কোলাজ কোলকাতা (১)

অটো
বর্ননাঃ
তিনটে চাকা, হ্যান্ডেলে ঝোলানো খুচরোর ব্যাগ আর চাকরি না পাওয়া ছোট দেওরের মত বাই ডিফল্ট কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় আর একখানা লম্বা-পনা হ্যাণ্ডেল ছাড়া যে যানের আর সমস্ত কিছু অদ্ভুত রকমের অনিশ্চিত তাকে অটো বলে। কিন্তু সেই বেকার যুবকটিকে যেরকম বাড়ির বাইরের কেউ অপমান করলে বৌদি ভয়ংকর রকম চটে যান সেরকম ভাবেই এই হ্যান্ডলের ওপর পা রাখা যায়না। মানে দরকার পড়লে মালাইচাকিটা পাশের গাড়িকে দিয়ে দিতে পারেন কিন্তু ওটার ওপর একেবারেই নয়।
প্রত্যেক সাধারণ মানুষের জীবনেই এমন একটা চায়ের দোকান ছিল বা আছে যেখানকার চা-টা কিনে খেতে হয় শুধুমাত্র সেখানে আড্ডা মারতে দেয় বলে। অটোও হল সেইরকম। তাই, জ্বালা, যন্ত্রণা, ব্যথা, লাইন, ভয়, অপমান এই সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা অটো ভালোবাসি। একই জায়গায় যাওয়ার সময় বাস আর অটো দুটোর অপশন থাকলে আমরা অটোটাই বেছে নেই। অটো ছাড়া কলকাতা হল খোসা ছাড়া বাদামের মত।

স্ট্যান্ড আর রুট:
যে জিনিস দুটো সল্টলেকের অটোর থাকেনা তাদের স্ট্যান্ড আর রুট বলা হয়। এক স্ট্যান্ড থেকে আরেক স্ট্যান্ডের মধ্যবর্তী রাস্তা কে বলা হয় রুট। বেশির ভাগ স্ট্যান্ডের আশে পাশেই একটা বাজার বা স্টেশন থাকে। দেখবেন কলকাতা যখন খটখটে শুকনো, পিচ ফিচ ফেটে গেছে, মানুষ একটু আর্দ্রতার জন্য মায় মানত অবধি করে ফেলেছে, তখনও বাজার আর স্টেশন নিকটবর্তী এলাকায় কাদা থাকে। এই কাদা কেন এবং কিভাবে সেটা কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু থাকে, থাকবেই, তা লাইনেও এসে পড়ে।
এবার ধরুন আপনি আধঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর লাইনের একদম সামনে চলে এলেন। এবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে। দু-তিনটে অটো এসে ঠিক আপনার সামনে দাঁড়াবে। তারপর চালক ভাই তার থেকে নেমে খুচরোর ব্যাগটা সঙ্গে করে নিয়ে কোথাও একটা চলে যাবেন। কেন যাবেনা জিজ্ঞেস করার যে মানেই নেই সেটা এতদিনে সকলে বুঝে গেছেন।
আরেক রকম হয়। আর এটা ঠিক তখনই হবে যখন আপনার সবচাইতে বেশি তাড়া থাকবে। মানে ধরুন প্রেমিকা অপেক্ষা করছে, বা বোতল। আপনি স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখলেন লাইন নেই। অটোতে উঠে পড়লেন, আরও দুজন জুটে গেলো, অথচ অটো ছাড়ছেনা। কারণ আর একজন জুটছেনা। ওই একজন যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ শুধুই অপেক্ষা। আপনার, প্রেমিকার, গেলাসের।
সবচাইতে বেশি অগ্রাধিকার পান যারা ওই একা আছেন তারা। “একজন” ডাক শুনে তারা লাইনের একদম শেষ থেকে হাত তুলে লুফে নেন বাকিদের ঈর্ষা। সামনে বসে রাজার মত এগিয়ে যান নিজের গন্তব্যে।

চালক:
এই একজন হলেন অটোর দেশের বেতাজ বাদশা। এনার মুড ভালো থাকলে আপনাকে ১০০ টাকাও ভাঙ্গিয়ে দেবে আর খারাপ থাকলে ৮ টাকাও খুচরোতে চাইবে। অটোতে উঠেই নিজের ভাড়াটা খুচরোতে দিয়ে দিলে মনে হয় চালক ভাইয়ের থেকে আপন আর কেউ হয়না।
এনাদের ভেতরেও নানা রকম প্রভেদ আছে। যাদের বয়স অল্প, তারা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে অটোটাকে সাজিয়ে তোলেন। লাল নীল আলো আর অসম্ভব জোরে উব-উব-উব-উব বেসনাদে মাতিয়ে রাখেন। বাস, ট্রাম, লরি কিচ্ছুর তোয়াক্কা করেননা। যে করে হোক অলে গলে যাবে। আর স্পিড! কে বলবে অটো!
বাকিরা হলেন বর্ষীয়ান। এনারা “যাবেন?” জিজ্ঞেস করলে জাস্ট মাথা নেড়ে উত্তর দেন। রাস্তায় বেয়াড়া ট্যাক্সি, দাঁড়িয়ে থাকা বাইক, এখনও ঠিক করে বসতে না শেখা প্যাসেঞ্জার সব্বাইকে ট্রাফিক আইন আর সহবৎ শিখিয়ে দিতে পারেন সেরকম দরকার হলে। এনাদের পুরো ব্যাপারটাই অসাধারণ। ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তা, বর্তমান পলিটিক্স সেই সঙ্গে খেলা সমস্ত কিছু নিয়ে কথা বলতে পারেন মনের মত প্যাসেঞ্জার পেলে।

প্যাসেঞ্জার:
অটো হল পৃথিবীর একমাত্র যান যেখানে সামনে চারজন পেছনে তিনজন বসেন। প্যাসেঞ্জার মানে আমাদের একটা প্যাটার্ন আছে। কেউ কেউ “আমি সামনে নামব” বলে যেন তেন প্রকারেণ ধারের সিট দখল করি। আবার সেই আমরাই যে করে হোক বৃষ্টির সময় মাঝে বসি। কারণ ধারে বসলে যে ধারে বসব জামার সেই ধার চপচপে হবেই। কেউ আটকাতে পারবেনা। কেউ না। বৃষ্টি না থাকলে রডে জমে থাকা জল চুইয়ে চুইয়ে এসে নিঃশব্দে ভিজিয়ে দেবে। কেউ কেউ, এই প্রবণতা সাধান-রত বাড়ন্ত বাচ্চাদের দেখা যায়, তারা পেছন পুরো ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও সামনে গিয়ে বসে।
আবার আমদের অনেক সময় এই ভেবে বিরক্ত লাগে যে পাশের লোকটা কেন বুঝতে পারছেনা অটোটা আমার বাপের সম্পত্তি। আমি একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রিলাক্সিয়ে বসব তা না। সেই শালা সরুন সরুন। আর না সরলে থাই কনুই দিয়ে জায়গা করে নেবে। ইকিরে! সে নয় আমরা একই ভাড়া দেব, একই জায়গায় যাব। তাই বলে আমার অন্যে ও একটু কষ্ট করতে পারবেনা? আমি একটু খুশি হতে পারি তাহলে।

উপসংহার:
খুশি থেকে মনে পড়লো। জীবনে প্রথমবার প্রেম হাত ধরেছিল অটোতে ওঠবার সময়ই। নাহ, ভুল লিখিনি। ধরেছিলাম নয় ওটা ধরেছিলই হবে। নাহলে আমি যা ক্যাবলা হয়তো ওই অটোতে উঠতেই পারতাম না। আবার লাইনে দাঁড়াতে হতো আর দেখে নিতে হতো বুকপকেটে খুচরো পাথর আছে কি নেই। তারপর হাত তুলত হত, যখন শুনতে পেতাম “একজন” !!

প্লুটোর ইন্টারভিউ

রিপোর্টারঃ নিজেকে কি বলবেন?

প্লুটোঃ কি আবার বলব? আপনাদের সুপারিইগো সম্বলিত জীবন। পোচ্চুর ক্ষ্যামতা। গোটা মহাবিশ্বের তুলনায় .000000000000000000১ ভাগের কয়েক হাজার ভাগ সাইজ হও্য়া সত্ত্বের দারুন দারুন গ্ল্যামারাসলি ঠিক করে দিচ্ছেন কে গ্রহ আর কে খনা মা। আপনাদের আমি কি বলব, আপনারাই বলুন।

রিঃ আহা আপনি খামোকাই রাগ…

প্লুটোঃ খামোকা? ধরুন আপনাকে আজ বলা হলো তুই মানুষ তারপর বলা হলো না তুই প্ল্যাটিপাস তারপর আবার বলা হলো না অনেক ভেবে দেখলাম তুই মানুষ। যা ভজহরি মান্নায় খেয়ে আয়। আপনার কেমন লাগবে?

রিঃ না মানে দেখুন…

প্লূটোঃ দেখছি তো বহুদিন ধরেই বাবা। ছোট তকমা সেঁটে দিতে পারলে তোমরা আর কিচ্ছু চাওনা। পাঁঠা বলি দেখলে নার্ভ ফেল হয়ে যায় ইদিকে অকারনে পিঁপড়ে মারো। কেন? কারন সে ছোট। পাঁঠা ডাকে, সে ডাকেনা। তোমার কুকর্ম তোমার চোখের সামনে তুলে ধরবার ক্ষমতা কেউ তাকে দেয়নি।

রিঃ আপনি তো কিছু শুন…

প্লুটোঃ এতদিন শুনিয়েও শখ মেটেনি? শোনান শোনান

রিঃ ছোট বিষয়ে…
প্লুটোঃ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কারোর নিকৃষ্টতা বোঝানোর জন্যে আপনি কোনোদিন তাকে ছোটোলোক সম্বধন করেন নি? ছোটদের কতটা পাত্তা দেন আপনারা ছুনুমুনুগুলূপুচো করা ছাড়া? যা বাজে তাই ছোট, যা খারাপ তাই ছোট। আপনি যে আপনি হয়েই জন্মাবেন সেটা যখন ডিসাইড হলো তখন আপনার সাইজ কত ছিলো বলুন তো?

রিঃ আপনি তো লিটারেল মিনিং এ চলে যাচ্ছেন

প্লুটোঃ যাহ বাবা আপনারা করবেন আর আমি গেলেই দোষ? খারাপ বোঝাতে ছোট শব্দের ব্যাবহার কেন হবে? কেন? যা কিছু ভালো তাই কেন বড় দিয়ে ডিনোট করা হবে? আছে এর কোনো উত্ত্র আপনার কাছে?

রিঃ তাই হয়ে আসছে কিনা…

প্লুটোঃ সেতো এককালে ন-বছরের মেয়েরও বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত, সেটা হয়ে এলে ক্যামন লাগত? হয়ে আসা মানেই ভালো? চেঞ্জের দরকার নেই?

রিঃ নিশ্চয়ই আছে কিন্তু আপনি তো বিষয় থেকে সরে যাচ্ছেন।

প্লুটোঃ একটুও সরছিনা। আসলে আপনাদের বড় হওয়ার লোভ এতটাই বেশি যে ঠিক বেঠিকের জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ভাবেন যা বড় তাই ভালো। তার কথা শোনেন বেশি তার জন্যে ভাবেন বেশি। গোটা বছরের শুধুমাত্র ছোটদের জন্যে কটা সিনেমা তৈরী হয়? ইদিকে বলবেন আজকালকার বাচ্চা খুব পাকা। আরি ওদের চারপাশে তো সবসময় দেখচে সব্বাই বড় হতে চাইছে। আর ওরা চাইলেই দোষ।

রিঃ আপনি কি চান?

প্লুটোঃ আমার চাওয়া না চাওয়াতে কি এসে যায় ভাই? আমি তো ছোট। আমি সিনেমার কমিক রিলিফ, কলেজের বারোয়ারী মশকরা। আমি হাইহিলের পায়ে পড়ে মেট্রোর হাতল ধরবার চেষ্টা আর তাই দেখে নল্বা বড়সড় দের জুত করে হাতল বাগানোর উদ্দেশ্য। আমি কি বললাম তাতে আর।

রিঃ এইতো এবার তো সুযোগ পাচ্ছেন, এবার বলুন নিজের কথা?

প্লুটোঃ হ্যাঁ উদ্ধার করে দিচ্ছে একদম সুযোগ দিয়ে। আসলে আপনারা তাকাতে শিখেছেন অন্য ভাবে। আকাশ ধরতে গিয়ে বিকেলে তাতে রঙের খেলা আপনাদের কাছে মাঠে মারা যায়। বড় অবশ্যই ভালো তবে ছোট মানেই যে খারাপ না, অসহায় না এ আপনাদের ধারণার বাইরে। বড় কিছু দেখে আপনারা তার মত হয়ে গিয়ে দেখতেই পাননা কতগুলো ছোট আসলে বাঁধা আচে একসাথে।

রিঃ আপনার কথা মত তাহলে পিঁপড়ে মারা আর মানুষ মারা সেম ক্রাইম তাই তো?

প্লূটোঃ আলবাত তাই। অকারণে যে কোনো কিছুকেই হত্যা করা তা সে পিঁপড়ে হোক কি মানূষ।

রিঃ তার মানে কারণ থাকলে মারাই যায়?

প্লুটোঃ দেখেছেন, এই হলো আপনাদের সবচাইতে বড় শক্তি। যেটা বলা হলোনা সেটাকেই টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে যুক্তি খাড়া করবার অযৌক্তিক ইতরশ্রেষ্ঠ উপায়। না বেকার আপনার সময় নষ্ট করে লাভ নেই। হ্যাঁ পৃথিবীতে ছবি যাওয়ায় আমি ক্যাতাত্ত বোধ করছি। আশা রাখছি আগামী কয়েকশ বছরের মধ্যে আপনারা এটাকেও পিকনিক স্পট বানিয়ে ফেলবেন, অনেক শুভেচ্ছা, রসোগোল্লা খেতে খুউব ভালোবাসি, ইত্যাদি, প্রিতী ও শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন নমস্কার।

রিঃ এইভাবে এড়িয়ে গেলেন

প্লুটোঃ আমি যে ছোটলোক ভাই। আমার চারটে বেসিক নিড ফুলফিল হয়নি তার সুপারিগো সফিস্টিকেটেড নয়, আসি।

ফ্যাশন টিভি

সে এক উত্তাল সময়। আবিষ্কারের সময়। কৈশর পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে যৌবনকে ধরবার, কিন্তু সে তখনও বিভিন্ন যোজনার মত যোজন বছর দূরে। সবাই নাকি দেখেছে, সবাই নাকি জানে “কি করে হয়”। আতিপাতি খোঁজ চলছে। ইলেভেনের দিদিদের কিছুতেই দিদি বলতে মন চাইছে না। নতুন ম্যাডাম ক্লাসে এলে বসন্ত বিলাপ। এরকম এক টালমাটাল মুহুর্তে দেবদূতের মত হাজির সে। বোতাম টিপলেই সমস্ত গোপন স্বপ্ন বিড়াল হাঁটছে তো হাঁটছেই। বাবা মায়েরা চাইল্ড লক করেও আটকাতে পারছেননা অজানা কে আবিষ্কার করবার অদম্য ইচ্ছে। হাতে রিমোট নিয়ে বাড়ির সব চাইতে রিমোট এরিয়াতে চলছে না দেখা পৃথিবী যাপন।

আমরা এক ম্যাড়ম্যাড়ে সময়ে জন্মেছি। বলবার মত কোন উত্তেজনাই পাইনি। না উডস্টক না নকশাল, কোন বই ব্যান করা নেই। তাই বড়দের ব্যাপারে কৌতুহল ছিলো অপরিসীম। কিন্তু যোগান বলতে সেই টাইটানিকের “ছবি আঁকার সিন টা”-ই ছিলো সম্বল। কিন্তু এ মাধ্যম হয়ে উঠলো একেবারে আপনার, নিজস্ব রাজধানী। যেখানে কিচ্ছু যাপসা নয়। একেবারে চকচকে ঝকঝকে। এই চ্যানেল আমাদের আর কিছু শেখাক না শেখাক একটা জিনিস শিখিয়েছে। উচ্চারন।

যেহেতু মিউট করে দেখতে হয় তাই আমারা জানতাম এর মালিকের নাম মাইকেল আদাম। ক্লাসের সব থেকে ইফরমেটিভ ছেলেটা খোঁজ আনলো “ও হলো মাইকের জ্যাকসনের ভাই”। আমরা কেউ আপত্তি করিনি। কারন এর আগে ও খবর এনেছিলো বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল আসলে একটা “হেব্বি বিসাল” জন্তুর নাম। ওর চামড়া দিয়ে “জারোয়ারা” এক ধরনের পোষাক বানায় যার নাম বারমুডা। সেখান থেকে আমাদের বারমুডার নাম এসেছে। তারপর ও আবার নাসায় ঘুরতে গেস্লো যেটা ক্লাসে সব্বাইকে বলেনি তাই ওর দেওয়া তথ্য অস্বিকার করবার হিম্মত আমাদের কারোর ছিলোনা।

ওই একদিন এসে বলল – গন্ধ পাচ্ছিস? বাবা কিনে দিয়েছে, “চ্যানেল”(Chanel) এর সেন্ট। তারপর সত্যি বলছি সারাদিন যেন একটা দারুন মিঠে গন্ধ পেলাম। ওর ইজ্জত আরও খানিকটা বেড়ে গেলো। সব্বার মনে একটাই প্রশ্ন “লিঙ্গারী”(Lingerie) টা ঠিক কখন কখন দেখায়? “হিউট কাউন্টার”(Haute Couture) দেখে আরেক বন্ধুর অমর উক্তি “হাইডি কুলুম (Heidi Klum) যেন কেন এসব করে?” এছাড়া “ডলিস আর গাবানা”(Dolce ans Gabbana) “জরেজিয়োহ আমানি”(Giorgio Armani)(কে একজন বলেছলো ওদের “আর” টা উচ্চারন করতে নেই) এসব তো আছেই।

চ্যানেলটা ফাস্ট বেঞ্চ লাস্ট বেঞ্চের ভেদাভেদটা মুছে দিয়েছিলো। যে ছেলেটা জীবনে কোনদিন ইংরিজীতে পাশ করতে পারেনি সেও জানতো “মিডনাইট হট” কখন হয়। তাকে একবার টিচার জিজ্ঞেস করলো – “বল শি ইজ ফলিং মানে কি?” সে বলল “মেয়েটা হলো হেমন্ত”। বেশীরভাগ দিনই কেউ ছলছল চোখে এসে জানান দিত বাবা ধরে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সব্বার একবাক্য প্রশ্ন- “কি চলছিলো?”। কেউ যদি উত্ত্র দিতো “ক্যালেন্ডার” তার দুঃখে আমরাই ধরে রাখতে পারতাম না চোখের জল।

ভুগোল স্যারের থেকেও ভালো পৃথিবী চিনিয়েছিলো এই চ্যানেল। মিলান, প্যারিস, মায়ামী হয়ে গেছিলো ঘরের উঠোন। “মডেলার”-রা (যারা মডেল হয় তারা মডেলার) যখন কেকের ওপর আগুন জ্বালিয়ে আমোদ করত আমারাও তখন তাদের খুশিতে পাগল হয়ে যেতাম। এক বন্ধু সেই দেখে কালী পূজোর দিন ফুলঝুরী জ্বালিয়ে জমাট বাঁধা খিঁচুড়ির ওপর লাগাতে গিয়ে বেকুব বনে গেলো। সেই ইনফরমেটিভ আবার বলল “ওগুলোর নাম ফুড ফায়ার। পুরোটা জ্বলে গেলে কাঠিটা চুষে চুষে খেতে হয়। ওর বিশাল দাম। পার্ক স্ট্রীটে পাওয়া যায়, আমি খেয়েছি”

দাম তো অবশ্যিই ছিলো। সেই অফুরান বোকামী গুলোর। বোকা বাক্সে আলাদীনের আশ্চর্য হীরেটা পেয়ে যাওয়ার দিন গুলোর। কেবলওয়ালাকে মারব বলে প্ল্যান করবার (চ্যানেলটা বন্ধ হয়ে গেলো বলে)। তারও দাম এখন অল্প, ফ্যাশন টিভিরও। চ্যানেলটাকে আর এখন কেউ পাত্তা দেয়না, চাইল্ড লক করেনা। দামী রেঁস্তোরা এখন সপরিবারে উপোভোগ করে ফ্যাব্রিকের কারুকাজ, মুখশ্রির উল্কি। আমরা যৌবন পেয়েছি আর চ্যানেলটা…নাহ তার যৌবন এখনও বেঁচে আছে, আমাদের কৈশরে, আমাদের বড় হওয়ার দিনগুলোতে, “লিঙ্গিরিতে”, “মৌলিন রুগের”(Moulin Rouge) নাচে। দাপটে বেঁচে আছে সে। থাকবেও। আমরন কাল, মিউট হয়ে রাতের অন্ধকারে।

ফলসা, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গৌরী সেন ইত্যাদি

Okolkata_OK_-_Ramyarachona-1024x160

সেই অনেক কাল আগে, চন্দননগরে আমাদের একটা বাড়ি ছিল। সেই বাড়ির লাগোয়া এক বেশ বড় বাগান ছিল। সম্ভবতঃ বিঘেখানেক। সেই বাগানে একটা মাঝারি গোছের গোল চৌবাচ্চায় রঙিন মাছ পুষত মণিকাকু।সেখানে কলতলায় বিকেলবেলা গা ধুয়ে চুলে বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে আমার গরমের-ছুটিতে-বাপের-বাড়ি-বেড়াতে-আসা পিসিরা পাঁচিলের ওপাশের বাড়ির মেয়েদের সাথে গপ্পো করত। সেখানে সন্ধ্যের মুখে বাগান আলো করে ফুটত ম্যাজেন্টা, হলুদ আর সাদা সন্ধ্যামালতী। সন্ধ্যামালতী শেষ বিকেলে ফোটে, চাঁদ ডোবার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। সূয্যির সাথে তাদের সদ্ভাব নেই। সকালে সেইসব ঘুমিয়ে পড়া সন্ধ্যামালতীই জায়গা পেত ঠাকুরের আসনে। আমি আর মণিপিসি সেই ম্যাজেন্টা সন্ধ্যামালতীর ফুল জলে চটকে পুতুলের বিয়েতে শরবত বানাতাম। সেই বাগানের এক দিকের ভাঙা পাঁচিলের গায়ে একটা লাল টকটকে পঞ্চমুখী জবার গাছ সারা বছর আমাদের বাড়ির এবং আশে পাশের গোটা দুয়েক বাড়ির পুজোর ফুল যোগাত। আর ছিল টগর আর কল্‌কে ফুলের গাছ। সেই বাগানের এক কোনে একটা খাটা পায়খানাও ছিল। সেখানে বাড়ির পুরুষেরা গামছা পরনে, এক হাতে একখানা জঘন্য দেখতে বালতি ভরে জল নিয়ে আর অন্য হাতে বিড়ি বা সিগারেট লুকিয়ে সকালের প্রয়োজনীয় কম্ম সারতে যেত। সেই তিন ধাপ সিঁড়ি ওঠা ইঁট বেরোনো, শ্যাওলা ধরা ঘরটা, যেটার সম্পর্কে আমার যথেষ্ট ভয় ছিল, সেই অবধি যাওয়ার ছোট্ট পথ টুকু অতি পরিষ্কার করে ঝাঁট দেওয়া থাকত আর তার পাশ দিয়ে দিয়ে রং-বেরঙের পাতাবাহারের গাছ লাগানো ছিল। এহেন ‘ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনিং’ কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল কে জানে! সেই বাগানে আরো ছিল বেশ কয়েকটা আম গাছ; সাথে ছিল জামরুল, কাঁঠাল, কলা, নারকেল ইত্যাদি ফলের গাছ ছিল। গরমের ছুটিতে বাবা-কাকারা আমগাছে উঠে আম পাড়তেন। দাদুকে এক-দুবার দেখেছি নারকেল গাছে উঠে নারকেল পাড়তে। তখন দাদুর ষাট অবশ্যই পেরিয়েছিল। নারকেল পেড়ে বাগানের শেষ কোনায় মানকচুর জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা দাদুর পায়ে আটকে থাকা জোঁক ছাড়াতে নুন আনতে হত। আমাদের সেই নোনা ধরা দেওয়ালে ঘেরা, শামুক -পিঁপড়ে-জোঁক পরিপূর্ণ বাগানটা ছিল মণিপিসি আর আমার পুতুলের সংসারের জন্য এক অভাবনীয় সুপারমার্কেট। Continue reading “ফলসা, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গৌরী সেন ইত্যাদি”

শীতবদল

‘সব ঋতুর সেরা বাঙালির তুমি শীতকাল’ – মান্না দে এমন একখানি গান বাঁধলে ফুটবলের মতই সেটি সমান আদর পেত।

আরামপ্রিয় বাঙালির কাছে শীতকাল হল শেষ পাতের মিষ্টি দইয়ের মতো . . নিজের মিষ্টতা আর ঠান্ডা দিয়ে যে ধীরে ধীরে সব বাঙালি মনকেই আচ্ছন্ন করে বছর শেষে।

আর গড়পড়তা বাঙালির মতই আমারও বছরের মধ্যে সবথেকে প্রিয় সময় শীতকাল (অবশ্যই দুর্গাপূজার সময় ছাড়া – বছরের ওই সেরা সময়ের সাথে তুলনা করা বারণ।)

sheetbodol
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

নতুন আলুর গায়ে লেগে থাকা মাটি আর নলেন গুড়ের গন্ধে মেখে থাকা শীতকাল আমার ভীষণ পছন্দের – সেই ছোটবেলা থেকেই।

জন্মসূত্রে আমি নব্বই দশকের শেষের দিকের -‘The nineties kids’ – বলতে যা বোঝায় এক্কেবারে তাই। মানে সেই চিত্রহার – চন্দ্রকান্তা, গণেশের দুধ খাওয়া – সূর্যগ্রহণে ডায়মন্ড রিং দেখার সময়ের।

তো সেই নব্বই পেরিয়ে এই বিংশ কালের স্টেশনে পৌছোতে গিয়ে অনেক নতুন বদল চোখে পড়েছে – প্রতিনিয়তই পড়ছে। অবশ্য এটা মনে হতেই পারে বদলে যাওয়াই বেঁচে থাকা – হক কথা। বদল না হলে পরিবর্তন হবে কী করে?তাই তো কোডাক ক্যামেরা চলে গিয়ে সেলফি ক্যামেরা এসেছে, চিঠি লেখা চলে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ এসেছে। আর এই বদলের হাওয়ায় আমার সাধের শীতের উত্তুরে হাওয়াও তার পথ বদলে ফেলেছে। কেমন সেই হাওয়াবদল? একবার পিছিয়ে যাওয়া যাক ছোটবেলার সেই ফেলে আসা শীতকালে।স্কুলে পড়ার সেই শীতের দিনগুলো শুরু হত একরাশ মিষ্টি রোদের আদর মেখে। কুয়াশার চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভাঙা সেই দিনের নিজের একটা ম্যাজিক ছিল। এখনও তো দিন শুরু হয় – কিন্তু সেই ম্যাজিক কোথায়? নিত্যদিনের কাজ মিটিয়ে আমরা যখন ঘুমাতে যাই রাত গড়িয়ে তখন মাঝ রাত। অতএব সকালের সূর্য দেখার সৌভাগ্য আমাদের নেই। এত আরাম করে বসে চায়ের আদর নিলে জীবনে অনেকখানি পিছিয়ে যেতে হবে যে – সামনের দিকে তো খালি এগিয়ে যাওয়া – থামতে মোদের মানা। তাই হারিয়ে যাচ্ছে আমেজের চায়ের কাপ। এই শীত দিন শুধুই ইন্সট্যান্ট কফি আর সবুজ চায়ের দিন।চায়ের মতই হারিয়ে যাচ্ছে কড়াইশুঁটির কচুরি-নতুন আলুর দমের সাথে জিভে জল আনা জলখাবার। স্বাস্থ্য সচেতনী বাঙালীর প্লেটে এখন সার্ভ হয় কর্ণফ্লেক্স, ব্রাউন ব্রেড, ফ্ল্যাক্সসিড। শরীর ভালো রাখতে গিয়ে মনকে খারাপ করে ফেলছি না তো?   হারিয়ে গেছে দুপুরের রোদ পোহানো আর শীতের ছুটির পাড়া ক্রিকেট। মনে পড়ে রোদ ঘেরা বারান্দায় বসে দাদু সারা দেশের খবর নিত – না না ফোনে নয় – খবর দিত দৈনিক সংবাদপত্র। আর দুপুরের রোদের আঁচে ছাদে বসে দিদা আসনে তুলত নিত্যনতুন ছবি। চোখে আরাম দেওয়া এই খুব প্রিয় ছবিটা এখন আর চোখেই পড়ে না – আমার তো নাই, আর আমার বিশ্বাস খুব কম বাঙালীর চোখেই এখন এমন ছবি ধরা পড়ে। আর শীতের ছুটিতে দুপুরের রোদে ক্রিকেট – সেও বেহদিশের পথে। মোবাইল আর প্লেস্টেশনের দৌলতে ব্যাটবল এখন ঘরবন্দী। হারিয়ে যাওয়ার এই লিস্টে ধীরে ধীরে যোগ হচ্ছে আর একটি নাম – পিকনিক! মনে পড়ে ছোটবেলা শীতকাল মানেই ছিল পিকনিক কাল। একটা অন্তত পিকনিকে যেতেই হবে – এটাই ছিল না বলা, না লেখা নিয়ম! ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ২৬শে জানুয়ারি – এই ছিল পিকনিক ক্যালেন্ডার। সেখানে হইচই করে রান্নাবান্না, রোদে বসে লুচি-আলুরদম আর মাংস-ভাত সহযোগে সেই চড়ুইভাতির সেই আনন্দ ছিল বছরের সেরা পাওনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই নিয়মও এখন অনেকটাই ফিকে। পিকনিকের সেই মুখভরা হাসি, পিকনিকের সেই প্রেম, পিকনিকের সেই পেটপুরে খাওয়া – সব নিরুদ্দেশের পথে। এখন আর এত সময় কোথায় যে সারাদিন আড্ডা দিয়ে, ব্যাডমিন্টন খেলে, রোদ পোহাতে পোহাতে একটা গোটা দিন নষ্ট করব? তাই পিকনিকের জায়গা দখল করেছে রেস্তোরার কিছু নতুন নামে মোড়া ডিশ আর মেপে আড্ডা। এই পরিমিত ভোজনের পোশাকী নাম – ব্রাঞ্চ! শীত মানেই তো বড়দিন আর বড়দিন মানেই কেকের দিন। মা-কাকীমারা প্রেশার কুকার বা পুরোন দিনের কেক তৈরির মেশিনে অনেক বাদাম দিয়ে বানাতো বড়দিনের কেক। সেই কেক বড়দিনের খুশীকে আরও বড় করে দিত। এখন শীত পড়তেই কিছু কেক রেস্তোঁরা বা বড় বড় হোটেলে ‘কেক মিক্সিং’ নামে একটি উৎসবের চল হয়েছে। এই ‘কেক মিক্সিং’ ব্যাপারটি আসলে হলো কেকের প্রস্তুতি পর্ব। সবাই একসাথে মিলে কেকের বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে বড়দিনের মাসকে স্বাগত জানায়। এই পর্বটি বেশ মজাদার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই পোশাকী পাবনের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপার্বণের। খুব প্রিয় একটা ছবি এখনো মনের ফ্রেমবন্দি। ছোটবেলার পৌষের একটা হিম সন্ধ্যেবেলায় ঠাম্মা-দিদা, মা-কাকীমাদের একসাথে বসে পিঠেপুলি বানানোর ছবি। সেখানেও ছিল সবার হাতের ভালোবাসার ছোঁয়া। ‘কেক মিক্সিং’এর মত সেই পিঠেপুলির উৎসবের ছিল নিজস্ব মিষ্টতা – অনেকখানি ভালোবাসা আর নতুন গুড়ের মিষ্টতা। শীত বদলের আগে মানে সেই নব্বই দশকের ঠান্ডাকালে আরেকটা মন ভালো করা চল ছিল। পাড়ায় পাড়ায় গানের জলসার চল। পাড়ার দাদা, পাশের পাড়ার কাকীমা, তার পাশের পাড়ার পিসিমা – সবাইকে একজায়গায় আনতে এই গানের উৎসবের জুড়ি মেলা ভার ছিল। শীতের হিম সন্ধ্যায় শালের গরমে বসে সেই গান শোনার স্মৃতিরা এখনও আসা যাওয়া করে। পাড়াতুতো সঙ্গীতানুষ্ঠানের চল এখন প্রায় উঠেই গেছে। ‘সফিস্টিকেশনের’ পাল্লায় পড়ে এই গান পার্বণেও এখন বেশ ভাঁটা পড়েছে। মফঃস্বলের কিছু পাড়ায় এখনো অবশ্য বসে গানের জলসাঘর। এইভাবেই নিরুদ্দেশের এই লিস্টে রয়েছে হাজারো একটা হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস। নারকেল তেলের জমে যাওয়া শালিমারের টিনের কৌটো হারিয়ে গেছে ‘ননস্টিক হেয়ার অয়েলের’ ভীড়ে, জয়নগরের মোয়ার বাক্স হারিয়ে যাচ্ছে ‘সুগার ফ্রি’ মিষ্টির মাঝে, শীতের রোদের চিড়িয়াখানার পিকনিক হারিয়ে যাচ্ছে শপিং মলের ‘ফুড কোর্টের’ খাবারের আড়ালে। আর আমার কলকাতা একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে এই শীতবদলের মরসুমে।

হারিয়ে যেতে যেতে যেটুকু পড়ে আছে তাই নিয়েই এখন আমাদের শীতদিন কাটে। দিদার হাতে তৈরী পুরোনো রেজাইয়ের গরম, পৌষ পার্বণের দিন না হলেও শীতের মধ্যেই কোনো একদিন মায়ের হাতের তৈরী নতুন গুড়ের পায়েস আর হঠাৎ করে ফিরে পাওয়া অলস শীতের দুপুরের ভাতঘুম – অনেক হারিয়ে যাওয়ার মাঝেও এরা ফিরে আসে পুরোনো অভ্যাসে আর শীত ছড়িয়ে পড়ে কমলালেবুর খোসার মত চারপাশে।

আজও একটি ব্র্যান্ড

তিনি নদীই হোন বা দেবী  তিনি আমাদের কাছে পূজনীয়া সর্বশুভ্রা সরস্বতী । নদী বা দেবী কিম্বা  দুটোই ভেবে নিয়ে আমরা সরস্বতীর পায়ে বছরের পর বছর চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি  ।  কিন্তু যদি ভেবে নিই তিনি আমাদের মধ্যে কোনো একজন মেয়ে তাহলে সমাজের স্তরে স্তরে এমন মেয়ের গল্প কিন্তু আমাদের খুব চেনাজানা ।

এমন  গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি  পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের  শক্তিমান পুরুষদের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । অব্যাহত থাকে তার লড়াই। চলুন সেই  কিম্বদন্তীর কড়চা খুলি আধুনিক ভাবে।

Saraswati

 

কোনও এক সময়

একদিন  ব্রহ্মার তলব তাঁর মেয়ে সরস্বতীকে । সে মেয়ে তখন নদী। উঠে এল পাতাল থেকে। বাপের চাহনি সুবিধের নয়, তা মেয়ে জানত। বাপ বলল,

-এবার তোমাকে আমার কাছে সর্বক্ষণ থাকতে হবে, এ আমার আদেশ ।

মেয়ে বলল, কারণটা কি শুনি? বাপ বলল, আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা গায়ত্রী জপ করব।

মেয়ে বলল, মামদোবাজি পেয়েছ? বুড়ো ভাম একটা। ঐ পুজোর ছুতোয় আবার আমার গায়ে হাত দেবে? আমি পুরুষদের থেকে সর্বদা দূরে দূরে থাকতে পছন্দ করি।

– সব পুরুষ আর আমি বুঝি এক হলুম?

মেয়ে বলল, আমি কি আর জানিনা? তোমার চারটে মাথা, আটটা চোখ, সর্বদা ঘুরছে আমার পেছন পেছন।

–  মনে রেখো তুমি আমার মেয়ে।

সরস্বতী গর্জে উঠে বলল, তো কি, তাহলে জেনে রাখো তোমার জন্যেই বিশেষতঃ আমি পাতালে থাকি।

মেয়েটা তখন ছুটল মহাদেবের কাছে।

-ঐ দ্যাখো, শিবুকাকা! বুড়োটা কি বলে! বলে কিনা আমাকে ভোগ করবে।

-হ্যাঁ, বলিস কি রে? ব্যাটা বুড়ো , বাপ্‌ হয়ে তোর দিকে নজর দেয়? শিবুকাকা মানে মহাদেব বললেন।

-জানো? ঐ যে তোমাদের স্বর্গের দালাল? কি যেন নাম? হ্যাঁ, মদনবাবুকেও বলছিল চুপি চুপি, আমি শুনেছি সে কথা….” মদন কিছু করো, এই সুন্দরী কন্যার প্রতি সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা যে “

-বলিস কিরে? এত বড় স্পর্ধা! এই সেদিন করে সভায় বড়মুখ করে ব্রহ্মা বলল, ” ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন, আজ থেকে আমারও মানস কন্যা এই মেয়েটির নাম দিলাম সরস্বতী ”  আর আজ সে তোকে কামনা করছে?  এড়িয়ে চল, পালিয়ে যা মা!

সরস্বতী বলল,

-কোথায় যাব? তাঁর দুষ্ট দৃষ্টি যে সর্বদা আমাকে চোখেচোখে রেখেছে। নিস্তার নেই আমার।

মহাদেব বললেন,

-তবে রে? দাঁড়া, ঐ কামদেব মদনকে আগে ভস্মীভূত করি! ব্যাটার দালালি করা বের করছি আগে।  ব্রহ্মা ভেবেছেটা কি তার পেশীর জোর আমার থেকেও বেশী? এবার দ্যাখ, কে বেশী শক্তিমান। কার কত বাহুবল?

সরস্বতী বলল, বাঁচালে শিবুকাকা! তুমি‌ই আমার সত্যিকারের পিতাশ্রী।

আবার দিন-কয়েক পর….

 ব্রহ্মা গেলেন ক্ষেপে। সরস্বতীকে তেড়ে গিয়ে তার প্রতি খুব দুর্ব্যবহার করে বললেন, তবে রে? আমি তোর কে ভুলে যাসনিরে মেয়ে।

মহাদেব তখন শরবিদ্ধ করে ব্রহ্মাকে হত্যা করলেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন।

আবারো কোনও একদিন

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন সেই  বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে…. ।

– সুন্দরী, কি অপরূপ লাবণ্যময়ী তুমি! তোমার নরম চাহনি, তরঙ্গায়িত, সুললিত শরীর, একটু জল দেবে?  প্রচুর জল চাই, প্রাণ ভরে দিতে পারবে তোমার জল?

সে মেয়ে ভাঙে তবু মচকায় না। পারলে চ্যালাকাঠ নিয়ে তাড়া করে ইন্দ্রকে। তার ছলাকলা বুঝতে বাকী নেই। স্বর্গে তার খুব নাম খারাপ। মেয়েছেলে দেখলেই সে ছোঁকছোঁক করে! মনে মনে ভাবল সরস্বতী।

– আমি কি বুঝিনা তোমার দুরভিসন্ধি? আসল কথা বলো!

ইন্দ্র বলল,

– পালাবে আমার সাথে?  সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিল ।

সরস্বতী  ইন্দ্রের মতলব বুঝতে পেরে  তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান ।

সে বলল,

– বাপু তুমিও সুবিধের নও।  ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে আমার  গতিপথ ঘোরাব । কিন্তু তোমার সাথে যাবনা।

অবশেষে ব্রহ্মার অনুরোধে সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেল সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । নিজে ক্রেডিট নেবেন তিনি। নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। আরও পাঁচজন সাথে থাকলে ব্র্যান্ড ডাইলুশ্যান!  যাই বল সরস্বতী ব্র্যান্ড নিঃসন্দেহে জবরদস্ত ।

পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেল সরস্বতী আর তক্ষুনি মহাদেব বললেন

– কি রে মেয়ে? এত ঘুরিসনা। অত ধকল কি মেয়েছেলের সহ্য হয়? আবার পথে বিপদ হতে পারে। যা সব বদমায়েশ লোকজন পথেঘাটে!

নে এবার আগুণ নিভিয়ে দে তোর জল দিয়ে। আমি তোর সুবিধের জন্য সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে  নিয়ে এসেছি ।

সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল । ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র ।

অন্য কোনদিন

আবারো স্বর্গে দুই দাপুটে ঋষি, বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠর কত অত্যাচার সহ্য করল এই মেয়ে। দুই ঋষির কি ছোঁকছোঁকানি এই সরস্বতীকে নিয়ে!  দুজনেই চায় এই মেয়েকে ভোগ করতে।

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । কাছেই বিশ্বামিত্রের আশ্রম। বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রে আদায়-কাঁচকলায়। দুজনারই ক্রাশ। দুজনারই টার্গেট সরস্বতী।

বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন

– বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচণ্ড বেগে  লণ্ডভণ্ড করে প্রবাহিত হও নয়ত খুব খারাপ হবে  , বলে দিলাম ।

সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । সে মনে মনে ভাবল,  নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে বুড়োর।

– আমি তো কারো ক্ষতি করিনা সাধু!তুমি কি চাও বল তো।

– আমি চাই ব্যাটা পাজি বশিষ্ঠ যেন আমার ত্রিসীমানায় না থাকে।

অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশ্বামিত্র তো বেজায় খুশি । মনে মনে ভাবল, এদ্দিনে বশিষ্ঠ জলে ডুবে মারা যাবে আর সে তখন সরস্বতীকে পেয়ে যাবেই।   কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনও হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেন ও বিশ্বামিত্রের এহেন দুরভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন । সেই দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম “শোন-পুণ্যা” ।

এবার দেখি সরস্বতী নামে আমাদের মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা বাড়ান নি ? না কি আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন ?  না কি একাধিক সপত্নীর সাথে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ?

নাহ, তিনি পালিয়ে যান নি। পরাজিত হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী ।

কালের কপোলতলে

বিষ্ণু ভাবছিলেন গঙ্গা, লক্ষ্মীর পর সরস্বতীর সাথে যদি ঘর বাঁধা যায়। অমন সুন্দরী, বিদুষীকে ঘরণী করলে মন্দ হবেনা। সরস্বতী তা বুঝতে পেরেই সমূলে বিষ্ণুর সেই প্ল্যানে কুঠারাঘাত করলেন। পুরুষের প্রতি তদ্দিনে তার ঘৃণা জন্মেছে। বিয়ের ফাঁদে আর নয়।

দুই স্ত্রী গঙ্গা আর লক্ষ্মীর মধ্যে বিষ্ণু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন । নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুঃখ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।

গঙ্গার মুখোমুখি হলেন ।

– শোনো গঙ্গা এটা কিন্তু ঠিক হচ্চেনা। তোমার স্বামী কিন্তু লক্ষ্মীরো স্বামী। সেটা মনে আছে তো?  লক্ষ্মী কেমন মনে মনে কষ্ট পায়, ডুকরে কাঁদে, তুমি দেখতে পাওনা?

লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন ।

সরস্বতী বললেন, যা বাবা, যার জন্যে চুরি করি, সেই বলে চোর?

সে নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছে বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিল ।

ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন। বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।

সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ?   রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা “থাকাথাকি’তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা ।   সরস্বতী সাজগোজ , পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি “হেড টার্নার’ ; হতেই পারে । সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণে বলা হয় সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে ।

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে নির্ভয়া, দামিনী বা আমানত হয়ে যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া ! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে ।   সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় !!!

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না – ৬

আগের পর্ব


 

সাত দুকুনে চোদ্দর চার – হাতে রইল পেনসিল


 

প্রজেক্ট ম্যানেজ সিরিজ অনেকদিন বন্ধ ছিল। কেন বন্ধ ছিল জিজ্ঞেস করায় এক এক জনকে এক এক রকম উত্তর দিয়েছি। যেমন – “তর্ক নেই বলে লেখা হচ্ছে না!”

“কেন – সে গেল কোথায়?”

“জলদাপাড়া”

“জলদাপাড়া – বলো কি?”

“থুড়ি – কাজিরাঙ্গা”

“ধুত্তেরি তাতে কি?”

“না মানে জঙ্গলে গিয়ে গণ্ডারের প্রেমে পড়েছে – তার বগল, কনুই, গলার এমন ছবি তুলেছে – যেন দীপিকা-ক্যাটরিনা-আলিয়ার ককটেল। সেই ছবি দেখতে দেখতেই তার সময় কেটে যাচ্ছে, বড় একটা হাসিঠাট্টা করছে না – ফলে গপ্পের আসরও বসছে না।”

আবার হয়তো কখনও পুজোর সময় পাড়ায় ঘুরছি – এমন সময় একজন ইস্কুলের মাস্টারমশাই বললেন, “তোমার লেখা খুব পড়ছি – অফিসের গল্পগুলো তো বেশ মজার।”

লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসলুম। একে তো ঘটনাগুলো কহতব্য নয় – তার ওপরে আমার এক কালের মাস্টারমশাই সেইসব আনসেন্সরড লেখা পড়েছেন – আর আমি সেই কলঙ্কিত ছাত্র কিনা তাতে লজ্জা লজ্জা পেয়ে ব্লাশ করছি। বললাম, “আপনি যেরকম ভাবছেন, তেমনটা ঠিক নয়”

“মানে?”

“মানে গল্প – কিন্তু বানান নয় – এমনটা হামেশাই ঘটে থাকে।”

“বল কি?”

পাশ থেকে আমার কাকা চাপা গলায় বললেন, “বেশি বলিস-নি -অন্য পাড়ার মেয়ে বিয়ে করতে হবে বলে একটা লোক চিরকুমার থেকে গেল!”

অমনি নারদ নারদ লেগে গেল।এখন কাকা আর মাস্টারমশাই বাল্যবন্ধু – তাঁরা ফাজলামি করতেই পারেন, তাই বলে আমার সামনে? তাই সসম্মানে কিছুদিন চুপ করে রইলাম।

এখানে শেষ হলে তাও কথা ছিল– কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না – বাঘের ঘরে ঘোঘের বাসা না কি যেন? সেরকম একদিন আমার বসেরও বস – একদিন আমাকে তেনার অ্যাকোরিয়ামে – থুড়ি ক্যাবিনে ডেকে পাঠালেন। “শুনলাম তুই নাকি ব্লগ করিস?”

“ইয়ে ঐ একটু আধটু?”

“কি লিখিস?”

“ফিরিঙ্গি কবিতে আর বাংলায় এলেবেলে গল্প দু একটা”

“বলিস কি – কিরকম পড়াস তো আমাকে-”

খুবই বিড়ম্বনায় পড়লাম – একে তো অফিসের গল্প। নাম-ধাম-চরিত্র যদিও অবফাসকেট করা আছে, তাও পরিচিত লোকজনের চেনা মুখগুলোকে খুঁজে নিতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “তোমার খুব একটা ভালো লাগবে না – একটু খিল্লি লেখা-”

“বলিস কি – তবে তো পড়বই। এটা তো খিল্লিরই যুগ- অবশ্যই পাঠাস আমাকে – হোয়াটস- অ্যাপ ও করে দিতে পারিস।”

অফিসের আর দশটা হুকুম তামিল করার সময় যেমনি ঘাড় নাড়ি – তেমনি নেড়ে বিদায় নিলাম। মনে মনে বললাম, “যে এই লেখা পড়লে আমাকে আর যে যে দুঃখ কপালে বাকি আছে, আর বেশিদিন বাকি থাকবে না। ” সত্যি কথা বলতে কি হঠাৎ করে এই লেখাটাও কারও সুনজরে পড়ে যাবে কি না তো জানি না, অনেকেই ঠারেঠোরে বলেছেন যা বোঝ না তাই নিয়ে লেখা তোমার উচিত হচ্ছে না। সব মিলিয়ে চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু বেশিদিন চুপচাপ থাকা যায় না – পেটের ভেতরটা ভবম হাজামের মত গুড়গুড় করে – রাজার মাথায় দুটো শিং। একদিন সেই শিং বেরিয়েই পড়ে।

যাই হোক–আজকে যার কথা বলব তাকেনিয়ে আগে লিখিনি। আমাদের অফিসের একটি ছেলে আছে –জ্যোতিষ্ক। এমনিতে সাদাসিধে, নোটবুকে ছবিটবি আঁকে। একদিন ফেসবুকে ছবি দেখলুম – শখ করে বাঘের গায়ে হাত বোলাচ্ছে। মনে মনে বললাম, বাপরে এক কালে স্যার আশুতোষ – আর তারপরেই জ্যোতিষ্ক । যখনই দেখা হয়েছে, বলেছি – “কিরে বাঘটাকে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে আয় একদিন।”সেও পালটা হাসে। একটু লাজুক দেঁতো হাসি। পরে যখন কাজেকর্মে আলাপ বাড়ল তখন বুঝলাম ওরকম থাইল্যান্ড (নাকি ব্যাঙ্কক) গেলে সব্বাই অমন একটু বাঘের গায়ে হাত বুলিয়ে আসে – কিন্তু আদপে সে ঘোর ভীতু। তার কাজই হিসেব রক্ষণ – কিন্তু হিসেবনিয়ে কথা শুরু হলেই – সে চোখমুখ লাল করে ফেলে, জ্যোতিষ্ক থেকে নিভষ্ক হয়ে যায়।

একদিন তাকে অফ-গার্ড ধরলুম। “কেস টা কি বল তো?”

“কোন কেসটা?”

“তোকে এমনিতে তো চালাক চতুর মনে হয় – কাজের বেলায় হঠাৎ হঠাৎ ফিউস হয়ে যাস কেন?”

“আমার মাইগ্রেন আছে”

“সিচুয়েশানাল মাইগ্রেন – আমার সঙ্গে চ্যাংড়ামো হচ্ছে?”

12511272_1169548606406123_1964383651_oঅনেক গাঁইগুঁই করে বললে, “আসলে ঐ অঙ্ক জিনিসটা আমার কিছুতেই মাথায় আসে না – আর তুমি এই ম্যানেজারদের তো জানো – আজ এই হিসেব এখুনি চাই, কাল ঐ হিসেব তক্ষুনিনিয়ে আসবি। আর আমি মাথার চুল ছিঁড়ি – একটা জুনিয়ার দিয়েছে – সে শালা কিচ্ছু করে না। পাঁচটার সময় টুক কেটে পড়ে। আর দিন নেই রাত নেই – আমার খালি হিসেব আর হিসেব – মালগুলো এত হিসেব নিয়ে যে কি করে তার নেই ঠিক।”

হেসে বললাম – “এই ব্যাপার – আগে বললেই হত?” এরপর তাকে একটা বুদ্ধি দিলাম। সে হাসতে হাসতে চলে গেল।

এর পর কদিন কেটে গেছে। দেখা গেল জ্যোতিষ্কর পারফরম্যান্স অনেকটা বেটার। তারপর একদিন তর্ক এসে বললে, “শুনলাম তুমি নাকি জ্যোতিষ্ক-কে কি একটা টোটকা দিয়েছ – আর অমনি সে হইহই করে কাজ করছে?”

“হুঁ”

“আমাদের জন্য যে কতবার বললাম, একটা ভালো দেখতে মেয়েকে নিয়ে এস টিমে – সে তো করলে না – আর যত হেল্প জ্যোতিষ্ককে – তা কি গুরুমন্তর দিলে একটু আমাদেরও বল?”

“সাত দুকুনে চোদ্দর চার হাতে রইল পেনসিল-”

“মানে?”

“মানেটা সিম্পল – আমাদের সঙ্গে কলেজে একটা ছেলে পড়ত। সে যে কোন পরীক্ষাতেই গিয়ে পাতা ভরে লিখে আসত হাতি ঘোড়া পালকি – জয় কানহাইয়া লাল – কি। আর পাশও করে যেত। জ্যোতিষ্ককেও সেরকম বললাম – যে কেউ নম্বর জিজ্ঞেস করলে কনফিডেন্টলি যে কোন একটা নম্বর বলে দিবি – থোড়াই সে তক্ষুনি খাতা খুলে বসে আছে যে তার অন্য কোন কাজ নেই যে নাম্বার মাথায় রেখে দিয়েছে। যা হোক একটা বুক চিতিয়ে বলে আসবি। তারপর দেখবি আর কেউ তোর মাথায় চেপে বসছে না। ”

“আবার ঢপ দিচ্ছ তো?”

“কোনটা ঢপ দিলাম?”

“তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না হিস্টরি – যে পাতা ভরিয়ে নম্বর আসত – আর ভুল ভাল হিসেব কিছু একটা দিয়ে দিলেই চলবে?”

“আহা তা কেন?”

“তবে?”

“ব্যাপারটা হল গিয়ে কনফিডেন্স। আমি জ্যোতিষ্ককে শুধু কনফিডেন্সটাই দিয়েছি – বুঝলি?”

“বাহ – আর ধরা পড়লে?”

“কেন হাতে হাতে পেন্সিল তো রয়েছেই। বুক ফুলিয়ে বলবে -তুমি যখন বলেছিলে, তখনো পুরো চোদ্দো হয়নি। তখন ছিল, তেরো টাকা চোদ্দো আনা তিনপাই। আমি যদি ঠিক সময় বুঝে ধাঁ করে ১৪ লিখে না ফেলতাম, তাহলে এতক্ষণে হয়ে যেত চোদ্দো টাকা এক আনা নয় পাই।”

মাথা নাড়তে নাড়তে তর্ক চলে গেল। আমি বললাম, “কি রে চললি কোথায়?”

“মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। এক কাপ চা খেয়ে আসি। নাহ – তোমার এই থিওরির পাল্লায় পড়ে মাথাটাই যাবে যে কোন একদিন। মনে হচ্ছে এর চেয়ে আমার গন্ডারই ভালো।”

ধুর ধুর – সব্বাই কেমন বেরসিক হয়ে যাচ্ছে।


 

প্রবাসীর ডায়েরি ৪

                                                                     “ভিন্ডি” – “সায়েরি” – “জোড়ি”

আজ আমি অসম্ভব উত্তেজিত। এত এত কথা বলার আছে যে গুছিয়ে সাজিয়ে উঠতে পারছি না। কাকে আগে কাকে পরে রাখবো ভাবতে ভাবতে দিশেহারা অবস্থা।

আর বিলম্ব নয়। ‘জয় জয় নির্মলার জয়’ বলে শুরুই করে দি। নির্মলা আর আমার দুজনেরই অজান্তে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে নির্মলা-কাব্য। আমাকে যে ও খেরোর খাতা হিসেবে দেখে তাতে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু, ও এখনো পর্যন্ত জানে না, যে কেউ আড়ালে আড়ালে ওর দৈনিক সংবাদ লিপিবদ্ধ করার ভার নিয়েছে, বিনা পারিশ্রমিকে। নির্মলার রোজ কাজে আসায় আমি অভ্যস্ত। কিন্তু ও কোন দিন কী প্রসঙ্গে কথা বলবে বা আদৌ বলবে কি না তার বোতাম আমাদের দুজনের কারুর হাতেই নেই। কোন বড় মাপের যন্ত্রীর তত্ত্বাবধানেই এই খেলা সম্ভব। তাই অকারণ জোর খাটানোর প্রশ্নই ওঠে না।

প্রথম অধ্যায় : ভিন্ডি

আমার এক বন্ধুর বাড়িতে তিন চার দিন হল এক বেলার রান্নার কাজে লেগেছে। গত পরশু ভিন্ডির সব্জি বানিয়ে ওদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আমার বন্ধুটির নাকি ভিন্ডি রান্নার গন্ধেই খিদে পেয়ে যায়। বুঝলাম, ভালো রান্না করার প্রশংসা এত অল্প সময়ের মধ্যে হাসিল করায় ও বেশ খুশী। তাও আবার অন্য প্রদেশের লোকের মুখ থেকে। কথাটা গতকালও শুনেছিলাম। আজ আবার শুনে আমারও ‘ভুক্’ লেগে গেল। গতকাল খুব কষ্টে রেসিপি জানার লোভ সামলেছিলাম। হাজার হোক প্রফেশনাল সিক্রেসি থাকতেই পারে। আজ আর পারলাম না। জোয়ান আর পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে টমেটো আর ভিন্ডি বানিয়েছিল। কিন্তু আরো একটা কিছু দিয়েছিল যেটা ওর মনে পড়ছে না। আমি জোর করিনি। কিছুটা হলেও ওর সিক্রেসি ওর অজান্তে রাখতে পারায়, আমি আত্মগ্লানির হাত থেকে মুক্তি পেলাম। সাধে বলি, বোতামের অস্তিত্বের কথা।

দ্বিতীয় অধ্যায় : সায়েরি

ওর গল্প বলার একটা স্বচ্ছ স্নিগ্ধ ধরণ আছে। তারিফ করায় জানা গেল যে কারোর ‘নলেজে’ যদি কোন কিছু  বসে যায় তাহলে তা বলতে কোন অসুবিধে হয় না। কিন্তু, যদি তা না হয় তাহলে মানুষকে দৌড়দৌড়ি করতে নানান রকম খাপছাড়া ঘটনার মধ্যে। ফলে, ‘কিস্সা’ বলতে অসুবিধে হয়। যেন, নলেজ ওর চোখে বিশাল বড় মাপের বাগান বিশেষ। আর কথারা হল সেই বাগানে খেলতে আসা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। কোন বিশেষ কারণে তারা বাগানের এক জায়গায় জড়ো হলেই গল্প তৈরী হতে থাকে।

বললাম , “তোমার বাচ্চাদের গল্প শোনাও?” জানালো, ঘুমোতে যাওয়ার সময় কিস্সা শুনতে ছানারা বেশ ভালবাসে। “কী ধরনের কিস্সা শোনাও – রাজা রাণীর গল্প?” মূলতঃ, যা ওর বাবা- মা-চাচা-চাচী-দাদা-দাদীর কাছ থেকে শুনে এসেছে, তাই বলে থাকে। এছাড়া নাকি সায়েরিও বলে। বললাম, দু একটা শোনাও। দু একটা লাইনেই শেষ এমন সায়েরি শোনার পর বুঝলাম যে ও ধাঁধাঁর কথা বলছে। ঠিক করলাম লিখে নি বরং। লেখার কথা বলতেই সাথে সাথে ঘর মোছার ন্যাতাকে তাচ্ছিল্যের সাথে ফেলে দেয়। ৪ ফুট ৭ ইঞ্চির ৪০ কেজি ওজনের শরীরটা জানালার পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে নিজেকে  ধপ করে ছেড়ে দেয়। দুই হাতলে দুই হাত রেখে বললো, “ঠিক হ্যায়, তো ফির লিখো”।

বগায়ের চ-খাটকে দরওয়াজা বন্ধ্  রহতা হ্যায়। বোলো কেয়া হ্যায়? .. হোঁট্। কথা বলার সময়ই তো ঠোঁট খোলে। আর চৌকাঠেরও কোন বালাই নেই। মনে পরে গেল দেশের বাড়ি আর কালিঘাটের একান্নবর্তী পরিবারে কাটানো বাড়িগুলোর কথা। ফ্ল্যাট বাড়িতে চৌকাঠ কোথায়, সবই ফ্ল্যাট।

ইধার সে গেয়া, উধার সে আয়া। বোলো কেয়া হ্যায়? … নজর। ভাবলাম, অনেক কিছুই তো হতে পারে। আমি কোন তর্কাতর্কির মধ্যে যাইনি।

মুঠঠি মে আতা হ্যায়, পর কুঠিয়া মে নেহি আতা। বোলো কেয়া হ্যায়?  ভাবলাম, মুঠঠি সমেত তো আমি নিজেই কুঠিয়ায় ঢুকে যাবো। কী রে বাবা! … ছাতা। জানলাম, কুঠিয়া মানে আনাজপত্র রাখার জন্য পাতলা লাহার পাত দিয়ে তৈরি ছোট দরজা ওয়ালা ঘর। অনেকটা ধানের গোলার ধরনের।

সব লোক বাজার গ্যায়ে পর মটুয়া নেহি গেয়ে। বোলো কেয়া? মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই মটুয়া রোগা হওয়ার ধান্দায় ছিল। … কুঠিয়া। কুঠিয়া প্রচুর আনাজ খেয়ে এত মোটা হয়ে গেছে, যে বেচারার নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই।

আমারই ঘরে বসে আমাকে হারতে দেখে নির্মলার মনে হয় ভালো লাগছিল না। অকপটে স্বীকার করে নিল যে প্রশ্নগুলো আমার জন্য একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। “ঠিক হ্যায় দিদি থোড়া সিম্পল্ সা সওয়াল করতি হুঁ।”

১০০ বিঘা জমিন। উসকে উপর গাউঠা জায়সা কুছ হ্যায়। বোলো কেয়া? অনেক পরিশ্রমের পর জানা গেল গউঠা মানে ঘুঁটে। যথারীতি আকাশ কুসুম ভেবেও এই ‘সিম্পল্ সা’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। … সূর্য্য। কীরকম জিজ্ঞেস করায়, বললো একশো বিঘা জমি অনেক অনেক বড় হয়। তার মধ্যে সূর্য্যই তো দেখা যায়! বললাম, সূর্য্য তো আকাশে। ওর পাল্টা উত্তর, “কিন্তু আকাশে বললে তো সবাই একবারেই বুঝে যাবে।” একমাত্র  হযবরল শাস্ত্রেই এর ব্যাখ্যা মিলতে পারে।

পরে ভাবলাম, ঠিকই আছে। আকাশ কোথায় শুরু আর ‘জমিন’ কোথায় শেষ এর উত্তর তো কারুর কাছেই নেই। তাই, গোটাটাই একটা বড় ‘জমিন’ ধরে নিলেই সব সমস্যার সমাধান। কিছুটা সবুজ, কিছুটা নীল। কিছুটা নিচে কিছুটা ওপরে। হযবরল ভাবে আছে।

তৃতীয় অধ্যায় : জোড়ি

এবার তৃতীয় এবং শেষ অধ্যায়। … “ওয়ো পতা নেহি দিদি। মুঝে তো সিরফ্ ইয়ে মালুম হ্যায় কে হামারে ইধার যব্ দিন হো তা হ্যায়, আমরিকা ম্যায় তব রাত হোতি হ্যায়।” কী মনে হল ওকে বললাম নিজের চারদিকে ঘুরতে। আর আমি নিজের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে ওর চারদিকে ঘুরতে থাকলাম। ন্যাতা নির্বাক দর্শক। নির্মলা চোখ বড় বড় করে মুখ হাঁ করে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতেই ওকে ভাঙ্গাচোরা হিন্দিতে দিন রাতের ‘কিসসা’ শোনাই। চাঁদের চরিত্রে অবশ্য কাউকে পাওয়া যায়নি। ওর চোখ মুখে বিস্ময়ের শেষ নেই। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অবাক হয়ে বললো, এত সব কথা ওর জানাই ছিল না। ওর বাবা মাও ওকে জানায়নি। এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে ন্যাতাকে নিতে গিয়ে হঠাৎ করে বলে বসলো “উপরওয়ালা কা হিসাব্ সহি হ্যায়, দিদি।” জানতে চাইলাম কীরকম হিসেব?

যদি ‘হরওয়াক্ত’ দিনই থাকতো তাহলে ‘আদমি’ কাজ করতে করতে পাগল হয়ে যেত। পৃথিবীর অন্যদিকে, রাতের লোকেরা ঘুমোতে ঘুমোতে ‘ভুকে পেয়াসে’ই মরে যেত। তাই ওর মতে ভগবানের হিসেবে কোন গরমিল নেই। ভগবান তাই পিঁপড়ে থেকে শুরু করে সব কিছুরই ‘জোড়ি’ বানিয়েছে দিন রাতের মতো।

আমি বাকরূদ্ধ।

পূর্ণা
১৯/০৮/২০১৫
গ্রেটার নয়ডা।

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না – ৫


আগের পর্ব


প-য়ের প্রকার


গম্ভীরভাবে বললাম, ‘পঞ্চ ম-কার কি জানিস?’

তর্ক মাথা চুলকে বললে, ‘কি একটা হয় শুনেছি – ঠিক ঠিক জানি না।’

‘বৈদিক মতে যেমন পঞ্চ-গব্য, তান্ত্রিক মতে তেমনি পঞ্চ ম-কার। ঠিক উল্টোটা। এদের মতে এইটা পবিত্র, তো ওদের মতে ঐটা। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। সবার সাধনার মার্গ আলাদা। বুঝলি কিছু?’

‘তুমি কি ফুল-টাইম প্রজেক্ট ম্যানেজার না পার্ট-টাইম তান্ত্রিক? কে জানে দেখা গেল হয়তো প্রজেক্ট নামান’র জন্য বাড়ি ফিরে নামাবলী পরে বসে থাক?’

‘ওরে গবেট-চন্দর – নামাবলীটা বৈষ্ণব আর পঞ্চ ম-কার তান্ত্রিক। দুটো ডোমেন পুরো আলাদা – একটা ডট নেট তো অন্যটা জাভা, একটা মেইনফ্রেম তো অন্যটা ইউনিক্স। যাই হোক, তান্ত্রিক টান্ত্রিক না তবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ঐ টাইপের একটা জিনিস আছে – তৃতীয় প-কার। এক্কেবারে নৈব নৈব চ। খুব সাবধানে এড়িয়ে চলা উচিত – যে কোন একটাই প্রজেক্টকে লাটে তোলার জন্য যথেষ্ট। মজার ব্যাপার হল এদের কোনওটাকেই লুকিয়ে রাখা সম্ভব না। যতই চেপে রাখার চেষ্টা কর – সে তার নিজমূর্তি ধারন করবেই। তাই ভাবছিলাম সেই ঘটনাটাই আজকে তোদের বলব। তোদেরও তো একদিন বড় হয়ে প্রজেক্ট চলাতে হবে – সব জেনে রাখা ভালো।’

KPMKN-5 illustration - small

কাজ ফেলে গল্প বলতে চাইলে যা হয় আর কি। ভিড় জমে গেল। সেই ঠেকে তর্ক, রুদ্ধ ছাড়াও পুতু, পার্থ (যে কিনা এখন ছবিগুলো আঁকছে) এরা সব্বাই আছে। ব্যস অমনি শুরু হয়ে গেল গল্প। অবশ্য গল্প ভাবলেই গল্প, খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন – হুবহু একই ঘটনা হয়তো আপনার অফিসেও হামেশাই ঘটে থাকে।

‘বেশ – প্রথমটা কি শুনি?’

‘কেন, প্রেম?’

‘যাহ – এটা তো কমন ছিল।’

‘ধুর ধুর – তোরা পয়েন্টটাই মিস করে গেলি। এ যে সে প্রেম নয়, এ হল অফিসের প্রেম। পাড়ার প্রেম বা ইশকুল কলেজের প্রেম নয় যে একটা চিঠি লিখলাম, দুটো বিরহের গান শুনলাম, তিনবার নীলাঞ্জনা গাইলাম বাথরুমে। অমনি হয়ে গেল – প্রাতঃকৃত্যের সাথে মাথা হালকা হয়ে গেল।’

‘তবে?’

‘আহা অফিসে কাউকে ভালো লেগে গেলে তাকে তো আট ঘণ্টা তাকে চোখের সামনে দেখতে হবে – তার সাজগোজ, কথাবার্তা, বন্ধু-বান্ধব, মোবাইল রিংটোন, সিক্রেট ট্যাটু – কত কি? এর মধ্যে লাঞ্চ আছে, টিফিন আছে, চা আছে। বিকেল বেলা ওয়াক করা আছে।’

তর্ক ফট করে বলে বসল, ‘আইসক্রিম আছে।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘মানে?’

‘না, মানে রুদ্ধ মাঝে মাঝে নীচে যায় গরমকালে – একটা মেয়েকে আইসক্রিম খেতে দেখতে যায়!’

রুদ্ধর দিকে তাকে ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘না না, ওটা অন্য ব্যাপার – তোরা বড্ড বাজে বকিস। যাই হোক, যা বলছিলাম। অফিসে কাউকে ভালো লাগলে সে আবেগটা বড্ড বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। স্বীকার করতে হয় না – চোখে মুখে ফুটে ওঠে। কাজে কর্মে পরিষ্কার বোঝা যায়। অনেককে দেখে তো আমার এরকমও মনে হয়েছে যে ওদের দুজনের জন্য দুটো কম্পিউটার বোধহয় লাগত না। ডেস্ক সেভ, ইলেক্ট্রিসিটি সেভ। কত প্রফিট।’

‘কেন? একবার ডেকে সোজাসাপ্টা বলে দিলেই হল বা ধরো চুপি চুপি ইমেল করলে?’

‘ওফ হাসালি, তোরা’

‘কেন? কেন?’

‘বাহ ইমেলে এরকম কু-প্রস্তাব দিলে, মানে চিঠিটা পড়ে যদি তাই মনে হয় আর কি, তাহলে এইচ-আর কেস হয়ে যাবে না? সেই ভয়টা তো সব সময় আছেই। তার ওপর যদি আবার রিজেকশন কেস হয়, তাহলে প্যাঁক, টিটকিরি তো আছেই, ওদিকে গোদের ওপর বিষফোড়া প্রজেক্টও অমনি রাতারাতি বদলে ফেলা যাবে না। ফলে সেই একই মেয়েকে আবার ন ঘণ্টা ধরে সহ্য কর আর যতদিন প্রজেক্টে আছো, ইশারায় বলে চল – একবার ডাকিলেই আসিব।’

‘আর যদি কেউ প্রোপোজ করার ম্যানেজারকে কপিতে রেখে দেয়? অন্তত এইচ আর কেসটা তো এড়াতে পারে?’

‘ওফ এরকম করেছিল বটে কৃষাণু। সেই ২০০৬ সালে। দিব্যি বন্ধুদের কথা শুনে বার খেয়ে, ডিকশনারি দেখে এক-পিস প্রেম পত্র সাজিয়েছিল কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেকে সেফ-সাইডে রাখার জন্য দুই ম্যানেজারকে কপিতে রেখে মেলটা করেছিল। ফলটা হল উলটো। লেঙ্গি তো খেলোই, তার ওপর জাঁদরেল প্রজেক্ট ম্যানেজারের দাবড়ানিতে টানা দু বছর ধরে সব প্রজেক্ট / নন-প্রজেক্ট পার্টিতে নীলাঞ্জনা গাওয়া করিয়েছিল। একটা সময় কৃষাণুর মনে হত ডেকে সবার সামনে বলদ বলে কান ধরে উঠবস করালেও বোধহয় এতটা দুঃখ হত না। প্লাস ঐ চিঠিটা পড়েনি এমন কেউ পাবলিক শুধু ঐ প্রজেক্ট কেন, গোটা অপিসেও ছিল না। তাই বলছি আর যাই করিস, ঐ ভুলটা কক্ষনও ভুলেও করিস না। ’

‘অনেকটা কার্তিক-দার মত কেস – পার্টিশন করতে চেয়েছিল, আর্কাইভাল হয়ে গেল?’

‘কার্তিক-দাটা আবার কে?’

‘ওহহো, তোমার সাথে এখনও তো পরিচয় হয় নি, তাই জানো না হয়তো। গোলাপি চশমা, সবুজ ট্রাউজার – কার্তিক-দা পুরো কেতার ছেলে ছিল। একবার একটা মেয়েকে তার ভালো লেগে যায়। তারপর তাকে পার্টিশন এক্সচেঞ্জ বোঝাতে কতবার কাচের ঘরে ডেকে নিয়ে যেত, শনিবারে আসতে বলত অফিস। শেষমেশ যখন কেটে গেল ঘুড়ি আমাদের এসে বলল, আর্কাইভাল হয়ে গেছে – ফাইল ক্লোসড।’

‘ওহহো’

‘কি হল আবার?’

‘একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল। সে আমার কাছে একটা ডিজাইন বার বার বোঝার চেষ্টা করতাম – কিন্তু আমি যতই যাই বলি, সে কিছুই বুঝতে পারত না। দু-একবার বাড়িও চলে এসেছিল। শেষে একদিন বাধ্য হয়ে বললাম – আর বোঝার দরকার নেই, ওতেই হবে। যেটুকু বুঝেছিস তাই দিয়েই চালিয়ে দে।’

‘হায় রে- এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করলে? মেয়েটা থোড়াই তোমার কাছে ডিজাইন বুঝতে চেয়েছিল। ছি ছি ছি – এইটুকু পারলে না? দেখতে কেমন ছিল?’

‘বেশ মিষ্টিই ছিল। কিন্তু তখনই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তো।’

‘সেইটাই তো সুযোগ ছিল – ধুর তুমিও যেমন’

‘আহ, কথায় কথায় তর্ক করিস না – যতক্ষণ অফিসে থাকবি, ঐসব ব্যাক পকেটে রাখবি। এই জন্যই বলছি, ওসব বাদ দে।’

‘তা তোমার প-কারে প্রেমের পর আর কি কি বাকী আছে শুনি?’

‘তার আগে আরও কয়েকটা ব্যাপার ছিল। প্রাক-বৈবাহিক তো বললাম, উত্তর-বৈবাহিক আর আন্তঃর্বৈবাহিক ব্যাপারও আছে’

‘গোদা বাংলায় বলবে?’

‘মানে প্রিম্যারিটাল, পোস্ট ম্যারিটাল – ইন্টার্ম্যারিটাল আর কি। ধরা যাক কেউ বিয়ের আগে পালাবে – সেও দেখেছি। কেউ বিয়ের পর অফিসে কি করে সেও দেখেছি। আবার অন্যের বউ -’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে তর্ক জিজ্ঞেস করলে, ‘পালাতে দেখেছ?’

‘তা আর দেখিনি? মেয়ের বাড়ি থেকে দুই জাম্বুবান মার্ক ভাই এসে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অফিসের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আর হুঙ্কার ছাড়ছে। আর ওদিকে প্রজেক্ট ম্যানেজার তাকে চেন্নাইতে পালানর সেফ প্যাসেজ দিচ্ছে। ছেলে তার হবু শালাদের এড়াতে বন্ধুর গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে অফিস থেকে বেরোচ্ছে – সব নিজের চোখে দেখা রে।’

‘তোমার প্রতিভা আছে বলতে হবে-’

‘আরে ঐটাই তো দ্বিতীয় প’

‘কিরকম শুনি?’

‘এই যেমন ধর আমাদের পুরনো প্রজেক্টে একজন সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিল। এমনিতে ছোটখাটো চেহারার লোকটিকে দেখলে সিকিউরিটি গার্ড বলে ভুল হতে পারে কারও। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রতিভা বোঝা যেত মুখ খুললে। একদিন তাকে একটা কলে ডাকা হয়েছিল – সে আই আই আই আই চারবার বলে কর্ণের রথের চাকার মত সেই যে আটকে গেল – আর কিছুতেই এগোয় না। তারপর থেকে আইয়াইয়াইয়াই টাই ওনার নাম হয়ে গিয়েছিল। এ শুধু অফিসে হলে ঠিক ছিল – একবার বিদেশে গিয়ে ব্যাঙ্কে, স্টেশনে মায় কাস্টমারের কি হাল করেছিল তার আর ইয়ত্তা নেই।’

‘এ আর প্রতিভা কোথায়?’

‘যাচ্চলে – প্রতিভা নয়? ধর ক্লায়েন্ট ফোন করেছে। যাকে খুঁজছে, তাকে দেখতে না পেয়ে ফোন তুলে দিব্যি বলে দিল – হি ইজ নো মোর। ব্যস সে ওদিক থেকে কনডোলেন্স ইমেল পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপরে ধর মেল পাঠিয়ে বলল, ঈশ ভুল হয়ে গেছে বলে ল্যান কেবলটা খুলে দিল। আরেকজনকে চিনি। সে মেল শুরুই করেছে, ‘হোপ ইউ আর নট ওয়েল’ বা কখন কি মনে হল মেল করার পরে এসএমএস করেছে – ‘ফলো মি অন মাই ইমেল’। কখনও আই অ্যাম হসপিটাল তো কখনও লেটস ড্যামেজ দা কন্ট্রোল। উদাহরণ ভুরি ভুরি। এই পর্যন্ত হলে তাও নয় ঠিক ছিল। একদিন তার মায়ের শরীর খারাপ – অমনি মেল করেছে মাই মাদারস হার্ট অ্যাটাকড। বোঝ – এগুলো প্রতিভা নয়? আর এসব প্রতিভা যেখানে আছে, সেখানে লুকিয়ে থাকার জো নেই – ফুটে বেরোবেই। তাই বলছিলাম, প্রজেক্টের সার্থে বড় মুশকিল।’

‘বুঝলাম – আর শেষের টা কি শুনি?’

‘ওহ ওটা আদিভৌতিক অর্থাৎ কিনা আমাদের কন্ট্রোলে না, ওটা আদি ভূতের ডিপার্টমেন্ট। আমার এক বন্ধু ছিল – রাত্তিরবেলায় ডিপ্লয়মেন্ট করছে। অফিসে একা। এমন সময় এল প্রবল বেগ। সে আইডি কার্ড ডেস্কে ভুলে টয়লেটে ছুটেছে। এদিকে ঐ দরজাটা এমন যে বেরোতে অ্যাক্সেস লাগে না – কিন্তু ফেরার সময় লাগে। আবেগেতাড়িত হয়ে যাওয়ার সময় ভুলে গেছে। কিন্তু পরে আর কিছুতেই ফিরে আসতে পারে না – অফিসে কেউ নেইও। সে এক কেলেংকারিয়াস ব্যাপার। তাই বলছিলাম আর কি এইসব জিনিস প্রজেক্টের পক্ষে বড় ক্ষতিকর। খুব সাবধানে থাকা উচিত। তেমন তেমন মুহুর্তে যে কোন একপিসই যথেষ্ট।’

‘বল কি?’

‘হুঁ হুঁ বাবা, সাধে কি আর মহাজ্ঞানী মহাজন বলে গেছেন – প্রেম, প্রতিভা আর পায়খানা – চেপে রাখা যায় না।’

এই এপিসোড এখানেই শেষ। যারা আমার গল্প শুনে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের হাত মকশো করছেন আগামী দিনের জন্য বা নেহাত গল্পচ্ছলেই পড়ছেন বা আমাকে ছোঁড়ার জন্য বাড়িতে ঢিল জমাচ্ছেন সকলকে বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা। সঙ্গে থাকুন, পড়তে থাকুন।


ছিন্নবীণা ৫

Stay high!

উফ! কটা দিন টানা গাঁজা সিগারেট খেয়ে কাটানো যাবে, জাস্ট ভাবা যাচ্ছে না!! সাধে বলে pujo spirit ?

না না, আমি না, শিব হয়ত প্রতিবছর এসময় এমনটাই ভাবেন!

পাড়ায়ে পাড়ায়ে প্যান্ডেল কর্তার এখন ঘুম উড়ে যাবার জোগাড়। শারদ সম্মানগুলো তো আর অন্যদের নিতে দেওয়া যায়ে না, কি বল?

তা যাকগে, শিব কে নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে, ও যেমন আছে থাক।

বেচারা মহিষাসুর! সবকটা দিন ত্রিশূল তলোয়ার বন্দুক সিংহের খোঁচা খেয়েই গেলো, un-caste বিয়ে করতে কেন যে গেলো বেচারা!ভাগ্যিস সেই সময় human rights commission ছিল না, নাহলে দুর্গাকেই জেলে পুরে দিত, তার সাথে চলতো মিটিং মিছিল আরও কতকি। social হামলা হয়ে যেত একটা! মহিষ মারলে তো SPCA খেয়ে নিত দুর্গা কে চিবিয়ে চিবিয়ে।

তা বেশ হয়েছে এ যুগে ঘটনাটা ঘটেনি। তাই জন্যেই কুমোরটুলি গেলে মাখা মাটি আর পাটের ঝুরোর গন্ধটা পাই। ভাগ্যিস কেউ ভেবেছিল socially একটা বড় পুজো করা হবে, তাই জন্যেই না তোমায়ে প্রতিবার জিজ্ঞেস করতে পারি, “কিরে কটা হল?” হ্যাঁ ব্যাপারটা এখন জামা ছেড়ে girlfriend হয়ে যাচ্ছে, that’s OK।

কতো লোক দেখি রাস্তায়ে, এও কিছু ঘটছে চারিদিকে, তাও, কি সুন্দর সবার মুখে হাসি দেখা যায়ে!!

রোদের দিক বদলে যাচ্ছে বলে, ঘরের খড়খড়ি দাওয়া জানলার ছোট্ট ফোকর দিয়ে আলো পড়ে, ঘরের ভেতর ঐ pin-hole কামেরার সিনেমার অ্যাঙ্গেল-টাই বদলে যায়ে !!

শাড়ি পাঞ্জাবি পরে থাকাটা যেন হুট করে ফিরে আসে, শুধু তুমি আসো বলে। কাজের চাপে রাত জেগে জেগে আমরা সবাই প্যাঁচা, তাই whole night ঘোরা টা এখনও trend।

একা পরবো? কাজের মাসি একা থাকবে? ওকেও তো এই বছরকার উৎসবে কিছু দিতে হয়ে, হাসিটা বেশ লাগে…।

সারা বছর কথা বলি না, তাও ঠিক এই দশমির সময়টা মনে হয়ে সব ভুলে সবার সাথে কথা বলে আসি, ডেকে ডেকে।

দুর্গা আমার কাছে একটা connecting memory; এলে কতকি সাথে নিয়ে আসে। বছরে একবার আসে বটে, পুরো বছরের হারিয়ে যাওয়া “bengalensis” ফিরিয়ে নিয়ে আসে, আর তার সঙ্গে একটুখানি ভুলে যাওয়া মনুষ্যত্ববোধ কে। গঙ্গা মাটি, বালি মাটি, গোবর, পুণ্য মাটি, ঠাকুর বানানোর আগে মনে করায়ে, সে কোথায়ে কোথায়ে আছে।

নতুন করে বুঝতে পারি যে, এরকম ভাল মনে, হয়ত পুরো বছরটাই থাকা যায়ে; bank balance বাড়লে যে মনটা এতটা হাসে না, এটাও বুঝি। চেনা মুখগুলো দেখা, “কিরে কেমন আছিস” বলা, এতদিন যা যা ভুল করেছি তার জন্যে ক্ষমা চাওয়া, নিজেকে “better luck next time” বলা, পুজো মানে তো এগুলোই।

এতকিছুর মাঝে নিজেকে ফিরে পাওয়ার নাম-ই দুর্গাপুজো।

হ্যাঁ আমরা বদলেছি, বদলাচ্ছি। আমরা বড় হচ্ছি, আমরা ভুলছি। তাও আমরা তোমার ভক্ত। তোমায়ে ভক্তিও করি, ভালও বাসি। তোমার মুখে মিষ্টি গুঁজে দি, তোমার দিকে হাত জোড় করে তাকিয়ে হা করে তোমায়ে দেখি। তোমার পায়ে আমার পড়ার বই ছোঁওয়াতে এখনও ছুটে যাই।

তুমি এলে , হারানো তার গুলো এখন টুং-টাং বাজে। তুমি এলে যেন নতুন করে তার গুলো বেধে ফেলতে পারি।

Modern যুগ, তা হোক না। মনটা তো এখনও DJ beats-এর থেকে ঢাকের আওয়াজে বেশি নাচে।

এখনও থাকতে চাই পুজোর অষ্টমীর সাজে। বাঙ্গালিয়ানা, খাসির মাংস, ইলিশ খিচুরি, কালবৈশাখী, গরম চা, কফি হাউস, মান্না দে, বিরেন্দ্র কৃষ্ণ, এসব ছাড়া, এখনো আমি নিজেকে খুজে পাই না।

এসো ডিয়ার দুর্গা, এবারেই নয় শুধু, বারে বারে এসো, এই হারানো আমির কাছে।

অপেক্ষায়ে রইলাম আমি, আর রইল আমার মনের ছিন্নবীণা।

Best Regards

পার্থ