ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

মেসবাড়ির রুটি

ললিত আমাকে নিয়ে গেছিল ওদের মেসে কোনো এক গ্রীষ্মের  সন্ধ্যা বেলায় | ললিতের সাথে আমার পরিচয় বাসনালয় নামক এক দোকানে | এক বন্ধুর পুত্রের অন্নপ্রাশন | বন্ধু আর তার স্ত্রী দুজনে মিলে নিমন্ত্রণ করে গেছে | না যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না | মাকে বাড়িতে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম কি দেওয়া যেতে পারে | মা বলেছিল কাঁসার থালা , বাটি ও গ্লাস দিতে | এই শহরের মেন্ রোডের ওপর এই বাসনালয় দোকানটাই সবচেয়ে বড় | দোকানের মালিক তারাপদ বাবু আমার এক প্রতিবেশীর ভায়রাভাই | সেই সুবাদেই জানাশুনা | দোকানের কর্মচারী ভদ্রলোক অনেকগুলো থালা-বাটি -গ্লাস মেঝেতে পাতা গদির ওপর এনে রাখল | সেই সময় ললিত এসেছিল ওদের মেসের জন্য একটা  কড়াই কিনতে | তখন ললিতকে চিনতাম না |  কিন্তু ও আমাকে যেন কি ভাবে চিনতো |

 

 কি ব্যাপার খুব চেনা চেনা লাগছে | আপনি কুমার না ? পদ্মপুকুর মেসে থাকেন তো ?

 পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি একটা রোগা ঢ্যাঙা মতো ছেলে একমাথা ঝাঁকড়া চুল নাড়িয়ে হাসছে |

 একটু বিস্মিত ভাবেই বললাম : আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না !

  চিনবেন কি করে ? এর আগে তো কখনো দেখেন নি | আমি অবশ্য আপনাকে দেখেছি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতে নয়তো বা আবৃতি করতে | অসাধারণ আবৃতি করেন ভাই | শুনে মুগধ হয়ে যেতে হয় | খুব ইচ্ছা ছিল আলাপ করার  তাই এখানে আপনাকে দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না | কিছু মনে করলেন না তো |

 বললাম : না না , মনে করবো কেন ?  আপনার নামটা জানতে পারি ?

 ললিত | ললিত মান্না |  একদিন যাবো আপনাদের মেসে | চা খাওয়াতে হবে কিন্তু |

 নিশ্চয়ই আসবেন |

            

আমার জিনিস প্যাক করা হয়ে গেছিল | দাম মিটিয়ে বাইরে  এলাম |  এর দিন সাতেক বাদে এক সন্ধেবেলায় ললিত এসে হাজির | চা অবশ্য খায় নি | এক গ্লাস জল খেয়েই উঠে পড়েছিল | তারপর আমাকে নিয়ে গেল ওদের মেসে | একটা এঁদো গলির ভিতর তিনতলা  ভাঙাচোরা বাড়ি | প্লাস্টার খসে ইট বেরিয়ে পড়েছে | সিঁড়ির মুখে একটা টিমটিমে আলো | ভালোভাবে কিছু দেখা যায় না | রেলিং বিহীন সিঁড়ি | সিঁড়িতে কোনো আলো নেই | সোজা তিনতলার একটা ঘরে আমাকে নিয়ে এলো |

 

একটা লম্বা টাইপের ঘর | তিনটে বিছানা পাতা | বিছানা বলতে তক্তপোশের ওপর তুলো বের করা তোশক , নোংরা , কোঁচকানো চাদর , তেলচিটে বালিশ , দেওয়ালে গোটানো মশারি | দেওয়ালের দুপাশে কতকগুলো দড়ি টাঙ্গানো | দড়ি থেকে ঝুলছে প্যান্ট  , জামা , গেঞ্জি , গামছা ,জাঙ্গিয়া ….প্রভৃতি অনেক কিছু | মাথার ওপর সিলিং ফ্যান যত জোরে  না ঘুরছে তার চেয়ে  শব্দ করছে বেশি  | মেঝেতে শতরঞ্চি বিছিয়ে তিনজন  বসে সকালের বাসি আনন্দবাজার পত্রিকাটা  পড়ছে |  পাশে   দু প্যাকেট তাস , একটা দু নম্বর খাতা  আর পেন | দেওয়ালের দিকে একটা ভাঙা কাপে পোড়া সিগারেট – বিড়ির টুকরো | ঘরময় পোড়া  দেশলাই কাঠি | বিড়ির ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম |

 ললিত সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল | সবাই বলতে শম্ভু , সুবিমল আর নারায়ণ | আর এক বন্ধু বিকাশ তখন ফেরে নি | ওদের বলল যে এই হচ্ছে কুমার , পদ্মপুকুর মেসে থাকে ….কিন্তু এসব শোনার ওদের কোনো আগ্রহ ছিল না | একটাই প্রশ্ন আমি তাস খেলতে জানি কি না | যেই বললাম কাজ চালাবার মতো সুবিমল আর নারায়ণ লাফিয়ে উঠে বলল : ওতেই হবে | বিকাশ আর শম্ভু – দুটোই মাল | তাস খেলতে পারে না কিন্তু শালারা  ঢুক ঢুক করে মাল খেতে পারে | শোনো ভাই , রোজ সন্ধ্যা বেলায় চলে আসবে | দু -হাত খেলা যাবে |

       

এমন সময় রান্নার মাসি বিকেলের টিফিন নিয়ে এসে হাজির | হাতে গড়া দুটো করে রুটি আর আলুর  চোখা  |  সাথে চা | আমাকেও দিল | মনে হল যেন অমৃত | আমাদের মেসে রুটির চল নেই | সকাল -সন্ধ্যা দু বেলায়ই  মুড়ি | সকালে মুড়ি আর চা আর সন্ধ্যা বেলা মুড়ি আর আলু-মাখা নয়তো আলু ভাজা | মুড়ি আমার দু চোখের বিষ | চোখ ফেটে জল এসে যায় | নিরুপায় হয়ে  চিবাই |

 

 রুটি আমার খুব প্রিয় | তাই আবার হাতে গড়া গরম গরম | রোজ তাস খেলতে আসা মানে সন্ধ্যে বেলার টিফিনটা জমিয়ে খাওয়া | এ সুযোগ কোনো ভাবেই ছাড়া যাবে না | প্রয়োজনে রাত জেগে তাস খেলা প্রাকটিস  করবো | রুটি আমার চাই -ই চাই |

             

এই যদি মেস হয় তাহলে আমি যেখানে থাকি সেটা তো রাজপ্রাসাদ | একটা আস্ত ঘর আমি একা ভোগ  করি |  ম্যানেজার দুলাল বাবু  প্রথমটায় আপত্তি করেছিলেন , পরে অবশ্য চুপ হয়ে যান | চুপ একচুয়েলি হন নি | বাড়ির মালিককে নালিশ করে ছিলেন আমার  নামে | মালিক এসে একচোট জ্ঞান দিলেন | মেস মানে কি ? মেসে একসাথে কি ভাবে থাকতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি | যেই বলেছি ডবলের চেয়েও বেশি দেব মালিক তো গলে জল | আমার মতো ছেলেই হয় না এসব বলে চলে গেলেন | কিন্তু রেগে গেলেন দুলাল বাবু | সন্ধ্যে বেলায় তার ঘরে তাসের আড্ডা বসতো | উনি আর যাদব বাবু দুজনে হেলথ ডিপার্টমেন্টের , ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের মদন মাইতি , এগ্রি কালচারের  ভোলানাথ রুইদাস  আর বিডিও অফিসের  স্বপন কাঁড়ার | সেদিন রাতেই সব জোট বাঁধল | আমি বাজার করতে পারিনা বলে আমাকে ছাড় দিয়েছিল | পরেরদিন সকালেই হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিল | দু বেলার বাজার হবে একদম হিসাব করে মেপে মেপে | দরদাম করে কিনতে হবে | পোকা বা পচা যেন না হয় |

  জীবনে বাজার করি নি | এতো কম টাকায় এতগুলো লোকের বাজার করা আমার পক্ষে অসম্ভব | কিন্তু হারলে চলবে না | এটা কোনো ব্যাপার ই না – এরকম ভাব করে বেরিয়ে গেলাম বাজারে | বাজার করে শিস দিতে দিতে মেসে ফিরছি | আজ সবাইকে দেখিয়ে দেব আমার এলেম   | অরে বাবা বাজার করি নি বলে বাজার করতে পারবো না ? দেখবি আর জ্বলবি | ভাববি যে আমাকে কাত করতে গিয়ে নিজেরাই কুপোকাত হয়ে গেলি | মেসে ফিরেই হাঁকডাক শুরু করে দিলাম | সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগলাম  বাজার করা একটা আর্ট | যারা এই আর্ট জানেনা তারা যেন আমার কাছ থেকে শিখে নেয় | বাস্তবে হল উল্টো | মুখ থুবড়ে পড়লাম আমি | আইটেম ওয়াইস হিসাব দিতে গিয়ে  একেবারে ল্যাজে-গোবরে হয়ে গেলাম |  ভুলে গেছি কোনটার কত দাম |  একে তো অঙ্কে কাঁচা  তার ওপর চালাকি করতেও শিখিনি | ঘেমে নেয়ে একাকার | শেষে দুলাল বাবুই উদ্ধার করলেন | মোট টাকাকে মোট আইটেম দিয়ে ভাগ করে হিসাব  দিলেন মিলিয়ে | ভাবলাম যাক এ যাত্রা কোনোমতে উৎরে গেলাম | না যাই নি | আরও বাকি ছিল রাতের জন্য | ট্যাংরা   মাছ এনে ছিলাম  লিটল ফিঙ্গারের সাইজের | সবার জন্য একটা করে | রান্না করতে গিয়ে মাথা আর কাঁটা অবশিষ্ট আছে মাছ  গলে  গেছে | তার ওপর মাছ পচা | বিচ্ছিরি গন্ধ | রান্নার মাসি জানালো রান্না করতে গিয়ে তার বমি এসে গেছিল | এরপর আমাকে যে সব মধুর বাণী শুনতে হয়েছে তা এখানে না লেখাই আমার পক্ষে শ্রেয় | লোকে বলে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় | কিন্তু আমি তো বার বার গেছি |

একবার সানন্দায় একটা লেখা বেরিয়ে ছিল | অপর্ণা সেন তখন সানন্দার সম্পাদক | লেখাটার মূল বিষয় ছিল যে ছোটরা বাবা-মায়ের কাছে যদি জানতে চায় তারা কি ভাবে পৃথিবীতে এলো তাহলে মিথ্যা কথা না বলে সত্যিটাই বলা উচিত | এই বক্তব্যকে সমর্থন করে মেসের বাবুদের যেই বলেছি সবাইতো রেরে করে আমাকে মারতে আসে আর কি | বলল : আমাদের ছেলে-মেয়েরা যদি কখনো এই প্রশ্ন করে তাহলে ঠাস করে থাপ্পড় মেরে বলবো যে ভাবে আমরা জেনেছি তোমরাও বড় হয়ে সে ভাবে জানবে |   আর হ্যাঁ , আপনাকে বলছি , ভবিষ্যতে এই জাতীয় নোংরা কথা আমাদের বলতে আসবেন না |

 

এরপর আর একবার বেলতলায় গেলাম | সকালে চায়ের সাথে মুড়ি চিবাতে অসহ্য লাগে বলে বিস্কুট কিনে এনেছিলাম | দরাজ হয়ে গেলাম  বিলোতে  | বললাম : আরে মুড়ি একটা খাবার নাকি | ওতে কোনো প্রোটিন -ভিটামিন নেই | থিন এরারুট বিস্কুট দিয়ে সকালে চা খান  উপকার হবে |

দুলাল বাবু বললেন : দেখুন , আমরা মেসে থাকি খরচ কমাবার জন্য , বাড়াবার জন্য নয় | আমাদের সবার সংসার আছে | আপনার মতো ব্যাচেলার নই আর আপনার বাবার মতো অঢেল টাকাও  নেই | আমাদের মুড়িই ভালো | আপনার বিস্কুট আপনি খান |

 

সকালের মুড়ির  বদলে বিস্কুট খাই | সন্ধ্যেবেলারটা কি ভাবে বাদ দেওয়া যায় ভাবছিলাম | ললিতদের মেসে সে সুযোগ এসে গেল | এখন থেকে প্রতিদিন সন্ধেবেলায় গরম গরম রুটি |

  

মনে মনে বললাম : আমার রাজপ্রাসাদের মুড়ির চেয়ে ভাঙা মেসবাড়ির রুটি হাজার গুনে শ্রেয় |

পোস্টটি শেয়ার করুন



1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
Mete Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Mete
Guest

ভাল । এরকম মজার গল্প অনলাইনে পরতে চাইলে আমার ওয়েবসাইট ফলো করতে পারেন http://www.saabdik.com