ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

ছেলেটি ঘড়ির কাঁটা মেপে ঠিক সকাল সাড়ে আটটার সময় এসে হাজির হল আমার ড্রয়িংরুমে। শুনেছিলাম পলিটিকাল সায়েন্স, ইকোনমিক্স এবং শেষমেশ বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়ে, ডিজিটাল মার্কেটিং-এ কাজ করেছে দেশ জুড়ে। এখন সে পেশাদার ইলেকশন ক্যামপেনার। বাঙালি হলে কি হবে, আরও সাত-আটটি ভারতীয় ভাষায় সে সমান স্বচ্ছন্দ। আন্দাজ করেছিলুম চেহারা আরেকটু ভারিক্কি হবে, কিন্তু দেখে একেবারেই অল্পবয়স্ক ছেলেছোকরা বলে মনে হল। এ কি পারবে এই গুরুদায়িত্ব সামলাতে?   

“বাহ, আপনাকে দেখে তো বয়স খুব একটা বেশি বলে মনে হচ্ছে না, পারবেন তো এত ঝামেলা সামলাতে?”

“দাঁড়ান, দাঁড়ান এক মিনিট – কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে।”

“মানে? ঠিক বুঝলাম না। আপনিই তো সেই ইলেকশন ক্যাম্পেন স্পেশালিষ্ট?”

“হ্যাঁ, তা ঠিক-ই, আমি সেই। আমাকে আপনাদের পার্টি হাইকমান্ডই পাঠিয়েছে আপনার সাথে কথা বলার জন্যে।”

“তাহলে?”

“তাহলে কিছু না। ব্যাপারটা এই যে – আমি এখনও ঠিক করিনি, আপনার কাজটা করব কি না। সেটা নিয়ে কথা বলতেই এখানে আসা। আমাকে কাজের প্রস্পেক্টটা একটু ক্লোজলি বুঝতে হবে-”

“ও আচ্ছা, তাই নাকি। সরি ভাই, আমি তো এত কিছু জানতামই না। কিছু মনে করবেন না – আসলে পলিটিক্সে তেমন অভিজ্ঞতা নেই কিনা। তা চা খাবে নাকি?”

“না, চা খাওয়ার সময় নেই। সকাল সাড়ে আটটায় এসেছি মানে, চা খেয়েই এসেছি নিশ্চয়ই। আপনার অনুমানশক্তি খুব ভালো নয়। টু দা পয়েন্ট আসতে হবে চট করে।”

“বেশ, বেশ। তা কোথা থেকে শুরু করা যায় – কি বলো?”
“কেন আপনাকে দিয়ে, অবশ্যই-”
“আমাকে দিয়ে? “
“হ্যাঁ, অতি অবশ্যই আপনাকে দিয়ে। ভোটে কে দাঁড়িয়েছে ~ আপনিই তো? নাকি ফ্যামিলির অন্য কেউ।”
“না, মানে প্রচার করতে গেলে আমার কন্সটিটিউয়েন্সি, পাবলিক সেন্টিমেন্ট, লোকাল হিস্ট্রি, দেশের হালচাল এইসব দিয়ে প্রচার শুরু করতে হবে না? পার্টির ইলেকশন ম্যানিফেস্টো ইত্যাদি।”

“আপনি তো আজব লোক। আপনার কি মনে হয় – আপনার মত লাস্ট মিনিট টিকিট পাওয়া লোকের মতামতের জন্য পার্টির ইলেকশন ম্যানিফেস্টো অপেক্ষা করে আছে? নাকি পাবলিক দেখে আপনি আপনার স্পিচ বদলাবেন? মিস্টার ভৌমিক, গেট দিস রাইট, ইউ আর এ পন ইন দ্য হোল সিস্টেম। আপনার অনেক আগেই এসব ঠিক হয়ে গেছে – আপনার হাতে সময় খুব কম। বুঝলেন? মানলাম আপনি কিছু একটা নিয়ে গ্রাজুয়েশন করেছেন, ব্যাবসাপত্র করে টাকা করেছেন, ভোটের টিকিট কিনেছেন – কিন্তু এখনও বুঝতে পারছেন না, আসল কাজটা কিভাবে হবে। অবশ্য সে যদি জিততে চান। যদি ভেতর ভেতর ধরেই নিয়ে থাকেন যে প্রথমবার বলে গাড্ডু খাবেন, তাহলে তো আর কথাই নেই। সেটা ধরে নিলে আমাকে এখনি ছেড়ে দিন – আমার আরও অনেক কাজ আছে। আর আপনি টাইম পাস করার জন্য আমাকে অ্যাফোর্ড করতে পারবেন না। আপনার বাজেট আপনি যত না জানেন, তার চেয়ে ভালো আমি জানি। হোমওয়ার্ক না করে আমি আসি না।”

“আরে না না – সে কি কথা, হারার আগে হারব সে আবার কি কথা। তা আপনি আমার কাজটা নিতে চাইছেন কেন?”

“কেন আবার? নিজের আর নিজের ট্র্যাক রেকর্ডের জন্যে অফ কোর্স – এখন অবধি লাস্ট মিনিট টিকিট পেয়ে নন-সেলিব্রিটী প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবার ক্রেডিট একমাত্র মুম্বাইয়ের রমেশ মাস্কারের। আপনাকে জেতাতে পারলে সেটা আমার হবে।”

“বল কি – এ সবেরও আবার রেকর্ড থাকে নাকি?”

“দেখুন মিস্টার ভৌমিক আমাকে নটায় বেরোতে হবে। আপনি কি সিরিয়াসলি আপনার কাজের কথা বলতে চান? আপনার কেসটা কিন্তু এখন আমার ওয়েটিং লিস্ট এ আছে।”

“না না, ভাই তুমিই শুরু কর।”

“ফর দা আম্পটিন্থ টাইম – আমি আপনার ভাই না, জামাই ও না। যাই হোক, ঠিক করেছেন কি আপনার গিমিকটা কি হবে?”

“গিমিক?”

“ইয়েস, গিমিক – মানে আপনার অবতার একরকমভাবে বলতে গেলে”

আমার মুখের কথা আটকে গেল – ছোকরা বলে কি?

“সে মুখ দেখেই বুঝতে পারছি কিছুই বোঝেন নি। আপনার চেয়ে কিন্তু আপনার পার্টির নতুন জেল থেকে ছাড়া পাওয়া মাধ্যমিক পাশ মালটাও বেশি স্মার্ট। যা বলতে বলা হয়, তাই বলে। যা করতে বলা হয় তাই করে। কখনও মাচায় নাচ, তো কখনো গান, তো কখনো গলি ক্রিকেট। মাল খেয়ে সাক্ষাতকার দিলেও একটা ভুল বেরোয় না। এক্কেবারে প্রপার মালখোর প্রতিমূর্তী। কার্দাশিয়ানের নাম শুনেছেন?”

“মানে, ঐ খাপছাড়াভাবে আর কি – আমেরিকার পেজ থ্রি সেলিব্রিটি না কি যেন, তিনিই তো?”

“মিস্টার ভৌমিক, মনে হচ্ছে আপনার ওপর আমাকে অনেক খাটতে হবে – পার্কস, পেমেন্টস কিন্তু কিছু বেশি নেব। এসব ট্রেড সিক্রেট।  যাইহোক, খুব ছোট করে বলতে গেলে – হ্যাঁ, পেজ থ্রি সেলিব্রিটী, ঠিকই। কিন্তু কখনো ভেবেছেন আমদানিটা কোথায়? ওনার পরিবার সোশাল মিডিয়াতে এক্কেবারে ওপেন বুক, এমনকি যৌন জীবনও, বউ/বর/দেবর/শালির দিকে চোখ টেপা –  কোন ব্যাপারেই রাখঢাক নেই। কিন্তু, সেটাই স্ট্র্যাটেজি – লোকে জন্য অন্য কিছু দেখছে, তার ফাঁকে এন্ডোর্স হয়ে যাচ্ছে হাজারও প্রোডাক্ট – ক্লোদিং লাইন, পারফিউম, গাড়ি, হোটেল, জুতো, ফার্নিচার – সব। লোকে কার্দাশিয়ান গিলছে না, বেকুব বনে গিয়ে কিনছে এমন সব লাক্সারি ব্যান্ডের জিনিসপত্র, যা তাদের দরকার নেই। আপনার ভোটে দাঁড়ানটাও ঠিক তাই। আপনার একটা পারসোনা বানাতে হবে – তারপর দেখতে হবে, লোকে খায় কিনা। কিছু বুঝলেন?”

“দাঁড়ান দাঁড়ান, আমি তো কিছুই ঠিক বুঝলাম না – আপনি বলতে চাইছেন-”

আমাকে থামিয়ে দিয়ে “বলতে চাইছি না – বলছি। দর্শন পড়েছেন? যেরকম ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ – তেমনি আপনার রাজনৈতিক অবতার। আপনি সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত নাকি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট। হিন্দু হবেন, না সেকুলার। রিলিজিয়াস না স্পিরিচুয়াল। হঠযোগী না নকশাল। প্রতিবাদী নাকি পাগল – সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে। আমাদের কোম্পানি ভ্যালিডেট ব্যাক-স্টোরি আর স্টান্ট ডিজাইন করে দেবে। তারপর আপনাকে ঠিক ঐ ভাবেই চলতে হবে। কোথায় কি বলবেন, কি খাবেন, কি পরবেন, কখন রাগবেন, কখন কাঁদবেন, কখন গান গাইবেন, কখন ঘাস কাটবেন – সবকিছু আমার প্ল্যান অনুযায়ী চললে, আপনি পুরো পাবলিক সেন্টিমেন্ট হালকা করে দুধের ওপর থেকে মালাইয়ের মত তুলে নেবেন। তারপরে ভোটটা তো নিমিত্ত মাত্র। ওখানে হারার কোন কারন নেই – আসল খেলা তো হয়ে যায় আগেই। আপনার কাছে চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে আপনার সময় খুব কম, কাজেই আপনাকে ড্রামা করতে হবে একটু বেশি। আপনি পারবেন বলেই টিকিটটা পেয়েছেন। পার্টি যদি মনে করত পারবেন না, তাহলে কোনদিনই পেতেন না – বুঝলেন কিছু?”

“কিছুটা – কিন্তু তাই বলে পাগল?”

“ওহ সব কথা কি খুলে বলা যায়? একবার একটা লোক দিলীর যন্তর মন্তরে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছিল – মুখ্যমন্ত্রী পাগল। তো পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রচুর প্যাঁদাল। বললে, শালা এত বড় সাহস যে মুখ্যমন্ত্রীকে পাগল বলছিস। মার খেয়ে লোকটির বুদ্ধি কিছুটা খুলেছে, সে হাতজোড় করলে –  আরে, স্যার – আপনি ভুল বুঝছেন। আমি তো আসলে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীকে পাগল বলেছি, সেই যে ভদ্রলোকের মাঝে মাঝে বায়ু চড়ে না? তখন পুলিশ তাকে আরও প্যাঁদাল। কেন বলুন তো?”

“কেন?”

“আরে পুলিশের কি আর জানতে বাকি আছে, কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পাগল। বুঝলেন কিছু?”  এই বলে সে থামল আর জোরে জোরে হাসত লাগল, “ঐ টাও স্টান্ট। মানে যাকে বলে অবতার। বুঝলেন?” 

খেয়াল করলাম কখন যেন ঘামতে শুরু করেছি। আমি একটু মুখ মুছলাম রুমাল দিয়ে, তারপর জল খেলাম গ্লাস থেকে, “ঠিক বলছেন – এটা দিল্লীর ঘটনা, না কি …?”

ছেলেটি প্রাণ খুলে হাসল আরও কিছুক্ষণ, “কি মনে হচ্ছে কাকা, পারবেন তো? ভেবে দেখুন, এখনও মিনিট পাঁচেক সময় আছে আমার হাতে।”             

 

 

পোস্টটি শেয়ার করুন



Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of