ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না – ৪

October 10, 2015


আগের পর্ব


দোষের মধ্যে আলু

তোমরা সেই গল্পটা শুনেছো তো? কুমির আর শিয়াল ঠিক করেছিল একসাথে চাষ করবে। প্রথমবার তারা করলে আলুর চাষ। কুমির খুব একটা সেয়ানা ছিল না। সে ভাবলে আলু বুঝি গাছের ফল। তাই শিয়ালকে বললে, ‘আগার দিক আমার আর গোড়ার দিক তোমার’। শিয়াল এক কথায় রাজি হয়ে গেল। পরে চাষবাস হওয়ার পরে কুমির বাড়ি গিয়ে বুঝলে শিয়াল বড় রকমের মেরে রেগে গেছে। কাজেই সে পরের বার ঐ একই ভুল আবার করবে না বলে দাবী জানাল – ‘এবার গোড়ার দিক আমার আগার দিক তোমার’। শিয়াল অম্লান বদনে রাজী হয়ে গেল। কিন্তু সেবার তারা করলে ধানচাষ। কুমিরের আবার জ্বলে ছারখার, শিয়ালের পোয়াবারো।

যদিও এ আলু সে আলু নয়, তবু এ এক ভারী মজার রোগ। সাধারনতঃ প্রজেক্ট ম্যানেজারদের (বিশেষ করে বিবাহিত) এই রোগ খুব হয়। একবার হলে চট করে সে রোগ চট করে সারেও না। দুঃখের বিষয় সেরকম চিকিৎসাও খুব একটা নেই। রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল এই যে একটু সেই দোষকে আস্কারা দিলে, তবেই রোগের লক্ষণ একটু কমে আসে। মানে ঘুরে ফিরে সে এক ভিসিয়াস সার্কেল। ভারতীয় উপমহাদেশে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। তবে শুনেছি থিসিস পেপারে নতুন আইডিয়ার অভাবে অ্যামেরিকাও আলুর দোষ নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেছে। আর তাছাড়া আমেরিকার আরেক ব্যামো আছে না – পাছে ওদের পরিষ্কার দেশেও দুনিয়ার যাবতীয় রোগ ছড়িয়ে পড়ে? যাইহোক, ওষুধ খুঁজে পাওয়া যাবে কি যাবে না সে আমেরিকার মাথার ব্যামো হতে পারে – আমার তো আর নয়। আমার প্রজেক্ট ঠিকঠাক চললেই হল, কারুর আলুর দোষ না হলেই হল।

দোষের মধ্যে আলু

দোষের মধ্যে আলু

রোগের সিম্পটমে ফেরা যাক। নতুন নতুন কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছি। প্রজেক্ট ম্যানেজারের সাথে দেখা হল। একটু বিশাল বপু। হাফশার্ট, কালো ট্রাউজার – ইন করা নয়। ঘাড়ের কাছে একটা ভিজে রুমাল। দেখেই জলহস্তীর মত সুরেলা কণ্ঠে প্রথম প্রশ্ন করলেন, ‘বাড়ি কোথায়?’

বললুম। তাতে চোখটা ওপরে তুলে বললেন, ‘স্টেশন থেকে কতদূর বাড়ি?’

‘বেশিক্ষণ না – মিনিট পাঁচেক। গার্লস ইশকুলের কাছে।’

‘গার্লস ইশকুলের কাছে বাড়ি হয়ে কোন সুবিধে হয়েছে?’

ঘাড় নাড়লাম, ‘না, হয়নি।’ সেদিন তো সবে শুরু। পরে কথাবার্তা শুনে ভালো করে চেনার পর বুঝেছি, ওনার মুখ মানেই জাঙ্গিয়া। খুললেই – যাক সে কথা। ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে ওনার আক্রমণের স্বীকার হয়নি এরকম লোক খুঁজে পাওয়া ভার। হয়তো কোনদিন কোন মেয়েকে বললেন, ‘এ সব কি পরে অফিসে এসেছিস? বাড়িতে ধোপা নেই।’ বা কোন ছেলেকে মেয়েদের মাঝে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘এসব কি কোড হয়েছে? এ কি লুঙ্গি পরে শীর্ষাসন করার যায়গা পেয়েছ?’ বা হয়তো, অন্য আরেক প্রজেক্ট ম্যানেজারের ওপরের চড়াও হয়ে বললেন, ‘মাইগ্রেশন প্রোগ্রামটাকে কি তোমার বউ পেয়েছ যে দু’দিনে প্রেগন্যান্ট আর আট মাসে ডেলিভারি হয়ে যাবে? প্ল্যান কোথায়? হোয়্যার ইজ দা ব্লাডি প্ল্যান?’

উনি ছিলেন আমার দেখা প্রথম পেশেন্ট – পরে অবশ্য অনেক দেখেছি আর ক্রমে বুঝতে পেরেছি রোগটার লক্ষণ নানান রকমের। যেমন ধরা যাক জেন্ডার বায়াস। মেয়েরা কোডে ভুল করলে দোষ নেই, ছেলেরা করলে তুলকালাম। মেয়েরা কাজ না করলে দোষ নেই, ছেলেরা করলে তুলকালাম। চুপচাপ সন্ধ্যে বেলায় চায়ের আড্ডায় কোন না কোন মেয়েকে নিয়ে যাওয়া। এসব তো তাও ঠিক আছে, একদিন যেটা শুনলাম – তার তুলনা হয় না। আমি এই ঘটনার প্রত্যক্ষ শ্রোতা। একদিন কাজ করছি। ডায়াগোনালি আমার পিছন দিকে বসত একটি মেয়ে – বেশ ন্যগ্রোধপরিমন্ডলা, মানে শারীরিকভাবে পরিপুষ্ট। প্রজেক্ট ম্যানেজার এসে বশংবদ হয়ে বলছেন – ‘তুমি কি বাড়ি থেকে লাঞ্চ এনেছ আজ?’

‘না, কেন?’

‘না মানে বাইরে খেতে যাওয়ার প্রোগ্রাম হচ্ছিল – তুমি কি আমাদের যাবে আমাদের সাথে?’

‘যেতে পারি – কিন্তু কি খাওয়া হবে?’

‘তুমি কি খেতে ভালোবাসো – রুটি মাংস না স্যান্ডুইচ না পিজা না বিরিয়ানি?’

‘উম্ম, স্যান্ডউইচ চলতে পারে। আর কে কে যাচ্ছে স্যার?’

এক গাল মাছির মত হেসে ম্যানেজারটি বললেন, ‘আপাততঃ তুমি আর আমি।’ পরে শুনেছি সেই ম্যানেজারই তার নাম দিয়েছিলেন আকাশগঙ্গা। তর্ক (আগের পর্বে যার কথা বলেছি) ভুরু কুঁচকে বললে – ‘আকাশগঙ্গা? সে আবার কি ধরনের নাম?’

আমি বললাম, ‘আহা চটিস কেন, আমি তো বাংলায় বলছি বলে বাংলা করে বললাম। আমাদের গ্যালাক্সির ইংরেজি নাম কি?’

তর্ক সব ব্যাপারে ফটাফট উত্তর দেয়, ‘কেন মিলকি ওয়ে?’ এই বলেই জিভ কেটে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল।

রোগের সবচেয়ে সাংঘাতিক লক্ষণটার কথা বলাই হয়নি। ম্যানেজারদের এই রোগ হলে খুব শিগগিরই তাদের চেলা, চামচাদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে। কারণটা অবশ্য স্বাভাবিক – ঐ যে আগে লিখেছি ভিসিয়াস সার্কেল। ম্যানেজারকে তুষ্ট করার জন্য বশংবদরাও তাদের বসেদের আলুর দোষে আস্কারা দিতে থাকে – ঐ অনেকটা যজ্ঞে ঘি ঢালার মত। সেটা কখন যজ্ঞে ঘি ঢালার জায়গায় ভস্মে ঘি ঢালা হয়ে যায়, তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। ফলে একসময় রোগটা তাদের নিজেদেরও চেপে ধরে আর কি। তর্ক হঠাৎ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললে, ‘রোগের লক্ষণ তো না হয় হল – কিন্তু কারণটা কি বলে তোমার মনে হয়?’

কান চুলকে বললেম, ‘সুকুমার রায়।’

তর্ক শ্রাগ করল, ‘কি ভাট বকছ?’

বললাম, ‘আরে খুড়োর কল পড়িস নি? সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যেরকম রুচি/ মন্ডা মিঠাই চপ কাটলেট খাজা কিম্বা লুচি / মন বলে তায় ‘খাব খাব’, মুখ চলে তায় খেতে / মুখের সঙ্গে খাবার চলে পাল্লা দিয়ে মেতে। এও অনেকটা সেইরকম ব্যাপার।’

‘মানে?’

‘ঢ্যামনা কথাটার আক্ষরিক মানে জানিস?’

‘নাহ, আমার বাংলা মিডিয়াম নয়। আর সব কথার মানে জানতে হবে নাকি?’

‘আমাদের ভঞ্জ স্যারকে একবার আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, লিমিটের অঙ্কে এই স্টেপটা কি করতে হবে? তাতে উনি ধুতিতে হাত দিয়ে বলেছিলেন এই ধুতিএর নীচে আন্ডারওয়্যার পরার যেমন দরকার আছে, তেমনি এই স্টেপটা করারও দরকার আছে। মানে না জানলে হবে? এখানে মানেটা হচ্ছে ধর এমন কেউ যার মনে মনে শখ পোয়াবারো, কিন্তু মুরোদ লবডঙ্কা। এও অনেকটা সেইরকম। খতিয়ে দেখেছি আলুর দোষের মূলে আছে প্রচণ্ড সাপ্রেসড লিবিডো। ম্যানেজার হতে হতে একটু বয়স তো হয়েই যায় – আর যা লাইফ-স্টাইল তাতে শরীর ভারী হতে বাধ্য। ফলে শরীর সাঙ্গ দেয় না – কিন্তু মন কি আর থেমে থাকতে পারে – ব্যস খুড়োর কল – সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যেরকম রুচি। যে ছুটছে তার আর হুস থাকে না ছুটতে ছুটতে কোথায় গেল। আশে পাশে সব ইয়েস ম্যান – রাজা তোর কাপড় কোথায় বলার লোক নেই।’

‘বাপরে – খিস্তির এত সায়েন্টিফিক মানে তুমি এত জানলে কি করে?’

‘কেন, আমার সব বিদ্যে যেখানে শিখেছি – সেই নরেন্দ্রপুরে।’

‘ভাবোও বটে – তা তুমিও তো ম্যানেজার – আর বয়সেও নেহাত কচি-খোকা নও – তোমার নিজেরই আলুর দোষ হয়নি তার গ্যারান্টি কি?’

‘আহা সেই গল্পটা শুনেছিস? নতুন কেউ পাগলাগারদ দেখতে এলে একটা লোক তাদের খুব যত্ন নিয়ে ঘোরাত আর কার কিরকম পাগলামি সব বুঝিয়ে দিত কিন্তু যখন তাদের যাওয়ার হত তখন – নাচ দেখেছেন? বলে নিজের নাচ দেখাতে শুরু করত, তখন সবাই বুঝত এও আরেক পাগল। অনেকটা সেইরকম।’

তখনকার মত হেসে উড়িয়ে দিলেও সত্যি বলতে কি ব্যাপারটা ফেলে দেওয়ার মত একেবারেই নয়। চারদিকে কত প্রজেক্টই চলছে কিন্তু এরকম হাজার হাজার নোংরামি চেপে রেখে একটা মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি সব্বাই যেন সব ঠিক ঠাক আছে। আজ যা হচ্ছে হচ্ছে – কিন্তু কাল যারা উঠে আসবে, তারা যেন এরকম না হয়। কাউকে ভালো লাগলে চোখে চোখ রেখে বলুক তোমায় দেখলাম। তখন যেন কুমির হয়ে শিয়ালের পিছনে দৌড়তে না হয়। যারা দোষের আলুর চাষ অ্যাদ্দিন করেছেন, তারা জেনে রাখুন সামনাসামনি না হলেও নিঃশব্দে বা আড়ালে খিস্তি অনেক খেয়েছেন। এবার শুধরোন। এরকম একটা বস্তাপচা আর্টিকেলে দুজন প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিকের নাম নিলাম। আশা করি পাঠক সেটুকু ধৃষ্টতা নিজ খুনে মাফ করবেন।


 

পোস্টটি শেয়ার করুন



2
Leave a Reply

avatar
2 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না - ৫ - ও কলকাতাmousanchi Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
mousanchi
Guest

Bhalo likhechen Mr Abhra Pal :)…,and lovely illustration by Partha… 🙂