ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না – ৫

October 24, 2015


আগের পর্ব


প-য়ের প্রকার


গম্ভীরভাবে বললাম, ‘পঞ্চ ম-কার কি জানিস?’

তর্ক মাথা চুলকে বললে, ‘কি একটা হয় শুনেছি – ঠিক ঠিক জানি না।’

‘বৈদিক মতে যেমন পঞ্চ-গব্য, তান্ত্রিক মতে তেমনি পঞ্চ ম-কার। ঠিক উল্টোটা। এদের মতে এইটা পবিত্র, তো ওদের মতে ঐটা। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। সবার সাধনার মার্গ আলাদা। বুঝলি কিছু?’

‘তুমি কি ফুল-টাইম প্রজেক্ট ম্যানেজার না পার্ট-টাইম তান্ত্রিক? কে জানে দেখা গেল হয়তো প্রজেক্ট নামান’র জন্য বাড়ি ফিরে নামাবলী পরে বসে থাক?’

‘ওরে গবেট-চন্দর – নামাবলীটা বৈষ্ণব আর পঞ্চ ম-কার তান্ত্রিক। দুটো ডোমেন পুরো আলাদা – একটা ডট নেট তো অন্যটা জাভা, একটা মেইনফ্রেম তো অন্যটা ইউনিক্স। যাই হোক, তান্ত্রিক টান্ত্রিক না তবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ঐ টাইপের একটা জিনিস আছে – তৃতীয় প-কার। এক্কেবারে নৈব নৈব চ। খুব সাবধানে এড়িয়ে চলা উচিত – যে কোন একটাই প্রজেক্টকে লাটে তোলার জন্য যথেষ্ট। মজার ব্যাপার হল এদের কোনওটাকেই লুকিয়ে রাখা সম্ভব না। যতই চেপে রাখার চেষ্টা কর – সে তার নিজমূর্তি ধারন করবেই। তাই ভাবছিলাম সেই ঘটনাটাই আজকে তোদের বলব। তোদেরও তো একদিন বড় হয়ে প্রজেক্ট চলাতে হবে – সব জেনে রাখা ভালো।’

KPMKN-5 illustration - small

কাজ ফেলে গল্প বলতে চাইলে যা হয় আর কি। ভিড় জমে গেল। সেই ঠেকে তর্ক, রুদ্ধ ছাড়াও পুতু, পার্থ (যে কিনা এখন ছবিগুলো আঁকছে) এরা সব্বাই আছে। ব্যস অমনি শুরু হয়ে গেল গল্প। অবশ্য গল্প ভাবলেই গল্প, খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন – হুবহু একই ঘটনা হয়তো আপনার অফিসেও হামেশাই ঘটে থাকে।

‘বেশ – প্রথমটা কি শুনি?’

‘কেন, প্রেম?’

‘যাহ – এটা তো কমন ছিল।’

‘ধুর ধুর – তোরা পয়েন্টটাই মিস করে গেলি। এ যে সে প্রেম নয়, এ হল অফিসের প্রেম। পাড়ার প্রেম বা ইশকুল কলেজের প্রেম নয় যে একটা চিঠি লিখলাম, দুটো বিরহের গান শুনলাম, তিনবার নীলাঞ্জনা গাইলাম বাথরুমে। অমনি হয়ে গেল – প্রাতঃকৃত্যের সাথে মাথা হালকা হয়ে গেল।’

‘তবে?’

‘আহা অফিসে কাউকে ভালো লেগে গেলে তাকে তো আট ঘণ্টা তাকে চোখের সামনে দেখতে হবে – তার সাজগোজ, কথাবার্তা, বন্ধু-বান্ধব, মোবাইল রিংটোন, সিক্রেট ট্যাটু – কত কি? এর মধ্যে লাঞ্চ আছে, টিফিন আছে, চা আছে। বিকেল বেলা ওয়াক করা আছে।’

তর্ক ফট করে বলে বসল, ‘আইসক্রিম আছে।’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘মানে?’

‘না, মানে রুদ্ধ মাঝে মাঝে নীচে যায় গরমকালে – একটা মেয়েকে আইসক্রিম খেতে দেখতে যায়!’

রুদ্ধর দিকে তাকে ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘না না, ওটা অন্য ব্যাপার – তোরা বড্ড বাজে বকিস। যাই হোক, যা বলছিলাম। অফিসে কাউকে ভালো লাগলে সে আবেগটা বড্ড বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। স্বীকার করতে হয় না – চোখে মুখে ফুটে ওঠে। কাজে কর্মে পরিষ্কার বোঝা যায়। অনেককে দেখে তো আমার এরকমও মনে হয়েছে যে ওদের দুজনের জন্য দুটো কম্পিউটার বোধহয় লাগত না। ডেস্ক সেভ, ইলেক্ট্রিসিটি সেভ। কত প্রফিট।’

‘কেন? একবার ডেকে সোজাসাপ্টা বলে দিলেই হল বা ধরো চুপি চুপি ইমেল করলে?’

‘ওফ হাসালি, তোরা’

‘কেন? কেন?’

‘বাহ ইমেলে এরকম কু-প্রস্তাব দিলে, মানে চিঠিটা পড়ে যদি তাই মনে হয় আর কি, তাহলে এইচ-আর কেস হয়ে যাবে না? সেই ভয়টা তো সব সময় আছেই। তার ওপর যদি আবার রিজেকশন কেস হয়, তাহলে প্যাঁক, টিটকিরি তো আছেই, ওদিকে গোদের ওপর বিষফোড়া প্রজেক্টও অমনি রাতারাতি বদলে ফেলা যাবে না। ফলে সেই একই মেয়েকে আবার ন ঘণ্টা ধরে সহ্য কর আর যতদিন প্রজেক্টে আছো, ইশারায় বলে চল – একবার ডাকিলেই আসিব।’

‘আর যদি কেউ প্রোপোজ করার ম্যানেজারকে কপিতে রেখে দেয়? অন্তত এইচ আর কেসটা তো এড়াতে পারে?’

‘ওফ এরকম করেছিল বটে কৃষাণু। সেই ২০০৬ সালে। দিব্যি বন্ধুদের কথা শুনে বার খেয়ে, ডিকশনারি দেখে এক-পিস প্রেম পত্র সাজিয়েছিল কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেকে সেফ-সাইডে রাখার জন্য দুই ম্যানেজারকে কপিতে রেখে মেলটা করেছিল। ফলটা হল উলটো। লেঙ্গি তো খেলোই, তার ওপর জাঁদরেল প্রজেক্ট ম্যানেজারের দাবড়ানিতে টানা দু বছর ধরে সব প্রজেক্ট / নন-প্রজেক্ট পার্টিতে নীলাঞ্জনা গাওয়া করিয়েছিল। একটা সময় কৃষাণুর মনে হত ডেকে সবার সামনে বলদ বলে কান ধরে উঠবস করালেও বোধহয় এতটা দুঃখ হত না। প্লাস ঐ চিঠিটা পড়েনি এমন কেউ পাবলিক শুধু ঐ প্রজেক্ট কেন, গোটা অপিসেও ছিল না। তাই বলছি আর যাই করিস, ঐ ভুলটা কক্ষনও ভুলেও করিস না। ’

‘অনেকটা কার্তিক-দার মত কেস – পার্টিশন করতে চেয়েছিল, আর্কাইভাল হয়ে গেল?’

‘কার্তিক-দাটা আবার কে?’

‘ওহহো, তোমার সাথে এখনও তো পরিচয় হয় নি, তাই জানো না হয়তো। গোলাপি চশমা, সবুজ ট্রাউজার – কার্তিক-দা পুরো কেতার ছেলে ছিল। একবার একটা মেয়েকে তার ভালো লেগে যায়। তারপর তাকে পার্টিশন এক্সচেঞ্জ বোঝাতে কতবার কাচের ঘরে ডেকে নিয়ে যেত, শনিবারে আসতে বলত অফিস। শেষমেশ যখন কেটে গেল ঘুড়ি আমাদের এসে বলল, আর্কাইভাল হয়ে গেছে – ফাইল ক্লোসড।’

‘ওহহো’

‘কি হল আবার?’

‘একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল। সে আমার কাছে একটা ডিজাইন বার বার বোঝার চেষ্টা করতাম – কিন্তু আমি যতই যাই বলি, সে কিছুই বুঝতে পারত না। দু-একবার বাড়িও চলে এসেছিল। শেষে একদিন বাধ্য হয়ে বললাম – আর বোঝার দরকার নেই, ওতেই হবে। যেটুকু বুঝেছিস তাই দিয়েই চালিয়ে দে।’

‘হায় রে- এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করলে? মেয়েটা থোড়াই তোমার কাছে ডিজাইন বুঝতে চেয়েছিল। ছি ছি ছি – এইটুকু পারলে না? দেখতে কেমন ছিল?’

‘বেশ মিষ্টিই ছিল। কিন্তু তখনই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তো।’

‘সেইটাই তো সুযোগ ছিল – ধুর তুমিও যেমন’

‘আহ, কথায় কথায় তর্ক করিস না – যতক্ষণ অফিসে থাকবি, ঐসব ব্যাক পকেটে রাখবি। এই জন্যই বলছি, ওসব বাদ দে।’

‘তা তোমার প-কারে প্রেমের পর আর কি কি বাকী আছে শুনি?’

‘তার আগে আরও কয়েকটা ব্যাপার ছিল। প্রাক-বৈবাহিক তো বললাম, উত্তর-বৈবাহিক আর আন্তঃর্বৈবাহিক ব্যাপারও আছে’

‘গোদা বাংলায় বলবে?’

‘মানে প্রিম্যারিটাল, পোস্ট ম্যারিটাল – ইন্টার্ম্যারিটাল আর কি। ধরা যাক কেউ বিয়ের আগে পালাবে – সেও দেখেছি। কেউ বিয়ের পর অফিসে কি করে সেও দেখেছি। আবার অন্যের বউ -’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে তর্ক জিজ্ঞেস করলে, ‘পালাতে দেখেছ?’

‘তা আর দেখিনি? মেয়ের বাড়ি থেকে দুই জাম্বুবান মার্ক ভাই এসে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অফিসের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আর হুঙ্কার ছাড়ছে। আর ওদিকে প্রজেক্ট ম্যানেজার তাকে চেন্নাইতে পালানর সেফ প্যাসেজ দিচ্ছে। ছেলে তার হবু শালাদের এড়াতে বন্ধুর গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে অফিস থেকে বেরোচ্ছে – সব নিজের চোখে দেখা রে।’

‘তোমার প্রতিভা আছে বলতে হবে-’

‘আরে ঐটাই তো দ্বিতীয় প’

‘কিরকম শুনি?’

‘এই যেমন ধর আমাদের পুরনো প্রজেক্টে একজন সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ছিল। এমনিতে ছোটখাটো চেহারার লোকটিকে দেখলে সিকিউরিটি গার্ড বলে ভুল হতে পারে কারও। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রতিভা বোঝা যেত মুখ খুললে। একদিন তাকে একটা কলে ডাকা হয়েছিল – সে আই আই আই আই চারবার বলে কর্ণের রথের চাকার মত সেই যে আটকে গেল – আর কিছুতেই এগোয় না। তারপর থেকে আইয়াইয়াইয়াই টাই ওনার নাম হয়ে গিয়েছিল। এ শুধু অফিসে হলে ঠিক ছিল – একবার বিদেশে গিয়ে ব্যাঙ্কে, স্টেশনে মায় কাস্টমারের কি হাল করেছিল তার আর ইয়ত্তা নেই।’

‘এ আর প্রতিভা কোথায়?’

‘যাচ্চলে – প্রতিভা নয়? ধর ক্লায়েন্ট ফোন করেছে। যাকে খুঁজছে, তাকে দেখতে না পেয়ে ফোন তুলে দিব্যি বলে দিল – হি ইজ নো মোর। ব্যস সে ওদিক থেকে কনডোলেন্স ইমেল পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপরে ধর মেল পাঠিয়ে বলল, ঈশ ভুল হয়ে গেছে বলে ল্যান কেবলটা খুলে দিল। আরেকজনকে চিনি। সে মেল শুরুই করেছে, ‘হোপ ইউ আর নট ওয়েল’ বা কখন কি মনে হল মেল করার পরে এসএমএস করেছে – ‘ফলো মি অন মাই ইমেল’। কখনও আই অ্যাম হসপিটাল তো কখনও লেটস ড্যামেজ দা কন্ট্রোল। উদাহরণ ভুরি ভুরি। এই পর্যন্ত হলে তাও নয় ঠিক ছিল। একদিন তার মায়ের শরীর খারাপ – অমনি মেল করেছে মাই মাদারস হার্ট অ্যাটাকড। বোঝ – এগুলো প্রতিভা নয়? আর এসব প্রতিভা যেখানে আছে, সেখানে লুকিয়ে থাকার জো নেই – ফুটে বেরোবেই। তাই বলছিলাম, প্রজেক্টের সার্থে বড় মুশকিল।’

‘বুঝলাম – আর শেষের টা কি শুনি?’

‘ওহ ওটা আদিভৌতিক অর্থাৎ কিনা আমাদের কন্ট্রোলে না, ওটা আদি ভূতের ডিপার্টমেন্ট। আমার এক বন্ধু ছিল – রাত্তিরবেলায় ডিপ্লয়মেন্ট করছে। অফিসে একা। এমন সময় এল প্রবল বেগ। সে আইডি কার্ড ডেস্কে ভুলে টয়লেটে ছুটেছে। এদিকে ঐ দরজাটা এমন যে বেরোতে অ্যাক্সেস লাগে না – কিন্তু ফেরার সময় লাগে। আবেগেতাড়িত হয়ে যাওয়ার সময় ভুলে গেছে। কিন্তু পরে আর কিছুতেই ফিরে আসতে পারে না – অফিসে কেউ নেইও। সে এক কেলেংকারিয়াস ব্যাপার। তাই বলছিলাম আর কি এইসব জিনিস প্রজেক্টের পক্ষে বড় ক্ষতিকর। খুব সাবধানে থাকা উচিত। তেমন তেমন মুহুর্তে যে কোন একপিসই যথেষ্ট।’

‘বল কি?’

‘হুঁ হুঁ বাবা, সাধে কি আর মহাজ্ঞানী মহাজন বলে গেছেন – প্রেম, প্রতিভা আর পায়খানা – চেপে রাখা যায় না।’

এই এপিসোড এখানেই শেষ। যারা আমার গল্প শুনে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের হাত মকশো করছেন আগামী দিনের জন্য বা নেহাত গল্পচ্ছলেই পড়ছেন বা আমাকে ছোঁড়ার জন্য বাড়িতে ঢিল জমাচ্ছেন সকলকে বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা। সঙ্গে থাকুন, পড়তে থাকুন।


পোস্টটি শেয়ার করুন



1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
0 Comment authors
কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না - ৬ - ও কলকাতা Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of