আশ্বিনের শারদ প্রাতে

আমি বাংলা ভাষাও ছাড়িনি, বাঙালিয়ানা ও ছাড়িনি, ছেড়েছি শুধু শহরটা। তবে ওটাও নেহাত দায় না পড়লে ছাড়তাম না।

শহর থেকে দূরে থাকার একটা খারাপ দিক হলও এখানে উৎসবের আমেজ ঠিক বোধ করা যায়না। উৎসব বলতে এখন অবশ্যই দুর্গাপূজার কথা বলছি। আজ দশ বছরের বেশি হয়ে গেল বাইরে। দিল্লী, লখনৌ, মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, লন্ডন… এখানে কোথাও কাশফুল ফোটেনা। কোথাও মহালয়ার দিন ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের আওয়াজ রেডিও থেকে ভেসে আসেনা। এখন অবশ্য সব টিভি চ্যানেলে একটা না একটা মহিষাসুর-মর্দিনী অভিনীত হয়, কিন্তু কোনও কিছুই যেন সেই রেডিওতে মহালয়া শোনার অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে পারেনা।

ছোটবেলার স্মৃতির কাঁটা এখনো আটকে আছে বাবার সেই murphy রেডিওতে। মহালয়া মানে এখনো আমার কাছে সেই পুরনো রেডিও, বীরেন বাবুর গলা, আর তারপর বাবা, জেঠু, কাকার তৈরি হয়ে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ করতে যাওয়া। মহালয়া মানে এখনো কাশফুল।

এখানে আমাকে কেউ ভোরবেলা ডেকে দেয়না। আগের দিন রাত জেগে প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করা ক্লান্ত চোখ মিছেই গোসা করে এলার্ম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। কফি মেকারের শব্দ, টোস্টারের থেকে বেরিয়ে আসা দুটো মুচমুচে টোস্ট, বাইরে হাল্কা মেঘলা আকাশ, আর অদূরের ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ, সব মনে করিয়ে দেয় আমার নাগরিক ব্যস্ততাকে। অফিস যেতে হবে।

রিপোর্টে শেষ মুহূর্তের ঝালাই দেওয়ার জন্যে ল্যাপটপ খুলতেই চোখ পরে গেল ক্যালেন্ডারে। আজ মহালয়া না? নিজের অজান্তেই রিপোর্টটা বন্ধ করে ইউটিউব খুলে টাইপ করি “মহালয়া বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র”। প্লেলিস্টের প্রথম ভিডিওতে ক্লিক করে, কফির কাপটা নিয়ে দাঁড়াই আমার বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর সামনে। ঘর জুড়ে তখন গমগম করে ওঠে বীরেন বাবুর কণ্ঠ…”আশ্বিনের শারদ প্রাতে…” এই বছরও বাড়ি ফেরা হলোনা।

ফলসা, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গৌরী সেন ইত্যাদি

Okolkata_OK_-_Ramyarachona-1024x160

সেই অনেক কাল আগে, চন্দননগরে আমাদের একটা বাড়ি ছিল। সেই বাড়ির লাগোয়া এক বেশ বড় বাগান ছিল। সম্ভবতঃ বিঘেখানেক। সেই বাগানে একটা মাঝারি গোছের গোল চৌবাচ্চায় রঙিন মাছ পুষত মণিকাকু।সেখানে কলতলায় বিকেলবেলা গা ধুয়ে চুলে বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে আমার গরমের-ছুটিতে-বাপের-বাড়ি-বেড়াতে-আসা পিসিরা পাঁচিলের ওপাশের বাড়ির মেয়েদের সাথে গপ্পো করত। সেখানে সন্ধ্যের মুখে বাগান আলো করে ফুটত ম্যাজেন্টা, হলুদ আর সাদা সন্ধ্যামালতী। সন্ধ্যামালতী শেষ বিকেলে ফোটে, চাঁদ ডোবার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। সূয্যির সাথে তাদের সদ্ভাব নেই। সকালে সেইসব ঘুমিয়ে পড়া সন্ধ্যামালতীই জায়গা পেত ঠাকুরের আসনে। আমি আর মণিপিসি সেই ম্যাজেন্টা সন্ধ্যামালতীর ফুল জলে চটকে পুতুলের বিয়েতে শরবত বানাতাম। সেই বাগানের এক দিকের ভাঙা পাঁচিলের গায়ে একটা লাল টকটকে পঞ্চমুখী জবার গাছ সারা বছর আমাদের বাড়ির এবং আশে পাশের গোটা দুয়েক বাড়ির পুজোর ফুল যোগাত। আর ছিল টগর আর কল্‌কে ফুলের গাছ। সেই বাগানের এক কোনে একটা খাটা পায়খানাও ছিল। সেখানে বাড়ির পুরুষেরা গামছা পরনে, এক হাতে একখানা জঘন্য দেখতে বালতি ভরে জল নিয়ে আর অন্য হাতে বিড়ি বা সিগারেট লুকিয়ে সকালের প্রয়োজনীয় কম্ম সারতে যেত। সেই তিন ধাপ সিঁড়ি ওঠা ইঁট বেরোনো, শ্যাওলা ধরা ঘরটা, যেটার সম্পর্কে আমার যথেষ্ট ভয় ছিল, সেই অবধি যাওয়ার ছোট্ট পথ টুকু অতি পরিষ্কার করে ঝাঁট দেওয়া থাকত আর তার পাশ দিয়ে দিয়ে রং-বেরঙের পাতাবাহারের গাছ লাগানো ছিল। এহেন ‘ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনিং’ কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল কে জানে! সেই বাগানে আরো ছিল বেশ কয়েকটা আম গাছ; সাথে ছিল জামরুল, কাঁঠাল, কলা, নারকেল ইত্যাদি ফলের গাছ ছিল। গরমের ছুটিতে বাবা-কাকারা আমগাছে উঠে আম পাড়তেন। দাদুকে এক-দুবার দেখেছি নারকেল গাছে উঠে নারকেল পাড়তে। তখন দাদুর ষাট অবশ্যই পেরিয়েছিল। নারকেল পেড়ে বাগানের শেষ কোনায় মানকচুর জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা দাদুর পায়ে আটকে থাকা জোঁক ছাড়াতে নুন আনতে হত। আমাদের সেই নোনা ধরা দেওয়ালে ঘেরা, শামুক -পিঁপড়ে-জোঁক পরিপূর্ণ বাগানটা ছিল মণিপিসি আর আমার পুতুলের সংসারের জন্য এক অভাবনীয় সুপারমার্কেট। Continue reading “ফলসা, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, গৌরী সেন ইত্যাদি”

ছায়া ছবির সঙ্গী (৯)

13046098_1239062649454718_938753217_n

বলেছিলাম কারিগরি কথা লিখব না। কিন্তু দেখলেন তো সেই কথাই এসে গেল। আসলে আমাদের কাজটা এতটাই কারিগরি নির্ভর যে একে বাদ দিয়ে, আমাদের আর অস্তিত্ব কোথায়?

১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালের কাজ শুরু হল। আমাদের কাজ শুরু মানে তো সলতে পাকানো থেকে। স্ক্রিপ্ট তৈরী করা। তার থেকে লোকেশন তালিকা, চরিত্র তালিকা তৈরী করা। চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা অভিনেত্রী বাছাই করা। ঘুরে ঘুরে কোথায় কোথায় শুটিং করা যেতে পারে বা আমাদের গল্প অনুযায়ী খাপ খাওয়ানো যেতে পারে, সেসব জায়গা নির্ধারণ করা। পোষাক পরিকল্পনা করা। আরো আরো কত কাজ।

এসব কাজে আনন্দ পেতাম। ভালোবেসে করতাম। কোনোদিন ক্লান্তি বোধ করিনি। নিজে নিজে অনেক উপায় উদ্ভাবন করতাম, কি করে কতটা সহজ করে করা যায় কাজটা। এমন একটা লিস্টি বানাতে হবে যেটা সব কলাকুশলীদের সামনে থাকবে এবং তারা এক চোখ বুলিয়েই সব কাজটা বুঝে নিতে পারবে। আমার সব সময় চেষ্টা থাকত এমন সব কিছু করার।

‘অপূর্ণ’ ছবির পোষাকের তালিকা তৈরী করেছিলাম, বিভিন্ন রঙের ব্যবহারে। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারত, কোন চরিত্র, কখন, কোন পোষাক পরবে এবং কোথায় তার পোষাক পরিবর্তীত হবে। দেবকুমার দা এবং দেব দত্ত দা দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন এবং আমাকে বাহবা দিয়েছিলেন। বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, ওঁনাদের উৎসাহ পেয়েছিলাম বলেই, আরও নতুন কিছু করার তাগিদ থাকত সব সময়।

এই রঙের কোড ব্যবহার এখন হয়ত নতুনত্ব কিছু নয়। কিন্তু ছাব্বিশ বছর আগে এইভাবে কেউ ভেবে দেখেনি বা করেনি। এমন অনেক তালিকাই তখন আমার উদ্ভাবনি চিন্তা দিয়ে তৈরী করেছিলাম, যা পরবর্তী কাজেও ব্যবহার করেছি। সেগুলির নমুনা দেখাতে পারলে বোঝানো সম্ভব হত। এখানে তার উপায় নেই।

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়’এর যে গল্প থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালটি তৈরী হয়, তার নাম ‘গনশার বিয়ে’। এই গল্প থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘বর যাত্রী’ হয়ে গেছে অনেকদিন। সেই চলচ্ছবি থেকেই উঠে এসেছিলেন পরবর্তী সময়ের নামী অভিনেতা কালী ব্যানার্জী। শোনা যায়, ওঁনার কথা আটকে যাওয়ার যে ঝোঁক, সেটা ওই গনশার চরিত্র করার সময় থেকেই তার সঙ্গে থেকে যায়। কারণ গনশা ছিল তোতলা।

আমাদের গনশা হল শঙ্কর চক্রবর্তী। অসাধারণ অভিনয় করে সবার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল সে। তার সঙ্গে এই জগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে বরাবরের মত, ঐ অভিনয় থেকেই। এই ধারাবাহিক এ শঙ্করের মত অনেকেই প্রথম অভিনয় করতে আসেন। পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অপরিহার্য হয়ে যান তাঁরা সকলেই। শুভাশিষ মুখার্জী, রাহুল বর্মন, জয় বাদলানী, দীপন তপাদার, রঞ্জন ব্যানার্জী। দীপন পরে দেবকুমার দা’র পরিচালনায় একটি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। কিন্তু সেই ছবিতে তার যে নায়িকা ছিল তাকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে, দুজনেই এ জগত থেকে সরে গেছে। আমার প্রথম কাজের সঙ্গে এঁদেরও যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বিবাহ অভিযান’ তাই এদের সাথে আত্মীক যোগাযোগটা আজও রয়ে গেছে।

প্রথম পর্বের শুটিং শুরু হল জয়নগর মজিলপুর এ। জায়গাটার নাম যে একসাথে জয়নগর মজিলপুর, ওখানে গিয়ে জানলাম। যেখানকার মোয়া সর্বজনবিদিত। এর পরের ক’দিন সকাল সন্ধ্যে প্রাতঃরাশ আর সন্ধ্যের জলখাবারে মোয়া খেতে খেতে অত্যিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম।

১৯৯০ এর ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা সদলবলে সেখানে গিয়ে তাঁবু গাড়লাম। তাঁবু গাড়াই প্রায়। এখন কেমন বলতে পারব না। তবে তখন ওখানে থাকার মত কোনো হোটেল ছিলনা। বিভিন্ন লোকের বাড়িতে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতাম। এক বাড়ির যে ঘরে দেবকুমার দা’র থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানেই আশ্রয় মিলেছিল আমার আর আমার এক সহকর্মীর।

তখন আবহাওয়ার এত অবনতি হয়নি। খুব ঠান্ডা পড়ত শহরে। আর জয়নগর তো শহর থেকে অনেক দূরে। বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। দেবকুমার দা শুতেন একটা তক্তাপোষে। আর আমরা দুজন শুতাম মাটিতে। মোটা করে খড় বিছিয়ে তার ওপর চাদর পেতে। ঘরে আলো নিভে যাবার পরেও আমাদের আলোচনা চলত। যেমন আজকের কাজে কি কি ভুল হল না হল না, কাল কি হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেটা আমার শিক্ষানবিশীর, মণি মুক্তো কুড়িয়ে নেবার সময়। সে সময়গুলো কোনোদিন ভোলা যাবে না। কথাবার্তা চলতে চলতেই কখন যে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসত, টের পেতাম না।

আমার ছোটবেলা

13016769_1234155003278816_254681483_o

Pet মানে অন্যকিছু হলে চলবে না। হতে হবে বাঁদর ছানা।

বায়েনা খানিক এরকম-ই ছিল।

আমার ছোটবেলার ঘটনা। সব বাচ্চাদের মতন আমার এক দিন মনে হল আমার একটা pet  দরকার। যেমন ভাবা সেই রকম কাজ। এই সব, জীবনের গুরুতর জিনিস এক মাত্র বাবারসাথেই আলোচনা করা যায়। গম্ভীর মুখে বাবা কে গিয়ে বললাম ” আমার একটা pet  দরকার”। মা তো শুনেই প্রমাদ গুনল , আবার একটা ঝামেলা জোটাব আমি। বাবা আরও গম্ভীরমুখে বলল ” ঠিক আছে”  , কিন্তু কিনতে যাবার আগে ঠিক করতে হবে আমি কি চাই কিনতে ।

আলোচনা শুরু হল, কি pet  কেনা হবে তাই নিয়ে।

১) কুকুর – কমন pet , আনেকেই কেনে। আমাদের সবার থেকে আলাদা হতে হবে। তাই কুকুর বাদ

২) বেড়াল – আমি একদম পছন্দ করই না , তাই বাদ

৩) খরগোশ – খুব ছোট বেলায় আমার এক জোড়া খরগোশ ছিল, তাই আবার খরগোশ চলবে না। এটাও বাদ

৪) মাছ – শুধু আকুয়ারিউম এ ঘুরে বেড়াবে আমার সাথে খেলা করতে পারবে না। তাই এটাও বাদ

 

সমস্যা গভীর । কি যে কেনা যায় তাই ভেবে পাছিনা । এরকম সময় বাবা বলল , আমি একটা বাঁদর পুষতে পারি. তাতে আমার লাভ । কারণ যথাঃ

১) পাশের বাড়ি র পেয়ারা যে আমি চুরি করই সেইটা আমার পোষা বাঁদর কে শিখিয়ে দিলে আমাকে আর কেউ দোষ দিতে পারবেনা

২) নতুন ধরনের pet , কেউ পোষে বলে আমার জানা নেই।

৩) আমার সাথে খেলা করতে পারবে।

 

যেই ভাবা, সেই কাজ।

এতগুলো দুর্দান্ত কারণ থাকাতে,  আমি আর বাবা রবিবার সকাল বেলা বেরিয়ে পরলাম , বাঁদর ছানা কিনতে । মা কি করবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে বসে পড়ল । হাতিবাগানে রবিবার সকালে খুব সুন্দর বাজার বসতো , এই সব পশু পাখি, মাছ গাছের। সারা বাজার ঘুরে পাওয়া গেলনা একটা বাঁদর ছানা। আমার কাঁদো কাঁদো হাল , কোথাও নেই আমার সাধের বাঁদর ছানা। হতাশ হয়ে দাঁড়ীয়ে আছি , এমন সময় বাবা বলল ” তাহলে একটা গাছের চারা কিনে বড়ো করা যাক , তাতে ফুল ফোটানো যাক ” । চারি পাশে প্রচুর সুন্দর সুন্দর ফুল এরগাছ , লোভ হচ্ছিল  অনেকখন ধরে, বাবা কে বলিনি পাছে বাঁদর কেনার সুযোগ হারাই । এবার বাবার প্রস্তাবে এক কোথায় রাজি হয়ে গেলাম । ফুল গাছের চারা কিনে নাচতে নাচতে বাড়ি চলে এলাম ।

বাবা-কে হারিয়েছি কয়েক মাস হল। হাতে সেদিন ফুল গাছের চারা দেখে মা সবচেয়ে খুশি হয়েছিল।

সে বৃক্ষ-রূপি pet জল, আলো আর বাতাস পেয়ে হয়ে উঠেছে যেন আমার আপনজন।

প্রবাসীর ডায়েরি ৩

মেলামেলি

নরম নীল আকাশ। তাতে কিছু মেঘ একে অপরের পিছু ধাওয়া করেছে। কেউবা ধীরে ধীরে নিজেকে বড় করে চলেছে। আবার কেউ তাদের আধো আধো হাত দিয়ে নরম নীল রংকে এক মনে আবিষ্কার করে চলেছে। এরই মধ্যে, রোদ কখনো চড়া গলায়, কখনো ফিসফিস করে সময় জানিয়ে চলেছে।

অন্যদিকে, নিমর্লা গাছের ছাওয়ায় বসে গরম গরম রুটি আর তরকারি বানাচ্ছে। আর, ওর ছেলেরা ওকে ঘিরে কেউ খেলছে, কেউবা পড়ছে, কেউ বা ওকে সাহায্য করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর ওর ঘরওয়ালে, কখনো শক্ত গলায়, কখনো নরম সুরে তদারকি করে যাচ্ছে। মাটির ভেতরেও একই ভাব। তার প্রকাশ ছোট বড় নানান মাপের ধানের ক্ষেতের হালকা, গাড় রকমারি সবুজে। সেখানেও গুটিকয়েক চাষীর কড়া – হালকা নজরদারী চলছে।

আকাশ, নিমর্লা, ক্ষেত – এক ছন্দে আবদ্ধ। হাওয়ার মিষ্টি গলার গানই আসলে স্বর্গ মর্ত্য পাতালকে এক ছন্দে বেঁধে কোন স্বপ্ন রাজ্যে নিয়ে হাজির করেছে।

এমন অনেক সকাল দুপুরের অপেক্ষায় ছিলাম। চারপাশের সবাই যখন ট্রেন বাসের ভীড় ঠেলে অফিস কাছাড়ির ব্যাস্ততায় গলা পযর্ন্ত ডুবে, তখন আমার এই মেলামেলির খেলায় গা ভাসিয়ে দেওয়া সকলের যে যথেষ্ট হিংসের কারণ, তা আমি নিশ্চিত। আমি নিরুপায়। আমার ক্ষিদে তেষ্টা পাওয়ার মতই ভাবনা পায়।

স্বর্গ মর্ত্য পাতালের মধ্যে মিল পেয়ে যখন আনন্দে মশগুল তখন কে যেন দুটি ঘটনা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে চলে গেল। সুতো ছিঁড়ে সব মিলগুলো আবার এলোমেলো হয়ে গেল। নিমর্লা ফোনে জানাল, ও আজ আসতে পারবে না। কারণ জানতে আমায় বারান্দায় যেতে বলে। দেখলাম, ওর টিনের ঝুপড়ি ভাঙা হচ্ছে। জলের পাইপ যাবে ওখান দিয়ে। তোমরা থাকবে, খাবে কোথায়? বলল, এত জিনিস নিয়ে আর কোথায় যাবো? দুদিন লাগবে, তারপর ওরাই নাকি ঝুপড়ি বানিয়ে দেবে, কোথায় ও জানে না। আগের জায়গাতেও হতে পারে। ওরা যখন তড়িঘড়ি রান্না করে খেয়ে নিচ্ছিল বাড়ি ছাড়তে হবে বলে, আমি তখন ন’তলার বারান্দা থেকে স্বর্গ মর্ত্য পাতালের মিল খুঁজছিলাম।

১৭ নং টেগোর টেম্পল রোড, শ্যামনগর – বিয়ের পর আমার প্রথম বাড়ি। প্রথম ভাড়া বাড়ি। চারটে ঘর। খাওয়ার জায়গা থেকে গঙ্গা দেখা যেত। সেখানে সব থেকে ছোট ঘরটা আমার। নতুন জীবনের অপরিণত দশার সাথে বেশ মানানসই ছিল। ঘরের রংও ছিল সবুজ।

বাড়ীওয়ালা প্রোমোটারকে বিক্রি করে দেওয়ায় আমাদের বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে তা ছেড়ে দিতে হয়। প্রাপ্য টাকার সামান্য অংশই পাওয়া গিয়েছিল। ছেড়ে দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই বাড়িটা মিলিয়ে যায়। এখন সেখানে নতুন ফ্ল্যাট। কেমন যেন জেল খানার আদলে বানানো।

এখনও মনে আছে খাওয়ার টেবিলে কে কোন দিকে বসত। রবিবার বাবা আর ও দুজনে মিলে বাজারে যেত, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম। বাবা বাজার থেকে ফিরে কী কী কিনেছে না জানালে পারকিনসন’স রোগে শয্যাশায়ী মা’র অভিমান সামলানো মুশকিল হত। বাবাকে একবার সরি বলতে বলায়, দুই ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে ফোকলা দাঁতে মিষ্টি হেসে সুর করে বলেছিল, “সরি, আমার লম্বা দাঁড়ি!” মা অনেক কষ্টে অভিমান সরিয়ে রেখে ওষুধ খেতে বাধ্য হত। জল ঘড়ি ধরে আসত, কিন্তু কাজে ফাঁকি দিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যেত। ফলে, সকালে উঠেই জল ধরার জন্য দৌড়দৌড়ি। জল ধরার ট্রেনিং কিছুটা অবশ্য বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলাম।

আমার ঐ বাড়ির স্মৃতির বয়স ছয় মাস। কিন্তু বাড়ির বাকি সদস্যদের প্রায় বত্রিশ তেত্রিশ বছরের স্মৃতি। মান অভিমান মাখা দেয়ালগুলো আজ অদৃশ্য। বাবাও নেই। মা’র অভিমান ধীরে ধীরে ভ্রমের পর্যায়ে ঠেকেছে। আমরাও আজকাল একে অপরের খুঁতের প্রতি আগের থেকে বেশী সহনশীল। সেই ছোট সবুজ ঘরটা মনের মধ্যে জানলা দরজা খুলে স্মৃতির হাওয়া খেয়ে কখন কাঁদে কখন হাসে।

নিমর্লাকে জিজ্ঞেস করলাম যদি কোন সাহায্য লাগে বলো। বললো, ব্যাস তোমার “দুয়া” আমার সাথে আছে। বাকিটা তো “নসিব”। যার যার কপালে যা ভোগান্তি আছে, তাকে তা ভুগতেই হবে। তুমি কী করবে বল? কথাটা শোনার পর মনে হল আবার আমি যেন মিল খুঁজে পেলাম। পরিবারকে ওর জাপটে থাকার আনন্দ, মেঘেদেরকে জড়িয়ে থাকা নরম নীল আকাশের আরাম, মাটির ওপর ভরসা করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বড় ধান গাছ আর ভাল খারাপ স্মৃতি আঁকড়ানো সেই সবুজ ঘর আবারও মিলেমিশে একাকার।

পূর্ণা
২৭/০৭/২০১৫
গ্রেটার নয়ডা।।

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না

প্রথম পর্ব – বন্ড’চরিত্র

প্রায় প্রতিদিনই দুনিয়ার লোকের ইমেল পড়তে হয়, তাতে হাজার ফ্যাঁকড়া, দু’শ সমস্যা; কিন্তু এসবের ফাঁকেও এক এক জায়গায় চোখ আটকে যায় – তা হল সিগনেচার, অর্থাৎ ইমেল লেখা শেষ হলে যেখানে প্রাপক সচরাচর নিজের সম্পর্কে কিছু লিখে থাকেন। আবার অনেকেই কোন না কোন লেখেন – যেমন আমার এক বস লিখতেন ওয়াল্ট ডিজনির ডায়লগ – তুমি যদি স্বপ্ন দেখতে পার, তাহলে তুমি সেই স্বপ্নকে বাস্তবের রূপও দিতে পার। কদিন আগে অফিসে এরকমই আরেকটা ইমেলে চোখ আটকে গেল –সেখানে নাম লিখতে গিয়ে একজন লিখেছেন – রিগার্ডস, শীল, বলবন্ত শীল। প্রথম ও শেষবার সেইরকম শুনেছিলাম ড্যানিয়েল ক্রেগের মুখে, “মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড”। তাই খুব অবাক হয়েই বলবন্তের সাথে ভালো করে আলাপ করতে বসলাম।

Illustration - part 1

বলবন্তের চেহারা যেমন লম্বা সেরকমই চওড়া। তার খোরাকি দিনে প্রায় গোটা দশেক এগ হোয়াইট (বাকি কুসুমটুকু খায় পাড়ার নেড়িকুত্তারা), গোটা তিরিশেক রুটি (সকাল বিকেল মিলে), পনের লিটার জল, মাংস খেলে দেড় কিলোর মত। বাড়িতে আশি জিবির সুপার-ফাস্ট ব্রডব্যান্ড কানেকশন, কলকাতার রাস্তায় তার বাইক চলে একশ থেকে দেড়শর স্পিডে। তার সাথে এক জিমে কসরত করতে আসে নুসরত জাহানের পর্যায়ের সুন্দরীরা। বাড়িতে বউ, ছেলে – অফিসে রিসেপশনিস্ট – এই নিয়ে তার দিন কাটে।

সব জানার পর একদিন বললাম, “এক সেই জেমস বন্ড বলেছিল, তারপর তোর ইমেলে দেখলাম – তোর মধ্যে কিন্তু এক্কেবারে হিরো হিরো ব্যাপার একটা আছে।”

বন্ড, থুড়ি শীল, এক গাল হেসে জবাব দিল, “একবার বিজন সেতুর ওপরে এক অটো-ওয়ালা কেলিয়ে এমন চলন্ত বাসে চড়ে পালিয়ে ছিলাম না – সে আর কি বলব, পরে গোটা একদিন গড়িয়া-হাট বন্ধ ছিল”

মুচকি হাসলাম কিন্তু বলতে গিয়েও বললাম না, “কলকাতায় যদি জেমস বন্ডের শুটিং হত, নিঃসন্দেহে তোর ডাক পড়ত।”

এহেন বন্ডের কাজে কর্মে কদিন মন নেই। একদিন পাকড়াও করে বললাম, “কি হয়েছে বন্ড?”

“আর বল কেন, এত কাজ চাপিয়ে দিচ্ছে-”

“কে কাজ চাপিয়ে দিচ্ছে?”

“কে আবার-(একজনের নাম নিল, এখানে অপ্রাসঙ্গিক)”

“এখন উপায়?”

“তুমি রিসেপশনিস্টকে এনে এখানে বসাও, দেখবে ডাবল স্পীডে কাজ হচ্ছে।”

এখন রিসেপশন থেকে তুলে এনে সুন্দরীকে চারতলায় প্রজেক্টের এক কোনে বসাব – এহেন ক্ষমতা আমারও নেই প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে, তাই মুচকি হেসে বললাম, “তার চেয়ে ভালো একটা সমাধান করা যেতে পারে!”

“কি কি, বল শুনি?”

“তুই ভিকি, ক্রিস্টিনা বার্সিলোনা দেখেছিস? না হলে চট করে দেখে নে একবার, তোর প্রোডাক্টিভিটি ডবল হয়ে যাবে”

যারা সিনেমাটি দেখেন নি তাদের অবগতির জন্য বলতে পারি এরকম রোম্যান্টিক সিনেমা আমি নিজে খুবই কম দেখেছি। ফিল্মের নায়ক এক বিতর্কিত চিত্রশিল্পী – হুয়ান অ্যান্তোনিও, যার সাথে আলাপ হয়ে স্পেন ঘুরতে আসা দুই বান্ধবী ভিকি ও ক্রিস্টিনার, আর ক্যানভাসে উপচে পড়া রঙের মত প্রাক্তন স্ত্রী এলিনা সকলে মিলে জড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতায়। হুয়ানের চরিত্রে জ্যাভিয়ের বার্ডেম, তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে পেনেলোপি ক্রুজ গোটা সিনেমায় নজর কেড়েছেন স্কার্লেট জোহানসনের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। সিনেমা দেখার পর স্প্যানিশ কান্ট্রিসাইড, স্থাপত্য, কবিতা, ফটোগ্রাফি, প্রেম – সব কেমন মিলে মিশে যায়।

শুক্রবার বন্ডকে বলেছি সিনেমার কথা। মনে হয়েছিল সে নিজে যেমন রঙিন মানুষ, তেমনি সিনেমা দেখে হয়তো অনুপ্রাণিত হয়ে কাজে খুব মন দেবে, রিসেপশনিস্টকে ঝাড়ি করতে হবে না – প্রজেক্টের সব কাজ হেলায় নামিয়ে ফেলবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। সোমবার বিকেলে যখন তার সাথে দেখা হল, সে মুখ গম্ভীর করে বললে, “এভাবে আমার সংসারে আগুন লাগাতে চাও তুমি?”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন?”

“ভাগ্যিস একা দেখেছি। আমার বউ এই সিনেমা দেখলে হবে পুরো উল্টোটা”

“মানে?”

“মানে টানে বেশি বোঝার দরকার নেই –যাই আগে দুটো ফুটলং খাই সাবওয়ে থেকে। তারপর জিমে যাই। ওখানে অনেক সুন্দরীরা আসে – মন ভালো করে আসি”

আমার কাছে ঠিক খোলসা হল না ব্যাপারটা।

অফিসে অন্যদের জিজ্ঞেস করে বুঝলাম – বলবন্ত যেমন বন্ড, তেমনি তার বউ এক্কেবারে লেডি বন্ড। বাইরে যাই করে থাকুক না কেন, বাড়িতে ফিরে অত বড় বন্ডও গ্রেহাউন্ড থেকে চিহুয়াহুয়া হয়ে যায়। নিজ গৃহিনীর সামনে সব্বাই গৃহপালিত স্বামী – তখন একডজন এগ হোয়াইটই হোক বা আড়াই কেজি চিকেনই হোক, কিছুই ধোপে টেকে না। নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। ম্যানেজমেন্টের প্রথম ধাপ ভুল থেকে শেখা। আর চটজলদি তো কোন সিদ্ধান্তই নেওয়া উচিত নয়। যাই হোক না কেন, প্রোডাক্টিভিটি রাতারাতি বাড়বে এমন গ্যারান্টি বোধহয় কোন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট টোটকাতেই নেই।

আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা যে খুব দীর্ঘায়ত এমন নয়, কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে বিভিন্ন শহর –সেও সংখ্যায় প্রায় দশ’টি –ঘুরে বলতে পারি, এমন গল্পের ঝুড়ি খুব সহজে শেষ হওয়ার নয়। সাধারণত এই ধরনের গল্প অফিস চৌহদ্দি, পার্টি-র রঙিন গ্লাস বা নিদেনপক্ষে চায়ের কাপে তেলেভাজার সাথেই ফুরিয়ে যায়। এসব লেখার কথা কেউ বড় একটা ভাবেন না। অন্তত: আমার বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের যতটুকু চিনি, তাদের কেউ এই গুরুদায়িত্ব নেবেন বলে মনে হয় না। তাই বলে গল্পগুলো ফুরিয়ে যাবে? নাম চরিত্র গোপন রেখে যতটা বলতে পারি সেই চেষ্টাই করছি।

কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না কিন্তু!!!