ও কলকাতা

দিল্লীকা লাড্ডু ও এক বান্ডিল ভূত

April 21, 2019 No comments

কিভাবে ভোটে দাঁড়াবেন না

April 13, 2019 No comments

কোলাজ কোলকাতা (১)

June 11, 2016 No comments

প্লুটোর ইন্টারভিউ

June 8, 2016 No comments

হালখাতা

উত্তর কোলকাতার শরীকী বাড়ি ছেড়ে মল্লিক রা বিধাননগর এর এক অভিজাত আধুনিক আবাসন এ উঠে আসে বছর পাঁচেক আগে। বিশাল ফ্ল্যাট, শুনেছি তখনই দাম ছিল কোটি টাকার ওপরে।

মল্লিক দের ছোট ছেলে সন্দীপন আমার বন্ধু। কলেজে থাকতে, ওদের পুরনো শরীকী বাড়িতে দূর্গাপুজোয় গেছি অনেকবার।

মল্লিকরা ‘স্বর্ণ-বেনে’। ওদের পারিবারিক ব্যবসাটা অবশ্য এখন আর নেই। শরীক দের হাঁড়ি আলাদা। শরীকী ভাগাভাগি তে, বউবাজারের একটা সোনার গয়নার দোকান সন্দীপনের বাবার ভাগে আসে। মাঝারি মাপের দোকান, শুনেছি এক সময় বেশ নাম করা ছিল। তবে বাড়ির দুই ছেলের কেউ ই পারিবারিক পেশায় যায়নি।

বছর দুয়েক আগের কথা। পয়লা বৈশাখ এর ঠিক দুদিন আগে, ওদের ফ্ল্যাটে গেছি। অন্নপূর্ণা পুজোর নেমন্তন্ন। দেখলাম পারিবারিক ট্র্যাডিশন বজায় রেখেই পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। বেশ বড় মাপের ঠাকুর, টানা টানা চোখের সাবেকী দুর্গার আদলের। পেছনে চালচিত্র সমেত অন্তত ফুট ছয়েক তো হাইট হবেই। ১০৮ টা পদ্ম, বিশাল একটা স্ট্যান্ডে ১০৮ টা প্রদীপ, দু জন পুরুত মশাই, ঢাকি – সব মিলিয়ে জমজমাট ব্যাপার। সন্দীপন আর ওর দাদা, দুজনেই ধুতি পাঞ্জাবি পরেছে। বউ রা সাধারণ বাঙালি স্টাইলে শাড়ি, নাকে নাকছাবি – ঠিক যেন কোন বাংলা সিনেমার অষ্টমীর সিকুয়েন্স।

কাকিমা কে প্রণাম টা সেরে ভেতরে গেছি, কাকু কে প্রণাম করতে। ঘরে ঢুকে দেখি কাকু খাতা কলম নিয়ে হিসেবে বসেছেন। পাশে সন্দীপন মুখ টা বাংলার পাঁচ করে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই কাকু বলে উঠলেন, – “এই যে, অভিদীপ কখন এলে? পরশু আসছ তো?”

– “তুই বাবা কে একটু বোঝা তো।” সন্দীপন এর চোখে মুখে চাপা বিরক্তি।

-“হয়েছে টা কি?” আমি তো অবাক।

-“আর কি। ট্র্যাডিশন! গাদা গুচ্ছের টাকার শ্রাদ্ধ। এম এস এক্সেল ছেড়ে দিয়ে আবার ব্যাক টু হালখাতা।”

ব্যাপার টা আঁচ করলাম। ওদের গয়নার দোকানে হালখাতার ব্যাপার টা এখনো চলে আসছে। কার্ড ছাপানো, মিষ্টির বাক্স, কোল্ড ড্রিঙ্ক – একদম সেই ৯০ এর দশক এর মতো। একটা অবসোলেট জিনিসের পেছনে এত টাকা পয়সার শ্রাদ্ধ করতে দুই ছেলেই নারাজ। কিন্তু মেসোমশাই এই ব্যাপারে অনড়।

– “নবীন এর দোকানে অ্যাডভানস দেওয়া আছে, সোমবার বিকেলে ৪ টেয় ডেলিভারি। তুমি আর তোমার দাদা গিয়ে নিয়ে আসবে। ৫০ টা বাক্স, গুনে আনবে। এই নাও রসিদ টা ধর।” কাকু নির্বিকার ভঙ্গিতে এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিলেন সন্দীপনের দিকে – ” আমার দোকানে নবীন ময়রা ছাড়া অন্য কোণও দোকানের মিষ্টি ঢোকে না।”

– “আচ্ছা এত গুলো টাকার শ্রাদ্ধ না করলেই নয়? পুজো তো করছ, এই মিষ্টির বাক্সের কনসেপ্ট টা বাদ দাও না এবার।”

কাকুর মুখ চোখ গম্ভীর, – “সব ই তো করছি আমার টাকায়, তোমাদের দু ভাই এর থেকে এক পয়সাও চেয়েছি? “

– “এর মধ্যে আমার টাকা তোমার টাকা কেন আসছে? সন্দীপনের গলার স্বর চড়তে থাকে – “হালখাতা তো বেসিক্যালি ইউজলেস জিনিস। দোকানের সব হিসেব কম্পিউটার এ স্টোর হয়। এই ২০১৭ য় কটা লোকে করে এসব? মিষ্টির বাক্সের ক্রেজ আর আগের মতো আছে?  আগে দোকানে যা লোক আসতো হালখাতা করতে, এখন তো তার হাফ ও আসেনা। মিষ্টির বাক্স লোক ডেকে বিলিয়ে দিতে হয়”।

– “হোক, সেটা আমি বুঝবো। তুমি বল বাক্স গুলো এনে দিতে পারবে কিনা। নাহলে অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে।”

সন্দীপন একটা হাঁফ ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি কি করবো বুঝতে না পেরে বসেই রইলাম।

– “আমার দোকান টার বয়েস প্রায় দেড়শ, বুঝলে অভি।” কাকু চশমা টা খুলে টেবিলে রাখলেন। “একটা সময়ে এই পয়লা বৈশাখ দিন টার কি রমরমা ছিল ভাবতে পারবে না। বছরের প্রথম দিন বলে কথা! তখন তো আর কোল্ড ড্রিংক এর বালাই ছিল না, অতিথি দের আমপোড়া শরবত খাওয়ানো হত বরফ দিয়ে। পটলডাঙ্গা রাজবাড়ি র মেজো তরফের বাবু রা ছিলেন আমাদের বাঁধা খরিদ্দার…”

কাকু নস্টালজিয়ায় ভেসে চললেন খানিকক্ষণ।

– “এসব তো আর তোমরা বুঝবে না। আমি পুরনো দিনের মানুষ, ইমোশন আঁকড়ে বেঁচে আছি। আমার পরে ছেলে রা কি আর এই দোকান রাখবে? তা বলে আমি যতদিন আছি, এই ট্র্যাডিশন কি ফেলে দিতে পারি বল? বাপ ঠাকুরদা আমার ক্ষমা করবে?” প্রৌঢ় মানুষ টার চোখে হাসির ঝিলিক।

সেদিন সন্দীপনের অনুরোধ রাখতে পারিনি। ওর বাবাকে বোঝানোর মতো কিছু ছিল না আমার কাছে। যুক্তি আর আবেগের এক অদ্ভুত টানাপড়েনের মধ্যে পরেছিলাম। সময় আর প্রযুক্তির জালে পড়ে আমরা বোধহয় খুব দ্রুত পালটে যাচ্ছি। বাংলা বছরের হিসেব এখন আর কেউ রাখি না। আর বছর দশেক পরে হয়তো এসব উঠেই যাবে। হালখাতার মতোই, ‘অবসোলিট’ হয়ে যাবে বাংলা ক্যালেন্ডার।

পুনশ্চ: সন্দীপনের বাবা গত বছর মারা যান। আমি সেই সময় ব্যাঙ্গালোরের প্রবাসী বাঙালি। কোলকাতায় ফিরেছি মাস খানেক হল, এর মধ্যে আর সন্দীপনের সাথে যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। আজ সকালে সন্দীপনের ফোন পেলাম। সোমবার ওদের দোকানে হালখাতার নেমন্তন্ন।  মিষ্টি টা এবার ও নবীন চন্দ্র দাস অ্যান্ড সন্স থেকেই আসছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন



Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of