ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

নিত্যযাত্রী

হেউ।Nitya Jatri Illustration - Small

মুখে ভাজা মৌরির দানা ফেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখেই ঢেঁকুরটা উঠল। লোহার গেটের হাঁসকল বন্ধ করতে করতে বললাম ‘শুনছো, সদর দরজাটা বন্ধ করে দিও, বেরোলাম’।  ভেতর থেকে বউয়ের কণ্ঠ শুনে নিশ্চিন্ত হলাম, ‘দিচ্ছি, দুগ্‌গা, দুগ্‌গা’।

বউয়ের হাতের রান্না; কুচো চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাকের চচ্চড়ি। আর ফালি ফালি লম্বা দুটো আলু ডোবানো চারাপোনার পাতলা ঝোল দিয়ে চারটি ভাত খেয়ে বের হতে একটু দেরিই হয়ে গেল। গেট থেকে বের হলাম নটা ছেচল্লিশে। তরিবতের রান্না জুত করে খেতে একটু সময় লাগেই। আর খাওয়াটাও বেশী হয়ে যায়। তার ওপর কাঁধে আছে রেক্সিনের ছোট ব্যাগে লাঞ্চ বক্স। তাতে তিনটে রুটি আর আলু-কুমড়োর ছেঁচকি। ছাড়ানো শসা দু’ ফালি।

চিন্তা হচ্ছে, নটা বাহান্নর মিনিটা পাবো কিনা। ওটা না পেলে কপালে আজ দুঃখ আছে। এমনিতে আমাদের অফিস শুরু দশটা থেকে তবে এগারোটা পর্যন্ত ঢুকলেও চলে। এই মিনিটা পেলে আরামসে পৌঁছে যাওয়া যায় এগারোটার আগেই। কিন্তু এটা না পেলে যদি পরেরটায় যাই, সেটা দশটা আঠেরোয়। সেটাতে অফিস পৌঁছতে সাড়ে এগারোটা হয়েই যায়। কেউ কিছু বলে না, তবে কান্তিদুলালবাবু ভুরু তুলে একবার আমাকে দেখেন, তারপর হলের দেয়ালঘড়িটা দেখেন। কান্তিদুলালবাবু আমার বড়োবাবু।

আমাদের বাড়ি থেকে বড়োরাস্তা পর্যন্ত গলিতে দুটো ভাঁজ আছে। অন্যদিনের চেয়ে আজকে একটু বেশ জোরেই পা চালাচ্ছি, তবে চালাবো বললেই কি আর চালানো যায়? শরীরের ওজনটি তো আর কম নয়। তারওপর সবে খেয়ে উঠে ভরা পেটের ভরটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে নিতে চাইছে। আমার পেটটি, কি আর বলব, মোশায়, আমার মধ্যে তো আর নেই, ঠেলে বেড়ে উঠছে দিন কে দিন। শীতকালে ছাদে উঠে রোদ্দুরে বসে, সারা গায়ে সরষের তেল মেখে বড়ো আনন্দ পাই। বাবা বলতেন, ‘বাচ্চু, শীতকালে নাভিতে অবশ্যই তেল দিবি, পেটটা শীতল থাকবে’। বাবার কথা মতো নাভিতে তেল মাখাতে হাতড়াতে হয়, নাভিটা কোনখানে। চোখে তো আর খুঁজে পাই না।

গলির লাস্ট ভাঁজটা ঘুরলে, বড়ো রাস্তাটা চোখে পড়ে। অটো যাচ্ছে, গাড়ি যাচ্ছে, বাইক যাচ্ছে হুস হুস করে। ঘড়িতে দেখলাম তিপ্পান্ন হয়ে গেছে। মিনিটা কি চলে গেলো। দু’ পাঁচ মিনিট তো দেরিতো হামেশা করে, আজ কি আর করবে না? ব্যাটারা আমার যেদিন দেরি হয় সেদিনই রাইট টাইমে বেরিয়ে যায়। আর আমি রাইট টাইমে এলে লেট করে। বাস পাবো কি পাবো না, এই দ্বিধায় যখন দুলছি, কানে এল, সেই চেনা ডাকটি- ‘আই, টালিগঞ্জ, মেট্রো, মেট্রো, হাজরা, ভওয়ানিপুর, এক্সাইড, পাকিস্টিট, ডালহাউসি’

বাঁশির সুরে শ্রীমতীর কি হতো ঠিক জানি না, কিন্তু ওই ডাক শুনে আমি ব্যাকুল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম,

‘অ্যাই মিনি, রোককে। রোককে’।  মিনির হেল্পারটা শুনতে পেয়েছে। ‘আস্তেপ্পাসেঞ্জার’ বলে নেমে পড়ল রাস্তায়। আগের মতোই ডাক পাড়তে পাড়তে বলল, ‘একটু পা চালিয়ে, কাকু’।

ঠিক চুয়ান্নতে বাসের পাদানি বেয়ে উঠতেই বিপত্তি। ওপরে ওঠার জায়গা নেই। হেল্পার আমার পশ্চাতে গুঁতো দিচ্ছে ভেতরে ঢোকার জন্যে। ঢুকবো কোথায়? ভর্তি বাস! সকলেই দুর্যোধন। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জায়গাও কেউ ছাড়বে না। কন্ডাকটার অনবরত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে, ‘পিছনের দিকে এগিয়ে যান। গেটের মুখটা ছেড়ে দিন’। সারা জীবন শুনে এলাম, পিছনে তাকিও না, সামনে এগিয়ে যাও। মিনিবাসে নিয়ম উলটো পিছনের দিকে এগোতে হয়। গুঁতোগুঁতি করে ঠেলে ধাক্কা মেরে ঢুকেই গেলাম। আমার চোখ দু দিকের সিটে বসা লোক ও মেয়েদের মুখগুলোর দিকে।  চেনামুখ যদি পাওয়া যায়, যারা মেট্রো কিংবা হাজরায় নামবে, তাহলে সেই সিটটার সামনে দাঁড়াবো।

পেয়েও গেলাম, এক ছোকরাকে। কানে হেড ফোন নিয়ে গান শোনে, আর মাথা নিচু করে মোবাইলে মহাভারত লিখেই চলে। এই ছোকরা রোজ টালিগঞ্জ মেট্রোতে নামে। সিটটার কাছে আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল, তার ঘাড়ে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে, মুচকি হেসে বললাম, ‘সরি ভাই, যা ভিড়। ভদ্রভাবে দাঁড়ানো যায় না’। তার ওপর আমার উদ্ধত ও উদ্গত পেটটি দিয়ে চেপে ধরলাম, উটকো লোকটিকে। উটকো লোকটি আহাম্মক ও ভদ্রলোক, একটু পরে সরে গিয়ে আমায় জায়গা ছেড়ে দিয়ে পিছনের দিকে চলে গেল। আমি সযত্নে নিজেকে ছোকরার সিটের পাশে প্রতিষ্ঠা করলাম। যাক বাবা, আজ সব কিছু ভালোয় ভালোয় চলছে। আর পাঁচটা স্টপেজ পরেই মেট্রো, ছোকরা নেমে গেলে, সিটটাতে বসে একটু চোখ বুজবো।

এতক্ষণ অন্যদিকে খেয়াল করিনি, এখন শুনলাম অনেক যাত্রি বাসের ড্রাইভার আর কণ্ডাকটারের খুব পেছনে লেগে চলেছে।

‘কি হল, বাসটা এবার চালা’। ‘কি কণ্ডাকটার, সেই থেকে লোক তুলচো, বাসটা এবার চালাতে বলো’। ‘এবারে একটু টান বাপ, আধাঘন্টা হয়ে গেল এইটুকু আসতে’। ‘এ শালা গরুরগাড়ির ড্রাইভার নাকি রে’? আমারও খুব মজা লাগে পেছনে লাগতে। ভিড়ের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে। মেঘের আড়াল থেকে তির ছুঁড়ে খুব আনন্দ। আর হবি তো হ, সুযোগ চলে এল হাতের মুঠোয়। কোন স্টপেজ নেই, বাসটা খামোখা থেমে পড়ে দুটো প্যাসেঞ্জার তুলল। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার লোক আমি অন্ততঃ নই। গলাটা একটু ভারি করে বললাম, ‘কিরে, এবার কি লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক তুলবি নাকি রে? যেখানে সেখানে লোক তুলছিস’? আমিই একটু আগে তাই করেছি, অস্টপেজে না দাঁড়ালে, এ বাসে আমার আজ চড়াই হতো না। কিন্তু তাতে কি? আমারটাতো গুছোনো হয়ে গেছে! আশেপাশের দু চারজন আমার দিকে তাকালো, একজন শুঁটকে টাকমাথা বুড়ো বললো, ‘যা বলেছেন, ভাই’।

আমি একটু জোর পেয়ে গেলাম, আবার বললাম, ‘এরা মানুষকে মানুষ বলেই গণ্যি করে না, ছোটলোকের দল। ছাগল ভেড়ার মতো লোক গাদাই করেই চলেছে’।  আমার কথায় কাজ হল বেশ, আরো কিছু লোক খুব তেতে উঠে তেড়ে গালাগাল দিতে লাগল ড্রাইভার আর কণ্ডাক্টারকে। দু’তিনজন বাসের গায়ে ধপ ধপা ধপ চাপড় মারতে শুরু করল। বাসের ভিড়টা বেশ খেপে উঠেছে। বাসটা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল, এইসময় আমি আর একটা দিলাম ছোট্ট করে, ‘দেখলেন, শালারা সেই থেকে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে এসে কিরম সিগন্যালটা খেলো? এখন দাঁড়িয়ে থাকুন পাঁচমিনিট’। একজন চেঁচিয়ে উঠল ‘আমাদের কি কাজকম্মো নেই নাকি রে, শালা’? ‘এই ড্রাইভারটা কি করে লাইসেন্স পেল রে’? ‘লাইসেন্স আছে কিনা, তাই বা কে জানে’?

জনগণের এই সব কথা বার্তায় আমার মনটা পুলকিত হয়ে উঠতে লাগল বারবার। নিজেকে মনে হচ্ছে জব্বর ন্যাতা, যার উস্কানিতে খেপে উঠছে জনতা। কি আনন্দ, কি আনন্দ! এদিকে আমার সামনের সিটে বসা ছোকরা কানের হেডফোন গুটিয়ে ব্যাগে রাখল। পরের স্টপেজ হচ্ছে, টালিগঞ্জ মেট্রো। ছোকরা নামার জন্যে রেডি হচ্ছে। তার মানে এবার আমার সিটে বসার পালা। আমাদের ছোটবেলায় স্লেট পেন্সিলে অ আ ক খ লিখতাম, ছোকরা স্লেটের মতো ঢাউস মোবাইলটা চাপা জিন্সের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে সিট ছাড়ল। আমি তেরছা হয়ে দাঁড়িয়ে ছোকরাকে বেরোনোর রাস্তা করে দিলাম, আর উল্টোদিকটা ব্লক করে দিলাম, যাতে অন্য কেউ ঢুকে পড়ে, আমার সিটটা দখল না করে নেয়। বাসে চলা ফেরা করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার রে ভাই? অনেক স্ট্রাটেজি, অনেক কৌশল, কায়দা।

সিটে বসে পড়ে নিজেকে মনে হল, এ সিট যেন বাসের আসন নয়, যেন রাজ্যসভা, লোকসভা কিংবা নিদেনপক্ষে বিধানসভার সিট। কাঁধ থেকে নামিয়ে বউয়ের রান্না ভরা ব্যাগটা কোলে নিয়ে জুত করে বসলাম। মেট্রো স্টেশান চলে এসেছে, হুড় হুড় করে লোক নেমে, প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল বাসটা। সিটগুলো সব দখল, চার পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে এদিকে সেদিকে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার সামনে দাঁড়ানো সেই আহাম্মক ভদ্রলোক। মনে হল, ওর কাটা ঘায়ে একটু নুনের ছিটে দিই। চোখাচোখি হতে বললাম, ‘এতো সিট খালি হল, আপনি একটা সিট পেলেন না’? ভদ্রলোক হাসলেন একটু, বোকার হাসি। ভাবখানা, ঠিক আছে, কি আর করা যাবে। আহাম্মক আর কাকে বলে?

মেট্রোতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করেও তেমন প্যাসেঞ্জার হল না, বাস আবার ছেড়ে দিল। ফাঁকা বাসে আমার এবার একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ভিড়ের মধ্যে আমি যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলোর অনেক কথাই যে আমি বলেছিলাম, কণ্ডাক্টারটা বুঝতে পারে নি তো? বাস ছাড়ার পরই কন্ডাকটার আমার কাছেই দৌড়ে এল দেখে আমি চমকে উঠলাম। সর্বনাশ, এখন ও যদি কিছু বলে? দেখলাম সেরম কিছু নয়, ব্যাটা টিকিট চাইতে এসেছে। কন্ডাক্টারের হাতে দশটাকা দিয়ে বললাম, আটটাকা। আসলে আমার গলির মুখ থেকে ভাড়া হয় দশ টাকা। ও কি আর অতো মনে রেখেছে? জিগ্যেস করলে বলব, মেট্রোর একটা স্টপেজ আগে উঠেছি। আট টাকার টিকিট আর দুটাকা ফেরত নিতে নিতে খুব দরদ ভরা গলায় বললাম,

‘কি হল হে? বাস তো একদম খালি, লোসকান হয়ে যাবে যে, ভাই’। আমার সহানুভূতিতে কণ্ডাকটার গলে গেল, বলল,

‘কি বলব বলেন, কাকু। স্ট্যান্ড থেকে মেট্রো অব্দি যা প্যাসেঞ্জার পাই, ওতেই আমাদের দুটো পয়সা থাকে। তা পাব্লিক এমন গালাগাল দেয়…’।  আমি মাখো মাখো গলায় বললাম,

‘সব লোক কি আর সমান হয় রে, ভাই? হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? তবে? ও সব কথা কানে দিও না’।

নিশ্চিন্ত হয়ে গুছিয়ে বসে আমি চোখ বুজলাম, মনে মনে বললাম, ‘আর বকিস না বাপ, এবার একটু ঝিমোতে দে’।

পোস্টটি শেয়ার করুন



8
Leave a Reply

avatar
7 Comment threads
1 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
7 Comment authors
ArafKishore Ghosalsamitkgকিশোর ঘোষালPROJJWAL MONDAL Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Kajal Mukherjee
Guest
Kajal Mukherjee

বাহ্, বেশ লাগলো। ভীষন সাবলীল। কেমন যেনো চট্ করে শেষ জয়ে গেলো।

সব্যসাচী সেন
Guest

ভাল,

বহ্নিতা পাল
Guest
বহ্নিতা পাল

বড্ড খাঁটি কথাগুলো গল্পের অাকারে লেখা

PROJJWAL MONDAL
Guest
PROJJWAL MONDAL

Bah besh valo laglo…

samitkg
Guest

puro bangali office jatrir poriskar chobi ar theke bhalo r hoi na,khub sundor

Kishore Ghosal
Guest

Thank you samitkg bhai

Araf
Guest

বেশ ভালো লেগেছে 🙂