ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

দেশভাগের কথকতা – দ্বিতীয় পর্ব [কলিকাতা]

শৈশবে জন্মভূমি পূর্ব পাকিস্তান ছাড়া এই পৃথিবীতে আর দুটো মাত্র জায়গা আছে বলে আমার  জানা ছিল । একটার নাম কলিকাতা আর অপরটার নাম হিন্দুস্থান । আমার বয়সের শিশুরা সেইসময় এই দুটো নাম বড়দের মুখে বেশ শুনতো । শৈশবের এই জানা আর না জানার ,খুব কম দৈর্ঘ্যের এই জীবনটা পরবর্তীতে আমরা বেশ সহজেই হারিয়ে ফেলি । আর এরকম অনেক জানা না জানাকে বাতিল করে করে আমরা বড় হয়ে উঠতে থাকি । মাথা ঘামাতে থাকি জানা অজানার মধ্যে অনেক সত্য ও অসত্য নিয়ে ।

তখন কি খুব বেশি বড় হয়েছি ? ১৯৬৯ সাল । শিলিগুড়িতে সদ্য স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ঝাড়া হাত পা হয়েছি । চলছে বড় হওয়ার নানা কায়দা কসরৎ  । ঠিক এই সময়ই এক সন্ধ্যা রাতে দার্জিলিং মেল থেকে শিয়ালদা স্টেশনে এসে নামলাম । কলিকাতা তথা কলকাতার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ । আবহে তখন বাজছে চলমান ট্রামের অদ্ভুত ঘন্টার আওয়াজ । স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে টের পেলাম বুকের খাঁচায় লুকিয়ে থাকা শৈশব পালাই পালাই করছে । ধাবমান এত মানুষ! সবাই যেন কী কারণে ঊর্ধশ্বাস । একটানা প্রায় চব্বিশ ঘন্টা রেল ভ্রমণের পর অপ্রত্যাশিত এই পরিবেশে কিছুটা দিশেহারা । সঙ্গের ছায়াসঙ্গী বন্ধুটি হাত ধরে টেনে নিয়ে এক রেস্তোঁরায় ঢুকিয়ে বলল “কী রে ঘাবড়ে গেছিস নাকি।” সে বেশ পোক্ত । বলল “চল কিছু খেয়ে নিই—তারপর তোর দাদার বাড়ির ঠিকানা খুঁজতে বের হবে ।” আমাকে সেই ঠিকানায় জমা করে বন্ধু চলে যাবে বরানগর । মনে মনে ভাবছি এই রাতে এও কি সম্ভব । ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম ” হ্যারে তুই পারবিতো?”

ঠিকানা খোঁজার সেই বুঝি  শুরু । তারপর বোধ হয় নাগাড়ে প্রায় বছর তিরিশ ধরে চলে এই শহরে যাওয়া আসা আর ঠিকানা খোঁজা । বর্হিবঙ্গ থেকে এই শহরে যাতায়াতের বাধ্যবাধকতা থেকে আমিও মুক্তি পাইনি । নাকি মুক্তি চাইনি ! আসলে সময়ের টানে এসব ভাবার হয়তো সময় ছিলনা । যাহোক, তারও কিছুটা পরে অনেক বয়স সময় খেয়ে খেয়ে আমি নিজেই একটি ঠিকানার মধ্যে ঢুকে পড়েছি এই শহরে । তাড়া খাওয়া অবুঝ শৈশব তারপর কি সত্যিই হারিয়ে গেল ? না বোধ হয় । এখনও শিয়ালদা গেলে তার সাথে দেখা হয় । একই রকম চঞ্চল, কৌতুহলী চোখ । তবে তার বয়সটা এর মধ্যে কিছুটা বেড়ে গেছে, এই যা । হাঁটার গতি একটু কম । রাস্তা হারানোর ভয়টা অনেক কম । কর্মজীবন বলে এখন আর কিছু নেই । সবটাই মর্মজীবন । এখন আর কথায় কথায়  কলকাতার এমাথা ওমাথা করা  হয়না । খুব বেশি হলে কলেজ স্ট্রীট । তবে বড় বড় বিজ্ঞাপনের বিল বোর্ড দেখে এখনো সে আগের মতই  ভয় পায় । তার ছোট বেলায় কলকাতা শহর জুড়ে বিশাল অজগর মার্কা  উড়ালপুলগুলো ছিলনা । এই গুলোও কিছুটা ভয়ের বইকি ।

উঠতি বয়সে জানতাম পশ্চিমবঙ্গে একটাই শহর । নাম কলকাতা । বাদবাকিগুলো সব মফঃস্বল শহর । শহর কথাটির সঙ্গে মফঃস্বল যুক্ত হলে যে বিস্বাদ ঠেকতো তা ওই বয়সে বেশ বুঝতে শুরু করেছিলাম । পশ্চিমবঙ্গ আসলে একটি ওয়ান সিটি স্টেট । ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলো ঠিক এমন নয় । অবশ্য কলকাতা অনেক দিন থেকেই একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছে । এই ব্র্যান্ডের কদর সারা ভারতেই । এই ব্র্যান্ডের মায়ার বাঁধনে মানুষ অকাতরে আটকে যায় এখানে । তবু  যদি নিজেকে কেউ ছিন্ন করতে চায় তবে তা যে খুব সহজ কাজ নয়- তা বলা বাহুল্য । জানা যায় যে তিনটি গ্রাম নিয়ে আদি কলকাতার পত্তন হয়েছিল । তো সেই সব গ্রামবাসীদের কোন বংশসূত্র কি এখনো বর্তমান ? কেউ কি তেমন দাবী করেন ? আমি অন্তত শুনিনি।  মনে হয় ইংরেজ পত্তনিদারদের দাপটে  কলকাতার ভূমিপুত্ররা সুচনালগ্নেই হারিয়ে গেছে । বরং ক্রমাগত বাইরে থেকে আমদানী হয়েছে কাজের লোকের । কেজো শহর কলকাতা গড়ে ওঠেছে তাদের শ্রমে ঘামে ।

তাই কলকাতা শুরুর থেকেই খুব একটা বাঙালি নয় । অথচ ঘটনাচক্রে এটা এখন এক বাংলার রাজধানী । বাঙালি জাতি-সত্তা এখানে বেশ অবান্তর। কলকাতা বৃত্তের কেন্দ্রে বাঙালি এখন খুঁজে বের করতে হয় । শ্রমজীবী কলমজীবী লক্ষ্য লক্ষ্য বাঙালি প্রতিদিন কলকাতায় আসে । তারা সকালে আসে রাতে ফিরে যায় । কলকাতা-বৃত্ত পরিধির বাইরে যারা থাকে তারা বেশির ভাগ উদ্বাস্তু । পূর্ববঙ্গীয় এই উদ্বাস্তুদের আগমন না ঘটলে এখানে কী হতো বলা মুস্কিল । একদা বিধান রায় কল্পিত  বিহারের সঙ্গে মার্জারের বিষয়টা হয়তো বাস্তব রূপ পেয়ে যেত । ব্রিটিশ উপনিবেশের খাঁটি সন্তান কলকাতা । উপনিবেশ বিরোধিতার সূত্র ধরে কলকাতায় যতটা ভারতীয়ত্বের চাষ হয়েছে তার দশ শতাংশও বাঙালি জাতি-সত্তা কথা হয়নি । পরবর্তীতে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনও এই রাজধানীকে ভাষা-জাতির কোন ধারণা দেয়নি । নিখাদ কসমোপলিশ ।

অপরিসর গলি, গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি , সাইনবোর্ডে “গৃহস্থ বাড়ি”লেখা দেখে বুঝে নিতে হয় এটা অন্য পাড়া । যেন হে খদ্দের ভুল করোনা । কোন নৈতিক সংঘাত নেই যেন । বিবিধ বৈপরীত্যের অপূর্ব সহাবস্থান । আবার তার বিপরীতও যে নেই তা নয় । তবু কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে এমন কবিতার লাইন জীবনানন্দ লিখেছিলেন কেন তা আজো বেশ প্রহেলিকা মনে হয় । কলকাতার জন-অরণ্য একটু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় কলকাতা আসলে অনেকগুলো কলকাতার এক সমষ্টি । সচরাচর তাদের মধ্যে অপরিচয়ের ব্যবধানটাই বেশি । যুগ যুগ ধরে তারা পরস্পর অপরিচিত থাকতেই যেন ভালবাসে । আত্মস্বার্থপরায়নতা মজ্জাগত ।

কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক মারা গেলেন প্রায় নব্বই বছর বয়সে । তিনি আটচল্লিশ সনে কলকাতা শহরে এসেছিলেন দেশভাগের সুবাদে । আমার সঙ্গে তাঁর যখন দেখা হয় তখন তিনি মধ্যবয়সী চাকুরিজীবী প্রতিষ্ঠিত একজন সংসারী । আশ্চর্য যে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি একবারের জন্য শুধু কলকাতার বাইরে গিয়েছিলেন । সেটা চাকরির সুবাদে আসানসোলে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন বছরখানেকের জন্য । এই শহরের বাইরের কোনকিছুর ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল না । এই কোনকিছুর মধ্যে মানুষও ছিল আমার বিশ্বাস । কারণ কখনো তিনি যেমন আত্মীয় বাড়ি যেতেন না, তেমনি কোন আত্মীয় তার বাড়িতে আসুক সেটাও খুব কাঙ্খিত ছিল বলে মনে হয় না । আমার সঙ্গে তার যে ক’বার দেখা হয়েছিল কোনবারেই তিনি ” আবার আসিস” কথাটা বলেননি । অথচ তা বলার কথাইত ছিল । কারণ তিনি ছিলেন আমার আপন মামা ।

পোস্টটি শেয়ার করুন



Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of