কে, স্টেশনে মায় কাস্টমারের কি হাল করেছিল তার আর ইয়ত্তা নেই।’

‘এ আর প্রতিভা কোথায়?’

‘যাচ্চলে – প্রতিভা নয়? ধর ক্লায়েন্ট ফোন করেছে। যাকে খুঁজছে, তাকে দেখতে না পেয়ে ফোন তুলে দিব্যি বলে দিল – হি ইজ নো মোর। ব্যস সে ওদিক থেকে কনডোলেন্স ইমেল পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপরে ধর মেল পাঠিয়ে বলল, ঈশ ভুল হয়ে গেছে বলে ল্যান কেবলটা খুলে দিল। আরেকজনকে চিনি। সে মেল শুরুই করেছে, ‘হোপ ইউ আর নট ওয়েল’ বা কখন কি মনে হল মেল করার পরে এসএমএস করেছে – ‘ফলো মি অন মাই ইমেল’। কখনও আই অ্যাম হসপিটাল তো কখনও লেটস ড্যামেজ দা কন্ট্রোল। উদাহরণ ভুরি ভুরি। এই পর্যন্ত হলে তাও নয় ঠিক ছিল। একদিন তার মায়ের শরীর খারাপ – অমনি মেল করেছে মাই মাদারস হার্ট অ্যাটাকড। বোঝ – এগুলো প্রতিভা নয়? আর এসব প্রতিভা যেখানে আছে, সেখানে লুকিয়ে থাকার জো নেই – ফুটে বেরোবেই। তাই বলছিলাম, প্রজেক্টের সার্থে বড় মুশকিল।’

‘বুঝলাম – আর শেষের টা কি শুনি?’

‘ওহ ওটা আদিভৌতিক অর্থাৎ কিনা আমাদের কন্ট্রোলে না, ওটা আদি ভূতের ডিপার্টমেন্ট। আমার এক বন্ধু ছিল – রাত্তিরবেলায় ডিপ্লয়মেন্ট করছে। অফিসে একা। এমন সময় এল প্রবল বেগ। সে আইডি কার্ড ডেস্কে ভুলে টয়লেটে ছুটেছে। এদিকে ঐ দরজাটা এমন যে বেরোতে অ্যাক্সেস লাগে না – কিন্তু ফেরার সময় লাগে। আবেগেতাড়িত হয়ে যাওয়ার সময় ভুলে গেছে। কিন্তু পরে আর কিছুতেই ফিরে আসতে পারে না – অফিসে কেউ নেইও। সে এক কেলেংকারিয়াস ব্যাপার। তাই বলছিলাম আর কি এইসব জিনিস প্রজেক্টের পক্ষে বড় ক্ষতিকর। খুব সাবধানে থাকা উচিত। তেমন তেমন মুহুর্তে যে কোন একপিসই যথেষ্ট।’

‘বল কি?’

‘হুঁ হুঁ বাবা, সাধে কি আর মহাজ্ঞানী মহাজন বলে গেছেন – প্রেম, প্রতিভা আর পায়খানা – চেপে রাখা যায় না।’

এই এপিসোড এখানেই শেষ। যারা আমার গল্প শুনে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের হাত মকশো করছেন আগামী দিনের জন্য বা নেহাত গল্পচ্ছলেই পড়ছেন বা আমাকে ছোঁড়ার জন্য বাড়িতে ঢিল জমাচ্ছেন সকলকে বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা। সঙ্গে থাকুন, পড়তে থাকুন।


ছিন্নবীণা ৫

Stay high!

উফ! কটা দিন টানা গাঁজা সিগারেট খেয়ে কাটানো যাবে, জাস্ট ভাবা যাচ্ছে না!! সাধে বলে pujo spirit ?

না না, আমি না, শিব হয়ত প্রতিবছর এসময় এমনটাই ভাবেন!

পাড়ায়ে পাড়ায়ে প্যান্ডেল কর্তার এখন ঘুম উড়ে যাবার জোগাড়। শারদ সম্মানগুলো তো আর অন্যদের নিতে দেওয়া যায়ে না, কি বল?

তা যাকগে, শিব কে নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে, ও যেমন আছে থাক।

বেচারা মহিষাসুর! সবকটা দিন ত্রিশূল তলোয়ার বন্দুক সিংহের খোঁচা খেয়েই গেলো, un-caste বিয়ে করতে কেন যে গেলো বেচারা!ভাগ্যিস সেই সময় human rights commission ছিল না, নাহলে দুর্গাকেই জেলে পুরে দিত, তার সাথে চলতো মিটিং মিছিল আরও কতকি। social হামলা হয়ে যেত একটা! মহিষ মারলে তো SPCA খেয়ে নিত দুর্গা কে চিবিয়ে চিবিয়ে।

তা বেশ হয়েছে এ যুগে ঘটনাটা ঘটেনি। তাই জন্যেই কুমোরটুলি গেলে মাখা মাটি আর পাটের ঝুরোর গন্ধটা পাই। ভাগ্যিস কেউ ভেবেছিল socially একটা বড় পুজো করা হবে, তাই জন্যেই না তোমায়ে প্রতিবার জিজ্ঞেস করতে পারি, “কিরে কটা হল?” হ্যাঁ ব্যাপারটা এখন জামা ছেড়ে girlfriend হয়ে যাচ্ছে, that’s OK।

কতো লোক দেখি রাস্তায়ে, এও কিছু ঘটছে চারিদিকে, তাও, কি সুন্দর সবার মুখে হাসি দেখা যায়ে!!

রোদের দিক বদলে যাচ্ছে বলে, ঘরের খড়খড়ি দাওয়া জানলার ছোট্ট ফোকর দিয়ে আলো পড়ে, ঘরের ভেতর ঐ pin-hole কামেরার সিনেমার অ্যাঙ্গেল-টাই বদলে যায়ে !!

শাড়ি পাঞ্জাবি পরে থাকাটা যেন হুট করে ফিরে আসে, শুধু তুমি আসো বলে। কাজের চাপে রাত জেগে জেগে আমরা সবাই প্যাঁচা, তাই whole night ঘোরা টা এখনও trend।

একা পরবো? কাজের মাসি একা থাকবে? ওকেও তো এই বছরকার উৎসবে কিছু দিতে হয়ে, হাসিটা বেশ লাগে…।

সারা বছর কথা বলি না, তাও ঠিক এই দশমির সময়টা মনে হয়ে সব ভুলে সবার সাথে কথা বলে আসি, ডেকে ডেকে।

দুর্গা আমার কাছে একটা connecting memory; এলে কতকি সাথে নিয়ে আসে। বছরে একবার আসে বটে, পুরো বছরের হারিয়ে যাওয়া “bengalensis” ফিরিয়ে নিয়ে আসে, আর তার সঙ্গে একটুখানি ভুলে যাওয়া মনুষ্যত্ববোধ কে। গঙ্গা মাটি, বালি মাটি, গোবর, পুণ্য মাটি, ঠাকুর বানানোর আগে মনে করায়ে, সে কোথায়ে কোথায়ে আছে।

নতুন করে বুঝতে পারি যে, এরকম ভাল মনে, হয়ত পুরো বছরটাই থাকা যায়ে; bank balance বাড়লে যে মনটা এতটা হাসে না, এটাও বুঝি। চেনা মুখগুলো দেখা, “কিরে কেমন আছিস” বলা, এতদিন যা যা ভুল করেছি তার জন্যে ক্ষমা চাওয়া, নিজেকে “better luck next time” বলা, পুজো মানে তো এগুলোই।

এতকিছুর মাঝে নিজেকে ফিরে পাওয়ার নাম-ই দুর্গাপুজো।

হ্যাঁ আমরা বদলেছি, বদলাচ্ছি। আমরা বড় হচ্ছি, আমরা ভুলছি। তাও আমরা তোমার ভক্ত। তোমায়ে ভক্তিও করি, ভালও বাসি। তোমার মুখে মিষ্টি গুঁজে দি, তোমার দিকে হাত জোড় করে তাকিয়ে হা করে তোমায়ে দেখি। তোমার পায়ে আমার পড়ার বই ছোঁওয়াতে এখনও ছুটে যাই।

তুমি এলে , হারানো তার গুলো এখন টুং-টাং বাজে। তুমি এলে যেন নতুন করে তার গুলো বেধে ফেলতে পারি।

Modern যুগ, তা হোক না। মনটা তো এখনও DJ beats-এর থেকে ঢাকের আওয়াজে বেশি নাচে।

এখনও থাকতে চাই পুজোর অষ্টমীর সাজে। বাঙ্গালিয়ানা, খাসির মাংস, ইলিশ খিচুরি, কালবৈশাখী, গরম চা, কফি হাউস, মান্না দে, বিরেন্দ্র কৃষ্ণ, এসব ছাড়া, এখনো আমি নিজেকে খুজে পাই না।

এসো ডিয়ার দুর্গা, এবারেই নয় শুধু, বারে বারে এসো, এই হারানো আমির কাছে।

অপেক্ষায়ে রইলাম আমি, আর রইল আমার মনের ছিন্নবীণা।

Best Regards

পার্থ

 

 

ছিন্নবীণা ৪


আগের পর্ব


বাজনাদার-পয়সাওলা-ব্যাচেলর আর সরস্বতী-লক্ষ্মী-কাত্তিক কথা

এক কালে বীণা বাজাতেন।

এখন iphone অ্যাপ download করেন।

এক কালে শ্বেত-বরণ বলেই লোকে চিনতো।

এখন তাকে Fair and Lovely-র দেবী বলেই হয়তো চিনছি।

এক কালে হাতেখড়ি, আর বইপত্র রেখে এবারের পরীক্ষাটা পাশ করা নিয়ে ভাবতাম, এখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটা সেই পাশ ফেলটা তুচ্ছ করে দিয়েছে।

 

Technically and technologically একটা চূড়ান্ত advanced জগতে পৌঁছে গেছি। গ্রামাফোন রেকর্ড ছেড়ে পাড়ায় পাড়ায় শখের রেকর্ডিং কোম্পানি; ইBook, ইMail, ই কা হ্যাঁই আর ই কা নাহি হ্যাঁই, ই কা কর সাকতা হ্যাঁই and ই কা নাহি কর সাকতা হ্যাঁই, এই ভেবে যখন কূল পাইনা, তখন অফিস কলিগ-টা বলে বসে, “কিরে কাত্তিক! বিয়েটা কবে?”

chhinnobeena-41-e1444649281575-1024x652

মন বলে “হুত্তেরি! লক্ষ্মী ঝলঝল করছে পকেটে, এর ওপর নাকি বিয়ে! বেঁচে থাকার লড়াই বুঝলে, যারা বেঁচে থেকে লড়ে, তারা ‘ব্যাচেলর’!”

আমি বাবা সলমান খান-এর ভক্ত, ক্যাটরিনা-সম মেয়ে থেকে শুরু করে হনুমান-এর লেজ পরা ছেলেদের সাথে সেলফি তুলবো, ঈদ মহরম দুর্গা পুজোতে নাচব, এই লাইফটাই ভালো।

প্রবলেম তখন হয়ে যখন বাড়ির লোক এটা বোঝে না। সবাই সলমান খান হলেও সবার তো আর সলমান খান-এর বাড়ি নয়।

তাই বসলাম ফিকির আঁটতে। ও বাবা, লক্ষ্মী তো এখন শুধু লেখায় পাওয়া যায়, এখানেও তো ‘ই’ মা; না না নাক সিঁটকে বলছি না, অবাক হয়ে বলছি। ই-cash, ই- mart, net banking, coin খুচরো নোট পত্র, আর লাগে না যত্রতত্র।

এখন coin ও coin-এর আভিজাত্য একটাই জায়গায়ে, অটো কাকুর খুচরো।

রাস্তা-কুঁড়ে রাও বলে “দাদা note দিবেন!”

তা লক্ষীকে দেব-দেবতা কম কষ্টে পায়নি, হিড়হিড় করে সমুদ্র মন্থন করে এক হাত জিভ বেরিয়ে পড়েছে যখন, তখন দেখা গেছে glamour girl কে। আগে সরস্বতীর সাথে এতো বনিবনা ছিল না তোমার, এখন donation আর development fee দিয়ে সরস্বতী মা-এর demand-টা, আর তোমাদের teamworkটা বেড়ে করেছ কিন্তু!

Free education নিয়ে চেঁচাচ্ছি না তা নয়, তবে এর ভেতরেও অনেক কালো টাকা সাদা হচ্ছে, এও সত্যি। Education, certification টাকা অনেক টাকা, কী খরচ দাদা, খেতে পাই না, আমার পকেট ফাঁকা।

নাহ! লেখা লম্বা হয়ে যাচ্ছে, খাবার ব্যাপারটা KFC-তে সেরে নেব, সেখানে সেদ্ধ corn দেয়ে; লক্ষী মা হাতে corn ধরে থাকে না? ওহো না না, ওটা ত ধানের শীষ! ধান? সেটা আবার কি? ওহো হ্যাঁ মনে পড়েছে, staple food, ও তো না খেলেও হয়ে, RICE বললে এখন সরকারি চাকরি বেশি মনে পড়ে, কদিন পর ডিজিটাল ধান খাবো, মোদী বাবু Farmville তে বিতরণ করবেন, ডিজিটাল ভারতে। এর বাইরে তো কিছু দেখছি না কাত্তিক-দা।

আমি ভিতু লোক, আমার সাহস নেই বাড়িতে বাবার উপর কথা বলার; বাবার চড়কে খুব ভয় পাই।

সমাজ আমার শিক্ষিত বটে, আজকাল যা সব শেখাচ্ছে, তাতে হলিউড ফিল্ম-এর যে কোন খুনি চরিত্র একের পর এক তৈরি হয়ে যাবে। ভালরা তাকিয়ে দেখবে, আর হীনমণ্য কোন নিচ লোকের Bank balance বেড়েই চলবে।

শিক্ষার নামে স্বার্থপরতা নজর কাড়বে, আর বোকা আমি “ইশ কী বাজে!” বলব।

আমি তো keywordটা বুঝে গেছি boss!

মা লক্ষ্মী কেবল প্যাঁচা ভালবাসেন।

আর গাঁজা টেনে DJ Remix-এই সরস্বতী আসেন।

সলমান খান কাত্তিকবাবু বন্দুক টেনে ধরে,

black buck তুমি দাঁড়িয়ে আছো .. Gun-এর ওপারে।

তোমাদের হেডমিস্ট্রেস দশভুজা দুর্গা কে এই Update গুলো দিয়ে দিয়ো হে,

এবছর, তোমরা এখানেই আসছ হে দেবী।

Warm Regards

পার্থ