আশ্বিনের শারদ প্রাতে

আমি বাংলা ভাষাও ছাড়িনি, বাঙালিয়ানা ও ছাড়িনি, ছেড়েছি শুধু শহরটা। তবে ওটাও নেহাত দায় না পড়লে ছাড়তাম না।

শহর থেকে দূরে থাকার একটা খারাপ দিক হলও এখানে উৎসবের আমেজ ঠিক বোধ করা যায়না। উৎসব বলতে এখন অবশ্যই দুর্গাপূজার কথা বলছি। আজ দশ বছরের বেশি হয়ে গেল বাইরে। দিল্লী, লখনৌ, মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, লন্ডন… এখানে কোথাও কাশফুল ফোটেনা। কোথাও মহালয়ার দিন ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের আওয়াজ রেডিও থেকে ভেসে আসেনা। এখন অবশ্য সব টিভি চ্যানেলে একটা না একটা মহিষাসুর-মর্দিনী অভিনীত হয়, কিন্তু কোনও কিছুই যেন সেই রেডিওতে মহালয়া শোনার অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে পারেনা।

ছোটবেলার স্মৃতির কাঁটা এখনো আটকে আছে বাবার সেই murphy রেডিওতে। মহালয়া মানে এখনো আমার কাছে সেই পুরনো রেডিও, বীরেন বাবুর গলা, আর তারপর বাবা, জেঠু, কাকার তৈরি হয়ে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ করতে যাওয়া। মহালয়া মানে এখনো কাশফুল।

এখানে আমাকে কেউ ভোরবেলা ডেকে দেয়না। আগের দিন রাত জেগে প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করা ক্লান্ত চোখ মিছেই গোসা করে এলার্ম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। কফি মেকারের শব্দ, টোস্টারের থেকে বেরিয়ে আসা দুটো মুচমুচে টোস্ট, বাইরে হাল্কা মেঘলা আকাশ, আর অদূরের ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ, সব মনে করিয়ে দেয় আমার নাগরিক ব্যস্ততাকে। অফিস যেতে হবে।

রিপোর্টে শেষ মুহূর্তের ঝালাই দেওয়ার জন্যে ল্যাপটপ খুলতেই চোখ পরে গেল ক্যালেন্ডারে। আজ মহালয়া না? নিজের অজান্তেই রিপোর্টটা বন্ধ করে ইউটিউব খুলে টাইপ করি “মহালয়া বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র”। প্লেলিস্টের প্রথম ভিডিওতে ক্লিক করে, কফির কাপটা নিয়ে দাঁড়াই আমার বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর সামনে। ঘর জুড়ে তখন গমগম করে ওঠে বীরেন বাবুর কণ্ঠ…”আশ্বিনের শারদ প্রাতে…” এই বছরও বাড়ি ফেরা হলোনা।

দুর্গাপূজা, প্রেম ও এক অধুরী কাহানী

পুজো আসছে, আর বাকি ১৩ দিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই এই ধরনের পোস্ট চোখে পড়ছে। আমরা যারা বাইরে থাকি, তাদের কাছে পুজো মানে কিন্তু বাড়ি ফেরার আনন্দ। আলোয় মোড়া আমার খুব চেনা এই শহর, চেনা-অচেনা সব মানুষ, ভিড়, একরাশ হাসিমুখ, প্যান্ডেলের বাইরে লম্বা লাইন, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ…সব মিলে মিশে একটা অন্যরকমের ভালোলাগা। তাই আমার বন্ধু যখন আমাকে এই লেখাটা লিখতে বলল, সঙ্গে জুড়ে দিলো যে একটু নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই কিন্তু, আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে জুলফিতে আর দাড়িতে রূপোলী ছোঁয়া দেখে চমকে উঠে, বাড়তে থাকা পেটের ওপর হালকা করে হাত বুলিয়ে নিজের মনেই গেয়ে উঠলাম “আমার যে দিন ভেসে গেছে…”।

“নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই” কথাটা কানে বাজতেই মনে হল, সত্যিই তো বয়েস বেড়ে চলেছে। অন্যের বউ, নিজের প্রেমিকা যখন বয়েস নিয়ে খোঁটা দিয়েছে, বিশ্বাস করুন একটুও গায়ে মাখিনি সেই সব কথা। কিন্তু লিখতে বসে যখন পুরনো কথাগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি, বেশ বুঝতে পারছি যে যেই ঘটনাগুলো “এই তো সেদিন” বলে সামলে রেখেছিলাম, পায় পায় ১৫ বছর হেঁটে পার হয়ে গেছে।

নস্টালজিয়ার কথা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়, কিন্তু আমার এতো নস্টালজিয়া নেই কারণ সময়ের সাথে সবকিছু পাল্টায় স্বাভাবিক রীতিতে, এবং সেটা মেনে নিতে হয়। যেটা পাল্টায় না সেটা হল এমন কিছু গল্প যা মনের ভিতর বাঁধা পড়ে আছে… পুজো আসতেই আগল খুলে ছড়িয়ে পড়বে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

“আমায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবি?” আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল এরকমই একটা ফোন কল দিয়ে। সে বছর পুজোর অষ্টমীর দিনটা বড্ড ভালো কেটেছিল। লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা, ফুচকা খাওয়া, প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝখানেও একে অপরের আঙ্গুল খুঁজে নেওয়া, প্রথম হাত ধরা, আর সব শেষে পাড়ার প্যান্ডেলের পিছনের অন্ধকারে আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা। সব মনে আছে স্পষ্ট করে, যেন কালকেই ঘটেছে সবকিছু। এখনো পুজোর ঢাক বাজলে চোখের সামনে সিনেমার রিলের মত চলতে থাকে সবকিছু। দশমীর দিন ওর হঠাৎ বাড়ি চলে আসা, মায়ের কাছে আবদার করা “তোমার সাথে বরণ করতে যাবো”, তারপর দুগালে সিঁদুর মেখে আমার ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠা “দেখ আমাকে কিরকম নতুন বউয়ের মত লাগছে।” কই, আমি তো কিছুই ভুলিনি?

আমার গল্পে বেকারত্বের জ্বালা ছিলনা, পকেটে একশ টাকা নিয়ে ঝাঁ চকচকে শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অসহায়তা ছিলনা, তোকে হারানোর ভয়ও ছিলনা…তবু কেন ভুল হল ঠিক সময়ে ভালোবাসার কথা বলতে না পারায়? আজ আমাদের মধ্যে দুটো মহাদেশের শূন্যতা। এই পুজোতে তুই শিকাগোর বঙ্গ সম্মেলনে তোর প্রিয় কবিতা পড়বি, আর আমি লন্ডনের শীতে ওভারকোট গায়ে চেপে ধরে হেঁটে যাবো কোনও পুরনো রাস্তা ধরে। তবুও আমার পুরো পুজো জুড়ে শুধু তোর কথাই মনে পড়বে। আমি জানি, কোথাও না কোথাও গিয়ে তোরও আমার কথা একটু হলেও মনে পড়বে। এই মনখারাপের মধ্যে দিয়েই কোথাও না কোথাও আমার আঙ্গুল ছুঁয়ে ফেলবে তোর হাত। ভালো থাকিস, মন।

পয়লা আষাঢ়

ডায়রির কাছে মিথ্যে কথা বলতে নেই। আজ হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি না নামলে, ডায়রিটা এতদিন পর আলমারির তাক থেকে নেমে আসত কিনা জানিনা। অনেকদিন সে দরজা বন্ধই ছিল, আজ বৃষ্টি না হলে কি হত বলতে পারব না, কিন্তু বৃষ্টির সাথে সব অভিমানের মত সেসব কোথায় ধুয়ে মুছে গেল। যা গরম গেল কলকাতায় তার সঙ্গে কেবল চৌত্রিশ বছর মার্কা উপমাই চলে একমাত্র, কিছু লেখার সাধ আহ্লাদ তো থাকে না। আবার দু-ফোঁটা পড়লেই গাছপালার মত মনমেজাজও চনমনিয়ে ওঠে। এদিক ওদিক একটু বেপরোয়া হতে ইচ্ছে করে। বাঙালির রোমান্টিকতায় বৃষ্টি আর বিকেল – দুটোই কোনোদিন ফুরবে বলে তো মনে হয় না।
বৃষ্টি শেষ হলেই বর্ষা শেষ হয়ে যায় না – এই ধারনা আমার অনে-এ-এ-কদিনের। হাতে ছাতা না থাকলে অপ্রস্তুত হয়ে ভিজে যাওয়ার স্মৃতিটুকু যেমন বেঁচে থাকে অনেকদিন, তেমনি। রেনিডে হয়ে শেষ কবে বাড়ি ফিরেছি, মিনে নেই – তাও এখনও তো ইচ্ছে করে সকালবেলা উঠে দেখব ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, ট্রাম বাস নেই। বস্-কে ফোন করলে তিনিই আগ বাড়িয়ে বলবেন, “না না, আজকে আর অফিসে আসার চেষ্টা কর না – দিনটা বাড়িতেই থাক”, কিন্তু সে কপাল কি আমার আছে, যে ঘুম থেকে উঠেই খিচুড়ির খোঁজ করব?

IMG-20160622-WA0006এই তো সেদিনকার কথা। সাউথের লাইনে ট্রেন বন্ধ। ঝুপ্পুস জলে ভিজে, গড়িয়া থেকে গোটা কয়েক বাস বদলে, সারা শহরের জল ঠেলে শিয়ালদা পৌঁছলাম। কোনও রকমে ট্রেনে উঠেছি – অথচ মনে হচ্ছে আরেকটু আকাশটাকে মুছে যেতে দেখি, যেন সে এক দুর্দান্ত ল্যান্ডস্কেপ, কোনও এক অসামান্য শিল্পীর ব্রাশস্ট্রোকে ভ্যান গফের মত মুনশিয়ানায় মুছে যাচ্ছে দিগন্তের ঠিকানা। চলন্ত ট্রেনের পাশে নারকেল গাছের পাতাও এক শেড বেশি সবুজ লাগছিল। এখন মনে হচ্ছে এই তো সেই সেদিনকার ঘটনা – যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব; অথচ মাঝখানে কেটে গেছে ষোল’টা বছর।
বৃষ্টি আমার কৈশোর, কিন্তু বর্ষা আমার প্রেম। তাই বলে কৈশোরসুলভ অপাপবিদ্ধ প্রেম নয়; রীতিমত নিষিদ্ধ এবং দু:সাহসী। প্রথম যৌবনে কারও কোমরে হাত দেওয়ার মত, তাও আবার দক্ষিণ ভারতে, শিরুভানি জলপ্রপাতের সামনে। পিছল পাথরের উপর দাঁড়িয়ে মৃদু বৃষ্টির আঘাতে সে পিছলে পড়ে যাচ্ছিল। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বৃষ্টির মত। আমি তার হাতটাই ধরে পারতাম, কিন্তু মনে হল ও যদি পিছল পাথরের খাদ বেয়ে পড়ে যায়? এত কাছ থেকে ওকে কি চলে যেতে দিতে পারি? কোদাইকানাল আমার কাছে বর্ষার আরেক নাম। সেদিন পাহাড়ি ঝর্নার কাছে রেখে এসেছিলাম আমার প্রথম স্পর্শবিদ্যুত, আজকে সেই উচ্ছল যুবতীর নামটা না হয় গোপনই থাক। সে একবার আমার বাহুবন্ধনে ধরা দিয়েছিল এটাই কি সব নয়? শ্রীদেবী বলিউডের রক্তে মিশিয়ে দিয়েছিলেন বর্ষার অমোঘ আকর্ষণ, পিছনে ফিরে তাকালে ঐ দিনটা আমিও মিস্টার ইন্ডিয়া হয়ে উঠেছিলাম।
আমার কাছে বর্ষা যেমন শুধু বৃষ্টি নয় আবার বৃষ্টিও শুধু বর্ষা নয়। সে যেমন বাঁধনহারা মুক্তির নি:শ্বাস, সে যেমন দুর্নিবার প্রেমের অনুভূতি, তেমনি এক মুহূর্তের বুকের ওম। ইংল্যান্ডের ঘটনা, যেখানে বারোমাস বৃষ্টি। ঐ বছর ইংল্যান্ডের কিছু জায়গা জলে ডুবেও গেছিল শুনেছি। যাইহোক – আমার সামনে প্যারামবুলেটরে রুপু – আমার দেড় বছরের কন্যা। বাইরে প্রবল বৃষ্টি ও জমাট সন্ধ্যে। হঠাৎ রুপু কাঁদতে শুরু করল। কাছেপিঠে একটাও ট্যাক্সি নেই। রুপুকে তুলে নিলাম কোলে, এঁটে নিলাম জ্যাকেট – ছোট্ট রুপু ব্যালেন্স হয়ে গেল ভুঁড়ি ও জ্যাকেটের অন্তর্বর্তী মহাকাশে। তোমায় আমি পরোয়া করি না বলে নেমে পড়লাম। বাইরে কুঁকড়ে আসছি ঠাণ্ডায়, আর বুকের ওমে সপ্রতিভ হয়ে উঠছে রুপু, একটু একটু করে।
পয়লা আষাঢ় – স্মৃতিগুলো এলোমেলো। স্থান কাল পাত্র পাত্রী বদলে গেছে। তবু সেই দু:সাহসিকতা মাঝে মাঝে নিজেকে জানান দেয়। প্রবল বৃষ্টিতে রেলিং ধরে জানলার সামনে দাঁড়াতে সাহস দেয় – তখন আর মাথার ওপর ছাত থাকে না, বৃষ্টি, হাঁটুজল ভেঙে কাকে যেন হাঁটতে দেখা যায়। কত লড়াই এই বর্ষাই শিখিয়েছে।

আমরা যারা বাইশের/তেইশের ওপারে আর উনত্রিশ/ত্রিশের এপারে

আমদের প্রজন্মটাকে সময় বস্তুটা চিরকালই হাঃ মুগ্ধ করে রেখেছে। একমাত্র ফুচকাওয়ালার হাত ধোওয়ার সাবান বাদ দিয়ে এমন কোনো জিনিস নেই যা আমরা দেখিনি (সোলজার কিন্তু হিট করেছিলো ফলে ওই প্রসঙ্গ আনা গেলোনা)। সেই জন্ম থেকে শুরু করে বর্তমানে পাড়ায় নির্ভয়ে সিগারেট খাওয়া/ মায়েরটা ছেড়ে নিজের জন্য শাড়ি কেনা অথবা দুটোই একসাথে অবধি। সারাটাক্ষন যেন এক অদৃশ্য হাত রোজনামচার চলতিতে ধরিয়ে দিচ্ছে অবাক হওয়ার ইস্তেহার। আর সে এমনই আদেখলা হওয়ার নিমন্ত্রন যাকে মুঁড়িয়ে ফেলে দেওয়ার যান্ত্রিকতা আমাদের ছিলনা, নেই, হবেও না।

আর হবেই বা কি করে। হরলিক্স তো এই হালে বলছে শিশুর আসলি মানসিক বিকাশ হয় ছানা-পোনা বেলায়। আর আমাদের কি শিখিয়েছে, এমনি এমনি খাও। আর গণ্ডগোলটা এখনেই। মুকেশ খান্না দেখিয়েছিলেন বীরদর্পে সত্যের পথে এগোনো মানেই চকমকে লাল, আঙ্গুল তুলে ফাকফাকফাকফাকফাক। চিন সরকার আর চ্যাপেল তো এই সেদিন বলল আসল মানেটা। জুরাসিক পার্কের ডাইনোর সাথে লড়ে গেছি প্রায় অনায়াসে তাই এখনও খুচরো না থাকলেও অটোতে ওঠার সাহস দেখাইনা। আমাদের ছুটি ছুটি তে লালকমল-নীলকমল আর ত্রিডিতে ডেথলী হ্যালোস, দুটোই “আরিব্বাসিয়”আমোদ দেয়।

সুযোগ পেয়েছি আলিশার গানে মিলিন্দ সুমান আর ঐশর্য রাই, দুজনকেই নাচতে দেখার। সাথে নেচেছে আসমুদ্র ডাল লেক যখন লাইভ পর্দায় শচীন দুশো করেছে আর দাদা জামা উড়িয়ে ঝামা ঘষে এসেছে উন্নাসিকতার মামাবাড়িতে। আমরা ভিসিআরে “বাজিগর” দেখেছি, “এই বেশ ভালো আছি” থেকে পেন্সিলের সাহায্যে টেপ-রের্কডারটাকে বারবার নীলাঞ্জনা মুখর করেছি, তিরিশ টাকায় দেড়শো গানের লক্ষ লক্ষ চাকতি জমিয়েছি, আর এখন, ক্লিকাই।

সাদা-কালো সুপারহিট মুকাবলার তালে তাল রেখে প্লাজমার অ্যান্ড্রয়েডিয় উত্থানে হবিট সুলভ প্রযুক্তির বির্বতন উইটনেস করাটা আমাদের হ্যাবিটে দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা কন্ট্রা হয়ে একপেশে দৌড়েছি এখন দৌড়ে দৌড়ে ভারচুয়াল কবাডি খেলি। আমরা চন্দ্রকান্তার জন্য রোববার সকাল নটায় উঠেছি আর এখন সেটার সিড পেলেই নামিয়ে ফেলার তালে আছি। আমরা আরেকটা রিভার্স এভিলিউশনেরও সাক্ষী। ফোন কে গাবদা থেকে ছোট্ট হয়ে আবার গাবদা হতে দেখছি। ওয়াকম্যান টা পকেটে ঢুকত না বলে বেল্টে ঢুকিয়েছি আর এখন হেডফোনটা ব্যাগে ঢোকেনা বলে গলায় ঝোলাই।

কিন্তু এখন প্রশ্ন আসতেই পারে যে এসব তো যারা উনত্রিশ/ত্রিশের ওপারে তারাও প্রত্যক্ষ করেছে। তবে আমরা আলাদা হলুম কই? অব্যশ্যই আলাদা! কারণ যে বয়সে যে বিষয়টা সবথেকে বেশী কৌতুহলাক্রান্ত করে আমরা ঠিক সেই বয়সে সেই বিষয় গুলোর একেবারে আনকোরা বিস্ফোরনের সামনে পড়ে গেসলাম। আঁচড়ের দাগগুলো তাই বড়ই আদরের। আমরা যখন সদ্য টিভি চালাতে পারি তখন সিন্দাবাদ তিমি আর তালিব মালিকা হামিরার সাথে সাথে লড়ছে। যখন বন্ধু ব্যাপারটা কলার তুলব তুলব করছে তখন ফারহান আখতার লঞ্ছ করলেন। গেঁড়েপাকা স্টেজ়টায়, বাড়ির লোক কেবল কাকুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফ্যাশন টিভি কেটে দিতে বলছে। যখন রিকশোতে বিনুনি দেখে রেসিং সাইকেলের স্পীড আপনা থেকে কমে যাচ্ছে ।অল্পবয়েশি স্যারের সামনে বিয়ে শুনে কান্না পাচ্ছে ঠিক তখনই শাহরুখ খান অমিতাভ বচ্চনের মুখের ওপর তেড়ে বেহালা বাজিয়ে দিলো।

যখন চে-গ্যেভারার টি-শার্ট খুঁজছি কমদামে তখন মোমবাতি মিছিল পেলো একের পর এক যতার্থতা। যখন যেটা তখন সেটার এরকম হাতে গরম একেবারে পাত পেড়ে খেয়েছি বলেই “ভালো তবে আমাদের সময় বেশী ভালোছিলো”-র ঢং থাকবেই। কিন্তু কয়েকটা জিনিসের ক্ষেত্রে সেটা সত্যিও! উদাহরন- কার্টুন নেটওয়ার্ক, ডব্লু ডব্লু এফ, জীবনমুখি, দেখ ভাই দেখের মত সিরিয়াল, শারদীয় আননন্দমেলা, দু-ছক্কা-পাঁচ, নিজস্ব ডাইরী আরও কত কি! পরিবর্তন ব্যাপারটে ধাতে সয়ে গেছে আমাদের। সে নন্দীগ্রামের মর্মান্তিক ঘটনাই হোক বা এস আর এফ টি আই তে দেবকর্ম প্রদর্শন।

আমদের কনফিউজড জেনারশন হিসেবে খ্যাতি আছে। দোষটা আমাদের না। আসলে আমাদের করন জোহর এই বলছে শিল্পী সে-ই যে বন্ধু, পরিবার, পড়শী, কলেজ প্রিন্সিপাল, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি সকলকে সম্মান করে ইদিকে নিজেই আবার খিস্তিটাকে নিয়ে যাচ্ছেন শিল্পের পর্যায়। বেলাকে এই অঞ্জন দও তো এই রক্তচোষার প্রেমে পড়তে দেখছি। জি কে বলছে ঠিক, সংসদ ও বলছে ঠিক আর দু-জনেরই আলাদা আলাদা প্রমান আছে। আমরা বাইককে বাইকারের তলায়, আর ক্যামেরাকে যার তার গলায় চলে যাওয়ার সব কটা স্টেজ একে একে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বাবা সাইগেলের গান দেখলে বকুনি খেতে হতো এখন ন্যাপি পরা আদোআদো “তাল বোতোল বোদকাহ” গেয়ে আদর খায়। ফলে কনফিউশনটাই স্বাভাবিক।

আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই মোদের তুলনা মোরাই। আমারা প্রেম কে ভাই আর সঞ্জয় দত্তকে মুন্নাভাই হতে দেখেছি। টি টোয়েন্টি, আইপিএল, অপমান করে স্মার্ট হওয়ার ক্ষমতা, এল ও এল, এ এস এ পি, টি কে সি আর, ইংরাজি শব্দের পাসে “ইয়ে” বসিয়ে সেটাকে ট্রান্সলেটিয়ে সময় বাঁচানো ইত্যাদির প্রভৃতির আবিষ্কারটা ঠিক যখন আমাদের সব থেকে দরকার ছিলো তখন-ই হয়েছে। আমরা কলকে মিল কল, এসএমএস কে হাইক, আর দরকার কে হোয়াটসআপ হতে দেখেছি।

আর তাই মোদের তুলনা মোরাই। আমরা আর যাই হইনা কেন বুড়ো-বুড়ি কোনোদিনও হবেনা। কারন বয়স কেবলমাত্র একটা নম্বর। আর এখন গ্রেডের যুগ। তাই বাকি আর সমস্ত কিছুর মতই সেটাও আমাদের বুকপকেটে জায়গা করে নেবে। আমরা বারবার ঠকতে পারি, তবে ঠকাবো না। কারন আমরা সাবানের বুদবুদ বানাতাম, কিনতাম না। নতুনত্বকে ওপেন চ্যালেঞ্জ। পারলে চমকে দেখা। উল্লাস।

ঋতুদা, ঋতুদি এবং আমরা

গতকাল ৩০শে মে ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকী তিন বছর হল তবু ভেতর ভেতর ভীষণ লজ্জা পাই এই ভেবে যে শ্রদ্ধা নিবেদন করার আগে, আমরা আদৌ তার যোগ্য কিনা এই প্রশ্নটা বোধহয় আমাদের নিজেদেরকেই আগে করা উচিত

৪৯ বছর আয়ু হিসেবে খুব কম, কিন্তু এখনও ফিরে তাকালে বড় বেশী করে মনে পড়ে পার্টিতে বা আড্ডায় ঋতুপর্ণকে লক্ষ্য করে তৈরী হওয়া হাস্যকর ক্যারিকেচার বা জোকসগুলোকে এখন সেইসব তামাশাগুলো বা ঋতুদি বলে করা সম্বোধন যেন গালে চড়ের মত আছড়ে পড়েআমরা কি চাইলেও পারতাম একটা চরিত্র নিয়ে অভিনয় করার স্বার্থে নিজেদের শরীর নিয়ে হরমোনাল এক্সপেরিমেন্ট করতে? তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি আসলে সেই সব ঠাট্টা ইয়ার্কি যত না ঋতুপর্ণকে লক্ষ্য করে তৈরীতার চেয়ে অনেক বেশী সমকামীতাকে স্বীকার না করতে চাওয়ার দুর্বলতাকে ঢাকার জন্য

আসলে এলজিবিটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব প্রমাণের যে লড়াইটা উনি লড়ছিলেন নিজেকে দিয়ে, সমাজকে দিয়ে, আমার মনে হয় সেটাই ওনার সর্বকালের সেরা সৃষ্টি জাতীয় পুরষ্কারগুলো হয়তো মিউজিয়ামে সাজান থাকবে, কিন্তু এই আপোষহীন লড়াইয়ের ইতিহাস আরো ভালো ভাবে সংরক্ষণ করা উচিত তোমার সাহসের কাছে কুর্নিশসত্যিই আমাদের অপরাধের শেষ নেই আমাদের মনের অন্ধকার কাটিয়ে তুলতে তুমি সিনেমাকে ব্যবহার করেছ অস্ত্র হিসেবেআমরা কতটা সফল হলাম সেটা ইতিহাস বলবে

উৎসব সিনেমার একটা ডায়লগ আজকে খুব মনে পড়ছেকন্সট্রাকশন, ডিকন্সট্রাকশন যা আমরা দেখতে পাইনি তা ঋতুদা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছো জীবনের সবচেয়ে বড় পর্দায় কলকাতা তরফ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা শিল্পী ঋতুপর্ণ, লেখক ঋতুপর্ণ এবং তারও আগে মানুষ ঋতুপর্ণকে

 

আমার ছোটবেলা

13016769_1234155003278816_254681483_o

Pet মানে অন্যকিছু হলে চলবে না। হতে হবে বাঁদর ছানা।

বায়েনা খানিক এরকম-ই ছিল।

আমার ছোটবেলার ঘটনা। সব বাচ্চাদের মতন আমার এক দিন মনে হল আমার একটা pet  দরকার। যেমন ভাবা সেই রকম কাজ। এই সব, জীবনের গুরুতর জিনিস এক মাত্র বাবারসাথেই আলোচনা করা যায়। গম্ভীর মুখে বাবা কে গিয়ে বললাম ” আমার একটা pet  দরকার”। মা তো শুনেই প্রমাদ গুনল , আবার একটা ঝামেলা জোটাব আমি। বাবা আরও গম্ভীরমুখে বলল ” ঠিক আছে”  , কিন্তু কিনতে যাবার আগে ঠিক করতে হবে আমি কি চাই কিনতে ।

আলোচনা শুরু হল, কি pet  কেনা হবে তাই নিয়ে।

১) কুকুর – কমন pet , আনেকেই কেনে। আমাদের সবার থেকে আলাদা হতে হবে। তাই কুকুর বাদ

২) বেড়াল – আমি একদম পছন্দ করই না , তাই বাদ

৩) খরগোশ – খুব ছোট বেলায় আমার এক জোড়া খরগোশ ছিল, তাই আবার খরগোশ চলবে না। এটাও বাদ

৪) মাছ – শুধু আকুয়ারিউম এ ঘুরে বেড়াবে আমার সাথে খেলা করতে পারবে না। তাই এটাও বাদ

 

সমস্যা গভীর । কি যে কেনা যায় তাই ভেবে পাছিনা । এরকম সময় বাবা বলল , আমি একটা বাঁদর পুষতে পারি. তাতে আমার লাভ । কারণ যথাঃ

১) পাশের বাড়ি র পেয়ারা যে আমি চুরি করই সেইটা আমার পোষা বাঁদর কে শিখিয়ে দিলে আমাকে আর কেউ দোষ দিতে পারবেনা

২) নতুন ধরনের pet , কেউ পোষে বলে আমার জানা নেই।

৩) আমার সাথে খেলা করতে পারবে।

 

যেই ভাবা, সেই কাজ।

এতগুলো দুর্দান্ত কারণ থাকাতে,  আমি আর বাবা রবিবার সকাল বেলা বেরিয়ে পরলাম , বাঁদর ছানা কিনতে । মা কি করবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে বসে পড়ল । হাতিবাগানে রবিবার সকালে খুব সুন্দর বাজার বসতো , এই সব পশু পাখি, মাছ গাছের। সারা বাজার ঘুরে পাওয়া গেলনা একটা বাঁদর ছানা। আমার কাঁদো কাঁদো হাল , কোথাও নেই আমার সাধের বাঁদর ছানা। হতাশ হয়ে দাঁড়ীয়ে আছি , এমন সময় বাবা বলল ” তাহলে একটা গাছের চারা কিনে বড়ো করা যাক , তাতে ফুল ফোটানো যাক ” । চারি পাশে প্রচুর সুন্দর সুন্দর ফুল এরগাছ , লোভ হচ্ছিল  অনেকখন ধরে, বাবা কে বলিনি পাছে বাঁদর কেনার সুযোগ হারাই । এবার বাবার প্রস্তাবে এক কোথায় রাজি হয়ে গেলাম । ফুল গাছের চারা কিনে নাচতে নাচতে বাড়ি চলে এলাম ।

বাবা-কে হারিয়েছি কয়েক মাস হল। হাতে সেদিন ফুল গাছের চারা দেখে মা সবচেয়ে খুশি হয়েছিল।

সে বৃক্ষ-রূপি pet জল, আলো আর বাতাস পেয়ে হয়ে উঠেছে যেন আমার আপনজন।

শীতবদল

‘সব ঋতুর সেরা বাঙালির তুমি শীতকাল’ – মান্না দে এমন একখানি গান বাঁধলে ফুটবলের মতই সেটি সমান আদর পেত।

আরামপ্রিয় বাঙালির কাছে শীতকাল হল শেষ পাতের মিষ্টি দইয়ের মতো . . নিজের মিষ্টতা আর ঠান্ডা দিয়ে যে ধীরে ধীরে সব বাঙালি মনকেই আচ্ছন্ন করে বছর শেষে।

আর গড়পড়তা বাঙালির মতই আমারও বছরের মধ্যে সবথেকে প্রিয় সময় শীতকাল (অবশ্যই দুর্গাপূজার সময় ছাড়া – বছরের ওই সেরা সময়ের সাথে তুলনা করা বারণ।)

sheetbodol
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

নতুন আলুর গায়ে লেগে থাকা মাটি আর নলেন গুড়ের গন্ধে মেখে থাকা শীতকাল আমার ভীষণ পছন্দের – সেই ছোটবেলা থেকেই।

জন্মসূত্রে আমি নব্বই দশকের শেষের দিকের -‘The nineties kids’ – বলতে যা বোঝায় এক্কেবারে তাই। মানে সেই চিত্রহার – চন্দ্রকান্তা, গণেশের দুধ খাওয়া – সূর্যগ্রহণে ডায়মন্ড রিং দেখার সময়ের।

তো সেই নব্বই পেরিয়ে এই বিংশ কালের স্টেশনে পৌছোতে গিয়ে অনেক নতুন বদল চোখে পড়েছে – প্রতিনিয়তই পড়ছে। অবশ্য এটা মনে হতেই পারে বদলে যাওয়াই বেঁচে থাকা – হক কথা। বদল না হলে পরিবর্তন হবে কী করে?তাই তো কোডাক ক্যামেরা চলে গিয়ে সেলফি ক্যামেরা এসেছে, চিঠি লেখা চলে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ এসেছে। আর এই বদলের হাওয়ায় আমার সাধের শীতের উত্তুরে হাওয়াও তার পথ বদলে ফেলেছে। কেমন সেই হাওয়াবদল? একবার পিছিয়ে যাওয়া যাক ছোটবেলার সেই ফেলে আসা শীতকালে।স্কুলে পড়ার সেই শীতের দিনগুলো শুরু হত একরাশ মিষ্টি রোদের আদর মেখে। কুয়াশার চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভাঙা সেই দিনের নিজের একটা ম্যাজিক ছিল। এখনও তো দিন শুরু হয় – কিন্তু সেই ম্যাজিক কোথায়? নিত্যদিনের কাজ মিটিয়ে আমরা যখন ঘুমাতে যাই রাত গড়িয়ে তখন মাঝ রাত। অতএব সকালের সূর্য দেখার সৌভাগ্য আমাদের নেই। এত আরাম করে বসে চায়ের আদর নিলে জীবনে অনেকখানি পিছিয়ে যেতে হবে যে – সামনের দিকে তো খালি এগিয়ে যাওয়া – থামতে মোদের মানা। তাই হারিয়ে যাচ্ছে আমেজের চায়ের কাপ। এই শীত দিন শুধুই ইন্সট্যান্ট কফি আর সবুজ চায়ের দিন।চায়ের মতই হারিয়ে যাচ্ছে কড়াইশুঁটির কচুরি-নতুন আলুর দমের সাথে জিভে জল আনা জলখাবার। স্বাস্থ্য সচেতনী বাঙালীর প্লেটে এখন সার্ভ হয় কর্ণফ্লেক্স, ব্রাউন ব্রেড, ফ্ল্যাক্সসিড। শরীর ভালো রাখতে গিয়ে মনকে খারাপ করে ফেলছি না তো?   হারিয়ে গেছে দুপুরের রোদ পোহানো আর শীতের ছুটির পাড়া ক্রিকেট। মনে পড়ে রোদ ঘেরা বারান্দায় বসে দাদু সারা দেশের খবর নিত – না না ফোনে নয় – খবর দিত দৈনিক সংবাদপত্র। আর দুপুরের রোদের আঁচে ছাদে বসে দিদা আসনে তুলত নিত্যনতুন ছবি। চোখে আরাম দেওয়া এই খুব প্রিয় ছবিটা এখন আর চোখেই পড়ে না – আমার তো নাই, আর আমার বিশ্বাস খুব কম বাঙালীর চোখেই এখন এমন ছবি ধরা পড়ে। আর শীতের ছুটিতে দুপুরের রোদে ক্রিকেট – সেও বেহদিশের পথে। মোবাইল আর প্লেস্টেশনের দৌলতে ব্যাটবল এখন ঘরবন্দী। হারিয়ে যাওয়ার এই লিস্টে ধীরে ধীরে যোগ হচ্ছে আর একটি নাম – পিকনিক! মনে পড়ে ছোটবেলা শীতকাল মানেই ছিল পিকনিক কাল। একটা অন্তত পিকনিকে যেতেই হবে – এটাই ছিল না বলা, না লেখা নিয়ম! ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ২৬শে জানুয়ারি – এই ছিল পিকনিক ক্যালেন্ডার। সেখানে হইচই করে রান্নাবান্না, রোদে বসে লুচি-আলুরদম আর মাংস-ভাত সহযোগে সেই চড়ুইভাতির সেই আনন্দ ছিল বছরের সেরা পাওনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই নিয়মও এখন অনেকটাই ফিকে। পিকনিকের সেই মুখভরা হাসি, পিকনিকের সেই প্রেম, পিকনিকের সেই পেটপুরে খাওয়া – সব নিরুদ্দেশের পথে। এখন আর এত সময় কোথায় যে সারাদিন আড্ডা দিয়ে, ব্যাডমিন্টন খেলে, রোদ পোহাতে পোহাতে একটা গোটা দিন নষ্ট করব? তাই পিকনিকের জায়গা দখল করেছে রেস্তোরার কিছু নতুন নামে মোড়া ডিশ আর মেপে আড্ডা। এই পরিমিত ভোজনের পোশাকী নাম – ব্রাঞ্চ! শীত মানেই তো বড়দিন আর বড়দিন মানেই কেকের দিন। মা-কাকীমারা প্রেশার কুকার বা পুরোন দিনের কেক তৈরির মেশিনে অনেক বাদাম দিয়ে বানাতো বড়দিনের কেক। সেই কেক বড়দিনের খুশীকে আরও বড় করে দিত। এখন শীত পড়তেই কিছু কেক রেস্তোঁরা বা বড় বড় হোটেলে ‘কেক মিক্সিং’ নামে একটি উৎসবের চল হয়েছে। এই ‘কেক মিক্সিং’ ব্যাপারটি আসলে হলো কেকের প্রস্তুতি পর্ব। সবাই একসাথে মিলে কেকের বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে বড়দিনের মাসকে স্বাগত জানায়। এই পর্বটি বেশ মজাদার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই পোশাকী পাবনের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপার্বণের। খুব প্রিয় একটা ছবি এখনো মনের ফ্রেমবন্দি। ছোটবেলার পৌষের একটা হিম সন্ধ্যেবেলায় ঠাম্মা-দিদা, মা-কাকীমাদের একসাথে বসে পিঠেপুলি বানানোর ছবি। সেখানেও ছিল সবার হাতের ভালোবাসার ছোঁয়া। ‘কেক মিক্সিং’এর মত সেই পিঠেপুলির উৎসবের ছিল নিজস্ব মিষ্টতা – অনেকখানি ভালোবাসা আর নতুন গুড়ের মিষ্টতা। শীত বদলের আগে মানে সেই নব্বই দশকের ঠান্ডাকালে আরেকটা মন ভালো করা চল ছিল। পাড়ায় পাড়ায় গানের জলসার চল। পাড়ার দাদা, পাশের পাড়ার কাকীমা, তার পাশের পাড়ার পিসিমা – সবাইকে একজায়গায় আনতে এই গানের উৎসবের জুড়ি মেলা ভার ছিল। শীতের হিম সন্ধ্যায় শালের গরমে বসে সেই গান শোনার স্মৃতিরা এখনও আসা যাওয়া করে। পাড়াতুতো সঙ্গীতানুষ্ঠানের চল এখন প্রায় উঠেই গেছে। ‘সফিস্টিকেশনের’ পাল্লায় পড়ে এই গান পার্বণেও এখন বেশ ভাঁটা পড়েছে। মফঃস্বলের কিছু পাড়ায় এখনো অবশ্য বসে গানের জলসাঘর। এইভাবেই নিরুদ্দেশের এই লিস্টে রয়েছে হাজারো একটা হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস। নারকেল তেলের জমে যাওয়া শালিমারের টিনের কৌটো হারিয়ে গেছে ‘ননস্টিক হেয়ার অয়েলের’ ভীড়ে, জয়নগরের মোয়ার বাক্স হারিয়ে যাচ্ছে ‘সুগার ফ্রি’ মিষ্টির মাঝে, শীতের রোদের চিড়িয়াখানার পিকনিক হারিয়ে যাচ্ছে শপিং মলের ‘ফুড কোর্টের’ খাবারের আড়ালে। আর আমার কলকাতা একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে এই শীতবদলের মরসুমে।

হারিয়ে যেতে যেতে যেটুকু পড়ে আছে তাই নিয়েই এখন আমাদের শীতদিন কাটে। দিদার হাতে তৈরী পুরোনো রেজাইয়ের গরম, পৌষ পার্বণের দিন না হলেও শীতের মধ্যেই কোনো একদিন মায়ের হাতের তৈরী নতুন গুড়ের পায়েস আর হঠাৎ করে ফিরে পাওয়া অলস শীতের দুপুরের ভাতঘুম – অনেক হারিয়ে যাওয়ার মাঝেও এরা ফিরে আসে পুরোনো অভ্যাসে আর শীত ছড়িয়ে পড়ে কমলালেবুর খোসার মত চারপাশে।

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না – ৬

আগের পর্ব


 

সাত দুকুনে চোদ্দর চার – হাতে রইল পেনসিল


 

প্রজেক্ট ম্যানেজ সিরিজ অনেকদিন বন্ধ ছিল। কেন বন্ধ ছিল জিজ্ঞেস করায় এক এক জনকে এক এক রকম উত্তর দিয়েছি। যেমন – “তর্ক নেই বলে লেখা হচ্ছে না!”

“কেন – সে গেল কোথায়?”

“জলদাপাড়া”

“জলদাপাড়া – বলো কি?”

“থুড়ি – কাজিরাঙ্গা”

“ধুত্তেরি তাতে কি?”

“না মানে জঙ্গলে গিয়ে গণ্ডারের প্রেমে পড়েছে – তার বগল, কনুই, গলার এমন ছবি তুলেছে – যেন দীপিকা-ক্যাটরিনা-আলিয়ার ককটেল। সেই ছবি দেখতে দেখতেই তার সময় কেটে যাচ্ছে, বড় একটা হাসিঠাট্টা করছে না – ফলে গপ্পের আসরও বসছে না।”

আবার হয়তো কখনও পুজোর সময় পাড়ায় ঘুরছি – এমন সময় একজন ইস্কুলের মাস্টারমশাই বললেন, “তোমার লেখা খুব পড়ছি – অফিসের গল্পগুলো তো বেশ মজার।”

লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসলুম। একে তো ঘটনাগুলো কহতব্য নয় – তার ওপরে আমার এক কালের মাস্টারমশাই সেইসব আনসেন্সরড লেখা পড়েছেন – আর আমি সেই কলঙ্কিত ছাত্র কিনা তাতে লজ্জা লজ্জা পেয়ে ব্লাশ করছি। বললাম, “আপনি যেরকম ভাবছেন, তেমনটা ঠিক নয়”

“মানে?”

“মানে গল্প – কিন্তু বানান নয় – এমনটা হামেশাই ঘটে থাকে।”

“বল কি?”

পাশ থেকে আমার কাকা চাপা গলায় বললেন, “বেশি বলিস-নি -অন্য পাড়ার মেয়ে বিয়ে করতে হবে বলে একটা লোক চিরকুমার থেকে গেল!”

অমনি নারদ নারদ লেগে গেল।এখন কাকা আর মাস্টারমশাই বাল্যবন্ধু – তাঁরা ফাজলামি করতেই পারেন, তাই বলে আমার সামনে? তাই সসম্মানে কিছুদিন চুপ করে রইলাম।

এখানে শেষ হলে তাও কথা ছিল– কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না – বাঘের ঘরে ঘোঘের বাসা না কি যেন? সেরকম একদিন আমার বসেরও বস – একদিন আমাকে তেনার অ্যাকোরিয়ামে – থুড়ি ক্যাবিনে ডেকে পাঠালেন। “শুনলাম তুই নাকি ব্লগ করিস?”

“ইয়ে ঐ একটু আধটু?”

“কি লিখিস?”

“ফিরিঙ্গি কবিতে আর বাংলায় এলেবেলে গল্প দু একটা”

“বলিস কি – কিরকম পড়াস তো আমাকে-”

খুবই বিড়ম্বনায় পড়লাম – একে তো অফিসের গল্প। নাম-ধাম-চরিত্র যদিও অবফাসকেট করা আছে, তাও পরিচিত লোকজনের চেনা মুখগুলোকে খুঁজে নিতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “তোমার খুব একটা ভালো লাগবে না – একটু খিল্লি লেখা-”

“বলিস কি – তবে তো পড়বই। এটা তো খিল্লিরই যুগ- অবশ্যই পাঠাস আমাকে – হোয়াটস- অ্যাপ ও করে দিতে পারিস।”

অফিসের আর দশটা হুকুম তামিল করার সময় যেমনি ঘাড় নাড়ি – তেমনি নেড়ে বিদায় নিলাম। মনে মনে বললাম, “যে এই লেখা পড়লে আমাকে আর যে যে দুঃখ কপালে বাকি আছে, আর বেশিদিন বাকি থাকবে না। ” সত্যি কথা বলতে কি হঠাৎ করে এই লেখাটাও কারও সুনজরে পড়ে যাবে কি না তো জানি না, অনেকেই ঠারেঠোরে বলেছেন যা বোঝ না তাই নিয়ে লেখা তোমার উচিত হচ্ছে না। সব মিলিয়ে চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু বেশিদিন চুপচাপ থাকা যায় না – পেটের ভেতরটা ভবম হাজামের মত গুড়গুড় করে – রাজার মাথায় দুটো শিং। একদিন সেই শিং বেরিয়েই পড়ে।

যাই হোক–আজকে যার কথা বলব তাকেনিয়ে আগে লিখিনি। আমাদের অফিসের একটি ছেলে আছে –জ্যোতিষ্ক। এমনিতে সাদাসিধে, নোটবুকে ছবিটবি আঁকে। একদিন ফেসবুকে ছবি দেখলুম – শখ করে বাঘের গায়ে হাত বোলাচ্ছে। মনে মনে বললাম, বাপরে এক কালে স্যার আশুতোষ – আর তারপরেই জ্যোতিষ্ক । যখনই দেখা হয়েছে, বলেছি – “কিরে বাঘটাকে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে আয় একদিন।”সেও পালটা হাসে। একটু লাজুক দেঁতো হাসি। পরে যখন কাজেকর্মে আলাপ বাড়ল তখন বুঝলাম ওরকম থাইল্যান্ড (নাকি ব্যাঙ্কক) গেলে সব্বাই অমন একটু বাঘের গায়ে হাত বুলিয়ে আসে – কিন্তু আদপে সে ঘোর ভীতু। তার কাজই হিসেব রক্ষণ – কিন্তু হিসেবনিয়ে কথা শুরু হলেই – সে চোখমুখ লাল করে ফেলে, জ্যোতিষ্ক থেকে নিভষ্ক হয়ে যায়।

একদিন তাকে অফ-গার্ড ধরলুম। “কেস টা কি বল তো?”

“কোন কেসটা?”

“তোকে এমনিতে তো চালাক চতুর মনে হয় – কাজের বেলায় হঠাৎ হঠাৎ ফিউস হয়ে যাস কেন?”

“আমার মাইগ্রেন আছে”

“সিচুয়েশানাল মাইগ্রেন – আমার সঙ্গে চ্যাংড়ামো হচ্ছে?”

12511272_1169548606406123_1964383651_oঅনেক গাঁইগুঁই করে বললে, “আসলে ঐ অঙ্ক জিনিসটা আমার কিছুতেই মাথায় আসে না – আর তুমি এই ম্যানেজারদের তো জানো – আজ এই হিসেব এখুনি চাই, কাল ঐ হিসেব তক্ষুনিনিয়ে আসবি। আর আমি মাথার চুল ছিঁড়ি – একটা জুনিয়ার দিয়েছে – সে শালা কিচ্ছু করে না। পাঁচটার সময় টুক কেটে পড়ে। আর দিন নেই রাত নেই – আমার খালি হিসেব আর হিসেব – মালগুলো এত হিসেব নিয়ে যে কি করে তার নেই ঠিক।”

হেসে বললাম – “এই ব্যাপার – আগে বললেই হত?” এরপর তাকে একটা বুদ্ধি দিলাম। সে হাসতে হাসতে চলে গেল।

এর পর কদিন কেটে গেছে। দেখা গেল জ্যোতিষ্কর পারফরম্যান্স অনেকটা বেটার। তারপর একদিন তর্ক এসে বললে, “শুনলাম তুমি নাকি জ্যোতিষ্ক-কে কি একটা টোটকা দিয়েছ – আর অমনি সে হইহই করে কাজ করছে?”

“হুঁ”

“আমাদের জন্য যে কতবার বললাম, একটা ভালো দেখতে মেয়েকে নিয়ে এস টিমে – সে তো করলে না – আর যত হেল্প জ্যোতিষ্ককে – তা কি গুরুমন্তর দিলে একটু আমাদেরও বল?”

“সাত দুকুনে চোদ্দর চার হাতে রইল পেনসিল-”

“মানে?”

“মানেটা সিম্পল – আমাদের সঙ্গে কলেজে একটা ছেলে পড়ত। সে যে কোন পরীক্ষাতেই গিয়ে পাতা ভরে লিখে আসত হাতি ঘোড়া পালকি – জয় কানহাইয়া লাল – কি। আর পাশও করে যেত। জ্যোতিষ্ককেও সেরকম বললাম – যে কেউ নম্বর জিজ্ঞেস করলে কনফিডেন্টলি যে কোন একটা নম্বর বলে দিবি – থোড়াই সে তক্ষুনি খাতা খুলে বসে আছে যে তার অন্য কোন কাজ নেই যে নাম্বার মাথায় রেখে দিয়েছে। যা হোক একটা বুক চিতিয়ে বলে আসবি। তারপর দেখবি আর কেউ তোর মাথায় চেপে বসছে না। ”

“আবার ঢপ দিচ্ছ তো?”

“কোনটা ঢপ দিলাম?”

“তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না হিস্টরি – যে পাতা ভরিয়ে নম্বর আসত – আর ভুল ভাল হিসেব কিছু একটা দিয়ে দিলেই চলবে?”

“আহা তা কেন?”

“তবে?”

“ব্যাপারটা হল গিয়ে কনফিডেন্স। আমি জ্যোতিষ্ককে শুধু কনফিডেন্সটাই দিয়েছি – বুঝলি?”

“বাহ – আর ধরা পড়লে?”

“কেন হাতে হাতে পেন্সিল তো রয়েছেই। বুক ফুলিয়ে বলবে -তুমি যখন বলেছিলে, তখনো পুরো চোদ্দো হয়নি। তখন ছিল, তেরো টাকা চোদ্দো আনা তিনপাই। আমি যদি ঠিক সময় বুঝে ধাঁ করে ১৪ লিখে না ফেলতাম, তাহলে এতক্ষণে হয়ে যেত চোদ্দো টাকা এক আনা নয় পাই।”

মাথা নাড়তে নাড়তে তর্ক চলে গেল। আমি বললাম, “কি রে চললি কোথায়?”

“মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। এক কাপ চা খেয়ে আসি। নাহ – তোমার এই থিওরির পাল্লায় পড়ে মাথাটাই যাবে যে কোন একদিন। মনে হচ্ছে এর চেয়ে আমার গন্ডারই ভালো।”

ধুর ধুর – সব্বাই কেমন বেরসিক হয়ে যাচ্ছে।


 

যার ঢিশুম করতে মুখোশ লাগেনি

12544216_1168034413224209_774650714_o

সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়তাম। মা আগের দিন একটা লাল গামছা কিনে এনেছিলো। গোড়া থেকেই তক্কে তক্কে ছিলাম। পরের দিন ইস্কুল কোনো কারনে ছুটি। বেশ জুত করে সেখানা কেটে কুটে পাগড়ি বানালাম একপিস। কাগজ কেটে গোঁফ। সারাদিন চাচা চৌধুরী হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। এমন আবেগে ভেসে গেলাম যে ভুলেই গেলাম মায়ের অফিস থেকে আসাবার সময় হয়ে গ্যাছে। মা, ফিরলো, দেখলো ছেলে সদ্য কেনা গামছা ফর্দাফাই করে, তারই লাল হাতকাটা কার্ডিগান খানা গায়ে জড়িয়ে কাল্পনিক রাকাকে কাল্পনিক সাবু দিয়ে পেটাচ্ছে। যে কটা কারনের জন্য আমার মা পৃথিবীর সবচাইতে মিষ্টি প্রানী তার একটা হলো মা সেইদিন শুধু হেসেছিলো। একফোঁটাও বকেনি মারেনি। কমিক্স নামের সেই আশ্চর্য ডানা জুড়ে স্পীচ বাবল আর থট বাবলে উড়ে বেড়াতে শেখাও মার হাত ধরেই। সেই টালমাটাল সময়েই এক জন্মদিনের দিন হাতে এলো একটা কমিক্সকা বাপ (তখন গ্রাফিক বলে কোনো শব্দ আছে কিনা তাই জানিনা, তায় আবার নভেল)। নর্থ শহরতলিতে বসেই মনে প্রাণে আন্তর্জাতিক হওয়ার হাস্যকর আপ্রান চেষ্টার ওই শুরু।
তখন ডায়ামন্ড কমিসকের দাম ছিলো দশটাকায় একটা, আর নণ্টে ফন্টে হাঁদা-ভোঁদাদের সাত টাকা। আরও একট ছিলো চার-টাকা দামের হাতের তালু সাইজের হি-ম্যান। সবচাইতে দামি ছিলো অরন্যদেব, পঁচিশ টাকা। এক একটা কমিক্স ছিলো কিডনিসম। সত্যি বলছি, এখন প্রাক্তন বিষয়টা নিয়ে যতটা সেনসিটিভ তখন কমিক্স নিয়ে তার চাইতেও বেশি ছিলাম। ফলে লোহিত সাগরের হাঙ্গর-এর পিছনে নব্বুই লেখা দেখে মনে ক্যামন একটা ভক্তিভাব চলে এসেছিলো আপনা থেকেই। তারপর কিনা আবার ওত্ত বড়! ওতোগুলো পাতা! একটাই গল্প! সব মিলিয়ে একটা আশ্চর্য ব্যাপার! চমকে এক্কাকার। গল্পটা পড়েছিলাম প্রায় একদমে। তারপর প্রায় বিলিয়ান টাইমস পড়েছি। একদমে। এর আগে চাচা চৌধুরী হরেদরে এগ্রহ সেগ্রহ করেছে, ফ্ল্যাশগর্ডন তো ছেড়েই দিলাম, তাছাড়া অরন্যদেব, হি-ম্যান সব্বাই হেলায় হারিয়েছে শত্রুদের। কিন্তু এই গল্পের হীরো দেখলাম ঘুঁষি খায়, মাথায় চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, পড়ে যায়, ফেঁসে যায়। কোনো স্পেশাল পাওয়ার নেই। অসম্বব বুদ্ধি আছে এমনটাও না। কেউ যে খুব বিশেষ পাত্তা দেয় তাও না। তার মধ্যে রোগা পাতলা চেহারা। কিন্তু শেষমেশ জিত তারই হয়। এই বিষয়গুলো একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেললো। আমায় ছোট থেকেই বাড়িতে শেখানো হয়েছে তুই কিন্তু ব্যাটা গরীব এবং ইন্টালিজেন্ট আর আমি তদ্দিনে বুঝে গেছি আমি বেশ সবার মত। ফলে টিনটিন হয়ে উঠলো আরাধ্য দেবতা। ছাপোষা ইন্টালিজেন্সির জয়। দরকার শুধু সাহস আর মনের জোর।

কারন ব্যাটা ঠিক সেই সেই কাজগুলোই করত যেগুলো কর সম্ভব। কঠিন কিন্তু সম্ভব। তিব্বত মোটেই ইটারনিয়া নয়, তা সত্যিই আছে, আর ইয়েতি তো আছেই। টিনটিন যেভাবে পৃথিবী চিনিয়েছে তার তুলনা কেবলমাত্র একজনই, নিউটন নামক বিড়ালের মালিক এক প্রোফেসর। টিনটিন সবচাইতে অবাক করেছিলো ওই কারনেই। টিনটিন অবাস্তব কাজ করেনা, কঠিন কাজ করে। আর গল্প? এ বলে আমায় পড় ও বলে আমায়। জীবনের মুল লক্ষ্যই হয়ে উঠলো পয়সা জমাও টিনটিন কেনো। যথারীতি ওত টাকা ওই সময়ে কোনোদিন জমেনি। ফলে চেয়েচিন্তে ধার করে পড়া ছাড়া উপায় রইলো না। বইগুলোর গুলোর ব্যাক কভারটায় লিস্টি করে দেওয়া থাকতো সবকটা বইয়েরর নাম। সেই দেখে দেখে মেলানো শুরু। কোনটা বাকি রয়ে গ্যালো। টিনটিন রিয়্যাল। সম্মানটা আশ্চর্য বাড়লো যখন বুঝতে পারলাম টিনটিন নীল আর্মস্ট্রং এর আগে চাঁদে গ্যাছে। উরেব্বাস!! ফ্রান্সিস বেকনের কল্পবিজ্ঞান থেকেই রয়্যাল সোসাইটি হয়েছে না? হার্জ গুপ্ত বিজ্ঞানী না হয়ে যায়না। এই নিয়ে ইস্কুলে তর্ক মারামারি ওবদি পৌঁছোলো। যথারীতি অসম্ভব মার খেলাম। প্রথমে বন্ধুর কাছে, তারপর আমি আর সেই বন্ধু টিচারের কাছে। কারন টিচার জিজ্ঞেস করেছিলো মারামারি করেছিস ক্যানো? আমি উত্তরে বলেছিলাম শুধু মারা হয়েছে মারিনি। কারন টিনটিনও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেয়। তারপরেও মারাই হলো।

কালের নিয়মে পেছনে কার্বাইড পড়লো। টিনটিনকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। বিপ্লবিদের দঙ্গলের ওই ছবি দুটো মনে আছে? সেই যে টিনটিনদের প্লেন যখন প্রথম বার নামছে তখনও না খেতে পাওয়াদের রাস্তার ধারের বসতির সামনে সেনা টহল দিচ্ছে আর যখন টিনটিন আর ক্যাপ্টেন তাদের বন্ধু আলকাজারকে প্রেসিডেন্ট করে ফিরে যাচ্ছে তখনও না খেতে পাওয়াদের রাস্তার ধারের বাড়ির সামনে সেনা টহল দিচ্ছে। তাছাড়া ওটোকারের রাজদন্ডের টুইস্ট, বা ফ্লাইট ৭১৪ এ সত্যি বলার ইঞ্জেকশনে ক্যারিদাস আর রাস্টাপপুলাসের কান্না? প্রতিবার, সে কাঁকড়া রহস্য হোক বা লাল বোম্বেটের জাহাজ বা চাঁদে টিনটিন, অত্যাধিক নেশার ফল যে কি হতে পারে সেটা অত মজারু ভাবে একবারে আর কেউ বোঝাতে পারেনি। এছাড়াও আরও কত কত কত। বিতর্কও যে হয়নি এমনটা নয়। বেশিরভাগ সময়ই এশিয়ানদের খল হাস্যকর চরিত্র করা হয়েছে বলে কথা উঠছে। প্রোফেসর ক্যালকুলাসের বধিরত্ব নিয়ে মজা করা হচ্ছে বলে কথা উঠেছে। এমনকি আমার সঙ্গে এক বন্ধুর এই মর্মে তর্ক হয় যে লোহিত সাগরের হাঙ্গর গল্পে আফ্রিকার গরীব মুসলমানদের এত অবোধ দ্যাখানো হলো ক্যানো? আমি যদিও ক্রীতদাস প্রথাকে অসম্ভব গালাগাল করে লড়ে গেছি। আর লড়ব না ক্যানো? টিনটিন তো অসম্ভব রকম বাঙ্গালী, তার চার পাশের সমস্ত মানুষগুলোই তাই। তার জন্যে অবশ্যই দায়ি আরেকজন মানুষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

একবার ইংরিজিতে পড়বার চেষ্টা করেছিলাম টিনটিন। অসহ্য লেগেছে। একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। কারন বাংলা এমন একটা ভাষা যেটা বলবার ধরন এমনকি পাড়া বিশেষেও বদলে যায়। এলাকার কথা তো ছেড়েই দিলাম। যেমন “দারুন ভালো” বিষয়টা গড়িয়ার দিকটায় “ফাটিয়ে”, লেকটাউনের দিকটায় “সেরা”, কফিহাউসের দিকে “লেভেল”, দমদমের দিকে “গোলা” ইত্যাদি। টিনটিনের বাংলাটাও একটা আলাদা ধরন। শব্দচয়ন একদম গোলা। একেবারে নিজস্ব। যেমন – “ক্ষির! নিশ্চয়ই ওপরে একটু চিনি ছড়িয়ে”, “ওটা খাসনা কুট্টুস, ওটা খেলে মানুষের মত নচ্ছ্বার হয়ে যাবি”, “বাহ, দিব্যি মানিয়েছে”, “চাঁদে যাচ্ছি বলেই কি হ্যা হ্যা করে হাসতে হবে নাকি?”, “এই তোমায় বেঁধে ফেললাম এবার একটা কুমির এসে তোমায় খেয়ে ফেলবে” ইত্যাদি। প্ল্যাটিপাস যে আসলে একটা প্রানীর নাম, এটা কোনো গালাগাল নয় সেতো জানলাম এই সেদিন। একটারও কোনো কম্পিটিটর পাওয়া যাবেনা। কেবল মিলানের কোকিলকন্ঠি বিয়াংকা কাস্তাফিওরের গানগুলোর যা লিরিক সেটারই একমাত্র কম্পিটিটর আছে। উনি যদি গান “আমি এক ছোট্ট মেয়ে, ভীষন ছোট্ট আমি/চোখের তারা নীলচে আমার চুলগুলো বাদামী” তবে তার উত্তর হলো “তুতু তু তুতু তারা/ খাবি খাতা দিল হামারা” গায়ক, কেল্টু দা।

টিনটিন চিনিয়েছে পৃথিবী। টিনটিন চিনিয়েছে যুদ্ধ। টিনটিন সেই কবে তেলের পাইপ উড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল ধান্দাবাজদের মুন্ডুপাত করে গ্যাছে। নেশার চোরা কারবারিদের ধরছে। আমেরিকান গ্যাংস্টারদের জেলে ঢুকিয়ে ন্যাসকার ভূমিকে শান্ত করে তবে ফিরেছে। শুধু একটা স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে নিজের বন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে গ্যাছে নিজের প্রানের মায়া না করে। চাঁদ আর সমুদ্রের তলদেশের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। একটা ছেঁড়া খবরের কাগজের ওপর ভরসা করে বাঁচিয়েছে নিজের আর নিজের বন্ধুদের প্রান কিন্তু এত কিছু শুধুমাত্র উনিশ বছরের ভেতরেই। বয়সা বাড়েনি। কারন টিনটিনের বয়স বাড়েনা। টিন্টিনিয়ানদেরও বয়স বাড়েনা। আজও একটা মলাটের ওপর চোখ পড়লেই চারপাশ হয়ে যায়….ঠিক যেমটা হতে চাই তেমন…সাহসী, বুদ্ধিমান, চিরতরুন, যে ভালোবাসতে জানে।

বুড়ো খোকার জন্মদিন সপ্তাহে অনেক শুভেচ্ছা..

অমল মহিমা লয়ে তুমি এলে- ২

স্কুলের ছুটি পড়ে যেতো মোটামুটি তৃতীয়া কি চতুর্থীর দিন থেকেই। একমাস ছুটির পরেই থাকতো অ্যানুয়াল পরীক্ষা, কিন্তু দুর্গাপুজো শেষ না-হওয়া পর্যন্ত ভুলেও আমরা পড়ার বইয়ের ধারেকাছে
ঘেঁষতাম না। পুজোর কেনাকাটা সারতে আমরা কলকাতার দিকে গেলেও ঠাকুর দেখার সময় কিন্তু নিজেদের এলাকাটা চষে বেড়াতেই পছন্দ করতাম। শহরতলীর মাইল দশেক জায়গা জুড়ে হয়ে থাকা ঠাকুরের সংখ্যা নেহাৎ কমকিছু  ছিলো না। বনেদী বাড়ির পুজো, প্যান্ডেলের পুজো মিলিয়ে গোটাদশেক দেবীপ্রতিমা দর্শন করতেই কেমন করে যেন সময় ফুরিয়ে যেতো। পুজোর নতুন জুতোর দেওয়া পুজোর ফোস্কা পায়ে নিয়ে সপ্তমী-অষ্টমী খুঁড়িয়ে, নবমী থেকে আবার পুরনো জুতো সম্বল করেই মাইলের পর মাইল হেঁটে ঠাকুর দেখা শেষ হয়েও যেন ঠিক শেষ হতোনা। সকাল হতে না-হতেই নাকেমুখে কিছু গুঁজে প্যান্ডেলে চলে যাওয়া, বাড়ি ফিরতে ফিরতে হয়ে যেতো প্রায় মাঝরাত।

Kunal 2

ঠাকুর দেখা মানে তো শুধু ঠাকুরের কাছে যাওয়াই নয় – কে কিরকম সেজেগুজে বেরিয়েছে, পরিচিত-স্বল্পপরিচিত সমবয়সী সুন্দরী মেয়েদের দিকে ইতিউতি তাকানো, একটু হাসি, একটু ইশারা, একটু মান-অভিমান, একটু আশা-দু:সাহস – মানে  চটপট প্রেমিক-প্রেমিকা বেছে নেবার মতো এরকম সুলভ সুযোগ বছরে আর দুটো আসতো না। রঙিন ফ্রক আর শাড়ির দল, সামান্য স্নো-পাউডারের প্রসাধনীতে হঠাৎ করেই প্রজাপতির মতো সুন্দরী হয়ে ওঠা মেয়েরা চোখে যেন সম্মোহনের মায়াজাল বুনে দিয়ে যেতো। মোটামুটি সপ্তমীর সকালের মধ্যেই আমাদের পছন্দের লিস্ট কমপ্লিট হয়ে যেতো – তারপরেই শুরু হয়ে যেতো পুজোর প্রেম। সেই প্রেম চলতো টানা কালীপুজো পর্যন্ত। অষ্টমীর অঞ্জলিতে প্যান্ডেলে হয়ে চলা আরতির সময় হাত জোড় হয়ে থাকতো দশভূজা দেবীর দিকে, কিন্তু মুন্ডু আপনা-আপনিই ঘুরে যেতো দ্বিভূজা চিন্ময়ীদের দিকে। কান্ড দেখে দেবী প্রতিমার মুখ হাসিতে ভরে উঠলেও কেন যে সেই মাটির প্রতিমা সজীব হয়ে সে’দিন দশহাতে আমার কানমূলে দিয়ে যাননি তা ভেবে আজ নিজের মনেই আক্ষেপ জাগে!!  রাতের প্রতিমা দর্শনের ফাঁকে ফাঁকে চলতো রাস্তার ধারে ভূঁইফোঁড়ের মত গজিয়ে ওঠা মেক-শিফ্ট স্টলগুলোতে অনবরত: খাওয়া-দাওয়ার পালা। ভীড়ের মধ্যে রীতিমত লড়াই করে ঘুগনি-ফুচকা-আলুকাবলি-এগরোল খতম করার পর থামস-আপের বোতলের শেষ বিন্দুটুকু পর্যন্ত গলায় ঢেলে ‘হেউ’ করে একটা বিকট শব্দে ঢেঁকুর তোলার মধ্যে কি যেন এক অনাস্বাদিত আনন্দ লুকিয়ে থাকতো, যার দেখা বছরের অন্য কোনো সময়ে মিলতো না।

দেখতে দেখতেই চলে আসতো দশমী – বিসর্জনের সময়, ঢাকের কাঠিতে বেজে উঠতো বিদায়ের বোল। বুকের ভিতর চলতো উথাল-পাতাল, আবেগের তোলপাড় – মা যে চলে যাচ্ছেন। চোখ ভেঙে নেমে আসতো জল, অভিমানও হতো খুব। তবুও বড়দের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মায়ের চলে যাওয়াকে কান্নাভেজা চোখে দেখতে হতো। ঝড়ের মতো হঠাৎ করেই যে পুজো এসেছিলো, তার চেয়েও দ্রুত বেগে চলে যেতো সে, যেমনটি চিরকালই আসে আর যায়। নবমী নিশি যেন বড়ো দ্রুত অতিক্রান্ত হযে যেতো। অনেকদিন আগে এক আধুনিক কবি লিখেছিলেন —

             বোধনের ঢুলি বাজাবেই শেষে

                            বিসর্জনের বাজনা,

                     থাক থাক সে তো আজ না

                                  সে তো আজ নয়, আজ না…

কিন্তু থাক থাক করে কিছুই কি ধরে রাখা যায়? কিছুই কি ধরে রাখা যাবে? অবশেষে ঢাকের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যায়। শুন্য মন্ডপে সঙ্গীহীন ক্ষীণ প্রদীপশিখা স্মরণ করিয়ে দেয় গতদিনের উৎসব রজনীর কথা। বাতাসে হিমেল ভাব আরেকটু বেড়ে যায়, শরতের শেষ শেফালী ঝরে পড়ে অনাদরে ধুলোভরা রাস্তায়। পুরানো গৃহস্থ বাড়ির ছাদের শিখরে মিটমিটিয়ে জ্বলে ওঠে কোন সনাতন পৃথিবীর অমল আকাশ প্রদীপ…

* * *     * * *     * * *

শরতের সোনা-ঝরা রোদ আর উপচে পড়া খুশি নিয়ে ভরে থাকা আমার ছোট্টবেলার শরৎ আজ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে চলে গেছে আমার প্রিয় মানুষরা, সঙ্গে নিয়ে শরতের সবকটা সোনা-রোদ মাখা ছবি! সেই শরৎকে আর কখনোই খুঁজে পাবোনা – যা কিছু নেই, তার টুকরো টুকরো ছবি জুড়ে একটা অসম্পূর্ণ কোলাজ তৈরির চেষ্টা করে চলি মনে মনে। যদিও জানি এই কোলাজটা আর সম্পূর্ণ হবেনা কখনোই। দূর্গাপুজো আজ বিশ্বজুড়ে – সচিনকত্তার গাওয়া টাকডুম টাকডুমের ভাঙা ঢোলটা কোথাও তবু যেন একটানা বেজেই চলেছে মনে হয়।

আজ দেশ ছেড়ে, সাত-সমুদ্র তেরো-নদী পার হয়ে এই বিদেশে-বিঁভুইয়ে এসে, এতোটা কাল কাটিয়েও অনুভব করছি ছেলেবেলার সেই সব সোনা-ঝরা দিনগুলোর স্মৃতি ভোলা সহজ কথা নয়। আজন্মের বাড়ি, যেখানে জীবনের প্রথম আনন্দ, প্রথম দুঃখ, প্রথম পাপ আর প্রথম পূণ্যের অনুভব। যেখানে বেড়ে ওঠা, কিশোর থেকে যুবক হওয়া – অথচ কি যেন রহস্যময়, কি যেন নতুন – শিরশিরে, ভয় মেশানো গভীর আনন্দ – সেই জায়গার আকর্ষণ কাটানো মোটেও সহজ কথা নয়। সোনালী ফসলে ভরে থাকা দেশের মাঠ, ভোরের দোয়েল পাখির মিঠে শিস, বাড়ীর পাশে হয়ে থাকা ছোট্ট ফুলের গাছ, শালুক-শাপলার পাতায় বসে থাকা কৃষ্ণকালো ভ্রমর, বৃষ্টিভেজা কদমের অদম্য সুগন্ধ, রুপোলী জরির ফিনফিনে জ্যোৎস্নাভরা রাত, আকাশ ঝমঝম করা তারাদের একদৃষ্টে চেয়ে থাকা, মাঠ শেষের দিগন্তরেখাকে আবীর রাঙা আভায় ভরিয়ে সূর্যের অস্ত যাওয়া, কমলালেবুর গন্ধ-ভরা শীতদুপুরের রোদে পা-মেলে বসে থাকা, নিঝুম আঁধারে ঝোপঝাড়ে বেজে চলা ঝিঁঝিঁদের সম্মিলিত অর্কেস্ট্রা,  এই সবই কি আমাদের জীবনের সব চাইতে বড় পাওয়া নয় ?