মার্জার কাব্য – ২

image002

(প্রথম ভাগ)

বিড়াল কাহিনী –

ছোটবেলার জীবনে অভাব-কষ্ট ছিলো, কিন্তু আনন্দের অভাব কখনোই অনুভব করিনি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক সময়েই আমাদের বাড়িতে খাবারের মেনুতে লাগাতার নিরামিষ পদ রান্না হতো। মাঝে মাঝে আমরা ছিপ দিয়ে পুকুর থেকে মাছ ধরার চেষ্টা করতাম। বেশিরভাগ সময়ে ছিপে ‘কই’, কি ছোটো ‘রুই’ মাছ ধরা পড়তো। পুকুরের সিঁড়ির ধারে একটা জবা গাছ বেড়ে উঠেছিলো, যার ডালপালা বেশ অনেকটাই বড় হয়ে ছাতার কাজ করতো। একদিন আমি এই জবা গাছের নিচে ছিপ ফেলে বসে আছি। আমার কাছাকাছি আমাদের সাদা বিড়ালটাও চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ দেখি ছিপের ফাতনাটা ডুবে ডুবে যাচ্ছে। বুঝলাম যে মাছ এসে টোপ গিলেছে। উত্তেজনার বসে ছিপ ধরে মারলাম খুব জোরে এক টান। এতো জোরে টান মেরেছি যে মাছ সমেত ছিপের দড়ি প্রায় ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে গিয়ে জড়িয়ে গেলো মাথার উপরে থাকা জবা গাছের ডালপালায়। আমার সাথে সাথে আমার পাশে বসা বিড়ালটাও মাছের এই শুন্যপথে উড়ান লক্ষ্য করেছিলো। আমরা দুজনেই তাড়াতাড়ি গাছের দিকে এগিয়ে গেলাম। মাছটা খুব একটা ছোটো ছিলো না। ডালে ঝোলা মাছের ঝটপটানি দেখে বিড়ালটা লোভে অস্থির হয়ে উঠলো। আমি তাড়াতাড়ি করে জবাগাছের ডাল থেকে মাছ আর ছিপের দড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে বাড়িতে চলে এলাম মা’কে দেখাতে যে এই মাছটাকে ছেড়ে দেবো কি না। বঁড়শীর বাঁকানো মুখ থেকে মাছের ঠোঁট ছাড়াতে বেশ বেগ পেতে হলো – কারণ মাছটা টোপটা বেশ ভালো করেই গিলেছিলো। মা বললো যে আর মাছ ধরতে হবে না, ওটাতেই সে-রাতের রান্না হয়ে যাবে। সুতরাং আমি ছিপ গুছিয়ে রেখে দিলাম। এর বেশ কিছু পরে কি একটা কাজে আমি আবার পুকুরের দিকে গেলাম। অবাক হয়ে দেখলাম আমাদের বিড়ালটা তখনও সেই একই ভাবে জবা গাছের ডালের দিকে ঘাড় উঁচু করে, এক দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে!! আমি যে অনেক আগেই মাছটাকে নিয়ে চলে গেছি সেটা সে বুঝতেও পারেনি, বা বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। সে তখনও ভেবে চলেছে যে মাছটা জবা গাছের কোনো ডালপাতার আড়ালে লুকিয়ে ঝুলছে, আর কোনো এক সময়ে ঝুপ করে নিচে পড়ে যাবে! তখন তিনি সেটাকে ধরে খাবেন !! read more

মার্জার কাব্য

ছেলেবেলার দিনগুলো একটু নয়, এখনকার থেকে বেশ অনেকটাই অন্যরকমের ছিলো। সে সময় না ছিলো কোনো আই-ফোন/আই-প্যাড, না ছিলো কোনো ভিডিও গেমস বা স্যাটেলাইট চ্যানেলের-র দৌরাত্ম্য। কিন্তু তাতে মনে হয় না যে কোনো কিছু মিস্ করেছি। আমাদেরকে ঘিরে থাকতো একরাশ নি:স্বার্থপর মানুষের দল – যাঁরা কোনো কিছুর প্রত্যাশা না করেই আমাদের ছেলেবেলার প্রতিটি দিনকে ভরিয়ে তুলতেন হাসি-ঠাট্টা-খেলা-গল্প-গান-আনন্দ দিয়ে। আর ছিলো অসাধারন সুন্দর রাশি রাশি গল্পের বই – রূপকথা, পক্ষীরাজ, ভুত-প্রেত, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, ঠাকুরমার ঝুলি, চাঁদমামা, সন্দেশ, আনন্দমেলা, শুকতারা, আরব্য রজনী. . . . দিগন্ত জোড়া মাঠ-গাছ-পালা, চোখ জুড়ানো শীতের নীলকাশ, শরতের আকাশে মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা, কাশফুলের ভারে পথ হারিয়ে যাওয়া, কার্তিক মাসের হিমেল হাওয়ায় চাদর গায়ে বসে আচার খেতে খেতে গল্পের বই পড়া, হেমন্তের বিকেলে সূর্য্যের ঝুপ্ করে হঠাৎ ডুবে যাওয়া, বসন্ত-বিকেলের ঝিরঝিরে বাতাসে মন হারিয়ে যাওয়া, বর্ষার ঘনঘটায় আকাশ কালো করে বৃষ্টির উদ্দাম নাচন, কালবৈশাখীর দাপট উপেক্ষা করে কাঁচা আম কুড়ানো, ভরা-বর্ষায় কলাগাছের বানানো ভেলায় চড়ে পুকুরে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো, সুপারি গাছের শুকনো খোলা-কে ‘Go-Cart’ বানিয়ে খেলা, চেনা রাস্তা ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে সম্পূর্ণ অচেনা অঞ্চলে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যাওয়া – আরও কত্তো কি! read more