রাজযোটক

“সেই দশটা বেজে গেলো, যতই তাড়াতাড়ি করি কিছু না কিছু করে দেরি হয়েই যাবে” – গজগজ করতে করতে শোভনা এপার্টমেন্টের তিনতলার ফ্ল্যাটে ঢুকল সরিৎ| রবিবার একলা মানুষের বাজার করতে বেশী সময় লাগে না -তবে পাঁচটা লোকের সাথে দু-পাঁচ মিনিটের কথায় ঘড়ির কাঁটা ধোঁকা দিয়ে যায়|সরিৎ ঘরে ঢুকে পরের কয়েক মিনিটে বাজারটা তুলে ফেলে আর আধ বোতল জল গলায় ঢেলে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়ল |

গল্পটা হল সরিৎ সোমের – নামের মতন মানুষটা সাদামাটা কিন্তু তার মধ্যেও তার জীবনটা বেশ আলাদা | বছর খানেক হল স্ত্রী-পুত্রকে এক পথ দুর্ঘটনায় হারিয়ে এখন সরিৎ একা – বাবা মা আগেই গত হয়েছিলেন, তারপর গত বছরের দুর্ঘটনার পর সে একেবারে স্বজনহারা | যদিও একেবারে স্বজনহারা বলা যায় না – তার তুতো পরিচয় কয়েক ভাইবোন ও তাদের পরিবার আছে, কিছু কাছের বন্ধু আছে এবং সর্বোপরি তার শ্বশুরকুলও আছে|তবে সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চললেও তার ধরন বেশ ঠান্ডা |ব্যাপারটা সাপ্তাহিক দু একটা ফোনের ওপর আর কোনো নিমন্ত্রণ পেলে লৌকিকতার দ্বারা সে চালিয়ে গেছে|কিন্তু পঁয়ত্রিশ পার করা সরিৎ গত এক বছরে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছে | তার প্রাইভেট ফার্মের চাকরি – বাড়ির টুকরো টাকরা দৈনন্দিন কাজ – কোনো ভালো ছবি এলে দেখতে যাওয়া – গল্পের বই পড়া যদি হয়ে তার জীবনজাপনের কিছু আবশ্যক কাজ তবে তাকে টিকিয়ে রেখেছে তার নিজের মাথা থেকে বের হওয়া এক অদ্ভুত নেশা |

সপ্তাহের বাকি ছদিন অফিস প্রভৃতি কাজে কালক্ষেপ হলেও রবিবারগুলো যেন তাকে কাটতে আসত | রুবি আর পাপাই যেদিন চলে গেলো তারপর থেকে সে চেষ্টা করেছে একা না থাকতে – একা থাকলেই শেষ দশ বছরের সুখ স্মৃতি তাকে খেতে আসত | কিন্তু রবিবার গুলো সে কি করবে – আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে তো আর বলা যায় না – “আমার এক ভালো লাগেনা – একটু সঙ্গ দেবে”! এই করতে করতেই মাস দশেক আগের সেই রবিবার আসে – যেদিন সরিৎ তার জীবনের সবচেয়ে ইনোভেটিভ আইডিয়ার জন্ম দেয়|

সে যা হোক এখন বর্তমান কথায় ফিরে আসি| সরিৎ খবরের কাগজটা খুলে বসল – সাথে ল্যাপটপ| খুব সংক্ষেপে কাগজের খবরের পাতাগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে চলে গেলো সাপ্তাহিক পাত্র পাত্রী কলামে | পাকা চোখে সে পর্যায়ক্রমে দুটি পাতার সব বিজ্ঞাপন পড়ল – কুলীন কায়স্থ থেকে সম্ভ্রান্ত মাহিষ্য , কনভেন্ট এডুকেটেড থেকে ঘরকন্না কাজে নিপুণা , স্বর্ণবর্ণ থেকে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, পশ্চিমবঙ্গীয় থেকে পূর্ববঙ্গীয় সবরকম পাত্রীর সাথে পরিচয় হয়ে গেলে সে এক এক করে সেই সব ঠিকানা , ফোন বা মোবাইল নম্বর এবং আর কিছু দরকারী খবর নোট করে নিল তার ল্যাপটপে | ব্যাপারটা শুনতে সোজা হলেও এতটা সোজা নয় – পঁয়ত্রিশ বছরের বিপত্নীক প্রাইভেট ফার্মের মধ্যপর্যায়ের অফিসারকে হালে পানি দিতে পারে এইরকম অন্তত দশটা ক্যান্ডিডেট পেতে গেলে অনেক বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে | তাছাড়া একটা সম-মানসিকতার প্রয়োজনও তো আছে |

তাই ঘণ্টা দেড়েক পর সরিৎ উঠে যখন চাল মেপে ভাত বসাতে গেল, তখন তার মেজাজ বেশ ফুরফুরে | গোটা চোদ্দ পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে – এর মধ্যে একজন নিশ্চয়ই তার দাম দেবে | একদিকে ভাত আরেকদিকে ডাল বসিয়ে সরিৎ ফিরে এলো তার বসার ঘরে |

এরপরের কাজটাই সব থেকে শক্ত – নিজের ঘটকালিটা নিজে করা একটু কঠিন বৈকি – বিশেষ করে সরিৎ এর মতন এক মুখচোরা মানুষের| কিন্তু একাকিত্ব তাকে এখন অনেকটাই বলিয়ে কইয়ে করে তুলেছে, অন্তত এই ব্যাপারে | না হলে সপ্তা তিনেক আগে রাখহরি মুখার্জী যখন সরিৎকে বলে – “তোমার কি ইয়ে যে আমি তোমাকে মেয়ে দেব !”, তখন সরিৎ ফোনের ওপর টানা পাঁচ মিনিটে নিজের সম্মন্ধে যা যা ভালো কথা বলেছিল, সেগুলো ডাহা মিথ্যে নয় কিন্তু ষোলো আনা সত্যিও তো নয় | কিন্তু বলার সময় সরিৎ এর গলা তো একফোঁটাও কাঁপেনি | হ্যাঁ তার মানে এই নয় যে সব সময় সফল হয়ে – তবে কাজ তো হচ্ছে, সেটা বড় কথা |

সরিৎ আজকের লিস্টটা দেখল ল্যাপটপে – ৭ জন পাত্রী চাকুরিরত , ১০জন তিরিশোর্ধ, ৫ জন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, ২জন ডিভোর্সই এবং একজন সন্তানহীন বিধবা |প্রথমে সে বাছল – “ পূ:ব: সুন্দরী কায়স্থ , সরকারি ব্যাংকে চাকুরিরতা, প্রা:স: কর্মীর একমাত্র কন্যা, ৩৪/৫”৩’ , বাম হস্তে সাদা দাগ | যোগ্য পাত্র কাম্য | মোবাইল – *********** |” ফোন নম্বর টিপে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে সরিৎ |

অপরপক্ষ – “হ্যালো, কাকে চান? ” বেশ ভারী কিন্তু মার্জিত কণ্ঠস্বর – হাজারহোক ৩৪ বছরের অবিবাহিত মেয়ের বাবা কিনা!সরিৎ ভাবনা গুছিয়ে বলে – “নমস্কার, আমার নাম সরিৎ সোম | হর্ষবাজার পত্রিকার পাত্র – পাত্রী কলামের বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করছি | “

অপরপক্ষ – “হ্যাঁ বলুন, পাত্রের সম্মন্ধে যা বলার বলুন |”

সরিৎ – “আজ্ঞে, আমি নিজে পাত্র | আমি একজন ——- ” সরিৎ তার নিজের তৈরি করা সংক্ষিপ্ত একটা পরিচয়ে দিল | এই পরিচয় অনেক সময় খরচ করে বানানো – এর মধ্যে কোনো এমন মিথ্যে নেই যা খোঁজ করলে ধরা যাবে | তার চাকরি, তার স্ত্রী-পুত্র বিয়োগ ইত্যাদি কোনো কথা গোপন না করে সরিৎ নিজের পরিচয় জ্ঞাপন করল|

অপরপক্ষ – “আমার নাম কুশল বসু | আপনার কথা শুনলাম, আপনার নম্বরটা সেভ করে নিচ্ছি – একটু বাড়িতে কথা বলি| কথা এগোনোর হলে আপনাকে ফোন করবো |”
সরিৎ এবার খুব উদার গলায় ঠিক আছে বলে ফোনটা নামিয়ে রাখল | সরিৎ যে খুব একটা চিন্তিত তা নয় – সে জানে এরকম বেশ কিছু “না”, “পরে জানাবো”, “ভেবে দেখবো” পার করে তার “হ্যাঁ” টা আসবে|

আধ ঘন্টা পরে যখন সরিৎ ভাত আর ডালের ব্যবস্থা করতে গেলো ততক্ষণে সে ৩ জায়গায় শুরুতে না, ২ জায়গায় পরে ভেবে জানাবো এবং ১টা শেষ পর্যায় না শুনে ফেলেছে | এই শেষ পর্যায় না টা একটু বোঝাতে হবে | যেখানে একটু কথাবার্তা আগে যায় সেখানে সরিৎ বলে – “আমি আপনাদের মেয়ের সাথে কোনো সম্মত জায়গায় আগে একটু কথা বলে নিতে চাই, পারস্পরিক চিন্তাভাবনা কিছুটা না মিললে তো বেশী কথা এগিয়ে লাভ নেই|” তো আজ একটা ফোনালাপই অতটা এগুলো – কিন্তু তাতে পাত্রীপক্ষ রাজি হয়েনি |

ভাত – ডাল এর ব্যবস্থা হয়ে যাওয়াতে , সরিৎ বাকি রান্না ফ্রীজ থেকে বার করে রেখে আবার কাজে লেগে পড়ল| চান যাওয়ার আগে বাকি আটটার চারটে সেরে ফেলতে হবে | লিস্টটাতে চোখ বুলিয়ে এবার বাছল – “Alliance invited for pretty widow 32/5”4’ MCom without issues, works at private bank,  seeks established professional from Kolkata”.

অপরপক্ষ – “হ্যালো”|

সরিৎ নিজের পরিচয় এবং ফোনের হেতু জানাল |

অপরপক্ষ – “আমি মিত্রার দাদা, প্রশান্ত মিত্র | মানে আমার বোনের ক্লাসিফাইড এডভার্টাইসমেন্ট আপনি দেখেছেন – বলুন|”

সরিৎ নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জ্ঞাপন করে পাত্রী সম্মন্ধে জানতে চাইল |

প্রশান্ত – “মিত্রা চাকরি করছে – সে আমাদের সাথে আমাদের পৈতৃক বাড়িতেই থাকে – আমাদের বাবা মা গত হয়েছেন – মিত্রার  এক্স-হাসব্যান্ড বছর দুই হল স্ট্রোক হয়ে মারা যায় – মিত্রা প্রথম দেড় বছর বিয়েতে কিছুতেই রাজি হয়নি – শেষমেশ আমাদের কথায় সে রাজি হয়ে – কিন্তু কথা এগোনোর আগে সে চায় পাত্রের সাথে আলাদা করে কথা বলে নিতে “|

সরিৎ শুনে ভাবল – যাক এবার আর আমাকে দেখা করার কথা বলতে হল না| সে বলল – “আমার আপনার বোনের সম্মন্ধে শুনে, তার লসের কথা শুনে খুব খারাপ লাগল | আপনারা সম্মত হলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে প্রস্তুত|”

প্রশান্ত – “আমি তাহলে আপনার নম্বর ওকে দিয়ে দেব, আপনারা কথা বলে নেবেন |”

সরিৎ – “আমার পরের শনিবার এর আগে দেখা করা হবে না, রোজ অফিস থেকে বেরুতে ৭টা হয়ে |”

প্রশান্ত – “কোনো অসুবিধে নেই – আমি মিত্রা কে জানিয়ে দেব |”

ফোনটা ছেড়ে সরিৎ হাঁপ ছাড়ল – আজকের সকালের কাজ মিটল | এদিকে ঘড়িতে প্রায় একটা বাজতে চলল দেখে সে দৌড় মারল বাথরুমের দিকে | রেডি হতে হবে যে – গত সপ্তাহের পাত্র চাই কলমের খোঁজ সুমিতা সরকার অপেক্ষা করবে যে লেকটাউন সিসিডি তে|

 

বিকেল চারটে – ভি.এই.পির থেকে অটোতে বসে সুমিতা সরকারের প্রোফাইলটা ভেবে নিল | ৩২ বছর বয়সী সরকারি স্কুল শিক্ষিকা, কালিন্দী দমদমে বাড়ি, বাবা-মার একমাত্র মেয়ে | গত রবিবার আজকে দেখা করার এপয়েন্টমেন্ট হওয়ার পর কাল রাত নটায় সুমিতা ফের একবার ফোন করে – নিজের সম্মন্ধে কিছু কথা বলতে|সরিৎকে সে ধন্যবাদ জানায় শুরুতে আলাদা দেখা করতে চাওয়ার জন্যে |সিসিডির সামনে নেবে অটোভাড়া মিটিয়ে সরিৎ পা বাড়াল |

ভেতরে ঢুকে চোখ বুলিয়ে দেখলো ৩টে টেবিলে লোকজন বসে – তারমধ্যে একটা টেবিল একলা এক মহিলা | সামান্য পৃথুলা, মাঝারি ফর্সা, গোল মুখ, কমলা আর সবুজের কম্বিনেশনে সালোয়ার কামিজ পরনে | সরিৎ এগিয়ে গেলো – “আপনি কি সুমিতা ?”

ফর্সা, গোল মুখ উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলো | “বসুন |”

সরিৎই কথা শুরু করল – “বেশিক্ষন অপেক্ষা করেন নিত?”

সুমিতা – “না, মিনিট পাঁচেক হল|”

সরিৎ মোটামোটি  সহজ গলায় বললো – “কি খাবেন বলুন, একটু গলাটা ভিজিয়ে নিলে মন্দ হত না |”

সুমিতা একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে – “আমি একটা আইস টি নেবো |”

সরিৎ কাউন্টারে গিয়ে নিজের আর সুমিতার অর্ডারটা দিয়ে এসে বলল – “কফিটা আমার ঠিক ভালো লাগে না |” এইগুলো সেরকম অসত্য যা কোনো ক্ষতি করে না , আর ধরা পরার ব্যাপারটা থাকে না |

সরিৎ এরপর নিজের জীবনের শেষের কয়েক বছরের কথা বলল – সুখের সংসার থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পরার কথা | এগুলো সরিৎ এর খুব যে বলতে ভালো লাগে তা না – কিন্তু নতুন মানুষের সাথে আলাপ পরবর্তী প্রশ্নের মধ্যে এটা বেশ কমন |

সুমিতা – “বাবা কিছুটা বলেছিলেন আপনার কথা, সত্যিই দুঃখের | থাক আর পুরানো কথায় গিয়ে কাজ নেই |”

সরিৎ একটা কাষ্ঠহাঁসির সাথে জবাব দিলো – “হ্যাঁ সামনে তাকানোই ভালো | আপনার স্কুলের কথা বলুন |”

এইভাবে সুমিতার স্কুল থেকে সরিতের ফার্ম – সুমিতার বাবা মা এবং এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি থেকে সরিতের আত্মীয়পরিজন – দুজনের পছন্দের হবি আর অপছন্দের মানুষ – দুজনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা – এইভাবে এক থেকে অন্য বিষয়ে জল গড়াতে থাকল পরের ঘন্টা দুই | এরইমধ্যে আইস টির পর চিলি চিজি টোস্ট ,দার্জিলিং টি টেবিল ঘুরে গেছে |

সরিৎ চায়ের কাপ শেষ চুমুকটা দিয়ে সামনে তাকাতেই সুমিতা জিগ্যেস করলো – “একটা কথা জানতে চাইলেন না তো ? ৩২ বছর বয়েসে এখনও অবিবাহিত কেন আমি ?”

সরিৎ মুখের একটা পেশীতেও কোনোরকম অস্বাভাবিকতা না রেখে বলল – “সেই কথার তো কোনো প্রয়োজন নেই এইখানে, যেই কারণেই হোক আপনি এখনো অবিবাহিত আর আমি বিপত্নীক | আর সেই কারণে আমাদের কথা এগোতে পারে আর তাই আমাদের আজ কথা বলতে আসা |”

তারপর হালকা মুখ টিপে এসে সরিৎ বলল – “তাছাড়া শুরুতে তো আপনি বলেই দিলেন পুরোনো কথায় কাজ নেই |”

দুজনে এবার কাফের ভদ্রতার পরিধি না ভেঙে যতটা প্রাণখোলা হাঁসি হাসা যায়, ততটা হাসল |

এরপর আরো ঘন্টাখানেক চললো আলাপচারিতা – আর সুমিতা অনেকটা বেশি খুলে বেড়ালো – শেষের দিকে তার যে সরিৎকে ভালো লেগেছে সেটা তার চোখে মুখে বেশ বোঝা গেলো |

ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়ে কিছুদূর যেতে সরিৎই ওঠার কথা বলে | বিল মিটিয়ে ওরা বাইরে আসলো যখন তখন ঠিক সাড়ে সাতটা | সরিৎ জিজ্ঞেস করল কি ভাবে যাবে সুমিতা?

সুমিতা – “এই যশোর রোডের থেকে তো রিকশা পেয়ে যাবো |” কথাটা বলে সরিৎ এর  দিকে তাকাতে সরিৎ ইঙ্গিতটা বুঝে বললো – “ঠিক আছে তাহলে যশোর রোড অব্দি হেঁটে যাওয়া যাক |”

বিশেষ হেতুতে তুমি এড়ানোর জন্যে ভাববাচ্যের প্রয়োগ শ্রেয় মনে করল সরিৎ |

একথা, ওকথার মধ্যে দিয়ে ওরা যশোর রোডে এসে পড়ল – সরিৎ সুমিতাকে একটা রিকশা ধরে দিল | সুমিতা হেসে বললো – “আশা করি আবার দেখা হবে |”

সুমিতার রিকশা ভিড়ে হারিয়ে যেতেই সরিৎ একটা ট্যাক্সি ধরল – আর এখন অটো ঠেঙিয়ে যেতে ইচ্ছে করল না | রবিবাসরীয় আড্ডা বা আলাপচারিতার পর সে একটু যেন ক্লান্ত হয়ে পরে |

ট্যাক্সি চলতে চলতে সরিৎ হিসাব করে দেখলো যে সুমিতা হলো ৩৭ নম্বর পাত্রী যার সাথে সে দেখা করলো | মোটামোটি একটা ছকে পরে গেছে – রবিবার সকালে পাত্রী শর্টলিস্ট করে ফোন করে ঠিক জনকে বাছা – পরের শনি / রবি বিকেলে তাদের সাথে সময় কাটানো – আবার রবিবার সকালে পরের সপ্তাহান্তের সঙ্গী বাছা |

ভাবনাতে ছেদ পড়ল জোড়া মন্দিরের কাছে ট্যাক্সিটা বাঁক নিতেই | মোবাইলে একটা মেসেজ ঢোকার ইঙ্গিত – চেক করে দেখে সুমিতা | “সময়টা ভালো কাটল – থ্যাংক ইউ – আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি |”

সরিৎ যেন আরো কিছুটা গুটিয়ে গেল, ভাবলো – “নাহ রাতেই ফোনটা করতে হবে |” আর ট্যাক্সিটা তখনি শোভনা এপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল |

 

রাত পৌনে দশটায় নিচের থেকে রুটিটা নিয়ে এসে ফোনটা করল সরিৎ | নিজের চেনা ঢঙে গলায় একটা মার্জিত ভাব এনে সুখেন সরকার কে সে বললো – “সুখেনবাবু আমার সুমিতার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে – ও খুব ভালো মেয়ে | তবে আমার মনে হলো যে আমাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কটা না হওয়া ভালো | মানে আর কিছু না , আমাদের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে এটা বুঝেছি যে এই সম্পর্ক আর না এগোলেই ভালো |”

পারস্পরিক ভাবে কতগুলো বিরোধী কথা বলে সরিৎ এবার সুখেনবাবুকে বলার সুযোগ দিল |

সুখেন – “সুমিতারও তোমার সাথে কথা বলে ভালোই লেগেছিলো | কিন্তু তুমি যখন চাইছ না – তখন এই ব্যাপারটা আর আগে না যাওয়াই ভালো | ধন্যবাদ |”

ফোনটা কেটে একটা দীর্ঘনিঃস্বাশ ছেড়ে সরিৎ সোফায় বসল – আরেকটা রবিবারের ইতি |

এতক্ষনে সরিৎ সোমের রবিবাসরীয় দিনলিপি থেকে আপনারা নিশ্চই বুঝেছেন ওর সেই মারাত্মক আইডিয়াটা কি | স্বজনহারা হয়ে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি ফার্মের কাজে আর দিনগুজরানে চলে গেলেও শনিবারের বিকেল থেকে তার মনে হত কখন আবার সোমবার আসবে | কিছুদিন কাজিন,বন্ধুদের বাড়ি গেছে সপ্তাহান্তে – কিন্তু তার কোথাও ভালো লাগত না | বন্ধুদের সবার একটা ফ্যামিলি লাইফ আছে – তাই কেউ না বললে বা সত্যি না ভাবলেও সরিৎ অস্বস্তিতে ভুগত |

তখনি একদিন রবিবারের পাত্র পাত্রী কলামে চোখ পড়তে তার মাথায় এই বুদ্ধিটা আসে | তার বন্ধু – আত্মীয় – শ্বশুরকুল সবাই তাকে আরেকবার বিয়ে করে জীবনে এগোতে বলেছে অনেকবার | কিন্তু তার সেই ইচ্ছে হয়নি , কিন্তু যখন ভাবল এই পাত্র চাই থেকে ঠিকঠাক পাত্রী খুঁজে তাদের সাথে একদিন করে যদি দেখা করা যায় – কথা বলা যায়, তাহলে?

সরিৎ নিজের কাছে পরিষ্কার, সে সম্পর্কে জড়াতে চায়ে না | তার কোনো ইচ্ছে নেই | আর সে এইভাবে কারুর ক্ষতি না করে , কোনো দুরভিসন্ধি না রেখে নিজের মতন করে একটু সময়কাটানোর উপায় পেয়েছে | সে জানে সবাই বুঝবে না – তাই সে কারোকে বলেনি | একাকিত্বের মধ্যেই সে এক আশ্চর্য্য উপায় বের করেছে একাকিত্ব থেকে কিছুক্ষনের মুক্তির |

 

সপ্তাহের শেষ দুটি দিন বাদ দিলে সোম থেকে শুক্র সরিৎ এর জন্যে থোড় বড়ি খাড়া – খাড়া বড়ি থোড় | সকালে রান্নার লোক রান্না করে দিলে, তৈরি  হয়ে অফিসের জন্যে বেরিয়ে পরা, তারপর সারাদিন ফার্মের কাজ করে যাওয়া | অফিসে এখন আর সরিৎ এতটা হুল্লোড়বাজ নয়, হ্যাঁ এমন নয় যে কারোর সাথে কোনো কথা বলেনা কিন্তু আগের সেই এনাৰ্জি যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না | কাজের শেষে বাড়ি ফিরতে রাত আটটা কি নটা, তারপর একটু গল্পের বই, একটু টিভি আর খাওয়াদাওয়া সহকারে দিনের শেষ | সুমিতার সাথে কাটানো রবিবারের পর পাঁচটা দিন এইভাবেই টুক টুক করে কেটে গেলো |

পরের শনিবার সকালে অফিস ঢোকার সময় মেসেজটা এলো |”সরিৎবাবু আমার দাদার সাথে আপনার কথা হয়েছিল | আমি আজ সন্ধ্যেবেলা দেখা করতে পারি | আমি উত্তর কলকাতার মেয়ে, তাই এইদিকে কোথাও দেখা করা গেলে ভালো হত | — মিত্রা”

মিত্রার নম্বরটা তার মোবাইলে ছিল না, তাই শেষে মিত্রার পরিচয়ে দেওয়া না থাকলে অসুবিধে হত বুঝতে| সরিৎ একটু ভেবে রিপ্লাই বাটন টিপল – “সন্ধ্যে ৭টায় গিরিশ পার্ক মেট্রোর সামনে – অসুবিধা হবে না তো |” মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অস্তর্থক জবাব এলো | সরিৎ দিনের দ্বিতীয় ভাগের প্লানটা ঠিক করে ফেলল |

ঠিক ৭টা বাজতে দশে সরিৎ যখন বেরোচ্ছে মেট্রো থেকে তখন সে চনমনে – শনিবার সন্ধ্যেটা বাড়িতে বসে ডালমুট চিবোতে হবে না এটা সত্যি বড় ব্যাপার | কিছুক্ষন দাঁড়ানোর পর সে দেখল দীর্ঘাঙ্গী, মাজা রঙের এক মহিলা পরনে মেরুন কাজ করা অফ হোয়াইট শাড়ি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে | সরিৎ অপেক্ষা না করে এগিয়ে বলল – “আপনি কি মিত্রা ?”

মিত্রা যেন একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল , ভুল লোকের দিকে তাকায়নি ভেবে আস্বস্ত |

সরিৎ – “চলুন, রাস্তা পার করে বিবেকানন্দ রোডের ওপর একটা রেস্টুরেন্ট আছে | ওখানে বসতে আপত্তি নেই তো |”

মিত্রা – “না, ঠিক আছে – চলুন |”

মিনিট খানেকের হাঁটা পথ মোটামোটি বাক্যহীন কাটল | বিবেকানন্দ রোড আর বিধান সরণি ক্রসিংয়ে এম্বেসী রেস্তোরাঁতে ওরা ঢুকে বসল যখন, তখন ঘড়িতে সোয়া সাতটা | বেয়ারা এসে জল দিয়ে , মেনু কার্ড ধরিয়ে অর্ডার নেওয়ার আগেই সরিৎ কিছু দরকারি খবর নিয়ে নিয়েছে – মিত্রার বাড়ি পাইকপাড়া ২নং বাসস্ট্যান্ডের কাছে, তার একটু রাত করে বাড়ি ফেরাতে সেরকম অসুবিধে নেই, সরিৎ তাকে ফেরার পথে ড্রপ করলে কোনো অসুবিধে নেই আবার না করলেও চিন্তার কিছু নেই, এখন থেকে ডাইরেক্ট বাস সে পেয়ে যাবে |

রেস্তোরাঁর আলোতে সরিৎ মিত্রার মুখশ্রীটা দেখেছে এরমধ্যে – অনাড়ম্বর সাজে লম্বাটে সুশ্রী মুখ | একটা হালকা আঁধার থাকলেও চোখদুটি বেশ ঝকঝকে |দুজনে ওয়ান বাই টু চিকেন হট এন্ড সওয়ার সূপ অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করলো|

মিত্রা – “আপনার স্ত্রী- সন্তানের আকসিডেন্টটা খুবই মর্মান্তিক | কত বয়স হয়েছিল ছেলের ?”

সরিৎ – “ছয়ে – ক্লাস ওয়ান|”

মিত্রা – “লাইফ ব্যাপারটা এতটাই আনসার্টেন যে কি বলবো – আমার সবকিছু শুধু একটা রাতে চেঞ্জ হয়ে গেল |”

দুজনের জীবনটা অনেকটা এক গতে বয়ে যাওয়াতে দুজনে দুজনের লসটা ভালো বুঝতে পারল | আস্তে আস্তে ওদের পুরানো জীবন ছেড়ে সামনের কথা হতে লাগলো | সরিৎ এর কাছে এই বিভিন্ন অলি গলি দিয়ে বয়ে চলা কথোপকথন চেনা অথচ অচেনা | চেনা কারণ গড়পড়তা বাঙালি বছর ত্রিশের মহিলার গল্প একটা ধাঁচে পরে যায় – কিন্তু সবার গল্পই একভাবে আলাদা আলাদা | মিত্রার সাথে কথা বলে একটা জিনিস সরিৎ এর ভালো লাগলো ওর স্পন্টেনিটিটা , মেয়েটার আড়ষ্ঠতা নেই বিশেষ |

ঘন্টা তিনেক বাদে কথা আর খাবার শেষ করে বেড়ানোর সময় আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতা হলো সরিৎ এর – মিত্রা কিছুতেই রাজি নয় যে সরিৎ বিল মেটাবে | হয়ে সে পুরোটা দেবে নয়তো অর্ধেক – অর্ধেক | শেষ পর্যন্ত সরিৎ রাজি হলো মিত্রাকে বিল মেটাতে দিতে কারণ অর্ধেক অর্ধেক ব্যাপারটা দৃশ্যকটু – কিন্তু তার সাথে সরিৎ এই প্রস্তাবে মিত্রাকে রাজি করল যে আগামীকাল লেকটাউন এর সিলভার চিমনিতে ডিনার খাওয়াবে সরিৎ |

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশের দিকে এগোচ্ছে দেখে সরিৎ একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিল | মিত্রাকে নামিয়ে সে চলে যাবে তার ঠিকানায় | মিত্রার বাড়ির সামনে ট্যাক্সি তা দাঁড়ালে, মিত্রা নেবে বলল – “কাল দেখা হচ্ছে তাহলে”| মিষ্টি হেসে ঘুড়ে চলে যেতে সরিৎ এর কেন জানি না মনে হলো মেয়েটা আলাদা | কিন্তু পর মুহূর্তে ভেবে নিল , কাল এই সময়ের মধ্যে তো সেই ফোনটা সে করেই দিয়েছে, “না” হয়েও গেছে – তাহলে আর ভেবে কি লাভ | সরিৎকে নিয়ে ট্যাক্সিটা রওনা দিল বাগুইআটির উদ্দেশে |

 

কথায় বলে মানুষের জীবনে সবই প্রথম একবার ঘটে – আর সেইটা যদি ভাবনার উল্টোদিকে হয়ে তাহলে ঘটনাটা অনেকটা সপাটে চড় খাওয়ার মতন হয়ে | পরের দিন রবিবার রাত দশটা দশে ঠিক সেরকম একটা চড় খেল সরিৎ|

তার আগে অব্দি তার রবিবার ছিল একদম ছকে ছক মেলানো | সকালে বাজার – খবরের কাগজের পাত্র/পাত্রী কলাম – কিছু ফোনের মাধ্যমে পরের সপ্তাহের সঙ্গী বাছা – সন্ধ্যে ছটা থেকে সাড়ে আটটা অব্দি মিত্রার সাথে আড্ডা | মিত্রাকে ওর বাকিদের থেকে ভালো লাগা একটা ব্যাপার ছিল কিন্তু তবুও শেষমেশ ফোনে না বলবে ভেবে বাড়ি ফিরল সরিৎ|

ঠিক দশটা দশে প্রশান্ত মিত্রর – মিত্রার দাদা – ফোন | একটু অবাক হয়েই ফোনটা ধরল | সৌজন্য বিনিময়ে করার পর প্রশান্ত বলল – “সরিৎবাবু মিত্রা তো আপনার সাথে দুদিন দেখা করল – শুনলাম আপনাদের কথাবার্তাও ভালোই হয়েছে – কিন্তু মিত্রা ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোতে চেয়ে না |”

ধাক্কা খেয়ে সরিৎ বলে উঠল – “না-এর কোনো কারণ বলেছেন কি মিত্রা ?” – বলে নিজেই অবাক হয়ে গেলো এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে |

প্রশান্ত সাবধানী গলায় বললো – “মিত্রা একটু চাপা ধরণের মেয়ে, বিশেষ খুলে কিছু বলল না – খালি বলল ওর মনে হয়েছে না এগোনোই ভালো |”

এবার নিজেকে সামলে নিল সরিৎ | হালকা গলায় বললো – “ঠিক আছে | ভালো থাকবেন ” – ফোনটা কেটে দিল |

একদিক দিয়ে দেখলে এতে সরিৎ এর অসুবিধের কিছুই নেই | সে “না” বলত, তার বদলে “না”টা বলেছে মিত্রা | কিন্তু সেই পুরুষ অহম সরিৎ কে ব্যাপারটা মানতে দিল না – তার সাথে ওর মনে একটা খটকা দেখা দিল ব্যাপারটা কি সত্যি যেরকম সে দেখল , কোনো কারণ নেই কিন্তু ষষ্ঠইন্দ্রিও যেন তার মনে একটা খুঁতখুঁতানি ঢুকিয়ে দিল |

সেইদিন রাতে কোনোরকমে ঘটনা পরম্পরা মন থেকে সরালেও, পরের দিন সকালটা সরিৎ শুরু করল সেই একটা অসোয়াস্তি দিয়ে | ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে, সরিৎ প্রায় বছরখানেক বাদে ছুটি নিলো | সে ফার্মে ফোন করে বিশেষ হেতুতে ছুটি নিল – আপাতত দিন দুয়েক, তারপর জানাবে | ফার্মের মুখার্জী সাহেব একটু অবাক হলেন সরিৎ এর ছুটি নেওয়াতে , কিন্তু যে মানুষটি শেষ এক বছর একটাও ছুটি নেয়নি তাকে তো কিছু বলার থাকে না |

ছুটি নিয়ে কি করবে সরিৎ ছকে ফেলল – মিত্রার একটু খোঁজ নিতে হবে | দুদিনে কথায় কথায় সে জানতে পেরেছে মিত্রা এক্সিস ব্যাংকে কাজ করে – পার্ক স্ট্রিটের থেকে মেট্রো ধরে শনিবার গিরিশ পার্ক আসে | সরিৎ এর ফার্মের সুমনের বৌ কাজ করে এক্সিস ব্যাংকে – পার্ক স্ট্রিট ব্রাঞ্চে | সরিৎ সুমনকে ফোনে ধরে ওর বৌ মৌমিতাকে বলল একটু জানতে ওদের ব্রাঞ্চে কেউ মিত্রা নামের আছে কিনা – এও বলল ওদের ব্রাঞ্চে না হলেও অন্য কোনো ব্রাঞ্চে কেউ আছে কিনা সেই খোঁজ নিতে|

তারপর সে ঠিক করল পাইকপাড়া যাওয়া যাক – তার এক দূরসম্পর্কের পিসি আগে থাকতো যদুবাবুর বাজারের দিকে| একবার ওই পাড়ায় কোনো পুরানো চেনা লোক থাকলে একটু দেখা যেতে পারে|

শুরুতে ব্যাপারটাতে একটা হেরে গিয়ে হার না মানা রকম থাকলেও যখন সরিৎ বাড়ির থেকে বের হল তখন অনেকটা কৌতূহল এবং রোমাঞ্চ দানা বেঁধেছে তার মনে |

 

পাইকপাড়া পৌঁছে সরিৎ তার পদ্মপিসির বাড়িতেই গেল আগে | কেউ থাকে না পিসি চলে যাওয়ার পর | তবে একতলায় এক ভাড়াটে থাকে যার সাথে সরিৎ এর আলাপ আছে | সাত-পাঁচ ভেবে তার কাছেই গেলো | ভদ্রলোক স্কুলে পড়ান – বেলা এগারোটার আগে বেড়োন না, তাই দেখা হয়ে গেলো | তো যতীন বাবুকে সরিৎ বলল – “ফার্মের একটা ছেলের বাড়ি থেকে এক পাইকপাড়ার বাসিন্দার খোঁজ নিতে বলেছে, মনে হয়ে বিয়েথার ব্যাপার |”

যতীনবাবু – “দেখো যদি আমাদের পাড়ার হতো হয়তো বলতে পারতাম, কিন্তু দু নম্বর বাসস্ট্যান্ড, মানে রানী রোডের দিকে ঠিক বলতে পারব না | এক কাজ করতে পারো আমার এক পুরানো ছাত্র আছে – আজকাল কেবল টিভির কাজ করে, ওর সাথে কথা বলতে পারো|”

এরপর যতীনবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে সরিৎ গেল কেবল টিভি অফিসে হোৎকার খোঁজে – ভাগ্য ভালো বেরোবার মুখে  হোৎকাকে পেয়ে গেল সরিৎ | এমনিতে পাত্তা দিত না, কিন্তু মাস্টারমশায় পাঠিয়েছে শুনে  হোৎকা একপায়ে রাজি সাহায্য করতে |

মিত্রার বাড়ির ঠিকানা জানা ছিল না – কিন্তু প্রশান্ত মিত্র আর মোটামোটি জায়গার আন্দাজ দিতে  হোৎকা ঝাঁপি খুললো – “স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে কাজ করে প্রশান্তদা – বোনের বিয়ে হয়েছিল – দু বছর হলো বিধবা – প্রশান্তদা সোর্স খাটিয়ে ঢুকিয়ে দিলো ব্যাংকে – বাড়িতে মা আছেন – আর প্রশান্তদার বৌ , মেয়ে – প্রশান্তদা ভালো লোক , সময় টাকা দিয়ে দেয় – মিত্রা চুপচাপ মেয়ে – ওর সম্মন্ধে বিশেষ জানা নেই – তবে কোনো লাফড়ার কথা শুনিনি স্যার |” – নামতা  শেষে  হোৎকা একটা বড় শ্বাস নিলো |

হোৎকাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ঘুড়তে যাবে – হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল সরিৎ এর | জিজ্ঞেস করল  হোৎকাকে – “ভাই প্রশান্ত বাবুর নম্বর আছে তোমার কাছে |”

হোৎকা হলুদ – খয়েরি দাঁত বের করে জানায় অবশ্যই আছে – বলে নম্বর মোবাইল দেখে জানিয়ে দেয় |

কেবল টিভি অফিস থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা নিশানা পেয়ে সরিৎএর মুখে প্রশস্তির হাঁসি | প্রথম দিন প্রশান্ত বলেছিল – বাবা মা গত হয়েছেন, কিন্তু হোঁৎকার খবর অনুযায়ী মা আছেন প্রশান্ত আর মিত্রার | এইটুকু থেকেই সরিৎ এর খটকা আর খটকা থাকে না – সত্যির মধ্যে হালকা মিথ্যে যা বলাতে ক্ষতি নেই, তার চেনা ছক | তাই সে নম্বরটা চাইল – সেখানেও গরমিল| এই নম্বর আর তার কাছে আসা প্রশান্তর ফোন নম্বর এক নয় | হতেই পারে দুটো নম্বর, কিন্তু সেটা বাজিয়ে দেখতে হবে |

হোঁৎকার থেকে পাওয়া নম্বরে ফোন করল সরিৎ | একটা অচেনা গলা – “হ্যালো |”

সরিৎ – “নমস্কার, আমি সরিৎ কথা বলছিলাম|”

প্রশান্ত মিত্র – “হ্যাঁ বলুন | কি ব্যাপারে, কোথা থেকে বলছেন?” – শুনে মনে হল না নামটা এর আগে শুনেছেন বা গলাটা আগে কানে এসেছে |

সরিৎ তৈরী জবাব দিলো – “স্যার, আমাদের ব্যাঙ্কের তরফ থেকে ….. |” প্রশান্ত মিত্র অভ্যেস মতন  দু একটা শব্দ ব্যবহার করে ফোনটা কেটে দিল |

সরিৎ এর নিস্তরঙ্গ জীবনে এ এক তাজা হাওয়া | এক মহিলার সাথে ম্যাচ-মেকিং হেতু দেখা, দুদিনের বেশ মসৃন আলাপচারিতার পর মহিলা তাকে না বলে, তারপর দেখা যায় মহিলার দাদা পরিচয়ে যে ফোন করে সে তার দাদা নয় এবং মহিলার দেওয়া তথ্য কিচ্ছু কিছু অসত্য |

বি.টি. রোডের ওপর একটা চায়ের দোকানে বসে একটা চা নিয়ে সরিৎ চুম্বকে পুরোটা ভেবে নিল| ভাবছিল পরের পদক্ষেপ কি হতে পারে | ঘড়িতে ১১.৩০. আর তখনি মোবাইল বেজে উঠল – সুমন এর স্ত্রী মৌমিতা | ফোনটা ধরতেই, মৌমিতা বলে উঠল – “সরিৎদা, তোমার মিত্রাকে পাওয়া গেছে | আমাদের ব্রাঞ্চে নয়, রবীন্দ্রসদনে একজন আছে | বছর দেড়েক হল ঢুকেছে – উইডো – লোন ডিপার্টমেন্টে কাজ করে | ফোন নম্বরটা পেয়েছি, আমি মেসেজ করে দিচ্ছি |”

সরিৎ থাঙ্কস বলে ফোনটা কেটে দিল | চা শেষ হবার আগেই মেসেজ চলে এল – এবার নম্বর মিলেছে মানে যেই মিত্রার সাথে তার কথা – দেখা – পরিচয় সেই মহিলা এক্সিস ব্যাঙ্ক রবীন্দ্রসদন ব্রাঞ্চে কাজ করে |

সরিৎ এর পরের পদক্ষেপ মাথায় এলো লাঞ্চ করতে করতে | কি করি, কি করি করতে করতে সিটি সেন্টারে চলে এসেছিলো – প্রায় এক বছর বাদে কোনো কারণ ছাড়া সে একটা ভালো রেস্তোঁরাতে একা একা খেতে ঢুকেছে | তবে সেটা আজ কাজে লেগে গেল – লাঞ্চের সময় এক পঁচিশ ছাব্বিশের ছেলে মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে ট্রু কলার অ্যাপ-এর কথা তুলতেই সরিৎ নড়েচড়ে বসল | এই অ্যাপ-এর কথা সে শুনেছে, যদিও ব্যবহার করেনি |

সঙ্গে সঙ্গে তার মোবাইল খুলে অ্যাপটা ডাউনলোড করে ফেলল – এবার যেই নম্বরটা পাত্র পাত্রী বিজ্ঞাপনে দিয়েছিল প্রশান্ত মিত্রর নামে সেটা দিয়ে খুঁজলো ট্রু কলারে | জয়দীপ ব্যাঙ্ক – লেখাটা পরেই সে লাফিয়ে উঠলো | খাওয়ার কথা ভুলে আবার ফোন করলো মৌমিতাকে |

মৌমিতা – “হ্যাঁ সরিৎদা  |”

সরিৎ – “মৌমিতা, সরি আবার জ্বালাচ্ছি |”

মৌমিতা – “আরে বলো না, কোনো চাপ নেই |”

সরিৎ – “জয়দীপ বলে কেউ আছে কিনা ওই রবীন্দ্রাসদন ব্রাঞ্চ বা অন্য কোনো ব্রাঞ্চে |”

মৌমিতা – “ঠিক আছে, দেখে বলছি | কিন্তু পরের দিন বাড়িতে এসে পুরো গল্পটা বলতে হবে কিন্তু, হি হি|”

সরিৎ আচ্ছা বলে ফোনটা ছাড়ল | বাকি খাবার শেষ করতে করতে হিসাবটা কষে নিল – যদি মৌমিতার দিক দিয়ে খবর আসে তো ভালো – নাহলে কালই মিত্রার মুখোমুখি হবে |

বিল মিটিয়ে আর মৌরি মুখে দিয়ে বেড়িয়ে এল সরিৎ |

 

মৌমিতার ফোনটা এল পরের দিন বেলা এগারোটার সময় | প্রথমেই সরি বলল দেরির জন্যে, তারপর বললো – “জয়দীপ নামের কাউকে পেলাম না সরিৎদা, না ওই ব্রাঞ্চে না অন্য কোনো এক্সিস ব্যাঙ্ক ব্রাঞ্চ |”

সরিৎ হালকা নিভে যাওয়া গলাতে বললো – “ঠিক আছে |” কাল রাতে একা ব্যালকনিতে বসে সরিৎ অনেক ভেবেছে | সে এইভাবে মিত্রাকে ধাওয়া করছে কেন – এটা কি শুধুই সত্যিটা জানার ইচ্ছে ? নাকি আরো কিছু আছে | পুরো ব্যাপারটার শেষ না দেখা অব্দি সরিৎ সেই শান্তিটা পাচ্ছে না যে, ঠান্ডা মাথায় ভাববে |

ফোনটা কেটে একটু ভাবল | রেডি হয়ে সরিৎ বেড়িয়ে পড়ল | নিজের ফার্মের নিচে পৌঁছাতে লাগল ঘন্টাখানেক | ফার্মে না ঢুকে সরিৎ ফোন করল সুমনকে – “ফোনটা নিয়ে একটু নিচে নামো তো |”

সুমনের ফোনটা নিয়ে সরিৎ জয়দীপকে ফোনটা করল | গলাটা একটু পাল্টে বলল – “জয়দীপবাবু ?”

জয়দীপ – “হ্যাঁ বলছি |”

সরিৎ নিজের প্ল্যান অনুযায়ী বলল – “আপনি আমাকে মাস চারেক আগে একবার ফোন করেছিলেন, ব্যাঙ্কের একটা অফার নিয়ে| “

জয়দীপ – “হতে পারে, কিন্তু আপনার নম্বর আমার কাছে নেই | বলুন কি ব্যাপারে কথা হয়েছিলো, এখন কি করতে পারি |”

সরিৎ – “পার্সোনাল লোন নিয়ে |”

জয়দীপ – “তাহলে স্যার আপনার কিছু ভুল হচ্ছে আমি ব্যাংকে আছি কিন্তু লোন ডিপার্টমেন্টে না |”

সরিৎ দেখল আর কিছু বলে লাভ নেই তাই আচ্ছা সরি বলে ফোনটা ছেড়ে দিল | সুমনকে আর কিছু না বলে ফোনটা ফেরত দিয়ে সরিৎ এগিয়ে গেল | আর কোনো রাস্তা নেই ভেবে সে রবীন্দ্রসদনে দিকে রওনা দিল |

সন্ধ্যে তখন ছটা, ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেছে এলগিন রোডে এক্সিস ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে | তখনই মিত্রাকে দেখতে পেল সরিৎ | আজ একটা সাদা – সবুজ শাড়ি , একই রকম প্রসাধন – আড়ম্বরহীন সাজ | মিত্রা একা মেট্রোর রাস্তা ধরতে সরিৎ ওর পাশে চলে আসে | বলে – “আধ ঘন্টা সময় হবে?”

মিত্রা একটু চমকে ওঠে, তাকিয়ে চিনতে পেরে সামলে নেয়| বলে – “ও আপনি |” সাথে সেই চেনা মিষ্টি হাঁসি |

সরিৎ – “আধ ঘন্টা সময় হলে একটু বসা যায়? দুটো কথা বলার ছিল| কথা দিচ্ছি আর বিরক্ত করব না|”

মিত্রা – “এমা, বিরক্ত কেন করবেন | চলুন, কোথায় বসবেন |”

সরিৎ – “২৪ চৌরাঙ্ঘি রোড বসা যাক|”

দুজনে পা চালিয়ে পৌঁছে গেলো কিছুক্ষনে| দুটো মোমো অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করলো সরিৎ| কোনো ভনিতা না করে বলল – “জয়দীপের নম্বরে এডভার্টাইসমেন্ট দেওয়ার কারণ কি ?”

মিত্রা সেই মিষ্টি হেঁসে – “ও তাহলে জয় আমাকে ঠিকই বলেছে – আপনিই ওকে ফোন করেছিলেন !”

সরিৎ মরিয়া ব্যাপারটা জানতে – “হ্যাঁ আমিই |”

মিত্রা – “দেখুন আমি বুঝতে পারছি আপনি খুব ডিস্টার্বড হয়ে আছেন | আমি পুরোটা বলছি – কিন্তু আগে বোলেনি আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, না কোনোরকম ঠকবাজি করেছি |”

মিত্রা – “অমিতাভ চলে যাওয়ার পর দাদা, মা, বৌদি সবার সঙ্গে থাকলেও খুব একা লাগত |মনে হতো কিভাবে কাজের বাইরের সময়টা কাটবে| বন্ধু স্বজন কারুর সাথেই ভালো লাগত না | তখনই পাত্র পাত্রী কলাম থেকে আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে | ভাবি কিছু সম্ভাব্য পাত্রের সাথে সময় কাটালে কেমন হয়ে – খারাপ কিছু না, শুধু বসে গল্প করা – কিছু মানুষকে চেনা – কিছু অভিজ্ঞতা – কিছুটা সময় কেটে যাওয়া | এই ভাবেই শুরু | প্রথমে নিজে ফোন করতাম – কিন্তু দেখলাম পাত্রী নিজে ফোন করছে এইটা লোকের ভালো লাগছে না | তাই তখন আমার খুব ভালো বন্ধু – স্কুলের বন্ধু – জয়ের হেল্প নিলাম | ও আমার দাদা সেজে ফোন করত | দেখা সাক্ষাতের পরে ওই ফোন করে না বলে দিত| কিছুদিন আগে জয়ের বুধ্ধিতেই ভাবলাম আমি একটা অ্যাড দিয়ে দেখি|”

মিত্রা পুরোটা বলে দম নিল, দিয়ে একটু জল গলায় দিয়ে সরিৎ এর দিকে তাকালো ধরা পড়া যাওয়া দৃষ্টিতে – “আপনিও সেইভাবেই আমাদের নাম্বার পান আর তারপর যা হয়েছে তো বুঝতেই পারছেন |”

সরিৎএর সামলাতে একটু সময় লাগলো | ও শুনেছিলো দুটো মানুষ একই রকম ধারায় চিন্তা করেছে পৃথিবীর দুই প্রান্তে – এরকম অনেকবার ঘটেছে | সেই দিক দিয়ে ভাবলে এখানে বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই | কিন্তু তবু নিজের জীবনের লুকিয়ে রাখা , অত্যন্ত সযত্নে লালিত এক চিন্তাধারা যা সরিৎ ভেবে এসেছে একান্ত তার, আজ যখন অন্য একজনের কাছ থেকে সেই উপলব্ধি শোনে তখন একটা ধাক্কা তো লাগবেই |

তারপর যে সিক্রেট এতদিন তার একার ছিল সে এবার মিত্রার কাছে মেলে ধরল |

দুজনে দুজনেরটা শোনার পর কিছুক্ষন চুপ করে রইল | মিত্রাই আগে হেঁসে উঠলো, আর তারপরে সরিৎ ও | আজ আর ওদের আশপাশের কারুর কথা মনে হল না | কিছুক্ষন পরে দুজনেই যখন অনেক হালকা হল তখন আবার সেই কথোপকথন শুরু হল যা কাল রাতের ফোনে কেটে গেছিল | কখন রাত দশটা হয়ে গেছে কেউ বুঝল না |

বাইরে এসে সরিৎ বলল – “তাহলে এবার থেকে মাঝে মাঝে দেখা হতেই পারে – আর তো কারুর কিছু লোকানোর রইল না |”

মিত্রা সেই মিষ্টি হাঁসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো |

সরিৎ একটা ট্যাক্সি ডেকে বললো – “চলো তোমায় নামিয়ে দিয়ে যাবো |” আজ আর ভাববাচ্যের সাহায্য লাগলো না | এক নৌকায় বসা দুজনের অনুরণন আজ একদম পারফেক্ট – তাই অস্পষ্টতা, অস্বচ্ছতা, দ্বিধা পেরিয়ে আজ যেন এক নতুন আলাপ |

 

পুনশ্চ

মাসছয়েক পরের কথা | ৪ নম্বর রানী রোডের সামনে ট্যাক্সিটা থামলে, সরিৎ তার থেকে নামল | মিত্রাকে প্রথমবার ট্যাক্সি করে নামানোর ঠিক ৬মাস ৭দিনের পর আজ সরিৎ এসেছে প্রথমবার প্রশান্ত মিত্র আর তাদের মা এর সাথে দেখা করতে | একটা চাপা টেনশন ছিল আর ঠিক তখনই গেট বন্ধ করে হোঁৎকার আবির্ভাব | এক মুহূর্ত লাগলো সরিৎকে চিনতে – “হে হে স্যার আপনি নিজেই | হে হে , ভালো ভালো |” – সেই হলুদ – খয়েরি ছোপ দাঁত দেখিয়ে হোঁৎকা বিদায় নিল |

তবে তার কথাটা ঠিক — ভালো, সবটাই আজ ভালো |

আমার ছোটবেলা

13016769_1234155003278816_254681483_o

Pet মানে অন্যকিছু হলে চলবে না। হতে হবে বাঁদর ছানা।

বায়েনা খানিক এরকম-ই ছিল।

আমার ছোটবেলার ঘটনা। সব বাচ্চাদের মতন আমার এক দিন মনে হল আমার একটা pet  দরকার। যেমন ভাবা সেই রকম কাজ। এই সব, জীবনের গুরুতর জিনিস এক মাত্র বাবারসাথেই আলোচনা করা যায়। গম্ভীর মুখে বাবা কে গিয়ে বললাম ” আমার একটা pet  দরকার”। মা তো শুনেই প্রমাদ গুনল , আবার একটা ঝামেলা জোটাব আমি। বাবা আরও গম্ভীরমুখে বলল ” ঠিক আছে”  , কিন্তু কিনতে যাবার আগে ঠিক করতে হবে আমি কি চাই কিনতে ।

আলোচনা শুরু হল, কি pet  কেনা হবে তাই নিয়ে।

১) কুকুর – কমন pet , আনেকেই কেনে। আমাদের সবার থেকে আলাদা হতে হবে। তাই কুকুর বাদ

২) বেড়াল – আমি একদম পছন্দ করই না , তাই বাদ

৩) খরগোশ – খুব ছোট বেলায় আমার এক জোড়া খরগোশ ছিল, তাই আবার খরগোশ চলবে না। এটাও বাদ

৪) মাছ – শুধু আকুয়ারিউম এ ঘুরে বেড়াবে আমার সাথে খেলা করতে পারবে না। তাই এটাও বাদ

 

সমস্যা গভীর । কি যে কেনা যায় তাই ভেবে পাছিনা । এরকম সময় বাবা বলল , আমি একটা বাঁদর পুষতে পারি. তাতে আমার লাভ । কারণ যথাঃ

১) পাশের বাড়ি র পেয়ারা যে আমি চুরি করই সেইটা আমার পোষা বাঁদর কে শিখিয়ে দিলে আমাকে আর কেউ দোষ দিতে পারবেনা

২) নতুন ধরনের pet , কেউ পোষে বলে আমার জানা নেই।

৩) আমার সাথে খেলা করতে পারবে।

 

যেই ভাবা, সেই কাজ।

এতগুলো দুর্দান্ত কারণ থাকাতে,  আমি আর বাবা রবিবার সকাল বেলা বেরিয়ে পরলাম , বাঁদর ছানা কিনতে । মা কি করবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে বসে পড়ল । হাতিবাগানে রবিবার সকালে খুব সুন্দর বাজার বসতো , এই সব পশু পাখি, মাছ গাছের। সারা বাজার ঘুরে পাওয়া গেলনা একটা বাঁদর ছানা। আমার কাঁদো কাঁদো হাল , কোথাও নেই আমার সাধের বাঁদর ছানা। হতাশ হয়ে দাঁড়ীয়ে আছি , এমন সময় বাবা বলল ” তাহলে একটা গাছের চারা কিনে বড়ো করা যাক , তাতে ফুল ফোটানো যাক ” । চারি পাশে প্রচুর সুন্দর সুন্দর ফুল এরগাছ , লোভ হচ্ছিল  অনেকখন ধরে, বাবা কে বলিনি পাছে বাঁদর কেনার সুযোগ হারাই । এবার বাবার প্রস্তাবে এক কোথায় রাজি হয়ে গেলাম । ফুল গাছের চারা কিনে নাচতে নাচতে বাড়ি চলে এলাম ।

বাবা-কে হারিয়েছি কয়েক মাস হল। হাতে সেদিন ফুল গাছের চারা দেখে মা সবচেয়ে খুশি হয়েছিল।

সে বৃক্ষ-রূপি pet জল, আলো আর বাতাস পেয়ে হয়ে উঠেছে যেন আমার আপনজন।

ঘন্টা দুয়ের পালা

ভিক্টোরিয়ায় সন্ধ্যাবেলা। পথের দিকে চেয়ে নম্রস্তনা, স্নিগ্ধতনু, হরিণনয়ন মেয়ে। থমথমে মেঘ ভেঙে এবার অঝোর বৃষ্টি নামল। ছাতায় মাথায় ক্যাওড়া কিচাইন, পথের ট্র্যাফিক থামল।

আকাশ চোখের ছেলেটিও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। লাজুক হেসে এবার এল কৃষ্ণকলির কাছে, “অনেকক্ষণ তো দাঁড়িয়ে আছেন কারও অপেক্ষায় – ফোনটা লাগান, বৃষ্টিতে যে শহর ভেসে যায়।”

“নেটওয়ার্ক ফেল।” কাঁদোকাঁদো কৃষ্ণকলি বলে, “ট্র্যাফিকও জ্যাম, পড়লাম কী ভীষণ গ্যাঁড়াকলে! বলেছিল ড্রপ করবে পিয়ারলেসের মোড়ে – একা এখন এ দুর্যোগে ফিরব কেমন করে!”

আকাশ ভাবে – নেকু, কেন ঘরের বাইরে এলে! এলেই যদি, কোন দুঃখে প্রেম করতে গেলে? মুখে বলে, “আমারটিও ডিচ করেছে, তাই চলুন তবে দু’জন এবার একসঙ্গেই যাই।”

“আপনি কোথায় যাবেন?”

“ধরুন, কোথাও কাছাকাছি। ভয় কিছু নেই, তেমন হলে সঙ্গে আমি আছি। রোডের ট্র্যাফিক লাজুক এখন। চলুন, মেট্রো নিয়ে এখান থেকে উঠব সোজা টালিগঞ্জে গিয়ে। সেখান থেকে রিক্সা চেপে যাদবপুরের মোড়ে। বাকি পথটা যেতে পারেন অটো বা বাস ধরে।”

ghonta duyer pala
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

হঠাৎ জাগে বিজলি ছটা অন্তরীক্ষলোকে। ‘ডেট’-ভাঙা দুই যুবা-যূনী তাকায় চোখে চোখে। দুষ্টু মনের জানলা ফুঁড়ে এক পলকের আশা – হয় যদি হোক ঘণ্টা দুয়ের খুচরো ভালোবাসা!

মেট্রোরেলে ভিড় থৈ থৈ। যখন দরজা খোলে আকাশ সবল বাহুর টানে সঙ্গিনীকে তোলে। ছিটকে পড়ে দেহে দেহে স্পর্শ কিছুক্ষণ। কোমল বুকের মদির ছোঁয়ায় হৃদয় উচাটন।

টালিগঞ্জে মহানায়ক বুক ছমছম হেসে বলেন – পথিক, মানবজীবন ধন্য ভালোবেসে। রিক্সা স্ট্যান্ডে গিয়ে কিন্তু ‘তেনার দেখা নাই’। কৃষ্ণকলি স্মার্টলি বলে, “চলুন, হেঁটেই যাই।”

আকাশ তবু সংশয়ে, “পথ তেমন বেশি নয়। মধ্যে কিছু আঁধার গলি, সেইখানেতেই ভয়।”

“তুমি তো আছ।” হরিণ মেয়ে নিবিড় হয়ে আসে। অবাক পুরুষ মুখ তুলে চায়, ঘনায় নারীর পাশে।

চোখে চোখে ফুলকি ছোটে, শরীর কাছে কাছে। রাস্তায় জল, দৃষ্টি জুড়ে ইলশে গুঁড়ি নাচে। নির্জন পথ, পেরোয় কত আঁধার-আলোর গলি। জল নুপুরে ছন্দ খোঁজে হারানো কোন কলি। মেদুর হাওয়ায় বুক টনটন কীসের যন্ত্রণায়! দুজনেই মন উজার করে হারিয়ে যেতে চায়। হঠাৎ দুটি ছন্নছাড়া বিক্ষত হৃদয় পরস্পরের মাঝে খোঁজে শান্ত পোতাশ্রয়।

রাস্তা কখন ফুরিয়ে আসে, ফুরোয় না আজ কথা – ঘরভাঙা আর বুকভাঙা দুই প্রাণের আকুলতা। ঘর ভেঙেছে খিদেয়, বানে। ভাসতে ভাসতে এসে কংক্রিটের এই জঙ্গলে পায় শুকনো মাটি শেষে। মহানগর, মহানগর, বলো না তুমি কার? তিলোত্তমার ওপর শুধু বীরের অধিকার। যে লুটে নেয় আজ সে মরদ, হৃদয়-বিবেক বোঝা। মায়ার খেলায় নকল খাঁটি, মিছেই আসল খোঁজা। প্রেমের খেলাও আজব খেলা, নিক্তি মাপা কল – যেইদিকে ঘাস বেশি সবুজ, ছুটবে ভেড়ার দল। সাবধানি ‘লাভ’ গড়ে, ভাঙে, লাভের গুড়ে বালি! প্রেমিকা চায় বিত্ত, প্রেমিক নগ্ন দেহই খালি। এই খেলাতে দুই গোহারা যখনই নিশ্বাসে অক্সিজেনের অভাব বোঝে, ভিক্টোরিয়ায় আসে। অপেক্ষা সার, কেউ আসে না। মিথ্য ‘ডেট’-এর ছলে আত্মপ্রবঞ্চনায় দু’জন স্বপ্ন খুঁজে চলে।

মায়াবী এক বর্ষারাতে আজ কি অবশেষে দুই হৃদয়ের স্বপ্ন একই চলার পথে মেশে? পুরুষ দেখে হরিণ মেয়ের স্নিগ্ধ বেতস তনু। আকাশ চোখে নারী দেখে ভরসার রামধনু। একটু দূরে পথের শেষে বাসগুমটির আলো – গলির ভেতর এধার-ওধার ছায়া কালো কালো। হঠাৎ স্তব্ধ পদধ্বনি, নিরালা এক ক্ষণে দু’টি শরীর এক হতে চায় তীব্র আলিঙ্গনে। ধকধক দুই হৃদযন্ত্র একই কথা বলে। ভালোবাসা উপছে পড়ে উষ্ণ চোখের জলে।

এবার ছাড়াছাড়ির পালা। কবে, বলো কবে হরিণ মেয়ে, আকাশ ছেলের আবার দেখা হবে? সেলফোন বের করে দেখে, জলের ধোঁয়ায় সাদা। ব্যাগ, পকেটের কাগজগুলোও নেতিয়ে যেন কাদা। দুষ্টু চোখে তাকিয়ে থেকে পরস্পরের দিকে এ-ওর হাতের পাতায় দিল সেল নাম্বার লিখে।

বাসে যে যার স্টপে নেমে গলির পথে হাঁটা। বুক হালকা, তবুও কিছু অস্বস্তির কাঁটা। ভালোবেসে কখনও কেউ আঘাত দিতে চায়? ভালোবাসলে কখনও সব সত্যি বলা যায়! চলে, চলে বাড়ির পথে, পথেরও নাই শেষ – খোয়াব ভাঙে, চারপাশে সেই আঁধার গলির দেশ!

আঁধার গলি, আঁধার গলি, বলো না তুমি কার? মুখে যাদের মিছরি হাসি, বুকে ছুরির ধার। হরিণ মেয়ে, আকাশ ছেলে দু’জনই আজ ঠিক বীরভোগ্যা তিলোত্তমার যোগ্য নাগরিক। অনেক হাবুডুবু খেয়ে সার বুঝেছে তারা – ফাঁসাও, নইলে ফাঁসো, এটাই এ জঙ্গলের ধারা! ছিপ ফেলে তাই বসে থাকে প্রেমের বালুচরে – সরল মুখের ইউ-এস-পি’তে সহজ শিকার ধরে।

দু-তিন দিনের ফ্যালফেলে প্রেম, নিরালা সব স্পট। মওকা বুঝে কাজটা হাসিল, তারপর চম্পট! আকাশ ছেলের অস্ত্র মোবাইল, অন্তরঙ্গ ফোটো। কিচাইন হলে দেখিয়ে চাকু পার্সটা খিঁচে ছোটো। হরিণ মেয়ের কাছে মজুত ড্রাগ মেশানো কোলা – নইলে স্প্রে-তে বেহুঁশ করে ভরিয়ে নেওয়া ঝোলা। কবির প্রিয় বর্ষাঋতু ওদের অফ-সিজন। আউটডোর প্রেম নেতিয়ে ছাড়ে বৃষ্টিভেজা দিন। সীট-ফিট সব ভিজে গোবর, মাঠঘাট থৈ থৈ। রেস্তরাঁতে রেস্ত খসে, প্রাইভেসিটাও কই! তবুও যদি হঠাৎ কোনও ছুটকো পাখি পায়, ভিক্টোরিয়ায় দাঁড়িয়ে ছিল তেমন দুরাশায়। মেঘের ছায়ায় সজল হাওয়ায় পিয়াসী প্রাণ কাঁদে। দুই শিকারিই পড়ল ধরা অথৈ চোখের ফাঁদে!

সত্যিকারের ভালোবাসা, এ কী বিষম দায়! নিয়ে নয়, মন কিছু দিয়ে ধন্য হতে চায়। ভালোবাসার সঙ্গীকে কি কষ্ট দেওয়া যায়? বুক ফাটলেও যায় না টানা আঁধার গলিটায়! কাজেই জানা, ঘণ্টা দুয়েই এই খেলাটার শেষ। অমৃতলোক থেকে আবার অন্ধকারের দেশ। স্প্রে আর ছুরি যেমন, তেমন রইল ব্যাগের নিচে। হাতের পাতায় লেখা দুটো নম্বর, সেও মিছে। ভোলো, ভোলো, তাকিয়ে বলো নিজের ছায়ার দিকে – অন্তত একবার তো তুমি ঠকাওনি সঙ্গীকে!

বর্ষা রাতের প্রেম কি তবু বললেই যায় ভোলা? ভালোবাসার কাঁঠাল আঠা, সহজে যায় তোলা! কী পেয়ে মন কী হারাল, হিসেব কষে চলে। নিশুত রাতে সময় পোড়ে, বুকে আগুন জ্বলে।

হরিণ মেয়ে, গভীর রাতে আমার বাড়ি এসো। আর কিছু নয়, অন্তত আজ আমায় ভালোবেসো। আজকে রাতে তোমার সাথে নিরুদ্দেশে যাবো। হরিণ মেয়ে, অন্তত আজ আমার কথা ভাবো!

আকাশ ছেলে, উষার আগে আমার বাড়ি এসো। কিছু না হয়, একটি বার আমায় ভালোবেসো। তোমার বুকে পরম সুখে সুদূর পাড়ি দেবো। আকাশ ছেলে, আজকে শুধু আমার কথা ভেবো।

ঘুমোয় ছেলে, ঘুমোয় মেয়ে – জাগুক না কল্পনা! রকেট যুগে একটি রাত, সময়টা অল্প না। কাল সকালে শুকনো আলোয় প্রেম-খোঁয়াড়ি কেটে বুকের জ্বালা নিভলে আগুন উঠবে জ্বলে পেটে। জঠরজ্বালা বড় জ্বালা, দেহে ছড়ায় তাপ। হাতের শিকার ছেড়ে দেওয়া ভুখার মহাপাপ। বুকের চিতা নিভলে পোড়ায় নিম্নাঙ্গের জ্বালা। অথ ইতি বর্ষা রাতের ঘণ্টা দুয়ের পালা।

ফেরা

মেয়েটা সোফার ওপর গা এলিয়ে পড়ে আছে, চোখ বোজা। চোখের কোণে কাজল ধেবড়ে রয়েছে। গালে সস্তার কসমেটিকসের চড়া প্রলেপ। দু-তিন প্রস্থ পলেস্তারা চাপিয়ে ব্রণর ক্ষত ঢেকেছে। ঠোঁটে লাল রঙের পুরু লিপস্টিক। হাঁ করা মুখের ওপর তিনটে নীল ডুমো মাছি ভন ভন করে উড়ছে। মাঝ রাত্তিরে হোটেলের এ সি ঘরে নীল ডুমো মাছি কোত্থেকে জুটলো কে জানে? শশাঙ্ক চান করতে যাবার আগেও দেখে গেছে আখাম্বা জগদম্বা হয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে ঢুকু ঢুকু চালাচ্ছে। শশাঙ্ক দু চুমুক দিয়েছে কী দেয়নি, মেয়েটা একাই প্রায় দেড় বোতল শেষ করেছে। মনে হচ্ছিল সারা পৃথিবীর তৃষ্ণা বুকের মধ্যে ভরে এনেছে। শশাঙ্কর ক্লান্ত লাগছিল। অনেকটা রাস্তা বর্ষা বাদলের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে এসেছে। মেয়েটাকে বসতে বলে বাথরুমে ঢুকেছিল।

phera
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

ঘন্টা হিসেবে পয়সা। মেয়েটা গ্লাস তুলে দেখিয়েছিল, “যাও সাব, আরামসে নহাও। আমি ততক্ষণ আমার গিলাস খতম করি।” আয়েস করে সোফার ওপর পা তুলে বসেছিল। দেখে মনে হচ্ছিল নিজেরই ঘর দোর। আগে হয় তো এসেছে অনেকবার। শশাঙ্কর অস্বস্তি লাগছিল। যে কোন হঠকারিতা জীবনে প্রথম বার করার সময় মনের মধ্যে একটা অশান্তি থেকেই যায়। মনে পড়ল সন্ধ্যেবেলা সুনীল বলছিল, “মুম্বইমে বারিষকা মজাহি কুছ ঔর হ্যায়!” বিকেল থেকেই ঝেঁকে ঝেঁকে বৃষ্টি হচ্ছিল। অনেক দিন পর আজ ক্লাবে সুনীলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শশাঙ্ক একা বোকা হয়ে একটা কোণের টেবিলে বসে ছিল। সুনীল এসে পিঠে হাত রাখলো, “ক্যায়সে হো দোস্ত?” সামনে চেয়ার টেনে বসে ওয়েটারকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। শশাঙ্ক খুশিই হল। বর্ষার জন্য ক্লাবে লোকজন কম। তাসের পার্টনাররা নেই। শশাঙ্কর মোবাইলে জল ঢুকে বন্ধ হয়ে গেছে। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। এতক্ষণ ভূতের মত চুপচাপ বসে ছিল। এখন দুটো কথা বলার লোক পাওয়া যাবে। হাত উলটে বলল, “ক্যায়সা মজা? দিনরাত জল ঝরছে। মনে হচ্ছে আসমানে পার্মানেন্ট ছেদ হয়ে গেছে।  থামবার নাম নেই। কোথাও বেরোনো যাচ্ছে না। মহা বোরিং।”

সুনীল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো, “হ্যাঁ, তা বটে।”

তারপর অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে  বলল, “বচ্‌পনকা দিন ভি ক্যা দিন থে! এই রকম বর্ষার দিনে একটা ছুঁড়িকে খুঁজে পেতে গাড়িতে তোলো আর সোজা খাণ্ডালা চলে যাও। হোটেল থেকে বেরোবার দরকার পড়বে না।” তারপর ছদ্ম বিষাদে গলা নামিয়ে বলল, “শাদি করে জিন্দেগি বরবাদ হয়ে গেছে দোস্ত। মৌজ মস্তি খতম। তেরা কেয়া হাল হ্যায়? ভাবী ক্যায়সি হ্যায়? সব ঠিকঠাক?”

দায়সারা মাথা নাড়লো শশাঙ্ক। শশাঙ্কর বৌ মীরা ছেলেটাকে বগলদাবা করে মায়কে চলে গেছে দিন দুয়েক আগে। ফোন ধরছে না। সম্পর্কটা মনে হচ্ছে দাঁড়াবে না। শশাঙ্ককে মীরার বাবার কোনদিনই তেমন পছন্দ নয়। নিমরাজি হয়ে বিয়েতে মত দিয়েছিলেন। তিনি পিছন থেকে মেয়েকে মদত দিচ্ছেন। বিয়ের সাত বছরও পুরো হয় নি। কথায় কথায় ঝগড়া-ঝাঁটি লেগেই থাকে। ক্লাবে এসে তাস খেলে টাইম পাস করা মীরার দু চক্ষের বিষ। এদিকে সন্ধের দিকটায় একবার ক্লাবে ঢুঁ না মারলে শশাঙ্কর শরীর আনচান করে। ক’দিন ধরেই মন কষাকষি, কথা কাটাকাটি চলছিল। গত পরশু ক্লাব থেকে ফিরে শশাঙ্ক দেখল ঘর অন্ধকার। মীরা খাবার টেবিলের ওপর একটা নোট ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে।

দু পেগ শেষ করে সুনীল উঠল, “চল্‌ দোস্ত আজ তুঝে পালঙ্কতোড় পান খিলায়েগা। তারপর ঘরে ফিরব।” পালঙ্কতোড় পান আবার কী বস্তু? বাপের জন্মে শোনেনি শশাঙ্ক। সুনীলকে জিজ্ঞেস করতে সে খানিকটা খ্যা খ্যা করে হাসল। তারপর শশাঙ্ককে টানতে টানতে গলির মধ্যে একটা পানের গুমটিতে ধরে নিয়ে গেল। অর্ডারি পানের একটা শশাঙ্কর হাতে গুঁজে দিয়ে আর একটা নিজে চিবোতে চিবোতে মিচকে হেসে বলল, “বাতানা কাল, ক্যায়সি লাগি। ঔর ভাবীকো জিয়াদা তং মত করনা।” শশাঙ্ক মনে মনে ভাবল, তং করার জন্য তো মানুষটাকে হাতের কাছে পাওয়া দরকার।

বিল্ডিঙে ঢোকার মুখে গাড়ি থামালো শশাঙ্ক। লোহার ভারী দরজাটা বন্ধ। ওয়াচম্যানেরও পাত্তা নেই। ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামল আবার। এই মুহূর্তে শশাঙ্কর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না ঘরে ফিরতে। প্রত্যেকবার তালা খুলে ঢোকার সময় মনে হয় ফাঁকা ঘরটা তাকে গিলে খেয়ে নেবে। ভয় করে, সে আর ঘরটা ছেড়ে বেরোতে পারবে না। শশাঙ্ক গাড়ি ঘোরালো। আজ একটা পাপ করলে কেমন হয়? পালঙ্কতোড় পানের মাদক রস তার রক্তে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে। চৈতন্যকে অবশ করে দিচ্ছে। কেউ জানবে না সে কোথায় যাচ্ছে। শশাঙ্ক হাইওয়ের দিকে গাড়ির মুখ ঘোরালো।  একটু কষ্ট করে জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালে দেখতো তার ঘরের জানলায় আলো জ্বলছে। মীরা ফিরে এসেছে। উদ্বিগ্ন হয়ে বার বার ঘড়ি দেখছে। পাঁচ বছরের ছেলেটাকে বলছে, “কখন যে তোর বাপ ফিরবে? মোবাইলটা স্যুইচ অফ। কোন জাহান্নমে আছে কে জানে?”

হাইওয়ের মুখেই সাজুগুজু করে মেয়েগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। পিছনে গাড়ি সারাইয়ের দোকানে টিম টিম করে হলুদ আলো জ্বলে। আজ বর্ষার রাত্তিরে, জলে কাদায় চত্বরটা ফাঁকা। একটু এগোতে মেয়েটাকে চোখে পড়ল। অন্ধকারে একা একা দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে জানলার কাঁচ নামাতেই ঝুঁকে এলো। বিড়বিড় করে ঘন্টার হিসেবটা জানিয়ে দিল। আগামের টাকাটাও। শশাঙ্ক পার্স খুলে টাকাটা বাড়িয়ে ধরে মেয়েটাকে বলল গাড়িতে উঠে আসতে। মেয়েটা হাত নেড়ে কাউকে ডাকল। একটা সিড়িঙ্গে মত লোক এসে মেয়েটার পিছনে দাঁড়ালো। কাছাকাছি কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল নিশ্চয়। এতক্ষণ নজরে আসে নি। মেয়েটা লোকটার হাতে টাকা কটা গুঁজে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসল, “চলো সাব। কিধার লেকে যাওগে?” পাপ করা এত সহজ শশাঙ্ক কল্পনাও করতে পারে নি।

একটা বোতলে এখনও কিছুটা তলানি রয়েছে। মেয়েটার গ্লাসও খালি নয়। ঘুমিয়ে পড়ল নাকি? শশাঙ্ক মেয়েটার নাম জানে না। জিজ্ঞেস করে নি। করে লাভ নেই। একটা বানানো নাম বলে দিত। পরে সেই নামে ডাকলে সাড়া দিত না। খাণ্ডালা ঘাটের এই হোটেলটা হাইওয়ে থেকে একটু ভেতরে। থাকার বন্দোবস্ত মন্দ নয়। বাথরুমে গরম জলের ব্যবস্থা আছে। এসে পৌঁছোনোর পর দু বোতল পানীয় আর অল্পস্বল্প কিছু নাস্তার অর্ডার করেছিল শশাঙ্ক। মেয়েটা একাই সেগুলো সাবাড় করেছে। এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। শশাঙ্ক মেয়েটার কাঁধে মৃদু ঠেলা দিয়ে ডাকল। মেয়েটা সোফার ওপরই কেত্‌রে পড়ল।

একটা ভয় শশাঙ্কর মেরুদণ্ড বেয়ে হিম হয়ে নেমে গেল। সে মেয়েটার নাকের কাছে হাত নিল। নিঃশ্বাসের অনুভব পেল না। মেয়েটা নিথর হয়ে পড়ে আছে। একটু সময় লাগলেও শশাঙ্ক বুঝলো মেয়েটা মরে গেছে। শশাঙ্ক যখন বাথরুমে ছিল তখন কি কেউ ঘরে এসেছিল? অথবা মেয়েটা হয় তো আগে থেকেই অসুস্থ ছিল। কেন মরেছে, কীভাবে মরেছে সেটা বড় কথা নয়। ব্যাপার হল যে সে খাণ্ডালা ঘাটের একটা অজানা অচেনা হোটেলে মাঝ রাত্তিরে একটা অপরিচিত মেয়ের প্রাণহীন শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নাম জানা দূরে থাক, মেয়েটাকে সে সন্ধ্যের আগে চোখে পর্যন্ত দেখে নি। শশাঙ্ক চিন্তা করতে পারছিল না। জানাজানি, থানা পুলিশ হবেই। তার আগে এই ঘরটা ছেড়ে পালাতে হবে। শশাঙ্ক টলটলে পায়ে গিয়ে দরজার নব ঘুরিয়ে টান দিল। দরজা খুলল না। ভারি প্লাইউডের দরজা বাইরে থেকে লক্‌ড।

ঘরের সঙ্গে লাগা একটা ছোট্ট ব্যালকনি ছিল না? শশাঙ্ক এগোলো। ব্যালকনিতে যাবার কাঁচের দরজাটা একটানে খুলে বাইরে এলো। এখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। এটা হোটেলের পিছন দিক। প্রায় তিরিশ ফুট নীচে একটা ঘাসের লন। সংকটে পড়লে মানুষ কী না করতে পারে? ব্যালকনির পাশ ঘেঁসে একটা জলের পাইপ নেমে গেছে। শশাঙ্ক তার ওপর পা রাখলো। ঘসা লেগে তার কনুই হাত ছড়ে যাচ্ছে। জামায় দেওয়ালে জমে থাকা ভিজে শ্যাওলা উঠে আসছে। নীচে ঘাসে পা রাখতেই গোড়ালি অব্দি কাদায় ডুবে গেল। গাড়িটা হোটেলের সামনে পার্ক করা আছে। শশাঙ্ক সাবধানে এগোলো। পা টিপে টিপে পোর্টিকো পেরিয়ে যাবার সময় দেখলো হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারে সেই সিড়িঙ্গে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারে কথা বলছে। হাইওয়েতে মেয়েটার পিছনে ছায়ার মত এসে দাঁড়িয়েছিল। লোকটা এখানে কী করছে? হোটেলের খাতায় শশাঙ্ক নিজের নাম দেয়নি। কী মনে করে নাম লিখেছিল – সুনীল। মোবাইল নম্বরটাও সুনীলের। সঙ্গিনীটিকে দেখে কাউন্টারের লোকটা বেশি কিছু জিজ্ঞেস করেনি। শশাঙ্ক গাড়িতে স্টার্ট দিল। সে উইণ্ডস্ক্রীনের মধ্যে দিয়ে দেখতে পাচ্ছে শব্দ পেয়ে লোকটা পিছন ফিরল। খাড়া নাকের ওপর তার জ্বলজ্বলে ধূর্ত চোখে অস্থিরতা। শশাঙ্ক আর দেরি করল না। দ্রুত ইউ টার্ণ নিয়ে রাস্তায় উঠলো। একটু এগোলেই পুণে-মুম্বই পুরোন হাইওয়ে। হোটেলটা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে। শশাঙ্ক এক্সেলেটরে পায়ের চাপ বাড়ালো।

হাইওয়েতে পড়ে আট দশ কিলোমিটার যাবার পর শশাঙ্ক বুঝলো প্রথমবার পাপ করার জন্য সে ভুল সন্ধ্যে বেছেছিল। গাড়িটা দুবার নৌকোর মত দুলে থেমে গেল। অন্য সময় হলে বনেট খুলে হাত পা মারত। কিন্তু এখন এই মানসিক অবস্থায়, মাঝরাতে ঝড় জলের মধ্যে সে চেষ্টা করা বোকামি। তাছাড়া যে লোকটা মুম্বই থেকে খাণ্ডালা ধাওয়া করে এসেছে সে এত সহজে তার পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না। শশাঙ্ক গাড়ি ছেড়ে রাস্তার ধার ঘেঁসে দাঁড়ালো। দূরপাল্লার ট্রাক পেরিয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা। তিন নম্বর ট্রাকটা তার হাত নাড়া দেখে থামল। শশাঙ্ক ড্রাইভারের পাশে উঠে বসল। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে জিজ্ঞেস করল, “এই ভূতিয়া যায়গাটায় কী করছিলে সাহাবজি?”

শশাঙ্ক একটু অবাক হল। “গাড়ি বন্ধ্‌ পড় গয়া। কিন্ত ভাইসাব, ভূতিয়া কেন?”

ড্রাইভার বলল যারা এই রাস্তায় গাড়ি চালায় সবাই জানে এই যায়গাটায় প্রায়ই একটা অশরীরী গাড়ি থামানোর জন্য হাইওয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে। কোন ড্রাইভার গাড়ি থামায় না। তার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়। সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। শশাঙ্কর কৌতূহল হল, “তাহলে আমার জন্য দাঁড়ালে কেন?”

ড্রাইভার চোখ মট্‌কে বলল, “ভূতে কি ঘড়ি পরে? তোমার হাতঘড়িটা হেডলাইটের আলোয় ঝলসে উঠলো। তাই থামালাম।”

শশাঙ্ক একটু থেমে ঘড়িটা হাত থেকে খুলে দিল, “শুক্রিয়া ভাইসাব। আপ ইসে রাখ লো।”

“আরে নেহি নেহি সাহাবজি…” বলতে বলতে ড্রাইভার কনুইয়ের খোঁচা মেরে শশাঙ্ককে দেখালো একটা অস্পষ্ট অবয়ব রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। গাড়ি থামাতে বলছে। ওয়াইপারের চলাচলের মধ্যে দিয়ে শশাঙ্ক দেখল সেই সিড়িঙ্গে লোকটা – খাড়া নাক, ধূর্ত চোখ। ও নিশ্চয়ই জানে ট্রাকে শশাঙ্ক রয়েছে। হয় তো ফলো করছিল। ড্রাইভার বিন্দুমাত্র গতি না কমিয়ে ট্রাকটাকে হাইওয়ের ওপর উড়িয়ে দিল। একটা ধাক্কা, ভোঁতা শব্দ। ড্রাইভার নিজেও কিছুটা অবাক হল। কিন্তু ট্রাক থামালো না। শশাঙ্ক লম্বা করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তে শশাঙ্কর পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠলো। জল শুকিয়ে মোবাইলটা আবার আপনা থেকেই চালু হয়ে গেছে। মীরা ফোন করছে। তার গলায় উৎকণ্ঠা, “কোথায় তুমি। ঘরে ফেরোনি কেন? মোবাইলটাও স্যুইচ অফ। আমরা ভেবে ভেবে অস্থির।”

শশাঙ্কর চোখ ফেটে জল এল, “তোমরা ফিরে এসেছো? পুণে গিয়েছিলাম, অফিসের কাজে। গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। ঘন্টা খানেকের মধ্যে ফিরছি। চিন্তা কোরো না।”

বাকিটা ব্যক্তিগত

রঙীন,

আজ তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম। বহু-বহুদিন পর। আমি তোমাকে ভুলিনি যদিও। মাঝে মাঝেই, অফিসের কাজের ফাঁকে ফেসবুকে বন্ধুদের কমেন্টের ভিড়ে তোমার মুখটা উঁকি দিয়ে যায়। তুমি বোধহয় জোর করেই আমাকে ভুলে গেছ, একদিন দেখলাম ফেসবুক থেকে আমাকে বাদ দিয়ে দিয়েছ। কেন গো, কী করেছিলাম আমি? তোমাকে ভাল লাগে, সেটা বোকার মত প্রকাশ করে ফেলেছিলাম শুধু। আর তো কিছু করিনি। তাতেই কি তুমি…?

আজ খুব পুরনো কথা মনে পড়ছে, জানো। অফিসে এসে কাজ করতে না পেরে নোটপ্যাড খুলে পাগলের মত লিখে যাচ্ছি – এই চিঠি – যা কোনোদিন তোমাকে পাঠাবো না। মনে আছে, একটা গোটা শীত দুজনে একসঙ্গে কাটিয়েছিলাম, বরফের শহরে। একে অপরের সান্নিধ্যে উষ্ণতা আদান প্রদান করেছিলাম। বড় ভাল কেটেছিল সেই দিনগুলো, তোমার সাথে দেখা হওয়ার পরের দিনগুলো। কী করে প্রথম দেখা হয়েছিল জানো? সেটাই তোমাকে বলিনি কোনোদিন, লজ্জায়। দুর্গাপুজোর আগে একদিন অফিস যাওয়ার জন্যে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ তোমাকে চোখে পড়েছিল। একই বাসে উঠেছিলাম দুজনে। তুমি উঠেই কানে ইয়ারফোন গুঁজে বই খুলে বসেছিলে। আমি একটু দূরে বসে তোমায় দেখছিলাম। মানে, বেশ নির্লজ্জের মতই দেখছিলাম। ভাগ্যিস ওটা দেশ ছিল না, নইলে নির্ঘাত কেউ বুঝে ফেলত। বিদেশে ওসব কেউ লক্ষ্য করে না। তোমার ঝোঁকানো মাথাটা পাশ থেকে দেখছিলাম। আসন্ন শীতের মেঘলা আলোছায়াতে তোমার টিকোলো নাকটা আরো প্রখর, আরো দৃপ্ত দেখাচ্ছিল। একটু বড়, টানা চোখে কীরকম একটা উদাসীনতা মাখিয়ে ঠোঁটদুটো চেপে তুমি একমনে বই পড়ে যাচ্ছিলে। নিজের স্টপে নামার জন্যে যখন উঠে দাঁড়ালে, লম্বা দোহারা শরীরটা প্রায় বাসের মাথায় ঠেকে যাচ্ছিল। আমাকে প্রায় মাথা তুলে তোমায় দেখতে হল। তুমি কিন্তু একবারও আশেপাশে তাকাওনি, অর্জুনের লক্ষ্যভেদের মত বাসের দরজাটা দেখছিলে। আর তোমার চোখদুটো আমায় টানছিল। ভীষণভাবে টানছিল। কী মায়াবী অথচ উদাসীন দুটো চোখ। যেন অযুত ভালবাসা জমিয়ে রেখেছ নিজের ভেতর কিন্তু বিলিয়ে দেওয়ার মত কাউকে পাচ্ছ না। আমি সম্মোহিতের মত তোমার দিকে চেয়ে ছিলাম লোকলজ্জা বিসর্জন দিয়ে। তোমার চেহারাটা, চোখদুটো প্রায় আমার মনে গেঁথে যাচ্ছিল, কেউ যেন কেটেকুঁদে বসিয়ে দিচ্ছিল আমার মনের দেওয়ালে।

তারপর থেকে প্রত্যেকদিন বাস স্টপে তোমাকে দেখার আশায় থাকতাম, যেন স্কুল-কলেজের দিনগুলো ফিরে এসেছিল। কিন্তু আর একদিনও দেখা পাইনি। দুর্গাপুজোর দিন বাঙালি সহকর্মীদের সাথে একটা ঢাউস ইশকুলে গিয়ে অঞ্জলির লাইনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ স্থানুবৎ হয়ে গেলাম…তোমাকে দেখে। বিশ্বাস করো, দু-এক মুহুর্তের জন্যে হৃৎপিন্ড থমকে গেছিল। তুমি একদিকে বসে একদৃষ্টিতে মা দুর্গার দিকে তাকিয়ে ছিলে কীরকম সমাধিস্থভাবে, অঞ্জলি দাওনি বাকি পাঁচজনের মত। আমার খুব ইচ্ছে করছিল তোমার সাথে একবার কথা বলার, তোমার গলার আওয়াজ শোনার, তোমার নামটা জানার; সুযোগের অপেক্ষায় উশখুশ করছিলাম। ভাগ্যক্রমে আমার এক সিনিয়ার সহকর্মী তোমাকে চিনতেন, তিনি নিয়ে গিয়ে আমাদের সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। দুজনের কম্প্যানি আলাদা হলেও একই টেকপার্কে অফিস জেনে মনে মনে আনন্দে লাফাচ্ছিলাম। সেদিনই প্রথমবার তোমার নামটা শুনলাম – রঙীন। লাল-নীল-সবুজ নয়, পুরোটা রঙীন। চেনাজানা লোকেরা অবশ্য বলছিল রঙীনের চেয়ে সাদা-কালো নামটা তোমায় বেশি মানায়। তুমি নাকি গম্ভীর, রাগী, চুপচাপ, অমিশুক, চাপা, ইত্যাদি। আমি ওসবে কান দিইনি, বরঞ্চ তোমাকে একটু কাল্টিভেট করতে চেয়েছিলাম। মনে আছে, কদিন পর বিজয়া সম্মিলনীর দিন তোমার ফোন নম্বর চাইলাম? উফ, সে যে মনে মনে আমাকে কতটা সাহস জোগাতে হয়েছিল তুমি যদি জানতে! সটান গিয়ে বললাম, ‘হাই! পুজোর দিন সেই যে আলাপ হল, চিনতে পারছ? তোমার নম্বরটা পেতে পারি? আমরা তো একই কমপ্লেক্সে কাজ করি, কখনো দেখা হতে পারে।’ তুমি নিশ্চয়ই আশা করোনি আমি সোজা গিয়ে এরকম বলব, তাই বোধহয় ঘাবড়ে গিয়ে নম্বরটা দিয়েই দিয়েছিলে।

ফেসবুকে বিজয়া সম্মিলনীর একই ছবিতে কে যেন আমাদের দুজনকেই ট্যাগ করেছিল। ব্যাস, আমিও মওকা দেখে তোমাকে বন্ধুত্বের আহ্বান পাঠিয়ে দিলাম। মাঝে মাঝে টুকটাক হাই-হ্যালো চলছিল। কাজের চাপে তুমি কিনা জানিনা, তবে আমি বেশ কয়েকদিন জর্জরিত ছিলাম। তোমার খোঁজ নেওয়ার সময় পাইনি। তারপর একদিন তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হল, তোমার গলার আওয়াজটা – একটু ভারী, চাপা – শুনতে খুব ইচ্ছে হল। ফোন করে লাঞ্চের অ্যাপো করলাম। তুমি একবারেই রাজি হয়ে যাবে ভাবিনি জানো, আমিই একটু অবাক হয়ে গেছিলাম। লাঞ্চে গিয়ে বুকটা একটু দুরুদুরু করছিল, তুমি কী ভাববে, কী বলবে, সেসব ভেবে। তবে দেখলাম, লোকে বেশ ভুল বলে। তোমার সঙ্গে কী সহজেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। গল্প করতে করতে লাঞ্চের ঘড়ি পেরিয়ে বিকেল অব্দি চলে যাচ্ছিল প্রায়। আমি বোধহয় তোমার মুষ্টিমেয় বাঙালী বন্ধুদের একজন ছিলাম, না? তোমার তো অবশ্য বন্ধুসংখ্যাই গুটিকয় ছিল। চাপা স্বভাবের মানুষ, বেশি কথা বলতে পছন্দ করো না, বাজে কথা একটাও বলো না, নিজের সম্পর্কে খুউব কম কথা বলো – এরকম লোকের ‘বাঙালী’ বন্ধু থাকা বেশ চাপের। কন্সট্যান্ট বকবক না করে গেলে আর আড্ডা কীসের? আমরা দুজন অবশ্য এই নিয়মের খানিকটা বিপরীত স্বভাবের। মনে আছে, প্রায় রোজই এক বাসে বাড়ি ফিরতাম? মানে, যেদিন দুজনের ফেরার সময় কাছাকাছি হত, একে অপরের কাজ শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতাম, তারপর বাস ধরে যে যার বাড়ি।

ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী
ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

আলাপ পর্বের মাঝেই ঝুপ করে শীতটা এসে গেছিল। যেদিন প্রথম বরফ পড়ল, হাঁ করে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে গায়ে মাথায় বরফ মাখছিলাম। ঠিক মনে হচ্ছিল কেউ ঠান্ডা পেঁজা তুলো দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে। আর তুমি বাস স্টপে শেডের নীচে বসে হাসছিলে। বিশ্বাস করো, সে একটা দারুণ হাসি ছিল – মৃদু, অথচ স্পষ্ট, স্নেহময় – শুধু ঠোঁটে নয়, পুরো চোখেমুখে হাসি খেলা করছিল, যেন আমার কান্ড দেখে তুমি খুব মজা পাচ্ছিলে। কদিন পরে অফিসের সামনে ব্ল্যাক আইসের ওপর পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম, ভাগ্যিস তুমি হাতটা ধরেছিলে। খুব ভাল লেগেছিল, জানো। ভরসা পেয়েছিলাম অনেকটা। শক্ত করে হাতে হাত ধরে বাকি পথটা পেরিয়েছিলাম। সেদিন মনে হয়েছিল যে তুমি আমাকে বন্ধু বলে মেনে নিয়েছ। তোমার চারপাশে গড়ে তোলা দেওয়ালের একটা হলেও ইঁট খসাতে পেরেছি আমি। যদিও বহু চেষ্টা করেও তোমার জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানতে পারিনি। নিবাস কলকাতা, পরিবার বলতে বাবা-মা আর চাকরি – এই পর্যন্তই বলেছিলে। কীসের যে তোমার এত নির্লিপ্তি, কেনই বা তুমি সবার থেকে আলাদা থাকো, কার জন্যে তুমি এত উদাসীন, সেসব কিছুই আমি জানতে পারিনি, রঙীন। ভেবেছিলাম আরেকটু সময়ে একসঙ্গে কাটালে হয়ত জানতে পারব। শহরে বরফ থাকলেও তোমার ভেতরের বরফ যে একটু একটু করে গলছিল সেটা বুঝতে পারছিলাম। এক সন্ধ্যায় তোমার কোথায় একটা পার্টি ছিল বলেছিলে। আমি রাত্রে খেয়ে উঠে শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে সিনেমা দেখছিলাম, তখন রাত্রি বারোটা হবে। বাইরে হু হু ঠান্ডা, বরফ পড়ছিল একটু একটু। হঠাৎ তুমি ফোন করে বললে আমার ফ্ল্যাটের সামনে গাড়িতে বসে আছ। অত রাত্রে, সত্যি বলতে কী, একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। আরো অদ্ভুত, তুমি বললে কোনো কারণে একটু ডিস্টার্বড আছ, আমি কি তোমার সঙ্গে একটু হাঁটতে যাব। অত ঠান্ডায় হাঁটাহাঁটির ইচ্ছে না থাকলেও তোমার গলায় একটা হালকা আর্তি শুনে নেমে এসেছিলাম।

কারণটা আমি আজও জানতে পারিনি, তুমি সেদিন বলোনি। তবে যাই হোক না কেন, মাঝরাত্রের সেই অদ্ভুত শীতার্ত পথচারিতা আমার চিরদিন মনে থাকবে। থোকা থোকা তাজা বরফের ওপর নীরবে, আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম দুজনে। তুমি শুধু বলেছিলে, ‘কী হয়েছে আমাকে জিজ্ঞ্যেস করো না প্লিজ। কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটতে চাই, মনে হল তোমার চেয়ে ভাল সঙ্গী আর কেউ হবে না।’ আমি যথারীতি দু একবার পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম, সেই দেখে তুমি আবার আমার হাত ধরেছিলে, শক্ত করে অথচ পরম মমতায়। সেই রাত্রে কেউ আমাদের দেখলে ভাবত আমরা হয়ত সারাজীবনের পথ একসঙ্গে পার করব। কিন্তু তা তো হল না। তুমি যে কী ভাবতে, কী করতে, আমি কখনো বুঝতে পারিনি। ওই হণ্টনপর্বের পর কয়েকদিন তুমি একেবারে গায়েব ছিলে।  অফিস যাওয়া-আসার সময় বদলে ফেলেছিলে, হয়ত আমাকে অ্যাভয়েড করতে। বেশ কবার ফোন করলেও ধরোনি। প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি অসুস্থ হয়ত, কিন্তু তারপর দেখলাম দিব্যি ফেসবুক করছ অন্যদের সাথে। আমিও আহত বোধ করে আর ফোন করিনি অনেকদিন। আশ্চর্য্যভাবে তুমিও চুপচাপ ছিলে। একদিন ফেসবুকে অনলাইন দেখে ‘হাই’ বললাম, তুমি উত্তর দিলে, কিন্তু ওই ‘হ্যালো’ অব্দিই। কী অদ্ভুত, না?

এই জন্যেই অবাক হয়েছিলাম যখন তুমি ফোন করে ডিনারে ডাকলে, তাও তোমার বাড়িতে! ওখানকার লোকেদের মধ্যে কাউকেই বোধহয় তার আগে তোমার বাড়িতে ডাকোনি। আমি অনেকটা খুশি আর একটু অবাক হয়েছিলাম। মনে মনে অনেক কিছু ভেবে নিয়েছিলাম, হয়ত সেটাই তোমার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্কের সূত্রপাত হতে পারত। সেই সন্ধ্যায় আমি একটু সেজেগুজেই গেছিলাম তোমার বাড়ি। হয়ত একটু বেশিই সেজে ফেলেছিলাম। তুমি দরজা খুলে আমাকে দেখে একটু চমকে গেছিলে, কী জানি একটু খুশিই হয়েছিলে কিনা। না বোধহয়, তাই না? কত কী রান্না করেছিলে আমার জন্যে। তখনও বুঝিনি কেন অত ঘটা করে ডেকেছিলে। বোকার মত ভেবেছিলাম হয়ত আমার জন্যেই অত আয়োজন করেছিলে, নিজের হাতে এটা সেটা রান্না করে। অত খাওয়া আর আড্ডার পরে বসে কফি খেতে খেতে তুমি বোমাটা ফেলেছিলে, একেবারে আমার মাথা ওপর। বলেছিলে তোমার এনগেজমেন্টের কথা। হ্যাঁ, আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই মুহুর্তটা। কলকাতায় তোমার বাগদত্তা আছে জেনে আমি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে ছিলাম। আমার চোখেমুখে আঘাতটা বোধহয় একেবারেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। তুমি একটু ইতস্তত করে আমার হাতের ওপর হাতটা রেখেছিলে। আর আমি তোমার সামনে অশ্রু বিসর্জনের ভয়ে নিজেকে এক্সকিউজ করে বাথরুমে চলে গেছিলাম। কয়েক মিনিটে নিজেকে সামলে এসে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছিলাম। সেদিন আঘাতটা খুব কড়া দিয়েছিলে, রঙীন। অত ভণিতা করে ডেকে খাইয়ে না বলে সোজাসুজি জানিয়ে দিতে পারতে। কিম্বা হয়ত পারতে না, তাই একটা মেকি ডিনার সাজিয়েছিলে। তোমার উদ্দেশ্য কিন্তু সফল হয়েছিল। আমি তোমার থেকে অনেক দূরে সরে গেছিলাম। বোকা ছিলাম হয়ত। হ্যাঁ, বোকা ছিলাম নিশ্চিত।

এখন ভাবলে বুঝি, রঙীন, কেন তুমি আমাকে আঘাত দিয়েছিলে, কেন দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে। ছোট গল্পেই শেষ করে দিয়েছিলে যাতে তোমার-আমার ব্যাপারটা উপন্যাস অব্দি না গড়াতে পারে। বুঝি, সবই। তবে এখন, এই যা। তখন বুঝলে হয়ত তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিতে পারতে। তোমার মনের দেওয়ালের যে ইঁটটুকু আমি খসিয়েছিলাম, সেটা তুমি নিপুণভাবে আবার জোড়া লাগিয়ে দিলে। এখন ভাবলে কষ্ট হয়, জানো।

আচ্ছা, অন্য কেউ কি আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে মাঝরাত্রে বরফের ওপর নিস্তব্ধে হেঁটেছে? উত্তরটা আমি জানি।

~ ইতি

গল্প প্রতিযোগিতা ফলাফল

Galpo Protijogita Result - Small

অপেক্ষা শেষ, ও কলকাতা আয়োজিত প্রথম গল্প প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হল –

১। মৌমিতা বিশ্বাস – পরিচয় 

২। নীলাঞ্জন ব্যানার্জি – পৌরুষ

৩। অনিরুদ্ধ সেন – ঘণ্টা দুয়ের পালা

৪। সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় – ফেরা

প্রথম ৪ প্রতিযোগীর জন্য রইল ওকলকাতার পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।  আপনাদের প্রাপ্য পুরষ্কার গুলি খুব শিগগিরই আপনাদের কাছে পৌঁছে যাবে।

ইয়া দেভি

২০১৫ অক্টোবর। শ্রী আবার দার্জিলিং এসেছে। এই নিয়ে কতবার হল? আগে বছরে একবার আসা প্রায় বাঁধাই ছিল। কখনও কখনও বা দু’বার? কোন ঠিক ঠিকানা নেই, হিসেব নেই।

শ্রী’র কাছে দার্জিলিং মানেই প্রেম, প্রেম মানেই দার্জিলিং। সেই কোন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আইসক্রিম খাওয়া থেকে শুরু করে নতুন প্রেমিকের কাঁধে মাথা রেখে পথ চলা অবধি দার্জিলিং মিশে আছে অগুনতি ভালো লাগায়। কখনও হট চকোলেটের চুমুকে, কখনও প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যে বোর্বনের উষ্ণতায়। কখনও মেঘলা অভিমানে, কখনও ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘায়। শ্রী’র দার্জিলিং কখনও শেষ হয় না। এবারে যদিও সে এসেছে এক্কেবারে একা – তাও একটা কাজে। তবু জমিয়ে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে। কবি সাহিত্যিকরা কত লিখেছেন, শীত হল একাকীত্ব আর প্রেম উষ্ণতা। শ্রীর কাছে দার্জিলিং হল দুয়ের জমজমাট ককটেল। নিজেকে হারান, আবার নতুন খুঁজে পাওয়া। বয়সের সাথে সাথে প্রেমটা খুব দরকার।

এবারেও চাইলে যে সঙ্গে কোন না কোনও একজন প্রেমিককে সঙ্গে করে আনা যেত না তা কিন্তু নয়। একবার ঈশারা করলে অনেকেই রাজী হয়ে যেত। শ্রীর আশেপাশে প্রেমিকের একটা প্রচ্ছন্ন ভিড় লেগেই থাকে – অফিসে কলিগ হোক বা বস, পাড়ায় পথচলতি আলাপ হোক বা জিমে। কখনও লাইব্রেরীতে। এটা শ্রী সব সময়েই উপভোগ করে। ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে হেসেও ফেলে – একরকম মাতাল আর বে-হিসেবী বরটাকে সে আজকাল আর প্রেমিকের দলে ধরে না। যদিও পুষ্কর এমনিতে খুব গুনি ছেলে, কিন্তু ওরা রাগের কাছে দুনিয়া ঠাণ্ডা। আজকাল অবশ্য দুজনেই দুজনকে প্রচুর স্পেস দিয়ে চলে। দুনিয়ার অনেক রকম নিয়ম বদলাচ্ছে। বিয়ের রীতিনীতি এক থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর ইকুয়েশনটা অনেকটাই অন্যরকম। এই যে শ্রী একা একা যাচ্ছে, মা কি কখনও চাইলেও তা করতে পারত?

এবারে সে হোটেল বা গেস্ট হাউসে থাকবে না। অনেকেই এখন পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে হোম স্টে করছে। তাই যাওয়ার সময়টা ঠিক হতেই শ্রী সেদিন কাউচ সার্ফিং করা শুরু করেছে। তখন নতুন একটা ছেলে এসে মিষ্টি করে বলল – ‘একা যাচ্ছেন নাকি?’ শ্রী এক ঝলক তাকিয়ে দেখল ছেলেটা বেশ হ্যান্ড-সাম। চেহারায় একটা ঝকঝকে ভাব আছে।

‘একা কোথায়?’, শ্রীও হেসে শেরিল স্ট্যায়েডের ‘ওয়াইল্ড’ বইটা এগিয়ে দিয়েছিল।

ছেলেটা বইটা তুলে এক ঝলক দেখে বলল, ‘হাউ ওয়াইল্ড ইট ওয়াজ টু লেট ইট বি। শেরিল তো চুরানব্বই দিনের জন্য গেছিল, আপনি কদ্দিন?’

‘ট্রাস্ট মি – ভেরি ভেরি ওয়াইল্ড। তোমার নাম কি?’

‘অচিন্ত্য।’

‘নতুন এসেছ?’

‘হ্যাঁ’

‘এসেই সিনিয়রের সঙ্গে ফ্লার্ট করছ?’

‘জুনিয়ার ভাবলে ফ্লার্ট করছি না – এমনিই কথা বলছি। আর শেরিল নিজেও তো একা ছিল না – ছিল কি? ধরে নাও আমি গ্রেগ’

ইয়া দেভি
ইয়া দেভি

ভ্যানেসার বাড়িতে উঠে বিছানায় এলিয়ে পড়তে অচিন্ত্যর মুখটা মনে পড়ল শ্রী’র। ওর নামের মানে টা কি? শিব মনে হয়। জিজ্ঞেস করা হয় নি। চাইলে অচিন্ত্যই কি চলে আসত না?

‘কিরকম হবে যদি আমি নিজেকে ক্ষমা করে দিই? যদি আমি এমন কিছু করে থাকি যা আমার করা উচিত ছিল না? আমি যদি কাউকে ঠকিয়েও থাকি? যার জন্য হয়তো কোন অজুহাতই যথেষ্ট নয়, কিন্তু তাও শুধু নিজের ইচ্ছেয় এরকম করে থাকি, তখন?’ শেরিলের এক একটা কথা বড্ড মাথার মধ্যে বাজছে। বইটা বন্ধ করে এক কাপ চা চাইল ভ্যানেসার কাছে – একটা শিক্ষিত ঝকঝকে মেয়ে – ইস্কুল শেষ করে এখন দিব্যি হলিডে হোম চালাচ্ছে। ইন্টারনেট কত কি সহজ করে দিয়েছে। কত টুরিস্ট আনছে।

‘ম্যাল কত দূরে বল তো?’
‘এ বাবা – ম্যাল আর দূরে কোথায়? ঐ – তো দেখা যাচ্ছে’ বাড়ির পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ডানদিক দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। ‘দেখতে পাচ্ছ না? ঐ যে ক্যাভেন্টার্সের ছাতাগুলো দেখা যাচ্ছে যে’

চায়ের পর অনেকটা ক্লান্তি দূর হয়েছে। পিঙ্ক টপ আর সবুজ ট্রাউজারের সঙ্গে মাথায় একটা সাদা উলেন টুপি আর ডেনিম জ্যাকেট চড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্রী। প্রাইমারি কালার ওর খুব ভালো লাগে – পুষ্করের লাগে না। এই নিয়ে আগে কত কথা কাটাকাটি হয়েছে। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগে শেরিল, একটা জলের বোতল আর একটা স্কেচ-বুক। শ্রী যদিও খুব একটা ভালো ছবি আঁকতে পারে না – তবু তার আঁকতে ভীষণ ইচ্ছে করে। কখনও পেন্সিল, কখনও চারকোল। আঁকতে গিয়ে হাতে ভুসোকালি। এবারের ছুটিতে সে যা খুশি করবে। সারাটা দিন একা একা ঘুরে কেটে গেল। মাঝখানে একটা অল্পবয়সী মারাঠি ছেলের এসে আলাপ করল, ‘হাই, আমি অর্জুন।’
‘শ্রী’
‘একা একা ঘুরছ দেখে মনে হল – আমরা কি আর এক কাপ কফি খেতে পারি?’
‘শিওর – তুমিও একা বুঝি?’
‘হ্যাঁ – এক্কেবারে হ্যাপি গো লাকি – পাহাড় আমাকে খুব টানে। এদিক ওদিক মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি।’
‘আর মুম্বাই?’
অনেকদিন শ্রী মুম্বাই যায় নি। নতুন সিনেমা, নতুন ফ্যাশন এইসব নিয়ে অর্জুন কার্লেকারের সাথে কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় কেটে গেল। এর মধ্যে বাড়ি থেকে ফোন। একবার তো বসের মেসেজ – ‘ডেড-লাইন মনে আছে তো?’ শ্রী রিপ্লাই করল, ‘উঁহু’। ছুটির মজাটা মাটি করতে কিছু লোক এক্কেবারে ওস্তাদ।

পুরনো ইস্কুলের পাড়া, তিব্বতি মুখোশের দোকান, লতানে গোলাপ দেখতে দেখতে শ্রী ভাবছিল – এখানে আর কটা দিন থেকে গেল হত না? আবার সোমবার সকালেই এই পাহাড় থেকে নামতে হবে? আবার সেই ধুলো, ধোঁয়া, ট্রাফিক, কলকাতা। হাঁপিয়ে ওঠা। দুটো ঘোড়াকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হল একটা স্কেচ করে ফেলে। কিন্তু করা গেল না। পাহাড়ে, জঙ্গলে একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছে শ্রী – সন্ধ্যেটা নামে যেন ঝুপ করে। একটা বাচ্চা ছেলে এসে ঘোড়া-দুটোকে টানতে টানতে নিয়ে গেল।

বাড়ির দিকে না ফিরে একটু উলটো রাস্তা নিলো শ্রী। ম্যাল থেকে অন্য দিকের যে রাস্তাটা ওপরে উঠেছে আস্তাবলের পাশ দিয়ে। দুটো মেয়ে পিঠে ঝুড়ি নিয়ে উঠছে, একজনের কোলে আবার একটা বাচ্চা। পাহাড়ি মেয়েরা কত পরিশ্রমী হয় – ভাবতে ভাবতে বাচ্চাটার দিকে একটু এগিয়ে গিয়েছিল শ্রী – যদি একবার কোলে নেওয়া যায়। কি ভীষণ কিউট বাচ্চাটা।

হঠাৎ প্রায় অন্ধকার ভেদ করে এসে দাঁড়াল তিনজন। দুজনকে না চিনলেও একজনের মুখটা চেনা বেরিয়ে গেল। ইন্টারপোলের ফাইলে একটাই ছবিই আছে লোকটার – হিরণ্য। একদিকে সুয়েভ, অন্যদিকে স্যাটান – কখনও হাতে না আসার মত ধুরন্ধর ক্রিমিনাল। খুব ধারাল একটা হাসি হাসল সে, ‘একা একা ঘুরতে এলেন ম্যাম – তাও আবার এরকম ফাঁকা রাস্তাটাই বেছে নিলেন? খাদটা দেখেছেন তো? এখন কি হবে বলুন তো?’

শ্রী একবার ঘাড় কাত করে খাদটা দেখল। ঢালু রাস্তা থেকে খাদটা বেশ গভীরই লাগে। অচেনা প্রেমিকের চোখ যেন, অতল। শ্রী অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে দেখে দৈত্যের মত একটা লোক ছুটে এলো। শ্রী হালকা করে বসে গিয়ে পা’টা চালাল ডানদিকে – লোকটা মালাইচাকিতে। অত প্রকাণ্ড চেহারার মানুষটা এরকম আর্তনাদ করবে শ্রী ভাবেনি। বাচ্চাটা সেই শুনে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।

ধুপ ধুপ করে দুটো শব্দ হল। মারাঠি ছেলেটার বয়স কম হলে কি হবে, শার্প শুটার হিসেবে দারুণ তো? খুব অবাক হয়ে হিরণ্য হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়েছে ততক্ষণে, আস্তে আস্তে হাত দুটো তুলছে মাথার ওপরে। একটু শ্রাগ করল শ্রী, ‘সরি ডার্লিং, প্ল্যানড মিশন ছিল – আই হ্যাড টু লোয়ার মাই গার্ড। ক্রাউচ সার্ফিং, নো গান – স্কেচ-বুক, কফি – এভরিথিং ওয়াজ প্ল্যান্ড। অ্যারেস্ট করার অর্ডার নেই’। চুলের মধ্যে একটা তিনকোনা কাঁটা ছিল, ততক্ষণে নির্ভুল লক্ষ্যে বিঁধে গেছে হিরণ্যর কাঁধে। সবচেয়ে কম রক্তক্ষরণে মৃত্যু।

আস্তে আস্তে ভিড় হতে শুরু করেছে। বসকে মেসেজ করা হয়ে গেছে শ্রী’র। লোকাল এসআই এসে পড়ার আগে তার মায়ের কাছ থেকে বাচ্চাটাকে একটু কোলে নিলো শ্রী, ‘ওমা ভয় করেছে বুঝি? ভয় যদি কখনও তোমাকে পেয়ে বসে, তাহলে জানবে তোমার আর কোনও যাওয়ার জায়গা নেই। তুমি ছোট – এখন থেকেই তোমাকে ঠিক করতে হবে তোমার গল্পে ভয় বলে কিছু থাকবে, কি থাকবে না।’

কথা বলতে বলতে কখন সে শ্রী থেকে শেরিল হয়ে গেছে, খেয়াল ছিল না। দু-তিন জন লোকাল পুলিশ এসে স্যালুট করে কাজ করা শুরু করেছে। অর্জুন হাঁটতে হাঁটতে আসছে ওর রাইফেলটা নিয়ে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পাহাড়ের ঢালটাকে আবার লক্ষ্য করছিল শ্রী। এখন আর অতটা গভীর লাগছিল না। সেই অন্ধকারেই দূরে কোথাও দেবীপক্ষ শুরু হচ্ছিল।

Fear, to a great extent, is born of a story we tell ourselves, and so I chose to tell myself a different story from the one women are told. I decided I was safe. I was strong. I was brave. Nothing could vanquish me.

লম্পট ও লাস্যময়ী

[লেখার মাঝে অনেক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ইচ্ছাকৃত – শুধুমাত্র ঘটনা ও চরিত্রে প্রয়োজনে, এজন্য পাঠকদের কাছে আমি ক্ষমা-প্রার্থী]


কাচের দেওয়ালে হালকা টোকা, “আসব?”

“তুমিই পদ্মিনী? এস ভেতরে এস। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”

ভিতরে আসতে আসতে পদ্মিনীর জবাব, “ইয়েস স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ। তবে আপনি আমাকে মিনি বলতে পারেন-”

“মিনি? কেন? আমি তোমাকে খামোকা মিনি বলতে যাব কেন?”

“পদ্মিনীটা আমার বাবামার দেওয়া নাম হলেও বড্ড সেকেলে – আর ঐ নামে ডাকাও খুব মুশকিল – ফোনেটিকালি। তাই আমাকে বন্ধু বান্ধবীরা সবাই একটু ছোট করে এক সিলেবল বানিয়ে দিয়েছে – মিনি। এমনকি আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলেও মিনি লিখি আজকাল। ওটাই ভালো লাগে শুনতে- শর্ট, সুইট আর স্মার্ট।”

“না না, আমি ওসব জানতে চাই না – আমার প্রজেক্টে ওসব চলবে না”

“কেন স্যার?”

“মিনি বললেই কেমন যেন মিনিস্কার্ট টাইপ মনে হয়”

“মিনিস্কার্ট খারাপ কিসে স্যার?”

অরিজিৎ একটু মুখ তুলে তাকালেন – “আজকে প্রথম দিন তাই জানিয়ে দিচ্ছি – আমার মুখে মুখে তর্ক করবে না। আমার প্রজেক্টে থাকতে হলে শুধু মন দিয়ে কাজ করবে, বুঝেছ? কেউ তোমাকে ওসব মিনিটিনি বলে ডাকতে পারবে না আর তুমিও স্কার্ট পরে ছেলেদের ডেস্কে বসে আড্ডা দিতে যাবে না – মিনি আর মিনিস্কার্ট আর ইকুয়ালি কনডেমড।ইস দ্যাট ক্লিয়ার?

পদ্মিনী খানিক মুখ নিচু করে রইল, তারপর ঘাড় নাড়ল।

“শুধু মাথা নাড়লে হবে না – হ্যাঁ বা না বল”

“আচ্ছা, আপনি যখন বলছেন তখন আপনি পদ্মিনীই বলবেন, তবে আর কে কি বলে ডাকবে তার গ্যারান্টি আমি নিতে পারব না।ড্রেস কোডের ব্যাপারটা মাথায় রাখব”

“এই জন্যেই, ঠিক তোমাদের মত এইসব মেয়েদের জন্যেই টিমের মোরাল এত লো হয়ে যাচ্ছে- শুক্রবার এক একদিন মনে হয় জাস্ট ঘুম থেকে উঠে যা পেয়েছ হাতের কাছে পরে চলে এসেছ। আমি ওসব পছন্দ করি না।”

Lampat O lasyamoyi - small

“আমি কি একটু বসব স্যার? নাকি বাকি ইন্টারভিউটাও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?”

“আচ্ছা, বোস। এক মিনিট, এক মিনিট তোমার হাতে ওটা কি? স্টিকার ফিকার নাকি?”

“না না, স্টিকার হতে যাবে কেন? ট্যাটু স্যার।”

“ট্যাটু?”

“মানে পার্মানেন্ট মার্ক স্যার – ইট ইস নাও এ পার্ট অফ মি। আরও একটা আছে স্যার, কাঁধে। এই যে! আই থিংক ইট ডিফাইনস মি।”

অরিজিৎ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর আস্তে আস্তে বললেন – “তুমি কর্পোরেট পলিসি যান না?”

“কোন পলিসিটা স্যার?”

“তোমার শরীরে কোথাও ট্যাটু থাকলে ওরকমভাবে খুলে রাখা যাবে না যাতে সবাই দেখতে পায়। ঢেকে রাখতে হবে?”

“হাত কি করে ঢেকে রাখব স্যার?”

“যেভাবে আর দশটা মেয়ে রাখে, ফুল স্লিভ পরে। এটা অফেনসিভ – মনে রাখবে। আর হ্যাঁ, স্লিভলেস এমনিতেও অ্যালাওড না।”

“কেউ দেখলে অফেনসিভ না, আর আমি পরলেই অফেনসিভ?”

“দেখ, আমি এই নিয়ে তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। আমি যা বলব শুনে চলতে হবে। তোমার মত একটা মেয়ের জন্য আমার টিমের ওয়ার্ক কালচার খারাপ হবে আমি চাই না”

“ওকে, স্যার-”

“এখন বল – তুমি এই প্রজেক্টে জয়েন করতে চাও কেন?”

“নীলের জন্য।”

“নীলের জন্য? নাও হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট?”

“ঐ যে সুনীল – ওর সাথে কদিন আগে আমার একটা পার্টিতে আলাপ হয়েছিল। ও কে আমার দারুণ লাগে, ও প্রমিসও করেছিল আমি এলে আমাকে নিয়ে নেওয়া হবে টিমে।”

“সুনীল মানে আমার টেকনিকাল লিড – ময়লা, লম্বা চেহারা, কোঁকড়ান চুল, সরু গলা?”

“হ্যাঁ ঐ – ওর সাথে আলাপ হয়ে দারুণ লেগেছিল”

“এক মিনিট, তুমি বিবাহিত না?”

“হ্যাঁ, স্যার”

“তবে তোমার সিঁথিতে সিঁদুর নেই কেন?”

“দ্যাট ইজ নান অফ ইয়োর বিজনেস স্যার। সিঁদুর পরা না পরাটা তো আমার পার্সোনাল ব্যাপার।”

“রিডিকিউলাস – ইট ইস আ সোশ্যাল অ্যান্ড মোরাল রেসপনসিবিলিটি। আমাকেই তো দেখতে হবে আমার প্রজেক্টে কে কি করছে। তোমার বর কোথায়? সে মাইন্ড করে না?”

“ও আর্মিতে – আর না ও কিছু মনে করে না। মেয়েদের বন্দী করে রাখার প্রথায় ও বিশ্বাস করে না।”

“বাহ – সিঁদুর পরা মানে বন্দী করে রাখা? এই বুঝেছ এত দিনে?”

“আগেকার দিনে মেয়েদের যুদ্ধে জিতে তাদের মাথা চিরে দেওয়া হত, আর্যদের সেই ট্র্যাডিশনই আজকের সিঁদুর পরা। কেন এইসব ভুলভাল নীতি মেনে চলব?”

“দেখ মিনি, চলবে না চলবে সে তোমার ব্যাপার। আমার প্রজেক্টে চলবে না। এটা আমার প্রজেক্ট – এখানে তুমি সিঁদুর না পরে অবিবাহিতা থেকে ফ্লার্ট করবে সে চলবে না”

“হোয়াট ক্র্যাপ?”

“যা বলছি, শুনেছ”

পদ্মিনী চোখ নামিয়ে নেয়। তার গলা ধরে আসে – যেন অনেক কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু কোন কথাই মুখ ফুটে বলতে পারছে না।

অরিজিৎ গলা নামিয়ে হালকা করে পদ্মিনীর হাতে হাত রাখে –“সরি, আমি তোমাকে…”

পদ্মিনী কথা শেষ করতে দেয় না, “আর আপনারা যে শুক্রবার হলেই মেয়েদের দুচোখ দিয়ে গিলে খান, সেটা কি ভদ্রতা?”

“কি যা তা বলছ?”

“কেন গত শুক্রবার ঈশিতার পিছন পিছন আপনি সিঁড়ি দিয়ে ন-তলা উঠে আসেননি?”

“ঈশিতা? ঐ নামে আমি কাউকে চিনি না। আর এ তে কি প্রমাণ হয়? আমি তো এক্সারসাইজ করার জন্য উঠছিলাম।”

“এক্সারসাইজ মাই ফুট। আপনি ওর পিছন পিছন উঠছিলেন ওর টাইট জিনসের জন্য – তাই না? কমেন্টও তো পাস করছিলেন হালকা গলায়, বন্ধুদের সঙ্গে। কি ভেবেছিলেন শোনা যাবে না কিছু? শুনলেও কেউ কিছু বলবে না? কর্পোরেট হাউস? ভেবেছিলেন আপনাকে কেউ চিনতে পারবে না?”

“আ – আমি জানি না কি বলছ তুমি। ইন্টারভিউ ওভার। তুমি যেতে পার- তোমাকে আমার টিমে কোন দরকার নেই।”

“দাঁড়ান – এত সহজে কি? শুরুটা আপনি করেছিলেন, কিন্তু ইন্টারভিউ শেষ হবে, যখন আমি বলব। আপনি কি মনে করেন, মেয়েদের সাথে যা খুশি তাই করবেন? তাদের ভয় দেখিয়ে তারপর হাত ধরার চেষ্টা করেন? মেয়েদের পোশাক নিয়ে কমেন্ট করতে খুব ভালো লাগে, তাই না?”

“আমি তোমার কথার কোন মানে বুঝতে পারছি না – কি বলতে কি চাও তুমি?” অরিজিতের গলা কাঁপতে থাকে একটু একটু করে।

“সোজা কথা – আপনি একজন ক্রীপ। আপনার কি মনে হয় আপনার পজিশনের জন্য যে কোন মাইন্ড গেম খেলে আপনি পার পেয়ে যাবেন? আপনি মেয়েদের সামনে ছেলেদের বলেন না জাঙিয়া খুলে লুঙ্গি পরে শীর্ষাসন করতে? সেটা তো মেয়েদের ওপর নিজের ঠোঁটকাটা বয়ান দেখিয়ে সুযোগ নেওয়ার জন্যই। আপনার প্রজেক্টের জুনিয়ার ছেলেদের বলেন না কোন একটি মেয়েকে চায়ের দোকানে নিয়ে যেতে আর তারপর মেয়েটির সাথে জোর করে গল্প করেন, আনকমফর্টেবল সব প্রশ্ন করেন? বাজে বাজে জোক্ বলেন? এক একদিন তাদের আপনার নতুন গাড়িতে করে ঘুরিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার অফার দেন না?”

“কে – কে তুমি? এ সব কি যা তা বলছ?”

“আমি কর্পোরেট এইচ আর। অনেক কমপ্লেন পেয়ে আপনাকে ইভ্যালুয়েট করতে এসেছিলাম, ভেবেছিলাম ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেব, কিন্তু যা দেখলাম তাতে কোন অ্যাকশনই যথেষ্ট নয়। ট্যাটু নিয়ে এত সমস্যা, অথচ তখন থেকে কোথায় তাকিয়ে ছিলেন, আমি দেখতে পাইনি ভাবছেন? আপাতত: আপনার সাসপেনশন আপনি মেলেই পেয়ে যাবেন। নাও দা ইন্টারভিউ ইস রিয়েলি ওভার।”

গটগট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বেরিয়ে যায় পদ্মিনি। অরিজিতের নড়বড়ে হাত খুঁজতে থাকে টাইয়ের নট’টা।


অন্য ভ্রমণ, বন্য ভ্রমণ

প্রচণ্ড রেগে গিয়ে শান্তনু বলল “তোদের না খেতে হয় খাস না, আমি একাই খাব। আর যখন খাব কেউ চাইলে একটা টুকরোও পাবি না বলে দিলাম”। বলেই গট গট করে বেরিয়ে চলে গেল।

সারান্ডার জঙ্গলে। ছবি সৌজন্যেঃ লেখক
সারান্ডার জঙ্গলে। ছবি সৌজন্যেঃ লেখক

সবে কুমডি থেকে থলকোবাদ বনবাংলোতে এসে পৌঁছেছি। ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা ফরেস্টের এইদিকটা এমনিতেই ঘন জঙ্গল। কুমডিতে তো দুদিন যা গেল তাতে এমনিতেই বেশ কাহিল হয়ে ছিলাম আমরা। কোনোদিন যে পাহাড়ী ঝরনা থেকে জল বয়ে এনে, নিজেরা কুড়ুল দিয়ে কাঠ কেটে, নিজেদেরই রান্না করে খেতে হবে সেটা আগে চারজনের কেউই ভাবিনি। তারপর রাত দুপুরে খিদে পেয়ে গেল..এদিকে রান্নাঘর বাংলো থেকে অনেক দূরে আর ড্রাইভার বলে গেছে রাতে বেরলেই  ‘ হাথি, ভালু ’ সবাই আমাদের আক্রমণ করবে বলেই বসে আছে …. সেই ভয়ে বাংলোর ফায়ার প্লেসেই ডিম সেদ্ধ বসিয়ে দেওয়া … খিদে তো মিটল … এদিকে বাংলোর বাইরে বেরিয়ে দেখি গোটা কুমডি আমাদের ফায়ার প্লেসের চিমনি দিয়ে বেরোনো ধোঁয়াতে সাদা হয়ে গেছে … মোদ্দা কথা হল এইসব কান্ডকারখানা ঘটিয়ে আমাদের মানসিক ক্লান্তি যথেষ্টই ছিল … তারপর আজ রাত্তিরে থলকোবাদ ওয়াচ টাওয়ারে সারা রাত কাটিয়ে প্রচুর জন্তু জানোয়ার দেখার অপেক্ষায় টানটান … চৌকিদার সারগেই বলেছে পকৌড়া ভেজে দেবে, কিন্তু টাওয়ার থেকে নামা চলবে না, কয়েক মাস আগে তিনটি ছেলে বারণ না শুনে রাতে নেমে পড়েছিল, তাদের একজনকে ভাল্লুক কামড়ে মাংস তুলে নেয় … আর সাথে কম্বল মাস্ট .. ওদিকে মহুয়ার গন্ধে ম ম করছে গোটা জঙ্গল .. সব মিলিয়ে হইহই ব্যাপার …… তার মধ্যে এই কাণ্ড……

Continue reading “অন্য ভ্রমণ, বন্য ভ্রমণ”