বেহায়া

ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দুপুরের কথাগুলোর জাবর কাটতে কাটতে কখন যে চোখ লেগে এসেছে টেরই পাননি দিলীপবাবু। হঠাৎ দেখলেন সারা ঘরে লাল আলো জ্বলছে। টকটকে লাল। খাটের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে যাদববাড়ির মেয়েটা।

কোলাজ কোলকাতা (১)

চালক:এই একজন হলেন অটোর দেশের বেতাজ বাদশা। এনার মুড ভালো থাকলে আপনাকে ১০০ টাকাও ভাঙ্গিয়ে দেবে আর খারাপ থাকলে ৮ টাকাও খুচরোতে চাইবে। অটোতে উঠেই নিজের ভাড়াটা খুচরোতে দিয়ে দিলে মনে হয় চালক ভাইয়ের থেকে আপন আর কেউ হয়না।

প্লুটোর ইন্টারভিউ

প্লুটো: দেখছি তো বহুদিন ধরেই বাবা। ছোট তকমা সেঁটে দিতে পারলে তোমরা আর কিচ্ছু চাওনা। পাঁঠা বলি দেখলে নার্ভ ফেল হয়ে যায় ইদিকে অকারণে পিঁপড়ে মারো। কেন? কারন সে ছোট। পাঁঠা ডাকে, সে ডাকেনা।

সমুদ্র গুপ্তের অটো-যাত্রা

সমুদ্র গুপ্ত অটোতে উঠলেন। জায়গাটা খানিক অন্ধকার বলেই আগে বোঝেননি অটোটার পেছনে দুদিক খোলা। অর্থাৎ ওদিকদিয়ে উঠতেই পারতেন। কিন্তু খামোকা বাঁইই করে অর্ধবৃত্তের মত পাক খেয়ে অটোর বাঁ দরজা দিয়ে পেছনের সিটে উঠেই দেখলেন হুড়মুড় করে কি একটা ডান দরজা দিয়ে ঊঠে পড়ল। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই নাকে এল পারফিউম আর ঘামে মাখামাখি এক বিতকুটে গন্ধ। স্পর্শে এল বড় সড় মেদবহুল এক মেয়েলী উপস্থিতি। আর ঘাড়ে সুড়সুড়ি দেওয়া একগাছি লম্বা চুল।
‘হ্যাঁ, কোথায় তুই?’ দেখা গেল মহিলা ফোন বের করে গলা পাকিয়েছেন। চওড়া স্মার্টফোনের পর্দাটা অটোর অন্ধকারে একবাক্স হীরক-খন্ডের মত জ্বলে উঠল। ততক্ষনে সমুদ্র গুপ্তকে স্যান্ডুইচ বানিয়ে পেছনের বাম দরজাও রাজারহাটের এক তথ্যপ্রযুক্তি সুলভ ছুঁচলো দাড়ি আর বিদগ্ধ চশমা ফ্রেম দখলে নিয়েছে। আর ছেলেটির হাতের বস্তাসদৃশ দুটো ল্যাপটপ ব্যাগে সে দরজা দিয়ে বাইরের আলো ঢোকার ফুটীফাটাও বন্ধ! এদিকে, ড্রাইভার ধর্মতলার ফুটপাথিয়া হকারের মত , ‘দুটো খালি… তাড়াতাড়ি… দুটো খালি’ বলে খদ্দের ডাকছে।
‘ও তুই বেরিয়ে গেছিস? এত তাড়াতাড়ি?’ মহিলা কথা বলে চলেছেন। সমুদ্র দেখছিল, ডানপাশের ওই বাহুবলী মহিলার স্মার্ট-ফোন কানে ধরা থলথলে হাত, ওনার মেদবহুল বুক-পেট ধরে টানা দেহরেখার সাথে পঁয়তাল্লিশডিগ্রীতে কাৎ করে বগল এলাকায় এক প্রশস্ত ফাঁকের জন্ম দিয়েছে। সে ফাঁক শুধু পারফিউম আর ঘেমো গন্ধের জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত নয়, বরং দেখে মনে হচ্ছে এক বিশাল পাইথনের হাঁ-মুখ। কিংবা সারসের ফাঁক করা লম্বা ঠোঁট। সেই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ফাঁক দিয়ে আবছায়া আলো এসে সমুদ্রকে বলে দিচ্ছিল এই মহিলা মোটেই তেমন বয়স্কা কেউ নয়। কানে বড় বড় দুল। ঠোঁট বেশ গাঢ় রঙে ছোপানো। গায়ের রঙ কালোই বলা যায়। চুলগুলো খানিক কোঁকড়ানো। আর বগলের ওই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ফাঁকা কৌনিক-জাঙ্গাটাই সমুদ্রের চোখজোড়াকে নিয়ে গিয়ে ফেলছিল ঠিক সামনেই একটি টেলরের দোকানে, যেখানে এক মহিলা বসেছিল আটপৌরে শাড়িতে। মাথার খানিক ওপরে দড়িতে টাঙানো জামাপ্যান্টগুলো নড়ছিল। আর সামনে দোকানের কাউন্টারে শুয়ে থাকা একটা শিশু হাতপা ছুঁড়ছিল আনন্দে। ওপরে কালো একটা ফ্যান ঘুরছিল বন বন করে। এভাবেই, ফ্যানের হাওয়ায় এই গরমে তুমুল ফুর্তির একটুকরো ছবি দেখছিল সমুদ্র গুপ্ত । আর আবছায়া এই ভ্যাপসানো ঘুপচিতে বসে ভাবছিল, অটো চললে কি খানিক মুক্তি পাবে ?
‘আমি তো প্রেসিতে আছি। প্রেসিডেন্সীর গেটে দাঁড়িয়ে আছি। ওকে বলেছি গাড়িটা আনতে। ফোন করেছিল। কাছাকাছি আছে। এই গরমে আর পারছিনা। ও এলে গাড়িতে অনুপম চালিয়ে এসির হাওয়া খেতে খেতে উত্তরপাড়া যাব। না দমদম পার্কে কাল যাব। তুই কাল কি করছিস?’ মহিলার ঠোঁটদুটো বিরাম নিচ্ছিল না যদিও এই গরমে।
সমুদ্র গুপ্ত কল্পনায় একটা এসি গাড়ি অনুভব করতে গিয়ে দেখল অনুপম রায় মাথায় সাদা টুপি পরে ড্রাইভারের আসনে বসে। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ভেবে আবার মেয়েটির বাহু ঘেঁষা ওই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রীর খোপ দিয়ে তাকিয়ে দেখল একটা কুকুর এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তায়। নিরীহ নেড়ি কুকুর।
‘ও তুই কাল চলে যাবি? এ বাবা। দেখা হল না। কাল থাকলে তুই আমাদের বাড়িতে থেকে খেয়ে যেতে পারতিস’ গলায় শান্তিপুরী ভদ্রতা এ মেয়ের এখন। সমুদ্রের রাগ হচ্ছিল। দমদম পার্কের অটোতে চড়ে প্রেসীডেন্সীর এসি ট্যাক্সি! পাঁয়তারা হচ্ছে!
চাকরি পাওয়ার আগে কোলকাতায় যখন ইন্টারভিউ-এর গোঁত্তা খেতে আসত জলপাইগুড়ি থেকে, এমন উত্তর হামেশাই পেত এখানকার আত্মীয় বন্ধুদের কাছে। ইন্টারভিউ দিয়ে অনেক সময়েই শিয়ালদার সস্তা হোটেলে থাকতে হত। অথচ সেই সব আত্মীয় বন্ধুরাই দার্জিলিং কিংবা ডুয়ার্সে এলে হেঁ হেঁ করে ফোন করত সমুদ্রকে। বিনি পয়সার হোটেল থেকে ফ্রি সার্ভিস গাইড। বেকার ছেলের এর চেয়ে বেশি কি আর যোগ্যতা হতে পারে?
খুব রাগ হচ্ছিল সমুদ্রের। বাঁ পাশের আইটির ছেলেটা চিৎকার করে উঠে বলল, ‘এই যে দাদা, এবারে অটোটা ছাড়ুন তো। যদি সারারাত কেউ না আসে আপনি এরকম চিল্লিয়ে যাবেন? আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে তো! এই গরমে এরকম করে পারা যায়?’
ওই মহিলা নাটুকে সংলাপে খানিক গলার জোর বাড়িয়ে বলল, ‘এই শোন, সাবধানে যাস। আর কাকু কাকিমাকে আমার প্রনাম জানাস। ও হ্যাঁ আমি না আগামী মাসে বোলপুর যাব। আমার জন্য একটা ব্যবস্থা করে রাখিস ভাইটি। জানিসই তো, ওখানে খুব কড়াকড়ি হচ্ছে আজকাল। তোর তো চেনাশোনা হোটেল আছে। ওর খুব ভরসা তোর ওপরে… ঠিক আছে?’ ।
সমুদ্র চিড়বিড়িয়ে উঠল। মনে হল ধাক্কেই ফেলে দেয় ওই ব্যাপারটিকে। কিন্তু সেসব হওয়ার আগেই দেখল কুকুরটি চিৎকার শুরু করেছে। ঘেউ ঘেউ ঘেউ ঘেউ। কি কর্কশ তিতকুটে আওয়াজ। যেন কারো ওপরে তীব্র আক্রোশ। নিজের অজান্তেই একটি শব্দযুগল বেরিয়ে এল সমুদ্রের মুখ দিয়ে,
‘শালা কুত্তা’!
ফোন থামিয়ে ঝড়ের বেগে মেয়েটি বাঁদিকে ঘুরে বলল, ‘কিছু বললেন?’ read more

আমরা যারা বাইশের/তেইশের ওপারে আর উনত্রিশ/ত্রিশের এপারে

আমদের প্রজন্মটাকে সময় বস্তুটা চিরকালই হাঃ মুগ্ধ করে রেখেছে। একমাত্র ফুচকাওয়ালার হাত ধোওয়ার সাবান বাদ দিয়ে এমন কোনো জিনিস নেই যা আমরা দেখিনি (সোলজার কিন্তু হিট করেছিলো ফলে ওই প্রসঙ্গ আনা গেলোনা)। সেই জন্ম থেকে শুরু করে বর্তমানে পাড়ায় নির্ভয়ে সিগারেট খাওয়া/ মায়েরটা ছেড়ে নিজের জন্য শাড়ি কেনা অথবা দুটোই একসাথে অবধি। সারাটাক্ষন যেন এক অদৃশ্য হাত রোজনামচার চলতিতে ধরিয়ে দিচ্ছে অবাক হওয়ার ইস্তেহার। আর সে এমনই আদেখলা হওয়ার নিমন্ত্রন যাকে মুঁড়িয়ে ফেলে দেওয়ার যান্ত্রিকতা আমাদের ছিলনা, নেই, হবেও না। read more

ফ্যাশন টিভি

সে এক উত্তাল সময়। আবিষ্কারের সময়। কৈশর পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে যৌবনকে ধরবার, কিন্তু সে তখনও বিভিন্ন যোজনার মত যোজন বছর দূরে। সবাই নাকি দেখেছে, সবাই নাকি জানে “কি করে হয়”। আতিপাতি খোঁজ চলছে। ইলেভেনের দিদিদের কিছুতেই দিদি বলতে মন চাইছে না। নতুন ম্যাডাম ক্লাসে এলে বসন্ত বিলাপ। এরকম এক টালমাটাল মুহুর্তে দেবদূতের মত হাজির সে। বোতাম টিপলেই সমস্ত গোপন স্বপ্ন বিড়াল হাঁটছে তো হাঁটছেই। বাবা মায়েরা চাইল্ড লক করেও আটকাতে পারছেননা অজানা কে আবিষ্কার করবার অদম্য ইচ্ছে। হাতে রিমোট নিয়ে বাড়ির সব চাইতে রিমোট এরিয়াতে চলছে না দেখা পৃথিবী যাপন। read more

ঋতুদা, ঋতুদি এবং আমরা

গতকাল ৩০শে মে ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকী তিন বছর হল তবু ভেতর ভেতর ভীষণ লজ্জা পাই এই ভেবে যে শ্রদ্ধা নিবেদন করার আগে, আমরা আদৌ তার যোগ্য কিনা এই প্রশ্নটা বোধহয় আমাদের নিজেদেরকেই আগে করা উচিত read more

ফলসা, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গৌরী সেন ইত্যাদি

মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক , বাজারে বা রাস্তার মোড়ে, কদাচিৎ ফলসার সাথে দেখা হয়েছে। এক আধবার খুব অল্প, এক ঠোঙা হয়ত কিনেও খেয়েছি। বেশিরভাগ গ্রীষ্মেই আম বা তরমুজের মত ফলসা সেইভাবে দেখতে পাইনা।খুব কম দিনের জন্য চোখে পড়ে গড়িয়াহাট বাজারে বা নিউ মার্কেটের ফুটপাথে। কিন্তু বিক্রেতারা ভয়ানক রকম দাম চায়। একশো গ্রাম আধা শুকনো মরা মরা ফলসা একশো টাকা, দেড়শো টাকা ইত্যাদি শুনে শুনে ফলসা কেনার শখ মোটামুটি জীবন থেকে ঘুচে গেছে। পকেটে নাই ট্যাহা, কিন্তু শখ ষোলআনা।মগজের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা ছোটবেলার স্মৃতি মাঝে মাঝেই জেগে ওঠে। তাই ফলসা বিক্রি হচ্ছে দেখলেই দাম জিজ্ঞেস করি। তারপরেই অবধারিতভাবে 'এ-ত দা-ম কে-এ-ন?' জিজ্ঞেস করলেই বিক্রেতা আমার দিকে এমন করে তাকায় যেন আমার সাথে কথা বলেছে বলে এবার তাকে অবেলায় গঙ্গায় ডুব দিয়ে আসতে হবে !

উন্নত শির

ফোন যে কখনো হাল ছেড়ে দেবে এটা ভাবা যায় না বোধয়। অন্তত রাহুল কখনই সেটা ভাবে নি।

তাও রাস্তার মাঝখানে। তবে ভাগ্যিস হাল ছেড়েছিল। মুখটা তুলেই রাহুল বুঝেছিল যে আরেকটু হলেই ও চলন্ত বাসের তলায় চাপা পড়তো।

ছায়া ছবির সঙ্গী (৯)

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়’এর যে গল্প থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালটি তৈরী হয়, তার নাম ‘গনশার বিয়ে’। এই গল্প থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘বর যাত্রী’ হয়ে গেছে অনেকদিন। সেই চলচ্ছবি থেকেই উঠে এসেছিলেন পরবর্তী সময়ের নামী অভিনেতা কালী ব্যানার্জী। শোনা যায়, ওঁনার কথা আটকে যাওয়ার যে ঝোঁক, সেটা ওই গনশার চরিত্র করার সময় থেকেই তার সঙ্গে থেকে যায়। কারণ গনশা ছিল তোতলা।