পয়লা বৈশাখ

কথায় বলে অন্ধের কি বা দিন, কি বা রাত। আমরা যারা লক্ষীসাধনায় মগ্ন হয়ে হত্যে দিয়ে বাইরে পরে আছি, আমাদের একই অবস্থা প্রায়। কবে পয়লা বোশেখ, কবে পঁচিশে, এক্সেল শীট, প্রজেক্ট ডেডলাইন আর কেপিআইয়ের চক্করে সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যায়। একটা নিয়মে নিজেকে বাঁধতে বাঁধতে কবে যে নিয়ম-দাস হয়ে গেছি, টের ও পাইনি। মাস পয়লার মোটা মাইনে আর দিনান্তে স্কচের অমোঘ টানে নিজেকে কবেই যেন আস্তে আস্তে হারাতে শুরু করেছিলাম। আমার মধ্যের আমিটা সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বারবার পালাতে চেয়েছে, আর তাকে আটকে রেখেছে বাইরের আমি। তাই পয়লা বৈশাখের নতুন জামা, আর পঁচিশের দিন শেষের কবিতা হাতে নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়ার বিলাসিতা চিন্তার বাইরে আর বেরোতে পারেনি।

কাল রাতেও অফিস থেকে ফিরেছি এগারোটার পর। কোনোরকমে কিছু একটা রেঁধে খেয়ে আবার ল্যাপটপ নিয়ে দাসত্বের রোজনামচা লিখতে বসেছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেও জানিনা। ঘুম ভাঙল যখন একফালি নরম রোদ জানলা বেয়ে মুখ ছুঁয়ে গেলো। অভ্যেস মতোই হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। দেখলাম হোয়াটস্যাপে বাবার একটা মেসেজ। “শুভ নববর্ষ।” ভদ্রলোকের এই ব্যাপারে কোন ভুল হয়না। প্রতি বছর প্রথম মেসেজটা বাবাই পাঠায়। অন্যান্য বছর আমি রিপ্লাই করে ছেড়ে দি, কিন্তু এ বছর মেসেজটা পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। রিপ্লাই করে সিগারেটটা শেষ করে বিছানা ছেড়ে নামলাম, কিন্তু অন্যদিনের মতো বাথরুমের দিকে না গিয়ে বসার ঘরে গিয়ে টিভিটা অন করলাম। কোন প্রাইভেট চ্যানেল না, সোজা ডিডি বাংলা। দেখলাম প্রভাতী অনুষ্ঠান তখনো চলছে। কফি বানিয়ে সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিলাম। কতক্ষণ অনুষ্ঠান দেখেছি, মনে নেই। হুঁশ ফিরল ফোনের আওয়াজে। যা ভেবেছিলাম তাই; অফিসের ফোন। রিংটোনটা অফ করে দিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে দিলাম পাশের চেয়ারে। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজেকে একবার দেখলাম। তিন মাসের না কামানো দাড়িটা একটু বেশি পাকা লাগছে। চোখের নিচে হাল্কা কালিও যেন পড়েছে মনে হচ্ছে। না:, এভাবে নিজেকে দেখে মোটেও ভালো লাগলো না। কেবিনেট খুলে রেজারটা বার করে দাড়িটা কামিয়েই ফেললাম।

স্নান করে বেরিয়ে আলমারি খুলে নতুন একটা পাঞ্জাবি বার করলাম। গত পুজোয় কিনেছিলাম, পরে ওঠা হয়নি। সবই নিউটনের থার্ড ল আর কি! আজকের জন্যেই হয়তো তোলা ছিল। বসার ঘরে এসে ফোনটা দেখলাম। সাতাশটা কল, সবই অফিসের। জুনিয়র একটি ছেলেকে মেসেজ করে বলে দিলাম আজ এসব না। বলে ফোনটা বন্ধ করে অন্য নাম্বারটা চালু করলাম। এবার বাজার যাবো, খাসির মাংস কিনতে। দুপুরে জমিয়ে রান্না, তারপর একটা ভালো সিনেমা দেখে লম্বা একটা ঘুম দেব। আজ পয়লা বৈশাখ, আজ আমি সব নিয়ম ভেঙে নিজের মতো করে থাকবো। কি বললেন, অফিস? না, আমাকে ছাড়া একদিন ওরা ঠিক থাকতে পারবে। প্রথম আলোর চরণধ্বনি একটু অন্যভাবেই না হয় আজ বাজলো।

আশ্বিনের শারদ প্রাতে

আমি বাংলা ভাষাও ছাড়িনি, বাঙালিয়ানা ও ছাড়িনি, ছেড়েছি শুধু শহরটা। তবে ওটাও নেহাত দায় না পড়লে ছাড়তাম না।

শহর থেকে দূরে থাকার একটা খারাপ দিক হলও এখানে উৎসবের আমেজ ঠিক বোধ করা যায়না। উৎসব বলতে এখন অবশ্যই দুর্গাপূজার কথা বলছি। আজ দশ বছরের বেশি হয়ে গেল বাইরে। দিল্লী, লখনৌ, মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, লন্ডন… এখানে কোথাও কাশফুল ফোটেনা। কোথাও মহালয়ার দিন ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের আওয়াজ রেডিও থেকে ভেসে আসেনা। এখন অবশ্য সব টিভি চ্যানেলে একটা না একটা মহিষাসুর-মর্দিনী অভিনীত হয়, কিন্তু কোনও কিছুই যেন সেই রেডিওতে মহালয়া শোনার অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে পারেনা।

ছোটবেলার স্মৃতির কাঁটা এখনো আটকে আছে বাবার সেই murphy রেডিওতে। মহালয়া মানে এখনো আমার কাছে সেই পুরনো রেডিও, বীরেন বাবুর গলা, আর তারপর বাবা, জেঠু, কাকার তৈরি হয়ে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ করতে যাওয়া। মহালয়া মানে এখনো কাশফুল।

এখানে আমাকে কেউ ভোরবেলা ডেকে দেয়না। আগের দিন রাত জেগে প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করা ক্লান্ত চোখ মিছেই গোসা করে এলার্ম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। কফি মেকারের শব্দ, টোস্টারের থেকে বেরিয়ে আসা দুটো মুচমুচে টোস্ট, বাইরে হাল্কা মেঘলা আকাশ, আর অদূরের ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ, সব মনে করিয়ে দেয় আমার নাগরিক ব্যস্ততাকে। অফিস যেতে হবে।

রিপোর্টে শেষ মুহূর্তের ঝালাই দেওয়ার জন্যে ল্যাপটপ খুলতেই চোখ পরে গেল ক্যালেন্ডারে। আজ মহালয়া না? নিজের অজান্তেই রিপোর্টটা বন্ধ করে ইউটিউব খুলে টাইপ করি “মহালয়া বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র”। প্লেলিস্টের প্রথম ভিডিওতে ক্লিক করে, কফির কাপটা নিয়ে দাঁড়াই আমার বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর সামনে। ঘর জুড়ে তখন গমগম করে ওঠে বীরেন বাবুর কণ্ঠ…”আশ্বিনের শারদ প্রাতে…” এই বছরও বাড়ি ফেরা হলোনা।

দুর্গাপূজা, প্রেম ও এক অধুরী কাহানী

পুজো আসছে, আর বাকি ১৩ দিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই এই ধরনের পোস্ট চোখে পড়ছে। আমরা যারা বাইরে থাকি, তাদের কাছে পুজো মানে কিন্তু বাড়ি ফেরার আনন্দ। আলোয় মোড়া আমার খুব চেনা এই শহর, চেনা-অচেনা সব মানুষ, ভিড়, একরাশ হাসিমুখ, প্যান্ডেলের বাইরে লম্বা লাইন, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ…সব মিলে মিশে একটা অন্যরকমের ভালোলাগা। তাই আমার বন্ধু যখন আমাকে এই লেখাটা লিখতে বলল, সঙ্গে জুড়ে দিলো যে একটু নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই কিন্তু, আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে জুলফিতে আর দাড়িতে রূপোলী ছোঁয়া দেখে চমকে উঠে, বাড়তে থাকা পেটের ওপর হালকা করে হাত বুলিয়ে নিজের মনেই গেয়ে উঠলাম “আমার যে দিন ভেসে গেছে…”।

“নস্টালজিয়ার ছোঁয়া চাই” কথাটা কানে বাজতেই মনে হল, সত্যিই তো বয়েস বেড়ে চলেছে। অন্যের বউ, নিজের প্রেমিকা যখন বয়েস নিয়ে খোঁটা দিয়েছে, বিশ্বাস করুন একটুও গায়ে মাখিনি সেই সব কথা। কিন্তু লিখতে বসে যখন পুরনো কথাগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি, বেশ বুঝতে পারছি যে যেই ঘটনাগুলো “এই তো সেদিন” বলে সামলে রেখেছিলাম, পায় পায় ১৫ বছর হেঁটে পার হয়ে গেছে।

নস্টালজিয়ার কথা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়, কিন্তু আমার এতো নস্টালজিয়া নেই কারণ সময়ের সাথে সবকিছু পাল্টায় স্বাভাবিক রীতিতে, এবং সেটা মেনে নিতে হয়। যেটা পাল্টায় না সেটা হল এমন কিছু গল্প যা মনের ভিতর বাঁধা পড়ে আছে… পুজো আসতেই আগল খুলে ছড়িয়ে পড়বে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

“আমায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবি?” আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল এরকমই একটা ফোন কল দিয়ে। সে বছর পুজোর অষ্টমীর দিনটা বড্ড ভালো কেটেছিল। লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা, ফুচকা খাওয়া, প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝখানেও একে অপরের আঙ্গুল খুঁজে নেওয়া, প্রথম হাত ধরা, আর সব শেষে পাড়ার প্যান্ডেলের পিছনের অন্ধকারে আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট রাখা। সব মনে আছে স্পষ্ট করে, যেন কালকেই ঘটেছে সবকিছু। এখনো পুজোর ঢাক বাজলে চোখের সামনে সিনেমার রিলের মত চলতে থাকে সবকিছু। দশমীর দিন ওর হঠাৎ বাড়ি চলে আসা, মায়ের কাছে আবদার করা “তোমার সাথে বরণ করতে যাবো”, তারপর দুগালে সিঁদুর মেখে আমার ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে ওঠা “দেখ আমাকে কিরকম নতুন বউয়ের মত লাগছে।” কই, আমি তো কিছুই ভুলিনি?

আমার গল্পে বেকারত্বের জ্বালা ছিলনা, পকেটে একশ টাকা নিয়ে ঝাঁ চকচকে শপিং মলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অসহায়তা ছিলনা, তোকে হারানোর ভয়ও ছিলনা…তবু কেন ভুল হল ঠিক সময়ে ভালোবাসার কথা বলতে না পারায়? আজ আমাদের মধ্যে দুটো মহাদেশের শূন্যতা। এই পুজোতে তুই শিকাগোর বঙ্গ সম্মেলনে তোর প্রিয় কবিতা পড়বি, আর আমি লন্ডনের শীতে ওভারকোট গায়ে চেপে ধরে হেঁটে যাবো কোনও পুরনো রাস্তা ধরে। তবুও আমার পুরো পুজো জুড়ে শুধু তোর কথাই মনে পড়বে। আমি জানি, কোথাও না কোথাও গিয়ে তোরও আমার কথা একটু হলেও মনে পড়বে। এই মনখারাপের মধ্যে দিয়েই কোথাও না কোথাও আমার আঙ্গুল ছুঁয়ে ফেলবে তোর হাত। ভালো থাকিস, মন।

স্মৃতি সুধা

আকাশটা যেন আরও কাছে চলে এসেছে।সামনের সবুজ ফাঁকা জায়গাটার বেশীরভাগটাই আজ কংক্রিটের দখলে।আজকাল সবকিছুই যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে শীতটাও কেমন যান তাড়াতাড়ি চলে গেল। বসন্ত এসে গেছে। এক অদ্ভুত গুমোট ভাব। গতকাল এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, আজকে তার সামান্য রেশ মাত্র নেই। একটা হাল্কা হাওয়া তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে।

অনেকক্ষণ ছাদের ধারে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কমলেশ্বর বাবু। কমলেশ্বর সেন। আজকাল মানুষ ভীষণ যান্ত্রিক। কমলেশ্বর হতে পারেন নি। মোবাইলটা আজও চার্জের অভাবে। নিস্তেজ হয়ে পকেটে ঘুমিয়ে আছে। বাবলু ছাদের লাইটটা জ্বালাতে এসে জিজ্ঞাসা করলো-“ কি জেঠু, এখন এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, নিচে যাবেন না?” তন্দ্রাটা হঠাৎ করে ভেঙে গেল। এই সব কিছু তার কত আপন, এই ছাদ, এই হাওয়া, এই আকাশ, সামনের জঙ্গল সব। ছাদের এই জায়গাটা থেকে মনে হয় আকাশের ভীষণ কাছে চলে এসেছে, ইন্দিরাও দেখতে পাচ্ছে। আজ তিনবছর হল ইন্দিরা চলে গেছে, আজ একবছর উনি ফ্ল্যাটে।

প্রথম যখন ইন্দিরাকে এই জায়গাটা দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন, বাড়ী গিয়ে ইন্দিরা তিনদিন কেঁদেছিল।প্রায় এক সপ্তাহ কথা বলেনি। শহর থেকে অনেক দূরে এই জমিটা কেনার আগে কমলেশ্বর কোনও আলোচনাই করেনি ইন্দিরার সাথে। এছাড়া কোনও উপায় ও ছিল না।

দেশভাগের সময় নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে এসে সারাটা জীবন বাবা একটা নিজের বাড়ী খুঁজেছিলেন, পাননি। কমলেশ্বরের মধ্যে সেই অন্বেষণের বীজ বপন করে ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। তার কিছুদিন পর মাও চলে গেলেন। নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা শেষ করে একটি আধা সরকারী অফিসে চাকরী যোগাড় করেন। তারপর ইন্দিরাকে বিয়ে করে সংসার পাতেন হাতিবাগানের একটি ছোট্ট দুই কামরার বাড়ীতে। তারপর সরকারী ব্যবস্থাপনায় শহর থেকে বেশ দূরে এই জমিটি কেনেন বেশ সস্তায় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।

বাড়ি তৈরি করে দেন আস্তে আস্তে। প্রথমে ইন্দিরা কোন উৎসাহই দেখাতো না। কমলেশ্বর প্রায় রোজ বাড়ি ফিরে এসে নতুন বাড়ীর খুঁটিনাটি ইন্দিরাকে শোনাত কতদূর এগোল, কোথা থেকে ইট আনছেন, মার্বেল দিচ্ছেন কোনখানে, মোজাইক করবেন না লাল মেঝে, বারান্দাটাতে গ্রিল কি দেওয়া হচ্ছে। আসলে বাড়ীটার সাথে ইন্দিরাকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করতেন। “কি গো একদিন যাবে নাকি তোমার নতুন বাড়ী দেখতে” কমলেশ্বর জিঞ্জাসাও করেছিলেন। খুব শান্ত ভাবে ইন্দিরা উত্তর দিয়েছিল, “ আমার নয়, বাড়ীটা তোমার। যেদিন বলবে সেইদিনই যাব।” তারপর থেকে ইন্দিরাকে বাড়ীর ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতেন না কমলেশ্বর।

মানুষ যখন নিষ্ঠা নিয়ে কোন কাজ করে, এবং প্রতিদিন সেটাকে পুরো করার অঙ্গিকার নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন সময়ের নিয়মে সেটা শেষও হয়। সেই একই নিয়মে বাড়ী তৈরিটাও শেষ হয়।

একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ী, নিচের তলায় তিনটে ঘর, একটি বারান্দা, সামনে একটি বসার যায়গা, বাড়ীর সামনে একটু যায়গায় ছোট্ট একটা ফুলের বাগান, ইন্দিরা ফুল ভালবাসে। বাড়ীর নাম “ইন্দিরা ভবন”।

এখন কোলকাতা থেকে সরাসরি কোনও বাস এখানে এসে পৌঁছায় না। যায়গাটা থেকে বেশ দূরে নেমে হেঁটে বা রিক্সাতে এখানে আসতে হবে। রিক্সাও সবসময় পাওয়া যায় বললে ভুল হয়। বাজারটাও বসে বেশ একটু দূরে।

সব না পাওয়াকে সাথে নিয়েই সংসারটাও জমে উঠলো কমলেশ্বর ও ইন্দিরার। ইন্দিরাও আস্তে আস্তে যায়গাটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে একটার পর একটা বাড়ী তৈরি হতে আরম্ভ হল। নতুন প্রতিবেশীরাও বেশ ভাল। সবাই মিলে সুখ-দুঃখে একটি পরিবারের মতো বসবাস শুরু করলো শহরের উপকণ্ঠে। কমলেশ্বর আর অন্যদের তত্ত্বাবধানে যায়গাটা আরও সুন্দর হতে আরম্ভ করল। পাকা পিচ এর রাস্তা, আলো, একটা বাজার, সবকিছুই তৈরি হল কমলেশ্বরের চোখের সামনে।

আসলে প্রথম দিন থেকেই জায়গাটা কমলেশ্বরের পছন্দ হয়েছিল, যখনই দেখতেন কোন নতুন বাড়ীর ভিত পোঁতা হচ্ছে, তখনই তখনই বাড়ীর মালিকের সাথে ভাব জমিয়ে নিজেদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে আসতেন। এইভাবে সবার খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন কমলেশ্বর।

ততদিনে কমলেশ্বর আর ইন্দিরার জীবনে এসে গেছে এক নতুন মানুষ, ওদের সন্তান ইন্দ্র। দিনগুলো খারাপ কাটছিল না। ইন্দ্র বড় হয়ে উঠছিল। সাথে সাথে এই নির্জন জায়গাটাও বেড়ে উঠছিল কালের নিয়মে। বসবাসকারী প্রত্যেকের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিবিড়তাও পেয়ে যাচ্ছিল কালক্রমে। শহর থেকে দূরে বলে এখন শহুরে দামালপনা জায়গাটাকে গ্রাস করেনি। প্রথম বছরের সার্বজনীন দুর্গোৎসবের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন কমলেশ্বর। নিজেদের বসা, আড্ডা মারার জন্য একটা ছোট্ট ক্লাবঘরও করা হয়েছে। উফঃ কই সুন্দর দিন ছিল তখন।

যায়গাটার সেই বৈচিত্র্য আর অবশিষ্ট নেই। শহর বৃদ্ধি পেয়েছে দৈর্ঘ্যে আর প্রস্থে। এই কয় বছরে প্রচুর নতুন মানুষ এইখানে এসে নিজেদের বসতি করেছে। যেই যায়গাতে আসার কথা শুনে ইন্দিরা প্রায় সাতদিন কথা বলেনি, সেই যায়গায় প্রচুর নতুন মানুষ প্রায় প্রতিদিন চলে আসছে। কমলেশ্বর শুনেছেন অনেকেই নাকি তার পৈত্রিক বাড়ী বিক্রি করে এইখানে চলে আসছে। মানুষের সংসার সাথে মাটির পরিমাণের সামঞ্জস্য দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে। তাই সবাই এখন অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে একটা ফ্ল্যাটে থাকে। সমগ্র বিশাল একটা আকাশচুম্বী বাড়ীর খুপরি খুপরি যায়গা। নিজেদের মাটিও না, আকাশও না। সবাই মাঝখানে ঝুলছে। কেউ কাউকে চেনে না। নিজেদের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগ নেই। মানুষ একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

এইসব ভাবলেই কমলেশ্বরের আজকাল ভীষণ কষ্ট হয়। কমলেশ্বরের জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। ইন্দ্রর পড়াশোনা শেষ করে একটা ভাল চাকরি পেয়েছে। বছর দুয়েক হল ইন্দ্রর বিয়ে হয়েছে, আর তাদের একটি খুব সুন্দর সন্তান এসেছে। কমলেশ্বরের আদরের নাতনী রিনি। একবছর হয়ে গেছে ইন্দিরা ইহলোক ত্যাগ করেছে। কমলেশ্বরও চাকরী থেকে অবসর পেয়ে গেছেন। এখন প্রায় সারাদিন রিনির সাথে সময় কাটান। ভালই আছেন।

 

“আমাদের কোনও কথাই কি তুমি শুনবে না বাবা ?” – বেশ চেঁচিয়েই বলেছিল ইন্দ্র। বেশ অবাক হয়েছিলেন কমলেশ্বর। ইন্দ্র এইভাবে কোনোদিন তাঁর সাথে কথা বলেনি। “কি অসুবিধা হচ্ছে আমি তো বুঝতেই পারছি না। তোমরা ওপরে থাক, আমি নিচে থাকি। এই বাড়ী আমি কাউকে দেব না”- দৃঢ় উত্তর দিয়েছিলেন কমলেশ্বর।

কয়েকদিন ধরেই এই ঝামেলাটা আরম্ভ হয়েছে। ইন্দ্র চায় বাড়ী ভেঙে একটা অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে। এখন ফ্ল্যাটে থাকাই ভাল। নিজেদের মত সাজানো যায়। এই কয়েকদিনে ফ্ল্যাটের প্রচুর উপকারিতা তালিকা জানিয়েছে কমলেশ্বরকে। ইন্দ্রর এক প্রোমোটার বন্ধু প্রায়ই বাড়ীতে যাতায়াত করছে।কমলেশ্বর এই ব্যাপারে ভীষণ জেদি, কিছুতেই বাড়ী উনি দেবেন না। বিভিন্ন দিক থেকে চাপ দেওয়ার পর ইন্দ্র সবথেকে বড় খেলাটা খেলল। রিনিকে তাঁর দাদুর কাছে আসা বন্ধ করে দিল। আসলের থেকে সুদের প্রতি মানুষের লোভ চিরকালই বেশী থাকে। কমলেশ্বর সেন এইবার ভেঙে গেলেন। বাড়ীর জন্য সংসারটাই যদি না থাকে তাহলে কি লাভ। ইন্দিরা চলে যাওয়ার সময়ও এত দুঃখ পাননি। নিজের জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি, সবথেকে বড় কৃতিত্ব চলে গেল, প্রোমোটারের হাতে।

আজ সাতদিন হয়েছে কমলেশ্বর ফ্ল্যাটে চলে এসেছেন। তিনতলায় সামনে পেছনে মিলিয়ে বেশ বড় একটা ফ্ল্যাট। প্রথম কদিন কমলেশ্বর শুধু তাঁর পুরনো বাড়ীর সাথে এই নতুন অবস্থানের তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। ভীষণ গুমোট মনে হয়েছে। ওনার একতলাটা হয়তো এর থেকে ছোট ছিল, কিন্তু কত নিজের ছিল। ইন্দ্রর সাথে আর স্বাভাবিক হতে পারেন না। নিজের ছেলেকে ভীষণ বড় খুনি মনে হয়। অনার আপন সন্তানের খুনের একমাত্র চক্রান্তকারী। আজ জীবনে যদি কোন টান থাকে তা হল রিনি। ওর মধ্যে কমলেশ্বর ইন্দিরার ছবি দেখতে পান।

লিফটের সাথে এখনও খুব একটা অভ্যস্ত হননি কমলেশ্বর। তাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা ব্যহত হচ্ছে। ফ্ল্যাটের বাকি বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করারও কোন সুযোগ নেই। এই অ্যাপার্টমেন্টের সবথেকে ভাল লেগেছে এইখানকার ছাদটা। বিশাল। আকাশের কাছাকাছি। এই ছাদ থেকে সামনের অনেকটা দেখা যায়, ভাল লাগে। আশেপাশের বাড়ীগুলোও আস্তে আস্তে অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে যাচ্ছে। এইসব মানুষগুলো কষ্টকরে নিজেদের মত করে এই যায়গাটা সাজিয়েছিলেন। বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব করেন আজকাল।

সবাই ছাদ থেকে ধরাধরি করে কমলেশ্বরের নিথর দেহটা নামাল তখন রাত এগারটা। ইন্দ্র অফিস থেকে এসে বিশ্রাম নিয়ে রাতে খাবার খাওয়ার অনেকক্ষণ পর, বাবার ঘরে আলো নেভানো দেখে একটু অবাক হয়েছিল। সৌমীকে জিজ্ঞাসা করে জানল যে ও কিছু জানেনা। সৌমী সিরিয়াল দেখছিল। “ বাবার আসাটা আমি লক্ষ্য করিনি”-সৌমী বলেছিল। বাবলু বলল সে জেঠুকে শেষবার ছাদে দেখেছিল।

শহরের গুমোট ভাবটা এখনও কাটেনি। আকাশটাও ঘোলাটে হয়ে আছে। বৃষ্টি পড়বে মনে হয় কংক্রিটের জঙ্গলে। জীবন এগিয়ে যাবে জীবনের মতো।

রাজযোটক

“সেই দশটা বেজে গেলো, যতই তাড়াতাড়ি করি কিছু না কিছু করে দেরি হয়েই যাবে” – গজগজ করতে করতে শোভনা এপার্টমেন্টের তিনতলার ফ্ল্যাটে ঢুকল সরিৎ| রবিবার একলা মানুষের বাজার করতে বেশী সময় লাগে না -তবে পাঁচটা লোকের সাথে দু-পাঁচ মিনিটের কথায় ঘড়ির কাঁটা ধোঁকা দিয়ে যায়|সরিৎ ঘরে ঢুকে পরের কয়েক মিনিটে বাজারটা তুলে ফেলে আর আধ বোতল জল গলায় ঢেলে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়ল |

গল্পটা হল সরিৎ সোমের – নামের মতন মানুষটা সাদামাটা কিন্তু তার মধ্যেও তার জীবনটা বেশ আলাদা | বছর খানেক হল স্ত্রী-পুত্রকে এক পথ দুর্ঘটনায় হারিয়ে এখন সরিৎ একা – বাবা মা আগেই গত হয়েছিলেন, তারপর গত বছরের দুর্ঘটনার পর সে একেবারে স্বজনহারা | যদিও একেবারে স্বজনহারা বলা যায় না – তার তুতো পরিচয় কয়েক ভাইবোন ও তাদের পরিবার আছে, কিছু কাছের বন্ধু আছে এবং সর্বোপরি তার শ্বশুরকুলও আছে|তবে সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চললেও তার ধরন বেশ ঠান্ডা |ব্যাপারটা সাপ্তাহিক দু একটা ফোনের ওপর আর কোনো নিমন্ত্রণ পেলে লৌকিকতার দ্বারা সে চালিয়ে গেছে|কিন্তু পঁয়ত্রিশ পার করা সরিৎ গত এক বছরে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছে | তার প্রাইভেট ফার্মের চাকরি – বাড়ির টুকরো টাকরা দৈনন্দিন কাজ – কোনো ভালো ছবি এলে দেখতে যাওয়া – গল্পের বই পড়া যদি হয়ে তার জীবনজাপনের কিছু আবশ্যক কাজ তবে তাকে টিকিয়ে রেখেছে তার নিজের মাথা থেকে বের হওয়া এক অদ্ভুত নেশা |

সপ্তাহের বাকি ছদিন অফিস প্রভৃতি কাজে কালক্ষেপ হলেও রবিবারগুলো যেন তাকে কাটতে আসত | রুবি আর পাপাই যেদিন চলে গেলো তারপর থেকে সে চেষ্টা করেছে একা না থাকতে – একা থাকলেই শেষ দশ বছরের সুখ স্মৃতি তাকে খেতে আসত | কিন্তু রবিবার গুলো সে কি করবে – আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে তো আর বলা যায় না – “আমার এক ভালো লাগেনা – একটু সঙ্গ দেবে”! এই করতে করতেই মাস দশেক আগের সেই রবিবার আসে – যেদিন সরিৎ তার জীবনের সবচেয়ে ইনোভেটিভ আইডিয়ার জন্ম দেয়|

সে যা হোক এখন বর্তমান কথায় ফিরে আসি| সরিৎ খবরের কাগজটা খুলে বসল – সাথে ল্যাপটপ| খুব সংক্ষেপে কাগজের খবরের পাতাগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে চলে গেলো সাপ্তাহিক পাত্র পাত্রী কলামে | পাকা চোখে সে পর্যায়ক্রমে দুটি পাতার সব বিজ্ঞাপন পড়ল – কুলীন কায়স্থ থেকে সম্ভ্রান্ত মাহিষ্য , কনভেন্ট এডুকেটেড থেকে ঘরকন্না কাজে নিপুণা , স্বর্ণবর্ণ থেকে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, পশ্চিমবঙ্গীয় থেকে পূর্ববঙ্গীয় সবরকম পাত্রীর সাথে পরিচয় হয়ে গেলে সে এক এক করে সেই সব ঠিকানা , ফোন বা মোবাইল নম্বর এবং আর কিছু দরকারী খবর নোট করে নিল তার ল্যাপটপে | ব্যাপারটা শুনতে সোজা হলেও এতটা সোজা নয় – পঁয়ত্রিশ বছরের বিপত্নীক প্রাইভেট ফার্মের মধ্যপর্যায়ের অফিসারকে হালে পানি দিতে পারে এইরকম অন্তত দশটা ক্যান্ডিডেট পেতে গেলে অনেক বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে | তাছাড়া একটা সম-মানসিকতার প্রয়োজনও তো আছে |

তাই ঘণ্টা দেড়েক পর সরিৎ উঠে যখন চাল মেপে ভাত বসাতে গেল, তখন তার মেজাজ বেশ ফুরফুরে | গোটা চোদ্দ পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেছে – এর মধ্যে একজন নিশ্চয়ই তার দাম দেবে | একদিকে ভাত আরেকদিকে ডাল বসিয়ে সরিৎ ফিরে এলো তার বসার ঘরে |

এরপরের কাজটাই সব থেকে শক্ত – নিজের ঘটকালিটা নিজে করা একটু কঠিন বৈকি – বিশেষ করে সরিৎ এর মতন এক মুখচোরা মানুষের| কিন্তু একাকিত্ব তাকে এখন অনেকটাই বলিয়ে কইয়ে করে তুলেছে, অন্তত এই ব্যাপারে | না হলে সপ্তা তিনেক আগে রাখহরি মুখার্জী যখন সরিৎকে বলে – “তোমার কি ইয়ে যে আমি তোমাকে মেয়ে দেব !”, তখন সরিৎ ফোনের ওপর টানা পাঁচ মিনিটে নিজের সম্মন্ধে যা যা ভালো কথা বলেছিল, সেগুলো ডাহা মিথ্যে নয় কিন্তু ষোলো আনা সত্যিও তো নয় | কিন্তু বলার সময় সরিৎ এর গলা তো একফোঁটাও কাঁপেনি | হ্যাঁ তার মানে এই নয় যে সব সময় সফল হয়ে – তবে কাজ তো হচ্ছে, সেটা বড় কথা |

সরিৎ আজকের লিস্টটা দেখল ল্যাপটপে – ৭ জন পাত্রী চাকুরিরত , ১০জন তিরিশোর্ধ, ৫ জন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, ২জন ডিভোর্সই এবং একজন সন্তানহীন বিধবা |প্রথমে সে বাছল – “ পূ:ব: সুন্দরী কায়স্থ , সরকারি ব্যাংকে চাকুরিরতা, প্রা:স: কর্মীর একমাত্র কন্যা, ৩৪/৫”৩’ , বাম হস্তে সাদা দাগ | যোগ্য পাত্র কাম্য | মোবাইল – *********** |” ফোন নম্বর টিপে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে সরিৎ |

অপরপক্ষ – “হ্যালো, কাকে চান? ” বেশ ভারী কিন্তু মার্জিত কণ্ঠস্বর – হাজারহোক ৩৪ বছরের অবিবাহিত মেয়ের বাবা কিনা!সরিৎ ভাবনা গুছিয়ে বলে – “নমস্কার, আমার নাম সরিৎ সোম | হর্ষবাজার পত্রিকার পাত্র – পাত্রী কলামের বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করছি | “

অপরপক্ষ – “হ্যাঁ বলুন, পাত্রের সম্মন্ধে যা বলার বলুন |”

সরিৎ – “আজ্ঞে, আমি নিজে পাত্র | আমি একজন ——- ” সরিৎ তার নিজের তৈরি করা সংক্ষিপ্ত একটা পরিচয়ে দিল | এই পরিচয় অনেক সময় খরচ করে বানানো – এর মধ্যে কোনো এমন মিথ্যে নেই যা খোঁজ করলে ধরা যাবে | তার চাকরি, তার স্ত্রী-পুত্র বিয়োগ ইত্যাদি কোনো কথা গোপন না করে সরিৎ নিজের পরিচয় জ্ঞাপন করল|

অপরপক্ষ – “আমার নাম কুশল বসু | আপনার কথা শুনলাম, আপনার নম্বরটা সেভ করে নিচ্ছি – একটু বাড়িতে কথা বলি| কথা এগোনোর হলে আপনাকে ফোন করবো |”
সরিৎ এবার খুব উদার গলায় ঠিক আছে বলে ফোনটা নামিয়ে রাখল | সরিৎ যে খুব একটা চিন্তিত তা নয় – সে জানে এরকম বেশ কিছু “না”, “পরে জানাবো”, “ভেবে দেখবো” পার করে তার “হ্যাঁ” টা আসবে|

আধ ঘন্টা পরে যখন সরিৎ ভাত আর ডালের ব্যবস্থা করতে গেলো ততক্ষণে সে ৩ জায়গায় শুরুতে না, ২ জায়গায় পরে ভেবে জানাবো এবং ১টা শেষ পর্যায় না শুনে ফেলেছে | এই শেষ পর্যায় না টা একটু বোঝাতে হবে | যেখানে একটু কথাবার্তা আগে যায় সেখানে সরিৎ বলে – “আমি আপনাদের মেয়ের সাথে কোনো সম্মত জায়গায় আগে একটু কথা বলে নিতে চাই, পারস্পরিক চিন্তাভাবনা কিছুটা না মিললে তো বেশী কথা এগিয়ে লাভ নেই|” তো আজ একটা ফোনালাপই অতটা এগুলো – কিন্তু তাতে পাত্রীপক্ষ রাজি হয়েনি |

ভাত – ডাল এর ব্যবস্থা হয়ে যাওয়াতে , সরিৎ বাকি রান্না ফ্রীজ থেকে বার করে রেখে আবার কাজে লেগে পড়ল| চান যাওয়ার আগে বাকি আটটার চারটে সেরে ফেলতে হবে | লিস্টটাতে চোখ বুলিয়ে এবার বাছল – “Alliance invited for pretty widow 32/5”4’ MCom without issues, works at private bank,  seeks established professional from Kolkata”.

অপরপক্ষ – “হ্যালো”|

সরিৎ নিজের পরিচয় এবং ফোনের হেতু জানাল |

অপরপক্ষ – “আমি মিত্রার দাদা, প্রশান্ত মিত্র | মানে আমার বোনের ক্লাসিফাইড এডভার্টাইসমেন্ট আপনি দেখেছেন – বলুন|”

সরিৎ নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জ্ঞাপন করে পাত্রী সম্মন্ধে জানতে চাইল |

প্রশান্ত – “মিত্রা চাকরি করছে – সে আমাদের সাথে আমাদের পৈতৃক বাড়িতেই থাকে – আমাদের বাবা মা গত হয়েছেন – মিত্রার  এক্স-হাসব্যান্ড বছর দুই হল স্ট্রোক হয়ে মারা যায় – মিত্রা প্রথম দেড় বছর বিয়েতে কিছুতেই রাজি হয়নি – শেষমেশ আমাদের কথায় সে রাজি হয়ে – কিন্তু কথা এগোনোর আগে সে চায় পাত্রের সাথে আলাদা করে কথা বলে নিতে “|

সরিৎ শুনে ভাবল – যাক এবার আর আমাকে দেখা করার কথা বলতে হল না| সে বলল – “আমার আপনার বোনের সম্মন্ধে শুনে, তার লসের কথা শুনে খুব খারাপ লাগল | আপনারা সম্মত হলে আমি ওনার সাথে কথা বলতে প্রস্তুত|”

প্রশান্ত – “আমি তাহলে আপনার নম্বর ওকে দিয়ে দেব, আপনারা কথা বলে নেবেন |”

সরিৎ – “আমার পরের শনিবার এর আগে দেখা করা হবে না, রোজ অফিস থেকে বেরুতে ৭টা হয়ে |”

প্রশান্ত – “কোনো অসুবিধে নেই – আমি মিত্রা কে জানিয়ে দেব |”

ফোনটা ছেড়ে সরিৎ হাঁপ ছাড়ল – আজকের সকালের কাজ মিটল | এদিকে ঘড়িতে প্রায় একটা বাজতে চলল দেখে সে দৌড় মারল বাথরুমের দিকে | রেডি হতে হবে যে – গত সপ্তাহের পাত্র চাই কলমের খোঁজ সুমিতা সরকার অপেক্ষা করবে যে লেকটাউন সিসিডি তে|

 

বিকেল চারটে – ভি.এই.পির থেকে অটোতে বসে সুমিতা সরকারের প্রোফাইলটা ভেবে নিল | ৩২ বছর বয়সী সরকারি স্কুল শিক্ষিকা, কালিন্দী দমদমে বাড়ি, বাবা-মার একমাত্র মেয়ে | গত রবিবার আজকে দেখা করার এপয়েন্টমেন্ট হওয়ার পর কাল রাত নটায় সুমিতা ফের একবার ফোন করে – নিজের সম্মন্ধে কিছু কথা বলতে|সরিৎকে সে ধন্যবাদ জানায় শুরুতে আলাদা দেখা করতে চাওয়ার জন্যে |সিসিডির সামনে নেবে অটোভাড়া মিটিয়ে সরিৎ পা বাড়াল |

ভেতরে ঢুকে চোখ বুলিয়ে দেখলো ৩টে টেবিলে লোকজন বসে – তারমধ্যে একটা টেবিল একলা এক মহিলা | সামান্য পৃথুলা, মাঝারি ফর্সা, গোল মুখ, কমলা আর সবুজের কম্বিনেশনে সালোয়ার কামিজ পরনে | সরিৎ এগিয়ে গেলো – “আপনি কি সুমিতা ?”

ফর্সা, গোল মুখ উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলো | “বসুন |”

সরিৎই কথা শুরু করল – “বেশিক্ষন অপেক্ষা করেন নিত?”

সুমিতা – “না, মিনিট পাঁচেক হল|”

সরিৎ মোটামোটি  সহজ গলায় বললো – “কি খাবেন বলুন, একটু গলাটা ভিজিয়ে নিলে মন্দ হত না |”

সুমিতা একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে – “আমি একটা আইস টি নেবো |”

সরিৎ কাউন্টারে গিয়ে নিজের আর সুমিতার অর্ডারটা দিয়ে এসে বলল – “কফিটা আমার ঠিক ভালো লাগে না |” এইগুলো সেরকম অসত্য যা কোনো ক্ষতি করে না , আর ধরা পরার ব্যাপারটা থাকে না |

সরিৎ এরপর নিজের জীবনের শেষের কয়েক বছরের কথা বলল – সুখের সংসার থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পরার কথা | এগুলো সরিৎ এর খুব যে বলতে ভালো লাগে তা না – কিন্তু নতুন মানুষের সাথে আলাপ পরবর্তী প্রশ্নের মধ্যে এটা বেশ কমন |

সুমিতা – “বাবা কিছুটা বলেছিলেন আপনার কথা, সত্যিই দুঃখের | থাক আর পুরানো কথায় গিয়ে কাজ নেই |”

সরিৎ একটা কাষ্ঠহাঁসির সাথে জবাব দিলো – “হ্যাঁ সামনে তাকানোই ভালো | আপনার স্কুলের কথা বলুন |”

এইভাবে সুমিতার স্কুল থেকে সরিতের ফার্ম – সুমিতার বাবা মা এবং এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি থেকে সরিতের আত্মীয়পরিজন – দুজনের পছন্দের হবি আর অপছন্দের মানুষ – দুজনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা – এইভাবে এক থেকে অন্য বিষয়ে জল গড়াতে থাকল পরের ঘন্টা দুই | এরইমধ্যে আইস টির পর চিলি চিজি টোস্ট ,দার্জিলিং টি টেবিল ঘুরে গেছে |

সরিৎ চায়ের কাপ শেষ চুমুকটা দিয়ে সামনে তাকাতেই সুমিতা জিগ্যেস করলো – “একটা কথা জানতে চাইলেন না তো ? ৩২ বছর বয়েসে এখনও অবিবাহিত কেন আমি ?”

সরিৎ মুখের একটা পেশীতেও কোনোরকম অস্বাভাবিকতা না রেখে বলল – “সেই কথার তো কোনো প্রয়োজন নেই এইখানে, যেই কারণেই হোক আপনি এখনো অবিবাহিত আর আমি বিপত্নীক | আর সেই কারণে আমাদের কথা এগোতে পারে আর তাই আমাদের আজ কথা বলতে আসা |”

তারপর হালকা মুখ টিপে এসে সরিৎ বলল – “তাছাড়া শুরুতে তো আপনি বলেই দিলেন পুরোনো কথায় কাজ নেই |”

দুজনে এবার কাফের ভদ্রতার পরিধি না ভেঙে যতটা প্রাণখোলা হাঁসি হাসা যায়, ততটা হাসল |

এরপর আরো ঘন্টাখানেক চললো আলাপচারিতা – আর সুমিতা অনেকটা বেশি খুলে বেড়ালো – শেষের দিকে তার যে সরিৎকে ভালো লেগেছে সেটা তার চোখে মুখে বেশ বোঝা গেলো |

ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়ে কিছুদূর যেতে সরিৎই ওঠার কথা বলে | বিল মিটিয়ে ওরা বাইরে আসলো যখন তখন ঠিক সাড়ে সাতটা | সরিৎ জিজ্ঞেস করল কি ভাবে যাবে সুমিতা?

সুমিতা – “এই যশোর রোডের থেকে তো রিকশা পেয়ে যাবো |” কথাটা বলে সরিৎ এর  দিকে তাকাতে সরিৎ ইঙ্গিতটা বুঝে বললো – “ঠিক আছে তাহলে যশোর রোড অব্দি হেঁটে যাওয়া যাক |”

বিশেষ হেতুতে তুমি এড়ানোর জন্যে ভাববাচ্যের প্রয়োগ শ্রেয় মনে করল সরিৎ |

একথা, ওকথার মধ্যে দিয়ে ওরা যশোর রোডে এসে পড়ল – সরিৎ সুমিতাকে একটা রিকশা ধরে দিল | সুমিতা হেসে বললো – “আশা করি আবার দেখা হবে |”

সুমিতার রিকশা ভিড়ে হারিয়ে যেতেই সরিৎ একটা ট্যাক্সি ধরল – আর এখন অটো ঠেঙিয়ে যেতে ইচ্ছে করল না | রবিবাসরীয় আড্ডা বা আলাপচারিতার পর সে একটু যেন ক্লান্ত হয়ে পরে |

ট্যাক্সি চলতে চলতে সরিৎ হিসাব করে দেখলো যে সুমিতা হলো ৩৭ নম্বর পাত্রী যার সাথে সে দেখা করলো | মোটামোটি একটা ছকে পরে গেছে – রবিবার সকালে পাত্রী শর্টলিস্ট করে ফোন করে ঠিক জনকে বাছা – পরের শনি / রবি বিকেলে তাদের সাথে সময় কাটানো – আবার রবিবার সকালে পরের সপ্তাহান্তের সঙ্গী বাছা |

ভাবনাতে ছেদ পড়ল জোড়া মন্দিরের কাছে ট্যাক্সিটা বাঁক নিতেই | মোবাইলে একটা মেসেজ ঢোকার ইঙ্গিত – চেক করে দেখে সুমিতা | “সময়টা ভালো কাটল – থ্যাংক ইউ – আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি |”

সরিৎ যেন আরো কিছুটা গুটিয়ে গেল, ভাবলো – “নাহ রাতেই ফোনটা করতে হবে |” আর ট্যাক্সিটা তখনি শোভনা এপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল |

 

রাত পৌনে দশটায় নিচের থেকে রুটিটা নিয়ে এসে ফোনটা করল সরিৎ | নিজের চেনা ঢঙে গলায় একটা মার্জিত ভাব এনে সুখেন সরকার কে সে বললো – “সুখেনবাবু আমার সুমিতার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে – ও খুব ভালো মেয়ে | তবে আমার মনে হলো যে আমাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কটা না হওয়া ভালো | মানে আর কিছু না , আমাদের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে এটা বুঝেছি যে এই সম্পর্ক আর না এগোলেই ভালো |”

পারস্পরিক ভাবে কতগুলো বিরোধী কথা বলে সরিৎ এবার সুখেনবাবুকে বলার সুযোগ দিল |

সুখেন – “সুমিতারও তোমার সাথে কথা বলে ভালোই লেগেছিলো | কিন্তু তুমি যখন চাইছ না – তখন এই ব্যাপারটা আর আগে না যাওয়াই ভালো | ধন্যবাদ |”

ফোনটা কেটে একটা দীর্ঘনিঃস্বাশ ছেড়ে সরিৎ সোফায় বসল – আরেকটা রবিবারের ইতি |

এতক্ষনে সরিৎ সোমের রবিবাসরীয় দিনলিপি থেকে আপনারা নিশ্চই বুঝেছেন ওর সেই মারাত্মক আইডিয়াটা কি | স্বজনহারা হয়ে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি ফার্মের কাজে আর দিনগুজরানে চলে গেলেও শনিবারের বিকেল থেকে তার মনে হত কখন আবার সোমবার আসবে | কিছুদিন কাজিন,বন্ধুদের বাড়ি গেছে সপ্তাহান্তে – কিন্তু তার কোথাও ভালো লাগত না | বন্ধুদের সবার একটা ফ্যামিলি লাইফ আছে – তাই কেউ না বললে বা সত্যি না ভাবলেও সরিৎ অস্বস্তিতে ভুগত |

তখনি একদিন রবিবারের পাত্র পাত্রী কলামে চোখ পড়তে তার মাথায় এই বুদ্ধিটা আসে | তার বন্ধু – আত্মীয় – শ্বশুরকুল সবাই তাকে আরেকবার বিয়ে করে জীবনে এগোতে বলেছে অনেকবার | কিন্তু তার সেই ইচ্ছে হয়নি , কিন্তু যখন ভাবল এই পাত্র চাই থেকে ঠিকঠাক পাত্রী খুঁজে তাদের সাথে একদিন করে যদি দেখা করা যায় – কথা বলা যায়, তাহলে?

সরিৎ নিজের কাছে পরিষ্কার, সে সম্পর্কে জড়াতে চায়ে না | তার কোনো ইচ্ছে নেই | আর সে এইভাবে কারুর ক্ষতি না করে , কোনো দুরভিসন্ধি না রেখে নিজের মতন করে একটু সময়কাটানোর উপায় পেয়েছে | সে জানে সবাই বুঝবে না – তাই সে কারোকে বলেনি | একাকিত্বের মধ্যেই সে এক আশ্চর্য্য উপায় বের করেছে একাকিত্ব থেকে কিছুক্ষনের মুক্তির |

 

সপ্তাহের শেষ দুটি দিন বাদ দিলে সোম থেকে শুক্র সরিৎ এর জন্যে থোড় বড়ি খাড়া – খাড়া বড়ি থোড় | সকালে রান্নার লোক রান্না করে দিলে, তৈরি  হয়ে অফিসের জন্যে বেরিয়ে পরা, তারপর সারাদিন ফার্মের কাজ করে যাওয়া | অফিসে এখন আর সরিৎ এতটা হুল্লোড়বাজ নয়, হ্যাঁ এমন নয় যে কারোর সাথে কোনো কথা বলেনা কিন্তু আগের সেই এনাৰ্জি যেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না | কাজের শেষে বাড়ি ফিরতে রাত আটটা কি নটা, তারপর একটু গল্পের বই, একটু টিভি আর খাওয়াদাওয়া সহকারে দিনের শেষ | সুমিতার সাথে কাটানো রবিবারের পর পাঁচটা দিন এইভাবেই টুক টুক করে কেটে গেলো |

পরের শনিবার সকালে অফিস ঢোকার সময় মেসেজটা এলো |”সরিৎবাবু আমার দাদার সাথে আপনার কথা হয়েছিল | আমি আজ সন্ধ্যেবেলা দেখা করতে পারি | আমি উত্তর কলকাতার মেয়ে, তাই এইদিকে কোথাও দেখা করা গেলে ভালো হত | — মিত্রা”

মিত্রার নম্বরটা তার মোবাইলে ছিল না, তাই শেষে মিত্রার পরিচয়ে দেওয়া না থাকলে অসুবিধে হত বুঝতে| সরিৎ একটু ভেবে রিপ্লাই বাটন টিপল – “সন্ধ্যে ৭টায় গিরিশ পার্ক মেট্রোর সামনে – অসুবিধা হবে না তো |” মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অস্তর্থক জবাব এলো | সরিৎ দিনের দ্বিতীয় ভাগের প্লানটা ঠিক করে ফেলল |

ঠিক ৭টা বাজতে দশে সরিৎ যখন বেরোচ্ছে মেট্রো থেকে তখন সে চনমনে – শনিবার সন্ধ্যেটা বাড়িতে বসে ডালমুট চিবোতে হবে না এটা সত্যি বড় ব্যাপার | কিছুক্ষন দাঁড়ানোর পর সে দেখল দীর্ঘাঙ্গী, মাজা রঙের এক মহিলা পরনে মেরুন কাজ করা অফ হোয়াইট শাড়ি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে | সরিৎ অপেক্ষা না করে এগিয়ে বলল – “আপনি কি মিত্রা ?”

মিত্রা যেন একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল , ভুল লোকের দিকে তাকায়নি ভেবে আস্বস্ত |

সরিৎ – “চলুন, রাস্তা পার করে বিবেকানন্দ রোডের ওপর একটা রেস্টুরেন্ট আছে | ওখানে বসতে আপত্তি নেই তো |”

মিত্রা – “না, ঠিক আছে – চলুন |”

মিনিট খানেকের হাঁটা পথ মোটামোটি বাক্যহীন কাটল | বিবেকানন্দ রোড আর বিধান সরণি ক্রসিংয়ে এম্বেসী রেস্তোরাঁতে ওরা ঢুকে বসল যখন, তখন ঘড়িতে সোয়া সাতটা | বেয়ারা এসে জল দিয়ে , মেনু কার্ড ধরিয়ে অর্ডার নেওয়ার আগেই সরিৎ কিছু দরকারি খবর নিয়ে নিয়েছে – মিত্রার বাড়ি পাইকপাড়া ২নং বাসস্ট্যান্ডের কাছে, তার একটু রাত করে বাড়ি ফেরাতে সেরকম অসুবিধে নেই, সরিৎ তাকে ফেরার পথে ড্রপ করলে কোনো অসুবিধে নেই আবার না করলেও চিন্তার কিছু নেই, এখন থেকে ডাইরেক্ট বাস সে পেয়ে যাবে |

রেস্তোরাঁর আলোতে সরিৎ মিত্রার মুখশ্রীটা দেখেছে এরমধ্যে – অনাড়ম্বর সাজে লম্বাটে সুশ্রী মুখ | একটা হালকা আঁধার থাকলেও চোখদুটি বেশ ঝকঝকে |দুজনে ওয়ান বাই টু চিকেন হট এন্ড সওয়ার সূপ অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করলো|

মিত্রা – “আপনার স্ত্রী- সন্তানের আকসিডেন্টটা খুবই মর্মান্তিক | কত বয়স হয়েছিল ছেলের ?”

সরিৎ – “ছয়ে – ক্লাস ওয়ান|”

মিত্রা – “লাইফ ব্যাপারটা এতটাই আনসার্টেন যে কি বলবো – আমার সবকিছু শুধু একটা রাতে চেঞ্জ হয়ে গেল |”

দুজনের জীবনটা অনেকটা এক গতে বয়ে যাওয়াতে দুজনে দুজনের লসটা ভালো বুঝতে পারল | আস্তে আস্তে ওদের পুরানো জীবন ছেড়ে সামনের কথা হতে লাগলো | সরিৎ এর কাছে এই বিভিন্ন অলি গলি দিয়ে বয়ে চলা কথোপকথন চেনা অথচ অচেনা | চেনা কারণ গড়পড়তা বাঙালি বছর ত্রিশের মহিলার গল্প একটা ধাঁচে পরে যায় – কিন্তু সবার গল্পই একভাবে আলাদা আলাদা | মিত্রার সাথে কথা বলে একটা জিনিস সরিৎ এর ভালো লাগলো ওর স্পন্টেনিটিটা , মেয়েটার আড়ষ্ঠতা নেই বিশেষ |

ঘন্টা তিনেক বাদে কথা আর খাবার শেষ করে বেড়ানোর সময় আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতা হলো সরিৎ এর – মিত্রা কিছুতেই রাজি নয় যে সরিৎ বিল মেটাবে | হয়ে সে পুরোটা দেবে নয়তো অর্ধেক – অর্ধেক | শেষ পর্যন্ত সরিৎ রাজি হলো মিত্রাকে বিল মেটাতে দিতে কারণ অর্ধেক অর্ধেক ব্যাপারটা দৃশ্যকটু – কিন্তু তার সাথে সরিৎ এই প্রস্তাবে মিত্রাকে রাজি করল যে আগামীকাল লেকটাউন এর সিলভার চিমনিতে ডিনার খাওয়াবে সরিৎ |

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে দশের দিকে এগোচ্ছে দেখে সরিৎ একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিল | মিত্রাকে নামিয়ে সে চলে যাবে তার ঠিকানায় | মিত্রার বাড়ির সামনে ট্যাক্সি তা দাঁড়ালে, মিত্রা নেবে বলল – “কাল দেখা হচ্ছে তাহলে”| মিষ্টি হেসে ঘুড়ে চলে যেতে সরিৎ এর কেন জানি না মনে হলো মেয়েটা আলাদা | কিন্তু পর মুহূর্তে ভেবে নিল , কাল এই সময়ের মধ্যে তো সেই ফোনটা সে করেই দিয়েছে, “না” হয়েও গেছে – তাহলে আর ভেবে কি লাভ | সরিৎকে নিয়ে ট্যাক্সিটা রওনা দিল বাগুইআটির উদ্দেশে |

 

কথায় বলে মানুষের জীবনে সবই প্রথম একবার ঘটে – আর সেইটা যদি ভাবনার উল্টোদিকে হয়ে তাহলে ঘটনাটা অনেকটা সপাটে চড় খাওয়ার মতন হয়ে | পরের দিন রবিবার রাত দশটা দশে ঠিক সেরকম একটা চড় খেল সরিৎ|

তার আগে অব্দি তার রবিবার ছিল একদম ছকে ছক মেলানো | সকালে বাজার – খবরের কাগজের পাত্র/পাত্রী কলাম – কিছু ফোনের মাধ্যমে পরের সপ্তাহের সঙ্গী বাছা – সন্ধ্যে ছটা থেকে সাড়ে আটটা অব্দি মিত্রার সাথে আড্ডা | মিত্রাকে ওর বাকিদের থেকে ভালো লাগা একটা ব্যাপার ছিল কিন্তু তবুও শেষমেশ ফোনে না বলবে ভেবে বাড়ি ফিরল সরিৎ|

ঠিক দশটা দশে প্রশান্ত মিত্রর – মিত্রার দাদা – ফোন | একটু অবাক হয়েই ফোনটা ধরল | সৌজন্য বিনিময়ে করার পর প্রশান্ত বলল – “সরিৎবাবু মিত্রা তো আপনার সাথে দুদিন দেখা করল – শুনলাম আপনাদের কথাবার্তাও ভালোই হয়েছে – কিন্তু মিত্রা ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোতে চেয়ে না |”

ধাক্কা খেয়ে সরিৎ বলে উঠল – “না-এর কোনো কারণ বলেছেন কি মিত্রা ?” – বলে নিজেই অবাক হয়ে গেলো এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে |

প্রশান্ত সাবধানী গলায় বললো – “মিত্রা একটু চাপা ধরণের মেয়ে, বিশেষ খুলে কিছু বলল না – খালি বলল ওর মনে হয়েছে না এগোনোই ভালো |”

এবার নিজেকে সামলে নিল সরিৎ | হালকা গলায় বললো – “ঠিক আছে | ভালো থাকবেন ” – ফোনটা কেটে দিল |

একদিক দিয়ে দেখলে এতে সরিৎ এর অসুবিধের কিছুই নেই | সে “না” বলত, তার বদলে “না”টা বলেছে মিত্রা | কিন্তু সেই পুরুষ অহম সরিৎ কে ব্যাপারটা মানতে দিল না – তার সাথে ওর মনে একটা খটকা দেখা দিল ব্যাপারটা কি সত্যি যেরকম সে দেখল , কোনো কারণ নেই কিন্তু ষষ্ঠইন্দ্রিও যেন তার মনে একটা খুঁতখুঁতানি ঢুকিয়ে দিল |

সেইদিন রাতে কোনোরকমে ঘটনা পরম্পরা মন থেকে সরালেও, পরের দিন সকালটা সরিৎ শুরু করল সেই একটা অসোয়াস্তি দিয়ে | ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে, সরিৎ প্রায় বছরখানেক বাদে ছুটি নিলো | সে ফার্মে ফোন করে বিশেষ হেতুতে ছুটি নিল – আপাতত দিন দুয়েক, তারপর জানাবে | ফার্মের মুখার্জী সাহেব একটু অবাক হলেন সরিৎ এর ছুটি নেওয়াতে , কিন্তু যে মানুষটি শেষ এক বছর একটাও ছুটি নেয়নি তাকে তো কিছু বলার থাকে না |

ছুটি নিয়ে কি করবে সরিৎ ছকে ফেলল – মিত্রার একটু খোঁজ নিতে হবে | দুদিনে কথায় কথায় সে জানতে পেরেছে মিত্রা এক্সিস ব্যাংকে কাজ করে – পার্ক স্ট্রিটের থেকে মেট্রো ধরে শনিবার গিরিশ পার্ক আসে | সরিৎ এর ফার্মের সুমনের বৌ কাজ করে এক্সিস ব্যাংকে – পার্ক স্ট্রিট ব্রাঞ্চে | সরিৎ সুমনকে ফোনে ধরে ওর বৌ মৌমিতাকে বলল একটু জানতে ওদের ব্রাঞ্চে কেউ মিত্রা নামের আছে কিনা – এও বলল ওদের ব্রাঞ্চে না হলেও অন্য কোনো ব্রাঞ্চে কেউ আছে কিনা সেই খোঁজ নিতে|

তারপর সে ঠিক করল পাইকপাড়া যাওয়া যাক – তার এক দূরসম্পর্কের পিসি আগে থাকতো যদুবাবুর বাজারের দিকে| একবার ওই পাড়ায় কোনো পুরানো চেনা লোক থাকলে একটু দেখা যেতে পারে|

শুরুতে ব্যাপারটাতে একটা হেরে গিয়ে হার না মানা রকম থাকলেও যখন সরিৎ বাড়ির থেকে বের হল তখন অনেকটা কৌতূহল এবং রোমাঞ্চ দানা বেঁধেছে তার মনে |

 

পাইকপাড়া পৌঁছে সরিৎ তার পদ্মপিসির বাড়িতেই গেল আগে | কেউ থাকে না পিসি চলে যাওয়ার পর | তবে একতলায় এক ভাড়াটে থাকে যার সাথে সরিৎ এর আলাপ আছে | সাত-পাঁচ ভেবে তার কাছেই গেলো | ভদ্রলোক স্কুলে পড়ান – বেলা এগারোটার আগে বেড়োন না, তাই দেখা হয়ে গেলো | তো যতীন বাবুকে সরিৎ বলল – “ফার্মের একটা ছেলের বাড়ি থেকে এক পাইকপাড়ার বাসিন্দার খোঁজ নিতে বলেছে, মনে হয়ে বিয়েথার ব্যাপার |”

যতীনবাবু – “দেখো যদি আমাদের পাড়ার হতো হয়তো বলতে পারতাম, কিন্তু দু নম্বর বাসস্ট্যান্ড, মানে রানী রোডের দিকে ঠিক বলতে পারব না | এক কাজ করতে পারো আমার এক পুরানো ছাত্র আছে – আজকাল কেবল টিভির কাজ করে, ওর সাথে কথা বলতে পারো|”

এরপর যতীনবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে সরিৎ গেল কেবল টিভি অফিসে হোৎকার খোঁজে – ভাগ্য ভালো বেরোবার মুখে  হোৎকাকে পেয়ে গেল সরিৎ | এমনিতে পাত্তা দিত না, কিন্তু মাস্টারমশায় পাঠিয়েছে শুনে  হোৎকা একপায়ে রাজি সাহায্য করতে |

মিত্রার বাড়ির ঠিকানা জানা ছিল না – কিন্তু প্রশান্ত মিত্র আর মোটামোটি জায়গার আন্দাজ দিতে  হোৎকা ঝাঁপি খুললো – “স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে কাজ করে প্রশান্তদা – বোনের বিয়ে হয়েছিল – দু বছর হলো বিধবা – প্রশান্তদা সোর্স খাটিয়ে ঢুকিয়ে দিলো ব্যাংকে – বাড়িতে মা আছেন – আর প্রশান্তদার বৌ , মেয়ে – প্রশান্তদা ভালো লোক , সময় টাকা দিয়ে দেয় – মিত্রা চুপচাপ মেয়ে – ওর সম্মন্ধে বিশেষ জানা নেই – তবে কোনো লাফড়ার কথা শুনিনি স্যার |” – নামতা  শেষে  হোৎকা একটা বড় শ্বাস নিলো |

হোৎকাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ঘুড়তে যাবে – হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল সরিৎ এর | জিজ্ঞেস করল  হোৎকাকে – “ভাই প্রশান্ত বাবুর নম্বর আছে তোমার কাছে |”

হোৎকা হলুদ – খয়েরি দাঁত বের করে জানায় অবশ্যই আছে – বলে নম্বর মোবাইল দেখে জানিয়ে দেয় |

কেবল টিভি অফিস থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা নিশানা পেয়ে সরিৎএর মুখে প্রশস্তির হাঁসি | প্রথম দিন প্রশান্ত বলেছিল – বাবা মা গত হয়েছেন, কিন্তু হোঁৎকার খবর অনুযায়ী মা আছেন প্রশান্ত আর মিত্রার | এইটুকু থেকেই সরিৎ এর খটকা আর খটকা থাকে না – সত্যির মধ্যে হালকা মিথ্যে যা বলাতে ক্ষতি নেই, তার চেনা ছক | তাই সে নম্বরটা চাইল – সেখানেও গরমিল| এই নম্বর আর তার কাছে আসা প্রশান্তর ফোন নম্বর এক নয় | হতেই পারে দুটো নম্বর, কিন্তু সেটা বাজিয়ে দেখতে হবে |

হোঁৎকার থেকে পাওয়া নম্বরে ফোন করল সরিৎ | একটা অচেনা গলা – “হ্যালো |”

সরিৎ – “নমস্কার, আমি সরিৎ কথা বলছিলাম|”

প্রশান্ত মিত্র – “হ্যাঁ বলুন | কি ব্যাপারে, কোথা থেকে বলছেন?” – শুনে মনে হল না নামটা এর আগে শুনেছেন বা গলাটা আগে কানে এসেছে |

সরিৎ তৈরী জবাব দিলো – “স্যার, আমাদের ব্যাঙ্কের তরফ থেকে ….. |” প্রশান্ত মিত্র অভ্যেস মতন  দু একটা শব্দ ব্যবহার করে ফোনটা কেটে দিল |

সরিৎ এর নিস্তরঙ্গ জীবনে এ এক তাজা হাওয়া | এক মহিলার সাথে ম্যাচ-মেকিং হেতু দেখা, দুদিনের বেশ মসৃন আলাপচারিতার পর মহিলা তাকে না বলে, তারপর দেখা যায় মহিলার দাদা পরিচয়ে যে ফোন করে সে তার দাদা নয় এবং মহিলার দেওয়া তথ্য কিচ্ছু কিছু অসত্য |

বি.টি. রোডের ওপর একটা চায়ের দোকানে বসে একটা চা নিয়ে সরিৎ চুম্বকে পুরোটা ভেবে নিল| ভাবছিল পরের পদক্ষেপ কি হতে পারে | ঘড়িতে ১১.৩০. আর তখনি মোবাইল বেজে উঠল – সুমন এর স্ত্রী মৌমিতা | ফোনটা ধরতেই, মৌমিতা বলে উঠল – “সরিৎদা, তোমার মিত্রাকে পাওয়া গেছে | আমাদের ব্রাঞ্চে নয়, রবীন্দ্রসদনে একজন আছে | বছর দেড়েক হল ঢুকেছে – উইডো – লোন ডিপার্টমেন্টে কাজ করে | ফোন নম্বরটা পেয়েছি, আমি মেসেজ করে দিচ্ছি |”

সরিৎ থাঙ্কস বলে ফোনটা কেটে দিল | চা শেষ হবার আগেই মেসেজ চলে এল – এবার নম্বর মিলেছে মানে যেই মিত্রার সাথে তার কথা – দেখা – পরিচয় সেই মহিলা এক্সিস ব্যাঙ্ক রবীন্দ্রসদন ব্রাঞ্চে কাজ করে |

সরিৎ এর পরের পদক্ষেপ মাথায় এলো লাঞ্চ করতে করতে | কি করি, কি করি করতে করতে সিটি সেন্টারে চলে এসেছিলো – প্রায় এক বছর বাদে কোনো কারণ ছাড়া সে একটা ভালো রেস্তোঁরাতে একা একা খেতে ঢুকেছে | তবে সেটা আজ কাজে লেগে গেল – লাঞ্চের সময় এক পঁচিশ ছাব্বিশের ছেলে মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে ট্রু কলার অ্যাপ-এর কথা তুলতেই সরিৎ নড়েচড়ে বসল | এই অ্যাপ-এর কথা সে শুনেছে, যদিও ব্যবহার করেনি |

সঙ্গে সঙ্গে তার মোবাইল খুলে অ্যাপটা ডাউনলোড করে ফেলল – এবার যেই নম্বরটা পাত্র পাত্রী বিজ্ঞাপনে দিয়েছিল প্রশান্ত মিত্রর নামে সেটা দিয়ে খুঁজলো ট্রু কলারে | জয়দীপ ব্যাঙ্ক – লেখাটা পরেই সে লাফিয়ে উঠলো | খাওয়ার কথা ভুলে আবার ফোন করলো মৌমিতাকে |

মৌমিতা – “হ্যাঁ সরিৎদা  |”

সরিৎ – “মৌমিতা, সরি আবার জ্বালাচ্ছি |”

মৌমিতা – “আরে বলো না, কোনো চাপ নেই |”

সরিৎ – “জয়দীপ বলে কেউ আছে কিনা ওই রবীন্দ্রাসদন ব্রাঞ্চ বা অন্য কোনো ব্রাঞ্চে |”

মৌমিতা – “ঠিক আছে, দেখে বলছি | কিন্তু পরের দিন বাড়িতে এসে পুরো গল্পটা বলতে হবে কিন্তু, হি হি|”

সরিৎ আচ্ছা বলে ফোনটা ছাড়ল | বাকি খাবার শেষ করতে করতে হিসাবটা কষে নিল – যদি মৌমিতার দিক দিয়ে খবর আসে তো ভালো – নাহলে কালই মিত্রার মুখোমুখি হবে |

বিল মিটিয়ে আর মৌরি মুখে দিয়ে বেড়িয়ে এল সরিৎ |

 

মৌমিতার ফোনটা এল পরের দিন বেলা এগারোটার সময় | প্রথমেই সরি বলল দেরির জন্যে, তারপর বললো – “জয়দীপ নামের কাউকে পেলাম না সরিৎদা, না ওই ব্রাঞ্চে না অন্য কোনো এক্সিস ব্যাঙ্ক ব্রাঞ্চ |”

সরিৎ হালকা নিভে যাওয়া গলাতে বললো – “ঠিক আছে |” কাল রাতে একা ব্যালকনিতে বসে সরিৎ অনেক ভেবেছে | সে এইভাবে মিত্রাকে ধাওয়া করছে কেন – এটা কি শুধুই সত্যিটা জানার ইচ্ছে ? নাকি আরো কিছু আছে | পুরো ব্যাপারটার শেষ না দেখা অব্দি সরিৎ সেই শান্তিটা পাচ্ছে না যে, ঠান্ডা মাথায় ভাববে |

ফোনটা কেটে একটু ভাবল | রেডি হয়ে সরিৎ বেড়িয়ে পড়ল | নিজের ফার্মের নিচে পৌঁছাতে লাগল ঘন্টাখানেক | ফার্মে না ঢুকে সরিৎ ফোন করল সুমনকে – “ফোনটা নিয়ে একটু নিচে নামো তো |”

সুমনের ফোনটা নিয়ে সরিৎ জয়দীপকে ফোনটা করল | গলাটা একটু পাল্টে বলল – “জয়দীপবাবু ?”

জয়দীপ – “হ্যাঁ বলছি |”

সরিৎ নিজের প্ল্যান অনুযায়ী বলল – “আপনি আমাকে মাস চারেক আগে একবার ফোন করেছিলেন, ব্যাঙ্কের একটা অফার নিয়ে| “

জয়দীপ – “হতে পারে, কিন্তু আপনার নম্বর আমার কাছে নেই | বলুন কি ব্যাপারে কথা হয়েছিলো, এখন কি করতে পারি |”

সরিৎ – “পার্সোনাল লোন নিয়ে |”

জয়দীপ – “তাহলে স্যার আপনার কিছু ভুল হচ্ছে আমি ব্যাংকে আছি কিন্তু লোন ডিপার্টমেন্টে না |”

সরিৎ দেখল আর কিছু বলে লাভ নেই তাই আচ্ছা সরি বলে ফোনটা ছেড়ে দিল | সুমনকে আর কিছু না বলে ফোনটা ফেরত দিয়ে সরিৎ এগিয়ে গেল | আর কোনো রাস্তা নেই ভেবে সে রবীন্দ্রসদনে দিকে রওনা দিল |

সন্ধ্যে তখন ছটা, ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেছে এলগিন রোডে এক্সিস ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে | তখনই মিত্রাকে দেখতে পেল সরিৎ | আজ একটা সাদা – সবুজ শাড়ি , একই রকম প্রসাধন – আড়ম্বরহীন সাজ | মিত্রা একা মেট্রোর রাস্তা ধরতে সরিৎ ওর পাশে চলে আসে | বলে – “আধ ঘন্টা সময় হবে?”

মিত্রা একটু চমকে ওঠে, তাকিয়ে চিনতে পেরে সামলে নেয়| বলে – “ও আপনি |” সাথে সেই চেনা মিষ্টি হাঁসি |

সরিৎ – “আধ ঘন্টা সময় হলে একটু বসা যায়? দুটো কথা বলার ছিল| কথা দিচ্ছি আর বিরক্ত করব না|”

মিত্রা – “এমা, বিরক্ত কেন করবেন | চলুন, কোথায় বসবেন |”

সরিৎ – “২৪ চৌরাঙ্ঘি রোড বসা যাক|”

দুজনে পা চালিয়ে পৌঁছে গেলো কিছুক্ষনে| দুটো মোমো অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করলো সরিৎ| কোনো ভনিতা না করে বলল – “জয়দীপের নম্বরে এডভার্টাইসমেন্ট দেওয়ার কারণ কি ?”

মিত্রা সেই মিষ্টি হেঁসে – “ও তাহলে জয় আমাকে ঠিকই বলেছে – আপনিই ওকে ফোন করেছিলেন !”

সরিৎ মরিয়া ব্যাপারটা জানতে – “হ্যাঁ আমিই |”

মিত্রা – “দেখুন আমি বুঝতে পারছি আপনি খুব ডিস্টার্বড হয়ে আছেন | আমি পুরোটা বলছি – কিন্তু আগে বোলেনি আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, না কোনোরকম ঠকবাজি করেছি |”

মিত্রা – “অমিতাভ চলে যাওয়ার পর দাদা, মা, বৌদি সবার সঙ্গে থাকলেও খুব একা লাগত |মনে হতো কিভাবে কাজের বাইরের সময়টা কাটবে| বন্ধু স্বজন কারুর সাথেই ভালো লাগত না | তখনই পাত্র পাত্রী কলাম থেকে আমার মাথায় একটা আইডিয়া আসে | ভাবি কিছু সম্ভাব্য পাত্রের সাথে সময় কাটালে কেমন হয়ে – খারাপ কিছু না, শুধু বসে গল্প করা – কিছু মানুষকে চেনা – কিছু অভিজ্ঞতা – কিছুটা সময় কেটে যাওয়া | এই ভাবেই শুরু | প্রথমে নিজে ফোন করতাম – কিন্তু দেখলাম পাত্রী নিজে ফোন করছে এইটা লোকের ভালো লাগছে না | তাই তখন আমার খুব ভালো বন্ধু – স্কুলের বন্ধু – জয়ের হেল্প নিলাম | ও আমার দাদা সেজে ফোন করত | দেখা সাক্ষাতের পরে ওই ফোন করে না বলে দিত| কিছুদিন আগে জয়ের বুধ্ধিতেই ভাবলাম আমি একটা অ্যাড দিয়ে দেখি|”

মিত্রা পুরোটা বলে দম নিল, দিয়ে একটু জল গলায় দিয়ে সরিৎ এর দিকে তাকালো ধরা পড়া যাওয়া দৃষ্টিতে – “আপনিও সেইভাবেই আমাদের নাম্বার পান আর তারপর যা হয়েছে তো বুঝতেই পারছেন |”

সরিৎএর সামলাতে একটু সময় লাগলো | ও শুনেছিলো দুটো মানুষ একই রকম ধারায় চিন্তা করেছে পৃথিবীর দুই প্রান্তে – এরকম অনেকবার ঘটেছে | সেই দিক দিয়ে ভাবলে এখানে বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই | কিন্তু তবু নিজের জীবনের লুকিয়ে রাখা , অত্যন্ত সযত্নে লালিত এক চিন্তাধারা যা সরিৎ ভেবে এসেছে একান্ত তার, আজ যখন অন্য একজনের কাছ থেকে সেই উপলব্ধি শোনে তখন একটা ধাক্কা তো লাগবেই |

তারপর যে সিক্রেট এতদিন তার একার ছিল সে এবার মিত্রার কাছে মেলে ধরল |

দুজনে দুজনেরটা শোনার পর কিছুক্ষন চুপ করে রইল | মিত্রাই আগে হেঁসে উঠলো, আর তারপরে সরিৎ ও | আজ আর ওদের আশপাশের কারুর কথা মনে হল না | কিছুক্ষন পরে দুজনেই যখন অনেক হালকা হল তখন আবার সেই কথোপকথন শুরু হল যা কাল রাতের ফোনে কেটে গেছিল | কখন রাত দশটা হয়ে গেছে কেউ বুঝল না |

বাইরে এসে সরিৎ বলল – “তাহলে এবার থেকে মাঝে মাঝে দেখা হতেই পারে – আর তো কারুর কিছু লোকানোর রইল না |”

মিত্রা সেই মিষ্টি হাঁসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো |

সরিৎ একটা ট্যাক্সি ডেকে বললো – “চলো তোমায় নামিয়ে দিয়ে যাবো |” আজ আর ভাববাচ্যের সাহায্য লাগলো না | এক নৌকায় বসা দুজনের অনুরণন আজ একদম পারফেক্ট – তাই অস্পষ্টতা, অস্বচ্ছতা, দ্বিধা পেরিয়ে আজ যেন এক নতুন আলাপ |

 

পুনশ্চ

মাসছয়েক পরের কথা | ৪ নম্বর রানী রোডের সামনে ট্যাক্সিটা থামলে, সরিৎ তার থেকে নামল | মিত্রাকে প্রথমবার ট্যাক্সি করে নামানোর ঠিক ৬মাস ৭দিনের পর আজ সরিৎ এসেছে প্রথমবার প্রশান্ত মিত্র আর তাদের মা এর সাথে দেখা করতে | একটা চাপা টেনশন ছিল আর ঠিক তখনই গেট বন্ধ করে হোঁৎকার আবির্ভাব | এক মুহূর্ত লাগলো সরিৎকে চিনতে – “হে হে স্যার আপনি নিজেই | হে হে , ভালো ভালো |” – সেই হলুদ – খয়েরি ছোপ দাঁত দেখিয়ে হোঁৎকা বিদায় নিল |

তবে তার কথাটা ঠিক — ভালো, সবটাই আজ ভালো |

শুভ নববর্ষ

আজ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক আগে আমরা ‘ও কলকাতা’ শুরু করেছিলাম পয়লা বৈশাখের দিন। খুবই সাধারণ, আড়ম্বরহীন একটা পোস্ট – এসে গেল ‘ও কলকাতা’র সাইট এবং সেই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যতটুকু নিজেদের বলা যায়। কয়েক বছর কেটে গেছে – অনেক নতুন, পুরনো লেখক ওয়েব সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন তাঁদের রচনাশৈলীতে। আমরাও অনেকরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে – হয়ত সব সময়ে নিয়মিত থাকতে পারিনি, কিন্তু আপোষ করিনি আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টায়। সময়ের সাথে দেখেছি অন্য কিছু ওয়েব পত্রিকাও অবয়ব বদলেছে।বদলেছি আমরাও। আজ অনেক বেশি মানুষ বাংলায় টাইপ করেন, পড়েন – অস্বীকার করতে অসুবিধে নেই যে ডিজিটাইজেশনের পথে আমরা সবাই হাঁটছি একটু একটু করে। সেই যাত্রাপথে আমাদের নতুন উপস্থাপনা – আমাদের “ওকলকাতা’ মোবাইল অ্যাপ। আপাতত শুধু অ্যান্ড্রয়েড প্লাটফর্মের জন্য শুরু হলেও আমাদের ইচ্ছা অন্যান্য মোবাইল প্লাটফর্ম বা অপারেটিং সিস্টেমের মধ্যেও কি করে এই অ্যাপটিকে পৌঁছে দিতে পারি। Continue reading “শুভ নববর্ষ”

কলকাতা কেন পুরনো হয় না

কলকাতা একটা গল্পের মত – এক একটি দৃশ্যের পিছনে, খুব চেনা পরিচিত কিছু মানুষ, কিছু ঘটনা, কিছু স্মৃতি, সব মিলেমিশে একাকার। সময়ের সাথে সাথে আমরা বদলাচ্ছি, বদলাচ্ছে কলকাতাও – এখন কলকাতা বলতে হয়তো নতুন হাইরাইজ, নতুন রাস্তা, ফ্লাইওভার, কিন্তু আমার কাছে নতুন করে শহরের সাথে আলাপ হওয়ার গল্পগুলো এখনও একই রকম থেকে গেছে। কত বছরের পুরনো সব ছবি -অথচ নতুন করে তুললেও তাতে ক্লান্তি নেই। কেন – এ প্রশ্নের সদুত্তর নেই

পৃথিবীর অনেক শহরে থেকেছি – ঘুরে বেড়িয়েছি, ছবি তুলেছি – কিন্তু  আমার এই কলকাতা কিছুতেই পুরনো হয় না। ভিউফাইন্ডারের পিছনে দাঁড়িয়ে ভোরের কলকাতাকে ঘুম ভেঙে উঠতে দেখার মত প্রাণবন্ত দৃশ্য আর দেখেছি কি কোথাও? যখন কলকাতা থেকে অনেক দূরে থাকি, তখন এই ছবিগুলোই হয়ে ওঠে অক্সিজেনের মত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস – এই অমূল্য স্মৃতি শুধু আমার নয়, আপনাদেরও।

ভালো থাকবেন, শুভ নববর্ষ।

Continue reading “কলকাতা কেন পুরনো হয় না”

ছায়া ছবির সঙ্গী (৯)

13046098_1239062649454718_938753217_n

বলেছিলাম কারিগরি কথা লিখব না। কিন্তু দেখলেন তো সেই কথাই এসে গেল। আসলে আমাদের কাজটা এতটাই কারিগরি নির্ভর যে একে বাদ দিয়ে, আমাদের আর অস্তিত্ব কোথায়?

১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালের কাজ শুরু হল। আমাদের কাজ শুরু মানে তো সলতে পাকানো থেকে। স্ক্রিপ্ট তৈরী করা। তার থেকে লোকেশন তালিকা, চরিত্র তালিকা তৈরী করা। চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা অভিনেত্রী বাছাই করা। ঘুরে ঘুরে কোথায় কোথায় শুটিং করা যেতে পারে বা আমাদের গল্প অনুযায়ী খাপ খাওয়ানো যেতে পারে, সেসব জায়গা নির্ধারণ করা। পোষাক পরিকল্পনা করা। আরো আরো কত কাজ।

এসব কাজে আনন্দ পেতাম। ভালোবেসে করতাম। কোনোদিন ক্লান্তি বোধ করিনি। নিজে নিজে অনেক উপায় উদ্ভাবন করতাম, কি করে কতটা সহজ করে করা যায় কাজটা। এমন একটা লিস্টি বানাতে হবে যেটা সব কলাকুশলীদের সামনে থাকবে এবং তারা এক চোখ বুলিয়েই সব কাজটা বুঝে নিতে পারবে। আমার সব সময় চেষ্টা থাকত এমন সব কিছু করার।

‘অপূর্ণ’ ছবির পোষাকের তালিকা তৈরী করেছিলাম, বিভিন্ন রঙের ব্যবহারে। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারত, কোন চরিত্র, কখন, কোন পোষাক পরবে এবং কোথায় তার পোষাক পরিবর্তীত হবে। দেবকুমার দা এবং দেব দত্ত দা দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন এবং আমাকে বাহবা দিয়েছিলেন। বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, ওঁনাদের উৎসাহ পেয়েছিলাম বলেই, আরও নতুন কিছু করার তাগিদ থাকত সব সময়।

এই রঙের কোড ব্যবহার এখন হয়ত নতুনত্ব কিছু নয়। কিন্তু ছাব্বিশ বছর আগে এইভাবে কেউ ভেবে দেখেনি বা করেনি। এমন অনেক তালিকাই তখন আমার উদ্ভাবনি চিন্তা দিয়ে তৈরী করেছিলাম, যা পরবর্তী কাজেও ব্যবহার করেছি। সেগুলির নমুনা দেখাতে পারলে বোঝানো সম্ভব হত। এখানে তার উপায় নেই।

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়’এর যে গল্প থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালটি তৈরী হয়, তার নাম ‘গনশার বিয়ে’। এই গল্প থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘বর যাত্রী’ হয়ে গেছে অনেকদিন। সেই চলচ্ছবি থেকেই উঠে এসেছিলেন পরবর্তী সময়ের নামী অভিনেতা কালী ব্যানার্জী। শোনা যায়, ওঁনার কথা আটকে যাওয়ার যে ঝোঁক, সেটা ওই গনশার চরিত্র করার সময় থেকেই তার সঙ্গে থেকে যায়। কারণ গনশা ছিল তোতলা।

আমাদের গনশা হল শঙ্কর চক্রবর্তী। অসাধারণ অভিনয় করে সবার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল সে। তার সঙ্গে এই জগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে বরাবরের মত, ঐ অভিনয় থেকেই। এই ধারাবাহিক এ শঙ্করের মত অনেকেই প্রথম অভিনয় করতে আসেন। পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অপরিহার্য হয়ে যান তাঁরা সকলেই। শুভাশিষ মুখার্জী, রাহুল বর্মন, জয় বাদলানী, দীপন তপাদার, রঞ্জন ব্যানার্জী। দীপন পরে দেবকুমার দা’র পরিচালনায় একটি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। কিন্তু সেই ছবিতে তার যে নায়িকা ছিল তাকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে, দুজনেই এ জগত থেকে সরে গেছে। আমার প্রথম কাজের সঙ্গে এঁদেরও যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বিবাহ অভিযান’ তাই এদের সাথে আত্মীক যোগাযোগটা আজও রয়ে গেছে।

প্রথম পর্বের শুটিং শুরু হল জয়নগর মজিলপুর এ। জায়গাটার নাম যে একসাথে জয়নগর মজিলপুর, ওখানে গিয়ে জানলাম। যেখানকার মোয়া সর্বজনবিদিত। এর পরের ক’দিন সকাল সন্ধ্যে প্রাতঃরাশ আর সন্ধ্যের জলখাবারে মোয়া খেতে খেতে অত্যিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম।

১৯৯০ এর ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা সদলবলে সেখানে গিয়ে তাঁবু গাড়লাম। তাঁবু গাড়াই প্রায়। এখন কেমন বলতে পারব না। তবে তখন ওখানে থাকার মত কোনো হোটেল ছিলনা। বিভিন্ন লোকের বাড়িতে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতাম। এক বাড়ির যে ঘরে দেবকুমার দা’র থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানেই আশ্রয় মিলেছিল আমার আর আমার এক সহকর্মীর।

তখন আবহাওয়ার এত অবনতি হয়নি। খুব ঠান্ডা পড়ত শহরে। আর জয়নগর তো শহর থেকে অনেক দূরে। বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। দেবকুমার দা শুতেন একটা তক্তাপোষে। আর আমরা দুজন শুতাম মাটিতে। মোটা করে খড় বিছিয়ে তার ওপর চাদর পেতে। ঘরে আলো নিভে যাবার পরেও আমাদের আলোচনা চলত। যেমন আজকের কাজে কি কি ভুল হল না হল না, কাল কি হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেটা আমার শিক্ষানবিশীর, মণি মুক্তো কুড়িয়ে নেবার সময়। সে সময়গুলো কোনোদিন ভোলা যাবে না। কথাবার্তা চলতে চলতেই কখন যে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসত, টের পেতাম না।

আমার ছোটবেলা

13016769_1234155003278816_254681483_o

Pet মানে অন্যকিছু হলে চলবে না। হতে হবে বাঁদর ছানা।

বায়েনা খানিক এরকম-ই ছিল।

আমার ছোটবেলার ঘটনা। সব বাচ্চাদের মতন আমার এক দিন মনে হল আমার একটা pet  দরকার। যেমন ভাবা সেই রকম কাজ। এই সব, জীবনের গুরুতর জিনিস এক মাত্র বাবারসাথেই আলোচনা করা যায়। গম্ভীর মুখে বাবা কে গিয়ে বললাম ” আমার একটা pet  দরকার”। মা তো শুনেই প্রমাদ গুনল , আবার একটা ঝামেলা জোটাব আমি। বাবা আরও গম্ভীরমুখে বলল ” ঠিক আছে”  , কিন্তু কিনতে যাবার আগে ঠিক করতে হবে আমি কি চাই কিনতে ।

আলোচনা শুরু হল, কি pet  কেনা হবে তাই নিয়ে।

১) কুকুর – কমন pet , আনেকেই কেনে। আমাদের সবার থেকে আলাদা হতে হবে। তাই কুকুর বাদ

২) বেড়াল – আমি একদম পছন্দ করই না , তাই বাদ

৩) খরগোশ – খুব ছোট বেলায় আমার এক জোড়া খরগোশ ছিল, তাই আবার খরগোশ চলবে না। এটাও বাদ

৪) মাছ – শুধু আকুয়ারিউম এ ঘুরে বেড়াবে আমার সাথে খেলা করতে পারবে না। তাই এটাও বাদ

 

সমস্যা গভীর । কি যে কেনা যায় তাই ভেবে পাছিনা । এরকম সময় বাবা বলল , আমি একটা বাঁদর পুষতে পারি. তাতে আমার লাভ । কারণ যথাঃ

১) পাশের বাড়ি র পেয়ারা যে আমি চুরি করই সেইটা আমার পোষা বাঁদর কে শিখিয়ে দিলে আমাকে আর কেউ দোষ দিতে পারবেনা

২) নতুন ধরনের pet , কেউ পোষে বলে আমার জানা নেই।

৩) আমার সাথে খেলা করতে পারবে।

 

যেই ভাবা, সেই কাজ।

এতগুলো দুর্দান্ত কারণ থাকাতে,  আমি আর বাবা রবিবার সকাল বেলা বেরিয়ে পরলাম , বাঁদর ছানা কিনতে । মা কি করবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে বসে পড়ল । হাতিবাগানে রবিবার সকালে খুব সুন্দর বাজার বসতো , এই সব পশু পাখি, মাছ গাছের। সারা বাজার ঘুরে পাওয়া গেলনা একটা বাঁদর ছানা। আমার কাঁদো কাঁদো হাল , কোথাও নেই আমার সাধের বাঁদর ছানা। হতাশ হয়ে দাঁড়ীয়ে আছি , এমন সময় বাবা বলল ” তাহলে একটা গাছের চারা কিনে বড়ো করা যাক , তাতে ফুল ফোটানো যাক ” । চারি পাশে প্রচুর সুন্দর সুন্দর ফুল এরগাছ , লোভ হচ্ছিল  অনেকখন ধরে, বাবা কে বলিনি পাছে বাঁদর কেনার সুযোগ হারাই । এবার বাবার প্রস্তাবে এক কোথায় রাজি হয়ে গেলাম । ফুল গাছের চারা কিনে নাচতে নাচতে বাড়ি চলে এলাম ।

বাবা-কে হারিয়েছি কয়েক মাস হল। হাতে সেদিন ফুল গাছের চারা দেখে মা সবচেয়ে খুশি হয়েছিল।

সে বৃক্ষ-রূপি pet জল, আলো আর বাতাস পেয়ে হয়ে উঠেছে যেন আমার আপনজন।

হ্যাপি মাদারস ডে

জয় মাতা দি

রোজ শোনা যায় এই চিৎকার, কাটরার পথে মাতৃ-দর্শন করতে যাবার সময়।
তবু, যেদিন আমি যাই, একমাত্র সেই দিন আমার কাছে বিশেষ।
মা কে রোজ বলবো ভাবি, তুমি কিকরে এমন করে করো, যাই করো না কেন।
কিকরে তোমার হাতের রান্নার স্বাদ চিরকাল অন্যরকম লাগে, কেন যতই তোমায়ে ডাকি, মনে হয়ে আরেকবার ডাকি।
সত্যি বলছি, দুর্গাপূজার অঞ্জলি দেবার সময় তোমার মুখটাই খুঁজি।
বাবা পিছনে শিব সেজে থাকে, কিন্তু আমি জানি, বাবাও ঠাকুমার জন্যে বেশি ভাবতো।
আমি তো বাবারই ছেলে, তা আমি আমার মা কে নিয়ে কেন ভাববো না বোলো ?

প্রেম আসলে অনেক প্রকার। কিছু প্রেম আশীর্বাদী, কিছু প্রেম আনন্দি, কিছু প্রেম হাস্যময়, কিছু প্রেম লাস্যময়, আর কিছু জান্তব।পার্ক স্ট্রিট দিয়ে হাটার সময় দেখি, রাস্তার ধারে রুগ্ন শিশুগুলো কে কেমন জন্তুর মতো আঁকড়ে ভালবাসে, আদর করে তাদের মা, আর কিছু মা–হারা হাঁ করে তাকিয়ে দ্যাখে।
এই প্রেম সবাই পায়ে না।হয়তো পায়ে, বোঝে না, বুঝি না।
তাহলে কি বুঝি?
বুঝি যে যা কারুর কাছে জান্তব, তা আমাদের কাছে দৈনিক। “ও মা, বেরবো, টাকা দাও”, এটাও যেমন দৈনিক। “ধুর তুমি কিছু জানো না”, এটাও তেমনি দৈনিক।
রাস্তার ধারের নোংরা ছেলেটার আদর খাওয়া, বা হয়ত কোনরকম খাওয়াই, ঠিক দৈনিক নয়। যাই দৈনিক নয়, তার-ই জোর বেশি।
কথায়ে কথায়ে বোধহয়ে অনেক হাবিজাবি বলা হয়ে গেলো। আর বিশেষ বলবো না, শুধু বলি, আজ বিশ্ব মাতৃ দিবসে, মা কে আদর করি, বা না করি, মনটাকে একটু নাহয় বোঝাই, যে এই যে দৈনিক মাতৃ স্নেহ, এটার শুরু এবং শেষ মায়ের থেকেই।
আর, যেকোনো ভাল জিনিষের মতই, মা সবসময় থাকবে না। যতদিন আছেন, ততদিন নাহয়ে তাঁকে প্রণাম তা জানাই?

ঘুম থেকে উঠে মা কে একটা প্রণাম জানালে, মনটা বরং ভাল হবে।
ওই একটা “খুশি থাক, আর নেকামো করিস না”র দাম অনেক।
আপনার আমার মন, মায়ের আশীর্বাদ-এর গভীরতা কখনও মাপতে পারি নি, পারবও না।

হ্যাপি মাদারস ডে।।