তোমাদের ভয় পাই

জীবনের ছোট্ট পরিসরে যেটুকু সামান্য শিক্ষা পেয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অবশ্যই ভয় পাওয়া। ভেতো বাঙালির ভীতুপনায় যতটা না অনুপ্রাস অলঙ্কারের ছোঁয়া, তার চেয়েও বেশি বোধহয় স্বস্তির আশ্বাস। ভয় না পেলে অ্যাড্রিনালিনের হিসাব-নিকাশ মেটাতে হয়ত ভয়ঙ্কর কিছু করে বসাটা অস্বাভাবিক ছিল না। ভেবেও সুখ হয় যে আমি ভয় পাই। তবে আজ শুধু কিছু শ্রেণীর মানুষের কথাই বলতে চাই যাদের থেকে ভীতি বড়ই অস্বস্তিকর ও অসুখকর। read more

এবং রবীন্দ্রনাথ

[বেশি মাথা ঘামাবার দরকার নেই – এই গল্পটার অণুপ্রেরণা অঞ্জন দত্ত-নিমা রহমানের ‘প্রিয় বন্ধু’। সেই গল্পটাকেই ঠিক আজকের তারিখে দাঁড়িয়ে দেখলাম। হ্যাঁ পরিপ্রেক্ষিতটা অনেকটা পালটে দিয়েছি। আর শুভ্রদীপ মুখার্জীকে ‘ঠিক থাকিস’ শর্ট ফিল্মটা বানিয়ে ‘প্রিয় বন্ধু’র কথা মনে করাবার জন্য অনেক ধন্যবাদ] read more

মাস্টারমশাই

নিত্যরঞ্জনবাবু একজন গানের জগতের লোক। চণ্ডীগড় বোর্ডের একজন পরীক্ষক। বছরের বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা নিতে যান। এছাড়া বাড়িতে গানের স্কুল আছে। এখনকার পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও বলিউডি গানকে প্রাণভরে ঘৃণা করেন। কোন কোন ছাত্র-ছাত্রীর মা বা বাবা যখন তার কাছে এসে বলে “মাস্টারমশাই বাংলা সিনেমার গান সেখাবেন তো?” তখন বড় কষ্ট পান তিনি। মনে মনে বিড় বিড় করেন “এরা যে কি করবে,আরে ক্ল্যাসিকাল হচ্ছে গানের মূল, তোরা সেটা শিখে নে আগে, তারপর না হয় যা পারবি করবি”। read more

আমার ডাক্তারি

গোলগাল মহিলা, বয়স চল্লিশের ঠিক কোনদিকে বলতে পারি না। কিন্তু যে দিকেই হোক, খুব বেশী দূরে নয়। বেশ বোঝা যায় একসময়ে সুন্দরী ছিলেন। হয়তো এখনও আছেন, কিন্তু উগ্র প্রসাধনের আড়ালে সেটা আর বোঝবার জো রাখেন নি। শরীরের সাজপোশাক আর চাকচিক্যে অর্থাভাবের কোন চিহ্ন নেই। মুখে শুধু গভীর উদ্বেগ। দ্রুতপায়ে রাস্তাটা পেরিয়ে এসে আমাদের বাড়ীর সামনে একবার দাঁড়ালেন। বাইরে সাইনবোর্ডের দিকে একবার দেখে একটু ইতস্তত করে একেবারে ঢুকে পড়লেন আমি যেখানে কাজ করছিলাম। read more

ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (২)

আগের পর্ব

জল্পনা চলছিল টেলিভিশন ধারাবাহিকের, সেসব শিকেয় তুলে, শুরু হ’ল নতুন চলচ্ছবির কাজ। যদিও তখন সব কাজই আমার কাছে নতুন এবং সমান আকর্ষনীয়, তবু সেলুলয়েডে পরিপূর্ণ একটি চলচ্ছবি তৈরী হবে এবং আমি তার অংশীদার, এটা ভেবেই উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। read more

বইমেলা উৎসবে কূপমন্ডুক

বছরের শুরুতে পড়ে পাওয়া চোদ্দআনার মত এক্সটেন্ডেড শীতে মজে থাকা বাঙালি তখনও শীতের পোশাক তোরঙ্গে তুলে রাখেনি। বড়দিন, নববর্ষের রেশ ততদিনে মিলিয়ে এসেছে। তবে প্রেমিক বসন্তের আগমনবার্তা তখনও এসে পৌছায়নি। এমন সময় শহর মাতাতে হাজির হল কলকাতা বইমেলা। অতঃপর, অন্নপায়ী বঙ্গবাসী চল বইমেলা। চারিদিকে হুজুগের অন্ত নেই। শোনা যাচ্ছিল বইমেলার সময়সীমা নাকি বাড়ছে। বই নিয়ে অনেক রোম্যান্টিকতা থাকলেও বইমেলা নিয়ে আমি খুব একটা আবেগতাড়িত নই। কাজেই ছুটির দিনগুলো হালকা শীতের ওমটুকু মেখেই কাটিয়ে দিচ্ছিলাম। তাই দেখে নিন্দুকে বললো – আমি নাকি কূপমন্ডুক। হবেও বা। নিজেকে তো আর দাঁড়িপাল্লা কষে মেপে দেখিনি। কিন্তু শেষ বেলার শীতে মজে আর বাকি দিনগুলো কাটান গেল না। বইমেলার হুজুগে গা না ভাসালেও, ভেতরে ভেতরে শহরের পথে মানুষ চেখে বেড়ানোর নেশাটুকু আবার চনমনিয়ে উঠল।  আমার শহর এক নতুন অভিসারে মাতছে, আমি কি আর নিজেকে ঘরের কোনে আটকে রাখতে পারি? বেরিয়েই পড়লাম ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে, শহরের নবতম মাদকতার রস চাখতে। ঝোলাটা আঁতেলসুলভ নয়, নেহাতই অভ্যেস। read more

ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ

ছোটবেলায়chhaya-chhobir-songi-logo আমরা একটা খেলা খেলতাম। হাতের দুটি আঙুলের আটটি কড়-এর মধ্যে একশো গুনতে হবে, কিন্তু কোনও কড়-এর পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। যে এর ভেতরের কায়দাটা জানেনা, তাকে বেশ মস্তানি দেখিয়ে বলা হত – “এই পারবি, পারবি”? তবে ব্যাপারটা জানা হয়ে গেলে দেখা যেত তেমন কিছু না। একটা লোক ঠকানো কায়দা মাত্র। আমরা আটটি কড়কে এই ভাবে ভাগ করতাম, “লাল-নীল-বাক-সো-এই-দেখো-এক-শো”। ব্যাস আট করে হয়ে গেলো একশ গোনা। তবে মোটেও এসব কায়দায় নয়, গুনে গুনে একশোটি বছর পার করে দিল ভারতীয় চলচ্চিত্র। তার বয়স এখন সত্যিই একশো। ১৯১৩ সালে দাদা সাহেব ফালকে পরিচালিত রাজা হরিশ্চন্দ্র চলচ্ছবি থেকে শুরু হয়েছিল সে যাত্রা। নানান ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে, চরাই উতরাই পেরিয়ে, পরীক্ষা নিরীক্ষা পেরিয়ে আজ ভারতীয় চলচ্চিত্র বিশ্ববন্দিতই শুধু নয়, সর্বজন গ্রাহ্য এবং সর্বত্র সম্মানিত। read more

দেশভাগের কথকতা – প্রথম পর্ব

দেশভাগের কথকতা
দেশভাগের কথকতা

আমাদের শৈশবের দৈত্যদানোদের মধ্যে শচীন চক্কোত্তি খুবই উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন। ছোটখাটো শ্যামলা রঙের মানুষটি তখনকার আর দশজন হিন্দু মানুষের মতই পরতেন ধুতি আর শার্ট। পোশাকের সঙ্গে তাল মেলানো তিনি দেখতে  ছিলেন প্রকৃতই খুব নিরীহ গোছের। কিন্তু তার নিরীহ ছবিটা আমাদের শৈশবে মোটেই নিরীহ মনে হতো না কারণ তিনি ছিলেন আমাদের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। ফলে তার স্পর্শ এড়ানোর জন্য আমরা সর্বদাই খুবই সতর্ক থাকতাম। আমাদের এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা লাভের সময়েই তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। সেই সময় তার মত বিদ্বান আমাদের দেশ গাঁ’য়ে খুবই বিরল ছিল। ফলে তাঁর যোগ্যতা অনুসারে তাঁর আসন সমাজে বেশ মজবুত ছিল বলেই মনে হত। কিন্তু একে ব্রাহ্মণ তায় বিদ্বান এই মানুষটিকে খুবই খটকা মনে হত। কারণ যখন দেখতাম সাপ্তাহিক হাটের দিন অন্য অনেক পশারীর সঙ্গে হাটের একটা নির্দিষ্ট চালা ঘরের নিচে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। দাঁড়িপাল্লায় আধ সের গুড় কিংবা এক পোয়া খেসারির ডাল মেপে দিচ্ছেন। খদ্দেরের সঙ্গে দাম দর নিয়ে রীতিমত তর্কবিতর্ক করছেন। স্কুলের হেডমাস্টারের এই ভূমিকা আমাদের কাছে অনেকটা না মেলা অংকের মত মনে হত। সাপ্তাহিক হাটের এই দোকানটি তাঁর বাড়িতে আবার রোজদিনই চলতো। বাড়িতে যদিও আলাদা কোন দোকান ঘর ছিল না। তাঁদের শোবার ঘরেই থাকতো মালপত্র। খদ্দেরকে তাই উঠোনে দাঁড়িয়েই সওদা করতে হত। তেল নিতে হলে তেলের শিশি নিকনো বারান্দায় রাখতে হত। পাশে পয়সা। বাড়ির লোকেরা সওদা বুঝিয়ে দিত এবং পয়সা গুনে নিত। কিন্তু হাতে হাতে দেয়া নেয়া বারণ, কারণ তাতে ছোঁয়াছুঁয়ি হতে পারে। বাড়িতে উনার শাশুড়ি থাকতেন। তিনি আরও সাংঘাতিক ছিলেন। তিনি আবার দণ্ডায়মান কোন খদ্দেরের ছায়াও মাড়াতেন না। ফলে হয়তো পুকুর ঘাট থেকে ঐসময় তিনি স্নান সেরে ফিরছেন আর নাদান কোন বালক খদ্দের দরোজার মুখোমুখি সওদার আশায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সময় মতো যদি সে সরে না দাঁড়ায় তাহলে তীক্ষ্ণ এক গলায় সে নিশ্চিত শুনতে পেত “ক্যাডারে নির্বংইশার পুত খারোইয়া আছস—-সর সর—সইরা যা।” read more

পাবলিক, কবি ও কবিতা

পাবলিক :

কি ? কবিতার বই কিনবো ? সে কি ? কিনলেই হলো নাকি? পড়বো কি করে ? গাইড বই কই ?ভূষণবাবুর টীকা-আলোচনা কই ? সুনীল-শ্রীজাত ব্লাফ মেরে গছিয়ে দেবেন তারপর কি সে সব মাল সাজিয়ে রাখবো? এই সেদিন ড্রয়িঙ রুমের শো-কেস’টাও দিলাম বেচে, আসলে বিপিন ভালো একটা অফার দিলে,এমনিতেই ঘুণ পড়বে মনে হচ্ছিলো ;দিলাম চালান করে আর কি। কাজেই ওই কাব্যির কেতাব যে সাজিয়ে রাখবো তারও উপায় নেই। read more

প-য়ে পুজো

অষ্টমীর দিন সকালে অঞ্জলি দিতে দিতে কেমন আনমনা হয়ে গেল মৈনাক। পুজোর কটা দিন তার হৃদয়টা বড় হয়ে যায় – যে যা চায় দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। অথচ খোদ পুজোর মণ্ডপে যেন ঠিক তার উল্টোটা। সবাই ফুল বেলপাতা কচলে মাইকে বাজা মন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে তারস্বরে চাইছে- “আয়ুর্দেহি, যশোদেহি, ধনং দেহি ইত্যাদি”। কান পেতে শুনলে মনে হচ্ছে মা দুর্গার কাছে এ তো একরকম ভিক্ষাই – তোমার ঝুলিতে যা যা আছে তা সব আমার ঝুলিতে দেহি দেহি। কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে হলেও মুখে সবাই একই কথা বলে চলেছে। তাহলে মনে মনে আরও কত কি চাইছে কে জানে। এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে তীব্র অস্বস্তি লাগছিল মৈনাকের – সবাই যেটুকু পেয়েছে, তার বেশী আর কিই বা পাবে – তাও আবার বছরের মধ্যে একটা দিন এরকম গদগদ প্রার্থনায়? কিরকম খাপছাড়া যেন এই চাওয়া পাওয়ার হিসেব। মাইক বলছে, “এবারে প্রণাম করুন।” সবাই মাথা নিচু করছে, এবার শুরু হবে ফিস ফিস করে নির্লজ্জ  আরেক ধাপ চাওয়া। প্রমোশন দাও, গাড়ি দাও, সুন্দরী বউ দাও, ফুটফুটে বাচ্চা দাও। তার মধ্যে আবার পুত্র সন্তানের জন্য আলাদা করে চাওয়া তো মন্ত্রেই আছে। যত্তসব ন্যাকামো। read more