আশ্বিনের শারদ প্রাতে

আমি বাংলা ভাষাও ছাড়িনি, বাঙালিয়ানা ও ছাড়িনি, ছেড়েছি শুধু শহরটা। তবে ওটাও নেহাত দায় না পড়লে ছাড়তাম না।

শহর থেকে দূরে থাকার একটা খারাপ দিক হলও এখানে উৎসবের আমেজ ঠিক বোধ করা যায়না। উৎসব বলতে এখন অবশ্যই দুর্গাপূজার কথা বলছি। আজ দশ বছরের বেশি হয়ে গেল বাইরে। দিল্লী, লখনৌ, মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, লন্ডন… এখানে কোথাও কাশফুল ফোটেনা। কোথাও মহালয়ার দিন ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের আওয়াজ রেডিও থেকে ভেসে আসেনা। এখন অবশ্য সব টিভি চ্যানেলে একটা না একটা মহিষাসুর-মর্দিনী অভিনীত হয়, কিন্তু কোনও কিছুই যেন সেই রেডিওতে মহালয়া শোনার অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে পারেনা।

ছোটবেলার স্মৃতির কাঁটা এখনো আটকে আছে বাবার সেই murphy রেডিওতে। মহালয়া মানে এখনো আমার কাছে সেই পুরনো রেডিও, বীরেন বাবুর গলা, আর তারপর বাবা, জেঠু, কাকার তৈরি হয়ে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ করতে যাওয়া। মহালয়া মানে এখনো কাশফুল।

এখানে আমাকে কেউ ভোরবেলা ডেকে দেয়না। আগের দিন রাত জেগে প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করা ক্লান্ত চোখ মিছেই গোসা করে এলার্ম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। কফি মেকারের শব্দ, টোস্টারের থেকে বেরিয়ে আসা দুটো মুচমুচে টোস্ট, বাইরে হাল্কা মেঘলা আকাশ, আর অদূরের ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ, সব মনে করিয়ে দেয় আমার নাগরিক ব্যস্ততাকে। অফিস যেতে হবে।

রিপোর্টে শেষ মুহূর্তের ঝালাই দেওয়ার জন্যে ল্যাপটপ খুলতেই চোখ পরে গেল ক্যালেন্ডারে। আজ মহালয়া না? নিজের অজান্তেই রিপোর্টটা বন্ধ করে ইউটিউব খুলে টাইপ করি “মহালয়া বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র”। প্লেলিস্টের প্রথম ভিডিওতে ক্লিক করে, কফির কাপটা নিয়ে দাঁড়াই আমার বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর সামনে। ঘর জুড়ে তখন গমগম করে ওঠে বীরেন বাবুর কণ্ঠ…”আশ্বিনের শারদ প্রাতে…” এই বছরও বাড়ি ফেরা হলোনা।

উপন্যাস আলোচনা: ‘কলাবতী কথা’

প্রতি বছর পুজো আমাদের কাছে একগুচ্ছ সাহিত্য নিয়ে হাজির হয় শারদীয়া পত্রিকা গুলোতে। আমাদের মত সাহিত্য পিপাসুরা অধীর আগ্রহে তাই অপেক্ষা করে থাকে পুজোর আগমনের। কিছু লেখা নিজ গুণে মনে থেকে যায়, আর কিছু লেখা বিস্মৃত হয় গুণহীনতায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত, বেশ কিছু গল্প উপন্যাস পড়লাম। তার মধ্যে শারদীয়া সানন্দাতে প্রকাশিত ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কলাবতী কথা’ র মধ্যে ভিন্নধর্মী এক লেখার আস্বাদ পেলাম।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে সাঁওতাল কন্যা কলাবতী। অদৃষ্টের পরিহাসে মাধ্যমিকেই পড়াশোনার ইতি, সে তার গ্রামের সাঁওতালি মাদল দলের এক নাচিয়ে, কুরুম্ভেরার মেলায় লাঞ্ছিত , পায়নি নিজের দলের কারুর সহানুভূতি বা সাহায্য। মেলার ওই ঘটনায় সে বাঁধা পড়ে কনকের সাথে এবং কালক্রমে কনকের সংসারে।

কনকের জীবনে সুখের থেকে দুঃখ টাই বেশি। পায়নি স্বামীর ভালবাসাটুকুও। তবুও নিজের সংসারের অস্বচ্ছলতাকে অতিক্রম করে এক আধুনিক রমণীর মোড়কে তাকে আমরা দেখতে পাই যার কাছে অপরিচিত কোন মেয়ের সম্ভ্রম অনেক বড় হয় নিজের অর্থোপার্জন থেকে। তাইতো কলাবতী যখন কুরুম্ভেরা মেলায় লাঞ্ছিত হয়েছে তখন একা সে পাশে দাঁড়িয়েছে, এগিয়ে গেছে প্রতিবাদ করতে বিপদ আছে জেনেও এবং সবশেষে জাতিভেদ দূরে রেখে সাঁওতাল মেয়ে কলাবতীকে নিজের পুত্রবধূর সম্মান দিয়েছে। এখানেই মহৎ হয়ে উঠেছে চরিত্রটি। আধুনিক চিন্তাভাবনার যে প্রতিফলন দেখি আমরা কনকের চরিত্র তা আধুনিক অগ্রসর সমাজেও বিরল।

রামু, কলাবতীর স্বামী, কনকের পুত্র। কলাবতীর প্রতি ভালবাসার অন্ত নেই। কনক, কলাবতীর ‘পইঠার পট-চিত্র’ গড়ে ওঠা ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য রামুর প্রতিদান অনেকটাই। কিন্তু রামুর সহজ সরল মন কলাবতীর মনের গভীরে পৌঁছতে পারে না। পারে না একজন নারীর গভীরতম ইচ্ছা অনিচ্ছার নাগাল পেতে, তাই তাকে হারাতে হয় কলাবতীকে। শুধু সাংসারিক দায়িত্ব ছাড়াও যে একজন নারী তার মনের পুরুষের কাছে আরও কিছু প্রত্যাশা করে নীরবে, তা বোঝার সাধ্য বোধহয় সহজ সরল গ্রাম্য রামুর ছিল না।

এছাড়া আমরা দেখি আকিও ও মিকি চরিত্র, জাপানী ছেলে মেয়ে। মিকির সাথে কলাবতীর পরিচয় হয় মেলায়। এবং তার হাত ধরেই কলাবতীর পটশিল্প পৌঁছে যায় সুদূর জাপানে। এবং উপন্যাস শেষে আকিওর হাত ধরে কলাবতীর নতুন সংসার শুরু হয় জাপানে।

কিন্তু যে জিনিসটা এই লেখাটাকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে তা হল এর বিষয়বস্তু। গ্রাম বাংলার পটশিল্প, পটশিল্পীদের জীবন, কথকতার কাহিনী যেগুলো বাংলার নিজস্ব, যার মধ্যে কোন কৃত্রিমতা নেই। লেখককে সেই কারণে ধন্যবাদ। বাংলার হাট, মিলন মেলার মেলা ইত্যাদি জায়গায় এই পটশিল্পের কিছু নমুনা আমরা মাঝে মাঝে কলকাতায় বসে দেখার সুযোগ পাই। কিন্তু লেখিকার লেখনীর জোড়ে আমরা ঘুরে আসি এই সব পটশিল্পীদের জীবনে, তাদের সংঘর্ষময় জীবনযাত্রার মধ্যে। দেখতে পাই কিভাবে এই পটশিল্পীরা পটের শিল্পের মধ্যে পুরাণের কাহিনী ফুটিয়ে তোলে, তার উপযুক্ত গান রচনা করে মেলায় মেলায় পসার সাজিয়ে বসে, কিভাবে দিনের পর দিন নিজেদের দারিদ্র অতিক্রম করেও বাংলার এই ঐতিহ্য কে নিজেদের কাঁধে বয়ে নিয়ে চলে। সঙ্গে রয়েছে কথকতার কাহিনী। উপন্যাসে বেশ কিছু ব্রতকথার উল্লেখ রয়েছে – ভৈমি একাদশী ব্রত, গোটা ষষ্ঠী, নিত-সিঁদুর ব্রত, অশোকষষ্ঠীর ব্রত, নীলষষ্ঠী ব্রত, অক্ষয় তৃতীয়া, বিপত্তারিণীর ব্রত, চাপড়া-ষষ্ঠী। এই সব ব্রতের পৌরাণিক কাহিনী কখনো কথকঠাকুরের মুখে, কখনো কনকের মুখে, কখনো কলাবতীর মুখে অনবদ্য ভঙ্গিতে লেখিকা ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখিকার পুরাণ বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা প্রশংসার উল্লেখ রাখে। উপন্যাস শেষে বিশেষ নোটের উল্লেখ থেকে জানতে পারি লেখিকা দীর্ঘদিন মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ছিলেন এবং সেই সূত্রে এই পটশিল্পীদের সংসর্গে এসেছিলেন। লেখিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই পটশিল্পীদের জীবনকে তাঁর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময়ের ফসল ‘কলাবতী কথা’, এটা যে কোন ‘Puja Assignment’ না তা পড়লেই বোঝা যায়। লেখিকা হৃদয় দিয়ে লিখেছেন। তাই লেখাটা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

তবে উপন্যাস পড়া শেষে কিছু প্রশ্ন মনে আসে।

এক জায়গায় আমরা দেখি আকিও জাপানী ভাষা ছাড়া জানে না। অথচ সেই রাতেই সে পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। এই কথোকপথন টা না থাকলেই বোধহয় ভাল হত। আমরা তো অনেক সময়েই নীরবে অনেক কথা বলে দিই। দুজন ভিন্নভাষী মানুষকে একে অপরের কাছে আনতে নাই বা আমরা মুখের ভাষা ব্যবহার করলাম, মনের ভাষাটা কি যথার্থ হত না?

উপন্যাসের শেষে যখন কলাবতী আকিওর সাথে জাপানে তার নতুন সংসার শুরু করে সেই সময় তার শাশুড়ি কনক বা তার স্বামী রামুর মনে কি হল তা জানা গেল না। কনক বা রামু ব্যাপারটা এত সহজে মেনে নেওয়াটাকেও ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। কলাবতীর মধ্যে আধুনিক মনস্কতার পরিচয় থাকলেও তা যেন কোথাও একটা সীমা লঙ্ঘন করে। তার দেশের সীমা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার থেকেও বড় হয়ে দেখা দেয় নারীত্বের পূর্ণ স্বাদ পাওয়ার নিদারুণ চাহিদা থেকে নারীমর্যাদার সীমানা পেড়িয়ে যাওয়া। তাই কলাবতী এই উপন্যাসের নায়িকা হয়েও কিছুটা যেন খলনায়িকা হয়ে যায় গল্প শেষে।

সব শেষে আবারও ধন্যবাদ লেখিকাকে এরকম একটা উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য। আশা করি লেখিকা পাঠকদের জন্য এরকম আরও কিছু উপন্যাসের ডালি নিয়ে হাজির হবেন অদূর ভবিষ্যতে।

ছিন্নবীণা ২


আগের পর্ব


যারা কাজ পরে করে, তারা কর-পরেট !

কী করবো বল, এই পোড়া IT Sector-এ রাত ৮-টার আগে তো কাজের চাপ পড়তেই দেখিনা।

আর এই খামকা বাজে কাজের উটকো চাপ বাঁচাতে দেখি, আশেপাশে পালাই পালাই রব। কেউ উচ্চশিক্ষা, তো কেউ ব্যাবসা। যারা উচ্চশিক্ষা, তাদের মধ্যে কেউ আবার উচ্চশিক্ষা করে ব্যাবসা। আর তার সাথে মাথা উঁচু flat, আর গাড়ি, আর না জানি কী।

জয় বাবা বিশ্বকর্মা ! তুমি না থাকলে কত কী পেতাম না। না আমি rowdy গুঁফো style বলছি না, ওটার জন্য Akshay/Salman আছে, বলছি এই আর্কিটেক্ট আর ডিজাইনারদের কথা। এই বাড়ি, গাড়ি, এই চারটে বন্ধুর সাথে রেস্তরায়ে গিলে আসা, যদিও এটাই সব নয়, এবং রাত্রে ঘুমের আগে নিজের এই অখাদ্য জীবনটা নিয়ে “কিচ্চু হবে নাহ !” ভাবলেই সব শেষ হয়ে যায়ে না, তাও মাঝে মাঝে ভাবি, এটাই কি আমি?

এটাই কি সব? কি চাইছি আমি বা আমরা? জাস্ট এই মেকি সুখ? আর তার পেছনে এত এত EMI-এর চোখ নাচানো? আমরা আজ totally confused।

‘ত্বাস্তর’ – এই confusion তৈরি করার একটাই অস্ত্র আছে, ত্বাস্তর। এ অস্ত্র আর কারুর নয়, বিশ্বকর্মার।

সব খারাপ, কিন্তু, সবই খারাপ কি? এই যে উঁচু ছাদগুলোতে দাঁড়িয়ে আমরা ঘুড়ি ওড়াই, খারাপ?

এই যে পুরনো গানগুলো আবার ফিরে আসে, খারাপ?

তুমি আর্কিটেক্ট। শুধু স্বর্গ, ত্রিপুর, লঙ্কা, ইন্দ্রপ্রস্থের-ই নয়ে, তুমি আর্কিটেক্ট এখনকার আমাদের জীবনধারার, আমাদের নতুন ফ্লাই-ওভার, আর আমাদের তার জন্যে রাস্তায় জ্যামেরও। তোমার ওপর ভরসা রেখেই আমরা গোঁত্তা খেতে খেতে অফিস যাচ্ছি, তাও ভাবছি, তুমি থাকলে ‘আচ্ছে দিন’ আসবেই!

তুমি “হাতি বাঁচাও” আন্দলনের মুখপাত্র, এবং পাড়ায়ে পাড়ায়ে Daler Mehndi-র গান চালানোরও পেছনে আছো।

তুমি বছরে একবার আসো বলেই রিক্সা-কাকু, অটো-কাকুরা, আমাদের সবার আগে celebrate করতে পারে; পরে অবশ্য তার দাম আমিই দেই, তবে এই রেজাল্ট দেখে তবে না মা দুগগা আসতে ভরসা পায় !

তুমি হার্ডওয়্যার নিয়ে Multi-tasking গুরু, তাই জন্যেই তো ইন্দ্রপ্রস্থে তোমার পুকুরে দুর্যোধন পড়ে গিয়ে episode-episode যুদ্ধ শুরু !

তুমি খালি গায়ে, ধুতি পরে, হাতি চড়ে smart…

আরে তুমি আর ১৫-ই আগস্ট আছে বলেই না, ঘুড়ি ওড়ানোটা আর্ট !

যাক, outlook-এ মেল এসেছে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কিনা, আমাদের ছুটি নেই, তোমরা ওড়াও, আমি…

ছিন্নবীণা ১

দুগগা নামে শুরু!


পুজো এসে গেল !

আর আমি জনৈক বাঙালি, অফিস কাছারি করেই ব্যাস্ত। পাড়ায় Theme পুজো হয় না, তাই পুজোর সপ্তাহখানেক আগের থেকে ছাড়া বোঝা দায়ে যে পুজো আসছে।

মা কে জিগালাম, “কী নেবে পুজোয়?”

মুখ ভেটকিয়ে বল্ল “যা দিবি……।”

বাবা কে জিগালাম তো বাবা বেগুনের দর, income tax ইত্যাদি কটা topic নিয়ে lecture দিয়ে দিল।

তা যাহোক, মা দুর্গা আসছে কোথায় ?

কই আমাদের পরিচিত কলকাতা? আমার তো প্রথম question… “চিনতে পারবে তো?” মানে, London Venice না হলেও সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা জগাখিচুড়ি পাকিয়ে কিরকম একটা London + Venice = VENDON হয়ে গেছে।

ঠাকুর বুঝে শুনেই weather-টা এমন করেছে যাতে পুজো এলেই ঝমাঝম জল পড়ে। আর আমাদের most welcome অতিথি দুর্গার চিনতে অসুবিধা না হয়। Same to same জলমগ্ন কলকাতা। দাদু, বাবা, আমি – তিন প্রজন্ম ধরে developing country; চিনতে কোন অসুবিধাই নেই!

Facebook, Whatsapp, Mobile device, social networking (ম্লেচ্ছ ভাষা!), কিরকম একটা বেঁধে ফেলেছে আমাকে। বারান্দার কোনের রোদ্দুরটা পাশে শিঙ গুঁতিয়ে ওঠা flatগুলো নিয়ে নিয়েছে। পাশের বাড়ির বাবাই-দা, English গান চালাত পুজোর সময়, পুজোর গানও চালাত; কান পেতে শুনতাম। নতুন গান! নিজের নেই, তাও শুনে কী মজা পেতাম! Internet এসে ঐ মজাটাই খেয়ে নিল। ক্যামেরা ছিল না, তাহলে ঠাকুরের ছবি?

ছবি থাকত মনে, থাকত রোজকার খবর কাগজে। তাতে মনটা যেন বেশি ভরে উঠত, একটু হলেও বেশি।

আরও কতকী করতাম! খেই নেই হে! VENDON হয়ত মা দুর্গা চিনতে পারবে … কিন্তু মা দুর্গা আমায় চিনতে পারবে তো?

আমি এখন একটা বিশ্বমানের MNC-তে দাঁতে দাঁত চেপে চাকুরীরত। আমি Soft Copy-তে বিশ্বাসী এক আজব জীব। ঠাকুর দেখে প্রণাম করি না, Selfie নি। শুভ বিজয়া? হে হে! Relative ব্যাপারটা, relativity আবিষ্কারের সাথে যেন আরও উবে যাচ্ছে। পাশের বাড়ির লোকজন কে চিনি না, দেখা হলে দাঁত বের করে হাসি; না হাসলে যদি বোকা বলে!

বদলে গেছি আমি।

মা দুর্গা, তুমি এলে একটা SMS কর, তোমার নামের placard নিয়ে দাঁড়াব। আজকাল বাঙলাও English-এ লিখি; আমায় চিনতে পারবে না বোধহয়।

টেক কেয়ার,

Best Regards

মা আসছেন

প্রতিবারই ঝামেলা লাগে। এবছরও লাগলো। কি না, সরস্বতীর একপাটি স্টিলেটোজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা! যাবেই বা কি করে, মামার বাড়ী থেকে ফিরে এসে সব এক্কেরে হেদিয়ে পড়ে প্রতি বছর। কোথায় কি ছুঁড়ে ফেলে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেইকো। একে তো চার-চারটে দিন ধরে অখাদ্য-কুখাদ্য গিলে পেটের ভেতর কুরুক্ষেত্র, তার ওপর ভুলভাল মন্তর শুনে শুনে কানে খোল জমে হালত আরই খারাপ। পইপই করে দুগ্‌গা বলতে থাকেন যে ওরে ম্যাক ডি তে যাসনা, আর ওই ডালডা মারা বিরিয়ানি তো নৈব নৈব চ …তা সেকথা কেউ শুনলে তো। পেত্যেকবার ফিরে এসেই অশ্বিনীকুমারদের ডবল ফীজ দিয়ে বাড়ীতে ডাকতে হয়! আর মহাদেব এমনিতেই ন্যালাখ্যাপা গোছের, ছেলেমেয়েদের শরীর খারাপ দেখে একেবারে গুষ্টির তুষ্টি করতে থাকে বৌয়ের। আবব্বে, তোর ছেলেমেয়েগুলো একেকটা কি স্যাম্পেল সেটা আগে দ্যাখ।

এইবার যেমন যাওয়ার আগে থেকেই খ্যাচরম্যাচর শুরু হয়েছে। কোত্থেকে খবর পেয়েছে কে জানে, কলকাতায় নাকি মদ,গাঁজা খাওয়া নিয়ে ব্যাপক বাওয়াল হয়েছে । ব্যস্‌ ! আর যায় কোথায়, একেবারে রাগে নেত্য করতে লেগেছে মিন্‌সে! আবার কত কথা, ” ক্যানো শুনি ? নেশা করে কনস্ট্রাকটিভ কাজকম্মো করা যায়না ? আমি নাচ-গান করিনা? আমি ত্রিগুণাতীত নই? ” আ মোলো যা, কোথায় কী ছোট্ট ঘটনা হয়েছে সেই নিয়ে বেকার চিল্লামিল্লি। সরস্বতীও বাপের তালে তাল মিলিয়ে সাফাই গাইতে লেগেছিল ,”হ্যাঁ, আমি বলছি ওরা বেশ মন দিয়েই আমার উপাসনা করে…এসব একদম ঠিক হয়নি” …… বোঝো ! এরপর যা হয় আর কি ! স্বামী-স্ত্রী তে ধুন্ধুমার…বুড়ো ব্যাটা শেষে ঠিক মেনে নিলো কিন্তু মাঝখান থেকে হল কী সেদিন আর জয়া-বিজয়ার সঙ্গে স্পা তে যাওয়া হলনা। ডেট পাওয়া এমনিতেই টাফ্‌ এইসময় আর মিস্‌ হলে তো কথাই নেই! ডানদিকের তিনটে আর বাঁ দিকের দুটো হাতে ম্যানিকিওর ছাড়াই এখন রওনা হতে হচ্ছে। মাথা আবার চিড়বিড়িয়ে উঠলো দুগ্‌গার।

কেউ তো আর বুঝবেনা, কী মারাত্মক সব ঘ্যাম নিয়ে হিরোইনরা পুজো ‘উদ্বোধন’ করতে আসে, বোধন না হোক, উদ্বোধন মাস্ট । সেখানে একটু টিপ্‌টপ্‌ হয়ে যেতে হয় নইলে মান থাকেনা। মেয়েরা তো কবে থেকেই শুরু করে দ্যায় মাঞ্জা মারা, কেতো, গণ্‌শাও কিছু কম যায়না । কেতোর ত স্বভাব ভীষণ খারাপ হয়ে গ্যাছে , হাঁ করে তাকিয়ে থাকে প্যান্ডেলসুন্দরীদের দিকে! এমনকি অসুরটা পর্যন্ত নুন-জল না খেয়ে এইট প্যাক্‌স বানাতে শুরু করে তিনমাস আগে থেকে! ভাবা যায়! সে যাক্‌গে, কিন্তু সংসারের ঘানি টেনে টেনে শুধু তাঁরই আর রূপচর্চা করার সময় হয়না। দীর্ঘশ্বাস পড়ে একটা দুগ্‌গার। ঠিক এই সময়েই একগাল হেসে বেরিয়ে আসে সরস্বতী, পেছনে পেছনে হাঁসু, ঠোঁটে জুতো।

“একি, তোমরা এখনও দাঁড়িয়ে ? চল চল …” নৌকোর দিকে এগোতে থাকে সরস্বতী,” এই কেতো, সরে বোস দিকি, আমার সাদা জামদানী তে যেন আবার তোর ময়ূর কাদা মাখা পা না দিয়ে দ্যায়”। ময়ূরটা খুক্‌ করে একটু হেসে একেবারে সামনের দিকে কেটে পড়ে। লক্ষ্মী অনলাইনে ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট চেক করছিল, তাই-ই করতে থাকে মন দিয়ে। “এলুম গো” বলে দুগ্‌গা নৌকোয় উঠতেই দুলে ওঠে সেটা। আর গণ্‌শা গজগজিয়ে বলে ওঠে ” আর কদ্দিন এসব নৌকো-ফৌকো করে যেতে হবে! কী ব্যাকডেটেড মাইরি , বেকার ভ্যান্‌তাড়া…আমার কোন ভক্ত কে বললেই লেটেষ্ট মডেলের ইম্পোরটেড গাড়ী পাঠিয়ে দেবে!” বাকিরাও সরবে সায় দ্যায় এবং জানায় যে তাদেরও মালদার ভক্ত কিছু কম পড়ে নাই ।

মা দুগ্‌গা শুনেও না শোনার ভান করে জলের দিকে তাকিয়ে থাকেন । ওরা তো বুঝবেনা… তাঁর কাছে এই চারটে দিন মানে অনেক কিছু…সারা বছরের অনেক হিসেব মেলাতে হয় তাঁকে এইসময়। বাপের বাড়ী বলে কথা, সাবেকী ভাবেই বরাবর গ্যাছেন, যাবেন ।