খুব চেনা রূপকথা

Khub Chena Rupkatha_Mahasweta Roy

এক দেশে এক সুন্দরী রাজকন্যা ছিল। তার নাম ছিল স্নো-হোয়াইট। তার একজন হিংসুটে সৎ-মা ছিল। সেই সৎ-মায়ের একটা জাদু-আয়না ছিল। সেই সৎ-মা জাদু-আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতঃ জাদু-আয়না, বলতো, সবচেয়ে সেরা সুন্দরী কে?

-আরে, একি! একি! এই অবধি শুনে চটে যাচ্ছেন কেন? ভাবছেন, এই বহুদিনের পুরানো রূপকথার গল্পটা আপনাকে শোনাতে বসেছি কেন? বলছি , বলছি। এই গল্প শোনানোর একটা উদ্দেশ্য আছে। যেকোন ঘটনার পেছনেই একটা কার্য-কারণ থাকে। ঐ যে জাদু আয়না, স্নো-হোয়াইটের প্রাসাদের কোন এক ঘরে থাকতেন- তিনি হলেন গিয়ে -ইয়ে-মানে-বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা- আমার উর্ধ্বতন দ্বাদশ পুরুষ !! বিশ্বাস করেন নি তো? জানতাম তো – করবেন না। কিন্তু সত্যি বলছি, সোনার গিলটি করা ফ্রেমে আঁটা সেই বেলজিয়াম কাঁচের তৈরি দশ ফুট বাই চার ফুটের আয়না মশাই সত্যি আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন। তাঁর কথা সেই কবে থেকে শুনে আসছি। আয়না কূলে তাঁর কথা জানেনা এমন একজন ও পাবেন না। আর ধরে নিতে পারেন পৃথিবীর সব আয়নাই কোন না কোন ভাবে তাঁর বংশধর। তবে হ্যাঁ- এখন দিনকাল পালটে গেছে- সে রামও নেই, সে রাজত্ব ও নেই। কোথায় যেন শুনেছিলাম, মানুষ নাকি আগে খুব লম্বা লম্বা ছিল, যতদিন যাচ্ছে ক্রমশঃ বেঁটে হচ্ছে। আমাদেরও সেই দশা। দশ ফুট আয়না! আজকাল লোকের ঘরই শুনি লম্বায় চওড়ায় হয় দশ বারো ফুট মত। তা সেই অনুপাতে আয়নাও আড়ে-দির্ঘে ছোট হতে হতে কোনক্রমে বেঁচে আছে। স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স আর কাকে বলে! জাদু-দাদু (মানে সেই যাঁর কথা প্রথমেই বলেছি) বেঁচে থাকলে নির্ঘাত জলগ্রহণ ত্যাগ করতেন- যদি দেখতেন এখন আয়নারা ছোট হতে হতে শেষে কিনা আঙ্গুল-সমান হয়ে লিপস্টিকের বাক্সের গায়ে সেঁটে বসেছে!ডারউইন সাহেব বেঁচে থাকলে এ নিয়ে নিশ্চয় এক নতুন থিওরি লিখতেন। শুধু কি আয়তন! কোথায় জাদু-দাদুর সোনার ফ্রেম, আর কোথায় এখনকার-ছ্যা ছ্যা- রংবেরঙের প্লাস্টিক। ওটাই বলতে গেলে ন্যাশনাল ড্রেস কোড। যাদের এখনও কপাল ভালো, তাদের এখনও সেগুন, রোজউড, কি নিদেন পক্ষে শৌখিন রট আয়রন কি বেত জুটছে। আর কতদিন জুটবে জানিনা।

এইখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি। আমাদের আয়নাকুলের সবাই অবশ্য এ কথা স্বীকার করতে চায়না। তবে আমি করি। আমরা জাদু-দাদুর বংশধর হতে পারি বটে, কিন্তু জাদু-দাদুর ক্ষমতাটা কিন্তু কেউই পাইনি। ওই যে- রানী জিজ্ঞাসা করতো – কে সব থেকে বেশি সুন্দরীয় –

অমনি দাদু গমগমে গলায় বলে দিতেন -“তুমি নয়, স্নো-হোয়াইট হল সেরা সুন্দরী…”-

সে ক্ষমতাটা কিন্তু আমাদের কারোর নেই। সে ক্ষমতাটা জাদু-দাদুর সাথেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা যতই চেষ্টা করিনা কেন, আমরা সেটা চেষ্টা করলেও পারব না। মুশকিল হল, সবাই সেটা ঠিক মানতে চায়না, বিশেষ করে মহিলারা!

এইরে, আপনি নিশ্চয় এখন বলবেন – দিব্যি নিজের গল্প করছিলে বাপু, এর মধ্যে মহিলা টেনে আনা কেন? আসলে সত্যি কথা হল, আমি যে এ বিষয়ে ভুক্তভোগী! আমার সামনে যত মহিলা এসে বসেন, তাঁরা সবাই আমাকে ভাবেন সেই জাদু-দাদু। সামনে বসেই নিজেকে বড় বড় চোখে আর আশেপাশের সবাইকে আড়চোখে দেখেন আর আমাকে মনে মনে প্রশ্ন করতে থাকেন – কে সুন্দর? আমিই তো?

আপনি এতক্ষনে হয়তো আন্দাজ করে ফেলেছেন কেন আমার সামনে অনেক মহিলা(রা) এসে বসেন; যদি না করে থাকেন, তবে জানাই- এই অধম একটি সৌন্দর্যশালার, মানে বাংলা ভাষায় যাকে বলে বিউটি পার্লার – সেই পার্লারের দেওয়ালে আটকে থাকা একটি চার ফুট বা তিন ফুট আয়না। পাশে আরো দুজন- খুড়তুতো-পিসতুতো। চেহারা নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই- পাতি প্লাইউডের ফ্রেম, তার রঙ এককালে নীল বা সবুজ কিছু একটা ছিল, এখন বোঝা দায়। আগে বেশ ঝকঝকে তকতকে ছিলুম, ইদানীং কিছু বয়সের ছাপ পড়েছে- মানে পেছনের পারা খসে পড়ছে একটু একটু, ফলে সামনে খুব ছোট্ট ছোট্ট কালো কালো দাগ… আমার ব্ল্যাকহেডস আর কি!

এই পার্লার খুব একটা বড় নয়, কাজের মেয়েও কম। আমাদের মালকিন রোজ আসেন না, আজ এসেছেন। এখন পুজোর বাজার কিনা, এখন সারাদিনই খুব ভিড় লেগে থাকে। প্রতিমা, মঞ্জু, সবিতা- তিনজনে মিলেও সামাল দিয়ে উঠতে পারেনা। কত রকমের, কত বয়সের মহিলা – পনেরো থেকে পঞ্চাশ- সব আছে। কারোর চুলের রঙ পাল্টাতে হবে, তো কারোর মুখের দাগ মুছতে হবে; কারোর ভ্রু হরধনুর মত করে দিতে হবে, তো কার ক্যাট্রিনা কাইফের মত চুল চাই। কি ভাবছেন- আমি আবার ক্যাট্রিনা কাইফ কে চিনলাম কি করে? আরে কি ভাবেন মশাই- আমি সবাইকে চিনি- শুধু ক্যাট্রিনা-করিনা-প্রিয়াঙ্কা নয়, আমি পেনেলোপে ক্রুজ-অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকেও চিনি। ওই সব দেশি-বিদেশি ফ্যাশন ম্যাগাজিন থেকে এদের ছবি দেখিয়েই তো কত মেয়ে নিজেদের চুলের স্টাইল ঠিক করে।

যাকগে, যা বলছিলাম, এখন দুপুর দুটো মত বাজে। আমাদের বারো বাই বারো ফুটের পার্লারের ভেতরে এখন বেশ কয়েকজন সুন্দরী। সুন্দরী বলতেই হবে – কারণ মেয়েরা তো সব্বাই সুন্দরী হয়, তাই না? মাঝখানের চেয়ারে মোটাসোটা বছর পঁয়তাল্লিশ এর শ্যামবরনী স্বাতী। ইনি আমাদের পার্লারের নিয়মিত সুন্দরী। যেদিনই আসেন, মালকিন এর মুখের হাসি দুই ইঞ্চি থেকে আড়াই ইঞ্চি হয়ে যায়। কেন আর বলে দিতে হবে না বোধ হয়। অত অত নোট হাতে পেলে আমিও ওরকম খুশি হতাম! আজকে ইনি ব্যস্ত নিজের চুলের রঙ করাতে। সারা মাথায় কালো গোবরের মত মেহেন্দি গোলা মাখিয়ে দিচ্ছে প্রতিমা। এই সময়টা সাধারনতঃ বেশিরভাগ মেয়ে চোখ বুজে একটু বিউটি স্লিপ দেওয়ার চেষ্টা করেন ( পার্লারে এসে ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বললে সুন্দরীরা রেগে যেতে পারেন ) । কিন্তু স্বাতী গভীর সমস্যায় পড়েছেন। কারণ মেহেন্দি করার কথা তিনি কালকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। আজ আসার পর থেকে মালকিন এবং প্রতিমা- মঞ্জুরা (অবশ্যি মালকিন আগে থেকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন বলে ) সবাই মিলে তাঁকে বলে যাচ্ছিল যে তাঁর উচিত মেহেন্দি না করে বাজারের নতুন আমদানি বার্গান্ডি রংটা লাগানো। এটাই এ বছর বেশি চলছে। তাও তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে মেহেন্দিই লাগাবেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে ঐ রংটা লাগানোই ভালো ছিল। বিশেষ করে যখন থেকে শুনেছেন মিসেস ব্যানার্জীও ওই রঙ লাগিয়েছেন তাঁর চুলে আর তাঁকে না জানি কি অসাধারন দেখতে লাগছে…ইশ্‌, খুব ভুল হয়ে গেল…এইসব ভেবে তিনি প্রতিমাকে নানা রকম প্রশ্ন করে যাচ্ছেন- এখন কি মেহেন্দি ধুয়ে ফেলে ওই রঙ লাগানো যাবে…

…না , যাবে না, আগামি দুই তিন মাস চুলে অন্য কোন রঙ লাগানো যাবে না, কারন মেহেন্দির ওপর কোন রঙ ধরবে না…

…এমা…এটা খুব খারাপ লাগছে না? ওটা করলেই হত…

…হ্যাঁ, আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম…

ওরে বাবা! আমার আপাততঃ হাই উঠছে; এর হয়ে গেল! আজ কেন, এই পুরো পুজোটা বেচারি আর শান্তিতে কাটাতে পারবে না। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে – মাথায় ঘুরবে মিসেস ব্যানার্জীর বার্গান্ডী চুল!

আমি অন্যদিকে চোখ ফেরাই। পেছনদিকের বেঞ্চে একজন বছর ছত্রিশ-সাঁইত্রিশের ফরসা, চুপচাপ মহিলা বসে আছেন। ইনি ইন্দ্রানী। ইনিও মোটামুটি নিয়মিত। খুব একটা হেলদোল নেই, বোঝায় যাচ্ছে কি করাবেন সেই বিষয়ে খুব নিশ্চিত। তার পাশে একটু আগে ঢুকেছেন আরেকজন – চোখে চশমা, পরনে সালোয়ার কামিজ, ওই ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। ইনি নতুন মুখ। আগে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। দুজনেই ভাবলেশহীন মুখে ,পরম ধৈর্য সহকারে (মানে মনে মনে যথেষ্ট মুন্ডপাত করে ) স্বাতীর ঘ্যানঘ্যানানি শুনছেন। ওদিকের চেয়ারে এতক্ষন বসেছিল কলেজ পড়ুয়া সুমনা। ও আজকে ফেশিয়াল করাবে। কিন্তু আমাদের ফেশিয়াল মাস্টার প্রতিমা এখনও স্বাতী এবং মেহেন্দী নিয়ে ব্যস্ত। তাই সুমনা ব্যাগ রেখে বিরক্ত মুখে বেরিয়ে গেল- কাছে পিঠে ঘুরে ফেরত আসবে।

সুমনা উঠে যেতেই ইন্দ্রানীকে ডেকে নিল মঞ্জু। ইন্দ্রানী ভ্রু প্লাক করাবেন। শান্ত, নিচু গলায় কথাটা বলে নিজেকে মঞ্জুর  আঙ্গুল এবং দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা সরু সুতোর হাতে ছেড়ে দিলেন। ইতিমধ্যে ইন্দ্রানী পাশে গিয়ে বসায়, স্বাতী সাময়িকভাবে নিজের চুলের রঙের দুঃখ ভুলে ইন্দ্রানীর পাঞ্জাবিদের মত উজ্জ্বল ত্বকের প্রশংসায় মেতে উঠলেন। যাক বাবা, খানিক্ষন স্বাদবদল! কান একেবারে পচে গিয়েছিল গত আধঘন্টায়!

সবিতা মাত্র কিছুক্ষন আগে একজনের চুল কেটে কিছুক্ষণের জন্য ব্রেক নিয়েছিল। এবার ফিরে এসে পেছনে বসে থাকা সালোয়ার-কামিজ কে ডেকে নিল। সালোয়ার-কামিজ চুল কাটবেন। বিশেষ কোন কায়দা নয়, শুধুমাত্র ট্রিমিং। নতুন মুখ দেখে মালকিন পেছনে এসে দাঁড়ালেন। দাঁড়াতেই হবে – নতুন খদ্দের, যত বেশি নানারকম বুঝিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালিয়ে বিল বাড়ানো যায় আর কি !

কিন্তু ইনি দেখা যাচ্ছে সহজে ভাংছেন না। ফেশিয়াল-প্লাকিং- ম্যাসাজ-মেহেন্দী- চুল রঙ, কিছুই করবেন না। নিতান্তই ট্রিমিং, মানে পুরো একশো টাকাও বিল হবে না! আহারে মালকিন! মুখটা দেখে আমার বেশ হাসি পাচ্ছে।

কপালে অবশ্য সুখ সইল না! দরজা ঠেলে ঢুকলেন মিঠু। ইনি আমাদের আরেক নিয়মিত সুন্দরী। রোগা, খিশকুটে চেহারা, হলরবলর করে কথা বলেন, গাদা গাদা টাকা খরচা করে মুখের দাগ তোলার চেষ্টা করেন (জন্মেও উঠবে না- বসন্তের দাগ তোলা যদি অতই সহজ হত! ) আর স্বাতীর সঙ্গে সবসময় অদৃশ্য লড়াইএ ব্যস্ত থাকেন -দুজনে পড়শি কিনা! একই আবাসনের বিভিন্ন দিকে থাকেন । কি করে যেন বেশিরভাগ দিন, এরা দুজন, একজন পার্লারে এলেই, অন্যজনও এসে উপস্থিত হবেন। নির্ঘাত জানলায় দাঁড়িয়ে নজরদারি করেন সারাদিন!

যাইহোক, আপাতত মিঠু দেওয়ালের দিকে রাখা সরু বিছানাটির ওপর আধশোয়া হয়ে পড়েছেন – ইনি আজ শুধু বাজে বকতে এসেছেন নাকি মালকিনের পকেট ভারি করতেও চান, এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। প্রচন্ড রকম ভাঙ্গা গলায় মিঠু নিজের রান্নার মেয়ের গুনগান করছেন। মেয়েটি অসাধারন রাঁধে (চুল ও বাঁধে আশাকরি ), গতরাতে যা মাংস রেঁধেছিল ভাবা যায়না, আজকে দশ জন গেস্ট এর জন্য রান্না করছে- এরকম মেয়ে লাখে একটা মেলে…এইরে! স্বাতীর আর সইল না! আর সহ্য হয় এতক্ষন ধরে? – কাজেই এবার স্বাতীর পাঁচালি শুরু হল – তার রান্নার মেয়েটি বড় বড় হোটেলের শেফ দের হার মানায়- যা ইলিশ মাছ রাঁধে, আর যা পোলাও রাঁধে…এই তো আর সাতদিন পরে স্টেটস্‌ থেকে স্বাতীর দেওররা আসবে পুজো দেখতে, ওই তো সব রান্না করবে…গতমাসে লন্ডন থেকে ভাইপোরা এসেছিল, তারা তো ওর রান্না খেয়ে মুগ্ধ…

আপাতত আমাদের পার্লারে প্রতিমা-মঞ্জু-সবিতার হাত চলছে নিয়মমত, দুইজন সুন্দরীর জোর গলায় মতামত আদান-প্রদান চলছে আমাদের অচেনা দুইজন মেয়ের রান্নার হাতের ক্ষমতা নিয়ে, মালকিনের হাত নোট গোণায় ব্যস্ত,মধ্যিখান থেকে কথাবার্তা কি করে যেন ঘুরে গিয়ে রান্নার মেয়ে থেকে নিজে নিজে রান্না করা, এবং বিদেশে কিরকম সব কাজ নিজেই নিজেকে করতে হয় সেইদিকে ঘুরে গেছে, তার ফলে মালকিন সুযোগ পেয়ে তার দাদা যে সুইডেনে থাকেন আর দেওর যে কানাডা তে থাকেন সেটা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন…


ন’টা বাজলো। এবার আজকের মত আমাদের ঝাঁপ বন্ধ করার পালা। অন্য সময়ে আটটায় বন্ধ হয়ে যায়।  কিন্তু এখন সামনে পুজো। তাই বেশি সময় খোলা রাখতে হচ্ছে। আমার সামনের চেয়ারে পা ঝুলিয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে বসে আছে। তার চুল কেটে দিচ্ছে সবিতা। পেছনে মেয়ের মা ঝিমধরা ক্লান্ত মুখে বসে আছেন। পাশে গোটা তিনেক শপিং ব্যাগ। বোঝাই যাচ্ছে, মেয়েকে নিয়ে সারাদিন নতুন জামাকাপড় কিনে শেষপথে এইখানে এসেছেন। এরাই আজকের শেষ খদ্দের, থুড়ি, শেষ ছোট্ট সুন্দরী এবং তার সুন্দরী মা।

মা- মেয়ে বেরিয়ে যেতে বাড়ী ফেরার জন্য তৈরি হতে লাগলো দিনভর খাটুনিতে ক্লান্ত প্রতিমা-মঞ্জু-সবিতা। মালকিন অনেক আগেই বেরিয়ে গেছেন। প্রতিমা সব কৌটো-বাক্স-যন্ত্রপাতি  গুছিয়ে তুলে রাখছে ঠিকঠাক জায়গায়। টাকা-পয়সা হিসাব করে গুনে তুলে নিচ্ছে মঞ্জু। যাওয়ার পথে মালকিনকে হিসাব এবং চাবি দিয়ে যেতে হবে। তিনজন তিনদিকে যাবে – সোনারপুর-মাঝেরহাট-উল্টোডাঙ্গা। এখান থেকে বেরিয়ে হেঁটে বালিগঞ্জ স্টেশন, তারপর যে যার ট্রেন। যাওয়ার পথে মনে হলে ফুটপাথের দোকান থেকে টুকটাক কেনাকাটা। বাড়ি ফিরে রান্না-খাওয়া-ঝগড়া-সমস্যা-সমাধান-ঘুম, আবার পরের দিন সকাল দশটার মধ্যে এসে দরজা খোলা।

ব্যস্ত হাতে চুল আঁচড়ে নিতে নিতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো সবিতা। নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। তারপর ব্যাগ খুলে টিপের পাতা বের করে একটা ছোট্ট টিপ পড়লো, মুখের ঘাম মুছলো। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে, রোজকার মত মুচকি হেসে বললো- “জাদু-আয়না, বলতো দেখি সবথেকে সুন্দরী কে?”


নীলকন্ঠ

Nilkantho

নামটা শুনেছেন নিশ্চয়ই। এই পাখিটিকে বলা হয়। ইংরিজিতে Indian roller.
কিছুদিন আগেও ইংরিজিতে আর একটা নাম ছিল, ‘Blue jay’. কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, ও নামটা ভুল। ‘ব্লু জে’ আসলে অন্য পাখি। এবার আমি যদি বলি, ‘নীলকন্ঠ’ নামটাও ভুল, নীলকন্ঠ আসলে অন্য পাখি? সবাই রে রে করে তেড়ে আসবেন না? চিরকাল জেনে এলাম এই পাখিটা নীলকন্ঠ, আর উনি এলেন কোন বিশারদ নাম নিয়ে গোলমাল পাকাতে?

আচ্ছা, বলুন তো, চিতাবাঘ দেখেছেন, ওই ইংরিজিতে যাকে বলে leopard ? সেটাও ভুল নাম জানেন কি? কী করে জানবেন বলুন, বলতে বলতে সেটাই এখন গেড়ে বসেছে। এমন কি চিড়িয়াখানার লেপার্ড এনক্লোজারের বাইরেও বাংলায় লেখা ‘চিতাবাঘ’।, ছোট বেলাত অ-য়ে অজগর আসছে তেড়ে তো আমরা সবাই পড়েছি। মনে আছে, ‘ঙ’ নৌকো,মাঝি ব্যাঙ, চিতাবাঘের সরু ঠ্যাং’? আজ্ঞে হ্যাঁ, সরু ঠ্যাং ওয়ালা ‘Cheetah’-ই বাংলায় ‘চিতাবাঘ’।, যা ভারতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অফিশিয়ালি ১৯৪৮ সালে। তারপরেও দুটো বাচ্চা কীকরে যেন বেঁচে গেছিল। মহারাজা কারনি সিং ( সেই অলিম্পিক শুটার) বীরদর্পে অসহায় বাচ্চাদুটোকে গুলি করে মারেন ১৯৫২ সালে।

তারপর যেহেতু গোল ছোপওয়ালা জন্তু বাঙালি আর দেখেনি(চিড়িয়াখানায়, বাইরে দেখার স্কোপ নেই, বাংলায় ছিলনা), তারা তখন অন্য গোল ছোপওয়ালা জন্তুটাকে চিতাবাঘ বলতে লাগল। কিন্তু আমাদের চেয়ে যাঁরা বয়সে বড়, তাঁদের মুখে ঠিক নামটাই শুনতাম –‘গুলবাঘ’।, ধীরে ধীরে গুলবাঘ নামটা হারিয়ে গেল। লেপার্ড এখন চিতাবাঘ। বাঙালি ছোট লরিকে ‘ম্যাটাডর’ বলে, কোলকাতার সামনের সারির বাংলা, ইংরিজি দুটো কাগজেই তাই লেখা হয়, চিতাবাঘ তো শিশু।

নীলকন্ঠ – আচ্ছা কেউ ভেবে দেখেছেন, কন্ঠটাই তো নীল নয়। বাকি শরীরের অনেকটাই তো নীল। তবে ব্যাটাচ্ছেলের নাম নীলকন্ঠ কেন? কোন যুক্তিতে? শুনুন তবে লেপার্ড যেমন চিতাবাঘ নয়, এটাও নীলকন্ঠ নয়।

আশির দশকের মাঝামাঝি, আনন্দবাজারের ক্রোড়পত্রে বিরাট হেডলাইন ও দারুন আকর্ষক রঙিন ছবি সহযোগে শ্রী দেবদূত ঘোষঠাকুরের এক বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হ’ল, ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’।, সেটি যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের নামানুসারে, তা নিশ্চয় বলে দিতে হবেনা। সেখানে নীলকন্ঠ পাখি নিয়ে অনেক কথা বলা ছিল। শোভাবাজারের রাজবাড়ির যে বিজয়ার দিনে নীলকন্ঠ উড়িয়ে দেওয়ার প্রথা, তার বিরুদ্ধে। পড়ে অবশ্য হাসব না কাঁদব ঠিক করতে পারিনি। নীলকন্ঠ (মানে, এই পাখিটা) নাকি ‘পুরুলিয়া’-র পাখি। কোলকাতায় তাকে ছাড়লে নাকি কাকে মেরে দেবে, ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে বলি,এটি পুরুলিয়া-চুরুলিয়ার নয়, সারা বাংলার যত্র তত্র দেখা যায়। কোলকাতায় কাকে মারবে? গল্ফ গ্রীনে বা টলি ক্লাবে কটা দেখতে চান? কিন্তু গোড়ায় গলদ মহাশয়, এটি নীলকন্ঠ পাখিই নয়।

নীলকন্ঠ পাখি আসলে এরই জাতভাই, নাম ‘কাশ্মির রোলার’ তার কন্ঠ, অর্থাৎ গলাটাই নীল। তাকে পাওয়া যায় লাদাখ অঞ্চলে, মানে যেখানে তার উড়ে যাবার কথা, সেই কৈলাশের খুব কাছে। এখন ভারতের মূল ভূখন্ডে পাওয়া যায়না, কারন, মাইগ্রেশনের রুটে ওদের মেরে মেরে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। তবে এককালে গুজারাট, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র, কেরল ও কর্ণাট অঞ্চলে শীতকালে চলে আসত। তাকে আর দেখা যাচ্ছেনা বলেই এ বেচারার নাম হয়েছে নীলকন্ঠ।

আরও একটা বিষ্ফোরক তথ্য দিচ্ছি। একটা লিঙ্কও দিচ্ছি, সেটা একটা বহু প্রাচীন বইয়ের। বিজয়া দশমী আসলে হয় দসেরার দিনে। মনে রাখতে হবে এই দুর্গাপূজো কিন্তু আসল দুর্গাপূজো নয়। রাজা কংসনারায়ণ চালু করার আগে দুর্গাপূজো হত বসন্তকালে। নীলকন্ঠ ওড়াবার রীতি আসলে দসেরায়। কেন? দসেরার সঙ্গে নীলকন্ঠ বা শিবের কী সম্পর্ক? সম্পর্ক নেই তো। ওই বইটায় বলছে, নীলকন্ঠ আসলে বিষ্ণুর প্রতীক। আপনারা বলবেন, ধূর মশায়, বিষ্ণু আবার নীলকন্ঠ হলেন কবে? আরে বাপু হননি তো। তিনি তো ‘নীলকান্ত’।, বইটায় লেখা আছে, এটি মহারাষ্ট্রের প্রথা। তাদের সঙ্গে দক্ষিণীদের খুব যোগাযোগ ছিল এককালে। দক্ষিনীরা তো ‘ত’ লেখেন টি+এইচ দিয়ে। জয়ললিতা বানান Jaylalitha। তো নীলকান্ত তো Neelkantha – এভাবেই লেখার কথা। তাই নয় কী? লিঙ্ক দিলাম এখানে

গল্পে পড়া বেগুণপোড়া

সারা ইন্টারনেট খুঁজলে কয়েক হাজার রান্না-বান্না সংক্রান্ত ব্লগ বা ওয়েবসাইট দেখতে পাওয়া যাবে। তার মধ্যে বাংলাতে লেখা ব্লগের সংখ্যাও কম নয়। আর রান্না? একবার যেকোন একটা রান্নার রেসিপির খোঁজ করে দেখুন না!  দিশি-বিলিতি-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-ট্র্যাডিশন-ফিউশন- যে কোন রান্নার অন্তত সাড়ে সাতাত্তরখানা রেসিপি পেয়ে যাবেন ! যদি জিজ্ঞেস করেন -“সাড়ে”টা কেন? ওটা হল, সেইসব ব্লগকে বোঝাতে, যাদের মালিকেরা নিজেরা কিছু লেখেন না, কেবলমাত্র এইব্লগ-সেইব্লগ থেকে রেসিপি এর লিঙ্ক এনে নিজের ব্লগে রাখেন (অনেক সময়ে অবশ্য অন্যের ব্লগ থেকে বেমালুম পুরো রেসিপিটা ঝেড়েও দেন !) আর ওই বাকি সাতাত্তরখানার মধ্যে যেটুকু তফাত, তা হল- কেউ বলেছেন তিনচামচ লঙ্কাবাটা, তো কেউ বলেছেন তিনখানা লঙ্কাকুচি, কেউ বলেছেন বোনলেস, কেউ বলেছেন বোন-ইয়েস!! সে যাকগে, মোদ্দা কথা হল, আর রেসিপি লিখে লাভ নেই। ব্যাপারটা ওই কোন যেন এক তাত্বিক বলেছিলেন- “আর গল্প লিখে কি হবে, সব গল্পই তো লেখা হয়ে গেছে…”- ওই গোছের। যাই লিখতে যান, কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও লিখে রেখে গেছে। তাই ঠিক করলাম, খাবারের রেসিপি নয়, খাওয়াদাওয়ার গল্পই করি বরং।

শীতকাল তো শেষ হয়ে গেল। অন্ততঃ কলকাতায় তো শেষ হয়ে গেল প্রায়। এখন বেশ ফুরফুরে দখিণা বাতাস দিচ্ছে, না ঠাণ্ডা-না গরম ভাব। এই সুখ অবশ্য আর বেশিদিন থাকবে না। ঠিক যেমন থাকবে না শীতের সবজি খাওয়ার আনন্দ। ফুলকপি ভাজা, বেগুণ পোড়া, বিট-গাজরের স্যালাড…আহা…ভেবেও সুখ !

তা এই সুখের সন্ধানে শীতকাল জুড়েই নানারকমের শাক সবজি কিনে এন্তার খেতেই থাকি। শীতে আমার প্রিয় খাদ্যগুলির মধ্যে বেগুণ পোড়া আর বেগুণ ভর্তা- দুই-ই খুব পছন্দের খাবার। দুটোকেই রুটি বা ভাত, দুই দিয়েই খাওয়া চলে। তবে অনেকদিন ধরে মনে মনে বেগুণপোড়া দিয়ে আরেকটা বস্তু খাওয়ার ইচ্ছা ছিল। সেটা এবার একদিন খেয়ে দেখেছি, এবং , বলতে দ্বিধা নেই, খুব আনন্দ হয়েছে। সেটা কি, সেটা বলছি, তার আগে একটা ছোট্ট মুখবন্ধ।

বেশ কয়েক বছর আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। কোন পত্রিকা, নাকি বই, কে লেখক, গল্পের নাম কি, গল্পের রূপরেখা কি, প্রেমের না ভূতের, কিচ্ছু মনে নেই! যা মনে আছে, সেটুকু হল এইরকম- সেই গল্প ছিল কোন এক একাকী বৃদ্ধার স্মৃতিচারণ। তিনি নিজের সংসার জীবনের কথা মনে করছেন। জমজমাট শ্বশুরবাড়ি ছিল তাঁর- যেমন হয়ে থাকত সেই সব কোন এক কালে…শ্বশুর-শ্বাশুড়ি-দেওর-ভাসুর-জা ইত্যাদি প্রভৃতি। বাড়ির চার বৌএর সারাদিন কেটে যেত শুধু সারাবাড়ির লোকজনের চারবেলার খাবার যোগান দিতে দিতে। ঠিক যেমন হয়েই থাকত (এখনো হয় কোন কোন পরিবারে) বাড়ির ছেলেরা আগে খেতে বসত । বাকিরা কে কি খেতে পাচ্ছে বা পাবে সেই নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। তাদের চর্ব -চোষ্য পেট পুরে খাইয়ে, তারপরে বাচ্চা-বুড়ো-চাকর-ঝি ইত্যাদিদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে একেকদিন দেখা যেত, বাড়ির চার বৌ-এর খাওয়ার মত আর কিছু বাকি পড়ে নেই। তখন আবার ভাত বসাও, দুটো আলুসেদ্ধ দিয়ে… কোন কোন হু হু ঠাণ্ডা শীতের রাতে তাদের আর সেটাও করতে ইচ্ছা করত না। তখন শেষ উনুনের আঁচে, গোটা তিন-চারেক বেগুণ পুড়িয়ে নিত তারা। তারপরে একটু তেল-লঙ্কা দিয়ে মেখে সেই বেগুণপোড়া খেত মুড়ি দিয়ে! সে স্বাদ নাকি অমৃতের মত, যে একবার খাবে সে আর ভুলবে না।

সেই যে পড়েছিলাম- সেই থেকে আমার মনে মনে প্রবল শখ ছিল- এই খাওয়াটা একবার খেয়ে দেখতে হবে। কিন্তু গত এক যুগেরও বেশি সময়ে সেটা আর করা হয়ে ওঠেনি। এখানে একটা কথা বলে নিই- এই অবধি পড়ে আমার সাহিত্যপ্রীতি সম্পর্কে যদি আপনি যথেষ্ট সন্দিহান হন (হতেই পারেন- গল্পের নাম, লেখকের নাম মনে নেই, অথচ মুড়ি-বেগুণপোড়া মনে আছে !!)- তাহলে বলি, আমি বাপু ভাল গল্প উপন্যাসের মর্ম একটু আধটু হলেও বুঝি, আর অতটাও পেটুক নই। তবে হ্যাঁ, ভাল খাবার -দাবার সম্পর্কে আমার উৎসাহ আছে, আর আমি যে খেতে ভালবাসি সেটা সবাইকে জানাতে আমার কোন প্রচলিত নারীসুলভ লজ্জ্বা-দ্বিধা নেই (থাকতে হয় বলে শুনেছি, তাই বললাম)। আর কোন গল্পে যদি খাবারের কথা বিস্তারিত লেখা থাকে, তাহলে সেটা পড়তে আমি খুব পছন্দ করি।

এবার যা বলছিলাম তাতে ফিরে আসি। আমি, এই এতদিনে, এই শীতে, অবশেষে, সেই কাজটি করতে পেরেছি। মুড়ি দিয়ে টাটকা বেগুণপোড়া খেতে পেরেছি। এবং খেয়ে বলছি- এই অভিজ্ঞতা সবার একবার নেওয়া উচিত (যদি বেগুণে অ্যালার্জি না থাকে)! ব্যাপারটা তৈরি করাও খুব একটা ঝামেলার বা সময়সাপেক্ষ নয়। বেগুণ পোড়ানোটাতে খানিকটা সময় যায়- মিনিট দশ-পনেরোর মত। কিন্তু সেই সময়ে বাকি জিনিষগুলোকে গুছিয়ে ফেলুন। কুচিকুচি করে কেটে নিন পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচালঙ্কা, আদা, ধনেপাতা। অল্প ক্যাপসিকামও নিতে পারেন। এক মুঠো টাটকা মটরশুঁটি ধুয়ে রেখে দিন। আর হ্যাঁ, রসুন ও দিতে পারেন কুচি করে, অথবা উত্তর ভারতের নিয়মে বেগুণের গা চিরে তার মধ্যে গুঁজে দিন রসুনের কোয়া। বেগুনের সাথেই ঝলসিয়ে যাবে। কাঁচা গন্ধটা আর থাকবে না। তারপরে আর কি। বেগুণ একটু ঠাণ্ডা হলে, একটা বড় পাত্রে রেখে পোড়া খোসা ছাড়িয়ে নিন। সব কাঁচা সবজি মেশান। তারপরে সেই সব্জি-সজ্জিত পোড়া বেগুণকে (অথবা বেগুণগুলিকে ) বেশ খানিকটা সর্ষের তেল এবং আন্দাজমত নুন দিয়ে ভাল করে মেখে ফেলুন। এরপরে, ঠিক যখন খেতে ইচ্ছা করবে, একবাটি মুড়ির সাথে ভাল করে মেখে খেয়ে ফেলুন । রাতের খাবার হিসাবে খেতে না ইচ্ছা হলে, সন্ধ্যেবেলার জলখাবার হিসাবে খেয়ে দেখুন। খেতে হলে সামনের কদিনের মধ্যেই খান, গ্রীষ্মের বীজভর্তি বেগুণ পোড়া হিসাবে খাওয়ার অযোগ্য।

আদ্যন্ত বাঙালির মত হাত দিয়েই খান, আঙুল চেটে চেটে। সায়েবি কায়দায় আবার ফর্ক-স্পুন দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমেজটাই মাঠে মারা যাবে।

কংক্রিট

তাড়াহুড়ো করে মোড় ঘুরতে গিয়েই বিপত্তি। একেবারে অ্যাক্সিডেন্টই করে বসল পবিত্র। ওদিক থেকে যে একটা মোটরসাইকেল আসছে তা তো সে বুঝতেই পারেনি। কি করে বা আর পারবে? মোটরসাইকেলওয়ালা যদি হর্ন না দিয়েই হোন্ডাটা বাঁই করে ঘুরিয়ে দেয় তবে কি আর পবিত্রকে দোষ দেওয়া যায়?

‘দেখে চলতে পারো না?’ রাস্তায় পড়ে চেঁচিয়ে ওঠে সে। তার সাইকেলটা ছিটকে পড়েছে খানিকদূরে, চাকাদুটো আস্তে আস্তে ঘুরে চলেছে তখনও। আশ্চর্য ব্যাপার! ধাক্কা মেরে চলে গেল, অথচ একবার ফিরেও তাকাল না ছেলেটা। সতেরো আঠারোর মত বয়স হবে। পেছনে সিটে বসে তার গায়ে লেপ্টে রয়েছে লাল টপ আর শর্ট জিন্স পরা তারই বয়সী একটা মেয়ে। ছেলেটার এমন ভ্রূক্ষেপহীন মনোভাবে বেশ বিচলিত হয়ে পড়ল পবিত্র। হাজার হোক, সে তো তার বাবার বয়সী পঞ্চাশোর্দ্ধ এক ভদ্রলোক। তার প্রতি একটা সহমর্মিতা দেখানো তো ওদের কর্তব্য ছিল। যুগের কি মহিমা!

পবিত্রর পা কেটে তখন গলগল রক্ত ঝরছে। হাতে, থুতনিতেও কেটে ছড়ে গেছে। কনুই আর হাঁটুতে চোট লেগেছে, বেশ যন্ত্রণা। অথচ কেউই এল না তাকে সাহায্য করতে। অবশ্য রাস্তাতে কেউ ছিলও না। এই ভরদুপুরে আশেপাশের গৃহস্থ বাড়িগুলোও সব ঘুমন্ত। ইশার শরীরটা আজ ভাল নেই। টুপুসও স্কুলে গেছে। তাই তাড়াতাড়ি অফিস সেরে বাড়ি ফিরছিল পবিত্র যাতে সে স্ত্রীকে কিছু সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অবস্থাটা এখন এমনই দাঁড়াল যে তার পক্ষে কাউকে সাহায্য করা তো দূরস্থ, তারই বরং এখন সাহায্যের প্রয়োজন।

সে উঠে কোনোমতে দাঁড়াতে যাবে এমন সময় কানে এল একটা হৈ হৈ শব্দ। পবিত্র তাকিয়ে দেখে দুটো ছেলে দৌড়তে দৌড়তে এদিকেই আসছে। একজনের রোগা পাতলা চেহারা, অন্যজনের গাঁট্টাগোট্টা। রোগা ছেলেটার চোখদুটো খুব উজ্জ্বল, বেশ সজীব। চোদ্দো কি পনেরোর মত বয়স হবে। অন্যজনের বয়স একটু বেশী বলেই মনে হল।

‘কি হয়েছে কাকু? পড়ে গেছেন? চিন্তা নেই, চাপ নেবেন না। আস্তে আস্তে আমার এই হাতটা ধরে ভর দিয়ে উঠুন। পুকাই, তুই কাকুর ঐ হাতটা ঘর।‘ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা যেন সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। তারপর ধরাধরি করে পবিত্রকে ওরা সামনের একটা বাড়ির উঁচু দাওয়ার ওপর বসায়।

‘পুকাই, তুই গিয়ে ক্লাব থেকে ফার্স্ট এড বক্সটা নিয়ে আয় তো। আর আমি দেখি এদিকে কোথাও জল পাওয়া যায় কিনা। পবিত্রকে ঠিকমত বসিয়ে ছেলেটা বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়। বাড়িটার সামনেটায় দাওয়া। তার ওপাশে একটা ঘর। টিনের ছাউনি দেওয়া চালাঘর। ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দু-তিনবার ডাকাডাকি করে ছেলেটা। কিন্তু কেউই সাড়া দেয় না। সে এবার দাওয়া থেকে নেমে বাড়ির পেছন দিকটায় যায়। পেছন দিকে কিছুটা উঠোন। একটা পাড় বাঁধানো কুয়ো। জলও আছে তাতে, কচুরীপানায় ভর্তি। জলের রঙ তাই সবুজ। সে দেখে এদিকের ঘরগুলো সব পাকা সিমেন্টের। কিন্তু হতাশার বিষয় এই যে ঘরে বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। অর্থাৎ বাড়ি ফাঁকা।

ভেবেছিল যা হোক একটা জলের ব্যবস্থা করা যাবে, কিন্তু সে গুড়ে বালি। আনমনে নানা চিন্তা করতে করতে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। আর রাস্তার ওপাড়ে চোখ পড়তেই দেখে মেঘ না চাইতেই জল। সামনেই টাইমকল। সিমেন্ট বাঁধানো কলপাড়। দেড়টা এখনও বাজেনি, তাই জল থাকারই কথা। কলটা একটু খুলতেই ফস্‌ করে জল ছিটকে এসে ছেলেটার পাদুটো ভিজিয়ে দিল। বারমুডাটাও ভিজল খানিক। ছেলেটা পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে সেটাকে জলে ধুয়ে নিল। তারপর নারকোলের একটা মালাইচাকি জোগাড় করে তাতে কিছুটা জল ভরে নিল। পবিত্র তখন মাথাটা দাওয়ার থামে এলিয়ে দিয়ে চুপচাপ বিশ্রাম নিচ্ছে।

সত্যি বলতে কি, পবিত্র যেন তখন ওদের ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছিল। তার মনে হতে লাগল, এরা যেন মানুষ নয়। স্বয়ং ভগবান এদের দেবদূত করে পাঠিয়েছেন, তারই সেবার জন্য। তাই তো এদের সাথে রক্তের কোন সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও এদের এত আপন মনে হয়। যেন নিজের ছেলে তাকে জল দিয়ে তার কাটা জায়গাগুলো ধুয়ে দিচ্ছে। ব্যথায় টনটন করা কনুইয়ে শীতল জলের মলম দিচ্ছে। পবিত্র তাকে মোলায়েম স্বরে বলে, ‘তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেব বাবা। তোমরা না এসে পড়লে আমি এখনও এখানেই পড়ে থাকতাম। বয়স হয়েছে, এখন তো তোমরাই আমাদের দেখবে। তা তোমার নাম কি বাবা?’

ছেলেটা রুমাল ধুয়ে নিংড়ে নেয়, তারপর রক্ত মুছতে মুছতে বলে, ‘অর্জুন’।

–      ‘বাঃ ভাল। কোথায় থাকো তুমি? কিসে পড়?’

–      ‘এই তো এখানেই। এখানে আমায় মোটামুটি সবাই চেনে। শুধু অর্জু বললেই হবে’।

–      বাঃ তোমার তো তাহলে বেশ নামডাক আছে। অ্যাঁ! বেশ করিৎকর্মা তো তুমি, গুড। এই তো চাই।

অর্জু নিঃশব্দে কাজ করে যায়। একটা কথাও বলে না। পবিত্রই আবার বলে ওঠে, ‘কিন্তু তুমি কিসে পড় তা তো বললে না?’

–      সামনের বছর মাধ্যমিক।‘

মাধ্যমিক শুনে একটু অবাক হয় পবিত্র। কারণ মাধ্যমিকের তুলনায় এ ছেলেকে একটু বড় বলেই মনে হচ্ছে। যাক গে, তবে ওর কথাবার্তা বলার মধ্যে বেশ একটা চটপটে ভাব আছে, একটা দৃঢ়তাও।

খানিকক্ষণ বাদে পুকাইকে আসতে দেখা গেল। হাতে একটা বাক্স। যার সামনেটায় লেখা, ফার্স্ট এইড্‌। পুকাই আসতেই ওর হাত থেকে বাক্সটা প্রায় ছিনিয় নেয় অর্জু। ‘কি করিস কি? এত দেরি কেন?’ খিঁচিয়ে ওঠে অর্জু। তার গলার দেমাকি স্বরে বেশ থতমত খেয়ে গেছিল পুকাই, সে কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই অর্জু তাকে অর্ডারি গলায় বলে, ‘যা, মোড় থেকে একটা রিক্সা ডেকে আন।‘ পুকাই যেন ওর এই আদেশেরই অপেক্ষা করছিল। আজ্ঞা পেতেই সে হনহন করে হাঁটা লাগাল মোড়ের দিকে।

পবিত্র বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, ‘আবার রিক্সা কেন? আমিই হেঁটে চলে যেতে পারব। এখন ব্যথা অনেক কমে গেছে।‘

তাকে বাধা দিয়ে অর্জু গমগম করে ওঠে, ‘থামুন দেখি কাকু। অর্জু যতক্ষণ আছে, তখন সে-ই আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে দেবে। আপনি আমাদের পাড়ায় এসে যখন চোট পেয়েছেন, তখন সব দায়িত্বই আমার।‘

–      ‘হাঃ, হাঃ, হাঃ। সত্যি তুমি একটা পাগল। ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। তবে আমাদের বাড়িতে একবার এস কিন্তু। কাছেই আমার বাড়ি। তোমাকে দেখলে আমার ঘরের লোক যে কত খুশি হবে।‘ বলতে বলতে একটু থামে পবিত্র। তারপর সে আবার শুরু করে, ‘তোমাদের মত ছেলেরা আছে বলেই তো পৃথিবীটা এখনো টিকে আছে বাবা।‘

এসব কথার কোন উত্তর দেয় না অর্জু। সে নিজের মনে কাজ করে যেতে থাকে। বাক্সটা খুলে লাল মলম বের করে সে পায়ের কাটা ঘায়ে লাগিয়ে দেয়।

ইতিমধ্যে রিক্সার আওয়াজ শোনা যায়। ‘চলুন কাকু, রিক্সা এসে গেছে। দাঁত বের করে কোমল গলায় বলে অর্জু। পবিত্রর হাজার মানা সত্ত্বেও অর্জু আর পুকাই তাকে ধরাধরি করে রিক্সায় তোলে। আর তারা রিক্সার পেছন পেছন সাইকেলে যাবে ঠিক করে। সাইকেলটার হ্যাণ্ডেলটা ঘুরে গেছিল। দু এক জায়গায় ঘটাং ঘটাং আওয়াজ। ওরাই সেসব ঠিক করে দিল। তারপরে সাইকেলে উঠে বসল পুকাই। আর তার পেছনে ক্যারিয়ারের দুই  দিকে দু-পা ফাঁকা করে বসে অর্জু। খানিকদূর যেতেই অর্জু চেঁচিয়ে ওঠে, ‘দেখুন কাকু, আমাদের নতুন ক্লাব। আপনার ডানদিকে।‘

পবিত্র পাশ ফিরতেই দেখে, ‘কৈশোর সমিতি’, স্থাপিত ২০১৩। রেজিস্ট্রি নম্বরটা অবশ্য কোথাও খুঁজে পেল না সে।

মিনিট দশেক চলার পরে পবিত্রর বাড়ি আসে। হলুদ রঙের দোতলা বাড়িটার সামনে কিছুটা বাগান। রিক্সা থেকে নামার সময় অর্জু আর এগিয়ে এল না।

‘কত ভাই?’

‘তিরিশ’। সটান জবাব দেয় রিক্সাওয়ালা।

‘অ্যাঁ! এইটুকু আসতেই তিরিশ কি গো?’ পবিত্র অর্জুদের মুখের দিকে একবার তাকায়। ওরা বাড়ির ভেতরে তখন সাইকেলটা রেখে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে একটা কথাও তারা বলে না। অগত্যা পবিত্র পকেট থেকে তিরিশটা টাকা বের করে রিক্সাওয়ালার হাতে দেয়।

ভাড়া মিটিয়ে পবিত্র সাইকেলটাকে ঘরে ঢোকাতে যাবে এমন সময় অর্জু বলে ওঠে, ‘তাহলে আমাদেরও ছেড়ে দিন কাকু।‘

–      অ্যাঁ। না না। ছাড়ব কি? তোমরা এস। ঘরে এসে একটু বস। তোমাদের আজকে না খাইয়ে ছাড়ছি না। সত্যি তোমরা না থাকলে …।‘

–      ‘ আরে না না। আমরা সেকথা বলছি না। বলছি, আমাদের ভাড়াটাও এবার মিটিয়ে দিন। জানেনই তো রেট। একশো। দুজনের টোটাল দুশো। টাকাটা ছাড়ুন। কাটি।‘ কর্কশভাবে বলে ওঠে অর্জু।

পবিত্র খানিকটা সময় জন্য হাঁ হয়ে থাকে। তারপর অবাকপারা গলায় বলে, ‘ কি বলছ কি তুমি? তবে এই জন্যেই কি তোমরা এত সব কাজ করে দিলে?’

অর্জু অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বলে, ‘তা নয় তো কি? এমনি এমনি এত খাটতে যাব কেন? তাও তো বেশি কিছুই চাইলাম না। মাত্র দুশোটা টাকা, তাইতেই এই?’ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হেসে ওঠে অর্জু।

পবিত্র আর কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে একশো টাকার দুটো নোট বের করে অর্জুর হাতে দেয়। অর্জু একবার ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে চলে যায়। যাবার আগে শুধু বলে যায়, ‘নিজের খেয়াল রাখবেন, আর কিছু হয়ে গেলে আমরা তো আছিই। চলি’।

পবিত্র টের পায়, তার হাত পা কাঁপছে। সে এই প্রতিদান কল্পনাও করতে পারে নি। আজকের কৈশোর কি এতটাই বিষয়ী? সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। দরজায় ঠকঠক করে।

ইশা এসে দরজা খুলতেই চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ও মা! কি হয়েছে তোমার? পড়ে গেছিলে বুঝি? ও মা গো!”

–      চুপ কর, চুপ কর। ভাল্লাগছে না এই চেঁচামেচি’। বিরক্তিতে স্ত্রীকে ধমকে ওঠে সে।

–      কেন? কি হয়েছে?

পবিত্র ঘরে ঢুকে খাটে কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেয়। শরীরের থেকেও তার মন অনেক বেশি ক্লান্ত আর অবসন্ন। বুকে একটা কষ্ট অনুভব করে সে। তারপর ইশাকে সে সমস্ত কথা খুলে বলে।

ইশা সবটা শোনে। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, ‘তো?’

পবিত্র একটু অবাক হয়।

ইশা আবার বলে, ‘তুমি সুস্থভাবে বাড়ি এসেছ এটাই কি বড় নয়?’

পবিত্র আরো আশ্চর্য হয়ে বলে, ‘কিন্তু তাই বলে ওরা টাকা নেবে? এটা কি ধরনের ব্যবসা?’

ইশা পবিত্রর গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলে, ‘কি ছেলেমানুষ তুমি? একেবারে সেকেলেই রয়ে গেলে। বলি আজকের যুগে টাকা ছাড়া চলে? বরং আমি তো ভালই বলব। তুমি সুস্থ হয়ে নিরাপদে বাড়ি এসেছ এটাই তো ভাল। না হলে হাত পা ভেঙে কোথায় পড়ে থাকতে। সেই তুলনায় ওদের সার্ভিসটা ভালই বলতে হবে।

পবিত্র আর কোন উত্তর করে না। বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর চোখদুটো বন্ধ করে। ইশা অবাক হয়ে লক্ষ করে পবিত্রর চোখের কোণে একবিন্দু জল চিকচিক করছে ঠিক মুক্তোর মত।

টোপ

Top_Tapas Royবক বকম, বক বকম — মর্দা পায়রারা মাদা পায়রার সামনে দাঁড়িয়ে ডেকে ফিরছিল। রোজকার সুর ভাজা। খোপ থেকে বেরিয়েছিস, এখন খা দা, ঘোর ফের, আকাশটা উড়ে বেড়া, তা নয়–সেই খোপের পাশটিতে বসে ঘুরুর ঘুরুর–প্র্মীর মনের কথাটা নিয়েই যেন পাড়াতুতো মাসি প্র্মীর দিকে তাকিয়ে হেসে বলে ওঠে, দেখ, দেখ, মর্দাগুলি ঘুরে ঘুরে মাদীগুলির মন কামনার কি রকম ফন্দি দেখেছিস !

–এটাই তো নিয়ম গো মাসি! এমনটাই সব জাগায় দেখবা, প্র্মীও হেসে বলে ওঠে ।

–তাই বুঝি? তোমার রাখাল নাগর তোমায় ঘুরে ঘুরে চক্কর মারে বুঝি !

–কি যে বল না মাসি! কবুতরের সঙ্গে আমার তুলনা? মাইনসে শুনলে কিন্তু আমার কুল মান যাইব !

–কুল আবার মান! ডালে ডালে পাতায় পাতায় চলা মাসীও কম যায় না, বলে, এত কিছু দেখলে পিরীতি চলে না বাপু !

ঠিক এমনি সময় শ্যামের বাঁশরি বেজে উঠলো, যার অপেক্ষায় সময় গুনছিল প্রমী। প্র্মীর ডাক এসেছে ।

মাসি এসব জানে,বলে,কি গো,কদম তলায় ফুল ফুটল,কেষ্ট ঠাকুরের বাঁশি বেজে উঠেছে গো ! মাসি মুচকি হেসে নিজের কাজে বেরিয়ে গেল ।

প্রমী ভাবল, মাসী তো আমার মনের মাসি, সে যা  খুশি বলুক। ওর মনে গানের উদয় হল, তোরা যে যা ভাবিস ভাই, আমার শ্যামের বাঁশি চাই, মনের মধ্যেই ও গুনগুনিয়ে উঠলো।

প্র্মীর মনে ফুল ফুটছিল, বেলা এগারটার খরা রোদের তাপ অনেকটা আগুনের কাছাকাছি হলেও এক আমেজী উষ্ণ দ্রবীভূত অবস্থা ক্রমশঃ তার মন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ওই রাখাল এসেছে–ওর কাঙ্ক্ষিত প্রেমিক রাখল এসেছে। সে তাকেই ডাকছে। ওর বাঁশি বেজে ওঠা মানে তার আর বসে থাকার জো নাই! প্র্মীর বুকের মাঝে কেউ যেন বার বার ঠেস মারে—যাও, যাও, তোমায় ডাকে গো…মনের জপ কি আপনা আপনি হয় গো ! সত্যি তাই, প্র্মীর ঘন ঘন শ্বাসের সঙ্গে দিক বিদিক জ্ঞান শূন্যতার এক ভাব যেন ভর করে আছে–আর তো থাকা যায় না, আশপাশের লজ্জা ভয় ঘৃণার তাড়না এখন তার কোথায়? প্রেম যে অন্ধ গো! এ কথা কত আর বোঝানো যায়–প্রমী হেঁটে চলেছে মাঠ ঘাট ময়দান পার করে জমির সরু আল বেয়ে ওই কদম গাছ–যদিও বট গাছ ওটা…আসল কদম গাছ এখন কটা বা আছে–আর ওই কৃষ্ণ, না কেষ্ট–ওরফে রাখাল, ওর বাঁশির সুর ত এখন সপ্তমে চড়ে আছে !

 দূর থেকেই রাখালের চোখ পড়ে প্র্মীর দিকে—রাখালের ঠোঁটের দু কোন,গাল বেয়ে লটকে আছে হাসির রেখা ।

জাগাটা সামন্য  নির্জনতা ঘেরা, বটের তলায় যে সাধুর বাস সে এখন ভেনিস হয়ে আছে–আসলে সাধুর একটা পেট বলে বস্তু আছে–তাকেও পেটের ডাকে সাড়া দিতে হয়, তাই তাকে প্রায়ই দিন ভর খুঁটে খেতে বেরোতে হয় লোকালয়ে। এখন এই বট তলার আশপাশটায়  শান্ততা বিরাজমান। দূরের ফসলের খেতে এদিক ওদিক দু চারজন চাষের কাজে ব্যস্ত। তাদের চোখ এত দূর আসলেও, স্পষ্টতা বড় কম। তারা ভালো করে ঠাওর করে উঠতে পারবে না যে কোন্ নায়ক নায়িকার পালা এখানে চলছে ! আর তা ছাড়া কাজ ফেলে এত দূরবিনী চোখ নিয়ে দেখার অবকাশ তাদের কোথায় !

প্রেমিকা এখনও আনটাচড, সদ্য ফোটা না হলেও মধুপের কোরক স্পর্শ ঘটেনি  জীবনে। কিন্তু রাখাল? তার বাঁশি যে ফেটেছে! ফেটেছে বলাটা বোধ হয় ঠিক হবে না, বলা যায় অনেক বার চিড় ধরেছে ।

প্রমী এসে রাখালের সামনে দাঁড়ালো। হাসি হাসি মুখে–যেমনটি ফুল মেলে ধরে তার পাপড়ি–আকাশের দিকে–তারপর উদার উদাস ভাবনা নিয়ে মৃদু মন্দ হাসি ফুটিয়ে রাখে তার মুখে, ঠিক তেমনি ।

আলাদা একটা ফুঁৎকার শব্দ হয়ে থেমে গেল রাখালের বাঁশি।

–এত দেরী করলি কেন? অভিমান যেন রাখালের সুরে ধরা পড়ছিল ।

–কৈ? আমি তো একটুকো দেরী করি নাই, ঈষৎ হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠে প্রমী ।

–তবে আয়, আমরা দুটিতে পাশাপাশি বসি, রাখালের মনে ডগ মগ খুশির ঢেউ !

না,কেউ যদি দেখে ফেলে–এই বন বাদাড়ে খোলা মাঠের মধ্যে—প্রমীর মুখে চোখে ইতস্তত লজ্জার ভাব ফুটে ওঠে।

–কে দেখবে ক? চল সাধুর ওই বসার থানে পাথরতে গিয়া বসি আমরা, রাখালের কণ্ঠ থেকে বিনীত সুর ঝরে পড়ে ।

–না,না,সাধু বাবার থানে আমি বসুম না ।

–কেন, কি হবে? ভস্ম কইরা দিব নাকি ?

প্র্মীর হাত ধরে টেনে নিয়ে রাখল সাধু বাবার থানের সপাট পাথরের ওপর বসলো। দুজন  গুঞ্জরনে, মধুর আলাপে কখন যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলল ।

এদিকে রণ প্রমীকে খুঁজতে বেরিয়েছে। প্রমী তার ছোট বোন। ও অনেক সময় ধরে ঘরে নাই–দিন কাল বড় খারাপ–সময় সুযোগ পেলে বয়স্থা মেয়েদের আর রক্ষা নাই–পথে ঘাটে টোপ লাগানোই থাকে। না জেনে বুঝে ধারে কাছে গেছ তো সেই মনোহর মায়াবী টোপ, আসো, আসো বলে ডাকতে থাকে–তার গায়ে বৈদ্যুতিক আকর্ষণ আছে। স্যাট করে সে নিজের গায়ে সেঁটে নেবে–যেন গায়ে তার এ.সী.কারেন্ট !

–প্রমী, প্রমী, প্রমী, মায়ের চীত্কার শুনে বিরক্ত হয় রণ। মায়ের ওপর ঝাঁজিয়ে ওঠে সে, ওরে দেখে রাখতে পার না, কোথায় যায় ও ?

–আমার তো সব জালা, সব দেখা শুনা কি আমারেই করতে হইব? তুই দেখ না, তর বোইনডা কৈ গেছে, মা বলে ওঠে ।

–দেখতাছি তো, রণর ভীষণ রাগ হয়। ঢেমনি বোন সুযোগ পেলেই কোথায় লাপাতা হয় কে জানে! ইদানীং উড়ুউড়ু মন হয়েছে ওর–কোন্ দিন যে পুরুষালি টোপ গিলে বসে থাকবে–আর ঝুলে থাকবে শূন্যে !

গেল কোথায় প্রমী? নেই–আশপাশ যত দূর চোখ যায় কথাও নাই। পুকুর ঘাটের কাছে এসে দাঁড়ালো রণ। দেখল ঘাটে বৌরা কাপড় কাচছে,এক পাশে কাঁচা ডাঁসা  মেয়েরাও রয়েছে! রণ দেখল, না, এখানে প্রমী নেই। হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেল যুমার দিকে–আই বাস, মনে মনে বলে উঠলো, কি সুন্দর রে তুই যুমা–রণর মনে পড়ে গেল একটা গানের কলি–চুম্মা চুম্মা দে দে…কুঁড়ি থেকেও এ সুন্দরী–চোখ ফেরাতে পারে না রণ–যুমা ভেজা শাড়িতে পারে দাঁড়িয়ে আছে। একটু ঘন ভাবে তাকাবার চেষ্টা করল ও। যুমির সুডৌল জলদ দেহটা সৌন্দর্যের একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে না ! ওর জলদেহ–জল লিপটা শরীরটা,এও এক সাজ বাহার বটে ! শাড়ির বদলে মেয়েদের এমনি জল পোশাক মন্দ নয় ! তারপর জলবিন্দুগুলিও কেমন সুন্দর, যুমির কপালে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে লেগে আছে! তার ওপর এখানে ওখানে আনাচে কানাচে এমনি বস্ত্র ভাঁজ থাকলে খারাপ লাগে না–কোন ডিজাইন করা বর্ডারের মত আর কি !

রণ দেখেছে কুঁড়িকে আর তার ভালো লাগে না। কুঁড়ির কুঁড়ি অনেকদিন আগেই ফুটে গ্যাছে–বলতে গেলে বাসি হয়ে গ্যাছে। যেমন কুঁড়ির আগে চম্পা ঝরে গিয়েছিল তার  থেকে। সব টোপ খাওয়া–রণ ও টোপ ফেলেছিল–সে টোপ গিলে চম্পা ঝুলে গ্যাছে। এখন কুঁড়িও ফুটে বুড়ি হয়ে গেছে ! ও ভাবলো এবারে যুমার জন্যেই সুন্দর ছিপের আধার ফেলে রাখবে–শাললা, এটাই কি ভাল…বাসা !

প্র্মীর কথা মনে হতেই মাথাটা ওর জ্বলে উঠলো। বেলা বারটার রোদ, মনে হল–মাথার ঘিলু পর্যন্ত তাপ পৌঁছে গ্যাছে। পুকুর পার থেকে নেমে এলো ও। দূরে মাঠ আর মাঠ–তাতে কোথাও কোথাও কাজ চলছে–নাঙল চলছে–আগামীর বীজ বপনের প্রচেষ্টা–বর্ষার বর দানের অপেক্ষা ।

দূরে বট গাছের দিকে তাকাল রণ। আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে, আশপাশে  ঝোপ ঝাড় হয়ে আছে। তারই ফাঁক ফোঁকর গলে তার চোখে পড়লো লাল একটা রং…শুরুতে চোখ তার মুহূর্তের জন্যে জ্বলে উঠেছিল, তার পরক্ষণেই নিভে গেল–হ্যাঁ, অন্য কেউ নয়–আজ প্রমী, ওর বোন লাল শাড়ি পরেছে। ওটাই হবে প্রমী –কারো টোপ গিলতে চলেছে–রাগে রণর এক পাটি দাঁত অন্য পাটিতে চেপে বসলো। সামনেই দু তিন হাত লম্বা শক্ত বেঁকা কোঁকা লাঠি পড়ে ছিল, সেটা হাতে তুলে নিলো। আর হনহন করে প্রায় দৌড়াবার মত চলতে থাকলো বট গাছের দিকে। দেরী করা চলবে না–শেষে যদি প্রমী টোপ গিলে ঝুলে যায়! নিজের বোনকে চোখের সামনে টোপ গিলতে কোন্ দাদা দেখতে চায় ? হ্যাঁ, নিজে যত খুশি মাছ গাঁথ না কেন–সেই যে কি গান আছে না—গুরুজী, কি মাছ ধরিলা বড়শী দিয়া ? হঠাৎ রণর যেন সম্বিত ফিরল, ধুত এ সব মনে করার মত সময় এটা নাকি !

এদিকের দৃশ্য এখন বড় ঘন ঘেঁষা চলছিল। বাঁশির খোঁজ নেই–সে বেচারা কোন চুলোয় পড়ে আছে কে জানে। প্র্মীর গাল টেনে চুম্মার পর চুম্মা সেঁটে দিয়েছে রাখল। এ যে আজের রাখাল–কেষ্টের সাগরেদ–কেলো কেষ্ট ! আজের রাখাল রক্তের স্বাদ জানে। বন জঙ্গল না হলেও তার সান্নিধ্য তার মনের গহনে অনুভব হয়। তার শুরুর সহজ সরল ইচ্ছেগুলি আজ মরে গ্যাছে। এক মৃগ মন ছাড়িয়ে এখন সে ব্যাঘ্র মনে প্রবেশ করেছে। তাই রক্ত তার ভালো লাগে–শিকার করতে তার আনন্দ হয়–শরীরের মধ্যেও রক্তের উৎক্ষেপণ সমান তালে চলতে থাকে। ভালবাসার মাঝের সৎ সততা এখন কোথায় যেন উবে গ্যাছে ! সে বন জঙ্গল প্রকৃতি আজ অনেক দূরে সরে গ্যাছে–মায়া মমতা বন্ধন ক্রমশ:আলগা হয়ে গ্যাছে। শহরের মত গ্রামের পরিবেশও আজ সম ভাবে দুষিত হয়ে এসেছে। যুগের হওয়া সবার গায়েই হু হু করে লাগতে যে !

প্রমী রাখালের ঠোঁট সরিয়ে দিতে পারে নি, বড় ধার ঠোঁট, প্রতি চুম্ব চাটনে মনে হচ্ছিল প্র্মীর অনেক যন্ত্রণা যেন তার শরীরে কিলবিল করছিল। হাজারো পোকা কুট কুট করে কেটে চলছিল তার দেহ। রাখাল, রাখাল…প্র্মীর মনের ভিতর ..কি…বুকের ভিতর…কোথা যেন অবলীলাক্রমে এক জপ হয়ে চলেছিল…

ভালবাসা তো অন্ধ কিন্তু ভলোবাসতে গিয়ে শরীর বিপাকের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার–সেটা শরীর কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে–ভালবাসা উবে যেতে থাকে বাষ্পের মত–লাখালের বাষ্পায়িত ভালোলাগার আঙুল  ফিরে ফিরে শেষে খুঁজেনিয়ে ছিল প্র্মীর সেই কোমল স্থান, সেই আবরণ বাধা পেরিয়ে সযত্নে আগলে রাখা নারীর ভুবন সে খুঁজে পেয়ে ছিল। চেতন অবচেতনের মাঝখানে ছিল ওদের আধ শয্যা।  আর ঠিক এমনি সময় একটা–একটা শব্দ ওদের কানে এসে পৌঁছালো–প্রমী, এক দীর্ঘ চীত্কার !

কয়েক মুহূর্ত মাত্র সময় যেতে না যেতে রণ তার হাতের শক্ত মুঠোয় ধরা লাঠি নিয়ে পৌঁছল বট বৃক্ষের কাছে–ওই তো প্রমী, তার বোন, রাখালের দেহ জড়িয়ে পড়ে আছে ! শরীরের সব রাগ যেন মাথায় চালান হয়ে গেল রণর। সে গায়ের জোর নিয়ে রাখালের মাথা  তাক করে মোক্ষম এক বাড়ি কসাল। কিন্তু এ কি হোল ! সঙ্গে সঙ্গে প্র্মীর মুখ থেকে আচমকা চাপা চীৎকার বেরিয়ে এলো। রণ দেখল প্র্মীর মাথায় গিয়ে সে আঘাত লেগেছে ! প্র্মীর দেহ এক পাশে নেতিয়ে পড়লো–মাথা ফেটে দরদর করে রক্ত ছুটে আসতে লাগল…

রাখালের বাঁশি তখন নিরুদ্দেশ–সে দেখল রণ, ওই উড়নচণ্ডী গুণ্ডা ছোঁড়াটা লাঠি তুলে তার সামনে–বুঝতে করলো–সামনে তার যম দাঁড়িয়ে–এলানো শরীর সে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে নিলো–আর সঙ্গে সঙ্গে আঁকাবাঁকা আল পথ না ধরে সে সটান দূরের জঙ্গলের দিকে ছুটতে লাগলো।

গর্জন করে উঠলো রণ, হাতের লাঠি তার শক্ত মুঠোয় ধরা।  আজ ছাড়াছাড়ি নেই, রাখালের মৃত্যু আজ তার হাতে।

প্রাণপণে ছুটে চলেছে রাখল, পেছনে মারণ মুখী রাবণ, ধরা পড়লে আর রক্ষে নেই। চরম প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে ধেয়ে আসছে সে। রাখল দেখল আর ক’পা দূরেই জঙ্গল—ওখানেই তবু শ্বাপদ সঙ্কুলের  সাথে ও মিশে যেতে পারবে।

রণ জঙ্গলের এপাশ ওপাশ অনেকটা জাগা নিয়ে হন্যে হয়ে রাখালকে খুঁজে বেড়াল। তখনও তার দাঁতে দাঁত চেপে ধরা ছিল।

চীৎকারের আওয়াজে আশপাশ খেতখামার থেকে কিছু লোক ছুটে এলো বট গাছের তলে। দেখল প্র্মীর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। মাথা ফেটে অনেক রক্ত গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। নিশ্চুপ হয়ে আছে তার শরীর। রণ ফিরে এসে, প্রমী, বলে চীৎকার করে ডেকে উঠলো ও। কোন সাড়া নেই প্র্মীর শরীরে। ও কি তবে অনন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে?

হ্যাঁ,তাই হল–প্রমীর দেহটা সত্যি নিষ্প্রাণ অনড় হয়ে পড়ে থাকলো ।

ঝান্ডির পথে আমরা

কথা ছিলো বাইকে করে যাবার। খুব সকালে বের হবো। কিন্তু নবমীর সকালটা যে বৃষ্টি মাখা!ধুর ছাই, বৃষ্টিটা মাটি করে দিলো সব। অন্য দিন আমি এতো সকালে ঘুম থেকে উঠিই না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো । এমন সময় সবুজের ফোন। কি করে যাই বলো তো? কি আর করা যাবে আজ তা হলে বাদ দাও। না না দাঁড়াও। আমি একটা ব্যাবস্থা করছি।সকাল এগারোটার দিকে আবার সবুজের ফোন। উদয় দা চলো, আমরা একটা মারুতি ভেন ভারা করে ফেলেছি। সেকি, এখন এতবেলায়!আমি তো প্রায় নাই করে দিচ্ছিলাম, আবার ওদের কথা ভেবে.. যাক বেড়িয়েই পরলাম। জলপাইগুড়ি থেকে লাটাগুড়ি হয়ে চালসা দিয়ে মালবাজার থেকে গড়ুবাথান। তারপর পনেরো কিমি দুরে ঝান্ডি।

না গেলে হয়তো জানতেই পারতাম না, জলপাইগুড়ির এতো কাছে সুইজারল্যান্ড।

1

গড়ুবাথান পেরিয়ে নদীটার কাছে এসে যেই দাঁড়ালাম! মনে হলো মা দুর্গা হয়তো কৈলাস থেকে ঠিক এ পথেই এসেছেন। বিস্তীর্ণ কাশ ফুলের গালিচা ভেদ করে নদীর জল যখন নদী জুড়ে ছোট বড় পাথড়ে হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ছে,মনে হচ্ছে পেঁজা তুলো মেঘ আকাশ থেকে নেমে এসেছে নদীতে। নীল নয়, আকাশটা ওই দিন ছিলো সাদা ক্যানভাসের মতো। মেঘে ঢাকা হলেও দুরে পাহাড় গুলো নীল দেখাচ্ছিলো । আমার তো মন চাইছিলই না ওখান থেকে সরতে। ওই বেরসিক গুলোর জন্যই যেতে হলো।

2

এবার আর গাড়ির পেছনের ছিটে নয় ভোম্বলের আগেই আমি উঠে পরলাম সামনে। ভোম্বল হই হই করছিলো বটে আমি কানেই দেইনি।

যত দুর চোখ যায় মেঘে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চা বাগান। তার ভেতর দিয়ে রাস্তা ঠিক মতো দেখা যাচ্ছেনা । তার উপর আবার এতো খাড়া রাস্তা যে আমাদের গাড়ি গো গো করছে। ভয়ে নেমে পড়লাম।  ড্রাইভার বিকাশ আর যেতে চাচ্ছে না। অনেক বোঝানোর পর গাড়ি নিয়ে একাই উঠলো ।

3

আমরা এবার হাটছি। ওরা সবাই লাঠি হাতে এমন ভাবে হাটছে, যেন মনে হচ্ছে অমরনাথ যাচ্ছি ! আমারো কষ্ট হচ্ছিলো। তবে ক্যামেরা হাতে থাকলে আমার আবার ওগুলো মালুম হয়না। তিন চার কিমি হাটার পর গাড়ি দেখা যেতেই ধড়ে প্রাণ আসলো। বিকাশ আর কিছুতেই উঠতে চাইলো না দেখে আমাদের আর ঝান্ডির গ্রামটায় যাওয়া হলো না।

দুর থেকে দেখলাম শুধু তবু যা দেখলাম এতো মর্তো নয় এ যেন স্বর্গ।

4

মিতার মৃত্যু

 

শনিবার, সন্ধ্যে ৮ বেজে ৩০ মিনিট

পরমা ফেনায় ভেসে যাচ্ছিল। বাথ টাবটাকে একটা সুরাপাত্র মনে হচ্ছিল। অবাক লাগে ভাবতে। কোথায় তার ছোটবেলার স্যাঁতস্যাঁতে কসবার বাড়ির অন্ধকার বাথরুমের এলুমিনিয়ামের মগ আর শ্যাওলা মাখা চৌবাচ্চা। আর কোথায় অর্ণবের এই তিন হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের পেল্লায় বাথরুম এবং সেই বাথরুমের কোনে সুসজ্জিত বাথ টাবের পাশে রাখা ওয়াইন গ্লাসে তার চুমুকের লিপস্টিক।

 

আরও পাঁচ মিনিট আগে

দীপক কিছু বুঝে উঠবার আগেই মিতা বন্দুকের নলটা নিজের মুখে ঢুকিয়ে ট্রিগার টেনে দিলে। মিতা যে সোফায় বসেছিল তার পিছনের দেওয়ালে রক্ত আর ঘিলুর ছিটে লেগে একাকার।

 

আরও তিন মিনিট আগে

“ এমন উষ্কখুষ্ক চেহারায় বসে আছ ? আধ ঘণ্টার মধ্যে অর্ণবদের বাড়িতে পৌছতে হবে যে। কাম অন। চেঞ্জ করে নাও প্লিজ। কুইক। পরমা তোমায় এক্সপেক্ট করে বসে আছে”, বলতে বলতে তোয়ালে হাতে দীপক বাথরুমের দিকে এগোল।

 

আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে

কলকাতার ট্র্যাফিক ক্রমশই অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। বাইপাসের জামে অন্তত আধ ঘণ্টা ধরে আটকে। দীপকের একটা সিগারেট ধরাতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই গাড়ির এসি বন্ধ করে জানালার কাঁচ নামিয়ে শহরের ধুলো বালি খেতে ইচ্ছে হল না।

 

আরও দু ঘণ্টা আগে

–      দীপক, মিতা দিল্লী থেকে ফিরেছে?

–      এই গতকালই ফিরল। কেন, ককটেলটা আজকেই প্ল্যান করছিস নাকি ?

–      অলকেশটা এমন ভাবে ধরেছে। তা ছাড়া ভাস্কর ইজ লিভিং ফর স্টেট্‌স টুমরো। কাজেই…

–      বেশ তো, উই উইল বি দেয়ার বাই নাইন।

–      প্লিজ একটু আগে আয়। পরমা ইনসিস্ট করছে। মিতা একটু আগে এলে হেল্প করতেও পারবে…

–      ঔকে। উই উইল বি আর্লি। আর অর্ণব, কমা স্কচগুলো সৌম্যদের জন্যেই রাখিস প্লিজ। নট ফর টুডে।

–      সারটেনলি নট।

 

আরও পাঁচ মিনিট আগে

এই নতুন পারফিউমটা কেমন আচ্ছন্ন করে রাখে। মিতার ভারি ভালো লাগে। আলগোছে মাঝেমধ্যেই নিজের ঘাড়ে গলায় স্প্রে করে নেয় সে। আমেজটা অনুভব করে। আজ সন্ধেবেলা যদি পরমা-অর্ণবদের ওখানে না যেতে হয়, তবে দীপক কে বলবে একটা সিনেমা দেখাতে। অথবা কোনও একটা পাব। অনেকদিন বেরোনো হয় না।

 

আরও দেড় ঘণ্টা আগে

–      ডায়েরিটা পেয়েছ ?

–      না! কোথাও নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি।

–      আর ইউ শিওর ?

–      ইয়েস। একদম।

–      মিতা পেয়ে  যায়নি তো ?

–      মনে হয় না। ওর হাব-ভাব তো একেবারে নর্মাল।

–      তাহলে গেল কোথায় ডায়েরীটা ?

 

আরও এক দিন আগে

–      একটা ভীষণ গণ্ডগোল হয়ে গেছে।

–      কি হল ?

–      আই থিংক আমার ডায়েরিটা তোমার বেডরুমে রয়ে গেছে।

–      যেখানে আমি তোমায় কবিতা লিখে দি ?

–      আর কোন ডায়েরির কথা আমি বলতে পারি দীপক ?

–      ড্যাম ইট পরমা। আর তুমি এখন আমায় জানাচ্ছ ?

–      ডোন্ট বি রুড টু মি। মদ, শরীর; আমাদের দুজনের কারোর মাথার ঠিক ছিল  সেদিন ? হাউ ক্যান ইউ ব্লেম মি ? আচমকা আমার হ্যান্ড-ব্যাগ খুলে দেখি ডায়েরিটা নেই…

–      দ্যাট ডায়েরি ওয়াজ অলওয়েজ গোয়িং টু বি ট্রাব্‌লসাম। কেন যে তোমার মাথায় ওই সিলি জার্নালটা রাখার কথা মনে এলো।আর কেন যে আমি রাজি হলাম।শিট! হাউ হরিব্‌ল। আমাদের নিজের অ্যাডাল্টারির জার্নাল!

–      মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ দীপক। ইট ওয়াজ রোম্যান্টিক।

–      লিস্‌ন। আজ মিতা সবে দিল্লী থেকে এসেছে। আর এদিকে আমি অফিসে। তোমার মনে আছে কোথায় থাকতে পারে ডায়েরিটা ?

–      তোমার বিছানার পাশের টেবিলের ওপরে বা টেবিলের ড্রয়ারে!

–      ওহ মাই গড! তুমি এমন একটা ভুল করতে পারলে কি করে ?

–      উইল ইউ স্টপ ব্লেমিং মি ? দীপক উই আর বোথ ইনটু ইট! ভুলে যেও না।

 

আরও সতেরো বছর আগে।

মিতা দেখতে এত সুন্দর কেন ? এত মখমলে কেন ? এত ভালো লাগে কেন ওকে ? মিতা এত আদুরে কেন ?  মাঝে মাঝে পরমা পাগল হয়ে যায়; মিতাকে সে জাপটে ধরলে মিতা এত ঘাবড়ে যায় কেন ? কেন সে মিতাকে পেতে পারবে না ? পরমা মেয়ে বলে ? মিতাকে কেন শান্তনু বা দীপকই অন্ধকারে ডেকে নিয়ে জড়িয়ে ধরবে ? কেন কেন কেন ? মাঝে মাঝে পরমার মনে হয় সে মিতাকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে, শেষ করে দেবে, প্রয়োজনে খুন করে দেবে। মিতা তার না হলে অন্য কারোর কেন হবে ?

তুতুর সাপ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে

Common Sand Boa

পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া যায় এমন সব সাপই যে বিষাক্ত তা কিন্তু নয়, কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষধর সাপ ছাড়া প্রায় সব কটি নির্বিষ। কিন্তু নির্বিষ ও স্বভাবে লাজুক হওয়া সত্ত্বেও কেন তুতুর বা COMMON SAND BOA (Gongylophis conicus)  সাপটির সংখ্যা কমে আসছে সেটাই চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত সাপ সম্পর্কে আমাদের ভয় আমাদের পরিবার থেকেই প্রথমে পেয়ে থাকি। আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা সব সাপই বিষাক্ত এবং মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। তাই এদের সম্পর্কে খানিকটা জেনে নেওয়া প্রয়োজন উভয়েরই নিরাপদে জীবনধারণের স্বার্থে। বর্ধমান জেলার শিল্প ও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চল হল রানীগঞ্জ, এখান থেকেই গত ৭ই জুলাই ২০১৩ তারিখে আমি এই সাপটি প্রথম খুঁজে পাই। এদের সাথে চন্দ্রবোড়া (RUSSLLE’S VIPER ) ও অজগরের (INDIAN ROCK PYTHON) বাচ্চার অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। এই দুটি কারণই এদের ক্ষতির মূল কারণ হিসাবে দাড়ায়। প্রথমত চন্দ্রবোড়ার মারাত্মক বিষের কথা অনেকেরই জানা তাই এদের দৈহিক গঠনের সাথে চন্দ্রবোড়ার মিল থাকায় প্রায় ভুল বশত এদের মেরে ফেলা হয়। দ্বিতীয়ত সাপুড়েরা আমাদের বোকা বানানোর জন্য প্রায় সময় এদের অজগরের বাচ্চা হিসাবে খেলা দেখাতে ব্যাবহার করে তাই এদের খুঁজে পেলেই সাপুড়েদের হাতে ধরা পড়তে হয় এদের।

আকারে বেশ মোটাসোটা ও শান্ত ধরনের সাপ এই তুতুর। এরা দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা এবং স্বভাবে নিশাচর প্রকৃতির হয়। এদের মাথা শরীরের থেকে ছোটো এবং লেজটা ভোঁতা। পিঠ খসখসে আঁশে ঢাকা এবং দেহের আকারের তুলনায় চোখ দুটো খুব ছোটো। হলদেটে সাদা পিঠের ওপর বাদামী রঙের অসমান ছোপ থাকে যার জন্য এদের অনেক সময় চন্দ্রবোড়া মনে হয়। তবে চন্দ্রবোড়ার মাথা আকারে অনেক বড় এবং তেকোনা প্রকৃতির। তুতুরের পেটের অংশ হালকা ঘিয়ে রঙের হয়। স্ত্রী সাপটি পুরুষের তুলনায় লম্বা হয়। এরা সাধারণত রুক্ষ পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। লোকালয় থেকে দূরে ঘাসবন, পাথরের খাঁজ বা পুরনো ইঁদুরের গর্তে থাকতে ভালবাসে। বালি মাটিতে মিশে থাকার মতো দৈহিক গঠনের জন্য এদের উপস্থিতি প্রায় বোঝাই যায় না। এরা ইঁদুর, কাঠবেড়ালি খেতে পছন্দ করে। তবে সুযোগ পেলে ছোটো পাখি, গিরগিটিও ছাড়েনা। এরা এমনিতে খুব শান্ত স্বভাবের হলেও বিরক্ত হলে ছোটো ছোটো লাফ দিয়ে সরে যায় বা কামড়াতে আসে। এরা ডিম পাড়ে না, স্ত্রী তুতুর সাপটি মে-জুলাই মাসে ৬-৮ টি বাচ্চার জন্ম দেয়। সুতরাং এই সাপটি অযথায় মারা পড়ে বা ধরা পড়ে, তাই এদের সম্পর্কে জেনে নিয়ে এদের রক্ষায় দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। তবেই আমাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে এদেরই সাথে।

 

বাহাদুর

বাহাদুর তার বাপের সাথে খেলে। ক্ষনে ক্ষনে লাথি মারে, মখদুম হেসে উঠে।
-উঃ বাপটা লাত্থি মারাও শিখছ!
মখদুম মুগ্ধ হয়। তার ছেলে দুনিয়াটা মোকাবেলা করতে শিখতাছে। বাহাদুর কি বোঝে, ৩ বছর বয়স! মজা পেয়ে আবার তার কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে উল্টে পড়ে যায়। কিন্তু কেঁদে ওঠেনা।
মখদুম অন্ধ। তবু আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে। হাতড়িয়ে বাহাদুরকে খুঁজতে থাকে। বাহাদুর আবার লাথি মারে। তার মানে সব ঠিক আছে।
বাহাদুর রাস্তায় গাড়ি দেখায়। একটা গাড়ি ছুটে গেলেই লাফায়। বোল ফুটতাছে। চিল্লাইয়া ওঠে, গাডি গাডি গাডি… আব্বু গাডি। মখদুম ভয় পেয়ে নিজের কাছে টেনে রাখে। নিজের মত করে বুঝ দেয়,
-হ বাপ, গাডি। কি সুন্দর, না? গাডি কেমনে চলে?
বাহাদুর মুখ দিয়া ‘ব্রুম ব্রুম’ শব্দ করে দেখায়। সে যা দেখে তাই দেখে মুগ্ধ হয়! কাক দেখে… আব্বু এটা কি? পুলিশ দেখে, আব্বু ওইটা কি? আব্বা, দেখ দেখ এটা দেখ ঐযে ঐটা… মখদুম বুঝতে পারেনা কি দেখায়। তার বাপ যে দেখেও না, সেটাও সে জানে না। মখদুম দেখার ভান করে বলে,
-ওহ! ঐটা। ঐটা আমার বাপের পংখীরাজ।
বাহাদুর ‘উম’ বলে বুঝুক না বুঝুক খুশি যে,
এটা তারই। মখদুম মিথ্যা বলতে চায় না।
যখন যে দল ক্ষমতায় আসছে, তার খালি গেছে। একে একে থাকার আশ্রয় জমি, তার ঠ্যাং তারপর চোখ। এরপর সে একদিন গেছিল পার্টি অফিসে।
-ভাই, আপনাদের কিডনি লাগবে না? আমার একটা বেশি আছে।
কুত্তাগুলা সব খাইছে আমার, সব! বাহাদুর এগুলার মধ্যে না পড়ুক, না দেখুক, না জানুক। কিন্তু কিভাবে বাঁচাবে সে তার বাহাদুরকে?
তার চোখ নাই সে বেঁচে গেছে। তাকে দুনিয়ার খারাপ জিনিশগুলা দেখতে হয় না আর। টিভি, পেপার, খবর, এক্সিডেন্ট, খুনাখুনি, মারামারি, জমি নিয়া কাইজ্যা, টেকার খেলা, ক্ষমতা, গন্ডগোল দেখতে হয় না। বাহাদুরকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে সে। মানুষ বহুত ডেঞ্জারাস। কিন্তু কি করবে সে? কিভাবে বাঁচবে বাহাদুর? চিন্তায় তার হাতের পাউরুটি অবহেলায় ঝুলছিল। হঠাত কোত্থেকে এক কুকুর এসে পাউরুটি হাত থেকে থাবা মেরে নিয়ে যায়। মখদুম চিল্লান দেয়, পিছে পিছে যায় বাহাদুর। পাউরুটি নিয়ে কুকুরের সাথে লড়াই করে বাহাদুর। দূর থেকে মখদুম চিল্লায়,
-ধর, ধর। মার। একটা কুত্তাও ছাড়বিনা। মার।
তারপর সব চুপ। মখদুম শংকিত কন্ঠে হাঁক দেয়… ততক্ষনে বাহাদুর কুকুরের মুখ থেকে পাউরুটি ছিনিয়ে এনে বীরদর্পে বাবার দিকে এগোতে থাকে। মখদুম দেখে না। এতক্ষন পর পাশে একলোকের আওয়াজ শোনা যায়,
-আরে এটা পোলা না বাঘ!? কুকুরের লগে যুদ্ধ কইরা কুকুরের মুখ থেইকা খাবার কাইড়া লইয়া আইছে।

মখদুম ঝটকা দিয়া বাহাদুরের হাতের পাউরুটি ফেলে দেয়। তার যেইখানে চোখ নাই সেই কোঠরে পানি জমা হয়। বাহাদুররে কোলে নিতে নিতে কয়,
-আমরা কুত্তা ডরাইনি!

অমল ও বইওয়ালা (নো অফেন্স মেন্ট!)

 

বইওআলা। বই — বই — ভালো বই!

 

অমল। বইওআলা, বইওআলা, ও বইওআলা!

 

বইওআলা। ডাকছ কেন? বই কিনবে?

 

অমল। কেন কিনব! আমি তো ই-বুক পড়ি।

 

বইওআলা। কেমন ছেলে তুমি। কিনবে না তো আমার বেলা বইয়ে দাও কেন?

 

অমল। আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতুম তো অন্য ব্যবসা করতুম।

 

বইওআলা। অন্য ব্যবসা!

 

অমল। হাঁ। তুমি যে কত হাঁক পেড়েও কিছু বিক্রী করতে পারছ না তা দেখে আমার মন খারাপ লাগছে।

 

বইওআলা। (বইর ব্যাগ নামাইয়া) বাবা, তুমি কি বিজনেস কনসাল্ট্যান্ট?

 

অমল। আমি তো ফেসবুকের ওপর ডক্টরেট করছি  তাই আমি সারাদিন ল্যাপটপ খুলেই বসে থাকি।

 

বইওআলা। আহা, বাছা তোমার কী হয়েছে?

 

অমল। আমি বড় হয়েছি। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শিখেছি। বইওআলা, তুমি কোথা থেকে আসছ?

 

বইওআলা। আমাদের গ্রাম থেকে আসছি।

 

অমল। তোমাদের গ্রাম? অনে–ক দূরে তোমাদের গ্রাম?

 

বইওআলা। আমাদের গ্রাম সেই পাঁচমুড়া পাহাড়ের তলায়। শামলী নদীর ধারে।

 

অমল। পাঁচমুড়া পাহাড় — শামলী নদী — কী জানি,হয়তো গুগল ম্যাপে তোমাদের গ্রাম দেখেছি — কবে সে আমার মনে পড়ে না।

 

বইওআলা। তুমি দেখেছ? পাহাড়তলায় কোনোদিন গিয়েছিলে নাকি?

 

অমল। না, কোনোদিন যাই নি। কিন্তু আমি ছবি দেখেছি। অনেক পুরোনোকালের খুব বড়ো বড়ো গাছের তলায় তোমাদের গ্রাম — একটি লাল রঙের রাস্তার ধারে। না?

 

বইওআলা। ঠিক বলেছ বাবা।

 

অমল। সেখানে পাহাড়ের গায়ে সব গোরু চরে বেড়াচ্ছে।

 

বইওআলা। কী আশ্চর্য! ঠিক বলছ। আমাদের গ্রামে গোরু চরে বই কি, খুব চরে।

 

অমল। মেয়েরা সব নদী থেকে জল তুলে মাথায় কলসী করে নিয়ে যায় — তাদের লাল শাড়ি পরা।

 

বইওআলা। বা! বা! ঠিক কথা। আমাদের সব গয়লাপাড়ার মেয়েরা নদী থেকে জল তুলে তো নিয়ে যায়ই। তবে কিনা তারা সবাই যে লাল শাড়ি পরে তা নয় — কিন্তু বাবা, তুমি নিশ্চয় কোনোদিন সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলে!

 

অমল। সত্যি বলছি বইওআলা, আমি একদিনও যাই নি। ঘরে বসেই যদি সব জানা যায় তাহলে কী দরকার গিয়ে তোমাদের গ্রামে?

 

বইওআলা। ঠিক কথা বাবা, খুব সত্যি কথা!

 

অমল। আমি বরং তোমায় অনলাইন বই বেচতে শিখিয়ে দেব। ঐরকম ব্যাগ কাঁধে নিয়ে — ঐরকম খুব দূরের রাস্তা দিয়ে আর তোমাকে ঘুরে বেড়াতে হবে না।

 

বইওআলা। মরে যাই! বই বেচতে যাব কেন বাবা। আমি আর তুমি মিলে বরং ও এল এক্স এর মতো কিছু সাইট খুলব।

 

অমল। না, না, আমি কক্‌খনো অনলাইনে ব্যবসা করব না। আমি একটা বিজনেস কন্সাল্টেন্সি ফার্ম খুলব। একে ওকে শুধু উপদেশ দেব, প্রয়োজনে ট্রেনিং ও দেব।

 

বইওআলা। হায় পোড়াকপাল! এ কেরিয়ার ও কি কোনো কেরিয়ার হল!

 

অমল। না, না, এ আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। ওয়াই ফাই খুব স্ট্রং হলে যেমন অনেক দূর থেকে নেট কানেক্ট করা যায় — তেমনি ঐ রাস্তার মোড় থেকে ঐ গাছের সারির মধ্যে দিয়ে যখন তোমার ডাক আসছিল, আমার মনে হচ্ছিল – ফেসবুকে ডক্টরেট করা হয়ে গেলে আমাকে কন্সাল্টেন্সি ফার্ম খুলতেই হবে!

 

বইওআলা। বাবা, এই এক ব্যাগ বই তুমি রাখো।

 

অমল। আমার তো বাজেট অ্যালোকেটেড নেই।

 

বইওআলা। না না না না — বাজেটের কথা বোলো না। আমার বইগুলো বিদেয় হলে আমি কত খুশি হব।

 

অমল। তোমার কি অনেক দেরি হয়ে গেল?

 

বইওআলা। কিচ্ছু দেরি হয় নি বাবা, আমার কোনো লোকসান হয় নি। বই বেচা যে কত ওয়েস্ট অফ টাইম সে তোমার কাছে শিখে নিলুম।